ডুবে যাওয়া লঞ্চে আমার ৩ ভাগ্নিও ছিল
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, মাওয়া থেকে
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৩
ওরা তিন বোন। নুসরাত জাহান হীরা। ফাতেমা তুজ জোহরা স্বর্ণা। আর জান্নাতুল নাইম লাকি। এদের মধ্যে লাকি তাদের খালাতো বোন। মাওয়ায় লঞ্চডুবির ঘটনায় এই তিন বোন এখন শুধুই স্মৃতি। এই তিন বোন নৌ মন্ত্রী শাজাহান খানের ভাগ্নি। নৌ মন্ত্রীর খালাতো বোন পারভীনের মেয়ে লাকি। হীরা ও স্বর্ণার মাও নৌ মন্ত্রীর খালাতো বোন। প্রথম যে লাশ উদ্ধার হয়, সেটি হীরার লাশ। হীরা জেডএইচ সিকদার মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। স্বর্ণা এবারের শরীয়তপুরের শেখ ফজিলাতুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে ঢাকার সিটি কলেজের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়। লাকি ছিলেন চীনের জুয়ানজো ইউনিভার্সিটির চিকিত্সা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। গতকালও স্বর্ণা ও লাকির লাশ উদ্ধার হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী শরীয়তপুরের আলী জব্বার জানান, লঞ্চ ডুবে যাওয়ার আগ মুহূর্তে লঞ্চের স্টাফরা মহিলা যাত্রীদের ভিতরে আটকে রাখে। তাদের লঞ্চের ভিতর থেকে বের হতে দেয়নি। তার চোখের সামনে স্ত্রী জাহানারা বেগম ও দুই মেয়ে হালিমা (২০) ও তানজিমা (১০) কে বের হতে দেয়নি। তিনি লঞ্চের ভিতর থেকে বের হয়ে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকার সময় লঞ্চ ডুবে যেতে থাকে। এসময় তিনি লঞ্চের ভিতর প্রবেশের চেষ্টা করলে দুই জন স্টাফ বাধা দেয়। লঞ্চের ভিতর থেকে তার স্ত্রী বের হয়ে আসার চেষ্টা করলে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। লঞ্চ ডুবে গেলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনি ও তার ছেলে অপু বেঁচে যান।
একই তথ্য জানিয়েছেন, হীরা ও স্বর্ণার বাবা নূরুল হক। মাদারীপুরের শিবচরের দলিল লেখক নূরুল হক লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় লঞ্চের বাইরে ছিলেন। লঞ্চের ভিতরে হীরা, স্বর্ণা ও লাকি ছিলেন। ডুবে যাওয়ার সময় তারা লঞ্চের ভিতর থেকে বের হতে পারেননি।
মাওয়া ঘাটে স্থাপিত নিখোঁজদের সন্ধানে ক্যাম্পে এ পর্যন্ত ১২৯ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় ৮৩ জন নারী ও শিশু। ধারণা করা হচ্ছে, লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় নারী ও শিশুরা লঞ্চের ভিতরে ছিল। সেখান থেকে বের হতে পারেনি বলে নিখোঁজের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে।
ফরিদপুরের ভাঙ্গার কাউলিপাড়া গ্রামের রেজাউল ইসলাম ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ঈদের পর গত শনিবার একই গ্রামের রূপার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ে শেষে গত সোমবার রেজাউল ঢাকার কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু পিনাক-৬ লঞ্চের যাত্রী হওয়ার কারণে তার নাম এখন নিখোঁজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গতকাল মাওয়া লঞ্চঘাটে রেজাউলের শ্বশুর শেখ শাহ আলী চিত্কার করে কান্নাকাটি করছিলেন। বিয়ের দুই দিনের মাথায় তার মেয়ে বিধবা হলো-এই শোক তিনি সইতে পারছেন না। চিত্কার করে বলছিলেন, ‘আল্লাহ তুমি একি গজব দিলে।’
ফরিদপুরের আটরশীর আয়শা আক্তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী শহীদুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টেসের প্রোডাকশন ম্যানেজার। বাবার বাড়িতে ঈদ উদযাপন শেষে আয়শা তার ৮ বছরের শিশু সারা মনি ও স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় আয়শা আক্তার ও সারা মনি লঞ্চের ভিতরে ছিলেন। শহীদুল লঞ্চের ডেকে ঘোরাঘুরি করছিলেন। ডুবে যাওয়ার সময় তিনি লঞ্চের ভিতর থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের বের করার চেষ্টা করলে ব্যর্থ হন। লঞ্চের কয়েকজন স্টাফ ভিতর থেকে নারী ও শিশুদের বের হতে দিচ্ছিলেন না। গতকাল মাওয়া লঞ্চঘাটে শহীদুল হক চিত্কার করে এসব তথ্য দিচ্ছিলেন। তিনি জড়িত লঞ্চের স্টাফদের বিচার চান।
নিখোঁজদের অনুসন্ধানের তথ্যকেন্দ্র অনুযায়ী নিখোঁজ যাত্রীদের মধ্যে ফরিদপুরের ২৫ জন, মাদারীপুরের ৪৯ জন, শরীয়তপুরের ২ জন , গোপালগঞ্জের ১৯, বরিশালের ৭, গাজীপুরের ২, নারায়ণগঞ্জের ৭, কুমিল্লার ৫, ঢাকার ১, ঝালকাঠির ৪, নরসিংদীর ১, নড়াইলের ১, বাগেরহাটের ২, চাঁদপুর ১, লক্ষ্মীপুরের ৩ জনসহ মোট ১২৯ জন রয়েছে । এদের মধ্যে পুরুষ ৪৬, মহিলা ৪৮ ও ৩৫ জন শিশু রয়েছে।