জনতার মৃত্যু নেই, তাই মৃত্যু নেই বঙ্গবন্ধুরও

একথা ঠিক যে, চূড়ান্ত বিচারে জনগণই হলো ইতিহাসের স্রষ্টা। সাথে সাথে একথাও অসত্য নয় যে, ইতিহাস সৃষ্টিতে ব্যক্তির ভূমিকাকেও অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করা যায় না। ইতিহাসই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জন্ম দেয়। ইতিহাসের নিজস্ব প্রয়োজনেই সে বিশেষ মুহূর্তে ইতিহাস নিজেই এসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে জনগণের দ্বারা রচিত হতে থাকা যুগান্তকারী ঘটনাবলীর প্রাণকেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ইতিহাসের হাতে তৈরি হওয়া সেই ব্যক্তিরাই আবার ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে নিয়ামক ওয়ে ওঠেন। জনগণ ও ব্যক্তির ভূমিকা এভাবে পরস্পর পরিপূরক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াতেই ইতিহাস রচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল সেরূপ নিয়ামক। জনগণের সামনে অবস্থান নিয়ে তিনি তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে রূপান্তরিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের স্থপতি রূপে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারা, বাংলাদেশের জন্ম- এসব ঐতিহাসিক অর্জন সম্ভব হয়েছে প্রধানত জনগণের অমোঘ শক্তির ফলে। তাছাড়া, তা সম্ভব হয়েছে শেরেবাংলা, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, মণি সিংহ প্রমুখ অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তির ত্যাগ-তিতিক্ষা-অবদানে। এসব কালজয়ী ঐতিহাসিক ব্যক্তির মধ্যে যিনি ঠিক ক্রান্তিকালীন সময়টিতে জনগণের সংগ্রাম, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-সাধনা, মনের কথাকে সবচেয়ে উপযুক্ত ও বলিষ্ঠভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি হলেন বাঙালির প্রিয় নেতা ‘শেখ সাহেব’- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে কারণেই জনগণের অন্তরে ও বাস্তব বিচারে তার অবস্থান অন্য সব ঐতিহাসিক ব্যক্তির ওপরে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারা ও তার ভিত্তিতে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সে সব ঐতিহাসিক অর্জন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার প্রতীক ও কেন্দ্রবিন্দু। এ বিষয়ে বিতর্ক করাটা একটি অনৈতিহাসিক পণ্ডশ্রম মাত্র। এ বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ ও বিতর্কের অবসান ঘটে গেছে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ড হিসাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি। একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যকে চরিতার্থ করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্যটি ছিল দেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারা থেকে কক্ষচ্যুত করে পরাজিত পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে আনা। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারার ভিত্তিতে অর্জিত স্বাধীনতার প্রতীকী পুরুষ ও কেন্দ্রবিন্দুকে, তথা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা ছাড়া এ ধরনের উল্টামুখী রাজনৈতিক ডিগবাজি সংগঠিত করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাই, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারা থেকে দেশকে সরিয়ে আনতে হলে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করাটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল এবং ঠিক সেটিই করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বদলে ফেলে দেশকে সাম্প্রদায়িক, সামরিক-স্বৈরাচারী, পুঁজিবাদী-লুটপাট তান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরশীলতার পথে টেনে নামানো হয়েছিল। এ ঘটনাতেই প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি মোটা দাগে সমার্থক ছিল। তা না হলে রাষ্ট্রীয় নীতি বদলানোর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে হতো না এবং বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর রাষ্ট্রীয় নীতি বদলানো হতো না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্যদিয়ে ইতিহাসের গতিধারাকে বহুলাংশে উল্টে দিতে পারলেও, তার সবটুকু অর্জন নিঃশেষ করা যায়নি। তার কারণ, মুক্তিযুদ্ধ যেমন ছিল বঙ্গবন্ধুর কীর্তি তেমনি তা প ধানত ছিল জনগণের নির্মাণ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হলেও জনগণকে হত্যা করা যায়নি। তাই, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারা আজও জীবন্ত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তা এখনো পূর্ণতা নিয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠা না পেলেও তা নিরন্তর জাগ্রত রয়েছে কোটি মানুষের অন্তরে। একইভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও চিরঞ্জীব থাকবেন কোটি জনতার অন্তরে। তা এ কারণে যে, বঙ্গবন্ধু ও জনগণের মিলিত কীর্তি হলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-ধারা ও তার ভিত্তিতে অর্জিত স্বাধীনতা। জনতার মৃত্যু নেই, তাই মৃত্যু নেই বঙ্গবন্ধুরও! [লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি] E-mail:selimcpb@yahoo.com