ব্রিকস ব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন আশার আলো

ব্রিকস নামে একটি নতুন উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সম্প্রতি। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত— এই পাঁচ নতুন অর্থ শক্তি মিলে গঠন করেছে এ ব্যাংক। সবাই ইতিমধ্যে ব্রিকস ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করেছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো বিনির্মাণে এই ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্রিকস ব্যাংক ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-এর মতো। এর প্রধান কার্যালয় হবে চীনের সাংহাইয়ে এবং ভারত হবে এর প্রথম সভাপতি আর রাশিয়া হবে প্রতিনিধিদের চেয়ারম্যান। গত ১৫ থেকে ১৭ জুলাই ব্রাজিলের ফোর্তালেজা শহরে শেষ হওয়া তিনদিনের সম্মেলন থেকে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর নেতারা ১০ হাজার কোটি ডলারের এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ব্রিকসভুক্ত পাঁচ দেশের নেতারা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ওখানে জানানো হয়, ব্যাংকের পাশাপাশি জরুরি সংকট মোকাবিলায় আইএমএফ-এর বিকল্প হিসেবে ১০ হাজার কোটি ডলারের একটি মুদ্রা তহবিলও থাকছে। এ তহবিলে চীন একাই ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার দেবে। রাশিয়া, ব্রাজিল ও ভারত প্রত্যেকে দেবে এক হাজার ৮০০ কোটি ডলার করে। আর দক্ষিণ আফ্রিকা দেবে ৫০০ কোটি ডলার। ব্রিকস ব্যাংকের মূল লক্ষ্য থাকবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো খাতে অর্থায়ন করা। এ ক্ষেত্রে লাভবান হতে পারে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। আপাতত এ পাঁচ দেশের মধ্যে সদস্যপদ সীমিত থাকলেও পরে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো ও ইন্দোনেশিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশকেও সদস্যপদ দেয়ার জন্য আলোচনা চলছে। এ ব্যাংকের ঋণ প্রদান কার্যক্রম ২০১৬ সালে শুরু হবে এবং ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক শর্ত ছাড়াই ঋণ দেবে। এর পাশাপাশি এমন অনেক খাতে ব্রিকস ব্যাংক অর্থায়ন করবে যা সাধারণত বিশ্বব্যাংক করে না। যেমন: জৈব জ্বালানি, বড় বড় বাঁধ তৈরি এবং পরমাণু বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনে ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক অর্থায়ন করবে। দরিদ্রমুক্ত বিশ্ব এবং ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ। সময়ের ব্যবধানে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত এ প্রতিষ্ঠানগুলো তৃতীয় বিশ্বের কাছে হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খবরদারির হাতিয়ার। এমন বাস্তবতায় অর্থনৈতিক এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে উদীয়মান বিশ্বের জোট ব্রিকস। সেই প্রচেষ্টারই বাস্তব প্রতিফলন হয়ে উঠেছে ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক। বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে যে এককেন্দ্রিক শাসন চলছে এর অবসান ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে উন্নয়নশীল বিশ্বের এ ব্যাংক। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ নেতারাসহ উন্নয়নশীল দেশের অনেক রাষ্ট্রনায়ক মনে করছেন, এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর আর্থিক নির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ব্রিকস ব্যাংকের উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন যে কোনো প্রভাব বিস্তার করার উদ্দেশ্যে ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। এবং আমরা চাই ন্যায়বিচার ও সম-অধিকার। আইএমএফকে তাই দ্রুত ভোটাধিকার কোটা পরিবর্তন করতে হবে। উদীয়মান দেশগুলোর গুরুত্ব মূল্যায়ন করতে হবে। বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বিশেষ করে ব্রিকস দেশগুলোর উত্থান বিশ্বব্যাপী তুমুল আগ্রহের সঞ্চার করেছে। এসব দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দ্বিগুণ। গত একদশকে বিশ্ব প্রবৃদ্ধিতে ব্রিকস দেশগুলোর অবদান ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রবৃদ্ধির ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং উন্নত দেশগুলো পারস্পরিকভাবে সহাবস্থান করতে পারে কীভাবে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে এর উত্তর একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিন্যাস পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এ কাঙ্ক্ষিত হিস্যা না পেয়েই মূলত ব্রিকস দেশগুলো বিকল্প ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসার পরই চীনা মিডিয়ায় বলা হয়, বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা বিশ্ব ও বহুজাতিক এজেন্সিগুলো যে ভুল জিইয়ে রেখেছে, এর মোকাবিলায় সাংহাইভিত্তিক নতুন এ ব্যাংক ভূমিকা রাখবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব কমবে। প্রকৃতপক্ষে ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর যে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে তাতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অভ্যন্তরীণ সংস্কারে আরো উদ্যোগী হবে। এখন প্রশ্ন হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন বলয় তৈরিতে ব্রিকস দেশগুলোর সক্ষমতা কতোটা রয়েছে? পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যা, আয়তন এবং অর্থনৈতিক আকারের দিক থেকে বর্তমান বিশ্বের একটি বড় শক্তি ব্রিকস। বিশ্বের ৪০ শতাংশ জনসংখ্যা এবং ২৫ শতাংশ এলাকা এ দেশগুলোর দখলে এবং বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ এ দেশগুলোর। এমনকি বর্তমানে ব্রিকস