যে দেশের পার্লামেন্টে মন্ত্রীরা বেঘোরে ঘুমান
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৪, ২১:৪৭
দৃশ্যটা কল্পনা করুন-সংসদের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন চলছে আর গুরুত্বপূর্ণ সে সময়টাতে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন সব ক’জন মন্ত্রী-এমপি। বাদ যাচ্ছেন না প্রেসিডেন্টও। তিনিও সুযোগ বুঝে দিচ্ছেন ঘুম। অধিবেশনের সময় ঘুমের কারণে উগান্ডার পার্লামেন্ট এখন নাম পেয়েছে ‘ঘুমন্ত পার্লামেন্ট’। সম্প্রতি এ আজব দৃশ্য প্রচার হবার পর আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরের শিরোনাম হয়েছে উগান্ডার পার্লামেন্ট। মন্ত্রী-এমপিদের ঘুমের ছবি দেখে দেশের জনগণের অনেকে বিশ্বাসই করতে পারছেন যে এ ছবিটা ‘আসল’। অনেকে ভাবছে এটা কারসাজি করে বানানো ছবি। নাহলে পার্লামেন্টে সবাই ঘুমায় কি করে! কিন্তু ঘুমন্ত জনপ্রতিনিধিরা এখন উগান্ডার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এমন আজব দৃশ্য দেখে সাংবাদিকরাও সেই মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করেননি। দ্রুত ক্যামেরাবন্দী করে ফেলেছেন ঘুমন্ত মন্ত্রী-এমপিদের ছবি।
উগান্ডার মন্ত্রী-এমপিরা তাদের এই ঘুমকাতুরে স্বভাবের পরিচয় এর আগেও বেশ কয়েকবার দিয়েছেন। শুরুটা হয়েছিল বছর চারেক আগে-জাতির উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট জোয়ারি মুসেভানি’র ভাষণদানকালে। দেখা গেল প্রেসিডেন্ট আবেগভরে তার ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন, আর সভাস্থলে উপস্থিত প্রায় সব কজন মন্ত্রী-এমপি আরামে বসে বসে ঘুমাচ্ছেন। সাংবাদিকরাও সুযোগটা লুফে নেন। মজার সেই ছবি তুলে ট্যাবলয়েড পত্রিকায় ছেপে দেন তারা। ছবির নিচে দেয়া সেদিনের সবচে গরম খবরের শিরোনাম ছিল-‘ঘুমন্ত জাতি’। সেই ঘটনার পর থেকেই সাংবাদিকরা সারাক্ষণ সুযোগ খুঁজেছেন বাজেট বক্তৃতাসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষণদানকালে মন্ত্রী-এমপিদের ঘুমন্ত মুখশ্রীর ছবি তুলতে। আর সেই সুযোগ তাদের মিলেও গেছে বার বার।
বাজেট বক্তৃতা বা প্রেসিডেন্টের ভাষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মন্ত্রী-এমপিদের এই নিদ্রাপ্রীতি নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলেছেন। মিডিয়া বিষয়টির কঠোর সমালোচনা করে যাচ্ছে, কেউ কেউ আবার এর অন্য ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছেন। সানডে মিররের কলাম লেখক বার্নার্ড ট্যাবায়ার এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘ঘুম এমনিতে খারাপ কিছু নয়, তবে কাজের সময় ঘুমানোর বিষয়টি অবশ্যই নিন্দনীয়। আমার জানা মতে ঘুমকাতুরে মন্ত্রী-এমপিদের কোন পরিসংখ্যান এখনো হয়নি, তবে এবারে প্রেসিডেন্টের বার্ষিক ভাষণের সময় যতজন ঘুমিয়েছেন, গত পাঁচ বছরের মধ্যে নিঃসন্দেহে তা সবচে বেশি।’
১৯৮৬ সালে মুসেভেনি উগান্ডার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর স্থানীয় সরকারের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রফেসর এডওয়ার্ড কাকোঙ্গে বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন সবকিছুই ছিল খুব উত্তেজনাকর এবং দেশ গড়ার সেই কর্মমুখর সময়ে ঘুমানোর কোন সুযোগই ছিল না। কিন্তু এখন এই ঘুমন্ত লোকজনদের দেখে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে উত্তেজনা অবশিষ্ট নেই, সবকিছুই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছে।’
বিরোধী দলের এমপি বেটি নামবুজি (৪৫) বিষয়টির আবার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, বয়সের ভারেই রাজনীতিবিদরা ক্রমেই ঝিমিয়ে পড়ছেন, যার প্রতিফলন পার্লামেন্টে দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, তারা এতই বুড়ো হয়ে গেছেন যে তাদের মনঃসংযোগে ভাটা পড়ছে, তারা ঘুমিয়ে পড়ছেন।
উল্লেখ্য, পার্লামেন্টে ঘুমের জন্য খ্যাত সহকারী প্রধানমন্ত্রী মোসেন আলীর বয়স ৮০ বছর ছুঁই ছুঁই করছে। প্রেসিডেন্ট মুসেভানির বয়সও এ বছরের সেপ্টেম্বরে ৭০ পূর্ণ হবে। মজার ব্যাপার হলো তার ক্ষেত্রেও পার্লামেন্টে বাজেট বক্তৃতার সময় ঘুমিয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।
এমপি নামবুজি পার্লামেন্ট সদস্যদের ঘুমিয়ে পড়ার আরো একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, প্রেসিডেন্টের নতুন কিছু বলার নেই। তার সহকর্মীরা আগে থেকেই জানেন, তিনি কী বলবেন। তাই তারা নেতার কথা শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাদের চোখে নেমে আসে ঘুম। নামবুজি প্রশ্ন তোলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রীবর্গ যদি পার্লামেন্টে তাদের নেতার কথাই মনোযোগ দিয়ে না শোনেন, তাহলে তারা তাদের মন্ত্রণালয়ের আমলাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে কী করে শুনবেন?’
তবে সরকারের মুখপাত্র রোজ নামাইয়ানজা এমপি নামবুজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকারি যন্ত্র কিভাবে কাজ করে সেটা আসলে নামবুজি জানেন না। মন্ত্রিসভার ঐ সিনিয়র সদস্যরা, যাদের প্রতি তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন, সরকারি কাজে ও নীতি নির্ধারণে তাদের বিশাল অবদান রয়েছে। আর এ সমস্ত কাজ করতে গিয়ে চিন্তায় মাঝে মাঝে চোখ বুজে আসাটা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তবে মন্ত্রী-এমপিদের ঘুমিয়ে পড়া নিয়ে সবচে মজার কথা বলেছেন মুসেভেনি সরকারের আরেক কঠোর সমালোচক ম্যাথিয়াস এমপুগা। ২০১১ সালে মুসেভেনি পুনর্নির্বাচিত হবার পর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ম্যাথিয়াস বলেন, ‘পার্লামেন্টে মন্ত্রী-এমপিরা ঘুমিয়ে পড়ছেন, এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? মুসেভেনি তো জাতিকে প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন যে তার আমল হবে ‘ঘুমের আমল’। তিনি উগান্ডার মানুষকে এখন সেই ঘুমই সরবরাহ করে চলেছেন।’ উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন ক্ষমতাচ্যুত হবার পর পরবর্তী ছয় বছরে ছয়বার ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। দেশে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। ১৯৮৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি বলেছিলেন, তিনি দেশ থেকে সহিংসতা দূর করে শান্তির ঘুম এনে দেবেন।