ভোলা জেলার চিত্র

সংকটাপন্ন রোগীদের জরুরি সেবা প্রায় অসম্ভব

সন্ধ্যা নামলেই ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ভোলার বিভিন্ন উপজেলায়। রাতের বেলা কোন নৌযান ছেড়ে যায় না এই উপজেলাগুলো থেকে। হঠাত্ কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে কিংবা কারো জরুরি চিকিত্সা সেবা দরকার পড়লে অপেক্ষা করতে হয় ভোর পর্যন্ত। বলা চলে, প্রতীক্ষা করতে হয় মৃত্যুর। জরুরি রোগী পরিবহনে কাগজে কলমে সাতটি উপজেলার জন্য রয়েছে একটি নৌঅ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু সর্বশেষ কবে এটি চলেছে, বলতে পারেনি কেউ। হার্ট অ্যাটাক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে বলতেই পারবে না রোগী বা রোগীর স্বজনরা কি হয়েছে। আর জানলেও কিছু করার নেই। পুরো জেলায় একজনও হূদরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। আর সন্ধ্যার পর হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হলে তো কথাই নেই, নিশ্চিত মৃত্যু। গর্ভবতী নারীদেরও ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। জটিল কোন পরিস্থিতি তৈরি হলে দেয়া যায় না আধুনিক সেবা। এসব রোগীর ধারেকাছে সর্বাধুনিক সেবা প্রদান করা হয় বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে তাত্ক্ষণিক রোগী নেয়া যায় না নৌঅ্যাম্বুলেন্সটি বন্ধ থাকায়। জেলার সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, এটি বন্ধ রয়েছে জনবল ও অর্থ বরাদ্দ না থাকায়। ভোলা সদর হাসপাতালে সংকটাপন্ন রোগীদের করোনারী কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ), ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটসহ (আইসিইউ) জরুরি পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা ব্যবস্থা নেই। নেই কোন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পাঁচটি সাবসেন্টার ও ২২১টি কমিউনিটি ক্লিনিকেও একই অবস্থা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। আছে সিজিরিয়ানসহ ছোট খাট অপারেশন ব্যবস্থা। কিন্তু অজ্ঞানকারী চিকিত্সক ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ জনবলের তীব্র অভাব রয়েছে। এসব কারণে অপারেশন বন্ধ। জেলায় সরকারিভাবে মঞ্জুরিকৃত চিকিত্সকদের পদের সংখ্যা ২০৬টি। এর মধ্যে কর্মরত আছে মাত্র ৫৩ জন চিকিত্সক। নার্স সংকটও তীব্র। যারা আছেন তাদের অনেকেই কাগজে আছেন, কিন্তু কর্মস্থলে নেই। জেলা সদরের প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো চলে এসব চিকিত্সকদের উপর। সরকারি হাসপাতালে রোগীরা চিকিত্সকদের দেখা না পেলে প্রাইভেট ক্লিনিকে ঠিকই পাচ্ছেন। অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া যায়। ভোলা সদর হাসপাতাল ভোলা সদর হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত ১০টি কনসালটেন্ট পদের মধ্যে ৬টি পদই শূন্য। অপারেশন থিয়েটার থাকলেও অপারেশন খুব একটা হয় না । এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। অভিযোগ আছে, কিছু কিছু ডাক্তার হাসপাতালে অপারেশন না করে ক্লিনিকে অপারেশন করতে পছন্দ করেন। এ হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত ৪৯ জন নার্সের মধ্যে ৭টি পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণী কর্মচারীর ১৩টি ও ৪র্থ শ্রেণীর ৫টি পদ শূন্য। চিকিত্সকদের ১২টি পদের মধ্যে ৯টি পদই শূন্য। এর মধ্যে কিছু কিছু ডাক্তার বদলির চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন। তবে