কংগ্রেস উদ্ধারে সামনে আসছেন প্রিয়াঙ্কা?

ভারতের সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের। এই পরাজয়ের কারণ খুঁজতে চেষ্টা হয়েছে দলের ভেতরে-বাইরে। পুরনো নেতৃত্ব নাকি নতুন প্রজন্মের সাংগঠনিক দুর্বলতা এ পরাজয়ের কারণ? এমন প্রশ্নের উত্তর সব সময় খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। কংগ্রেস সরকারের জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্নীতির অভিযোগ পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিলো এটা সত্যি তবে তরুণ নেতা রাহুল গান্ধী জনগণের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে পারেননি। অনেক ভোটার মনে করেন রাহুল সুবিধাপ্রাপ্ত, উদাসীন এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ কারণে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বকে অনেকে দায়ী করছেন। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে গান্ধী-নেহেরু পরিবার। কংগ্রেসকে মানুষ চিনেছে গান্ধী-নেহেরু পরিবারের দল হিসেবে। এই নির্বাচনের পরাজয় তবে কি গান্ধী-নেহেরু পরিবারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে? হয়তো অনেকেই এটা মনে করছেন। তবে বিশ্লেষকদের মত, এক্ষেত্রে অনেকটাই ভিন্ন। ভারতের বর্ষীয়ান সাংবাদিক ইন্দার মালহোত্রার মতে, এ পরাজয়ে কংগ্রেস ধ্বংস বা অদৃশ্য হয়ে যাবে না। পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দলের রয়েছে। আর গান্ধী পরিবার ছাড়া অন্য কেউ কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে না। তাদের বাইরে কারো নেতৃত্ব মেনে নিতে কংগ্রেস নেতারাও রাজি নন। তাহলে রাহুল গান্ধীই কী পরিবার আর কংগ্রেসের কর্ণধার? অনেকেই বলছেন, উল্টো কথা। বলছেন, রাহুল নেতা হিসেবে আকৃষ্ট করতে খুব কমই পেরেছেন। গত ১০ বছরে পার্লামেন্টে তিনি কমই কথা বলেছেন। তার বক্তব্য ক্ষমতায়ন, উন্নয়নের মতো শব্দে ভারি। যা ভারতের জনগণকে তেমন একটা আর্কষণ করে না। এ অবস্থায় রাহুল গান্ধীর ওপর ভরসা করতে পারবে কী কংগ্রেস? হয়তো এমন চিন্তা কংগ্রেসের মধ্যেও কাজ করছে। দলের ভেতরে কিছু অস্বস্তিও আছে। অনেকেই চাইছেন রাহুল নয় তার বোন প্রিয়াঙ্কা দলের নেতৃত্বে আসুক। এর কারণ ভাই রাহুল গান্ধীর চেয়ে বয়সে দুই বছরের ছোট হলেও ভারতের রাজনীতিতে তাকে অনেক বেশি সহজাত বলেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে। গত মে মাসের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিজেপিকে লক্ষ্যবস্তু করতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। শেষ সময়ে এসে কিছু জাতীয় ইস্যু ও বিজেপিকে লক্ষ্য করে বক্তব্য দেয়ায় নতুন করে কংগ্রেসের জোয়ার তুলেছেন তিনি। যদিও নির্বাচনে তিনি শুধু মা সোনিয়ার রায় বরেলি ও ভাই রাহুল গান্ধীর আমেথি আসনে প্রচারণা চালান। প্রচারণায় নামার আগে রাহুল গান্ধীর প্রচারণা দপ্তরে অনেক বেশি সময় দিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। যে কারণে তার ভূমিকা অনেক বেশি তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে উঠে কংগ্রেসে। তার আগ্রাসী প্রচারণা, মুগ্ধকর বক্তব্যে শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদ প্রিয়াঙ্কাকেই দেখতে পেয়েছিলো ভারতীয়রা। কংগ্রেসের ভরাডুবির পর কংগ্রেসে নানামুখি হিসাব নিকাশ হয়েছে। এখন অনেকেই রাহুলের চেয়ে প্রিয়াঙ্কাকেই নেতৃত্বে দেখতে আগ্রহী। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের সঙ্কট শিগগিরই হয়তো কাটতে চলেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধীর মেয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকে দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। দলটির তিনজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রিয়াঙ্কার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে যেসব বিকল্প আলোচনা টেবিলে উঠে আসছে, সেগুলোর মধ্যে আছে, তাকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বা কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশ শাখার প্রধানের দায়িত্ব দেয়া। যদি তিনি এর কোনোটির দায়িত্ব নিতে চান, তবে কেউই সম্ভবত প্রতিবাদ জানাবেন না। প্রিয়াঙ্কা শিগগিরই দলে সক্রিয় হচ্ছেন বলে প্রচারণা চালিয়ে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এলাহাবাদে পোস্টার লাগানো হয়। এতে বলা হয়, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিও (বিজেপি) কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহর প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করাতে হলে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রিয়াঙ্কার কথাই ভাবতে হবে। ভারতের কংগ্রেস দলও জানায়, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী শিগগরিই রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার দলের মুখপাত্র শোভা জানান, লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পরই কথা ওঠে দলে নেতৃত্বের রদবদল নিয়ে। কথা বেশি হয় প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে ঘিরে। এমনও বলা হচ্ছিল, দুর্বল নেতৃত্বের কারণে বোন প্রিয়াঙ্কার কাছে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ হারাতে পারেন রাহুল গান্ধী। তবে গত বৃহস্পতিবার সেই সম্ভাবনা নাকচ করে কংগ্রেস জানিয়েছে, কাউকে সরিয়ে নয়, গান্ধী পরিবারের তিনজনকেই নেতৃত্ব দিতে চায় কংগ্রেস। কিন্তু এর একদিন পরই গত শুক্রবার প্রিয়াঙ্কা গান্ধী জানান, এই ধরনের তথ্য ভিত্তিহীন এবং অনুমানমূলক। এক বিবৃতিতে প্রিয়াঙ্কা বলেন, তিনি কংগ্রেসের কোনো পদেই দায়িত্ব গ্রহণ করছেন না। এ ধরনের খবর সত্য নয়, এটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। নির্বাচনে প্রচারণার সময়ও তিনি বলেছিলেন, দলে কোনো পদ নেয়ার ইচ্ছা তার নেই। শুধু দুটি আসনেই তার প্রচারণা চলবে। প্রিয়াঙ্কা যোগ দিলে কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে আস্থাহীনতার দানা বেঁধেছে তা হয়তো কেটে যাবে। নির্বাচনে পরাজয়ের ব্যর্থতা কাটিয়ে হয়তো দলটি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।