মামলা হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে!

দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা! শুনলে যে কারো হকচকিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। গত বুধবার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রতিনিধি সভা। ঐ দিন পার্লামেন্টের এই নিম্নকক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব আনা হলে তা ভোটাভুটিতে দেন রিপাবলিকান পার্টির নেতা ও স্পিকার জন বোয়েনার। ২৪ ভোটের ব্যবধানে ঐ প্রস্তাব পাস হয়। অর্থাত্ ফেডারেল কোর্টে এখন ওবামার বিরুদ্ধে মামলা করতে আর কোন বাধা নেই। যদিও প্রশ্ন আছে, বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? তবে মামলা হোক আর না হোক, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন ঘটনায় বিশ্ব গণমাধ্যমে বেশ কিছু দিন ধরে চলছে ব্যাপক শোরগোল। মামলা আয়োজনের আড়ালে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক ও বিরোধী রিপাবলিকান দলের তীব্র ক্ষমতার দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে এসব আলোচনা বিশ্লেষণে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশে পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে রিপাবলিকান নেতারা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ওবামাকে অন্তত পক্ষে ইম্পিচ করার পথ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি সভায় বিরোধী দল যে প্রস্তাব আনে, তাতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে ঘোরতর অভিযোগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ওবামা সাংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। লঙ্ঘন করেছে ক্ষমতার সীমা রেখা। রিপাবলিকান নেতাদের অভিযোগ, একতরফা ক্ষমতা ভোগ করছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কংগ্রেসের হলেও প্রেসিডেন্ট ওবামা কখনও কখনও নিজেই আইন তৈরি করছেন। তাই স্বাভাবিকভাবে তার ক্ষমতার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিনিধি সভায় এসব অভিযোগ সম্বলিত প্রস্তাব আনেন টেক্সাসের কংগ্রেসম্যান পিট সেশনস। ভোটাভুটির আগে আবেগপূর্ণ বিতর্কে জড়ান স্পিকার জন বোয়েনার। তিনি বলেন, ‘এটা রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট দ্বন্দ্ব নয়, বরং এটা সংবিধান রক্ষার লড়াই, যা নিয়ে আমরা শপথ করেছিলাম। আইন সভার সদস্য হয়ে সেই শপথ নেয়ার পর আপনি কি আইন কার্যকর ও পরিবর্তনের দায়িত্ব কোন প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেবেন?’ এরপর প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন ২২৫ জন সদস্য। আর বিপক্ষে ভোট দেন ২০১ জন। মজার ব্যাপার হলো, ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির কেউ ঐ প্রস্তাবের পক্ষে তথা প্রেসিডেন্ট ওবামার বিরুদ্ধে ভোট দেননি। বরং বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টির পাঁচ নেতা ভোট দিয়েছেন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ভোটাভুটির পর এখন মামলার খসড়া প্রস্তুত করছেন প্রতিনিধি সভার আইনজীবীরা। অবশ্য রিপাবলিকান দলের প্রভাবশালী নেতা ন্যান্সি পেলোসি জানিয়েছেন, মামলা-টামলা নয়, প্রেসিডেন্টকে ইম্পিচমেন্ট করার পথ খোঁজা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তারই প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যসেবা আইনের ইস্যুতে। গত বছর ঐ আইনের আওতায় চাকরিজীবীদের ইন্স্যুরেন্সের কিস্তি মওকুফ করার নির্বাহী আদেশ জারি করেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। সে অনুসারে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ফুলটাইম শ্রমিকদের কোন কিস্তি পরিশোধ করার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু রিপাবলিকানদের বক্তব্য হলো- কংগ্রেস যেখানে না বলেছে, প্রেসিডেন্ট ওবামা সেখানে হ্যাঁ বলছেন। অর্থাত্ কংগ্রেস ভোটের মাধ্যমে যেসব প্রস্তাবকে নাকচ করে দিচ্ছে, সেসব প্রস্তাবের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ওবামা নির্বাহী আদেশ জারি করছেন। এর ফলে সংবিধানে লিখিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য হতাশা ব্যঞ্জক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে আটক এক মার্কিন সেনাকে মুক্ত করতে প্রেসিডেন্ট ওবামার নির্বাহী আদেশে জঙ্গিদের সাথে বন্দি বিনিময় এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশকারী কিছু তরুণকে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোকেও মামলার পটভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রিপাবলিকানদের অভিযোগ, এমন অসংখ্য ইস্যুতে পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে ওবামা নিজের নির্বাহী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছেন, যা ক্ষমতা অপব্যবহারের শামিল। তবে মামলার এসব প্রক্রিয়াকেই সময়ের অপব্যবহার বলে মনে করেন খোদ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি বলেন, সবাই জানে এটা একটা রাজনৈতিক চটকবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। ওবামার মতে, বিরোধী দল অধ্যুষিত কংগ্রেসের পক্ষে যখন কোন কিছুই করা সম্ভব হয় না, তখন তিনি বা তার দল করণীয় সব কিছুই করে দেখাবে। তিনি দাবি করেন, কঠোর পরিশ্রমী পরিবারগুলোর স্বার্থে এমন চল্লিশটিরও বেশি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যা কংগ্রেস করতে পারেনি। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, হোয়াইট হাউজ গোছানো থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত যে কোন ইস্যুতেই নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। কখনও কখনও তিনি পত্রিকায় লেখনীর মাধ্যমে অনেক ইস্যুতে জাতিকে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। তখন সেসব নির্দেশনা সম্বলিত পত্রিকাও নির্বাহী আদেশের সরকারি দলীল হিসেবে গণ্য হয়। হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তারা তাই সব সময় নজর রাখেন প্রেসিডেন্টের কলম ও ফোনে। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রেসিডেন্টই এই চূড়ান্ত ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছেন। এক হিসেবে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে সমকামী অধিকার থেকে শুরু করে অভিবাসন সংস্কার আইন পর্যন্ত ১৮৩টি ইস্যুতে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তার আট বছরের মেয়াদকালে জারি করেছিলেন ২৯১টি নির্বাহী আদেশ। একই মেয়াদে রোনাল্ড রিগান জারি করেন ৩৮১টি। সে তুলনায় প্রেসিডেন্ট ওবামার নির্বাহী আদেশের সংখ্যা বেশ কমই। প্রতিনিধি সভার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন চলছে এক ধরনের অচলাবস্থা। ফলে অনেক প্রস্তাব সিনেটে পাস হলেও প্রতিনিধি সভায় তা আটকে যায়। কারণ তা এখন পুরোপুরি বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে। আগামী নভেম্বরে এই অচলাবস্থা হয়তো চূড়ান্ত রূপ নেবে। কারণ ঐ মাসে অনুষ্ঠিত হবে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রতিনিধি সভার পাশাপাশি সিনেটেরও নিয়ন্ত্রণ চায় রিপাবলিকানরা। সেই নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্টকে ইম্পিচ বা তার বিরুদ্ধে মামলা করার প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষকরা দেখছেন রাজনীতির মাঠ গরমের প্রক্রিয়া হিসেবে। কারণ ফেডারেল কোর্টের কোন বিচারকই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেবে কি-না সন্দেহ আছে। কানসাস নগরীর এক বক্তব্যে তাই প্রেসিডেন্ট ওবামা হয়তো ঠিকই বলেছিলেন, কাউকে মামলায় ফাঁসানো সৃষ্টিশীল কোন কাজ না।