দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভুগছে ৪১ শতাংশ শিশু

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান ফেব্রুয়ারিতে প্রথম মা হন। মেয়ে জারিয়া নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জন্ম নেয়। তাই কিছুটা দুর্বল হওয়ায় সে মায়ের দুধ টেনে খেতে পারছিল না। শুভাকাঙ্ক্ষিদের কথায় অনিচ্ছা সত্যেও মেয়েকে সাত দিন বিকল্প খাদ্য দিতে হয়েছে তার। এরপর টানা চার মাস শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালেও শিশুকে বিকল্প খাদ্যে অভ্যস্থ করাতে হয়েছে তাকে। কারণ তিনি কর্মজীবী মা। শিশু বাসায় রেখেই তাকে কাজে যেতে হয়। একই অবস্থা বস্তিবাসী কর্মজীবী নারী আঁখির বেলায়। আঁখি বেগম বলেন, ‘নিজে ভাল খাই নাই, তাই দুধ হয় নাই, বাচ্চারে তো না খাওয়াইয়া রাহন যায় না। তাই ডিব্বার দুধ দিছি।’ এমন নানা কারণ দেখিয়ে মায়েরা শিশুকে বিকল্প খাদ্য দিচ্ছেন। এর ফলে দেশে বেড়ে যাচ্ছে শিশু অপুষ্টির হার। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের শেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী জন্মের প্রথম ছয়মাস শুধু বুকের দুধ না খেয়ে দেশে ৪১ শতাংশ শিশু দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভুগছে। এই বাস্তবতার মধ্যে গত ১ আগস্ট শুরু হয়েছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। জাতীয় খাদ্যনীতি কার্যপরিকল্পনা ও দেশি বিনিয়োগ পর্যবেক্ষণের এক প্রতিবেদন মতে, দুই বছরে দেশের পুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। এই প্রতিবেদন মতে ২০১১ সালে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ অপুষ্টির শিকার শিশু ছিল ৪ শতাংশ। যা ২০১৩ সালে বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে হয়েছে। অর্থাত্ দুই বছরে ঝুিঁকপূর্ণ অপুষ্টির শিকার শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় গত জুনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন মতে, দুই বছরে শিশু অপুষ্টির হারও বেড়েছে। ২০১১ সালে অপুষ্টির শিকার শিশু ছিল ১৬ শতাংশ। ২০১৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৮ শতাংশে। কিন্তু যথানিয়মে মায়ের দুধপানসহ শিশুর সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে অপুষ্টি দূর করে আমরা সুস্থ-সবল ও সক্ষম মানব সম্পদ নিশ্চিত করতে পারি। মায়ের দুধের কোন বিকল্প বা সমকক্ষ নেই এবং মায়ের দুধ শিশুর মস্তিষ্ক গঠনে অপরিহার্য। শিশুকে মায়ের দুধ পান করাতে বাড়তি কোন শ্রম এবং অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় না। মায়ের দুধপান শিশু এবং মা উভয়ের জন্য উপকারী। আর শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় বলে মন্তব্য করেন জাতীয় অধ্যাপক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এমআর খান। অথচ অশিক্ষা, প্রান্তিক এলাকায় সরকারি কার্যক্রমের অভাব, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং মায়ের দুধের বিকল্প জাতীয় খাদ্যের সহজলভ্যতা বাড়িয়ে দিচ্ছে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি। ডা. এমআর খান বলেন, অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে আগ্রহ হারায়। এখানে ধনী-গরিব উভয়ের মধ্যে এই প্রবনতা আছে। তবে যারা পড়াশুনা করেন, একটু নিজের স্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন তারা শিশুকে জন্মের প্রথম শাল দুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে ছয় মাস তো শুধু বুকের দুধ খাওয়ানই, এর পরেও স্বাভাবিক খাবারের সাথে মায়ের দুধ চালিয়ে যান। তিনি বলেন, নবজাতককে যখনই বিকল্প খাদ্য দেয়া হয় তখনই তার ডায়রিয়া, পেটে ব্যথ্যাসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১১-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেক অপুষ্টিতে আক্রান্ত। অপুষ্টির কারণে ৪৩শতাংশ শিশুর উচ্চতা এবং ৩৬ শতাংশ শিশুর ওজন বয়সের তুলনায় কম। ১৬ শতাংশ শিশুর ওজন উচ্চতার তুলনায় কম এবং ৪৭ শতাংশ শিশু রক্ত স্বল্পতায় ভুগছে। অর্থাত্ অপুষ্টির কারণে আমাদের অর্ধেক শিশুর সুষ্ঠু শারীরিক বৃদ্ধি সম্পন্ন হচ্ছে না। এখনও প্রায় অর্ধেক শিশু পুষ্টিহীনতার পেছনে সরকারের কার্যক্রমের অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা বিষয়ক কর্মসূচি সমন্বয়ক ডা. রাইসুল হক। তিনি বলেন, দেশে ৬ হাজার লোকের জন্য সরকারের একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। সে সকল ক্লিনিকে পুষ্টি বিষয়ে সেবা দিলে একাজ আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে পারে। যেখানে সরকারের লোকবলের অভাবে পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে পাশাপাশি কাজ করবে সহায়ক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। ফলে বিষয়টি অধিক গুরুত্ব ও গতিশীল হবে। মানুষ তা গ্রহণ করবেন। মা-বাবাকে বোঝানো কার্যক্রম এক্ষেত্রে সফল বলেও তিনি জানান। মাঠপর্যায়ে সরকারের পুষ্টি সেবা না থাকাই পুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সরকারের সংশ্লিষ্টরাও। তাদের মতে, বিভাগীয় সরকারি হাসপাতালগুলোতেও পুষ্টি সেবা কার্যক্রম নেই। আর জাতীয় অধ্যাপক বলেন, আমরা মা-বাবাকে ছয় মাস তো শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর কথা বলি। যে সব মা-বাবার ঈমানের জোর কম তারা নানাযুক্তির প্ররোচনায় বিকল্প খাদ্য বেছে নেন। ঈমানের জোর বাড়াতে হবে। চিকিত্সা বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পত্রিকা ল্যানসেট-এ ২০০৮ সালে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের বিশ্ব ব্যাংকের এক তথ্য মতে যেসব শিশু প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ খায়নি তাদের মৃত্যুঝুঁকি জন্মের পর প্রথম ছয় মাস যারা শুধু বুকের দুধ খেয়েছে তাদের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি। আর এই সকল নবজাতক ও পাঁচ বছর বয়সি শিশুর মৃত্যূ আশঙ্কাও বেশি থাকে। তাদের উচ্চতা ও ওজন দুই-ই কম হয়।