বিয়ের বারো বছর পর
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৫৯
আজ আকাশ খুব মেঘলা। টিএসসির সামনে দিয়ে যাচ্ছি। হঠাত্ চোখের সামনে ভেসে উঠল বিয়ের পরের সেই দিনগুলোর কথা। যখন আমি আর ও মিলে একসাথে এক হোন্ডায় করে যেতাম অফিসে। আমাকে নামিয়ে দিয়ে ও চলে যেত ওর অফিসে। আমরা ফিরতামও একসাথে। এমন বর্ষায় প্রথম দিনে টিএসসিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। সময় বয়ে চলে তার নিজের বেগে, কেউ তার পথ রোধ করতে পারে না। এখন আমাদের বিয়ের প্রায় বারো বছর হতে চলল। আমাদের একমাত্র মেয়েকে নিয়েই আমাদের জীবন। সময়ের সাথে ব্যস্ততা বেড়ে চলেছে। জীবনে কোনো বৈচিত্র্য নেই। মনে হচ্ছিল আজকে সারাদিন কি করলাম? সেই এক নিয়মে অফিস। আর বাসায় গিয়ে রান্না করতে হবে, মেয়েকে পড়াতে হবে। ও যে কখন ফিরবে তার ঠিক নেই। খাওয়ার সময় একটু হয়ত কথা হয়, ওইটুকুই। ভেবে মনটা খুব খারাপ লাগছিল। এই স্বপ্নই কি আমরা দেখেছিলাম। বাড়ি গিয়ে মাত্র আমার মেয়েকে পড়ানো শুরু করেছি। হঠাত্ কলিংবেল বেজে উঠল। ভাবলাম এই সন্ধ্যায় কে এল? ওর তো ফিরতে অনেক দেরি হবে। খুলে দেখি দরজায় কদম ফুল হাতে ও দাঁড়িয়ে আর বাইরে হু হু বাতাস মেঘের গর্জন। যেন মনে হল, যেমন করে ও আগে বর্ষায় কদম তলায় দাঁড়িয়ে ফুলের মালা দিত, তেমনিভাবে আমরা কদম তলায় দাঁড়িয়ে আছি মালা হাতে। খোঁপায় মালা পরে, হাতে হাত ধরে তিনজন মিলে চলে গেলাম ছাদে। এই শহরে কোলাহলের মাঝেও বৃষ্টিতে ভিজে একটু মজা করে জীবনের মাঝে আনন্দ ফিরিয়ে আনতে। এক মুহূর্তেই মুছে গেল সকালের সব দুঃখ, ক্লান্তি। মনের মাঝে যে কালো মেঘটি জমেছিল তা বাতাসে ভেসে উড়ে গেল। দূর হয়ে গেল সেই একঘেয়েমি। কখনও একটু বেড়িয়ে, একে অপরকে সামান্য ফুল দিয়ে। কখনও বা নাটক দেখে নিজেদের জীবনে আনন্দ ধরে রাখার চেষ্টা আমরা করে চলেছি। অনেক সময় মেয়েকে আমার মায়ের কাছে রেখেও চলে যাই কবিতা আবৃত্তি শুনতে, গান শুনতে শুধু দু’জনে। আর তাই বিয়ের বারো বছর পরও দু’জন মিলে আমাদের জীবনের বৈচিত্র্য, একে অপরের প্রতি অনুভূতি এখনও ধরে রাখতে পেরেছি। এভাবেই মনের কথা তুলে ধরলেন ইতিহাসের অধ্যাপক শিরিন।
বিয়ের পরের চার-পাঁচ বছর দু’জন দু’জনকে বুঝতে বুঝতেই চলে যায়। বিয়ের দশ বারো বছর পর, একই নিয়মে দু’জনের জীবন যখন চলতে থাকে। কর্মব্যস্ততার সাথে সংসারে দায়িত্বও বাড়তে থাকে। জীবনযুদ্ধে লড়তে লড়তে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। জীবনে ভালোবাসার সেই অনুভূতিগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। নানা বিষয়ে মত-দ্বিমতের কারণে অনেক সময়ই সম্পর্কে চিড় ধরতে থাকে। একজনের কাছে অপরজনের ভালো দিকগুলোর চেয়ে শুধু খারাপ দিকগুলোই চোখে পড়ে। যেহেতু জীবন খুঁজে বৈচিত্র্য, তাই নানা পথেও মন চলে যায়। কখনও বা পরনারী বা পর পুরুষের প্রতিও মন ঝুঁকে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে জীবনে বিয়ের সময়ের সেই আনন্দ ও বৈচিত্র্যকে ধরে রাখতে কি করণীয়। সে সম্পর্কে জানতে বিভিন্ন তরুণ-তরুণীর আদর্শ, যারা ভবিষ্যতে তাদের মতো সুখী জীবনই গড়তে চায়, এমন দুই জুটির সাথে কথা হচ্ছিল-
