সুযোগ সদ্ব্যবহার করছে ইসরাইল

আরব বিশ্বের বিভক্তি ঐতিহাসিকভাবেই ছিল। আর এর সুযোগ পশ্চিমা বিশ্ব ভালভাবেই নিয়েছে। সেই ঐতিহাসিকতাই যেন আবার প্রাধান্য পাচ্ছে। আর এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের মধ্যকার সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্ব এবং স্বৈরশাসকরদের ক্ষমতার লোভ পশ্চিমা বিশ্বকে মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইসরাইল গাজায় যে হামলা চালাচ্ছে এটা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি ছায়াযুদ্ধ। সেটা যদি হয় মধ্যপ্রাচ্য যে পশ্চিমা বিশ্বের হাতের মুঠোয় আসবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পুরো মুসলিম বিশ্ব পরিণত হবে পশ্চিমাদের হাতের পুতুলে। মধ্যপ্রাচ্যে হামাস এখন অনেকটাই দুর্বল। তাদের মূল সমর্থক মিসর তাদের ওপর থেকে ছায়া সরিয়ে নিয়েছে। অস্ত্র পাচারের সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কমে গেছে আয়। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেনারের আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি অনেকটাই ইসরাইলপন্থী বলে মনে করা হয়। সিসির চেষ্টায় খুব একটা আন্তরিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। কারণ সিসি জানেন, হামাসের সঙ্গে ব্রাদারহুডের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার কথা। ইরান আগে হামাসকে সমর্থন দিলেও এখন সেভাবে দিচ্ছে না। যদিও ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি গাজায় হামলার নিন্দা করছেন এবং মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। কারণ ইরান সিরিয়ার শিয়াপন্থী সরকারকে সমর্থন দিয়ে থাকে। আর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে হামাস। ফলে সিরিয়া সরকারও হামাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আরব বিশ্বের বিভক্তির সুযোগ নিয়ে যেভাবে ইসরাইল ফিলিস্তিনীদের ওপর হামলা করছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করছে তাতে মনে হচ্ছে এটা হয়তো মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণের একটা ছায়া যুদ্ধ। মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড যে শক্তিশালী সেটা যে কেউই ধারণা করতে পারেন। বিশ্বের ৭০টি দেশে সংগঠনটির শাখা রয়েছে। পুরো আরব বিশ্বে তাদের কর্তৃত্ব বিরাজমান। হামাসকে তাদের একটি অঙ্গসংগঠন বলে অনেকে মনে করেন। আরব বসন্তের সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমাপন্থী সরকার প্রধানদের পতনের ধারাবাহিকতায় মিসরের রাষ্ট্রক্ষমতায় ক্ষমতায় এসেছিল ব্রাদারহুড। কিন্তু ক্ষমতায় স্বাদ ভোগ করতে পারেননি তারা। অচিরেই সেনাবাহিনীর রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছে। দলটিকে মিসরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নেতা-কর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় করে কারাদণ্ড দেয়া হচ্ছে। ফলে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে ব্রাদারহুড। মিসরে আবারো পশ্চিমাপন্থী সেই হোসনে মোবারকের সরকারের ছায়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিবেশি ইসরাইলসহ পশ্চিমা বিশ্বেও পাশাপাশি সৌদি আরব এবং রাশিয়াও প্রেসিডেন্ট সিসিকে সমর্থন দিচ্ছে। ফলে সিসির ক্ষমতা যতো দীর্ঘায়িত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। আর সিসির ক্ষমতা যতো দীর্ঘায়িত হবে ততোই ব্রাদারহুডের দুর্ভোগ বাড়বে। কারণ সিসি তো ইতোমধ্যে ব্রাদারহুডকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছেন। গত ৮ জুন থেকে ফিলিস্তিনের উপত্যকা গাজায় ইসরাইলি হামলার পর থেকে নিহতের সংখ্যা ১৭০০ ছাড়িয়ে গেছে। যেভাবে আকাশপথ, নৌপথ এবং স্থলপথে গাজাবাসীর ওপর ইসরাইলি সেনাবাহিনী হামলার করছে তাতে অনেকের কাছে মনে হতে পারে এটা মানুষ মারার একটা নাটক। ইসরাইল এবং পশ্চিমা বিশ্ব মিলে এই নাটক মঞ্চস্থ করছে। আর আরব বিশ্বেও ক্ষমতাধররা সেটি বসে বসে দেখছে এবং সময় কাটাচ্ছে। হামলায় নিহতের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। রয়েছে প্রচুর সংখ্যক শিশু এবং নারী। যুদ্ধ নীতিমালাও এক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে হুঁশিয়ার করে জাতিসংঘ। এমনকি ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও আনা হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির পক্ষ থেকে হুমকি দেয়া