বরিশাল-ভোলা রুটে ঝুঁকি নিয়ে চলে স্পিডবোট

উত্তাল কালাবদর নদী পাড়ি দিয়ে একের পর এক যাত্রী বোঝাই স্পিডবোট বরিশাল-ভোলা রুটের যাত্রী পরিবহন করছে। বরিশাল প্রান্তে লাহারহাট ও ভোলা প্রান্তে ভেদুরিয়া থেকে অসংখ্য স্পিডবোট যাত্রী পরিবহন করছে। ভোলাগামী যাত্রীরা বরিশাল থেকে সড়কপথে লাহারহাট গিয়ে ফেরি কিংবা লঞ্চে না উঠে দ্রুত কালাবদর নদী পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য স্পিডবোটের যাত্রী হন। যাত্রী প্রতি ভাড়া দেড়শ টাকা। ৪/৫ জন ধারণক্ষমতার একটি স্পিডবোটে যাত্রী বহন করা হয় ৮/১০ জন। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে উত্তাল কালাবদর পাড়ি দেয়া লক্কর-ঝক্কর মার্কা এসব স্পিডবোট চালানোর জন্য দক্ষ চালকও নেই। লাহারহাট-ভেদুরিয়া ছাড়াও বরিশাল নগরীর চরকাউয়া ফেরিঘাট থেকে ভোলা খেয়াঘাট পর্যন্ত যাতায়াত করে এই স্পিডবোট। এগুলোতে ভাড়া বেশি হওয়ায় যাত্রী কম থাকে। স্পিডবোটের সংখ্যাও কম, তবে ঝুকিমুক্ত নয়। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে এ রুটে চলাচলকারী লোকজন জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে নদী পাড় হন। এসব স্পিডবোটে যাত্রী পরিবহন করাতো দূরের কথা, চলাচলের অনুমতি নেই। স্পিডবোটের বৈধ কাগজপত্র পর্যন্ত নেই। সরকারি দপ্তরের বিকল ও বাতিল পুরনো স্পিডবোট নিলামে ক্রয় করে জোড়াতালি দিয়ে চলছে এ ব্যবসা। থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে বরিশাল-ভোলা নৌ-রুটে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করে স্পিডবোটগুলো। মাঝে-মধ্যে দুঘর্টনা ঘটলে তা আপস নিষ্পত্তি হয়ে যায়। স্পিডবোট দুঘর্টনায় একাধিক ব্যক্তি মারা গেলেও দোষী কাউকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। বরিশাল-ভোলা রুটে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন ছাড়াও চুক্তিভিত্তিক এ সব স্পিডবোট দিনে-রাতে হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, বাউফলসহ বিভিন্নস্থানে যাত্রী পরিবহন করে থাকে। দ্রুত যাতায়াতের জন্য অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে ভরা বর্ষায় মানুষ এসব স্পিডবোটে যাতায়াত করছে। অবৈধ এসব স্পিডবোট চলাচল বন্ধের জন্য লঞ্চ মালিক পক্ষের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের ৭ এপ্রিল সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জোবায়ের আহমদ বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দেন। লঞ্চ মালিকদের পক্ষে কাজী ওয়াহেদুজ্জামান গত বছর ১০ জুন হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। রিটের শুনানিশেষে হাইকোর্টের বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও এবিএম আলতাফ হোসেনের সমম্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ ৭২ ঘন্টার মধ্যে বরিশাল ডিসি ঘাট ও লাহারহাট বিআইডব্লিউটিএ’র টার্মিনাল এলাকা থেকে নিবন্ধনহীন স্পিডবোট চলাচল বন্ধের জন্য রুল জারি করে। আদালতের এসব আদেশের খবরই জানেন না স্পিডবোট চালকরা। তারা আরো বেপরোয়া গতিতেই গভীর রাতে ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে কালাবদর নদী। বরিশাল বন্দর কমর্মকর্তা শহীদউল্লাহ জানান, হাইকোর্টের রিটের প্রেক্ষিতে নিবন্ধনহীন স্পিডবোট চলাচল বন্ধের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে চিঠি দেয়া হয়েছে। শুধু স্পিডবোট নয়-কালাবদর নদীর উত্তাল ঢেউ ভেঙ্গে লাহারহাট থেকে ভেদুরিয়া পর্যন্ত বরিশাল-ভোলা রুটের যাত্রী পরিবহন করে ইঞ্জিনচালিত বেশকিছু নৌকা। যাত্রী পরিহনের জন্য নৌকায় স্যালো ইঞ্জিন যুক্ত করে নদ-নদীতে চলাচলকারী এসব নৌযানকে স্থানীয় ভাবে ‘ট্রলার’ বা ‘টেম্পু’ বলা হয়। যাদের স্পিডবোটে উঠার সাধ্য নেই তারা কম টাকায় এ ট্রলারযোগে বড় নদী পাড় হয়ে থাকেন। বর্ষা মৌসুমে মেঘনার ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসাবে চিহ্নিত যেসব এলাকায় সি-ট্রাক বা বে-ক্রস জাহাজ ছাড়া চলাচল নিষিদ্ধ সেই মেঘনা নদীতেও এসব ট্রলার কিংবা ‘এমএল টাইপের’ ছোট ছোট লঞ্চ যাত্রী পরিবহন করে থাকে। ভোলার মির্জাকালু থেকে লক্ষ্মীপুরের আলেকজান্ডার পর্যন্ত বিশাল মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে যাত্রী পরিবহন করছে ছোট্ট ৩ টি লঞ্চ। এ সব লঞ্চের এ রুটে যাত্রী পরিবহনের কোন অনুমতি নেই। রুট পারমিট ছাড়াই চরফ্যাশনের বেতুয়া থেকে মনপুরার সাকুচিয়া ও জনতা বাজারে যাত্রী পরিবহন করে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরার সাথে চলাচলকারী সি-ট্রাক সিংহভাগ সময়ই থাকে বিকল। মানুষ যাতায়াত করে ট্রলারে। যদিও মাওয়ায় নৌ-দুঘর্টনার পর গত বুধবার সচল হয়েছে সি-ট্রাকটি। এর আগে যেদিন ৩ নম্বর সর্তক সংকেত ছিল সেদিনও এ ঝুকিপূর্ণ রুটে চলছে ট্রলার। একই অবস্থা দৌলতখান-আলেকজান্ডার ও ইলিশা-মজু চৌধুরীর হাট রুটের। এসব রুটে সি-ট্রাক বিকল থাকার অজুহাত তুলে পরিচালনা করা হয় অবৈধ ছোট ট্রলার বা এমএল টাইপের লঞ্চ। মানুষ বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুকি নিয়ে এসব নৌ-যানে উঠে যাতায়াত করে থাকেন।