ত্রুটিপূর্ণ নকশায় লঞ্চ নির্মাণ বেড়েই চলেছে দুর্ঘটনা

ত্রুটিপূর্ণ নকশায় লঞ্চ নির্মাণ আর অদক্ষ চালকের কারণেই দেশে ৭০ ভাগ লঞ্চ ডুবছে। লঞ্চ মালিকরা বিআইডব্লিউটিএ থেকে লঞ্চ নির্মাণের জন্য ঠিকই নকশা পাস করিয়ে নেন কিন্তু ডকইয়ার্ডে গিয়ে নিজেদের মত করে লঞ্চ তৈরি করেন। দেড় তলা লঞ্চের অনুমোদন নিয়ে তৈরি করছে তিন থেকে সাড়ে তিনতলা। ত্রুটিপূর্ণ এসব লঞ্চ সামন্য দুর্যোগে একটু কাত হলেই ডুবে যায়। গত ১৪ বছরে ৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অপর দিকে দেশে ২৩ হাজার নৌযানের মধ্যে ২২ হাজার নৌযানেরই লাইসেন্স নেই। ফলে নৌপথে চলাচলকারী জনসাধারণ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রাজধানীর অদূরে বুড়িগঙ্গার তীরে কেরানীগঞ্জে গড়ে ওঠা ডকইয়ার্ডে পুরনো নৌযান হয়ে যাচ্ছে নতুন। এ সব ডকইয়ার্ডে নকশা অনুযায়ী নৌযান তৈরি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রতিনিধি দলকে হাতে রেখেই এসব কাজ করা হচ্ছে। তবে ডকইয়ার্ড মালিকরা বলছেন, লঞ্চ মালিকরা ডকইয়ার্ড ভাড়া নিয়ে লঞ্চ নির্মাণ করেন। এক্ষেত্রে ডকইয়ার্ড মালিকদের তেমন কিছু করার থাকে না। আশরাফুল হাসান আশু নামে একজন ডকইয়ার্ড মালিক বলেন, ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ নির্মাণ ঠেকাতে হলে নকশা অনুমোদন ও মনিটরিং সিস্টেম এর উপর জোর দিতে হবে। তাদের উদারতার কারণেই ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ তৈরি হচ্ছে। ডকইয়ার্ডে যেসব লঞ্চ তৈরি হচ্ছে তার অধিকাংশই নিয়ম অনুযায়ী লঞ্চের গভীরতা দিচ্ছে না। নিয়মানুযায়ী লঞ্চ নির্মাণ করা হলে সেটি ঝড় বা দুর্যোগের কবলে পড়ে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত কাত হলেও পানিতে ডুববে না। কিন্তু নকশা না মেনে যে সব লঞ্চ তৈরি হচ্ছে সেগুলো ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রি কাত হলেই পানি ঢুকে দুর্ঘটনার কবলে পড়বে। এছাড়া যে পরিমাণ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন প্রয়োজন তার থেকে শতাধিক কম ক্ষমতার ইঞ্জিন ব্যবহার, ধারণক্ষমতার চেয়ে যাত্রীদের জন্য কয়েকগুণ পরিমাণে (আপার) স্পেস রাখা হয়। ফলে এসব নৌযান চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিরাপদ নৌ জোটের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৬ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত যত লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছে তার ৭০ ভাগই ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ লঞ্চের মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। সংগঠনটি বলছে, ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ আটক এবং ভরা মৌসুমে বিশেষ মনিটরিং ও ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন নৌপথে চলাচলকারী নৌযানের সংখ্যা ৩৫ হাজার। এর মধ্যে রেজিস্ট্রেশন রয়েছে মাত্র ১৩ হাজারের। আর রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চলাচল করছে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার নৌযান। এ ১৩ হাজার লঞ্চের মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান ২ হাজার ২২৫টি। যাত্রীবাহী নৌযানের মধ্যে বছরে ফিটনেস পরীক্ষা বা সার্ভে করা হয় মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০টির। সার্ভে না করার কারণে ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল করছে। আর প্রতিবছরই ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা, মৃত্য হচ্ছে শত শত মানুষের। নৌযান সার্ভে না হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাত্র চারজন সার্ভেয়ার দিয়ে ঠিকমত সার্ভে করা সম্ভব হয় না। নৌ দুর্ঘটনা কমাতে লঞ্চের ফিটনেস ঠিকমত পরীক্ষা নিরীক্ষা করা যাচ্ছে না। এ জন্য প্রাইভেট সেক্টরে নৌযানের ফিটনেস দেখার দায়িত্ব দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ উদ্যোগ কার্যকর হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুপারিশের ভিত্তিতে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেবে। বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, ২০০০ সালে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা যান ৪৩৯ জন যাত্রী। ২০০১ সালে ৭৬টি দুর্ঘটনা ঘটে, মারা যান ৩৯২ জন। ২০০২ সালে ২৮টি দুর্ঘটনা ঘটে, মারা যান ছয় শতাধিক। ২০০৩ সালে ৬৪টি দুর্ঘটনা ঘটে, মারা যান ১ হাজার ২০৫ জন। ২০০৪ সালে ৫৬টি দুর্ঘটনা ঘটে, মারা যান ৪৮৭। ২০০৫ সালে ৪৯টি দুর্ঘটনা ঘটে, মারা যান ১৭৬। ২০০৬ সালে ৩৮টি দুর্ঘটনা ঘটে, মারা যান ৭৮। ২০০৭ সালে ৩৪টি দুর্ঘটনা ঘটে মারা যান শতাধিক যাত্রী। ২০০৮ সালে ৩১টি দুর্ঘটনা ঘটে, প্রাণ হারান তিন শতাধিক যাত্রী। ২০০৯ সালে ২৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় ৩০৮ জনের। ২০১০ সালে ৩৮টি দুর্ঘটনায় ৭০ জন মারা যান। ২০১১ সালে ৩৫টি লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে, পানিতে ডুবে মারা যান ১৫৬ জন। ২০১২ সালের মার্চে মেঘনায় এমভি শরীয়তপুর-১ ডুবে মারা যায় শতাধিক যাত্রী। ২০১৩ সালে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মারা যান প্রায় ৪৫০ জন। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত লঞ্চডুবে পৃথক ঘটনায় শতাধিক মানুষ মারা যান। এ ছাড়াও নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক শতাধিক যাত্রী।