সৈয়দ হকের পাশে একটা সবুজ গাড়ি, পুরনো। গাড়িতে সে হেলান দিয়ে সিগারেট জ্বালাবার জন্য লাইটার বার করেছে। তাকে দেখাচ্ছে ঠিক সিনেমার হিরোর মতো। আনোয়ারা কলেজের গেটের বাইরে এসে অবাক হয়ে বলল, গাড়ি? কার?
সৈয়দ হক হেসে বলল, আমার। আবার কার? বলতে বলতে সে গাড়িতে হেলান দেওয়া ভঙ্গি থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তাকে এখন দেখে মনে হচ্ছে ছয় ফুট লম্বা। তার গায়ে পাটভাঙা শার্ট, গ্যাবাডিনের মসৃণ ট্রাউজার। পায়ে চকচকে জুতো। দুই চোখে তারার দীপ্তি জ্বলজ্বল করছে।
তোমার মানে? কিনলে?
হ্যাঁ।
টাকা? এত টাকা কোথায় পেলে? আনোয়ারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে?
চিত্রনাট্য লিখে। ‘মাটির পাহাড়’ বলে একটা সিনেমার চিত্রনাট্য লিখে হঠাত্ বেশকিছু টাকা পেয়ে গেলাম। কিনে ফেললাম গাড়িটা। তোমাকে নিয়ে ঘুরব। তারপর গাড়ির দরজা খুলে বলল, এসো ভেতরে বসো। আজ আমরা মিরান্ডার রেস্তোরাঁয় যাব।
আনোয়ারা সবুজ রঙের প্রিফেক্ট গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, তুমি সত্যিই পাগল। যা মনে আসে তা-ই কর।
সৈয়দ হক আসনে বসে স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে বলল, স্বাধীনতার মানে তো তা-ই। অন্যের ক্ষতি না করে যা খুশি তা-ই করা। নয় কি?
রবিবারের সকালের নবাবপুর রোড বেশ ঢিলেঢালা, অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। লোকজন হাঁটছে ধীরেসুস্থে। রিকশা যাচ্ছে মন্থর গতিতে। দোকানের ঝাঁপ খুলে দোকানিরা ঝাড়মুছ করছে। মিরান্ডার রেস্তোরাঁ সবে খুলেছে। তারা দুজনেই প্রথম খরিদ্দার। যা হয়, ভেতরে ঢুকে প্রথমে কিছু পরিষ্কার দেখা যায় না। তারপর অস্পষ্ট আলোয় দেখা যায় টেবিল-চেয়ার আর কয়েকজন ওয়েটার।
সৈয়দ হক আনোয়ারাকে নিয়ে বসল এক টেবিলে। তার দিকে তাকিয়ে বলল, মিরান্ডার রেস্তোরাঁর কথা তোমাকে বলেছি মাঝে-মাঝে। এটা আমাদের প্রিয় আড্ডার স্থান ছিল পঞ্চাশের দশকে। এখানে বসেই আমি লিখেছি ‘তিন পয়সার জ্যোছনা, ‘রক্ত গোলাপ’ আর ‘কবি’ নামের গল্পটি। রক্ত গোলাপ লিখেছিলাম তিন দিনে আর কবি একদিনে। রক্ত গোলাপে ছিল কল্পনা আর বাস্তব মেশানো। ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে নিয়েছিলাম লোককাহিনি। বোধকরি আমাদের লোককথা নিয়ে সেটাই প্রথম আধুনিক সাহিত্যচর্চা এবং তা আমিই করেছিলাম, বিদেশি অনেক বই পড়া সত্ত্বেও।
আনোয়ারা বলল, দেখা যাচ্ছে তোমার মধ্যে শেকড়ের টান বেশ রয়েছে, অবচেতনে হলেও।
শুনে সৈয়দ হক একটু ভাবল। তারপর বলল, পূর্বপুরুষের রক্ত বইছে আমাদের ধমনীতে। আমরা কী করে অস্বীকার করি? শিকড়ের দিকে গমন, প্রত্যাগমন করতেই হবে, আগে আর পরে।
কফি আর খাবারের অর্ডার দিয়ে সৈয়দ হক বলল, আইএ পরীক্ষার শেষ দিনে গভীর রাতে বাবা মৃতুশয্যায়—এই টেলিগ্রাম পেয়ে পরের দিনই কুড়িগ্রাম গিয়েছিলাম। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগের দিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, তোমার নিচে সাত সাতটি ভাইবোন রেখে যাচ্ছি। সামান্য সম্পদ যা রেখে যাচ্ছি তুমি তাদের দিয়ে দিও। নিজে কিছু নিও না। তোমার অনেক হবে। তারপর বললেন, তুমি আমার কাছে কিছু চাও। তোমাকে দিয়ে যাই। আমি বললাম, না, আমার কিছু চাই না। বাবা ছাড়বেন না। বললেন, বল তোমার কী ইচ্ছা?
এর আগেও এমন হয়েছে। তিনি আমাকে গরম কোট বানিয়ে দিতে চেয়েছেন। আমি নিচ্ছি না। তিনি আমাকে বলছেন, চলো রেস্টুরেন্টে গিয়ে মোরগ-পোলাও খাই’। আমি খাই না। শেষের দিকে আমাকে খুশি করার জন্য তাঁর কী যে প্রবল ইচ্ছে! আমি অভিভূত হই। মৃতুশয্যায় তাঁর শেষ কথা ফেরাতে পারলাম না। বললাম, কয়েকটা গল্প লেখা হয়েছে, একটা বই বার করার ইচ্ছে। বাবা সাগ্রহে বললেন, ক পৃষ্ঠার বই? বললাম, সোয়াশো পৃষ্ঠা হয়তো হবে। তিনি তাঁর হোমিওপ্যাথির বই ছাপিয়ে অভিজ্ঞ, তাই মনে মনে হিসেব করে বালিশের তলা থেকে চাবির গোছা বার করে আমাকে দিয়েই তাঁর সিন্দুকটা খোলালেন। সেখান থেকে সাতশো টাকা নিতে বললেন। টাকাটা তাঁর হাতে দিলাম। তিনি টাকাগুলো আমার হাতে দিয়ে বললেন, ভালো একটা প্রেসে ছাপতে দিও। বইটা যেন সুন্দর হয়।
সৈয়দ হকের কথা শুনে আনোয়ারা অবাক হয়ে বলল, বাহ্! তোমার বাবা তো দারুণ ছিলেন। এমন বাবা হতে পারে ভাবা যায় না।
সৈয়দ হক বলল, হ্যাঁ, এই ছিলেন আমার বাবা। যিনি প্রথমে এতটা বাধা দিয়েছিলেন আমার লেখক হবার ইচ্ছা শুনে।
আনোয়ারা বলল, সেই টাকা দিয়ে বই-ই বার করলে? গল্পের বই? অন্যভাবে খরচ করলে না?
সৈয়দ হক বলল, হ্যাঁ বই বার করলাম। বাবাকে যেমন বলেছি। গল্পের বই, আমার প্রথম গল্প সংকলন ‘তাস’। তারপর একটু থেমে বলল, কবিতার বই বের করতে পারতাম, কিন্তু মনে হলো কবিতায় এখনো আমি তৈরি হয়ে উঠতে পারিনি। অতএব গল্পের বই। বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেলাম হাসান হাফিজুর রহমানের কাছে সওগাত প্রেসে। ইতিমধ্যে তাঁর একুশে সংকলনে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছে সেই ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে। এক বছর পর তাঁর সামনে হাজির হলাম গল্প সংকলনের পাণ্ডুলিপি নিয়ে। আঠারো বছর বয়স আমার পুরো হয়নি। ঐ বয়সে বই! আমার একটু কুণ্ঠাই ছিল। হাসান একটুও চমকালেন না। বরং একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন আমার পাণ্ডুলিপির ওপর। বললেন, বাহ্! এই তো, একটা বই হয়ে যাবে। সেদিন ঐ সওগাত আপিসে বসেই হাসান পুরো ছক কেটে দিলেন বইয়ের। সাজিয়ে দিলেন কোন গল্পের পর কোন গল্প যাবে। তারই পরামর্শে দৌড়ে গেলাম শেখ সাহেব বাজারে স্টার প্রেসে। মনোটাইপে কম্পোজ করার একমাত্র প্রেস ছিল ওটাই। বাবা মৃতুশয্যায় বলেছিলেন, বইটা যেন ভালো হয়। সে কথা মনে ছিল। প্রেস থেকে কয়েকদিন পর প্রুফ নিয়ে ছুটলাম কাপ্তানবাজারে বামাচরণ চক্রবর্তী রোডে। সেখানে আনিসুজ্জামান থাকেন। তাঁকে দিয়ে দেখাই বইটার মেকআপ আর প্রুফ কাটার কাজ। তখন ওটাই ছিল আমাদের সবার পক্ষে স্বাভাবিক, পরস্পরের কাজে এগিয়ে আসা আর এ নিয়ে আনিসুজ্জামানকে কিছু বলতে হতো না। জগন্নাথ কলেজে আনিসুজ্জামান যখন ছাত্র, আমিও পড়ি। অচিরে আমরা বন্ধু হয়ে যাই। কতটা নিবিড় ছিল সেই বন্ধুত্ব তার একটা ছায়া পড়েছিল আমার অসমাপ্ত উপন্যাস ‘অন্যজন’-এ। সে যা-ই হোক আনিসের বামাচরণ লেনের বাড়িতে আমাদের অনেক জমজমাট আড্ডা হয়েছে। সেখানে সকাল-সন্ধ্যা তাসের প্রুফ দেখা চলছে। বামপন্থার রাজনীতি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। আত্মগোপনকারী তরুণ তুর্কিদের জন্য টাকাও তুলছে আনিস। আমি যখন যতটা পারি দিচ্ছি। আনিস লিখলেন আমার গল্প সংকলনের পেছনের মলাটে পরিচিতিমূলক ছোট একটা বাক্য, যার প্রথমটা ছিল হাসানেরই ততক্ষণাত্ মুখে মুখে বলে দেওয়া—‘পলক পড়ছে তো জন্ম হচ্ছে নতুন কথার’।
আনোয়ারা বলল, ক টা গল্প ছিল ঐ সংকলনে?
সৈয়দ হক বলল, সাতটি। তারপর বলল, এখন আমি বেশ অবাকই হই ভেবে যে, ষোলো থেকে সতেরো বছর বয়সে লেখা ঐ সাতটি গল্পের একটিও নয় প্রেমের। সবই ছিল রাজনীতি, উদ্বাস্তু মধ্যবিত্ত আর কন্যাদায় বিষয়ে। গাফফার চৌধুরী পড়ে বলেছিলেন, সেই পঞ্চাশের দশকে আমিই নাকি সত্যিকার অর্থে আধুনিক কলম হাতে ধরি। শুনে আমি অভিভূত হলেও স্মরণে রাখি যে আমার আগে আধুনিক গল্প লিখেছেন ফজলে লোহানী, আনিস চৌধুরী এবং সৈয়দ আতিকুল্লাহ।
আনোয়ারা বলল, গাফফার চৌধুরীর ঐ উক্তির পেছনে একটা যুক্তি নিশ্চয়ই ছিল। তিনি তো তোমাকে খুশি করার জন্য ও কথা বলেননি।
সৈয়দ হক একটু ভাবল, তারপর বলল, না তা বলেননি। তিনি কাউকে খুশি করার জন্য কিছু বলতেন না। তবে তিনি যদি আমার গল্পে আধুনিকতার চিহ্ন দেখেই থাকেন তাহলে তার পেছনে রয়েছে বোম্বে আমার প্রবাসজীবন। সেখানে আমি যে এক বছর ছিলাম তার অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে বিদেশি লেখকদের বই পড়া আমাকে আধুনিক হবার জন্য বেশ সাহায্য করেছে। কথা শেষ করে সে আনোয়ারার দিকে তাকিয়ে বলল, এই কষ্টের অভিজ্ঞতা তোমারও হয়েছে। তুমি বড় লেখক হতে পারবে। তাছাড়া তুমি যে পেশা বেছে নিয়েছে সেটা তোমাকে আরো অভিজ্ঞতা এনে দেবে।
আনোয়ারা কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বলল, বেশি বাড়িয়ে বলছ। আমার তো একটাও বই বার হয়নি এখনো। গল্প-কবিতার সংখ্যাও কম।
সৈয়দ হক কফির কাপ হাতে নিয়ে বলল, হবে। সমারসেট মম ডাক্তারি পড়েছিলেন কিন্তু সেটাকে পেশা হিসেবে নেননি। হয়েছিলেন লেখক। কিন্তু তাঁর চিকিত্সাশাস্ত্র পড়ার অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল।
আনোয়ারা বিব্রত হয়ে বলে, হেমিংওয়ে! কোথায় সমারসেট মম আর কোথায় আমি! তুলনা হয়?
সৈয়দ হক সিগারেট ধরিয়ে বলল, নিজেকে কখনো ছোট করে দেখবে না।
সেদিন বিকালে সৈয়দ হক কলেজের হোস্টেল থেকে তাকে আর তার বান্ধবীদের নিয়ে গেল বেবী আইসক্রিম খাওয়াতে গুলিস্তান সিনেমা হলের কাছে। ইতিমধ্যে সে তার বান্ধবীদের সঙ্গে সুপরিচিত হয়েছে এবং ঘনিষ্ঠও। বেবী আইসক্রিমে গিয়ে কোহিনুর বলল, কিছু একটা সেলিব্রেট করছেন মনে হয়? এনগেজমেন্ট রিং দিয়েছেন বুঝি?
