গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৪০
মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা)
ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
পূর্ণিমা চাঁদ পর্ব— ১৭
আজকে রাখী পূর্ণিমা। হিন্দু, জৈন ও শিখ ধর্মের লোকজন এটি পালন করে। মেয়েরা তাদের ভাইদের হাতে একটা সূঁতা বেঁধে দেয়। এতে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হয়। ভারতে সামপ্রদায়িক সংকটের সময় রবিঠাকুর হিন্দু-মুসলিম সবার হাতে রাখী বেঁধে দিয়ে সংকট কাটানোর প্রয়াস করেছিলেন।
অণুদের সবাই ছাদে এসেছে। পরিষ্কার আকাশে ঝলমল করছে চাঁদ। রেখা গান ধরলো— চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে। গান শেষ হলে বিন্দু বললো— বাবা, চাঁদে গাছ দেখা যাচ্ছে।
অণু বললো— ওগুলো গাছ নয়। চাঁদের পাহাড়। আজকে পূর্ণিমার রাতে পাহাড়গুলো ক্লিয়ার দেখা যাবে।
পূর্ণিমা কীভাবে হয় বাবা? —কণিকার প্রশ্ন।
চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সাতাশ দিন সাত ঘণ্টা তেতাল্লিশ মিনিট বারো সেকেন্ডে একবার ঘুরে —বললেন নীলকান্তবাবু। আবার নিজের অক্ষকে কেন্দ্র করেও ঘুরে। ঘুরতে ঘুরতে একদিন চাঁদ থাকে সূর্যের দিকে। চাঁদের যে দিকটাতে সূর্যের আলো পড়ে সেই দিকটা আমরা দেখতে পাই না, অন্ধকার দিকটা থাকে পৃথিবীর দিকে। ফলে সেদিন চাঁদের অমাবস্যা। এটিকে বলা হয় নতুন চাঁদের দিন। দু-একদিন পর সূর্যের মুখোমুখি অবস্থান থেকে সরে যায় চাঁদ। ফলে এক চিলতে চাঁদ দেখতে পারি আমরা সন্ধ্যায়। সাতদিনে প্রায় নব্বই ডিগ্রি সরে যায়। তখন অর্ধেক চাঁদ দেখতে পারি। এরপর চাঁদের দৃশ্যমান অংশ বাড়তে থাকে। 14 বা 15 দিনের দিন চাঁদ সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্থান করে। তখন চাঁদকে পূর্ণ আলোকিত দেখা যায়, ঠিক আজকের মতো। আজকেও কিন্তু চাঁদের অর্ধেক আলোকিত। পৃথিবী থেকে সেই আলোকিত অংশ দেখতে পারি বলে আজকের দিনটাকে পূর্ণিমা বলি।
চাঁদের বুড়ি কাকে বলি বাবা? বিন্দু বললো।
নীলকান্তবাবু বললেন— চাঁদ পৃথিবীর দিকে সবসময় একটা মুখই তুলে ধরে। ওই দিকটা লাভায় গঠিত একটা অন্ধকার অঞ্চল। একে আমরা চাঁদের বুড়ি বলি। 1609 ও 1610 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী টমাস হ্যারিয়ট ও গ্যালিলিও চাঁদের এবড়ো-থেবড়ো এলাকা, বড় গহ্বর ও পাহাড় লক্ষ করেন।
চাঁদের পাহাড়ের কী নাম বাবা? সীমা বললো।
চাঁদের পাহাড়ও পৃথিবীর পাহাড়ের নামে নাম, আল্পস।
আর গর্তগুলোর নাম? বললো চন্দ্রা।
গর্তগুলো বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিকের নামানুসারে। আরিস্তাকাস, কোপারনিকাস, টাইকো, প্লাতো ইত্যাদি।
কমলা বললেন— চাঁদেরও কি দিন রাত্রি আছে?
হ্যাঁ, চাঁদের একদিন হলো পৃথিবীর 29 দিন 12 ঘণ্টা 44 মিনিট 3 সেকেন্ডের সমান।
বিন্দু বললো— চাঁদ তো আমরা একটা থালার মতো দেখি। আসলে কি চাঁদ ভাত খাওয়ার প্লেটের সমান?
