দক্ষিণাঞ্চলে প্রবল জোয়ার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৪, ২২:৩২
এবারের পূর্ণিমায় বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী দেশের দক্ষিণাঞ্চল অস্বাভাবিক জোয়ারের কবলে পড়েছে। প্লাবিত হয়েছে নগর-শহর ও পল্লীর বিস্তীর্ণ জনপদ। দুঃসহ দুর্ভোগের কবলে পড়েছে হাজারো বিপন্ন নারী-পুরুষ-শিশু।
মংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা: পশুর নদীর জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে মংলা পৌরশহর ও শহরতলী। শহরের গরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ স্থাপনা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত। গত রবি ও সোমবার দুই দিনে পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ারে পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদী-খাল উপচে ও ড্রেন দিয়ে ঢুকে মংলা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও শহরতলীর নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। শহরের শেখ আব্দুল হাই সড়ক, কুমারখালী, মাদ্রাসা রোড ও কবরস্থান রোডসহ প্রধান প্রধান সড়ক কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে বাড়িঘর। নদীর পানি বেড়ে তা শহরে ঢুকে পড়ার পাশাপাশি ফেরিঘাট, খেয়াঘাট প্লাবিত হয়ে পণ্যবাহী ট্রাক, বাসসহ চরম জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। শহরের দোকানপাট, রাস্তাঘাট দুপুর থেকে বিকাল নাগাদ পানিতে ডুবে থাকে। যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দোকনপাটগুলোতে বেচা-কেনায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় ভাঙ্গা জায়গা ও ড্রেন দেখতে না পারায় যানবাহন এবং লোকজনের চলাচলে ভোগান্তি বেড়েছে।
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা: ভোলার চরফ্যাশনে নদীভাঙ্গনে চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের সাড়ে ৪ কিমি বিলীন বেড়ীবাঁধ পুনঃনির্মাণ না করায় লঘুচাপ আর পূর্ণিমার প্রভাবে রবিবারের জোয়ারে চরফ্যাশন উপজেলার ৪৫টি গ্রাম আবারো প্লাবিত হয়েছে। গত দুইদিনের প্রবল জোয়ারে গ্রামে বসতঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হওয়ায় লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। আগামী এক সপ্তাহকাল এ প্লাবন স্থায়ী হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সরেজমিনে মাদ্রাজ ঘুরে দেখা গেছে, গত রবিবারের চেয়ে গতকাল সোমবার জোয়ারের পানি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। শত শত বসতভিটা, রাস্তাঘাটের উপর দিয়ে জোয়ারের পানি গড়িয়ে পড়ছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আবারো পানি বন্দী হয়ে পড়েছে গ্রামের মানুষ।
প্লাবিত এলাকার জন প্রতিনিধিরা জানান, জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর, হামিদপুর, চর নিউটন, চর আফজাল, পূর্বমাদ্রাজ, মিয়াজানপুর, চর নাজিম উদ্দিন ১ ও ২নং ওয়ার্ড, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর কুকরী মুকরী ও চর পাতিলার সব কয়টি গ্রাম, আসলামপুর ইউনিয়নের আয়েশাবাগ ও আসলামপুর, জাহানপুর ইউনিয়নের ওমরাবাজ ও জাহানপুর এবং হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব হাজারীগঞ্জ এবং হাজারীগঞ্জ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চর কুকরী মুকরী ইউপি চেয়ারম্যান হাসেম মহাজন জনান, তার ইউনিয়নের সবকয়টি গ্রামই জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। লোকজন আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। জোয়ারের পানি বাড়তে থাকায় চরফ্যাশন সদরের জনগণের মাঝেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
চরফ্যাশন সদরসহ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় আতঙ্কের মাঝে দিন যাপন করছেন।
গলাচিপা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা :গলাচিপা উপজেলা রতনদী তালতলী ইউনিয়নের ৫৫/১ নং পোল্টারের বেড়িবাঁধে দুই পয়েন্টে বিধ্বস্ত হয়ে গত তিনদিন ধরে জোয়ারের পানিতে নিজহাওলা ও গ্রামর্দন, বন্যাতলীসহ বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তিন গ্রামের বাড়ি-ঘর, পুকুর, মাছের ঘের, বীজতলা তলিয়ে গেছে। তিন হাজার মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার এবং কৃষি কাজে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ।
