সরকার ‘আদিবাসীদের’ অধিকার অস্বীকার করছে :সন্তু লারমা
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪১
পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বলেছেন, ৪৩ বছর ধরে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদন করছে। আদিবাসী জীবন রূদ্ধ হয়ে পড়েছে। কোন সরকারই আদিবাসীদের কথা শুনছে না। তাদের অধিকার অস্বীকার করে চলেছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার তা রক্ষা করছে না। এখন আদিবাসীদের পরিচয়ও কেড়ে নিতে চাইছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীতে কেন্দ ীয় শহীদ মিনারে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন’। দিবসটিকে ঘিরে পাহাড় ও সমতল থেকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী সাজ-পোশাকে জড়ো হয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। শত শত ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর সমাবেশ পরিণত হয় প্রতিবাদী সভায়।
সকালে বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধনের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আদিবাসী’ অভিধা ব্যবহারে অস্বীকার করে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করছে। জাতিসংঘ যখন বলছে, ইন্ডিজেনাস পিপলস, তখন আমরা আদিবাসী অভিধা ব্যবহারে দ্বিধা করছি। জানি না কারা সেই বুদ্ধিজীবী, যারা বলছে ‘আদিবাসী’ বললে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকি হতে পারে। আদিবাসীদের উন্নয়নের ধারায় যোগ করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, নিরাপত্তার সমস্যা দিয়ে আদিবাসী সমস্যা দেখলে চলবে না। আদিবাসীদের বিচ্ছিন্ন করে নয়, তাদের সম্পৃক্ত করেই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগুতে হবে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন দাবি করে তিনি বলেন, আমরা শান্তিচুক্তি নিয়ে সারা বিশ্বের কাছে গর্ব করি। বিশ্বাস করি, এ সরকারের সময়েই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শান্তিচুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যা সমাধান সম্ভব। সংবিধান আদিবাসীদের অধিকার দিয়েছে। এখন সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করা দরকার।
তথ্য কমিশনার অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, আদিবাসী অভিধা ব্যবহার করা যাবে না বলে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী (হাসানুল হক ইনু) আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সদস্য। আসলে আমরা যখন সরকারে যাই, তখন আর মতাদর্শ থাকে না।
বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূত হেদার ক্রুডেন বলেন, একটি ভূখণ্ডের সৌন্দর্য ও গর্ব তার আদিবাসীরা। ভূমিই হলো আদিবাসীদের প্রধান সম্পদ। আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণে সরকারকে আরো আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এসময় আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত হানা ফুগল এস্কেজার, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি পলিন টমাসিচ, ঐক্য ন্যাপের পঙ্কজ ভট্টাচার্য, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের শাহীন আনাম, একশন এইড বাংলাদেশের ফারাহ কবীর, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কাজল দেবনাথ, আদিবাসী ফোরামের সঞ্জিব দ্রং, বাপা’র ড. আবদুল মতিন প্রমুখ। সমাবেশ শেষে শহীদ মিনার থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। এর আগে সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘মাদল’ গানের দল পরিবেশন করে একাধিক গণসংগীত। রাঙামাটির ‘গিরিসুর’ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির উদ্যোগে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খেয়াং, খুমি প্রভৃতি ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা পরিবেশন করে ঐতিহ্যবাহী নাচগান। দিনাজপুরের ওঁরাও সাংস্কৃতিক দল ঢোলের তালে তালে পরিবেশন করে নাচ।
ক্ষুদ্রজাতির মেলা
এদিকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ বাংলা একাডেমি চত্বরে আয়োজন করেছে দু’দিনব্যাপী ক্ষুদ্রজাতির কুটির শিল্প প্রদর্শনী, মেলা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আজ রবিবার মেলা সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
শনিবার দুপুরে মেলার উদ্বোধন করেন আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন বিষয়ক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এডভোকেট সুলতানা কামাল, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহিন আনাম প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ভাষার প্রতীক হিসাবে যেমন বাংলা একাডেমি হয়েছে তেমনি প্রতিটি ভাষায় একাডেমি করতে হবে। আমরা প্রতিটি মানুষের জন্য সমান অধিকার চাই।