হঠাত্ করে বৈরী আকাশ

১৭ থেকে ২৪ জুলাই, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি বড় বিমান দুর্ঘটনা। হঠাত্ করে যেন বৈরী হয়ে উঠেছে আকাশ। এসব দুর্ঘটনা যেন সে কথায় বলছে। দুর্ঘটনার কারণগুলো যাহোক না কেন, মারা যাচ্ছে সাধারণ নিরীহ মানুষ। আতঙ্ক বাড়ছে বিমান যাত্রীদের মধ্যে। গত ১৭ জুলাই পূর্ব ইউক্রেনের রুশ সীমান্তের কাছাকাছি ২৯৮ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে বিধ্বস্ত হয় মালয়েশিয়ার একটি বোয়িং ৭৭৭ বিমান। সকল যাত্রী ও ক্রু প্রাণ হারিয়েছে এই দুর্ঘটনায়। অনেকের ছিন্ন মরদেহের খোঁজ পর্যন্ত মেলেনি। বলা হচ্ছে, ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিমানটি ভূপাতিত হয়। বিদ্রোহীদের ভুলে চালানো হামলায় প্রাণ গেছে প্রায় ৩০০ মানুষের। এর প্রায় চার মাস আগে ২৩৯ আরোহী নিয়ে উধাও হয়ে যায় মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের আরেকটি বিমান। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে বড় ধাক্কা খেল এয়ারলাইন্স কোম্পানিটি। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ইউক্রেনে ভূপাতিত হবার ছয়দিনের মাথায় তাইওয়ানে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আরেকটি বিমান। অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী ট্রান্স এশিয়া এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজটি মাগং বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে গিয়ে কয়েকটি ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৪৮ জন। এর একদিন পরই ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবার ১১৬ আরোহী নিয়ে আলজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা এয়ার আলজেরির একটি যাত্রীবাহী বিমান মালির উত্তরাঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়। জানা যায়, বিমানটি ১১০ জন যাত্রী এবং ৬ জন ক্রু নিয়ে রাজধানী আলজিয়ার্সের উদ্দেশে উয়াগাদুগু থেকে উড্ডয়নের প্রায় ৫০ মিনিট পরেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিমানের সকল যাত্রী ও ক্রু মারা গেছে। যাদের মধ্যে ৫১ জন ফ্রান্সের নাগরিক ছিলেন। ব্যাপক ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে এটি বিধ্বস্ত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি ছিল স্পেনের সুইফট এয়ার এয়ারলাইন থেকে ভাড়া করা একটি বিমান। এক সপ্তাহের বিমান দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যানে আকাশপথ যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যু ফাঁদে। লোকসানের ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিমান পরিবহনের কোম্পানিগুলো। ভাবিয়ে তুলেছে বিশ্ব সম্প্রদায়কে। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স তো এখন এক আতঙ্কের নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সে যারা আগাম টিকেট কিনেছে ইচ্ছা করলে সবাই টিকেট ফেরত দিয়ে বিনা জরিমানায় মূল্য ফেরত নিতে পারেন। কোম্পানিটি তার নাম বদলেও চিন্তাভাবনা করছে। এতো অল্প সময়ের ব্যবধানে যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনা ও মানুষের মৃত্যু হয়তো খুব কমই দেখেছে বিশ্ব। এখন প্রশ্ন হলো কেন এতো সব দুর্ঘটনা। নেই কেন তার প্রতিকার! কিছু সমস্যা আছে প্রাকৃতিক আবার কিছু সমস্যা আছে মনুষ্য সৃষ্ট। বিশ্ব যখন এসব প্রশ্নে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন বিবিসির এক প্রতিবেদনে দেয়া হয়েছে আশ্চর্য হওয়ার মতো তথ্য। এতে বলা হয়েছে, গত তিন বছরে ভারতে কমপক্ষে ৯৯ জন পাইলট বিমান নিয়ে ওড়ার আগে মদ্যপ অবস্থায় ধরা পড়েছে। জাতীয় সংসদে দেশটির সরকার এ তথ্য জানিয়েছে। আচমকা চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই পাইলটদের শরীরে অ্যালকোহলের পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি ছিল। যে কারণে তাদের আর বিমান নিয়ে উড়তে দেয়া হয়নি। এমন ঘটনা অন্যান্য দেশেও যে কম তা নয়। এসব তথ্যে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। এ অবস্থায় যাত্রীদের নিরাপত্তায় বিমান কোম্পানিগুলোকে সতর্ক হতে হবে। মালয়েশিয়ার বিমানটি রুশ-ইউক্রেন সীমান্তের কাছে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ক্ষেপণাস্ত্রে বিধ্বস্ত হয় বলে ইউক্রেনের দাবি। যাত্রীবাহী কোনো বিমানে এ ধরনের হামলার নজির খুবই কম। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ কি হতে পারে? তাই এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোর যুদ্ধপ্রবণ ও গোলযোগপূর্ণ এলাকার আকাশ সীমানা এড়িয়ে চলতে গতিপথ নির্ধারণ জরুরি। তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী জিই ২২২ ফ্ল্যাইটটি বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। চীন ও তাইওয়ানে আগের দিন টাইফুন মাটমো আঘাত হানে। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা পর বিমানটি যাত্রা করলেও আকাশে ওঠার পর পরিস্থিতি আরো বৈরী হয়ে ওঠে। এরপর কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকট শব্দে বিমানটি রানওয়ের ওপর ভেঙে পড়ে। বিমানটি বিধ্বস্তের প্রধান কারণ হিসেবে বৈরী আবহাওয়াকেই দায়ী করছেন কর্তৃপক্ষ। আলজেরীয় এএইচ ৫০১৭ বিমানটির খারাপ আবহাওয়ার কারণেই খুব সম্ভবত মালিতে বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফ্লাইট বাতিল করা হলে হয়তো এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। এরপরও বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি এড়িয়েই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ফ্লাইট পরিচালনা করা উচিত। বিমান দুর্ঘটনার বহু নজির রয়েছে, এর সঙ্গে আরো নতুন নতুন দুর্ঘটনা যোগ হচ্ছে, দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। তবে এটা কারো প্রত্যাশা হতে পারে না। মালয়েশিয়ার বিমান নিখোঁজের পর যাত্রীর মধ্যে আতঙ্ক আছে। পর পর এই দুর্ঘটনাগুলো আতঙ্ক আরো বাড়াচ্ছে। তাই এয়ারলাইন্সগুলোর দায়িত্ব হওয়া উচিত যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।