সম্মিলিতভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৪৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের মতে, এ শতকেই অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতির নীতি নির্ধারণে আরো বড় ভূমিকা চাইছে— সেটা স্পষ্ট। তারা পশ্চিমা দেশগুলোকে চ্যালেঞ্জ দিতে চেয়েছে। বিশ্বের যত পণ্যসেবা উত্পাদন হয় তার ২১ শতাংশ আসে এই পাঁচটি দেশ থেকে। কিন্তু বহুপক্ষীয় ঋণের উত্স বিশ্ব্যব্যাংক আইএমএফ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের খবরদারি ধনবান দেশগুলোর হাতে, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) যাত্রা শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলো বেশিরভাগ মূলধন জোগায়। এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তারা ব্যাংকটির কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ছড়ি ঘোরায় জাপান। এ ধরনের সমস্যা এড়াতে চেয়েছে ব্রিকসভুক্ত দেশ ভারত এবং তাতে সফল হয়েছে। ভবিষ্যতে অন্য যে কোনো দেশের সদস্য হিসাবে যোগদানে বাধা নেই ব্রিকস ব্যাংকে। এই পাঁচটি দেশের মূলধন হিস্যা ৫৫ শতাংশের নিচে নামতে পারবে না। ব্রিকস ব্যাংকের আত্মপ্রকাশ বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রত্যাশার বার্তা বয়ে এনেছে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-এর ক্রমাগত খবরদারির চাপে পিষ্ট হতে হতে তাদের কবল থেকে মুক্তি পেতে ব্রিকস ব্যাংক সহায় হয়ে পাশে দাঁড়াবে তেমন প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। যে কারণে ব্রিকস ব্যাংকের অংশীদার হতে চায় বাংলাদেশ। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের এবং আইএমএফ-এর ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছেন। এর জন্য প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিতে ব্রিকস সদস্য পাঁচ দেশের রাষ্ট্রদূতকে চিঠি দিচ্ছে সরকার। চিঠিতে ব্যাংকটির গঠন প্রণালী, কার্যপরিধি ও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর কি ধরনের প্রতিনিধিত্ব থাকবে তা জানতে চাওয়া হচ্ছে। সব তথ্য পাওয়া গেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে বাংলাদেশ ব্রিকস ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হবে বা হতে পারবে কিনা। ওদিকে বাংলাদেশ চীনের নেতৃত্বে গঠিত এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অংশীদারও হতে চাইছে। তবে এআইআইবি’র চেয়ে ব্রিকস ব্যাংকের অংশীদার হতে বেশি আগ্রহী বাংলাদেশ। কারণ এআইআইবিতে চীনের একক আধিপত্য থাকবে। কিন্তু ব্রিকস ব্যাংকে পাঁচ সদস্য দেশের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে বলে বাংলাদেশ সেখান থেকে বেশি সুবিধা পেতে পারে। বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক কিছু আচরণে বাংলাদেশের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। এখন যেভাবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্তসহ চুক্তি করার পরেও বিভিন্ন অজুহাতে টাকা তুলে নিচ্ছে বিকল্প সৃষ্টি হলে সেই প্রবণতা কমে যাবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সুযোগ বয়ে আনবে আশা করা যায়। বাংলাদেশের পূর্বদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। গত কয়েক মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন ও জাপান সফর করেছেন এবং সেখান থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তার আশা করা হচ্ছে। ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারও পূর্বমুখী। তারাও চাইছে চীন ও ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, জাপান প্রভৃতি দেশের সঙ্গে অথনৈতিক বন্ধন বাড়াতে। তারা বাংলাদেশের সঙ্গেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে চায়। বাংলাদেশের পূর্বমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রতি তাদের সায় রয়েছে। আবার এশিয়া ফর এশিয়ানস— এখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাইরের দেশগুলো দাপট দেখাবে কেন, খবরদারি করবে কেন— এ প্রশ্ন চীন ও ভারত উভয়েরই। আর এখানেই ঢাকা-দিল্লি-বেইজিংয়ের পরস্পরের আরো কাছে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিকস ব্যাংক এক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা নিতে পারে। যে পাঁচটি দেশ ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক গড়ে তুলছে তাদের মধ্যে প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হচ্ছে চীন। পাঁচ দেশের মোট জিডিপির ৭০ শতাংশ রয়েছে ১৩০ কোটি মানুষের এ দেশে। চীন যদি তার স্বার্থকে বড় করে দেখে তাহলে ব্রিকস ব্যাংকের কার্যক্রমে তার প্রভাব পড়তেই পারে। দেশগুলোর রাজনৈতিক ব্যবস্থাও ভিন্নতর— ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী। কিন্তু রাশিয়া ও চীন অর্থনীতিতে পুঁজিবাদকে মেনে নিলেও গণতন্ত্রের প্রশ্নে একেবারেই কাটখোট্টা, অনুদার। বিশ্বব্যাংক স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে খুব কম সুদে বলা যায় একেবারে নামমাত্র সুদে ঋণ দেয় এবং সেই ঋণ পরিশোধের সময়সীমা থাকে বেশ দীর্ঘ। ব্রিকস ব্যাংকের সুদের হার কি এ ৭০ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পারবে? এটা ঠিক যে তারা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো অর্থনীতি বহির্ভূত শর্ত চাপিয়ে দেবে না। চীনের হাতে এখন অঢেল অর্থ এবং তারা সেটা ব্রিকস ব্যাংকের মাধ্যমে খাটাতে উঠে-পড়ে লেগেছে। আবার ব্রিকস ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভারত হয়তো এ অর্থ ঋণ হিসেবে প্রদানের সময় নিজের প্রভাব খাটাতে চাইবে। এরকম পরিস্থিতিতে তারা প্রত্যেকে নিজের জন্য সুবিধা আদায় করতে গিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে ব্রিকস ব্যাংকের বারোটা বাজায় কিনা, সেটাও দেখার বিষয় বৈ-কি?