সৈয়দ হক বলল, এখনো নয়। মা আসছেন কুড়িগ্রাম থেকে তিনিই আংটি পরাবেন।
তাহলে এই আইসক্রিম? মিলি তাকাল।
হক বলল, গাড়ি কিনেছি তো সেই জন্য।
সে রাতে আনোয়ারা তার ডায়েরিতে লিখল, ডিসেম্বর ১৯৬৪। আজ হক তার বাবা সম্বন্ধে যা বলল তা প্রায় অবিশ্বাস্য। যে বাবা ডাক্তারি পড়াবার জন্য চাপ দিয়ে এসেছেন এবং যে চাপ থেকে সে উদ্ধার পেতে বোম্বে পালিয়ে গিয়েছে সেই বাবা তাকে শুধু গ্রহণই করেননি তার সাধ আর বাসনা পূরণের জন্য সাহায্য করেছেন। মৃত্যুশয্যায় তার হাতে তুলে দিয়েছেন জীবনের কষ্টের সঞ্চয় থেকে টাকা বই বার করার জন্য। শুধু তাঁর দাবি ছিল একটাই, বইটা যেন ভালোভাবে ছাপা হয়। তাঁর সঙ্গে আমার বাবার তুলনা করে আমি শিহরিত হই। তিনি জোর করেছেন আমাকে দিয়ে উর্দু বলাতে। তিনি চুড়িপট্টির অন্যান্য মানুষের মতো আমাকে দেশোয়ালি ভাষায় কথা বলার জন্য চাপ দিয়েছেন। যখন তাঁকে বলেছি লেখক হব, শুনে তিনি হইহই করে বলেছেন, লেখকরা খেতে পায় না। পাগল হয়ে যায়। নজরুলের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন এই প্রসঙ্গে। মাও আমাকে লেখক হতে দিতে চাননি। চেয়েছেন উচ্চশিক্ষিত হই, ডাক্তার হই। কিন্তু তিনি নিজে যেমন কারো তোয়াক্কা না করে আমাদের মহল্লায় বাংলা বলে গিয়েছেন আমাকেও উত্সাহ দিয়েছেন বাংলা বলতে। বাবা নয়, মাকেই কৃতিত্ব দেই আমার সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখার জন্য। লেখাপড়া করে একটা পেশা গ্রহণের পর যদি লেখক হই তাহলে তাঁর আপত্তি নেই, এটা বুঝতে পেরেছি। তা-ই আমার জন্য যথেষ্ট। আমার বাবা ছিলেন একটা উল্কার মতো। নিজে কোনোদিন সুখের মুখ দেখেননি, তাঁর আশেপাশের কাউকেও সুখের মুখ দেখতে দেননি। এই আশেপাশের মানুষরা তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে।
দুই
সৈয়দ হকের মা এসেছেন কুড়িগ্রাম থেকে, শীতের শেষে। গাছের শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে রাস্তায়, ধুলো উড়ছে মাঝে মাঝে। কখনো হঠাত্ কোকিলের ডাক শোনা যাচ্ছে। হক বলল, মা বিশেষ করে তোমাকে দেখার জন্য এসেছেন। তাঁকে তোমার সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছি প্রথম দেখার পর থেকেই। তোমাকে দেখার জন্য তাঁর খুব কৌতূহল। তিনি যেহেতু প্রায়ই অসুস্থ থাকেন, তাঁর পক্ষে ঘন ঘন ঢাকা আসা সম্ভব না। আর সেই জন্য এবারেই তোমাকে দেখে আর্শী্বাদ করে যেতে চান। তাঁকে আগেই জানিয়েছি আমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাঁর মতামত নেবার কথায় তিনি বলেছেন যে, আমার পছন্দই তাঁর পছন্দ। জানতাম তিনি একথাই বলবেন, কিন্তু তবুও মা হিসেবে তাঁকে আমার এ কথা বলার প্রয়োজন বলে মনে করেছি। তারপর আনোয়ারার দিকে তাকিয়ে সে বলল, আমাদের পরিচয়ের প্রায় দু বছর পর আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি। এটা বেশ অস্বাভাবিক, তা-ই না?
আনোয়ারা বলল, অস্বাভাবিক কেন? আমার পরীক্ষা শেষ হবার জন্যই তো আমাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
শুনে সৈয়দ হক বলল, আমি সে কথা বলছি না। আমি বলছি এই দু বছরের মধ্যে আমাদের সম্পর্ক ছিন্নও হয়ে যেতে পারত।
আনোয়ারা একটু অবাক হয়ে বলল, ছিন্ন হয়ে যেতে পারত কেন?
সৈয়দ হক বলল, বা রে, কত কারণ থাকতে পারে। এমন কি হয় না?
আনোয়ারা বলল, হয় কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা দিনে দিনে শক্ত হয়েছে। সেজন্য ছিন্ন হওয়ার প্রশ্ন ওঠেনি। তারপর আনোয়ারা বলল, আমার মা-বাবাকে এখনো আমাদের সম্বন্ধে বলা হয়নি। জানি আমার এই সিদ্ধান্তে তাঁরা সুখী হবেন না।
সৈয়দ হক বলল, তাহলে? কী করবে তুমি?
আনোয়ারা বলল, আমাকে অনড় হয়ে থাকতে হবে আমার সিদ্ধান্তে। এই পর্যন্ত আমি তাঁদের ইচ্ছায় সব করেছি। এখন তাঁদেরকে এই একটা ইচ্ছা মেনে নিতে হবে।
সৈয়দ হক গাড়ি চালাচ্ছে, তার পাশে বসে আনোয়ারা কথা বলে যাচ্ছে। তার গায়ে নতুন একটা জ্যাকেট, মনে হচ্ছে সদ্যই কেনা। এতদিনে আনোয়ারার জানা হয়ে গিয়েছে যে, কাপড়চোপড়ের ব্যাপারে হক বেশ শৌখিন। তাকে একই পোশাকে সে বেশিদিন দেখেনি। সৈয়দ হক ভেতরের উন্নতির জন্য যেমন পড়াশোনা করছে অবিরাম, বাইরের দিকটাও ছিমছাম শুধু না, স্মার্ট দেখানোর জন্য সে সদাই সচেষ্ট। এ শুধু আনোয়ারাকে ইমপ্রেস করার জন্য নয়, তার অনেকদিনের অভ্যাস। এটা বুঝতে পেরেছে আনোয়ারা।
লক্ষ্মীবাজারে তারা দুজনে পৌঁছাল দুপুরের আগে। দরজা খোলাই ছিল, ধাক্কা দিতেই দুই পাট খুলে গেল। ভেতরে উঠানে কয়েকটা চেয়ার পাতা, মনে হয় তাদের দুজনের বসার ব্যবস্থা। তারা ভেতরে ঢুকতেই হাসিমুখে এক প্রৌঢ়া এলেন, সরু কালো পাড়ের সাদা ধবধবে শাড়ি। আনোয়ারা কাছে গিয়ে তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করল। তিনি আনোয়ারার মুখ ওপরে তুলে বললেন, থাক থাক মা। তুমি দীর্ঘজীবী হও। তারপর বললেন, বাদশাহ বলেছিল তুমি সুন্দর। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে কম করেই বলেছে। তুমি অপূর্ব সুন্দর। তোমার স্বভাবটা তার চেয়েও বেশি সুন্দর—এটা আমি বেশ বুঝতে পেরেছি তোমাকে দেখার আগেই।
সৈয়দ হক আর আনোয়ারা কথা বলছে, এই সময়ে সৈয়দ হকের ভাইবোন সব উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। এদের মধ্যে বাদশাহ অর্থাত্ হেমিংওয়ের পরে যে ভাই রাজা, তাকে আনোয়ারা আগেই দেখেছে। সে লক্ষ্মীবাজারের এই বাড়ির সামনের ঘরে হোমিওপ্যাথির দোকান দেখাশোনা করে। বাড়ির ভেতরে বড় বড় মটকায় ওষুধ থাকে, সেগুলো প্যাকেটে করে সে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠায়। তার ছোট ভাই শাহজাহানকেও আনোয়ারা এ বাড়িতে দেখেছে কয়েকবার। তার ভাই শাহজাহান, সিরাজ এরা দেশের বাড়িতেই থাকে বেশিরভাগ, মাঝে মাঝে ঢাকায় আসে যে জন্য তার সঙ্গে দেখা হয়নি। সৈয়দ হকের ছোট বোন তিনা, হোসনে আরা রুবা, এদেরকেও আজ প্রথম দেখল আনোয়ারা। এদের সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তাদের মা তাকে জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেলেন। ভেতরে গিয়ে তারা বসল একটা বিছানায়, সাদা ধবধবে চাদর পাতা, শিয়রের বালিশে ফুল তোলা দুটো বালিশ। আনোয়ারা আগেই জেনেছে হেমিংওয়ের নিজে সহ সব ভাইয়ের নাম ইতিহাসের রাজা আর নওয়াবের অনুসরণে রাখা। তাদের বাবার মনে হয়েছে এমন নাম দেওয়া হলে তারা সবাই জীবনে উন্নতি করবে। এই জন্য হেমিংওয়ের ডাক নাম হয়েছে বাদশাহ। প্রথমে শুনে আনোয়ারা হেসেছিল। তাকে বলেছিল, আমি তোমাকে ঐ নামে ডাকতে পারব না।
বাদশাহ বলেছিল, তাহলে কী নামে ডাকবে আমাকে?
আনোয়ারা হেসে বলেছিল, কেন, হেমিংওয়ে বলে। সেই থেকে আনোয়ারা তাকে একান্তে ঐ নামেই ডেকে আসছে। অবশ্য নিজেদের মধ্যে, বাইরের কারো সামনে নয়।
লক্ষ্মীবাজারের গোবিন্দ লেনের এই বাড়িতে হেমিংওয়ে উঠেছিল ১৯৪৯ সালে যখন সে ঢাকায় স্কুলে পড়তে আসে। প্রথমে সে উঠেছিল বংশাল রোডে সংবাদ পত্রিকার উল্টো দিকে এক মসজিদের লাগোয়া ঘরে। তার বাবার পরিচিত এক ওস্তাগর লক্ষ্মীবাজারে সাধন বাবু নামে এক হিন্দু ভদ্রলোকের এই বাড়িটির কথা বলেছিল। তিনি সপরিবারে কলকাতা চলে যাচ্ছিলেন এবং যাওয়ার আগে বাড়িটি ভাড়া দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। মাসে পঞ্চাশ টাকায় সেই বাড়ি ভাড়া করা হয় এবং হেমিংওয়ে সেখানে জব্বার নামে কুড়িগ্রাম থেকে তার সঙ্গে আসা এক কাজের ছেলের সঙ্গে উঠেছিল। তারপর সাধন বাবুর সঙ্গে চুক্তি করে তার বাবা বাড়িটি কিনে নেন এবং সেই থেকে হেমিংওয়ে এই বাড়িতেই আছে। তার ভাইবোন মাঝে মাঝে যাওয়া-আসা করে। শুধুমাত্র রাজা হোমিওপ্যাথির ব্যবসা করার জন্য এই বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকছে অনেক বছর থেকে। মাঝখানে তাদের এক ফুফাত ভাই ছিল এখানে সপরিবারে। হোমিওপ্যাথি ব্যবসার বেশ বড় রকমের ক্ষতি করে সে চলে গিয়েছে।
হেমিংওয়ের মা বললেন, বাদশাহ তোমার খুব প্রশংসা করে। আমি বুঝতে পারছি কেন করে। তুমি খুব লক্ষ্মী মেয়ে, দেখলেই বোঝা যায়। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, বসো তোমরা কথা বল। আমি দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা করি।
মেঝেতে শতরঞ্জি পেতে দস্তরখান সামনে রেখে খেতে বসল সবাই। হেমিংওয়ের মা সবার সঙ্গে খেলেন না, দেখাশোনা করলেন, আনোয়ারার পাতে একটু পর পর খাবার তুলে দিলেন। তিনি নিজেই সব রেঁধেছেন। পোলাও, কোর্মা, গরুর ঝাল মাংস আরো কয়েক পদের তরকারি। কালাচাঁদ গন্ধবণিক থেকে আনা হয়েছে দই আর মিষ্টি।
খাওয়ার পর হেমিংওয়ের মা আনোয়ারাকে শোবার ঘরে নিয়ে বিছানার পাশে বসালেন। তারপর একটা ছোট লাল রঙের বাক্স খুলে তার আঙুলে পরিয়ে দিলেন সোনার আংটি। আনোয়ারা তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করল। তিনি তাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরলেন। কান্না ভেজা গলায় বললেন, বাদশাহর বাবা দেখলে খুব খুশি হতেন। তারপর আস্তে করে বললেন, আমার ছেলেটা একটু খেয়ালি। ঘরসংসার বোঝে না। তুমি ওকে দেখে রেখো।
তার কথা শুনে আনোয়ারার একটু হাসি পেল। সে মনে মনে বলল, আমিই বা কতটা সংসারী। আমার মাথাতেও তো সবসময় লেখার পোকা কুটকুট করে যাচ্ছে। এই মহিলা জানেন না তাঁর পুত্রবধূও মোটামুটি সংসারবিরাগী। তার মন পড়ে থাকে অন্য জগতে যার সঙ্গে বিষয়-আশয়ের সম্পর্ক কমই। বিয়ের পর আমরা হব নির্ভেজাল লেখক দম্পতি। শয়নে-স্বপনে আমরা কেবল লেখার কথাই ভাবব। আনোয়ারা মনে মনে বলল।
হোস্টেলে ফিরে আনোয়ারা হাতের আংটি দেখাল বান্ধবীদের। তারপর বলল, এখন আমার মা-বাবাকে রাজি করানো তোদের দায়িত্ব।
কোহিনুর বলল, বেশ চিঠি লিখে জানিয়ে দিচ্ছি তোর বাবাকে। তুই তো নিজে লিখতে পারবি না।
আনোয়ারা কোহিনুরের বিছানায় বসে আংটিটার দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ লেখ। আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে যাবে দু মাসের মধ্যেই। এখুনি জানাবার সময়।
হোস্টেলে ফেরার সময় হেমিংওয়ে বলেছিল, আমাদের পরিবারের আকার দেখে ভয় পেয়ে যাওনি তো মঞ্জু?
আনোয়ারা অবাক হয়ে বলেছিল, ভয়। কেন ভয় পাব কেন? যশোরের চুড়িহাট্টায় আমাদের পরিবার তো আরো বড়। আমাকে নিয়ে আমরা নয় ভাইবোন। এর বাইরে আছে বড় মা অর্থাত্ সত্ মায়ের দুই সন্তান। তাদের কথা তোমাকে বলেছি। তুমিও তোমাদের বড় পরিবারের কথা আমাকে জানিয়েছ। আজকে আবার নতুন করে তোলা কেন?
