ঈদের ছুটিতে চিকিত্সা সেবায় বিঘ্ন

ঈদের ছুটিতে চিকিত্সা সেবা ভেঙ্গে পড়ায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৭৪ জন রোগীর মৃত্যু হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডাক্তার, নার্স ও ওষুধের অভাবে শের-ই-বাংলা মেডিক্যালে ৪৪ জন এবং রংপুর মেডিক্যালে ৩০ জন রোগী মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তবে হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুর হার আগের অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লিটন বাশার, বরিশাল অফিস থেকে জানান, ঈদের টানা ছুটিতে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহত্ চিকিত্সা কেন্দ্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৪ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ঈদে চিকিত্সক ও নার্সরাগণ ছুটিতে যাওয়ার কারণে বিনা চিকিত্সায় এত রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বজনদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল শনিবার শেবাচিম ও সদর হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের ছুটির সাথে সাপ্তাহিক ছুটি ভোগের কারণে এখনো এ দুটি হাসপাতালে চিকিত্সক সংকট চলছে। নেই পর্যাপ্ত নার্স। পদের বিপরীতে অর্ধেক জনবল নিয়ে চলা এ দুটি হাসপাতালের যে কজন চিকিত্সক ও নার্স কর্মরত রয়েছেন তার সিংহভাগ গতকাল শনিবার পর্যন্ত কর্মস্থলে যোগ দেননি। রোগ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে চিকিত্সাধীন রোগীরা। তারা জানান, ঈদের দিন নামে মাত্র কোরমা-পোলাও খাওয়ানো হলেও কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সা সেবা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন। গত ২৮ জুলাই ঈদের আগের দিন থেকে ১ আগষ্ট শুক্রবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত শুধুমাত্র শেবাচিম হাসপাতালেই ৮ নবজাতক শিশুসহ ৪৪ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, এত রোগীর মৃত্যুর কারণ চিকিত্সার অভাব। মারা যাওয়া ৪৪ রোগীর মধ্যে ৮ জনই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির একদিন পরে মারা গেছেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২৮ জুলাই থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৯’শ রোগী ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং অনেকে স্বেচ্ছায় প্রাইভেট ক্লিনিকে চলে গেছেন। এর মধ্যে চিকিত্সা সেবায় অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ তুলে দুটি হাসপাতাল থেকে দেড়’শ রোগী বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি হলেও বাকীদের উন্নত চিকিত্সার নামে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। যা অতীতের সকল রের্কড ভঙ্গ করেছে। হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ঈদের একদিন আগ থেকে ছুটি শুরু হলেও এ দুটি হাসপাতালের প্রায় ৫’শ চিকিত্সক-নার্স গত ২৬ জুলাই থেকেই গণছুটিতে যেতে শুরু করেন। অধিকাংশ চিকিত্সক ও নার্স কোন প্রকার ছুটির অনুমতি ছাড়াই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে বাড়িতে চলে যান। এর মধ্যে অধিকাংশই গতকাল পর্যন্ত কর্মস্থলে যোগদেননি। ফলে রোগীদের দুর্ভোগ চরমে উঠছে। যারা মারা গেছেন তার বাইরে চিকিত্সাধীন রোগীরা এখন পর্যন্ত চিকিত্সা সেবা পাচ্ছেন না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঈদের আগের দিন ২৮ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত এ দুটি হাসপাতালে ইর্ন্টানি ১৮৯ চিকিত্সকের মধ্যে ৫০ জন, ২৮ জন রেজিস্ট্রারের মধ্যে মাত্র ১০ জন, ৪৩ সহকারী রেজিস্ট্রারের মধ্যে মাত্র ১৫ জন, ১৬ জন মেডিক্যাল অফিসারের মধ্যে ৫ জন, ১৮ জন ইনডোর মেডিক্যাল অফিসারের মধ্যে ৮ জন ও ৬ জন জরুরী বিভাগের মেডিক্যাল অফিসারের পদে ৩ জন চিকিত্সক কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন। যদিও হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, জরুরী বিভাগে ৬ জনের পদে ঈদ উপলক্ষে ১৪ জন চিকিত্সককে দায়িত্ব দেয়া হয়। একইভাবে ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে ঈদের ছুটিতে কাজ করেছেন মোট ১০৫ জন চিকিত্সক। রোগীর স্বজনদের দাবি তারা চিকিত্সক তো দূরের কথা নার্সদের