রেখা বললো— সুকান্তের কবিতা— ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
হ্যাঁ, বললেন— নীলকান্তবাবু। চাঁদ একটা থালা বা রুটির মতো দেখা গেলেও এটি আসলে এতো ছোট নয়। চাঁদের ভর 7350 কেজি। এর আয়তন পৃথিবীর আয়তনের চৌষট্টি ভাগের এক ভাগ। কিন্তু পৃথিবী থেকে 3,84,400 কিলোমিটার দূরে থাকায় আমরা চাঁদকে এতোটা ছোট বলে মনে করি।
পূর্ণিমা চাঁদ আকাশে সত্যিই চমত্কার জ্যোছনা দিয়ে আলোকিত করে রেখেছে। বিন্দু বললো— দেখো চাঁদের কী চমত্কার আলো।
চাঁদের তো নিজের কোনো আলো নেই, তাই না? বললো আকাশ।
হ্যাঁ, বললেন কমলা। চাঁদের আলোটা সূর্য থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা।
নীলকান্তবাবু বললেন— মজার ব্যাপার হলো, আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদকে যতোটা সুন্দর দেখি, চাঁদ থেকে অথবা পৃথিবীর বাইরে থেকে আমাদের পৃথিবীকে কিন্তু আরো বেশি সুন্দর দেখায়। আর চাঁদের আলো যতোটা স্নিগ্ধ, তার উত্তাপ কিন্তু এরকম স্নিগ্ধ নয়।
তাই না কি ! বললো চন্দ্রা।
হ্যাঁ, চাঁদের তাপমাত্রা দিনে একশ’ সাতাশ ডিগ্রি আর রাতে মায়নাস একশ’ তিয়াত্তর ডিগ্রি সেলসিয়াস।
অণু বললো, বাবা আবার কয়দিন পর পূর্ণিমা হবে?
আবার একমাস পর। বললেন কমলা। তিনিও চাঁদের পূর্ণিমা-অমাবস্যা সম্পর্কে কিছু কিছু জানেন।
বিন্দু বললো, বেশি বেশি পূর্ণিমা হলে ভালো লাগতো।
নীলকান্তবাবু বললেন— বেশি বেশি তো হবে না। প্রতি মাসে একবার পূর্ণিমা, আরেকবার অমাবস্যা হয়। তবে 2012 সালের আগস্ট মাসে দুইবার পূর্ণিমা হয়েছিলো। একমাসে দুটি পূর্ণিমা হলে দ্বিতীয়টিকে বলা হয় ব্লু-মুন বা দ্বিতীয় চাঁদ। ব্লু-মুন অন্যান্য সাধারণ পূর্ণিমার মতোই।
অনেকটা সময় ছাদে গল্প হলো। বিন্দুর তৃষ্ণা পেয়েছে। সে বললো— মা, পানি খাবো।
নিচ থেকে খেয়ে আয় —বললেন কমলা।
চন্দ্রা বললো— মামা, চাঁদে কি পানি আছে?
না, চাঁদে পানি আছে বলে এখনো কোনো সুনিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ক্সি জাং বলেছেন, চাঁদে পানির উপাদান হাইড্রোক্সল রয়েছে। চাঁদের উল্কাপিণ্ডের স্তরে হাইড্রোক্সলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হাইড্রোক্সলে একটা অক্সিজেন আরেকটা হাইড্রোজেনের পরমাণু আছে, যা পানির উপাদান।
তাহলে তো পানিও পাওয়া যেতে পারে —বললো আকাশ।
হ্যাঁ, বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, চাঁদে পানির অস্তিত্ব থাকতে পারে।
বিন্দু বললো— বাবা চাঁদ একটা কেন? বেশি চাঁদ হলে কী হতো। আমরা বেশি বেশি পূর্ণিমা পেতাম।
তার কথা শুনে কমলাও হাসলেন। যতসব আজগুবি কথাবার্তা। নীলকান্তবাবু বলেন— বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছেন, পৃথিবীর আকাশে আগে একটা নয় দুটো চাঁদ ছিলো। একটা চাঁদের অমাবস্যা হলে আরেকটা পূর্ণিমার আলো দিতো। ফলে পৃথিবীর আকাশ প্রতিটা রাতেই আলোকিত থাকতো। দুই যমজ বোনের মতো পৃথিবীর চারপাশে ঘুরাঘুরি করতো দুটি চাঁদ। একদিন ঘুরতে ঘুরতে দুই বোনের সংঘর্ষ বেঁধে গেলো। এতে দুটো চাঁদ এক হয়ে গেলো, আর এবড়ো থেবড়ো পাহাড়ের উত্পত্তি হলো চাঁদে।
দুই বোনের গল্পে মজা পেলো সবাই। আকাশ বললো— যারা চাঁদে গেলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই অনেক বড় বিজ্ঞানী।
হ্যাঁ। বললেন নীলকান্তবাবু। আমার বন্ধু, নীল মানে নিল-আর্মস্ট্রং, অ্যাডউইন-ই-অলড্রিন আর মাইকেল কলিন্স তিনজন চাঁদে গিয়েছিলেন। তবে মাইকেল কলিন্স চাঁদে নামেননি। তিনি মূল নভোযানটি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। ও হ্যাঁ, আজকে তো দশ আগস্ট। গত সাত আগস্ট ছিলো নিল-আর্মস্ট্রং এর মৃত্যু দিবস। 2012 সালের 7 আগস্ট এই মহান নভোচারী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পৃথিবীর সকল মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।