হেমিংওয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিলাম। তাছাড়া আজকেই তো তুমি সবাইকে একসঙ্গে দেখলে।
আনোয়ারা সামনের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, হুঁ।
সে লক্ষ্মীবাজারে হেমিংওয়ের বাসায় কয়েকবার গিয়েছে, কিন্তু সব ভাইবোনকে একসঙ্গে দেখেনি। সে প্রথমবার গিয়েছিল হেমিংওয়ের পড়ার আর লেখার ঘর দেখার জন্য।
‘তার লেখার ঘর দেখার আমার খুব আগ্রহ ছিল। তাই একদিন গভীর রাতে রাস্তার ধারে তার পড়ার ঘরে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। সেই ঘরে নাকি তার অনেক বন্ধুবান্ধব এসেছিল আগে। সব নামকরা কবি-সাহিত্যিক, বন্ধুবান্ধব। এসেছিলেন শিল্পী মুর্তজা বশীর, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, কবি জসিম উদ্দীন, কবি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, ফজলে লোহানী এবং আরো অনেকে।
ছোট একটা ঘর। ঘর ভর্তি বই। মেঝে, দেয়াল, তাক সব বইয়ে সয়লাব। উল্টো-পাল্টা হয়ে বইগুলো পড়ে আছে সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মেঝেয় পড়ে আছে সিগারেটের ছাই, অর্ধদগ্ধ সিগারেট, সিগারেটের শেষাংশ। পড়ে আছে কত দিনের বাসি চায়ের কাপ, পিরিচ, পিরিচে ছাইয়ের স্তূপ, ছড়ানো-ছিটানো জামা-কাপড়, লেখার কাগজ, কালির দোয়াত, কলম, মাথা ধরার প্যারাসিটামল। ততদিনে আমার বোদলেয়ার পড়া সারা। জাঁ পল সার্ত্রের নাম শুনেছি, সিমোন দ্য বোভোয়ারের নাম জানি, সার্ত্রে যে বোভোয়ারের বন্ধু তাও জানি, আর তার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার বর্তমান জীবন যেন মিলিয়ে নিতে চাই। যদিও আমার নিজের হোস্টেলে আমার রুম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আমার টেবিলের ওপর বই-খাতা গোছানো, কলম কালির দোয়াত জামা-কাপড় জুতো সব গোছানো। তবুও আমি রোমাঞ্চিত মনে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম সেই ঘর। ঘরের ভেতরে ছোট্ট করে জ্বলছে হ্যারিকেন। সমস্ত বাড়ি নিস্তব্ধ। শুধু নিম গাছ থেকে ফল পড়ার শব্দ টুপ টাপ। বেড়াল ডেকে উঠল কোথাও।’ (আনোয়ারা সৈয়দ হক, ক্ষুব্ধ সংলাপ)।
‘সেদিন সন্ধ্যায় কোহিনুর আমার বাবার কাছে যে চিঠি পাঠাবে তার খসড়া পড়ে শোনাল। শোনার পর তাকে আবার নতুন করে লিখতে বললাম। এইভাবে কয়েকটা চিঠির খসড়া লিখল সে। আমার খালি চিন্তা হচ্ছিল যে কথাটা কিভাবে বললে বাবা কম রাগ করবেন। রাগ যে করবেন সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ ছিল না। মা প্রথমে আপত্তি করলেও তাঁকে মানিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু বাবার সম্মতি পাওয়া হবে বেশ কঠিন।
‘রাতের বেলা আমার ডায়েরিতে লিখলাম জানুয়ারি, ১৯৬৫। আজ হেমিংওয়ের মা এবং তার সব ভাই-বোনের সঙ্গে দেখা হলো আনুষ্ঠানিকভাবে। তার মাকে দেখে আমার খুব পছন্দ হলো। আমাকেও তিনি বেশ পছন্দ করেছেন বুঝতে পারলাম। তিনি যখন আমার হাতে আংটি পরিয়ে দিচ্ছিলেন আমি উপলব্ধি করলাম যে আমার জীবনে একটা বড় বাঁক সামনে। ভাবতেই বেশ শিহরিত হলাম, যা আগে কখনো হইনি।’
তিন
সকালেই এসেছে সৈয়দ হক তার সবুজ প্রিফেক্ট গাড়ি চালিয়ে। হোস্টেল থেকে আনোয়ারা বেরিয়ে গেটের সামনে গাড়িতে এসে বসতেই হক বলল, আজ তোমাকে বিউটি বোর্ডিং দেখাতে নিয়ে যাব। এর কথা তোমাকে অনেক বলেছি। আজ নিজের চোখে দেখবে। অনেক আড্ডা, অনেক লেখালেখি আর অম্লমধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে বিউটি বোর্ডিংয়ের পুরনো দালানটায়। বলতে পার শেষ পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে প্রাণবন্ত আড্ডা হয়েছে বিউটি বোর্ডিংয়ে বসেই। আমাদের এতজন একসঙ্গে আর কোথাও বসিনি। আমার লেখালেখির বেশিরভাগই হয়েছে ওখানেই। লক্ষ্মীবাজারে আমাদের বাড়ির বারান্দায় একচিলতে জায়গায় আমার চৌকি আর টেবিল যেখানে থাকত সেটা লেখালেখির জন্য মোটেও অনুকূল ছিল না। বিউটি বোর্ডিংয়ে প্রথম দিন এসেই আমার পছন্দ হয়ে যায়। শুধু আড্ডা দেওয়ার জন্য নয়, লেখালেখির জন্য একটা চমত্কার জায়গা মনে করেও।
নবাবপুর রোড দিয়ে মিরান্ডার হোটেল ছাড়িয়ে বাংলাবাজারের দিকে যেতে যেতে হক বলল, বিউটি বোর্ডিংয়ে খাবার ঘরেই আমি সেই ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত কত লেখালেখি করেছি আর কত আড্ডা দিয়েছি আমরা—আমি, শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তার হিসেব নেই। বিউটি বোর্ডিংয়ের দু পা দূরেই শহীদ কাদরীর বাড়ি। আমি আর ওবায়দুল্লাহ হাঁটাপথে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে। শামসুর রাহমান তাঁর আশেক লেনের বাড়ি থেকে পাটুয়াটুলী হয়ে বাংলাবাজারে বিউটি বোর্ডিংয়ে আসতে কত আর সময় নিতেন? আড্ডার লোভে আসতেন আনিসুল হক পাটুয়ালীতে তাঁর কাফেলা পত্রিকার আপিস থেকে। আসতেন সঞ্জীব দত্ত আর খালেদ চৌধুরীও। সাদেক খানও এসেছেন কখনো কখনো। মাঝে মাঝে হানা দিতেন সৈয়দ আতিকুল্লাহ। কখনো লাজুক ভঙ্গিতে এসে যেতেন আল মাহমুদ। একটু থেমে সৈয়দ হক বলল, সঞ্জীব দত্তের সঙ্গে আমাদের জমে ওঠে কলকাতা থেকে তিনি ঢাকায় আসার পরপরই। তাঁর প্রতি আমাদের আকর্ষণের কারণ ছিল একাধিক। প্রথমত তিনি কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র। সেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যিনি পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সর্বপ্রথম দাবি জানান। সঞ্জীব দত্ত সদ্যই ঋত্বিক ঘটকের জমজ বোন প্রতীতি দেবীকে বিয়ে করেছেন আর ঐ বিয়ের কারণেই তাঁকে কলকাতা থেকে চলে আসতে হয়। তাঁর প্রতি আমাদের আকর্ষণের আরো একটি কারণ, তিনি আমাদের তখনকার প্রিয় প্রসঙ্গ অস্তিত্ববাদ সম্পর্কে গভীর পড়াশোনা করে প্রায় অথরিটি হয়ে গিয়েছেন এবং এই বিষয় নিয়ে তিনি প্রায়ই খালেদ চৌধুরীর সঙ্গে প্রাণবন্ত আলোচনায় যোগ দেন যা আমরা খুব উপভোগ করি। সবশেষে আমরা তাঁর প্রতি আকৃষ্ঠ হই তাঁর ইংরেজি কবিতার জন্য যা তিনি পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকায় ছাপাতেন। কী অমিত দখলই না ছিল তাঁর ঐ ভাষার ওপর। আমরা তাঁর লেখা কবিতার মর্মোদ্ধার করতে গিয়ে ঘর্মাক্ত এবং প্রাণান্তকর অবস্থায় পড়ি। ঐ অবজার্ভার পত্রিকাতেই তিনি পরে সম্পাদকীয় লেখার চাকরি পান ইংরেজি ভাষার ওপর তাঁর প্রবাদপ্রতিম দখলের জন্য।
আনোয়ারা বলল, ১৯৫৪-র আগে থেকে কি বিউটি বোর্ডিং ছিল?
সৈয়দ হক গাড়ি বাংলাবাজারের গলির মুখে নিতে নিতে বলল, বিউটি বোর্ডিংয়ের বিল্ডিং যেখানে সেই জায়গায় একটা প্রেস ছিল। ঐ প্রেস থেকে বেরোত সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা পত্রিকা’। দেশ-বিদেশের খবরের সাপ্তাহিক সংক্ষিপ্ত সংবাদ, প্রবন্ধ, গল্প আর কবিতা ছাপা হতো ঐ পত্রিকায়। এতই নাম ছিল পত্রিকাটির যে নবীন কবি শামসুর রাহমান তাঁর প্রথম লেখা কবিতাটি ওইখানে ছাপতে দিয়েছিলেন ১৯৪৮-এর ডিসেম্বরে। আমি ১৯৫২-র মে মাসে বোম্বে থেকে ফিরে এসে একটা গল্প লিখেছিলাম। সম্পাদক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় গল্পটি পড়ে খুব কুণ্ঠিতভাবে বলেছিলেন, আমরা আর দেশভাগ এবং দাঙ্গা নিয়ে গল্প ছাপতে চাই না। আপনি অন্য পত্রিকায় গল্পটা দিন। শুনে আমার রাগ হয়েছিল, যে জন্য ঐ পত্রিকার সিঁড়ি আর কখনো মাড়াইনি। তখন বুঝিনি ৫২-র ঐ দিনগুলোতে গুণ্ডা দিয়ে হলেও গদি আঁকড়ে থাকা মুসলিম লীগ আর বিহারিদের ভয়ে কতটাই না সাবধানে চলতে হতো সংখ্যালঘুদের। কবে যে সোনার বাংলা পত্রিকা উঠে গেল, সুনীল বাবু দেশ ছাড়লেন, কোনো খবর রাখিনি।
গাড়ি থামিয়ে বসে থেকেই সৈয়দ হক আনোয়ারাকে বলল, একদিন শহীদ কাদরী জানাল, তাদের বাড়ির কাছেই একটা আড্ডা দেবার জায়গা হয়েছে, নাম বিউটি বোর্ডিং। এক ভোরে তার সঙ্গে জায়গাটা আবিষ্কার করতে গিয়ে দেখি, আরে! এ যে সেই সোনার বাংলা পত্রিকার আপিস! কাদরীকে সে কথা বলতেই সে আঙুলের তুড়ি দিয়ে বলল, ধুর সে কবে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। কাদরী সুযোগ পেলেই ভ্যানিশ কথাটা খুব ব্যবহার করত। তারপর কাদরীর সঙ্গে বিউটি বোর্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকে আমার খুব পছন্দ হয়ে যায়। খুব নিরিবিলি আর গরমেও বেশ ঠাণ্ডা। সামনে একফালি মাঠ, সবুজ ঘাস হাসছে চারদিকের পুরনো দালানকোঠার ভেতর। খাবার-দাবার খুব সস্তা। চার আনায় হাতের তেলো সাইজের মাটন কাটলেট। দুপুরে মাড়োয়ারি লাঞ্চ মানে গরম আটার রুটি, খাঁটি ঘি মাখানো আর হিং দেওয়া সবজি। সঙ্গে অড়হরের ডাল। আমাদের খাওয়া শুরু হলো বিউটি বোর্ডিংয়ে। দিনের বেলা খাওয়ার ঘরে বসি যেখানে একদিন ছিল সোনার বাংলার প্রেস। বিকেলে আমাদের আড্ডা হয় সামনের সবুজ ঘাসের কার্পেট মোড়া মাঠে, হলুদ রঙের কাঠের চেয়ার পেতে। ঐ হোটেলে বাকি রাখার ব্যবস্থাও হয়ে গেল ম্যানেজার প্রহ্লাদের সৌজন্যে। সে হোটেল মালিকের শ্যালক। তবে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুদার মতো পাওনার তাগিদ দেওয়ার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত।
বিউটি বোর্ডিংয়ে যে সাহিত্যিক আড্ডা জমে ওঠে তার শুরুটা করে কাদরী। আড্ডার পাশাপাশি সেখানে আমি লেখাও শুরু করি। বিউটি বোর্ডিংয়ে লেখার জন্য আমার একটা স্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে গেল। কাঁধে আমার তখন লেখার নাছোড় ভূত, দিন-রাত্তির লিখিয়ে নিচ্ছে গল্প, কবিতা, উপন্যাস। লক্ষ্মীবাজারে এক নম্বর গোবিন্দ দত্ত লেনে আমাদের বাড়িতে যে সুবিধে পাইনি তা পেয়ে গেলাম বিউটি বোর্ডিংয়ে। মতি ভাই রেস্টুরেন্টে, সিনেমা কেবিনের কাঠের দোতলায়, মিরান্ডার রেস্টুরেন্টে পর্দাটানা কেবিনে বসে আমাকে আর লিখতে হলো না আগের মতো।
সৈয়দ হক বলতে থাকল, আমি সকাল আটটা নাগাদ এসে যেতাম লেখার জন্য। ক্রমে ক্রমে আসত আর সকলে। তাদের হো হো হাসি আর জমজমাট কোলাহলেও আমার লেখার ব্যাঘাত ঘটেনি। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছাপা আমার প্রায় সব কবিতাই বিউটি বোর্ডিংয়ে বসে লেখা। দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘আনন্দের মৃত্যু’র প্রায় সব গল্প ‘এক মহিলার ছবি’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’ আর ‘অনুপম দিন’ উপন্যাসও ওখানে বসেই লেখা।
গাড়ির ভেতরে বসে আনোয়ারা চুপ করে শুনছে। স্মৃতিচারণার উত্সাহে হক বলে যাচ্ছে, বিউটি বোর্ডিংয়ে শামসুর রাহমান কত যে সদ্য লেখা কবিতা পড়ে শুনিয়েছেন আমাদের! কলকাতা থেকে কবিতা পত্রিকা কি হুমায়ুন কবির সম্পাদিত ‘চতুরঙ্গ’ ডাকে তাঁর কাছে পৌঁছালেই সোজা নিয়ে আসতেন বিউটিতে। আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। কবিতা নিয়ে কত যে কথা বলতেন তিনি কাদরীর সঙ্গে। কাদরী ইংরেজি আর ঠাট্টার মতো উর্দু মেশানো বাংলায় কবিদের কবিতা নিয়ে উচ্চৈঃস্বরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলে যেত তার অনন্য বাক্ভঙ্গিতে। ‘পয়ার ছন্দে লেখা ইস কবিতামে কায়সুল হকনে জো লিখখা ‘রজনীগন্ধা গো’ উসমে দুই মাত্রা দিয়া-হা হা হা।’ কিংবা ‘রাহমান আপনে ‘দুঃখ’ কবিতাঠো জো লিখা উসমে কনটেম্পোরারি আমেরিকান পোয়েট্রি আপনে ক্যাটালগিং কিয়া।’ কাজটা যে পছন্দ হয়নি তার স্বর শুনে বুঝতে কষ্ট হয় না আমাদের। কাদরীর কাছেই আমরা জেনে উঠি কবিতার ক্যাটালগিং ব্যাপারটা কী? একই বিষয়ের একটার পর একটা ভাব বর্ণনা করে যাওয়া।