দেখাও পাচ্ছেন না। গণছুটির ব্যাপারে পরিচালক বলেন, ঈদের ছুটির সাথে সকলেই ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে বেশ কিছু সিনিয়র হিন্দু নার্সিং ছাত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাড়াও স্থানীয় চিকিত্সক ও নার্সরা ছুটি ভোগ না করে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে তিনি জানান। রংপুর ওয়াদুদ আলী, রংপুর থেকে জানান, ৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও ঈদের আমেজ কাটেনি রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এর ফলে কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে হাসপাতালের চিকিত্সা ব্যবস্থা। গত বৃহস্পতিবার ঈদের ছুটির শেষদিন হলেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত অনেক ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে যোগদান করেননি। যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের অনেকেই হাসপাতালে নামকাওয়াস্তে ডিউটি করছেন। ছুটি শেষ হওয়ার পরও চিকিত্সকরা কর্মস্থলে যোগদান না করায় হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। চিকিত্সা-সেবা ব্যাহত হওয়ার কারণে রোগীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। অনেক অভিভাবকই আবার চিকিত্সা সেবা না পাওয়ার কারণে তাদের রোগীদের হাসপাতাল থেকে ক্লিনিকগুলোতে নিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে গত ৫ দিনে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা না পেয়ে ৩০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিনে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের নানা দুর্ভোগের চিত্র। হাসপাতালে চিকিত্সক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নার্সসহ ওয়ার্ড বয়দের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে দালাল চক্রের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের এ হাসপাতালে বেড সংখ্যা মাত্র ১ হাজার। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার রোগী চিকিত্সাধীন থাকে। ঈদ উপলক্ষে ডাক্তার, নার্স ও অন্য কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি এবং চিকিত্সায় অবহেলার শিকার চিকিত্সাধীন অধিকাংশ রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন। সাধারণত প্রতিটি ওয়ার্ডের বেডে এবং মেঝেতে গাদাগাদি রোগী থাকলেও গতকাল অধিকাংশ ওয়ার্ডে হাতে গোনা রোগী ছিল। আবার কোন কোন ওয়ার্ড একেবারেই ফাঁকা ছিল। চিকিত্সা সেবা না পেয়ে ফেরত যাওয়া ওসমান আলী নামের এক রোগী জানান, ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার দিন থেকে আমাদের কেউ খোঁজ-খবর নিচ্ছে না। তাই হাসপাতালে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে বাড়িতে যাওয়াই ভালো। রোগী ও তাদের অভিভাবকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। চিকিত্সা সেবা না পেয়ে সচ্ছল ব্যক্তিরা তাদের রোগীদের হাসপাতাল থেকে ক্লিনিকে ভর্তি করালেও নিম্নবিত্ত রোগীরা হাসপাতালেই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছুটিতে থাকায় এ সকল ওয়ার্ডের রোগীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। বিশেষ করে ঈদের ছুটির আমেজ এ সকল ওয়ার্ডের রোগীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। রোগীর অভিভাবকরা প্রায়ই সব ওষুধই চড়া দামে বাহির থেকে ক্রয় করছেন। হাসপাতালের নামে বরাদ্দ দেয়া ওষুধ কোথায় কিভাবে ব্যবহার হয় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. গোলাম মোস্তফা চিকিত্সা সেবা না পেয়ে মৃত্যুর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অধিকাংশ ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ইতিমধ্যে কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হওয়ার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি। হাসপাতালে রোগী শূন্য ওয়ার্ড প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, অধিকাংশ রোগী ঈদ করতে বাসা-বাড়িতে গেছেন। কেউ ছাড়পত্র নিয়েছেন কেউবা বিনা অনুমতিতে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন। দু’-একদিনের মধ্যেই এ সকল রোগী হাসপাতালে ফিরে আসবেন বলে তিনি জানান।