‘কামালকে জিজ্ঞেস কর, সে জজ হতে রাজি কি না’

‘বঙ্গবন্ধু আমাকে ১৯৪৫ সাল থেকে চিনতেন। তিনি আব্বাকে খুব মান্য করতেন। আব্বাকে তার হোস্টেলে নিয়ে যেতেন গান গাওয়ার জন্য। তিনি আমাকে ভীষণ আদর করতেন। আমি যখন বিলেতে পড়তাম তখন বঙ্গবন্ধু কি যেন কাজে বিলেতে গিয়েছিলেন। আমি তাকে রান্না করে খাওয়াইছিলাম’-এভাবেই জীবন ও কর্মের নানা দিক সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামাল। তার এই বর্ণনা সাক্ষাত্কার আকারে প্রকাশ পেয়েছে ‘চির উন্নত মম শির’ বইয়ে। বইয়ে বিচারপতি মোস্তাফা কামাল বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে তত্কালীন অ্যাটর্নি জেনারেল ফকির শাহাবুদ্দিন সাহেবকে আমার কাছে পাঠালেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছেন- ‘কামালকে জিজ্ঞেস কর, সে জজ হতে রাজি কি না। আমি তাকে আজকেই জজ করে নেব।’ তখন জজদের মাইনে ছিলো এক হাজার টাকা। আমি তখন অনেক বেশি আয় করি। কেবল টাকার মুখ দেখেছি। আমি শাহাবুদ্দিন ভাইকে খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম আমাকে কি চিরদিন গরীব থাকতে হবে? ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর আবার আমার ডাক পড়ে, আমি যাইনি। তারপর বিচারপতি কামালউদ্দিন আহমদ যখন প্রধান বিচারপতি হলেন তিনি আমাকে নেয়ার জন্য বেশ আটঘাট বেঁধে লেগে গেলেন। আমাকে খুব আদর করতেন। তিনি আমাদের বালিগঞ্জ স্কুলের ছাত্র। তিনি আমার এমন অবস্থা করলেন যে, আমার মক্কেল আসা বন্ধ হয়ে গেলো। আমার মক্কেলদের তিনি বলতেন ‘তার কাছে কেস নিয়ে কি হবে। দুই দিন পর মোস্তাফা কামাল বিচারপতি হয়ে যাচ্ছেন।’ শেষ পর্যন্ত আমি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলাম।’ বইটিতে ৮১ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী বিচারপতি মোস্তাফা কামালের ওপর লেখা ৩১টি বাংলা ও ইংরেজি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। আছে তার পারিবারিক ও কর্মজীবনের বিভিন্ন ছবি। তার একটি সাক্ষাত্কারও আছে এতে। এটি সম্পাদনা করেছেন মোস্তাফা কামালের বড় মেয়ে শিক্ষক ও সংগীত শিল্পী ড. নাশিদ কামাল। বিচারপতি মোস্তাফা কামাল বলেছেন, ‘আমার দাদা জাফর আলী, তিনি তুফানগঞ্জ মহকুমা কোর্টের একজন উকিল ছিলেন। তার ইচ্ছা ছিলো আমার আব্বা আব্বাসউদ্দিনকে ব্যারিস্টারি পড়াবেন। আব্বা তো হতে পারলেন না গানের লাইনে চলে গেলেন। তিনি খুব ছোটবেলা থেকে আমার কানে মন্ত্র পড়ার মতো বারবার বলতেন- তোকে ব্যারিস্টার হতে হবে। ব্যারিস্টার কি? ব্যারিস্টার হলে কি করতে হয় সে ধারণাও আমার ছিলো না। পরে অনার্সে এসে বুঝতে পারি আইন পড়া একটা আলাদা জীবন। আমি যে ব্যারিস্টার হব, আমার আব্বার ইচ্ছাকে পূর্ণ করব- এই সংকল্প নিয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করি। তিনি জীবিত থাকতে আমাকে ব্যারিস্টার দেখে গেছেন।’ বিচারপতি কামাল বলেন, ‘আব্বা সব সময় বলতেন ‘বাবা তুমি চাকরি কর না। চাকরি মানে চাকর।’ তিনি খুব অল্প বেতনে কৃষি বিভাগে কেরানির চাকরি করতেন। দার্জিলিং বেড়ানো তার শখ ছিলো। ছুটি পেলে তিনি দার্জিলিং যেতেন। তো এক ছুটিতে তিনি দার্জিলিং বেড়াতে গেলেন। সেখান থেকে ফেরার পর আব্বাকে খুব গঞ্জনা শুনতে হয়। তার বস তাকে বলেছিলেন, ‘পচাত্তর টাকার কেরানি তার আবার দার্জিলিং যাওয়ার শখ।’ তখন আব্বা তাকে বলেছিলেন , ‘আপনাকে দার্জিলিং থেকে খুব সুন্দর একটা চিঠি লিখেছিলাম। ওই চিঠিটা আপনি রেখে দেবেন। একদিন আপনার ছেলেমেয়েরা গর্ব করে বলবে, আব্বাসউদ্দীন আমার পিতাকে চিঠি লিখেছিলেন। আব্বা ওইদিনই চাকরি ছেড়ে দেন।’ বিচারপতি মোস্তাফা কামাল বলেন, ‘অবসরে আমি নিয়মিত গান শুনি। বড়বড় ওস্তাদদের গান শুনি, পুরনো দিনের গান শুনি। এখানকার ওস্তাদদের গান শুনি। গান শুনে শুনে আমার একটা পাকা কান তৈরি হয়েছে। কোনো আজেবাজে গান আমাকে শোনাতে পারবেন না। এক সময় প্রচুর বই পড়তাম; কিন্তু গত দুই-তিন বছর বই পড়া কমে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছোটবেলায় কোন বর্ণ পরিচয় হয়নি, অর্থাত্ অ, আ, ক, খ -এর বই নিয়ে বর্ণমালা শিখিনি। আমি বাংলা শিখেছি খোদার দান হিসেবে। আব্বার অসংখ্য রেকর্ড ছিলো বাসায়। ওই রেকর্ডের লেবেলগুলো দেখে দেখে আমি বলতাম, এটা ‘ঈদ মোবারক হো’, এটা ‘ও মন রমজানের রোজার শেষে’ ইত্যাদি। ওই রেকর্ডের লেবেল দেখে দেখে আমি বাংলা শিখে ফেলি। তবে স্কুলে ইংরেজি শিখেছি। তিনি বলেন, ‘আব্বার সঙ্গে কবি কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ও বন্ধুত্ব ছিলো। তিনি আমাকে না দেখেই কাজী নজরুল ইসলামের কাছে বলেছিলেন-‘কাজীদা, আল্লাহর অসীম অনুকম্পায় আমার এক খোকা এসেছে ঘরে, আপনি যদি খোকার নামকরণ করেন।’ মহা উল্লসিত হয়ে দুদণ্ড চোখ বুজে বলে উঠলেন, ‘খোকার নাম রইল মোস্তাফা কামাল।