সৈয়দ হক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, কাদরী তখনই বড় কবি, এই জন্য যে তিনি কবিতা বুঝতেন। তাঁর কবিমনটা ছিল সোনা পরখের কষ্টিপাথর। নিজের কবিতা সম্বন্ধেও কাদরীর ছিল একই বিচার। বলতেন, আমার এই একটা কবিতা হয়েছে। ওটা হয়নি। এতটাই আত্মবিশ্বাস ছিল তাঁর যে কবিতা যখন ছাপাবার জন্য দিতেন কিছু একটা অবশ্যই হয়েছে বলেই দিতেন। তাঁর মতো আমাদের সবাইকে স্থির প্রত্যয়ে যে দাঁড়াতে হয়েছিল কবিতার জমিতে তার পেছনে যে বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা ভূমিকা রাখেনি তা কি কেউ বলতে পারি আমরা? আমাদের জীবনের লক্ষ্যই তখন ছিল অবিরাম কবিতা নিয়ে লিখে যাওয়া। এই দেশে, সেই কালে যখন শিল্পে-সাহিত্যে রুচিটাই ছিল মধ্যযুগীয়। আমি ঠাট্টা করে বলতাম, কবিতা এখন কায়কোবাদের খপ্পরে। উপন্যাস নজিবর রহমানে বন্দি। নাটক প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর মহলে। অতটাই মন্দ ছিল না অবশ্য পরিস্থিতি, আমার কথায় অতিরঞ্জন ছিল। তবে বিশ্বের সমসাময়িকতা আর আধুনিকতার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না পাঠকের এবং অনেক প্রধান লেখকের। যোগাযোগটা পঞ্চাশের এই আমাদেরই রচনা করে উঠতে হয়েছিল। রুচিটা এই আমাদেরই গড়ে দিতে হয়েছিল এবং তা ঐ বিরামহীন চলা নিয়েই। বিউটি বোর্ডিংয়ে আমাদের নিরন্তর তর্কে নতুন নতুন চিন্তা আর ভাবনার সংঘাতে কবিতায় আমরা বিবর্তিত হতে থাকি। খুঁজে পেতে থাকি আপন স্বর। শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার প্রায়ই দ্বন্দ্ব হয় ইউরোপীয় পুরাণ থেকে উপমা আর প্রতীক তাঁর কবিতায় ব্যবহার করা নিয়ে। আমি এদেশের পুরাণ ও কিংবদন্তি ব্যবহারের পক্ষে বলি। শামসুর রাহমান খুঁজে পান না কী আছে আমাদের ভাঁড়ারে। আমি একই হাতে পয়ার ও গদ্য ছন্দে সমান তালে ব্যবহার করছি, শামসুর রাহমান গদ্য ছন্দটাকে আদপেই আমল দিচ্ছেন না। তিনি শহীদ কাদরীর অবিরাম ইংরেজি, মার্কিন আর ফরাসি কবিতা নিয়ে আলোচনায় এতটাই মগ্ন যে আমাদের কথা তাঁর কানে ঢুকছেই না। কাদরীর সঙ্গেই ক্রমে তাঁর বেড়ে উঠছে ওঠাবসা। এ নিয়ে মতান্তর হয়নি আমাদের মধ্যে, কিন্তু মন খারাপ হয়েছে কখনো কখনো। এইসব যখন হচ্ছে তখন শোনা গেল হঠাত্ বজ্রপাত। ১৯৫৮-র অক্টোবরে আইয়ুব খান জারি করলেন সামরিক শাসন। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কলকাতার সঙ্গে সাহিত্যের যোগাযোগ মুহূর্তেই ছিন্ন হয়ে গেল। বিউটি বোর্ডিংয়ে আমাদের আড্ডাও সরকারের গোয়েন্দাদের নিবিড় নজরদারির জন্য কমে এল। শুরু হলো বিউটি বোর্ডিংয়ের কর্মচারীদের কাছে গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ। কারা আসে, কতক্ষণ থাকে, কী আলোচনা করে এইসব জানার জন্য তাদের আগ্রহ। এরপর সরকারি এজেন্ট কিছু ছাত্রনেতা এসে ঘাঁটি গাড়ল বিউটি বোর্ডিংয়ে। দেখে শুনে আমাদের অনেকেই পাততাড়ি গোটাল।
শহীদ কাদরী নতুন আড্ডা খুঁজে বার করল মদনমোহন বসাক রোডে রথখোলা মাঠের পাশে ছাপড়া ছাউনির এক রেস্টুরেন্টে। দেখে আমার পছন্দ হলো না। বহুদিন আমি একাই যাই বিউটিতে। নতুন কিছু মুখ দেখি, যারা খুব সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করে এবং আমাকে তীক্ষ্ম চোখে দেখে। একসময় আমি আস্তে আস্তে সরে পড়ি। তারপর বসতে শুরু করি জিন্নাহ অ্যাভিনিউ-র এক প্রান্তে সদ্যই খোলা ক্যাসবা রেস্তোরাঁয়। লেখার জন্য ফিরে যাই জনসন রোডের মিরান্ডার রেস্টুরেন্টে। কিন্তু বিউটি বোর্ডিংয়ের পরিবেশ কোথাও পাই না।
ক্যাসবায় সাহেবি সাজসজ্জা এবং ইংলিশ মেন্যু আমাকে আকর্ষণ করে না। সেখানে বসে লেখালেখির কথা মনে আসে না। আমি ক্যাসবায় বিকেলে এসে বসে থাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যেন নিঃসঙ্গ এক মানুষ। তখন আমার ভেতরে চিত্কার করতে থাকে কবিতা নয় দেশ। আমার করোটির ভেতর উত্তাল সমুদ্রের ধ্বনি। একদিন ঐভাবে বসে থাকতে থাকতে নিভৃতে পেয়ে যাই আলতাফ মাহমুদকে। এক সন্ধ্যায় তিনি গুনগুন করে গাইলেন, কোনো কথা নয় সুরই কেবল—গির্জার সামগান থেকে অনুপ্রাণিত সেই স্বর। একটু চেষ্টা করেই বোঝা যায় স্বরের পেছনের কথাগুলো—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী’। কোনো বাণী নয় শোনালেন শুরুর সেই বিলাপের ধ্বনি। গড়পড়তা সেই সন্ধ্যা হয়ে উঠেছিল আমার জন্য বায়ান্নরই একুশে ফেব্রুয়ারি।
অনেকক্ষণ কথা বলার পর সৈয়দ হক থামল। দুপুর তখন তাদের চারদিকে। সে বলল, চল যাই তোমাকে বিউটি বোর্ডিংটা দেখিয়ে নিয়ে আসি। আগের মতন নেই। কিন্তু এখনো দু বেলা খাবার পাওয়া যায়। আমরা সেখানে লাঞ্চ সারব।
আনোয়ারা উঠতে উঠতে বলল, এখন ওখানে সাহিত্যের আড্ডা হয় না? তোমরা কেউ যাও না?
সৈয়দ হক রাস্তার লোকজনের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, হয়। তবে আগের মতো নয়। শুধু সময় বদলে যায়নি, আমাদের অনেকেও বদলে গিয়েছে। লোভে কিংবা ভয়ে। বুদ্ধিজীবীদের হাত করার জন্য এই সরকার কত প্রকারের টোপ ফেলেছে। ১৯৫৯ সালেই প্রতিষ্ঠিত হয় রাইটার্স গিল্ড, কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব কুদরত উল্লাহ শাহাব তার উদ্যোক্তা। অনেকেই লোভ সংবরণ করতে পারেনি। যোগ দিয়েছে সেই সেই সংসদে সরকারি পুরস্কার লাভের আশায়। কণ্ঠশিল্পীদের নিয়েও অমন একটা সংসদ গঠনের প্রয়াস ছিল আইয়ুব খান সরকারের। সেটা সফল হয়নি। তবে কেউ কেউ বাংলা গান পাশাপাশি উর্দুতে গাইতে শুরু করে। সংস্কৃতিসেবীরা কিন্তু একতাবদ্ধ হয়ে পড়ে ১৯৬১-তে যখন পাকিস্তান সরকার রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া নিষেধ করল। বিচারপতি মুর্শেদকে সভাপতি আর সুফিয়া কামালকে সচিব করে গঠিত হলো রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটি। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আপামর বাঙালি ঐ এক ইস্যুতে একতাবদ্ধ হয়েছিল। তারপর একটু থেমে বলল, বাঙালিরা অমনই। যখন আঘাত আসে তারা রুখে দাঁড়ায়।
বাংলাবাজারের মুখে গাড়িটা রেখে সৈয়দ হক গলিপথ দিয়ে অগ্রসর হতে হতে বলল, এই লপ্তে তোমাকে বাংলাবাজারটাও দেখিয়ে নিই। এখানেই সব পাবলিশারের আপিস। হবু লেখক হিসেবে, এমনকি প্রতিষ্ঠিত লেখকদেরও এখানে অনেক ঘুরতে হয়েছে এবং এখনো হয়। যত নিন্দাই করি না কেন অথবা বিরক্ত হই, বাংলাবাজারের পাবলিশাররা ছিল এবং আছে বলেই আমাদের বই বের হয় ছাপা হয়ে। বলতে পার বাংলাবাজারও আমাদের জন্য আমাদের লেখকদের জন্য একটা তীর্থস্থান। একদিন একে নিয়েও একটা বড় মাপের লেখা উচিত আমাদের কারো।
চার
‘এই যে সদরঘাটের মুখে মল্লিক ব্রাদার্সের দোকানের পরে একদিকে আজিজুল হাকিম আর অন্যদিকে কবি মঈনুদ্দিন-এর বইয়ের দোকান। আলহামরা লাইব্রেরির মাঝখানেই ছিল ফজলে লোহানী আর মুস্তাফা নূরউল ইসলামের বুকস এন্ড বুকস-এর বইয়ের দোকান। খুব আধুনিক আর অগ্রসর একটি বইয়ের দোকান। ঢাকায় সেই প্রথম। চমত্কার অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ডটি আর পলিশ করা কাউন্টারটি চোখ আটকে রাখত। দরজার মুখে বইয়ের পুরো মলাট সাজানো। শোকেসটি এখনো আমার চোখে লেগে আছে। কলকাতার বই প্রকাশ হলেই এখানে এসে যেত। সিগনেটের বই এখানেই আমি দেখে উঠি। এখান থেকেই প্রথম যে দুটি বই কিনি, কবিতারই ছিল, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘মেঘ বৃষ্টি ঝড়’ আর কামাক্ষী প্রাসাদের ‘এ্যাসপিনওয়ানের আলোকস্তম্ভ’।
‘দোকানটা নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল লোহানী আর মুস্তাফার। তাঁরা একদিন সাহিত্যের বই ছাপাবেন, নতুন লেখকদের প্রাধান্য দিয়ে। সদ্য আসা বইয়ের ছাপা তালিকা পাঠানো হতো তখনকার নামী পাঠকদের কাছে। পাঠক তালিকা দেখে বই চাইলে নিখরচায় বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিত দোকানের একমাত্র কর্মচারী সুলতান। বইয়ের খবরাখবর নিয়ে ছোট্ট একটা বিলি-কাগজ বের করতেন ওরা। মুস্তাফা কলেজে অধ্যাপনা শুরু করলে সময় দিতে পারেননি এই লাইব্রেরিতে। লোহানীও নানাভাবে ব্যস্ত। তাদের কর্মচারী সুলতান তাই সুযোগ নিয়ে টাকা আত্মসাত্ করতে শুরু করে। একসময় দোকানটা বন্ধ হয়ে যায় আমাদের মন খারাপ করে দিয়ে।
‘সেই সময়, পঞ্চাশের দশকে স্কুল-কলেজের বই আর ইসলামি বই বা পঞ্জিকা ছাড়া সাহিত্যের বইয়ের প্রকাশক কেউ ছিলেন না ঢাকায়। বাবুবাজারে ছিল লুত্ফর রাহমান সাহেবের ওসমানীয়া লাইব্রেরী, কলকাতা থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয় দেশভাগের পর। ওসমানীয়া লাইব্রেরী প্রথম সাহিত্যের বই প্রকাশের চেষ্টা করে, কবিতার একটি বই আশরাফ সিদ্দিকীর ‘তালেব মাষ্টার ও অন্যান্য কবিতা’। ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্যই বইটি ছাপেন লুত্ফর রহমান। ঐ ওসমানীয়া থেকেই পরে বের হয় কাজী আফসার উদ্দীনের ‘চর ভাঙ্গা চর’ উপন্যাস।
‘বাংলাবাজার থেকে দূরে আরমানীটোলার মাঠের পাশে ছিল একটি বইয়ের দোকান, আবদুল বারী ওয়ার্সী সাহেবের ‘ওয়ার্সী বুক সেন্টার’। ঐ বইয়ের দোকানটি বাংলাবাজারে না থাকলেও বাংলাবাজারেরই প্রকাশনা পরিবারের অন্যতম সদস্য বলে মনে করা হতো।’
আনোয়ারা বলল, নিউ মার্কেটে ওদের দোকান আছে। সেখান থেকে আমি প্রায়ই বই কিনি।
সৈয়দ হক বলল, হ্যাঁ সেখানে তাদের বই বিক্রির দোকান আছে। এরা কলকাতার বই ছাড়াও দোকানে রাখতেন স্টেশনারি সামগ্রী। ওখান থেকেই পরে বেরিয়েছিল আলাউদ্দিন আল আজাদের দুটি গল্পের বই। ‘ধানকন্যা’ আর ‘মৃগনাভী’। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরেরও একটা গল্পের বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়েছিলেন ওয়ার্সী সাহেব। একশো টাকার বিনিময়ে মালিকানা স্বত্ব কিনে নিয়েছিলেন। নগদ টাকা নয়, বলেছিলেন দোকান থেকে সমমূল্যের বই কিনে নিয়ে যেতে। বোরহানউদ্দিন-এর সেই বই দিনের আলোর মুখ দেখেনি।
সৈয়দ হক আর আনোয়ারা দুজন বাংলাবাজারের গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। একটু পরপর আসছে বই আর কাগজভর্তি ঠেলাগাড়ি। রিকশা আসছে মাঝে মাঝে। দু পাশের দোকানে বসে আছে মালিক অথবা দোকানি। খুব একটা কোলাহল না হলেও চারদিকে মানুষের কণ্ঠস্বর বাংলাবাজারকে মুখর করে রেখেছে। আনোয়ারা তাকিয়ে দেখল সূর্য এখন মাথার ওপরে। সে মাথায় ঘোমটা টেনে দিল রোদের তাপ এড়াবার জন্য। তার দিকে তাকিয়ে সৈয়দ হক বলল, আর বেশিক্ষণ আমরা ঘুরব না। লাঞ্চের সময় হয়ে এসেছে। তোমার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।
আনোয়ারা রাস্তায় একটা মরা ইঁদুর এড়িয়ে যাবার জন্য সাবধানে পা ফেলে বলল, না আমার খিদে পায়নি। তুমি যা বলছিলে শেষ কর। এখানে তো বার বার আসা যাবে না। বাংলাবাজারের কাহিনি তোমার মুখ থেকে শুনে নিই।
