লঞ্চটি কি হারিয়ে যাবে চিরতরে
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫২
¬পদ্মায় নিমজ্জিত লঞ্চ পিনাক-৬ গতকাল শুক্রবার পঞ্চম দিনেও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নৌবাহিনী কর্মকর্তাসহ অর্ধ শতাধিক সদস্য আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনাস্থলের আশপাশে যতদূর পর্যন্ত লঞ্চটি যেতে পারে সেই পর্যন্ত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে নৌবাহিনীর সদস্যরা অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। গতকাল পর্যন্ত লঞ্চটির সন্ধান মিলেনি। নৌবাহিনী সূত্রে জানা যায়, ঘটনাস্থলের আশেপাশে ৭ থেকে ৯ নটিকেল মাইল এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। তবে ঘটনাস্থলের কাছে খারি রয়েছে। গভীর স্রোতযুক্ত খারি। সেখানে নিমজ্জিত লঞ্চটি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। নৌ বাহিনীর অনুসন্ধানকারী দলের যন্ত্রে সেই ধরণের একটি সংকেত আসছে। কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, হয়তো লঞ্চটি সেখানে থাকতে পারে। আর যদি সেই খারির মধ্যে লঞ্চটি থাকে, তাহলে সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হবে না বলে এক কর্মকর্তা জানান। এছাড়া বিআইডব্লিউটিএ, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন নিমজ্জিত লঞ্চটির সন্ধানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পিনাক লঞ্চটি দিনার ও নাসরিনের ন্যায় পরিত্যক্ত হিসাবে ভাগ্যবরণ করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চিরতরে পিনাক লঞ্চটি হারিয়ে যাবে? ১৯৯৪ সালের ২০ আগস্ট চাঁদপুরের মেঘনা মোহনায় ২ শতাধিক যাত্রী নিয়ে এমভি দিনার লঞ্চটি ডুবে যায়। চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে আসার সময় মেঘনা মোহনা ঘুরতে গিয়ে প্রচণ্ড ঘুর্ণিস্রোতে পড়ে দুপুর ১২টায় দিনার লঞ্চটি ডুবে যায়। ৫ দিন অনুসন্ধান চালিয়ে লঞ্চটির কোন সন্ধান মিলেনি। অবশেষে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। একই স্থানে ২০০৩ সালের ৯ জুলাই সন্ধ্যায় ৮শ যাত্রী নিয়ে এমভি নাসরিন লঞ্চটি ডুবে যায়। ঐ সময় এক সপ্তাহ যাবত্ নৌ বাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসিসহ স্থানীয় প্রশাসন নিমজ্জিত লঞ্চটি উদ্ধারে ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। প্রচণ্ড স্রোতের কারণে ঐ সময় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো কষ্টসাধ্য ছিল। কোন সন্ধান না পাওয়ায় যৌথ বাহিনী এ লঞ্চটি উদ্ধারের আর কোন সম্ভাবনা নেই বলে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। পিনাক লঞ্চটি যেখানে নিমজ্জিত হয়, সেখানেও ছিল প্রচণ্ড স্রোত। ফলে পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত পিনাক লঞ্চটির নামও এমভি দিনার ও নাসরিনের ন্যয় পরিত্যক্ত ঘোষণার খাতায় লেখা হতে পারে। পদ্মা-মেঘনার প্রচণ্ড স্রোতে ব্যাপক নদী ভাঙ্গন নিয়ে আমেরিকার নদী বিশেষজ্ঞ ড. গিবসের নেতৃত্বে ১৭টি দেশের ২০সদস্য বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ দল পদ্মা মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনা অর্থাত্ মুন্সীগঞ্জ থেকে নোয়াখালীর চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত স্টাডি করেন। ঐ সময় ড. গিবস স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘তোমরা পদ্মা ও মেঘনাকে নদী বলো কিভাবে? এগুলোতো সমুদ্রের চেয়েও ভয়ংকর।
৪ আগস্ট পিনাক লঞ্চটি নিমজ্জিত হওয়ার দেড় ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট নৌবাহিনীর জাহাজ হাজী মহসিনের ঘাঁটি থেকে দুই কর্মকর্তার নেতৃত্বে ১১ জন ড্রাইভার কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। খুলনা থেকে নৌ বাহিনীর একজন হাইড্রোগ্রাফারের নেতৃত্বে সার্ভে দল ঘটনার পর দিন এসে কার্যক্রম শুরু করেন। নৌ বাহিনীর জাহাজ এলসিটি-০১২ ও আর-৫১ আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনার পর দিন থেকে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে। চট্টগ্রাম থেকে নৌবাহিনীর জাহাজ শাহপরান রওয়ানা দেয় ঘটনার পর। চাঁদপুর পর্যন্ত জাহাজটি পৌঁছেছে। তবে নদীর মধ্যে বিভিন্ন চর থাকায় এত বড় জাহাজের ঘটনাস্থলে পৌছাতে সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে চরের কারণে পদ্মা নদী দুই ভাগে বিভক্তি হয়ে প্রচণ্ড স্রোত বইছে। ঘটনাস্থলের আশেপাশে প্রায় ৭ থেকে ৯০ ফুট গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। প্রচণ্ড স্রোতের কারণে আরও গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়নি বলে এক কর্মকর্তারা জানান।
অনুসন্ধান কার্যক্রম মনিটরিং করার দায়িত্বে নিয়োজিত এক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, লঞ্চ থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের কেউ কেউ বলেছেন, পিনাক লঞ্চটি ডুবতে ডুবতে এক পর্যায় কাত হয়ে গেছে। ফলে লঞ্চটি উল্টে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। ছোট লঞ্চটি প্রচণ্ড স্রোতে ভাসিয়েও নিয়ে যেতে পারে। এ কারণে ভাটি এলাকাও গতকাল থেকে নৌ বাহিনীর সদস্যরা অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে।
উচ্চ ক্ষমতার অনুসন্ধানী জাহাজ জরিপ-১০ মাওয়ায়
উচ্চ ক্ষমতার অনুসন্ধানী জাহাজ জরিপ-১০ শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে মাওয়ার দুর্ঘটনাস্থলে পৌছেছে। অনুসন্ধানী জাহাজ কান্ডারী-২ এবং সাইড স্কেন সোনার ব্যবহার করে তিস্তা, সন্ধানী, আইটি ৯৭ ও ব-দ্বীপ শুক্রবার সকাল থেকে ডুবে যাওয়া লঞ্চ ‘পিনাক-৬’ এর সন্ধান করছে। এসব তথ্য নিশ্চিত করে নৌ বাহিনীর সদর দপ্তরের উপ পরিচালক কমান্ডার হাবিবুল আলম জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের ৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা সার্চ করার পর এখন নতুন করে আরও নতুন এলকায় অভিযান চলাচ্ছেন তারা। জরিপ-১০ পৌছায় অনুসন্ধান আরও জোরদার হয়েছে।
লঞ্চের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় উদ্ধারকারী জাহাজ ‘নির্ভীক’ ও ‘রুস্তম’ মাঝ পদ্মায় অলস বসে আছে। দীর্ঘ ৫ দিনে লঞ্চের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে স্বজনহারা পরিবারগুলো। অনেকেই লাশের জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছেন। স্বজনদের খোঁজ করছেন নানা স্থানে। স্বজনহারাদের দীর্ঘ পাঁচ দিনের অপেক্ষায় এক শোকাবহ বিশেষ পরিস্থিতি এখন মাওয়ায়।