বাংলাদেশিদের ঘিরে চলছে কলকাতার চিকিত্সা ব্যবসা
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০১৪, ২২:১৩
গত প্রায় দুই দশক ধরে কলকাতায় একের পর এক বেসরকারি হাসপাতাল তৈরি হয়েছে অত্যাধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থাসহকারে। এর ফলে দক্ষিণ ভারতে চিকিত্সা করাতে যেতেন পূর্ব উত্তর-পূর্ব ভারতের যেসব মানুষ, তাদের অনেকেরই এখন হাতের নাগালে উন্নত চিকিত্সা ব্যবস্থা। বাংলাদেশ থেকেও হাজার হাজার মানুষ কলকাতার হাসপাতালগুলিতে চিকিত্সা করাতে যান প্রতিবছর; কিন্তু সার্বিক পরিকল্পনা আর পরিকাঠামোর অভাবে, কলকাতা এখনো পরিপূর্ণ চিকিত্সা কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে নি। বাংলাদেশি রোগীদের নিয়ে সেখানে চলে হাসপাতালগুলোর মধ্যে ব্যবসা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা, সঙ্গে রয়েছে দালালদের ফাঁদ।
দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার ইস্টার্ন বাইপাসের ধারের মুকুন্দপুর এলাকাটা একসময়ে ছিল জলা জমি; কিন্তু এখন প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই ব্যস্ত। গত দেড়-দুই দশকে সেখানে গড়ে উঠেছে একের পর এক বড় বেসরকারি হাসপাতাল। বিশিষ্ট ক্যান্সার-সার্জন গৌতম মুখোপাধ্যায় এই অঞ্চলের বেসরকারি চিকিত্সা পরিষেবার সঙ্গে একেবারে গোড়া থেকেই যুক্ত। তিনি বলছিলেন, সরকারি হাসপাতালগুলিতে যে বিপুল সংখ্যক রোগী যেতেন, তা হাসপাতালগুলির পক্ষে সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সেই সুযোগটা নেয় কর্পোরেট সংস্থাগুলি। বছর কুড়ি ধরে তারা কলকাতায় আসতে শুরু করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিয়াক সায়েন্সেস হাসপাতালটি সাধারণ মানুষের কাছে ভারতের প্রখ্যাত হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী শেট্টির হাসপাতাল নামেই পরিচিত। ওই গোষ্ঠীর পূর্বাঞ্চলের পরিচালক দীপক ভেনুগোপালন বলছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব ভারত বা বাংলাদেশের মানুষের কাছে দক্ষিণ ভারতই চিকিত্সার জন্য সেরা জায়গা হয়ে থেকেছে। তবে গত ৫ বছরে মানুষ আসলে কলকাতার চিকিত্সা-ব্যবস্থার ওপরে ভরসা করতে শুরু করেছেন, কারণ এখানে একের পর এক বিশ্বাসযোগ্য হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। তবে তিনি একথাও জানান, এখনো বেসরকারি হাসপাতালগুলি পুরো ভর্তি হয় না। বাইপাস অঞ্চল আর মধ্য কলকাতা মিলিয়ে হাসপাতালগুলিতে হাজার তিনেক শয্যা রয়েছে বেসরকারি খাতে, যার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শয্যায় রোগী ভর্তি হন। বাকিগুলো খালি পড়ে থাকে। অর্থাত্ বাজার বৃদ্ধির অনেক সুযোগ রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে স্থানীয় মানুষ ছাড়া আর সব থেকে বেশি যারা চিকিত্সা করাতে আসেন, তারা বাংলাদেশের রোগী। এই অঞ্চলের সব থেকে পুরানো বেসরকারি হাসপাতাল হলো পিয়ারলেস। ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ সমাদ্দার বলেন, তার হাসপাতালে গত বছর প্রায় ১৪ হাজার বাংলাদেশি চিকিত্সা করিয়েছেন। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ পার্থ প্রতিম বিষ্ণু বলেন, শিশু আর পূর্ণবয়স্কদের ব্রেন টিউমার, মেরুদণ্ডের সমস্যা বা চলাফেরার সমস্যা নিয়েই তার বিভাগে বাংলাদেশ থেকে মানুষ চিকিত্সা করাতে আসেন।
কিডনি বিশেষজ্ঞ দীপক শঙ্কর রায় বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসপাতালে তাদের বিভাগে বাংলাদেশ থেকে আসা বেশীরভাগ রোগীই কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য আসেন।
বাংলাদেশ থেকে আসা দুইজন রোগী বললেন, “যারা আসছেন, তাদের অনেক সময়ই দালালের পাল্লায় পড়ে ঠকতে হচ্ছে, বিশেষত বাংলাদেশি রোগীদের।” এক মহিলা রোগী বললেন, ঢাকাতেও চিকিত্সা খারাপ হয় না; কিন্তু কলকাতা থেকে চেনাশোনা অনেকে চিকিত্সা করিয়ে ভাল হয়ে ফিরেছেন সেই ভরসাতেই এখানে আসা।
মুকুন্দপুর অঞ্চলের হাসপাতালগুলিতে চিকিত্সা করাতে যারা বাইরে থেকে, বিশেষত বাংলাদেশ থেকে আসেন, তাদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করার জন্য সেখানে রীতিমতো একটা সমান্তরাল শিল্প গড়ে উঠেছে। সেখানে হোটেল-লজ আর বাংলাদেশিদের পছন্দের খাবারের দোকান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কলকাতা-ঢাকা রুটের বাসের টিকিট কাউন্টার বা বিদেশ থেকে টাকা আনানোর ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের সহযোগী পরিষেবা। এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ।
বাংলাদেশ থেকে আসা রোগীদের ভারতীয় ভিসা পাওয়াটা একটা বড় সমস্যা, বলছিলেন পিয়ারলেস হাসাপাতালের দিলীপ সমাদ্দার। সরকারের তরফে সার্বিক পরিকল্পনার অভাবে আরো বেশি সংখ্যক মানুষ চিকিত্সা সেবা নিতে আসতে পারছেন না- বললেন পিয়ারলেস হাসপাতালের বিপণন বিভাগের প্রধান সুগত মজুমদার।
যদিও বেসরকারি বা কর্পোরেট হাসপাতালগুলিকে ঘিরেই কলকাতার চিকিত্সা পরিষেবা চলছে, তবে সব থেকে বেশি মানুষ এখনো চিকিত্সা করান সরকারি হাসপাতালগুলিতেই। বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের বহু মানুষ সেখানেও আসেন।
বেসরকারি কর্পোরেট হাসপাতাল যেমন আরো প্রয়োজন, তেমনই সরকার এবং বড় বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা ট্রাস্টগুলিকেও বড় হাসপাতাল আর উন্নত চিকিত্সা দেয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন কলকাতার অভিজ্ঞ মহল। তবেই কলকাতা হয়ে উঠতে পারবে সত্যিকারের চিকিত্সা পরিষেবা কেন্দ্র যাতে স্থানীয় মানুষ তো বটেই, উত্তর-পূর্ব ভারত বা বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলির মানুষও উপকৃত হবেন।