ওষুধপত্রের সরবরাহ সন্তোষজনক বলে রোগী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা গেছে। খাবার ও ডিউটি রেজিস্ট্রারসহ হাসপাতালের উন্নয়ন কার্যক্রম সিভিল সার্জন নিজে তদারকি করেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেন। তবে বর্তমানে ১শ’ শয্যা হাসপাতালটিতে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে বিধায় চিকিত্সা কার্যক্রমে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। হাসপাতাল ঘিরে দালাল চক্রের উত্পাত রয়েছে । ২/১ জন ডাক্তারের বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিত্সার দিকে ঝোঁক বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন শতাধিক রোগী আসে। তাদের চিকিত্সা দেয়ার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ভোলা সদর উপজেলা ভোলা সদর উপজেলা কমপ্লেক্সে ১৫টি চিকিত্সক পদের মধ্যে ১০টি পদই শূন্য। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি একটি পুরনো ভবনে। নেই একজন নার্সও। তৃতীয় শ্রেণীর ১০৯টি পদের মধ্যে ১৪টি শূন্য। তবে এখানে টিকাদান কর্মসূচিসহ অন্যান্য কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবেই চলছে। মনপুরা:ভোলার সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত মনপুরা উপজেলা। ৩১ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে নামেই ৫০ শয্যায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। এখানে ভবন নির্মিত হলেও চিকিত্সা সেবা তেমন পান না রোগীরা। ৫০ শয্যার লোকবল তো দূরের কথা পুরনো ৩১ শয্যার অনুপাতেই চিকিত্সক নেই। একজন আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ও একজন মেডিক্যাল অফিসার লক্ষাধিক লোকের চিকিত্সা সেবা দিয়ে থাকেন। চার জন কনসালটেন্টের একজনও নেই। ৮ জন অন্যান্য চিকিত্সকের মধ্যে আছে মাত্র দুজন । ১১ জন নার্সের মধ্যে আছে মাত্র ৩ জন। আবার ডাক্তারসহ কর্মচারীরা ২/১ দিন ডিউটি করে কর্মস্থল ছেড়ে চলে যান। ডাক্তারদের মধ্যে অনেকেই এক দেড় মাস থেকে তদ্বির করে বদলি হয়ে চলে যান। চরফ্যাশন:চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবকাঠামো মোটামুটি ভালো হলেও বাথরুম কেবিন ও বেডগুলো দুর্গন্ধময়। এ হাসপাতাল ঘিরে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। মঞ্জুরীকৃত ১০ জন কনসালটেন্টের বিপরীতে আছে মাত্র ৩ জন। ২৬ জন চিকিত্সকের মধ্যে আছে মাত্র ৯ জন, নার্স মঞ্জুরীকৃত ১৫টি পদের মধ্যে আছে ১২ জন, ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী ১২৪ জনের মধ্যে আছে মাত্র ৯৭ জন। ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ২৩ জনের মধ্যে আছে ১৯ জন। এখানে ওষুধ সরবরাহ ভালো থাকলেও বিতরণে কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দক্ষিণ চর আইচা:এ ২০ শয্যার হাসপাতালটি চরফ্যাশনে অবস্থিত। এখানে ৫ জন ডাক্তারের মধ্যে আছে মাত্র ২ জন । ২য় শ্রেণীর (নার্স) ৪ জনের মধ্যে ১ জনও নেই । ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী ৭টি পদের মধ্যে আছে মাত্র ৩ জন । ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীর ১টি পদ শূন্য। খায়েরহাট:৩০ শয্যার এ হাসপাতালটি ভোলা সদরের দক্ষিণ দীঘলদিতে অবস্থিত। এখানে চিকিত্সক দুজনই আছেন। নার্স ৪ জনের স্থলে আছে ৩ জন। ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী ৪ জনের মধ্যে একজনও নেই। ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ১০ জনের মধ্যে আছে ৭ জন। এখানে হাসপাতাল ভবন ও আবাসিক ভবন বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠলেও বহু বছরের অযত্নে অবহেলায় ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে। তজুমদ্দিন:এখানে কনসালটেন্ট ৪ জনের মধ্যে ৪ জনই নেই। ডাক্তার ১০ জনের স্থলে আছেন ২ জন। নার্স ১০ জনের স্থলে আছে ৮ জন । ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী ৫০ জনের স্থলে আছে ৩২ জন। ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ১৯ জনের স্থলে শূন্য পদ ৪। এখানে ভবন থাকলেও চিকিত্সা সেবা তেমন একটা উন্নত নয়। তবে ওষুধ পত্রের সরবরাহ ও বিতরণ স্বাভাবিক রয়েছে। ডাক্তাররা অনেকেই থাকেন না। থাকলেও ছুটি নেয়ার প্রবণতা বেশি। দৌলতখান:অনেকটা জরাজীর্ণ ও অপরিচ্ছন্ন ভবনে এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অবস্থিত। এখানে ১০ জন কনসালটেন্টের মধ্যে ১০ জনই নেই। ২১ জন ডাক্তারের মধ্যে ৩ জন আছেন। নার্স ১৬টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৫টি। ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী ৮০ জনের মধ্যে শূন্য পদ ২৩টি। ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ২৩টি পদের মধ্যে আছে ১৯টি। বোরহানউদ্দিন:এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনটি পরিচ্ছন্ন হলেও এখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শয্যা নেই। সরকারি হিসাব মতে, মঞ্জুরীকৃত ১০ জন কনসালটেন্টের মধ্যে ৯টি পদই শূন্য। তবে অনেকের অভিযোগ প্রায়ই তাদের দেখা যায় না। ২১ জন ডাক্তারের মধ্যে আছে ৬ জন। ২য় শ্রেণীর (নার্স) ৩টি, ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী ৯৫টি পদের মধ্যে ১৯টি, ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ২২টির মধ্যে ২টি পদ শূন্য রয়েছে। লালমোহন:কনসালটেন্টের ৯ জনই নেই। অন্যান্য চিকিত্সক ২১ জনের মধ্যে ১৪টি পদ শূন্য । ২য় শ্রেণীর (নার্স) ১৬ জনের মধ্যে আছে ১২ জন, ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী ১২১ জনের মধ্যে ২৫টি পদ শূন্য, ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ২৬ জনের মধ্যে আছে ২২ জন। টিবি ক্লিনিক:এখানে কনসালটেন্টের পদ থাকলেও দীর্ঘদিন যাবত্ পদটি শূন্য। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ৮ জনের স্থলে আছে ৫ জন। ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ৭ জনের স্থলে ৭ জনই রয়েছে। একটি বহুপুরাতন জরাজীর্ণ ভবনে টিবি ক্লিনিকের কাজ চলে। সিভিল সার্জনের বক্তব্য ভোলার সিভিল সার্জন ডা. ফরিদ আহমেদ জানান, ভোলা সদর হাসপাতাল জনবল ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিত্সকের স্বল্পতা আছে। ভোলা যেহেতু একটি নদী বেষ্টিত দ্বীপ জেলা, সেহেতু রাতে গুরুতর রোগীদের চিকিত্সার জন্য বরিশাল, ঢাকা কোথাও নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। এখানে একটি নৌ-এম্বুলেন্স দেয়া হলেও জনবল নেই। সেটি চালু রাখার জন্যও অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ফলে এটি চালু করা যাচ্ছে না । অ্যানেসথেসিস্ট না থাকায় দুই বছর ধরে বড় ধরনের কোন অপারেশন হাসপাতালে করা হয়নি। বাইরে থেকে ডাক্তার এনে ছোট খাট অপারেশন মাঝে মধ্যে হয়। তিনি বলেন, হূদরোগের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। কার্ডিওলজি ইউনিটে কিছু যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু কার্ডিওলজিস্ট না থাকায় চিকিত্সা দেয়া যাচ্ছে না।