সৈয়দ হক বলতে থাকে, এই বাংলাবাজারে যেখানে আমরা এখন হাঁটছি, এখানে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ছিল প্যারাডাইস লাইব্রেরী। আহমদ আতিকুল মাওলা ষাটের দশকের গোড়ায় দোকানটি দেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম বই ছিল আবদুস শাকুরের ‘ক্ষীয়মান’, মাদ্রাসায় তারই একদা সহপাঠীর গল্পের বই। ঐ বই দিয়েই প্রকাশনার জগতে তাঁর প্রবেশ। এর পরে পরেই তিনি আমার ‘রক্তগোলাপ’ আর ‘অনুপম দিন’ উপন্যাস ছাপলেন। তিনি, মাওলা সাহেব মালিকানা নেওয়ার আগে ঐ প্যারাডাইস লাইব্রেরী থেকে বের হয় ইকবালের কবিতা। অনুবাদ করেছিলেন ফররুখ আহমেদ, সৈয়দ আলী আহসান আর আবুল হোসেন। এর পাশাপাশি পকেট বইয়ের আকারে বের হয়েছিল ইকবালেরই ‘শিকওয়া’র বাংলা অনুবাদ। অনুবাদক আবুল কালাম মুস্তফা।
পঞ্চাশের মাঝামাঝি বাংলাবাজারের ঐ প্যরাডাইস লাইব্রেরী থেকে পিঠোপিঠি দুটি বই বের হয়। দুটিই ছোটগল্পের বই, দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ। শামসুদ্দিন আবুল কালামের ‘পথ জানা নাই’ আর ‘মেঘনায় কত জল’।
আনোয়ারা বলল, নিউ মার্কেটে ওয়ার্সী বুক সেন্টারের দোকান থেকে আমি বই দুটো কিনেছি। গল্পগুলো চমত্কার।
সৈয়দ হক বলল, প্রথম বইটির গল্প পড়ে আমি কয়েকদিন স্তব্ধ হয়েছিলাম। গল্পগুলো আমার হূদয় স্পর্শ করেছিল। তারপর একটু থেমে সে বলল, সর্দার জয়নুদ্দিনের ‘নয়ানঢুলী’ বইটিও ছাপে ওয়ার্সী বুক সেন্টার। চমত্কার প্রচ্ছদ করেছিলেন কামরুল হাসান। তখন শিল্পীদের আয়ের অন্যতম উপায় ছিল প্রচ্ছদের ছবি আঁকার আর বইয়ের ভেতর অলংকরণ। লেখকদের পাশাপাশি তাঁরাও ঘুরতেন বাংলাবাজারে, প্রকাশকদের দোকানে গিয়ে খোঁজ নিতেন কাজ আছে কি না? কিন্তু তাঁর আঁকা মেঘনায় কত জল বইয়ের প্রচ্ছদই আমার দৃষ্টি কেড়েছিল। নয়নভোলানো নীল রঙের ওপর নদীর ঢেউ কাগজের সাদায় ফুটিয়ে তোলা, নীলের ওপরই কালো রঙে কয়েকটি পায়ের ছাপ। নীল রংটা কামরুল ভাই হয়তো দিয়েছিলেন ঐ বইয়েরই ‘মেঘনায় কত জল’ গল্পটার কথা মনে করে। ওই গল্পটা পড়ার পর আমিও ভুলতে পারিনি। অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের ক্রাউন সাইজে ছিল ‘নয়ানঢুলি’র বাদামি-হলুদ প্রচ্ছদ, ঢোল বাদনরত ঢুলির একটা স্কেচ ছিল মাঝখানে।
বই দুটোর শোভা ও সজ্জা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, ঈর্ষিত হয়ে উঠেছিলাম। স্বপ্ন দেখেছিলাম আমারও বই প্যারাডাইস থেকে বের হবে। তার প্রকাশক সেই আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কী কারণে মনে হয় দোকানটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হয়তো সাহিত্যের বই বের করাটা লোকসানের ছিল তখন, সেই কারণে। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর আতিকুল মাওলা এসে মওলা ব্রাদার্স নামে বইয়ের দোকান খুললেন। এই যে দেখ, আমাদের ডান দিকে সেই দোকান। দেখতে ছোট কিন্তু মাওলা সাহেব একে নিয়েই অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন সাহিত্যের বই বার করার জন্য। বুকস এন্ড বুকসের পরে তখনকার দিনে আধুনিক রুচিসম্মত একমাত্র বইয়ের দোকান হয়ে উঠল মাওলা ব্রাদার্স। চেয়ার-টেবিলের ডিজাইন থেকে শোকেস, কাউন্টার, সাইনবোর্ড আর দেয়ালের রং একেবারে নতুন ছাঁচে সাজানো হলো। সাজানোর শিল্পী ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। হ্যাঁ, তখন শিল্পীদের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনেরও কাজ করতে হয়েছে আয়-উপার্জনের জন্য।
এই লপ্তে দুজন শখের প্রকাশকের কথা বলে নিই। প্রথম চলচ্চিত্র মাসিক পত্র ‘সিনেমা’ সম্পাদক ফজলুল হক আর চলচ্চিত্র সাপ্তাহিক ‘চিত্রালী’র সম্পাদক এসএম পারভেজ। দুজনেই সাহিত্যের বই প্রকাশ করার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলেন, যতটা না বাণিজ্যিক কারণে তার অধিক প্রাণের টানে। ফজলুল হক তাঁর ইনল্যান্ড প্রেস থেকে বের করেছিলেন জহির রায়হানের প্রথম গল্পের বই ‘সূর্যগ্রহণ’ আর পারভেজ সাহেব তখন আমার প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’ ছেপেছিলেন। কী কাঁচা সেই লেখা আমার। এখন লজ্জা পাই মনে করতে গিয়ে। ওরা কেউই প্রকাশনায় স্থির থাকেননি, দুজনেই ছিলেন শখের প্রকাশক।
এই বাংলাবাজারেই এক বইয়ের দোকানের কথা না বললে অসম্পূর্ণ হবে আমার এই রানিং কমেন্টারি। বুকস এন্ড বুকস-এর কয়েক ঘর পর এখনকার মাওলা ব্রাদার্সের পশ্চিম পার্শ্বে গলির মুখে ডান পাশে ছিল বাংলাবাজারের সবচেয়ে প্রশস্ত একটি ঘরে মোহাম্মদ নাসির আলী সাহেবের বইয়ের দোকান নওরোজ কিতাবিস্তান। তিনিও কলকাতা থেকে বই আনিয়ে নিতেন, তবে লোহানীদের মতো মার্কেটিং আর পাবলিসিটি দক্ষতা ছিল না তাঁর। অতএব, লোহানীদেরই জয়জয়কার পড়ে গিয়েছিল তখনকার বাংলাবাজারে। নওরোজ কিতাবিস্তান পঞ্চাশের দশকে কোনো সাহিত্যের বই ছাপেনি।
দুজনে হাঁটছে আর দু পাশের দোকানের দিকে তাকিয়ে দেখছে। সৈয়দ হক বলতে থাকল, পঞ্চাশের দশকে কি পাকিস্তান হওয়ার পরের বছরগুলোতে উদ্যোগী প্রকাশক দু-একজন ছাড়া ছিলেন না। তাঁদের দোষ কী? সাহিত্যের পাঠকই তৈরি হয়নি তখন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে। লেখকদের বই বেশিরভাগ লেখকরাই পড়ত। তাই বলে সাহিত্যের বই প্রকাশনা বন্ধ ছিল, তাও বলা যাবে না। লেখকরা বই ছাপাত নিজ উদ্যোগে। যেমন আমি ছেপেছিলাম ‘তাস’ গল্প সংকলন। ১৯৫০ কি আগের বছর আশরাফ সিদ্দিকী আর আবদুর রশিদ বের করেন ‘নতুন কবিতা’। তরুণ কবিদের সংকলন। পঞ্চাশের দশকের কবি—যাঁদের মধ্যে ছিলেন শামসুর রাহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, হাসান হাফিজুর রহমান আর আমি বাদে অন্য সকলের কবিতা ছাপা হয়েছিল ঐ সংকলনে। কবিদের মধ্যে বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
‘প্রকাশকের অভাবে কবি-লেখকদের নিজ উদ্যোগে বই বের করার দলে প্রথমেই ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। তিনি সেই পঞ্চাশেই তাঁর পৈতৃক টাকায় আর শামসুর রাহমানের বাবা মোখলেসুর রহমান সাহেবের প্রেস থেকে টাকা না দিয়ে ধারে প্রকাশ করেছিলেন দাঙ্গার পাঁচটি গল্প। একরঙ্গা কালো মলাটের সেই বই বিষয়ের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যময় ছিল।
তারা দুজন হাঁটছে বাংলাবাজারের গলি দিয়ে। সৈয়দ হক অনর্গল বলে যাচ্ছে ক্লান্তিহীনভাবে আর আনোয়ারা শুনছে খুব মনোযোগ দিয়ে। দোকান থেকে কৌতূহল নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে দেখছে কেউ কেউ। পথচারীদের মধ্যেও কয়েকজন চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল। খুব স্বাভাবিক নয় এই দৃশ্য, একজন যুবক আর যুবতী হেঁটে যাচ্ছে বাংলাবাজারের অপরিসর গলি দিয়ে। কোথাও থামছে না, কোনো দোকানে ঢুকছে না তারা। একজন কেবল বলেই যাচ্ছে, অন্যজন শুনছে মনোযোগ দিয়ে। একসময় সৈয়দ হক হাঁটা বন্ধ করে আনোয়ারার দিকে তাকিয়ে বলল, যথেষ্ট হয়েছে। বাংলাবাজারের প্রকাশনা জগত্ তোমার চেনা হয়ে গেল। এখন আমরা ফ্রি। তবে বিউটি বোর্ডিংয়ে না গিয়ে আমরা ইসলামপুরে যাব। সেখানকার বিখ্যাত সাইনু পাহলোয়ানের মোরগপোলাও খাওয়াব তোমাকে আজ।
ইসলামপুরের পশ্চিম মাথায় যেখানে চকবাজার শুরু তার কাছে হেঁটে হেঁটে গেল দুজন। দু দিকে পুরনো দোতলা, তিন তলা দালান। রং করার অভাবে কালচে দেখাচ্ছে দেয়াল। অনেক বাড়ির দেয়ালে পলেস্তরা খসে পড়েছে। দেয়ালে এবং ছাদে উদ্ধত ভঙ্গিতে গজিয়েছে বটের চারা। একটা দরজা খোলা দোকানের ভেতরে তাকিয়ে সৈয়দ হক বলল, হ্যাঁ এখনো মোরগপোলাও পাওয়া যাবে। দেরি করে এলে ওদের পাতিলের রান্না শেষ হয়ে যায়, যার জন্য ওরা দরজাটা বন্ধ করে দেয়। চল তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকি।
দুজনে ভেতরে ঢুকে অনেকক্ষণ অন্ধকারে ভালো করে কিছু ঠাহর করতে পারল না। সেই পুরনো অভিজ্ঞতা! মনে করে হাসল আনোয়ারা। একটু পর দেখা গেল অপরিসর লম্বা ধরনের দোকানের একদিকে চেয়ার-টেবিল পাতা, দেয়ালে পুরনো সিনেমার পোস্টার। ঘরের মেঝেটা স্যাঁতসেঁতে। দেয়ালে মাঝে মাঝে পলেস্তরা খসে পড়ে লাল ইট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সে সব তাদের বেশিক্ষণ চোখে পড়ল না, এক পাগল করা গন্ধে তারা মাতোয়ারা হয়ে উঠল যেন। মোরগপোলাও-এর গন্ধ যে এমন নেশা করার মতো হতে পারে তা ভাবতে পারেনি আনোয়ারা।
এক প্লেট মোরগপোলাওয়ের অর্ডার দিল সৈয়দ হক।
আনোয়ারা অবাক হয়ে বলল, তুমি খাবে না?
আমি খেয়ে এসেছি। সৈয়দ হক খুব স্বাভাবিক স্বরে উত্তর দিল।
একটু পর পোলাওয়ের প্লেট এল, সেইসঙ্গে আলাদা করে মুরগির তরকারি। হেঁটে হেঁটে খুব খিদে লেগেছিল আনোয়ারার। খাবার আসতেই গোগ্রাসে খেতে শুরু করল। অনেকক্ষণ পর তার মনে হলো সৈয়দ হকের মুখটা শুকনো। সে বলল, সত্যিই খেয়ে এসেছ? খাও না আমার সঙ্গে।
সৈয়দ হক মাথা নেড়ে জানাল সে খেয়ে এসেছে। কিন্তু আনোয়ারাকে খুশি করার জন্য তার প্লেট থেকে দু-এক লোকমা তুলে খেল।
খাওয়া শেষ হলে সৈয়দ হকের মুখের দিকে তাকিয়ে পোলাওয়ের প্রশংসা করতে যাবে সেই সময় আনোয়ারার মনে হলো সৈয়দ হক মিথ্যে বলেছে। সে দুপুর খায়নি। কী করে খাবে? সকাল থেকে তাকে নিয়েই তো ঘুরছে, বাংলাবাজার, বিউটি বোর্ডিং এই সব জায়গায়। কোথাও তাকে লুকিয়ে খেতে দেখেনি সে। আর লুকিয়েই বা কেন খেতে যাবে? সৈয়দ হক মিথ্যে কথা বলেছে, সে খায়নি। কেন মিথ্যে বলেছে। ওর পকেটে যে টাকা আছে তা দিয়ে মনে হয় এক প্লেটেরই অর্ডার দেওয়া যায়। সেই জন্য। হ্যাঁ, এটাই কারণ। সেই মুহূর্তে সৈয়দ হকের মুখের দিকে তাকিয়ে আনোয়ারার বড় মায়া হলো। ইচ্ছে হলো মুখটা কাছে টেনে চুমোয় চুমোয় ভরে দেয়, যা সে কোনোদিন করেনি। আজ সেটা করতে তার খুব ইচ্ছে হলো। কিন্তু তা কী করে হয়? চারদিকে এত লোক।
আনোয়ারার খাওয়া শেষ হলো। কিন্তু মনে রয়ে গেল বেদনাবোধ। হকের খাওয়া হলো না। দেরিতে টের পেল সে যে হক খায়নি। বেশ একটা অপরাধবোধ চেপে থাকল তার মনে। এঁটো হাত নিয়ে বসে আছে সে, ভাবছে সৈয়দ হকের কথা। হঠাত্ সৈয়দ হক বলল, আমরা শিগগির স্বামী-স্ত্রী হতে যাচ্ছি। ভেবে দেখেছ কেমন হবে আমাদের দাম্পত্য জীবন, মঞ্জু।
সুখের। হাসিমুখে বলল আনোয়ারা।
হুঁ। কেমন সুখের? সৈয়দ হক তাকিয়ে থাকল তার দিকে।
লেখক-দম্পতির যেমন হওয়া উচিত। তুমি লিখছ, আমি লিখছি। কেউ কারো লেখার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছি না। কে কী লিখছি তা নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে না।
লেখা শেষ হয়ে গেলেও না? সৈয়দ হক একটু অবাক হয়ে তাকায়।
না। আনোয়ারার মুখে স্মিত হাসি।
একেবারেই জানব না, কে কী লিখছি? এ কেমন কথা?
অবশ্যই জানব। ছাপা হয়ে গেলে। আনোয়ারা হাসতে হাসতে বলল।
বাহ্! চমত্কার আইডিয়া। হ্যাঁ তা-ই তো, দুজন পরিণত মনের লেখকের একসঙ্গে থেকে এমনই করা সমীচীন হবে। তুমি ঠিকই ভিজ্যুয়ালাইজ করেছ। সৈয়দ হকের মুখে হাসি। তারপর সে বলে, আমাদের সাংসারিক কাজ, সেসব কেমন হবে?