পল্লব-প্রমার বিয়ে প্রায় ১৪ বছরের বেশি হতে চলল। পল্লব একটি কলেজে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে রয়েছেন। তিনি বলেন, আমার আর ওর বিয়ের আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক। তাই আমরা দু’জন দু’জনকে চিনি এবং একে অপরের বন্ধু আরও বেশি বছর ধরে। এপর্যন্ত চলার পথে বহু গল্প, কবিতা, নাটক আমাদের জীবনের সঙ্গী হয়ে রয়ে গেছে। আমরা এখন চারজনের পরিবার। আমাদের এক মেয়ে এক ছেলে। পরিবার যত বড় হয়েছে সংসারের প্রতি দায়িত্বও আমার তত বেড়েছে। তাই বেড়েছে চাহিদা, বেড়েছে কাজের চাপ। তবু এর মাঝেও আমাদের জীবন বৈচিত্র্যময়। কেননা জীবন মানেই পরিবর্তনশীল, মানুষও পরিবর্তনশীল। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখনও আমরা একে অপরকে চিনছি নতুনরূপেই। তবে জীবনের আনন্দ, অনুভূতি ধরে রাখতে কিছুদিন পরপরই আমরা বেরিয়ে পড়ি ঘুরতে। দিনাজপুর, সিলেট, রংপুর, রাঙামাটি... এসব নানা জায়গায় পাহাড়, নদী, প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাই সবাই মিলে, ভুলে যাই জীবনের সব ব্যস্ততা। আমাদের দু’জনের সংসারে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি হয়ে প্রথম এসেছিল আমাদের মেয়ে। তখনো আমরা দু’জন মিলে যেমন ওকে সঙ্গ দিয়েছি, তেমনি ভুলে যাইনি আমাদের আগের জীবনকেও। তাই এখনো আমরা চলে যাই শিল্পকলা একাডেমীসহ আরও নানা জায়গায় গান শুনতে, নাটক দেখতে, শুধু দু’জনে। চারুকলায় বসে দু’জন মিলে কবিতা আবৃত্তি করতে করতে পুরনো সেই ভুবনে ফিরে যাই। আমরা একজন আরেকজনকে বুঝি। আমরা একজন আরেকজনের বন্ধু। কখনো কোনো ছুটির দিন, আমি আমার ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গেলে ও হয়ত বাচ্চাদের রাখে। কখনও ওর স্কুল বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গেলে আমিও একা বাচ্চাদের দেখি। ও শুধু জীবনে সঙ্গ দেয়াই না আমার আনন্দের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করে আবার আমিও করি। আমার খুশি ওর কাছে গুরুত্বপূর্ণ আর ওর খুশি আমার কাছে। সেটা আমরা যখন অনুভব করতে পারি, তখন তা আমাদের মধ্যেকার দূরত্বকে দূর করে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। জীবনকে নতুন করে উপভোগ করতে শেখায়। এভাবেই বহু বছর ধরে আনন্দে কেটে যাচ্ছে আমাদের সংসার।
তেমনি আরেক জুটি সোহানা-আশিক। ওদের বিয়ের প্রায় এগারো বছর হতে চলল। সোহানা বলেন, আমাদের পরিবার থেকেই বিয়ের আয়োজন করা হয়। তাই বিয়ের সময় আমরা অনেকটাই ছিলাম একে অপরের কাছে অজানা। একজন আরেকজনকে বিয়ের পরেই বুঝেছি, অনুভব করেছি। ওর সরকারি বদলির চাকরি। কখনো এ জেলায় তো কখনো অন্য জেলা। আমার চাকরি ঢাকার ব্র্যাকে। তাই মাসের অনেকটা সময়ই আমাদের থাকতে হয় আলাদা। দু’জনই তাই এখনও তীর্থের কাকের মত চেয়ে থাকি ছুটির দিনটির দিকে। ও এখন কুমিল্লায়। প্রতি সপ্তাহেই চলে আসে। কখনও আমিও চলে যাই অফিসের কাজে কুমিল্লায়। আমাদের মধ্যেকার এ দূরত্বও আমাদের জীবনের মাঝে এক বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে। মাঝে কয়েক বছর ও ছিল ঢাকায়। সে সময়টাকে আমরা সেভাবে উপভোগ করেছি। প্রতিদিনই বেড়ানো, গল্প, নাটক, গান শোনা চলেছে। ওকে যদি সবসময় কাছে পেতাম তবে আমি কাছাকাছি একসাথে থাকার এ আনন্দ উপভোগ করতে পারতাম না। তাই দূরত্বও অনেক সময় দু’জনকে খুব কাছাকাছি এনে দেয়। প্রতিদিনই ফোন আমাদের যোগাযোগের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আমাদের একমাত্র ছেলের স্কুল ছুটি থাকলে বাবার কাছেও গিয়ে থাকে। তাই ওর জীবনও বৈচিত্র্যময়। ও আমার কথা ভেবে, আমার চাকরির কথা ভেবে কিছু সময় একা কাটাচ্ছে। আবার আমিও ওর জন্য। আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব আমাদের মধ্যকার জীবন বন্ধনকে আরও নিবিড় করেছে।
ছবি: কে-ক্রাফট