স্মার্ট পলিটিক্স

স্মার্ট শব্দটিকে যেভাবে প্রথম সংজ্ঞায়িত করতে শিখি সেটি হচ্ছে, কাউকে ভাল বা সুন্দর ড্রেস পরতে দেখলে ভাবি তিনিই স্মার্ট। পরবর্তীতে শিখলাম-ড্রেস নয়, সুন্দর চেহারা নয়-যিনি খুব দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন তিনিই স্মার্ট। বর্তমান সময়ে সে সংজ্ঞাও পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে। স্মার্ট হচ্ছেন তিনি, যিনি পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের সাথে নিজের এবং ড্রীম টিমকে উন্নয়নে নিয়ে যেতে পারেন বা নিজে যে স্বপ্নটি বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করেন সেটি যখন অন্যের মধ্যে ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন করতে পারে তখনি তার স্মার্টনেস পরস্ফুিটিত হয়। অর্থাত্ একক উন্নয়ন নয়, সার্বিক উন্নয়নের অংশীদারীত্ব স্মার্টনেস। স্মার্টনেস ব্যক্তির কথাবার্তা, নেতৃত্বের ধারা, তার কাজকর্মে আমরা অনেক সময় অবলোকন করে থাকি। তবুও আজকাল টকশোগুলোতে বিজ্ঞজনদের কথাবার্তা শুনে সাহস করে অনেক কিছু শেয়ার করি। তবে আমার স্মার্টনেস সম্পর্কে শেয়ার ধারণা আরেকটু ব্যাপক। একটি সংবাদের মধ্যে স্মার্টনেস থাকতে পারে, থাকতে পারে তা কোন চিত্রে বা বাক্যেও। যে বাক্য, যে সংবাদ, যে চিত্র, যে ছবি আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়, উদ্বেলিত করে নিজের উন্নয়নের এবং স্বপ্ন তৈরি করে সুন্দরের; সে ধরনের জিনিস স্মার্ট বটে। বিষয়টি কর্পোরেটের জন্য উপকারী। কর্পোরেটে এগুলো নিয়ে বাঘা বাঘা কথাবার্তা হয়। কিন্তু রাজনীতিতে এই ইস্যুগুলো নিয়ে আমি নিশ্চিত আমাদের রাজনীতিবিদরা ভাবেন না। সরকার ও বিরোধী দলের কথাবার্তা শুনে শঙ্কিত হচ্ছি আবার আন্দোলনের নামে কি ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। তাই একজন নাগরিক হিসাবে স্মার্ট রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করছি। কারণ স্মার্ট রাজনীতিতে নিজ স্বার্থ, নিজ উন্নয়ন আর তা বজায় রাখতে ধ্বংসযজ্ঞ থাকে না। বলছিলাম অনেক কিছুর মধ্যেই স্মার্টনেস থাকতে পারে। যেমন প্রধান বিরোধী দলের বিরোধী শব্দটির মধ্যেই গোলমাল। সেই কারণে যখন কোন দল সরকার গঠন করে পরের দিন সেই দল বিরোধী দলের বিরোধের স্বীকার হয়। প্রধান বিরোধী দল নামকরণ না করে যদি সেটিকে বলা হতো প্রধান সহযোগী দল তাহলে নামেই উদ্বেলিত হতে পারতো একটি দল ও সংগঠন। বিরোধিতার কারণে বিরোধিতা না করে সহযোগিতার কারণে সহযোগিতা করতে পারতো একে অন্যকে। এতে সরকারি দলও মাথা ঘামাতে পারতো উন্নয়নের বিষয় নিয়ে। জনকল্যাণে, রাষ্ট্রের কল্যাণে প্রচুর সময় ব্যয় করতে পারতো সরকারি দল। পজিটিভ থিঙ্কিং অনেক শক্তিশালী ভূমিকা রাখে সেটি আমরা রাজনীতিতে বাস্তব রূপে দেখতে পারতাম। কিন্তু সেটি না হওয়ার কারণে সরকারও সরকার গঠনের পরের দিন থেকে বিরোধী দলের জন্যে বিরোধী হিসাবে আবির্ভূত হন। কিভাবে কাকে জেলে পুরবেন, মামলায় ঝুলাবেন, বসতভিটা থেকে তাড়াবেন, পুলিশ দিয়ে বেধড়ক পিটাবেন, দেশ ছাড়া করবেন সেই বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জনগণ হয় শিল-পাটার মাঝখানে মসল্লা। ৫ই জানুয়ারী নির্বাচন পূর্ববর্তী বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নেতৃত্ব ও কর্মকাণ্ডে খোদ বিরোধী দলীয় নেত্রী ক্ষোভের সাথে অনেক কথা বলেছেন। আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পেছনে দলীয় বড় বড় নেতাদের দোষারোপ করেছেন। আসল ব্যর্থতা আসলে ছিল স্মার্ট রাজনীতি ও প্রজ্ঞার অভাব। যে কর্মসূচিতে জনগণের দুঃখ ও দুর্দশা বেড়ে যায়, সাধারণের ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যু ঘটতে থাকে তা কোনক্রমেই স্মার্ট রাজনীতির অংশ নয়। নির্বাচন পরবর্তীতেও প্রধান বিরোধী দলের কোন কর্মসূচির মধ্যে কোন স্মার্ট কর্মসূচি ছিল না। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, অতি সম্প্রতি দলকে সংগঠিত করার জন্য বিএনপির ছয় হাজার ইফতার পার্টির প্রয়োজনীয়তা দলের জন্য হয়তো প্রয়োজন ছিল। সেখানে অনেক অর্থের ও লোকবলের যে সমাগম ঘটেছিল- একই কর্মসূচি যদি করা যেতো তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে, এই গ্রুপের ১৬০০ শ্রমিক মানবেতর পরিস্থিতিতে ঈদের দিনেও যে করুণভাবে কাটিয়েছে, তাদের কিছু সাহায্য ও সহযোগিতা যদি করা যেতো সমাজ অনুপ্রাণিত হতো। কার কোনটি দায়, সে দায়ভার চাপাতে চাপাতে আমরা ধ্বংস ছাড়া অন্য কিছু খুব একটা পাচ্ছি না। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সময় যখন মির্জা ফকরুল ইসলাম জনগণের উদ্দেশ্যে তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন সেটির মধ্যে আমরা অনেকেই স্মার্ট বক্তব্য খুঁজে পেয়েছি। সে বক্তব্য আমাদের মনে সাহস যুগিয়েছিল, আমরা ভাবতে পেরেছি সাধারণ মানুষ আর একা নয়। রাজনীতিবিদরা আমাদের নিরাপত্তার জন্য ভালো পরামর্শ দিচ্ছেন। যদিও বক্তব্যে যতো স্মার্টনেস ছিল কর্মে সেটি ছিল অসার। মিরপুরের কালশীতে বিহারী ক্যাম্পের ঘটনাতেও বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা আমাদের হতাশ করেছে। অতি সম্প্রতি লঞ্চ ডুবিতে যে শত শত পরিবার তাদের স্বজনদের হারিয়েছে তাদের দুঃসহ মনবেদনায় সহমর্মিতার হাত বাড়াতে বিরোধী দল তেমনভাবে দাঁড়াতে পারেনি। অনেক সময় উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সরকার টালমাটাল হয়ে পড়লে বিরোধী দল যখন সহযোগিতার হাত বাড়ায় তখন সেটি হয় স্মার্ট রাজনীতির অংশ। আমরা যখন দেখি আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী সন্তানের জন্য রান্না করছেন, বাড়ির আঙ্গিনায় ব্যাডমিন্টন খেলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অথবা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইছেন তালে তালে, বিয়ের দাওয়াত দিতে যাওয়া কোন পুত্রতুল্য খেলোয়াড়কে আদর-সোহাগ করেন তখন আমরা অভিভূত হই। আশার আলো দেখি সেই স্মার্ট ছবিগুলো দেখে। আশা জাগানিয়া একটি পরশ সেগুলোর মধ্যে থাকে। আমরা সুন্দর ছবিগুলো দেখে আমাদের মানসপটে আঁকি সুন্দরের স্বপ্ন। কিন্তু হায়! আমাদের বাস্তব চিত্র যে অন্য রকম। সুন্দরের স্বপ্ন আমাদের চুরমার হয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে। জনগণ আজকে অসহায়। কিন্তু এরা জানে স্মার্ট রাজনীতি ছাড়া এদেশে আর ভালো কিছু কোনভাবেই সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জনগণের ভালো-মন্দের সম্পৃক্ততায় স্মার্ট রাজনীতি একমাত্র মুক্তির উপায়। বিএনপির নেতৃত্বে অনেক তরুণ নেতার কাঁধে অনেক দায়ভার এসেছে। তারা আশাকরি স্মার্ট রাজনীতি করবেন। সরকারি দলও সেই দিকটাতেই ছুটবেন। হাস্যকর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বাদ দিয়ে স্মার্ট রাজনীতি নিয়ে ভাববেন। প্রয়োজনে ‘পলিটিক্যাল স্কুলিং’ ব্যবস্থা প্রণয়ন করে রাজনীতিতে স্মার্টনেস কিভাবে সংযোজন করা যায় তা শেখা যেতে পারে। শেষ করছি এই বলে জীবনের স্মার্ট ফিলোসপি বা দর্শন হচ্ছে এটি মেনে নেয়া ‘জীবনে অমরত্ব লাভ সম্ভব নয়, এটি শতভাগ সত্য’। কবরে শায়িত হওয়ার পর কবরে যে ধুলোবালি জমবে সেটিও আপন জনেরা বা সাঙ্গ-পাঙ্গরা নিজে মুছতে যাবে না। ধোয়া-মোছার কাজ যদি কিছুকাল করেও তাও কবরস্থানে কর্মরত কাউকে পয়সা দিয়ে করাবে। তাই সাঙ্গ-পাঙ্গ আর আপনজন নয়, গণমানুষের কল্যাণে এ পারে থাকতেই কিছু করে যেতে হবে। এ পারের সময়টুকুও একটি জীবনে খুব সংক্ষিপ্ত। লেখক :ব্যাংকার ই-মেইল:Sharifkhan64@gmail.com