কুমিল্লার দুই হাসপাতালের নির্মাণ কাজ আট বছরেও শেষ হয়নি
মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৬
মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ২০ শয্যার ৬টি হাসপাতাল দুর্ভোগে ১০ লক্ষাধিক মানুষ
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ ও সদর দক্ষিণ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণ কাজ দীর্ঘ ৮ বছরেও শেষ হয়নি। এছাড়া জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের ২০ শয্যার ৬টি হাসপাতালের কার্যক্রমও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কমপক্ষে ১০ লক্ষাধিক জনগণের স্বাস্থ্যসেবা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
সদর দক্ষিণ
সদর দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৯টি ভবনের নির্মাণ কাজ ২০০৬ সালে শুরু হয়ে ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হলেও বাকি কাজ কবেনাগাদ শেষ হবে তা বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। গত বিএনপি সরকারের আমলে তত্কালীন কুমিল্লা-৯ নির্বাচনী এলাকার এমপি মনিরুল হক চৌধুরী উপজেলার উত্তর গোপালনগর এলাকায় প্রায় ৫ একর জায়গায় ৩১ শয্যা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল এবং একই উপজেলার বাগমারা এলাকায় ২ একর ১৬ শতক জায়গায় ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি) মোট ১৩ কোটি ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৩ টাকা ব্যয়ে পৃথক ঠিকাদার নিয়োগ করে উভয় হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু করে। এ উপজেলা হাসপাতালের নির্মাণ কাজ নির্ধারিত ১ বছর ৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। পরে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সীমিত পরিসরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ (বহির্বিভাগ) চালু করা হয়। নির্মাণ কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় এ উপজেলার প্রায় সাড়ে ৪ লাখ জনগণ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলুর রহমান জানান, চিকিত্সক-কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা নেই। নেই অ্যাম্বুলেন্স ও এক্স-রে মেশিন। স্বাস্থ্যকর্মীর ৩০টির মধ্যে ২২টি পদ শূন্য। সীমানা প্রাচীর না থাকায় হাসপাতালটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থাকলেও তা রোগীদের কোনো কাজে আসছে না। নির্মাণ কাজ দীর্ঘ ৮ বছরেও সম্পন্ন না হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে ওই হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
মনোহরগঞ্জ
৩ লক্ষাধিক জনসংখ্যার মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোনো অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। কিন্তু কাগজে-কলমে এখানে হাসপাতাল আছে এবং পোস্টিং রয়েছে চিকিত্সক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ পর্যাপ্ত জনবল। ২০০৬ সালে এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে প্রায় ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করার পর ২০০৯ সালের প্রথমার্ধে কাজ বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। দেড় বছরের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা থাকলেও দীর্ঘ ৮ বছর ধরে অবহেলায় পড়ে আছে অর্ধনির্মিত স্থাপনা। এদিকে ভবন নির্মাণ না হওয়ায় এ উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি কক্ষে। গত ১৬ জুলাই থেকে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় ডাকবাংলোতে জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মুজিবুর রহমান বহির্বিভাগের চিকিত্সা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল মজিদ বলেন, বসার স্থানই যেখানে নেই, সেখানে চিকিত্সা সরঞ্জামাদির বিষয়ে কথা বলে লাভ কী। এ উপজেলায় চিকিত্সকের ২১টি পদের মধ্যে মাত্র ২টি শূন্য। ২টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ১৬টি কমিউনিটি ক্লিনিকই এ উপজেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা। উপজেলা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র মিলে ১৬ জন চিকিত্সক কর্মরত আছেন। পর্যাপ্ত চিকিত্সক পোস্টিং থাকলেও কার্যক্রম পরিচালনার মতো ভবন/অবকাঠামো না থাকায় স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
জেলার ২০ শয্যার ৬টি হাসপাতাল
চট্টগ্রাম বিভাগে ইউনিয়ন পর্যায়ে ২০ শয্যা বিশিষ্ট ৯টি হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। এরমধ্যে কুমিল্লায় স্থাপন করা হয় ৬টি হাসপাতাল। এগুলো হচ্ছে- নাঙ্গলকোটের গুহারুয়া, বরুড়ার সোনাইমুড়ি, চান্দিনার মহিচাইল, সদর দক্ষিণের বাগমারা, দাউদকান্দির ট্রমা সেন্টার ও একই উপজেলার দোনারচর ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। এসব হাসপাতালের প্রতিটিতে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকসহ ৬ জন চিকিত্সক ও ৫ জন নার্সসহ ২১টি পদ সৃজন করা হয়।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মুজিবুর রহমান বলেন, মনোহরগঞ্জ ও সদর দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা চলে গেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অর্ধনির্মিত অবস্থায় পড়ে থাকা এসব স্থাপনার বেশিরভাগের দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়ে গেছে। এদিকে ‘শীঘ্রই দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে’ স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে প্রতি মাসে জেলার উন্নয়ন কমিটির সভায় এমন আশ্বাস দেয়া হলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। যত কম সময়ে পুনঃদরপত্র আহবান করে এসব হাসপাতালের নির্মাণ কাজসহ বিদ্যুত্, পানি ও জনবলের সংকট নিরসন করা যাবে স্বাস্থ্যসেবায় সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের ভোগান্তি ততো তাড়াতাড়ি কাটিয়ে উঠা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।