কাজের লোকরা করবে। ঐ সব নিয়ে আমরা সময় নষ্ট করব না। শুধু বলে দোবো কী চাই।
সৈয়দ হক বলল, হুঁ। আমি কিন্তু সকালে উঠে তোমাকে কফি বানিয়ে দেবো। নিজে কফির কাপ নিয়ে বসব তোমার বিছানার পাশে। তারপর পোশাক পরে নিয়ে লিখতে বসব লাইব্রেরি রুমে গিয়ে।
পোশাক পরবে কেন? আনোয়ারা তাকায় কৌতূহল নিয়ে।
বাড়ির লাইব্রেরিই আমার আপিস হবে। সেখানে আমি পোশাক পরে গিয়ে বসব লিখতে। প্রতিদিন সকালে।
আর আমি?
তুমি তো ডাক্তার। তোমাকে আপিসে যেতে হবে। তুমি নাস্তা করে তৈরি হয়ে নিলে আমি তোমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসব গেট পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে গিয়ে।
আনোয়ারা বলল, আমার আপিস করা নিয়ে তোমার কোনো আপত্তি হবে না তো?
না, হবে না। যতক্ষণ চাকরি তোমার লেখায় বিঘ্ন না সৃষ্টি করে। মনে আছে তো ভার্জানিয়া উলফ লিখেছেন, লেখকের চাই নিজের উপার্জন আর লেখার জন্য নিজের ঘর। তুমি দুটোই ম্যানেজ করতে পারবে।
তোমার খাওয়া-পরা নিয়ে দুশ্চিন্তা কি থাকবে মনে? আনোয়ারা তাকাল হকের দিকে।
দুশ্চিন্তা হবে কেন? আমিও উপার্জন করব। বই লিখে। সিনেমার ক্রিপ্ট লিখে। দরকার হলে অনুবাদ করে। আমি সব্যসাচীর মতো দু হাতে কাজ করব। বুঝলে মঞ্জু। তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে অভাব দেখা দেবে আমাদের সংসারে। আমরা তাতে একটুও ঘাবড়াব না। আর্থিক সংকট হবে সাময়িক। আমরা সব সংকটই উত্তীর্ণ হতে পারব।
আনোয়ারা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, চমত্কার হেমিংওয়ে। আমাদের যৌথ জীবনের চিত্রনাট্য খুব সুন্দর করে মনে মনে তৈরি করেছ তুমি। চলবে।
সৈয়দ হক বলল, আর হ্যাঁ। আমরা প্রায়ই ঘুরব। দেশের ভেতরে, দেশের বাইরে। মানুষকে দেখব, নানা চরিত্রের মানুষ। যা দেখব সব নোট বইতে লিখে রাখব। সমারসেট মম যেমন করতেন। নোট বইয়ের ঐ সব লেখা থেকে আমরা গল্পের, উপন্যাসের উপকরণ পাব। আমরা ঘরকুনো হয়ে থাকব না। জনবিচ্ছিন্ন হব না। সভা-সমিতিতে যাব। অন্যের কথা শুনব। আমরা আমাদের বক্তব্য রাখব বিভিন্ন ইস্যুতে। একটা সুস্থ্য মূল্যবোধ থাকবে আমাদের জীবনযাপনে।
আনোয়ারা বলল, হেমিংওয়ে, আমার ভয় হয়।
ভয়? কিসের ভয়?
লেখাকেই জীবনের ধ্রুবতারা মনে করার জন্য আমরা হয়তো সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারব না। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী তারা হয়তো নিন্দা করবে। সমালোচনার কথা বলবে।
সৈয়দ হক শুনে কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, হ্যাঁ। তা হতে পারে। কিন্তু আমরা তো নিজের জন্য কিছু করব না। সমষ্টির জন্য, সবার জন্য কাজ করে যাব। আমাদের পরিশ্রমের ফসল, সাহিত্যচর্চা হবে সবার জন্য। আমাদের কেউ স্বার্থপর বলতে পারবে না। তারপর একটু থেমে বলল, আর হ্যাঁ, একটা কাজ করতে হবে আমাকে।
কী? আনোয়ারা তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
সৈয়দ হক বলল, আমাকে ঘন ঘন কুড়িগ্রাম যেতে হবে। ওখানে আমার যে শেকড় তার সঙ্গে সম্পর্ক আরো দৃঢ় করে নিয়ে লিখতে হবে গ্রামের মানুষের কথা। বড় মাপের লেখা লিখতে চাই আমি। মানে এপিক। তবে কুড়িগ্রাম নাম দেবো না সেই এপিকের পটভূমির।
আনোয়ারা অবাক হয়ে বলল, তাহলে ঐ পটভূমিতে যে তোমার শেকড় তা জানা যাবে কী করে?
অন্য নামে পরিচিত হবে কুড়িগ্রাম আমার লেখায়। কল্পিত এক নাম দেবো আমি। কল্পিত কিন্তু বাস্তবই বটে।
আনোয়ারা বলল, হ্যাঁ, নতুনত্ব থাকবে। সেই কল্পিত জনপদ শুধু কুড়িগ্রাম নয়, এদেশের সমস্ত জনপদেরই প্রতিনিধিত্ব করবে। চমত্কার আইডিয়া হেমিংওয়ে। তুমি পারবে।
সে রাতে ডায়েরিতে আনোয়ারা লিখল :
ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৫ : আজ হককে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম আমি। সে নিজে অভুক্ত থেকে সামনে বসে আমাকে তার প্রিয় দোকানে মোরগ-পোলাও খাওয়াল। পরে বুঝতে পারলাম টাকার অভাবে সে নিজের জন্য খাবার দিতে বলেনি। শুধু আমাকে খুশি করার জন্য ইসলামপুরের ঐ বিখ্যাত দোকানে নিয়ে গেল। তার ক্ষুধার্ত মুখ দেখে আমার খুব মায়া হচ্ছিল। সেই সঙ্গে একধরনের গৌরবও বোধ করছিলাম। সে যে একটা আদর্শ নিয়ে থাকে, তার সৌজন্যবোধ প্রখর সেই বিশ্বাস আমার দৃঢ় হল।
বাংলাবাজারের নাড়ী-নক্ষত্র জানা হল আজ। সব বিখ্যাত প্রকাশকের দোকান দেখলাম যেখানে রাশি-রাশি বই র্যাকে সাজানো। চারিদিকে শুধু কাগজ আর কালির গন্ধ।
খুব মজা পেলাম হক যখন আমাদের দাম্পত্য জীবনের কল্পিত ছবিটা তুলে ধরল। তার সেই কল্পনার সঙ্গে আমিও যোগ করলাম আমার স্বপ্ন কথা। প্রবাদ আছে, মানুষ ভাবে এক আর হয় এক। আমাদের জীবনে যেন তা সত্য না হয়।
পাঁচ
পঁয়ষট্টির জানুয়ারিতে শীত যখন জেঁকে বসেছে, আনোয়ারার এমবিবিএস পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো। সে ফাইনাল পরীক্ষায় সব বিষয়ে পাস করেছে প্রথম চেষ্টাতেই। সবাই এই কৃতিত্বের অধিকারী হতে পারে না, যার জন্য তাকে অকুণ্ঠ অভিনন্দন আর প্রশংসা জানাল বন্ধুবান্ধব এমনকি কয়েকজন শিক্ষকও। আনোয়ারা খুব খুশি, এখন সে নামের আগে ডক্টর লিখতে পারবে অথবা নামের শেষে এমবিবিএস, ঢাকা। এর সঙ্গে তার আরো একটা আনন্দের বিষয় জড়িয়ে রয়েছে এই পাস করার সঙ্গে; তার এবং সৈয়দ হকের বিয়ের পথে আর কোনো বাধা থাকল না। এই পরীক্ষা পাসের জন্যই তারা অপেক্ষা করেছে দীর্ঘ দুটি বছর। এই সময়ের ভেতর বেশ ঝুঁকি ছিল তাদের সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার, নিজেদের কারণে অথবা বাইরের হস্তক্ষেপে। এমন যে কোনো সম্ভাবনাই দেখা যায়নি তার পেছনে একটাই কারণ, তারা দুজন দুজনকে খুব অন্তরঙ্গভাবে চিনেছে, জেনেছে এবং ভালোবেসেছে। যত দিন গিয়েছে তাদের ভালোবাসা কেবল অভ্যাসে পরিণত হয়নি, তার ভিতও মজবুত হয়েছে পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়া এবং উপলব্ধির ভিত্তিতে। পরীক্ষা পাস আনোয়ারার জন্য আরো একটা নতুন অনুভূতি নিয়ে এল, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ এবং তার জন্য স্বাধীনতাবোধ। এই অনুভূতি আনোয়ারাকে আবেগে আপ্লুত করল, তার মনে হলো সে এবার সত্যিই যশোরের চুড়িহাট্টার শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তবিহঙ্গের মতো আকাশে উড়তে পারবে। সে তার মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে, সেইসঙ্গে বাবারও মুখ উজ্জ্বল করেছে, এই আনন্দের অনুভূতি তাকে বিভোর করে রাখল অনেকক্ষণ। সে পরীক্ষার রেজাল্ট হাতে নিয়ে সোজা পোস্ট অফিসে গিয়ে টেলিগ্রাম পাঠাল বাবাকে, ইংরেজিতে লিখে জানাল পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হয়েছে। আব্বা ইংরেজি জানেন না, পাড়ার কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নেবেন। এছাড়া উপায় কী? টেলিগ্রামে তো ইংরেজি ছাড়া বাংলা ব্যবহার করা যায় না। এটা নিয়ে যে এখনো কেন আন্দোলন হয়নি এই বিষয়টা হঠাত্ করে তাকে বিচলিত করে তুলল। আব্বা টেলিগ্রামটা পড়ে প্রায় চিত্কার করে তাঁদের মহল্লায় আত্মীয়-স্বজনদের জানাবেন খুশির কথা—যদিও তার ঢাকায় এসে পড়াশোনা করাটা মোটেও সুনজরে দেখেনি।
সৈয়দ হক বিকেলে ফুল নিয়ে এল মেডিক্যাল কলেজের লেডিজ হোস্টেলে। শুধু আনোয়ারার জন্য নয়, তার অন্য যেসব সহপাঠী পাস করেছে তাদেরকেও একটা করে ফুলের তোড়া দিল। তারপর হেসে বলল, সময় থাকলে চলুন আমার গাড়িতে। সবাই মিলে বেবী আইসক্রিমে গিয়ে হৈ চৈ করে খাওয়া যাবে। এই খুশির খবরটা সেলিব্রেট তো করতে হয়। তার কথা শুনে সবাই হাততালি দিয়ে বলল, খুব ভালো কথা। ইট রিকোয়ার্স সেলিব্রেশন।
বেবী আইসক্রিমের মালিক এবং অভিনেতা হারুন সৈয়দ হকের বন্ধু। সে যেন আগে থেকেই জানত, তাদের সবার জন্য টেবিল রিজার্ভ করে রেখেছে। দরজার সামনে লম্বা গোঁফওয়ালা গার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে সে সবাইকে রিসিভ করল হাসিমুখে। তার সৌজন্যে চমত্কৃত হলো আনোয়ারার সব বন্ধু এবং বান্ধবী। কেবিনে বসে হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে কোহিনুর বলল, এখন শুভ কাজটা সেরে ফেলতে হয়। সৈয়দ হক বুঝতে না পেরে তার দিকে তাকিয়ে বলল, আইসক্রিম খাওয়া? সেই জন্যই তো সবাই এসেছেন এখানে। শুনে হাসিতে আনোয়ারার গায়ে ঢলে পড়ল কোহিনুর, তার দেখাদেখি অন্য বান্ধবীরাও। হাসি থামিয়ে কোহিনুর বলল, কথাসাহিত্যিক, শুভ কাজ মানে আপনাদের বিয়ে, এটা বুঝতে পারছেন না। যে পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিলেন দুজন দীর্ঘ দুই বছর তা তো শেষ হয়ে গেল। এখন বিয়ের পিঁড়েতে বসতে কোনো অসুবিধা নেই। সে কথাই বলছিলাম। মিলি হেসে বলল, একটা রেকর্ড স্থাপন করেছেন আপনারা দুজন। পাক্কা দু বছর কোর্টশিপ করেছেন। বাব্বাহ! এমন হয় না। কাউকে বললে বিশ্বাস করবে না। হাসিনা বলল, হক ভাই, এখন আর দেরি নয়। আমরা ঢাকা থাকতে থাকতেই হয়ে যাক শুভ কাজ। এরপর কে কোথায় ছড়িয়ে পড়ব ঠিক নেই।
সৈয়দ হক লাজুক ভঙ্গিতে বলল, আপনাদের বান্ধবীকে বলুন।
কোহিনুর, মিলি আর হাসিনা প্রায় একসঙ্গে আনোয়ারার দিকে তাকাল। আনোয়ারার মুখ রক্তিম হয়ে এসেছে। দেখে কোহিনুর বলল, ও মা! বন্ধু দেখি লজ্জা পাচ্ছে শুনে। যেন নতুন কথা শুনছে। কিরে, হঠাত্ এমন লজ্জাবতী লতা হয়ে গেলি যে?
