পার্টটাইম শিক্ষকই ভরসা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে

দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও শিক্ষাদানে আউটসোর্সিংয়ের উপরই ভর করে চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যাপক ও প্রভাষকের সংখ্যার মধ্যে আনুপাতিক দূরত্ব অনেক বেশি। পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিতেই বেশি মনোযোগী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা পূর্ণকালীন শিক্ষকদের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি। আবার পূর্ণকালীন এ শিক্ষকদের মধ্যে অধিকাংশই প্রভাষক। পূর্ণকালীন অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের সংকট প্রকটতর হচ্ছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠানে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক এবং প্রভাষকের সংখ্যার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হয়। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনও এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এর উপর খন্ডকালীন বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের উপস্থিতি গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করবে না। দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর ভর করে শিক্ষাদান চলায় পাবলিক এবং প্রাইভেট-দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিকল্পনাহীনভাবে একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিদের মধ্যে ‘কম খরচে বেশি শিক্ষক নিয়োগের মনোভাবই’ এ আউটসোর্সিং নির্ভরতার প্রধান কারণ। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন প্রভাষক সংকট নেই, অধ্যাপক সংকট রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও এ সংকট রয়েছে। তবে বেসরকারিতে এ সংকট বেশি। অবস্থার উন্নয়নে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিক ও পরিচালকদের সাথে কথা বলছে। পূর্ণকালীন একজন অধ্যাপক এক লাখ টাকার নিচে বেতন নিতে রাজি হন না। এর অর্ধেক খরচে একজন অধ্যাপককে অনায়াসে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে পাওয়া যায়। এ সুযোগটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কাজে লাগায়। অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিস’র একজন নেতা বলেন, দেশে ৭৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় একটার পর একটা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে। যে যেভাবে পারছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিচ্ছে। এটিতো মুদি দোকান নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এত পূর্ণকালীন অধ্যাপক পাওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০১২ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী,কাগজে-কলমে বাংলাদেশের ৬০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বক্ষণিক শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণকালীন শিক্ষকের সংখ্যা আট হাজার ১৭৮, খন্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা তিন হাজার ৯৩৫। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সংখ্যা ৬২৩ জন, খন্ডকালীন অধ্যাপকের সংখ্যা এক হাজার ৬৬ জন। পূর্ণকালীন শিক্ষকের তালিকাজুড়েই রয়েছে প্রভাষকদের আধিপত্য। পূর্ণকালীন আট হাজার ১৭৮ জন শিক্ষকের মধ্যে পাঁচ হাজার ২৬৪ জন প্রভাষক। খন্ডকালীন প্রভাষকের সংখ্যা এক হাজার ২৭৪ জন। ইউজিসির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন অধ্যাপক আছেন ২৪ জন, সহযোগী অধ্যাপক ২৫, সহকারী অধ্যাপক ৩৮ এবং প্রভাষক ২১৫ জন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের সংখ্যা পূর্ণকালীন শিক্ষকের চেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে খন্ডকালীন অধ্যাপক আছেন অন্তত ৭৩ জন এবং সহযোগী অধ্যাপক ৩২ জন। পূর্ণকালীন ও খন্ডকালীন শিক্ষকের অনুপাতে ভারসাম্যহীন অবস্থা প্রকট হয়েছে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পূর্ণকালীন ১২ অধ্যাপকের বিপরীতে খন্ডকালীন অধ্যাপক আছেন ৬৫ জন। স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পূর্ণকালীন ১২ জনের বিপরীতে খন্ডকালীন অধ্যাপক আছেন ৪৫ জন। এদিকে শিক্ষকদের খন্ডকালীন দায়িত্বপালন জ্ঞান বিতরণ ব্যবস্থায় বিশৃংখলা তৈরি করছে বলে অভিযোগ সরকারি ও বেসরকারি দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ছাত্র আবদুল গফুর বলেন, ক্লাসের সময় ছাড়া বিভাগে শিক্ষকদের পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্লাসে ঠিকমত বিষয় না বুঝিয়ে এসাইনমেন্ট নির্ভর কাজ দেন শিক্ষার্থীদের। পরীক্ষার ফলাফলও ঠিকসময়ে প্রকাশ করা হয় না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার কারণেই এটি ঘটে। গ্রিন ইউনিভার্সিটির এক ছাত্র বলেন, শিক্ষকরা শুধু ক্লাসে আসেন আর যান। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কতো নেই। যেন শুধু সনদ নিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। ইউজিসির একজন সদস্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খন্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা সার্বক্ষণিক শিক্ষকের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হওয়া কোনভাবেই উচিত নয়। ইউজিসি এ ব্যাপারে বার বার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাগাদা দিলেও পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। তবে কাগজে-কলমে হিসেব দেখাতে তারা পূর্ণকালীন প্রভাষক নিয়োগ দিতেই মনোযোগী। ইউজিসির এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কোর্স শুরু করতে হলে ঐ বিভাগে অন্তত একজন অধ্যাপক, তিনজন সহযোগী অধ্যাপক ও চারজন প্রভাষক থাকার শর্ত বেঁধে দিয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সময় সব ঠিক আছে দেখিয়ে কাগজপত্র জমা দেয়। কিন্তু বাস্তবে তার সঙ্গে অনেক সময়ই মিল পাওয়া যায় না। পরে ইউজিসি এ বিষয়ে তলব করলে তারা সময়ক্ষেপণ করে।