পূর্ণিমার জো এর প্রভাবে গলাচিপা উপজেলার রতনদী তালতলী ইউনিয়নের ৫৫/১ নং পোল্টারের বেড়িবাঁধে ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বদনাতলী লঞ্চঘাটের উত্তর পাশে নিজহাওলা গ্রামের বেড়িবাঁধ প্রায় ৭ শত ফুট এবং গ্রামর্দন গ্রামের নতুন বেড়িবাঁধ ৩ শত ফুট বিধস্ত হয়ে বুড়াগৌরঙ্গ নদীর লোনাপানি প্রবেশ করে। এতে ওই তিনটি গ্রামের বসতঘর, বাড়ি, পুকুর, মাছের ঘের ও বীজতলা তলিয়ে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়। নিজহাওলা গ্রামের আমেনা বিবি (৪৫) ও লুত্ফা বেগম (৬০) জানান, তাদের রান্না বান্না করে খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। ঘরে পানি উঠেছে। গ্রামর্দন গ্রামের মত্স্য চাষী গিয়াস উদ্দিন জানান, ৪টি পুকুর ও ২টি ঘের তলিয়ে গিয়ে রুই, কাতলা ও চিংড়ি মাছ ভেসে গেছে। এতে ৩ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে। এলাকার পানের বরজে পচন ধরেছে।
বাগেরহাটের শরণখোলায় ভোলা নদীর ভাঙ্গনে
৬টি দোকান ও ২টি বসতবাড়ি নদীতে বিলিন
বাগেরহাট ও শরণখোলা প্রতিনিধি:সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের খুড়িয়াখালী বাজারের ৬টি দোকান ও দুটি বসতবাড়ি সোমবার দুপুরে ভোলা নদীর ভাঙ্গনে নদীতে সম্পূর্ণ বিলিন হয়ে গেছে। এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে নদী সংলগ্ন ওই বাজারে শতাধিক দোকান, শতাধিক বসতবাড়ি ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যে কোনো মুহূর্তে তা বিলিন হওয়ার আশঙ্কা করছে এলাকাবাসি। এঘটনার পর বাজারের ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নদী লাগোয়া দোকান ও বসতবাড়ি ভেঙে সরিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। গত ১০ বছরে বগী-শরণখোলা নদীতে বিলিন হয়েছে ৫ শতাধিক বসতবাড়ি, বগী বন্দর, মসজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
এলাকাবাসি জানায়, মৃত মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম তালুকদারের ১০ কাটা জমির বসত বাড়িটি সম্পূর্ণ বিলিন হয়ে গেছে। সবকিছু হারিয়ে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী আমেনা বেগম (৬০) ও তার বাক প্রতিবন্ধী ছেলে জাকির হোসেন বিলাপ করছে। এছাড়া সেলিম খানের একটি বসতঘর ও একটি মাছের ডিপো ঘর, পান্না আকন, পনু কবিরাজ এবং জালাল মোল¬ার মুদি দোকান সম্পূর্ণ নদীগর্ভে চলে যায়। আংশিক ভাঙনের শিকার ক্ষিতিশ, ধলু হাওলাদার, কামরুল খান, রুস্তম মুন্সী তাদের দোকান ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী আমেনা বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘মোর সব কিছু শ্যাষ ওইয়া গ্যাছে। কিছুদিন আগে মোর স্বামী গ্যাছে। এহন বাড়িডাও (বাড়িটি) নদীতে লইয়া গেল। কাইল মঙ্গলবার মোর ছোড মাইয়াডার বিয়া। হেয়াও আল¬ায় ওইতে দিলনা’।
প্রত্যক্ষদর্শী ওই বাজারের ব্যবসায়ী ইউসূফ মেকার, মামুন হাওলাদার, জাফর খান, সলেমান হাওলাদার, ফেরদৌসহ অনেকেই জানান, তারা সকাল ১০ টার দিকে বিকট শব্দ শুনে নদীর পাড়ে ছুটে যান। তারা মুহূর্তের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার বাড়িটি নদীতে তলিয়ে যেতে দেখেন। ১০ কাটা জমি, ঘরবাড়ি, গাছপালা চোখের পলকে বিলিন হতে দেখে তারা হতবাক হয়ে পড়েন। এরপর একে একে দোকানগুলোও নদীতে তলিয়ে যায়। দুপুরে আরও একটি দোকান বিলিন হয়। এছাড়া বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় মেম্বার আব্দুর রাজ্জাক জানান, তিনি ঘটনার পর পরই বাজারে এসে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধার পরিবারটির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। বাজারে সবাই আতঙ্কে আছেন।
সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদর চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হোসেন জানান, ওই এলাকার মানুষ প্রতি বছরই কমবেশি নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছে। আজকের বগী-শরণখোলা নদীটি একসময় খাল ছিল। ভাঙনের ফলে সেটি এখন নদীতে পরিনত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের এক সময়কার প্রসিদ্ধ বগী বন্দরটির এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এক হাজারেরও বেশি বসতবাড়ি বিলিন হয়েছে।