আনোয়ারা চোখ নামিয়ে বলল, ধ্যাত্। থাম তো তোরা।
সৈয়দ হকের খুব ভাল লাগল আনোয়ারার ঐ লজ্জাবনত মুখ দেখে। ব্রীড়াবনত ভঙ্গিতে তাকে এখন খুব সুন্দর লাগছে, যেন নববধূ সামনে বসে। সে আবিষ্কার করল একটি মেয়ের সৌন্দর্য তার লাজুকতায়, নম্রতায় এবং স্বল্পবাক হয়ে মাথা নিচু করে রাখার মধ্যে যেমন অন্য কিছুতে তেমন নয়। এই মুহূর্তে তার খুব ইচ্ছে হলো আনোয়ারার মুখ দু হাতে তুলে তার মুখের কাছে আনে। আজও কি সে না বলবে? এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে? সে অপলকে তাকিয়ে থাকল আনোয়ারার নত মুখের দিকে।
পরদিন কোহিনুরের রুমে আনোয়ারার বান্ধবীদের বৈঠক হলো তার বিয়ে নিয়ে। তারা সবাই জানে এই বিয়েতে আনোয়ারার বাবা রাজি হবেন না, হয়তো তার মাও। অন্য বাবা-মায়ের মতো তারাও আশা করে আছেন যে, আনোয়ারা হয় ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার কাউকে বিয়ে করবে। একজন সাংবাদিক-লেখককে তাঁরা জামাই হিসেবে মেনে নিতে চাইবেন না, কেননা ঐ পেশার নামই হয়তো শোনেননি। আর শুনলেও খুব একটা দাম দেননি। বিয়ের বাজার বলতেই এখন বোঝায় সরকারি আমলা, ইঞ্জিনিয়ার অথবা ডাক্তার। শেষোক্তরাও আমলা হয় চাকরি নিয়ে, কিন্তু তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সমাজে আলাদা একটা মর্যাদা পায়। এই অবস্থায় কী করা যায় আনোয়ারা আর সৈয়দ হকের বিয়ে সুসম্পন্ন করার জন্য, এই নিয়ে অনেক আলাপ হলো বান্ধবীদের মধ্যে। শেষ পযর্ন্ত ঠিক হলো কোহিনুর আনোয়ারার বাবাকে একটা চিঠি লিখে জানাবে। সেই দিনই রাতের খাবারের পর আনোয়ারাকে পাশে নিয়ে কোহিনুর তার পড়ার টেবিলে বসে চিঠি লিখল। একটা চিঠি লেখে আর দুজনে পড়ার পর মাথা নেড়ে বলে, নাহ্! এতে হবে না। আরো ভালো করে লিখতে হবে। এইভাবে ছয়টা চিঠির খসড়া লেখার পর একটা চূড়ান্ত করা হলো। প্রথমে তার বাবাকে খুব সম্মানের সঙ্গে সম্বোধন জানাল কোহিনুর। তার প্রশংসা করল সন্তানবত্সল হওয়ার জন্য। তারপর লিখল, আমাদের বান্ধবীর জন্য একটা ভালো পাত্র পেয়েছি আমরা। আমাদের খুব পছন্দ। আনোয়ারাও পছন্দ করে তাকে। দুজন দুজনকে দেখেছে এবং তাদের একে অপরকে ভালো লেগেছে। ছেলে আনোয়ারার বাবা-মা’র কথা শুনেও খুব মুগ্ধ। ছেলেটি উচ্চশিক্ষিত, একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস লিখে নাম করেছে। মাঝে মাঝে সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেও ভালো অর্থ উপার্জন করে। ঢাকাতে তাদের বাড়ি আছে, লক্ষ্মীবাজারে। সে ইতিমধ্যে একটা গাড়ি কিনেছে। সুতরাং সে যে আনোয়ারাকে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখবে সে বিষয়ে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। এখন বাবা এবং মা রাজি হয়ে আশীর্বাদ করলেই শুভ বিয়ে সম্পন্ন করা যেতে পারে।
আনোয়ারার বাবা উত্তর দিলেন কয়েকদিন পর। তিনি লিখলেন, তুমি কে তা আমার জানা নাই। বলেছ আমার মেয়ের বান্ধবী। হতে পারে একসঙ্গে পড়ছ যখন বন্ধুত্ব হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার কাছ থেকে আমার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব শুনতে হবে এটা আশা করি নাই। তোমার চিঠি আমাকে স্তম্ভিত করেছে। আমি বেঁচে থাকতে তুমি কিংবা তোমার বান্ধবীরা আমার মেয়ের বিয়ে সাব্যস্ত করার কে? আর ছেলেটি সম্বন্ধে যা বললে তা জানার পর আমার মেয়েকে সজ্ঞানে পানিতে ফেলে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার কিংবা আমার স্ত্রীর নেই। এই বিষয়ে আমার মেয়ের সঙ্গে সরাসরি কথা হবে। তোমরা এর মধ্যে এসো না। এটা একধরনের বেয়াদবি বলেই মনে করি।
আনোয়ারা গম্ভীর হয়ে বলল, জানতাম বাবা রাজি হবেন না।
কোহিনুর চিন্তিত মুখে বলল, তাহলে উপায়?
আনোয়ারা বলল, আমাকে যশোরে গিয়ে আব্বা আর মাকে সামনাসামনি বলতে হবে। এছাড়া উপায় দেখছি না।
শুনে মিলি বলল, তোর আব্বা খুব রাগী বলেছিস। তোর কথা শুনে যদি বকাবকি এমনকি মারধর করে তোকে ঘরে বন্ধ করে রাখেন?
আনোয়ারা বলল, হ্যাঁ, আব্বার পক্ষে তা করা সম্ভব। কিন্তু আমাকে তার মুখোমুখি হতেই হবে। আমি তো আর সেই আগের মতো ছোট্ট মেয়েটি নেই। আমি এখন পূর্ণবয়স্ক এবং একজন ডাক্তার। আমার নিজের মতামত বলে কিছু থাকাটাই স্বাভাবিক। নিজের ভালোমন্দ বুঝেই আমি জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি, এই কথা বলব আব্বা আর মাকে। তাঁরা যদি বিশ্বাস করে আমাকে একা পড়াশোনা করার জন্য ঢাকায় পাঠাতে পারেন এবং এখানে পাঁচ বছর হোস্টেলে থাকার অনুমতি দিয়ে থাকেন এবং সেই সুযোগের আমি যদি অপব্যবহার না করে থাকি তাহলে এখন আমার এই সিদ্ধান্ত তাঁদের মেনে নেওয়া উচিত। এই কথা বলব আমি।
সব শুনে সৈয়দ হক বলল, আমি কি যাব তোমার সঙ্গে যশোর?
আনোয়ারা চমকে উঠে বলল, মাথা খারাপ! আগুনে ঘি ঢালা হবে তুমি আমার সঙ্গে গেলে। বিয়ের আগেই আমাদের মেলামেশা তাদের কেউ ভালো চোখে দেখবেন না। আত্মীয়স্বজনের বক্রোক্তি আর হাসিঠাট্টা তাদের মন আরো বিষিয়ে তুলবে। না, তুমি যেতে পার না। আমাকে সামলাতে হবে এই পরিস্থিতি।
সৈয়দ হক মরিয়া হয়ে বলল, তোমার বাবা সম্বন্ধে যা বলেছ এতদিন, তাতে আমি ভরসা পাচ্ছি না। হয়তো তোমাকে যশোর থেকে আসতেই দেবেন না। ওখানেই তাঁদের পছন্দমতো কাউকে এনে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবেন।
আনোয়ারা বলল, তুমি খুব এক্সট্রিম সিচুয়েশনের কথা ভাবছ। ব্যাপারটা অতদূর গড়াবে বলে আমি মনে করি না। আমার ওপর তাঁদের বিশ্বাস আছে, না হলে ঢাকায় পাঠাতেন না একা। আমি মনে করি তাঁদেরকে বোঝাতে পারব যে কোনো ভুল করছি না তোমাকে বিয়ে করতে চেয়ে। তারপরে একটু থেমে বলল, আমি প্রাপ্তবয়স্কা এবং এখন একজন দস্তুরমতো ডাক্তার। আমাকে ধমক দিয়ে নিজের মতের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবেন না তাঁরা।
সৈয়দ হক বলল, তুমি ভালো করে ভেবে দেখো। জেদ কোরো না। ঠাণ্ডা মাথায় সব ভাবতে হবে। তারপর বলল, তুমি কি তাঁদেরকে এই পর্যন্ত আমার সম্বন্ধে কিছুই বলনি?
না। আনোয়ারা চিন্তিত মুখে বলল।
সৈয়দ হক বলল, আকারে-ইঙ্গিতে জানানো উচিত ছিল। তাহলে খবরটা পেয়ে এতটা অবাক হতেন না। এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতেন না।
আনোয়ারা বলল, আগে জানালে আব্বা হয়তো আমাকে ঢাকা থেকে নিয়ে যেতেন। পড়াশোনা বাদ দিয়ে আমার বিয়ে দিয়ে দিতেন। যেমন দিয়েছেন আমার বড় বোন বুলু বু-কে। তখন তো আমার ডাক্তার পদমর্যাদা থাকত না, নিজের পায়ে দাঁড়াবার সাহসও পেতাম না। আব্বা যা বলতেন তা করতে বাধ্য হতাম। কিন্তু এখন আমি একজন ডাক্তার, যে সমাজে মর্যাদার পাত্র এবং নিজের পায়ে দাঁড়াবার যোগ্যতা রাখে। এখন আব্বা আমাকে আগের মতো অসহায় ভাবতে পারবেন না এবং আমার মতামত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার মতো নৈতিক সাহস পাবেন না। তারপর একটু থেমে বলল, না এতদিন তাঁদের তোমার সম্বন্ধে না জানিয়ে ভুল করিনি। এখনই তাঁদেরকে জানাবার উত্তম সময়। তুমি কিছু ভেবো না। বাবা আমাকে সামনে পেয়ে বকাবকি করবেন, মেজাজ দেখাবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার সিদ্ধান্ত তাঁকে মেনে নিতে হবে। এই বিশ্বাস আমার আছে। আমাকে একাই যেতে হবে যশোর। তুমি কিছু ভেবো না।
যশোরে যাওয়ার আগে আনোয়ারা তার আব্বাকে চিঠি লিখে জানাল সে আসছে। তার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে। এবার বাসে নয়, প্লেনে ঢাকা থেকে যশোর গেল আনোয়ারা। এয়ারপোর্ট থেকে রিকশা দিয়ে চুড়িহাট্টার কাছে এসে আনোয়ারা রিকশা থেকে নামল। তারপর তার পা যেন আর সামনে যেতে চায় না। সে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল তাদের মহল্লার গলির মুখে হাতে ব্যাগ নিয়ে। তাকে দেখে মহল্লার লোকজন প্রথমে খুব অবাক হলো, তারপর উত্তেজিত হয়ে আলোচনা শুরু করল নিজেদের মধ্যে দেশোয়ালি ভাষায়। আনোয়ারা বুঝল তারা তার সমালোচনাই করছে, ভালো কিছু বলছে না। সে ঢাকায় পড়তে যাওয়ার পর থেকে তারা এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়াই দেখিয়ে এসেছে, এতে সে অবাক হলো না। সে তাদেরকে প্রায় উপেক্ষা করে গলি দিয়ে বাড়িতে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কাছে আসার পর সে খুব অবাক হলো যখন মহল্লার কয়েকজন সম্ভ্রম করে তাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকল, ডাক্তার সাহেবান। হামারা লাড়কি ডাক্তার বনগেয়া।
তাদের বাড়ির দরজা খোলাই ছিল। আনোয়ারা ব্যাগ হাতে ভেতরে ঢুকে প্রায় চেঁচিয়ে তার মাকে ডাকল। তার ডাক শুনে আব্বা কিং বা মা কেউ দরজার বাইরে এলেন না। সে দরজার কাছে গেল ধীরপায়ে হেঁটে, মনে হলো যেন অন্তবিহীন পথ পেরিয়ে এসেছে সে। দরজার কাছে এসে ভেতর থেকে একটা কান্নার আওয়াজ পেল সে। কে যেন গুমরে গুমরে কাঁদছে। খুব করুণ সেই কান্নার সুর। শুনে তার বুকটা ধক করে উঠল। ভেতরে ঢুকে সে দেখল তার বাবা ভেতরের বারান্দায় হাঁটুর কাছে মাথা নিয়ে দু হাত দিয়ে ধরে রেখেছেন। কান্নার গমকে একটু পরপর কেঁপে উঠছে তার শরীর। আনোয়ারা অবাক হয়ে দেখল তার বাঘের মতো রাগী বাবা দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে শিশুর মতো কাঁদছেন। তার মা পাশে বসে তাঁর পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আনোয়ারাকে দেখে তার মা উঠে এলেন তার কাছে। তাঁর দু চোখও ভেজা। আব্বা তাকে না দেখেই বুঝলেন সে এসেছে। এবার তাঁর কান্না উঁচু নাদে উঠল। তিনি হু হু করে কেঁদে উঠলেন। প্রথমে আনোয়ারা বুঝতে পারেনি তার আব্বার কান্নার কারণ। তারপর তার মনে পড়ল যখন সে স্কুলে পড়ে কঁচি-কাঁচার আসর পাতায় লেখা ছাপা হয়, সেই সময়ে খুলনা থেকে সিরাজউদ্দৌলা নামে এক কিশোর তাদের বাড়ির ঠিকানা বার করে এসে উপস্থিত হয়েছিল এবং আব্বাকে জানিয়েছিল যে, সে তাঁর মেয়ের লেখার ভক্ত পাঠক। খুলনা থেকে এসেছে তাকে দেখতে। শুনে আব্বা মোটেই মেজাজ খারাপ করেননি। বরং খুশি হয়ে বাজারে গিয়ে মাছ কিনে এনেছেন ছেলেটাকে খাওয়ানোর জন্য। ছেলেটাকে খাওয়ানোর পর তিনি তাকে বাস স্টেশনে গিয়ে উঠিয়ে দিয়ে এসেছেন। যতক্ষণ ছেলেটা ছিল তাদের বাড়িতে তার বুক দুরু দুরু করেছে। ভেবেছে এই বুঝি তার আব্বা হুঙ্কার দিয়ে উঠবেন। মারধর না করলেও গলাধাক্কা দিয়ে ছেলেটাকে বিদায় করে দেবেন। কিন্তু তিনি তেমন কিছুই করলেন না দেখে সে খুব অবাক হয়েছিল। সিরাজউদ্দৌলা চলে যাবার পরও তিনি তাকে কিছু বললেন না। কিন্তু একটা খুব অবাক কাণ্ড হলো এরপর। ভক্ত পাঠক হিসেবে সিরাজউদ্দৌলা তার সঙ্গে আগের মতো আর পত্রালাপ করল না। আব্বা কি তাকে কিছু বলেছিলেন বিদায় দেওয়ার সময়? আনোয়ারা অনেকদিন সেই কথা ভেবেছে।
বারান্দায় আব্বাকে বসে থেকে কাঁদতে দেখে আনোয়ারার আরো একটি ঘটনা মনে পড়ে যায়। সে যখন আইএসসি পড়ছে কলেজে, সবুজ নামে পাড়ারই একটি ছেলের সঙ্গে তার খুব অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু সেটা কখনো প্রেমের পর্যায়ে যায়নি, কেননা সবুজ ছিল লম্বা আর হ্যাংলা। অমন শরীর আর চেহারার মানুষকে ভালোবাসবার কথা মনে হয়নি তার। তার আব্বার চোখে সবই ধরা পড়েছে। আনোয়ারা বুঝতে পেরেছিল যে তিনি ওত পেতে আছেন কখন সে সবুজের সঙ্গে আরো অন্তরঙ্গ হয়ে পড়ে। তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার মাকে সব বলে তাড়াতাড়ি মেয়েকে বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু আনোয়ারা তাকে সে সুযোগ দেয়নি। তবে সে কয়েকদিন শুনেছে আব্বা মাকে একান্তে বলছেন, তোমার মেয়েটি খুব রোমান্টিক স্বভাবের। দেখো কখন হুট করে ঐ ছেলেটার প্রেমে পড়ে যায়। তাহলে আমি কিন্তু দেরি করব না। সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবো। আমার বাড়িতে এই সব বেশরীয়তি কারবার চলতে পারে না।