হয়েছে। তবে এসব হুমকির তোয়াক্কা করছে না ইসরাইল। তারা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ও রক্ষা পায়নি। ইসরাইল জানায়, ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামাসের অস্ত্রাগার ছিল। বিবিসি জানায়, একটি বাড়িতে হামলা চালায় ইসরাইল। অভিযোগ করে, ঐ বাড়িতে হামাসের সদস্য রয়েছে। কিন্তু পরে দেখা যায়, বাড়িতে হুইল চেয়ারে বসা অবস্থায় এক বৃদ্ধা নিহত হয়। সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব বিভিন্ন সময় ইসরাইলি হামলার নিন্দা করে। কিন্তু তারা এসময় ইসরাইলের ‘আত্মরক্ষার’ অধিকারের কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেনি। আর ইসরাইলের এই ‘আত্মরক্ষার’ জন্যই গাজার হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে জীবন দিতে হয় অকালে। সম্প্রতি ইসরাইল তাদের একজন সেনার অপহরণের অভিযোগ করার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘বর্বর’ বলে উল্লেখ করে। কিন্তু এরপর ইসরাইল জানায়, তাদের সৈন্যটি যুদ্ধে নিহত হয়েছে। অথচ কত মানুষকে এই সেনার জন্য জীবন দিতে হলো! যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা খাতে ২২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা ঘোষণা করেছে। ইসরায়েলের সর্বাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ প্রযুক্তির জন্য শুক্রবার এই জরুরি তহবিলের অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেস। কংগ্রেসের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এর ভোটাভুটিতে অনুদান দেয়ার পক্ষে ৩৯৫ ভোট পড়ে। মাত্র ৮ জন সদস্য এর বিপক্ষে ভোট দেন। অনেকটা সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়া ঐ বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট ওবামার অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের মতে, মার্কিন সিনেটে ইসরাইলের পক্ষে শতভাগ ভোট পড়া আর আরব স্বৈরশাসকদের ৯৮ শতাংশ ভোট পাওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ফ্রান্স যেভাবে নিন্দা জানিয়েছে খোদ দেশটির জনগণের মধ্যেই তা নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। আর হল্যান্ড কেবল ইসরাইলের প্রক্রিয়া কিছুটা সংশোধন চেয়েছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেছেন, মিসরের অস্ত্রবিরতি পরিকল্পনাই গাজায় সংঘাত নিরসনের ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হতে পারে। তিনি এই অস্ত্রবিরতি পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বলেন, এটাই উপযুক্ত সময়। ফিলিস্তিনে রক্তপাত বন্ধে ও গাজার আগুন নেভাতে আমাদের দ্রুত এর সুবিধা নিতে হবে। তিনি কিন্তু ইসরাইলের হামলার নিন্দা জানাননি। গত শনিবার দিনভর গোলা হামলায় গাজার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের পর হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে না গিয়ে হামলার তীব্রতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরাইল। শুক্রবার গাজায় সুড়ঙ্গ পথের তল্লাশিতে থাকা সেনাদের ওপর হামাসের আক্রমণের পরই যুদ্ধবিরতি ভেঙ্গে তারা হামলা চালাতে বাধ্য হয় বলে দাবি ইসরাইলি সেনাদের। তবে হামাস বলেছে, অস্ত্রবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের মতো কোনো তত্পরতা তারা চালায়নি। শুক্রবার আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ ৭২ ঘণ্টার অস্ত্রবিরতিতে রাজি হওয়ায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি যৌথভাবে তা ঘোষণা করেন। ঐ সময়ের মধ্যে মিসরের রাজধানী কায়রোতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় বসার আয়োজন হতে থাকে, যাতে হামাসের প্রতিনিধিদেরও রাখার সিদ্ধান্ত হয়। গাজার সুড়ঙ্গপথ ব্যবহার করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র দলগুলো ইসরাইলে আক্রমণ চালায় বলে অভিযোগ করে আসছে দেশটির সরকার। গাজার সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস করাই চলমান সেনা অভিযানের মূল লক্ষ্য বলে ইসরাইলর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ঐ সুড়ঙ্গ পথগুলো ধ্বংসের অভিযানে সমর্থন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার আশায় মিসরের কায়রোতে যে আলোচনা চলছে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবার সেই আশা একেবারেই শূন্যে মিলিয়ে গেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।