শেষ বিদায় হলো না ৬১ হতভাগ্য যাত্রীর!

পদ্মায় ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ লঞ্চের হতভাগ্য ৬১ যাত্রী শেষ পর্যন্ত নিখোঁজই রয়ে গেলেন। এদের শেষ বিদায়ও দিতে পারলেন না স্বজনরা। লাশের জন্য স্বজনদের অপেক্ষার প্রহর আর কোন দিনই শেষ হবে না! গতকাল লঞ্চ শনাক্ত ও উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণার পরও স্বজনরা লাশের সন্ধানে পদ্মার ভাটি অঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন। কেউ কেউ অপেক্ষা করেছেন শিবচরের পাঁচ্চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। যদি প্রিয়জনের লাশটি পাওয়া যায়। ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ ৬১ জনের বেশির ভাগই ছিলেন লঞ্চের কেবিনে। এদের প্রায় ৮০ ভাগই নারী ও শিশু। শরীয়তপুরের আলী জব্বার জানান, লঞ্চ ডুবে যাওয়ার আগ মুহূর্তে লঞ্চের স্টাফরা নারী যাত্রীদের কেবিনের ভিতর থেকে বের হতে দেননি। তারা কেবিনের দরজা বন্ধ করে দেন। এনিয়ে লঞ্চের স্টাফদের সঙ্গে তার হাতাহাতিও হয়েছিল। তার চোখের সামনে স্ত্রী জাহানারা বেগম ও দুই মেয়ে হালিমা (২০) ও তানজিমা (১০) কেবিন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে, তাদের জোর করে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন এক স্টাফ। লঞ্চ ডুবে গেলে তিনি ও তার ছেলে অপু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এখনও তিনি তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ খুঁজে পাননি। গতকাল গোপালগঞ্জের মোকসেদপুর থানার বামনডাঙা গ্রামে মাহমুদা বেগমের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি জানান, বোন ও ভাগ্নের লাশের জন্য মাওয়া থেকে বরিশাল পর্যন্ত নদীতে হন্য হয়ে খুঁজেছেন। বেওয়ারিশ লাশগুলোতে তার বোন ও ভাগ্নের লাশ আছে কিনা তা খুঁজতে তিনদিন অবস্থান করেছেন পাঁচ্চর বিদ্যালয় মাঠে। লঞ্চ শনাক্ত ও উদ্ধার অভিযান সমাপ্তি ঘোষণার পরও তিনি লাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্তত লাশ পেলে তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারবেন। পঞ্চগড়ের সাজু ও বাবু গতকালও মাওয়ায় পদ্মার ভাটি অঞ্চলে ট্রলারে করে নিখোঁজ বোন শেফালী আক্তার পলি ও ৭ বছরের ভাগ্নি মেঘলার লাশ খুঁজেছেন। মোবাইল ফোনে বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘গত ২৭ জুলাই গাবতলী বাস টার্মিনালে তার বোন ও ভাগ্নিকে গোপালগঞ্জে যাওয়ার জন্য একটি বাসে তুলে দেন। বাসে তুলে দেয়ার সময় শেফালী তাকে বলেছিল, ভাই শ্বশুর বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর আপনার সাথে কিছু কথা আছে।’ লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পর সেই কথা তিনি আজও জানতে পারলেন না। এখন তিনি তার বোন ও ভাগ্নির লাশ চান। বোনের সেই অজানা কথা জানা না হলেও তাকে শেষ বিদায় দিতে চান। শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, সোমবার পর্যন্ত পাঁচ্চর কন্ট্রোল রুম থেকে ২৬ টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ১৮ টি লাশ বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হয়েছে। বরিশাল থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত এক নারীর লাশ রবিবার রাতে পৌঁছেছে। এই লাশ শনাক্ত না হলে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হবে। এর মধ্যে সোমবার দুপুরে বরিশাল থেকে আরো একটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। ঐ লাশ শিবচরের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। এই লাশ পাঁচ্চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছলে মোট লাশের সংখ্যা হবে ৪৬। গত ৪ আগস্ট মাওয়ায় পদ্মা নদীতে আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় এমএল পিনাক-৬ লঞ্চ। ঐ দিনই শতাধিক যাত্রী জীবিত উদ্ধার হলেও এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন ৬১ যাত্রী।