বিচার বিলম্বের যত কারণ

মামলা জট নিরসনে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে মনিটরিং সেল গঠনের জোর সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। এই সেল হাইকোর্টের সকল বেঞ্চের নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা কঠোরভাবে পর্যালোচনা করবে। কোন বেঞ্চের নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা কম হলে প্রধান বিচারপতি সংশ্লিষ্ট বিচারককে ডেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন যাতে মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি পায়। সুপারিশে বলা হয়েছে, নিম্ন আদালতে কোন মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর পর বিরতিহীনভাবে বিচার কার্যক্রম চালু না থাকায় তা বছরের পর বছর নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে এবং বিচার বিলম্বিত হয়। তাই সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর পর তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে বিচার কার্যক্রম চালু, অবসরপ্রাপ্ত জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও পদায়ন এবং নতুন তিন হাজার বিচারক নিয়োগ করে বিচারাধীন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার শুনানি, আপিল ও রিভিশন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিশন বিচার বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান করে সম্প্রতি সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পেশ করেছে। এতে কিভাবে উচ্চ ও নিম্ন আদালতের মামলা জট দ্রুত নিরসন করা সম্ভব সে বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- আদালতে প্রায় ২৮ লাখ মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার মামলা। এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য ৯০ জন বিচারপতি কর্মরত আছেন। ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মামলার সংখ্যাও সমানতালে বৃদ্ধি পেয়েছে যা অস্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়। উচ্চ আদালত উচ্চ আদালতের মামলা জট নিরসনের সুপারিশে বলা হয়েছে, কোন দেওয়ানি কিংবা ফৌজদারি মোশন দরখাস্ত বা মামলা বাতিলের আবেদন দাখিল করলে বিচারপতিরা প্রথমেই এর মেরিট যাচাই করবেন এবং মেরিটবিহীন দরখাস্ত হলে অবশ্যই সরাসরি খারিজ করবেন। এ ব্যাপারে প্রধান বিচারপতিকে সার্বক্ষণিক প্রতিটি বেঞ্চের মামলা নিষ্পত্তির বিষয় অত্যন্ত কঠোর হস্তে মনিটর করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে সামারি ডিসপোজাল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, তা পুনরায় চালু করার জন্য প্রধান বিচারপতিকে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথা মেরিটবিহীন মামলার সংখ্যা ক্রমাগত আকাশচুম্বী হবে এবং নতুন বিচারক নিয়োগ করলে মামলার সংখ্যা কমবে। নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে অনিবার্যভাবে নিম্ন ও উচ্চ আদালতে মামলার জট সৃষ্টি হয়। এ ব্যাপারে বিচারকদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মোশন শুনানি নিরুত্সাহিত করে মামলা নিষ্পত্তির ওপর জোর তাগিদ দিতে হবে। যে বেঞ্চ রুল ইস্যু করেন প্রধান বিচারপতি উক্ত বেঞ্চকেই ইস্যুকৃত রুলগুলোর শুনানি অন্তে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেবেন। যদি প্রকৃত আইনগত কোন কারণ ছাড়া রুল জারি করা হয়েছে বলে প্রধান বিচারপতির নিকট প্রতীয়মান হয় তাহলে ওই বিচারকের বিরুদ্ধে অদক্ষতাজনিত অসদাচারণের জন্য ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। নিম্ন আদালত নিম্ন আদালতে মামলার সংখ্যা ২৪ লাখ। এর মধ্যে জেলা ও দায়রা জজ বা মহানগর দায়রা জজ আদালতে ১৪ লাখ ৮২ হাজার মামলা বিচারাধীন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ৯ লাখ ২৭ হাজার। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সভায় বলা হয়, পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক সংকটের কারণে এই বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। পদোন্নতি ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে এই সংকট নিরসন করা সম্ভব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিপুল সংখ্যক মামলার বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটসহ ১৭০০ বিচারক কর্মরত রয়েছেন যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। এই মামলা জট কমাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কয়েক ধাপে কমপক্ষে আরো ৩ হাজার নতুন বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের সাপোর্টিং স্টাফ নিয়োগ দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সত্ ও কর্মঠ অবসরপ্রাপ্ত জজদেরকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও পদায়ন করলে পুরাতন বিচারাধীন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার শুনানি, আপিল ও রিভিশন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। এই পদক্ষেপটি দ্রুত কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে জোর সুপারিশ করা হয়। জেলা ও দায়রা জজ পর্যায়ে পদোন্নতি বা নিয়োগের ক্ষেত্রে সত্ ও কর্মঠ বিচারকদের সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা অপরিহার্য বলে মনে করে কমিশন। সুপারিশে বলা হয়, প্রতি জেলা সদরে নতুন এজলাশকক্ষ নির্মাণসহ ভৌত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। হাইকোর্ট বিভাগ নিম্ন আদালতসমূহের বিচারিক কাজ সম্পাদন করার জন্য প্রতি কর্মদিবস সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে। একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে যে অধিকাংশ বিচারক নির্ধারিত সময়ে এবং অনেক বিচারক বিরতির পর এজলাশে উঠেন না। পুরো কর্মদিবস যদি বিচারিক কাজে ব্যয় করা নিশ্চিত করা যায় তবে মামলার জট কিছুটা হলেও কমতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশে সান্ধ্যকালীন আদালত চালু করার আদৌ প্রয়োজন হবে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলা মুলতবির বিষয়ে বিচারককে কঠোর হতে হবে। মুলতবির কারণ যথার্থ মনে হলে পর্যাপ্ত খরচসহ মুলতবির আবেদন বিবেচনা করা যেতে পারে। আপিল মামলাসহ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানির পর অবশ্যই সাত দিনের মধ্যে রায় প্রদান করতে হবে। তবে কোন মামলার আকৃতি-প্রকৃতি বড় বা জটিল হলে তা অবশ্যই পরের সপ্তাহের মধ্যে রায় প্রদানে সচেষ্ট হতে হবে। আদালতের বিবেচনায় কোন মামলা মিথ্যা বা হয়রানিমূলক বলে প্রমাণিত হলে উপযুক্ত খরচসহ ডিসমিস করতে হবে। ফৌজদারি রুলস ও অর্ডার এর ৫০০ নং রুল অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজ ও সমপর্যায়ের জেলা জজদের কর্মস্থল ত্যাগ করতে হলে তাদেরকে অবশ্যই হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রারের নিকট লিখিতভাবে জানাতে হবে। কিন্তু বিধানটি ব্যাপকভাবে লংঘিত হচ্ছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে জেলা পর্যায়ের বেশ কিছু বিচারক প্রতি বৃহস্পতিবার আদালতের কর্মদিবসে কর্তৃপক্ষের অগোচরে কর্মস্থল ত্যাগ করেন এবং পরের রবিবার দুপুর নাগাদ কর্মস্থলে হাজির হন। ওই নৈতিকভাবে দুর্বল জেলা জজদের অধস্তন বিচারকরা অনুরূপভাবে প্রতি সপ্তাহে কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। ফলে জজশিপের সামগ্রিক বিচারকার্য দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার প্রতি সপ্তাহে জেলা জজদের নিকট থেকে কর্মস্থল ত্যাগের কোন দরখাস্ত পান না। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে জেলা জজদের বাসায় টেলিফোন করে খোঁজ খবর নিয়ে দৃষ্টান্তমূলকভাবে তাদেরকে শোকজ করলে এ ধরনের অবৈধ কর্মস্থল ত্যাগের ঘটনা কমে যাবে। প্রতিবেদনে সমগ্র বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ ও সহকারি জজসহ প্রত্যেক বিচারকের জন্য একজন করে দক্ষ স্টেনোগ্রাফার নিয়োগ দিতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিচারকদের নিজ হাতে সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করার পরিবর্তে কম্পিউটার টাইপ চালু করা দরকার। প্রত্যেক আদালতে প্রিন্টারসহ একটি কম্পিউটার ও আরো তিনটি মনিটর সরবরাহ করতে হবে। বিচারকাজে স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে সাক্ষীর জবানবন্দি স্টেনোগ্রাফার কম্পিউটারে টাইপ করবেন এবং তা সঠিকভাবে রেকর্ড হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য বিচারকসহ উভয়পক্ষের আইনজীবীদের সম্মুখে একটি করে মোট ৩টি মনিটর থাকবে। এই ব্যবস্থা বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে রয়েছে।