দল নয় ব্যক্তিরই বিচার করা উচিত

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী বা কোন দল, সংগঠনের বিচার চায় না যুক্তরাষ্ট্র। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরই বিচার করা উচিত, কোন দলের নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সফররত যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র্যাপ পঞ্চমবারের মতো ঢাকা সফরে এসে গতকাল মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ মতামত দেন। স্টিফেন জে র্যাপ গতকাল বিকেলে আমেরিকান সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। এ সময়ে মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সিলর পুস্পিন্দর ধিলন ও আমেরিকান সেন্টারের পরিচালক ভিরাজ এম লেবেইলি উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন বিশেষ দূত বলেন, প্রকৃত অপরাধী ও দায়ীদের বাইরে দলকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করলে তা সামাজিক শান্তি ও মীমাংসার জন্য সহায়ক হবে না। তাই গুরুত্ব দেওয়া উচিত অপরাধী ব্যক্তিকেই। অপরাধের জন্য ব্যক্তি বিশেষ দায়ী থাকে। তারাই সিদ্ধান্ত নেয়, দল নয়। আসামি পক্ষের কৌঁসুলিরা বাংলাদেশের বাইরে তৃতীয় দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার করার দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে স্টিফেন দূত বলেন, আমার সঙ্গে আলোচনায় তারা বিষয়টি তুলেছেন। আমি মনে করি জাতীয়ভাবে এ বিচার হচ্ছে। এ পর্যায়ে তৃতীয় দেশে বিচার করা অবাস্তব হবে। আমার এই মতামতে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা হতাশ হয়েছে। মার্কিন দূত আরো বলেন, ২০১০ ও ২০১১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর প্রথম দিকে আমি অনেকগুলো সুপারিশ দিয়েছিলাম। যাতে বিচারের মানদণ্ড উন্নত হয় আন্তর্জাতিকভাবে মান বাড়ে। আমার বেশ কিছু সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে। এখনও বিচারের মান আরো উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে মতামত দেন মার্কিন বিশেষ দূত। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। যথেষ্ট পরিমাণ সাক্ষ্য প্রমাণ ও তথ্য থাকলে বিশেষ পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যেতে পারে। পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে কোন কোন রাজ্যে ও কেন্দ্রীয়ভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ইউরোপে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ হয়েছে। আধুনিক ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় যে কোন ব্যক্তিকে সাজা দেওয়া যায়। কিন্তু তা মৃত্যুদণ্ড হবে কিনা নির্ভর করবে অপরাধের মাত্রা, তথ্য প্রমাণের উপর। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে আমি মনে করি সবচেয়ে ভাল মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকা। জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে বিচারিক আদালতের পর সুপ্রিম কোর্টে আপিলের বিধান রয়েছে। বিচারিক আদালতের রায়ের পর সংসদে আইন প্রণয়ন করে বিশেষ পরিস্থিতিতে আপিল করা হয়। যদি দ্বিতীয় পর্যায়ের কোন আদালতে পর্যালোচনার বিধান থাকত তাহলে ভাল হত। আইন করার পর মৃত্যুদণ্ড দিলে তা ত্রুটিমুক্ত হতে পারত। তবে পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ। তিনি আরো বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিয়ে যাবে। পুরো বিচার প্রক্রিয়া শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত্ ইসরাইলী গণহত্যার সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন র্যাপ গতকাল সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সাথে সাক্ষাত্ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী তাকে বলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে, যা উপর্যুপরি দু’টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্পষ্টতঃই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সমর্থন জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানান এবং তার পাশাপাশি এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরো জোরালো সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। রাষ্ট্রদূত র্যাপ বলেন তিনি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা করতে আসেননি বরং এই আদালত যেন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি মডেল হতে পারে তা’তে সহায়তা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে জানান যে, এই যাদুঘর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে সহায়তা করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক আদালতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে জানান যে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি দেশীয় আদালত হলেও তা আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে সর্বদাই সচেষ্ট রয়েছে। মাহমুদ আলী রোম স্ট্যাটিউট এর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চান এবং গাজায় নিরীহ শিশু ও সাধারণ নাগরিকদের উপর ঢালাওভাবে ইসরাইলী গণহত্যার সমালোচনা করেন। এক্ষেত্রে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইয়ের গাজায় সংঘটিত গণহত্যাসমূহের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যথাযথ তদন্ত, প্রসিকিউশন ও শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানোর বিষয়টি তুলে ধরেন। এ প্রসংগে স্টিফেন র্যাপ জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরকার যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি জতিসংঘ স্কুলে আক্রমণ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান যে, এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই সকলেরই আন্তর্জাতিক মানবিক বিষয়াবলী সংক্রান্ত আইনসমূহ কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত এবং বলেন যে যুক্তরাষ্ট্র গাজায় সংঘটিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রত্যাশা ও সমর্থন করে। তিনি বলেন এই লক্ষ্যে ইসরাইল সরকার কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।