পালিত হলো বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ

সর্বস্তরের সচেতনতা জরুরি

১-৭ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। দুই বছরে দেশে ঝুকিপূর্ণ অপুষ্টির শিকার শিশু ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এই প্রতিবেদন মতে দুই বছরে শিশু অপুষ্টির হারও বেড়েছে ২ শতাংশ। ২০১১ সালে যেখানে অপুষ্টির শিকার শিশু ছিল ১৬ শতাংশ। ২০১৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৮ শতাংশে। সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয়মাসে উন্নিত করা। ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও উহা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩’ প্রণয়ন করেছে। তবে এখনও কেন অপুষ্টির হার বাড়ছে তা নিয়েই আমাদের মূল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন— রাবেয়া বেবী সামিয়া আসাদী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আমার প্রথম সন্তান গর্ভে আসার সাথে সাথেই আমি চাকরি ছেড়ে দেই। কারণ সেখানে লিফট ছিল না। যে অফিসে আমি কাজ করতাম সেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ করে সন্তানকে ব্রেসফ্রিডিং করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া যেত না। সন্তানের বয়স দুই বছর হলে আমি আবার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেই। দুই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা আর আশেপাশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলতে হয়, আমরা মেয়েরা যে ঘর সংসার করে কাজ করছি, তার জন্য আজও সমাজ তৈরি হয়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয়মাস হলেও, বেসরকারি ব্যাংকসহ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে চার মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া হয়। আমার জানা মতে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়া কোন ব্যাংক, সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে দিবাযত্ন কেন্দ্র নাই। কর্মজীবী নারীর জন্য যা অপরিহার্য। আজও গার্মেন্টস শ্রমিকদের মা হলে চাকরি ছাড়তে হয়। মায়ের অপুষ্টি সন্তানের অপুষ্টিতে রূপান্তরিত হয়। শুধু সরকারকে নয় সকলকেই এক্ষেত্রে কাজ করতে হবে বলে আমি মনে করি। রাশেদা রওনক খান শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার মেয়ের বয়স সাত মাস। ওকে আমি সাড়ে চার মাস পর্যন্ত বুকের দুধ দেই। আমি যেহেতু কর্মজীবী মা। তাই আমার ছয় মাস মাতৃত্ব কালীন ছুটি শেষ হয়, মেয়ের বয়স ছয় মাস হওয়ার আগে। তাই কাজের জন্যই আমি মেয়েকে বাইরের খাদ্য দিতে বাধ্য হই। দেশের পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নতির জন্য আমি মনে করি যেমন মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন তেমন পৃত্রিত্বকালীন ছুটি প্রয়োজন। মা সন্তান জন্ম দিলেও লালন-পালন করার দায়িত্ব বাবা-মার সমান বলে আমি মনে করি। তবে আমাদের সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা এত প্রকট যে অনেক মা শাশুড়ি ছেলে -মেয়ে জামাইয়ের সন্তান লালন পালনে স্ত্রীকে সবরকম সহযোগিতাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। যা বদলানোর প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমি আমার মা- আর স্বামীর পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছি। আবার আমাদের সমাজে অনেক পরিবার মা-শাশুড়ির সহযোগিতা যেমন তেমন অনেকের মা-শাশুড়িকে কাছে রেখে সহযোগিতা পাওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকে না। সময়ের প্রয়োজনে আজ মেয়েরা সকল পর্যায়ে কাজ করছে। নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার গতিকে ধরে রাখতে এবং সামনে এগিয়ে নিতে দিবাযত্ন কেন্দ্রের মতো সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এমন অনেক প্রতিষ্ঠানে দিবাযত্নকেন্দ্র নাই। এখানে যেমন শিক্ষকরা মা হন তেমন ছাত্রীরাও। ছাত্রীদের জন্য ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি থাকে না। আর একটি বিষয় আমাদের পোশাক শ্রমিকদের সহযোগিতার জন্য বিজেএমইর যেমন দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা উচিত তেমন দরিদ্র মায়ের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা জরুরি। কারণ অপুষ্টি আক্রান্ত মা অপুষ্টি আক্রান্ত সন্তানই জন্ম দেবে। সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার এ ক্ষেত্রে ভূমিকা আছে বলে আমি মনে করি। আয়শা খানম সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীকে স্বাবলম্বী করার জন্য আমরাই ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি চেয়েছিলাম। তাই আজ সরকার যখন আমাদের দাবি মেনে নিয়েছেন তখন আমাদের সাময়িক কিছু অসুবিধা হলেও দৃঢ় প্রতিজ্ঞভাবে ছয়মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয় প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে সহকর্মীদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। মা যখন গর্ভবতী হন তখন আমরা সাধ্যের মধ্যে নিতান্তই না পেরে মাকে পুষ্টিকর খাদ্য দেই। আর সন্তান প্রসবের পরে অবহেলা করি। এসব বিষয়ও আমাদের গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আমাদের শ্রম আইন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ৫০ জন নারী থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানে দিবাযত্নকেন্দ্র থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে তা নেই। ফলে কর্মজীবী মা বাধ্য হন শিশুকে বাইরের খাবার দিতে। এ সকল বিষয়ে সরকার ও সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে শুধু মুখে নয় কাজেও নারীর এগিয়ে যাওয়ার গতিকে বেগবান করবো।