একটি বাড়ি ভাড়ার ইতিবৃত্ত
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৮
সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে পরিবারসহ এক ভাড়া বাড়িতে উঠি। বাসা ভাড়া মাসে টাকা ৪,০০০/-। বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির বিল আলাদা। কথা ছিল ২ বছর পর পর বাসা ভাড়া বাড়াবেন বাড়িওয়ালা। কিন্তু ১ বছর শেষ হতেই টাকা ২০০/- বাড়িয়ে নিলেন। এভাবে বাড়তে বাড়তে ২০০৫ সালে বাসা ভাড়া হয়ে গেল টাকা ৫,০০০/-। ২০০৬ সালে বাসা ভাড়া বাড়ালেন টাকা ৩০০/-। এভাবে বাড়তে বাড়তে ২০০৯ সালে বাসা ভাড়া হলো টাকা ৬,২০০/-। ২০১০ সালে বাসা ভাড়া বাড়ালেন টাকা ১০০০/-। ২০১১-২০১২ সালে বাড়ালেন টাকা ১৫০০/- করে। ২০১৩ সালে বাড়ালেন ২০০০/-। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে (৬ মাসে) বাড়ালেন ২,৫০০/-। বর্তমানে একই বাসার ভাড়া মাসে ১৪,৭০০/-। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুত্ বিলও বেড়েই চলেছে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি হতো ২০০-৩০০ টাকা করে। ২০১০ সাল থেকে বাড়ছে হাজার হাজার টাকায়। এখন ৬ মাসেও ভাড়া বাড়াচ্ছে। গত ৫ বছরে বাসা ভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৩৮%। বাড়িওয়ালার এক কথা পোষাইলে থাকেন না হয় চলে যান। কথা বাড়াইলে গালাগালি শুনতে হয়। পাড়ার বখাটেদের দিয়ে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়ার হুমকিতো আছেই। নাতি-নাতনিরা আসে, পাশের স্কুল-কলেজে পড়ে, অনেকদিন এক মহল্লায় থাকি। তাই কথায় কথায় বাসা বদলানো সহজ নয়। এছাড়াও সব বাড়িওয়ালাইতো প্রায় একই রকম। কার কাছে যাবো?
বাড়িওয়ালারা মহল্লায় মহল্লায় বাড়িওয়ালা সমিতি করেছেন। জুন মাস আর ডিসেম্বর মাসে তারা মিটিং করে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেন। কোন বাড়িওয়ালা কোন কারণে মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকলে অন্যরা বাসায় গিয়ে তা জানিয়ে আসে। এক মহল্লার সমিতি অন্যমহল্লার সমিতিকে চাপ দেয় বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির জন্য। যাতে ভাড়াটিয়ারা মহল্লা ছেড়ে যেতে না পারেন। বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি যেন না হয় তা নিয়ে কত লেখালেখি হচ্ছে তার কোন পাত্তাই বাড়িওয়ালারা দিচ্ছেন না। তাঁদের কথা আমার বাড়ির ভাড়া আমি ঠিক করব সরকারের কথা শুনতে যাব কেন? ১৫ বছরেও বাড়ি রং করলেন না, দরজা জানালা মেরামত করছেন না। কিন্তু বছর বছর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাবদ আয়করের রিটার্নে মিথ্যা খরচ দেখিয়ে কর ফাঁকি দিচ্ছেন।
২০০০ সালে কাজের বুয়ার বেড়া আর টিনের চালার ১ রুমের ভাড়া ছিল টাকা ৩০০-৪০০। বর্তমানে টাকা ৩,০০০/- থেকে ৩,৫০০/- কমে বুয়া বা গার্মেন্টস কর্মীরা ১ রুমের বাসা ভাড়া পাচ্ছে না। এ বৃদ্ধি থামছেই না। হিসাব বিজ্ঞানের পারিবারিক বাজেট অধ্যায়ে বলা আছে শহরে আসবাবপত্র, গ্যাস, বিদ্যুত্, পানিসহ বাসা ভাড়া খরচ ধরা হবে ৩০%। অথচ আমাদের মত যাদের মাসিক আয় টাকা ২৪,০০০/- থেকে ২৫,০০০/- তাদের শুধু বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৬০%। চাল, ডাল, সবজি, মাছ, স্কুলের টিউশন ফি, ওষুধ, যাতায়াত সবকিছুরই দাম বেশি। আমরা আর পারছি না। সরকারের আদেশ কেউ মানছে না। মনে হয় যেন এটা মগের মুল্লুক। চলছে হরিলুট। ‘হাসিনা পারে। হাসিনাই পারবে’ শ্লোগানটি দেখে মনে অনেক আশা নিয়ে লেখাটি লিখলাম যদি কিছু হয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট বিনীত আবেদন, বাড়ি ভাড়ার বর্তমান আইনটি জনস্বার্থে সময় উপযোগী ও কার্যকর করার ব্যবস্থা নিন। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সকল বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা শহরের এলাকা ভিত্তিক পুরাতন বাড়ি ও নতুন বাড়ির জন্য আলাদা-আলাদা ভাড়া নির্ধারণ করে দিন। বিটিভি-র রাতের ৮টার সংবাদের আগে বাড়ি ভাড়া আইনটি প্রচারের ব্যবস্থা নিন। যারা বাড়ি ভাড়া দেন তাঁরা যেন বাড়ি ভাড়া আইনের শর্তসমূহ ও ভাড়া কত টাকা তা লেমিনেটিং করে বাড়ির গেইটের দেয়ালে লাগিয়ে দেন, তার একটি আইনি ব্যবস্থা করুন। সারাদেশে বাসা, দোকান ও অফিস মিলে প্রায় ৬ কোটি ভাড়াটিয়া আছে। আর বাড়িওয়ালা ৫০ লক্ষও হবে না। তাই ভোটার হিসাবেও ভাড়াটিয়ার সংখ্যা বেশি। আপনি গার্মেন্টস কর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের (যারা সরকারি বাসা পায়নি) যে বেতন বৃদ্ধি করেছেন তা ইতিমধ্যে বাড়িওয়ালারা হজম করে ফেলেছেন। তাই এ বৃহত্ ভাড়াটিয়া জনসংখ্যাকে বাঁচানোর জন্য সরকার প্রধান হিসেবে আপনার কাছে আমাদের নিবেদন রইলো।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, ঢাকা