বরিশালে সিংহভাগই ফিটনেসবিহীন লঞ্চ
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৩
ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী বিলাসবহুল লঞ্চগুলোর চেয়ে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এখানকার অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী ‘এমএল টাইপের’ একতলা লঞ্চগুলো। অভ্যন্তরীণ রুটে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতকারী ৫১টি লঞ্চের মধ্যে ৩৬টিরই ফিটনেস নেই। ধারণক্ষমতাসহ জীবনরক্ষায় যাত্রীদের যেসব সরঞ্জামের কথা নৌযানগুলোর সামনে লিখে রাখা হয়েছে বাস্তবে তা নেই। এসব তদারকির জন্য কোন লোকও নেই। এ অঞ্চলে ৩ হাজার নৌযান পরিদর্শনের দায়িত্বে আছেন মাত্র একজন পরিদর্শক।
বরিশাল নৌ-বন্দর টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ভোলা, লালমোহন, বোরহানউদ্দিন, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, বাউফল, ধুলিয়া, কালাইয়া, কালিশুরী, বগা, বামনা, বেতাগীসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করে মোট ৫১টি লঞ্চ। গতকাল শনিবার সরেজমিনে বরিশাল নৌ-বন্দরে এসব লঞ্চ ঘুরে দেখা গেছে, বহু পুরনো এসব লঞ্চের অধিকাংশ সংস্কারের অভাবে লক্কর-ঝক্কর হয়ে গেছে। জোড়াতালি দিয়ে এসব লঞ্চে যাত্রী পরিবহন করা হলেও জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নেই। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে ফিটনেস সনদ আনার সময় যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ও সরঞ্জাম থাকার যে তালিকা জমা দেয়া হয়েছিল বিআইডব্লিউটিএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী তা হুবহু লঞ্চের সামনে লিখে রাখা হয়েছে, বাস্তবে এর দেখা মেলেনি।
বরিশাল-হিজলা রুটে চলাচলকারী এম এল বিশারী ও এম এল মুমিন লঞ্চে কোন লাইফ বয়া নেই। মেঘনার কালীগঞ্জ থেকে ঝুঁকি নিয়ে এ দু’টি লঞ্চে যাতায়াত করে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ। শুধু বিশারী আর মুমিন নয়, ‘এম এল জনতা’, ‘এমএল চরমোনাই-১’ ও ‘চরমোনাই -২’, ‘সাচনা’, তমা’, ‘পারভীন’, ‘এমএল সুরভী’, ‘এমএল সুপার সনিক-১’ ও ‘সুপার সনিক-২’ লঞ্চ ঘুরে একই অবস্থা দেখা গেছে। ছোট্ট এ লঞ্চগুলো ঝড় তুফান ছাড়াও পণ্যবাহী কার্গো বা ডাবল ডেকার কোন লঞ্চের সাথে সামান্য ধাক্কা লাগলেই দুর্ঘটনা ঘটে।
এসব নৌযান চালানোর জন্য নেই কোন দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাষ্টার সুকানী। সিংহভাগ লঞ্চই লস্কর-খালাসী দিয়ে চালানো হয়। নৌযান শ্রমিক নেতারা জানান, লঞ্চ মালিকরা কম বেতনে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়ে লস্কর-খালাসী নিয়োগ দেয় লঞ্চ চালানোর জন্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লঞ্চ মালিক জানান, এদের প্রশিক্ষণ সনদ নেই, তবে এরাও লঞ্চ চালাতে পারদর্শী। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ মাষ্টার, সুকানী নিয়োগ দিলে তারা কিছুদিন পর পর বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করেন, ধর্মঘট করেন, যে কারণে লোকসান গুনতে হয়।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নৌ-পরিদর্শক মারুফ হোসেন জানান, বরিশাল বিভাগের ৩ হাজার নৌযান পরিদর্শনের জন্য মাত্র একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। তার পক্ষে সব সুষ্ঠুভাবে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা) আবুল বাশার মজুমদার জানান, বরিশাল নদী বন্দর থেকে চলাচলকারী ৫১টি লঞ্চের মধ্যে ৬৫ ফুটের নীচে এমএল টাইপের লঞ্চ চলাচল করছে ১৫টি। সিংহভাগ লঞ্চ ঝুকিপূর্ণ স্বীকার করে জানান, এসব লঞ্চে লাইফ বয়া, বাতিসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকায় ৬৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ফিটনেসবিহীন এসব লঞ্চ চলাচলের বিষয় দেখার দায়িত্ব সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের। ঐ দপ্তরেরও একজন মাত্র কর্মকর্তা এ অঞ্চলের জন্য দায়িত্বে রয়েছেন। তার একার পক্ষে সার্ভে করা এবং নবায়নবিহীন ফিটনেস ছাড়া, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের বিষয় দেখা সম্ভব হচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা জানান, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভে সনদ দেয়া ও নবায়নের পর আর তেমন তদারকি না করায় অভ্যন্তরীণ রুটে এসব ফিটনেস বিহীন লক্কর-ঝক্কর লঞ্চ ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী পরিবহন করছে।