ছেলেবেলায় পাড়ার আরেকটি ছেলের সঙ্গে সত্যি সত্যি রোমান্সে জড়িয়ে পড়েছিল আনোয়ারা। ছেলেটির নাম মুকুল। পাড়ার নামকরা ছেলে। লেখাপড়ায় চৌকস, খেলাধুলায় চ্যাম্পিয়ন। গান করে মিষ্টি গলায়। আবার ভালো ছবিও আঁকে। দেখতে রাজপুত্রের মতো। কিছুটা বড় হওয়ার পর যখন এসব বুঝবার ক্ষমতা হলো, মুকুলকে দেখে আনোয়ারার মুগ্ধতার সীমা থাকল না। একটা ছেলের মধ্যে এত সব গুণ থাকতে পারে, তার বিশ্বাসই হতে চায় না। কিন্তু মুকুলের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গতা জমে ওঠে না। মুকুল তাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, সে চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে। বাড়ির বাইরে গিয়ে দাঁড়াবার সাহস হয় না, ডেকে আনা তো দূরের কথা। আব্বার কড়া হুকুম, স্কুল ছাড়া তার কোনো অজুহাতেই বাইরে যাওয়া চলবে না। ঘরের ভেতরে থেকেই আনোয়ারা আকুলি-বিকুলি করে। মুকুল তার সারা সত্তা জুড়ে, কিন্তু তাকে তার মনের কথা বলা হয় না। সে ভাবে, আমার কি কোনো অসুখ হয়েছে? আমি একটা ছেলের কথা শয়নে-স্বপনে কেন ভাবি? আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে সে কেন বসে আছে। এই অসুখের নাম কী। একদিন মুকুল আচমকা তার ঘরে ঢুকে পড়ে মুখভরা হাসি নিয়ে—যেন এমনভাবে আসাটা তার জন্য খুব স্বাভাবিক। সে ঘরের ভেতরে এসে আনোয়ারার মুখের চিবুক তুলে ধরে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা চুমো খাব। একটা মাত্র চুমো, খেতে দিবি। মুকুলের আদরে যেন প্লাবিত হয়ে গেল আনোয়ারার শরীর ও মন। যে বদ্ধ পরিবেশে কাটে তার দিন এবং রাত সেখানে যেন হঠাত্ করে অনেকগুলো জানালা খুলে গেল। আনোয়ারার হাতে বাঁধানো কবিতা লেখার খাতা দেখে মুকুল সেটা হাতে নিয়ে সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে লিখে দিল তার নাম, আনোয়ারা বেগম চৌধুরী। সেই অন্য কেউ অমন করে তার নামটা লিখে দিল। দারুণভাবে রোমাঞ্চিত হলো সে। আগেই সে কবিতা আর গল্প লিখত। সেগুলো ছাপা হতো পত্রিকায় ছোটদের পাতায়। মুকুলের স্পর্শ পাওয়ার পর আনোয়ারার শরীরে ও মনে লেখার উন্মাদনা সৃষ্টি করল জোয়ারের। প্লট মনে আসে, সঙ্গে সঙ্গে সে প্লট সাজিয়ে ফেলে এবং লিখতে বসে। সে লেখে হলুদ খামে, লেখা শেষ হলে পোস্ট করে পাঠায় পত্রিকায়। সেই সব লেখা ছাপা হলে সে পড়ে, মুকুলকে পড়তে দেয়। দিনরাত তখন শুধু তার লেখার চিন্তা। মাথায় শুধু নতুন লেখার ফুলঝুরি। কঁচি-কাঁচার আসরের পাতা মানেই আনোয়ারা বেগম চৌধুরী। মুকুলকে কাছে পেয়ে আনোয়ারার সৃজনশীলতার ধারা আরো বেগবান হয়ে গেল। ক্লাসের লেখাপড়াতেও সে এগিয়ে থাকল। ক্লাস সেভেন থেকে এইটে উঠল ফার্স্ট হয়ে। লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হবার বাসনা তার মনে। মুকুল তার এই বাসনাকে উত্সাহ দিয়ে যাচ্ছে। ক্লাসের সব মেয়েই লেখে তারা বড় হয়ে ডাক্তার হবে, জনগণের সেবায় উত্সর্গ করবে নিজেকে। আনোয়ারা তার ডায়েরিতে লেখে যে বড় হয়ে লেখক হবে, লেখক হবার ভেতর দিয়েই সে করবে জনসেবা।
বাবার চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও মায়ের কাছে একদিন ধরা পড়ে গেল আনোয়ারা। মা কান্নাকাটি শুরু করলেন কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে পাছে কেউ দেখে ফেলে। তিনি কাঁদেন গোপনে, ভাড়ার ঘরে মুখ চেপে, ঘরের কোণে, দরজার আড়ালে। মা কাঁদেন আর বলতে থাকেন, তোর ওপর কত আশা করেছিলাম আমি। আর তুই এভাবে আমাকে আঘাত দিলি! ওই ছেলেকে বিয়ে করলে শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে হেঁসেলে ঢুকবি, যেমন ঢুকেছে তোর বড় বোন। মুখে রক্ত উঠে যাবে সংসারের ঘানি টানতে টানতে। চোখে তোর অন্ধকার নেমে আসবে। আমাকে দেখে বুঝতে পারিসনি কিংবা তোর বোনকে দেখে।
মায়ের এতসব কথা, সতর্কবাণী আনোয়ারার কানে ঢোকে না, ঢুকলেও অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। অবশেষে একদিন তার মা বলে বসলেন, তোর ভেতর দিয়ে আমি ব্যর্থ জীবনের স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা দেখেছি। কিন্তু তুই যে এইভাবে আমার স্বপ্নকে ধূলিস্যাত্ করে দিবি ভাবতে পারিনি। মায়ের কান্না এবং এই করুণ আর্তনাদ শোনার পরও আনোয়ারার ভেতরে কোনো পরিবর্তন আসে না। তার সমস্ত সত্তা জুড়ে তখন কেবল একজনই—মুকুল। এরপর একদিন আনোয়ারা দেখে তার মা ভেতরকার ঘরের বারান্দায় বাবাকে সব বলছেন। মা কাঁদছেন না, খুব স্বাভাবিক স্বরে গুছিয়ে কথাগুলো বলছেন। আনোয়ারা যে কোনো মুহূর্তে তার আব্বার হুঙ্কারধ্বনি আর মারধরের জন্য তৈরি হচ্ছে। সে মনে মনে ঠিক করে নিল, তার আব্বা সব শোনার পর যা-ই করুন না কেন সে শক্ত হয়ে থাকবে। সে কয়েকদিন আগে রূপমহলে ‘দুলারী’ সিনেমা দেখেছে। সেই সিনেমায় মধুবালা প্রেমের জন্য কত কষ্টই না পেয়েছে। কিন্তু প্রেম ছেড়ে দেয়নি। সে তার আব্বার মতোই জেদী। সেটা তার আব্বা এবং মা দুজনেই জানেন। সে রিকশা এবং পর্দাকে বিদায় দিয়েছে স্কুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। মাথার ঘোমটাকেও বিদায় করেছে। মানা করা সত্ত্বেও সে পাড়ার বাইরে বন্ধুদের বাড়ি যায়, সুযোগ পেলেই গল্পের বই পড়ে। সে তার বাবার পকেট থেকে প্রচুর পয়সা চুরি করেছে, তাকে প্রচুর মিথ্যা কথা বলেছে। রাগ করে মায়ের শখের তৈরি গদি বিছানা পেশাব করে ভিজিয়েছে। বাবা জেদ করলেও উর্দু পড়েনি সে, উর্দুতে কথা বলা শেখেনি। যে বাংলা ভাষার জন্য ঢাকায় ছেলেরা প্রাণ দিয়েছে সেই ভাষাতেই সে গল্প আর কবিতা লেখে। বাবা জোর করলেও সে গোষ্ঠীর দেশোয়ালি ভাষায় কথা বলেনি। তারা বিহারের সাসারান থেকে আসা মহাজের এ কথাও কোনোদিন স্বীকার করেনি। এই রকম স্বভাবের মেয়ে হয়ে সে তার বাবার রাগের হুঙ্কার কিংবা মারধরের তোয়াক্কা না করে বারান্দার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকল—শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখার জন্য।
একটু পর তার মায়ের বক্তব্য শেষ হলো। তারপর এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এল বাড়ির ভেতর। আনোয়ারা নির্ভীক হয়ে খুব শান্তভাবে অপেক্ষা করতে থাকল তার বাবার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। কিন্তু কোনো হুঙ্কারধ্বনি উঠল না বারান্দায় বসে থাকা মানুষটার মুখ থেকে। হঠাত্ নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল খান খান হয়ে। পুরুষ কণ্ঠে কান্নার ধ্বনি উঠল। ক্রমেই উঁচু নাদে উঠল সেই ধ্বনি। আনোয়ারা অবাক হয়ে দেখল তার বাঘ বলে পরিচিত বাবা উবু হয়ে বসে বসে কাঁদছেন। পৃথিবীটা হঠাত্ তার চোখের সামনে দুলে উঠল। আমার বাবা, বাঘ বাবা শিশুর মতো কাঁদছেন! এ দুঃখ কোথায় রাখি আমি? দাঁড়িয়ে থেকে ভাবল আনোয়ারা।
এরপর মুকুল তার জীবন থেকে সরে গেল, ধীরে ধীরে নয়, এক ধাক্কায়। আনোয়ারাই সরিয়ে দিল তাকে।
আজ, এত বছর পর আনোয়ারা তার বাবাকে দেখল ঠিক সেদিনের মতো তার বাবা বারান্দায় বসে কাঁদছেন, যেদিন তার মা তাঁকে মুকুলের ব্যাপারটা জানিয়েছিল। সেই কান্না শুনে আনোয়ারা মুকুলকে ভুলতে হবে এই সংকল্প নিয়েছিল। সেই সংকল্পে সে ছিল অটল। সে মুকুলকে ভুলতে পেরেছিল। বাবার কান্না তাকে দিয়ে সেই অসম্ভব কাজটা করিয়েছিল। কিন্তু এখন তো তা হবে না! আনোয়ারা এখন বয়সে অনেক বড় হয়েছে। সে এখন পাস করা ডাক্তার। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে সে। সাধ-আহ্লাদ জলাঞ্জলি দিতে হবে না অন্যের কথা ভেবে। সৈয়দ হকের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক তা অটুট থাকবে। তার সংকল্পের এবং সিদ্ধান্তের কথা সে অবিচল ভঙ্গিতে জানাবে বাবাকে। এক চুলও সরে আসবে না সেই সিদ্ধান্ত থেকে।
বারান্দায় বসে বাবা কান্না থামিয়েছেন, বোধ করি টের পেয়েছেন আনোয়ারা এসেছে। কিন্তু তিনি পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন না। পায়ের আওয়াজ পেয়েও তার দিকে ফিরে তাকালেন না একবারও। তার মা তাকে নিয়ে ভেতরের ঘরে গিয়ে বললেন, তুই একজন লেখককে বিয়ে করবি শুনে তিনি ভেঙে পড়েছেন। শোনার পর থেকেই তিনি হঠাত্ হঠাত্ কাঁদতে থাকেন।
আনোয়ারা বলে, শুধু লেখক না মা। সে অন্য কাজও করে। বাড়ি আছে, গাড়ি আছে তার।
রাতে খাওয়ার পর বাবা বললেন, তোর মা ঢাকা গিয়ে ছেলেকে দেখে আসবে। দেখে এসে আমাকে বলবে। তুই ছেলে মানুষ। সবকিছু বোঝার ক্ষমতা হয়নি। মুরুব্বিরা দেখে আসুক ছেলেটা কেমন। তোর স্বামী হয়ে তোকে সুখী করতে পারবে কি না। মা-বাবা হয়ে আমাদের তো এইটুকু নিশ্চিত হতেই হবে।
শুনে আনোয়ারা কিছু বলল না। মনে মনে ভাবল, বেশ তো মা চলুক ঢাকা। দেখুক সৈয়দ হককে। সে তো পছন্দ করার মতোই ছেলে। মা তাকে পছন্দ না করে পারবে না।
আনোয়ারার মা তাকে নিয়েই ঢাকা এলেন কয়েকদিন পর। সঙ্গে তার ছোট ভাই তাপস আর ছোট বোন বিউটি। তাদেরকে ওঠানো হলো কোহিনুরদের তেজগাঁওয়ের বাড়িতে। হোটেলে রাখাটা কেমন যেন মনে হলো আনোয়ারার কাছে। কোহিনুর তার মতের প্রতি সমর্থন জানাল। পরদিনই সৈয়দ হক গাড়ি নিয়ে দেখা করতে এল তার মায়ের সঙ্গে। হাসিমুখে কথা বলল সপ্রতিভ হয়ে। এমন ভাব তার যেন কতদিনের চেনা। আনোয়ারা জানে এটা তার অভিনয় না। সে খুব স্বাভাবিক হয়েই এমন ব্যবহার করে থাকে। আনোয়ারার মনে হলো, সৈয়দ হককে দেখে তার মা খুব একটা হতাশ হলেন না। তার কথা শুনলেন খুব আগ্রহ নিয়ে। সৈয়দ হকের পরিবার সম্বন্ধে দু-একটা প্রশ্ন করলেন তিনি। সৈয়দ হক কিছুক্ষণ পর তাপসকে তার গাড়িতে করে গুলিস্তানে বেবী আইসক্রিম খেতে নিয়ে গেল। কিন্তু তারা একটু পরই ফিরে এল। কী ব্যাপার? দোকান কি বন্ধ? সৈয়দ হক হাসতে হাসতে বলল, তোমার ভাই কিছুতেই বেবী আইসক্রিমের ভেতর ঢুকবে না। দোকানের সামনে ঐ যে লম্বা গোঁফওয়ালা দারোয়ান, তাকে দেখে তোমার ভাইয়ের ভীষণ ভয়। শুনে আনোয়ারা আর তার মা বেশ হাসলেন। তার মা বললেন, আমার ছেলে পুলিশ দেখলেই ভয় পায়। তারপর বললেন, লোকটা বুঝি পুলিশের মতো? সৈয়দ হক বলল, দেখতে অমন মনে হতে পারে কিন্তু তার হাতে রাইফেল নেই। লাঠি।
এদিকে আরেক কাণ্ড বাধিয়ে বসল আনোয়ারার বোন বিউটি। সে সৈয়দ হকের সঙ্গে লক্ষ্মীবাজারে তাদের বাড়িতে গেল বেড়াতে। ফিরে এসে খুব উত্তেজিত স্বরে তাদের মাকে বলল, মা ঐ বাড়িতে পায়খানা নেই। বিজলিবাতি জ্বলে না। ওখানে বু কে বিয়ে দিও না।
শুনে মা আনোয়ারার দিকে তাকালেন। আনোয়ারা বলল, পাকা পায়খানা এখন নেই, একদিন হবে। ঢাকায় অনেকেরই নেই। যশোরে আমাদেরও তো ছিল না একসময়। শুনে তার মা কী যেন ভাবলেন। তারপর স্বগতোক্তির মতো বললেন, এতগুলো ভাইবোন! এই ছেলেকেই দেখতে হচ্ছে তাদের। যে মেয়ে তাকে বিয়ে করবে তাকেও দেখতে হবে অতগুলো ননদ-ননদী। তাহলে তুই নিজের ভাইবোনদের দেখাশোনা করবি কী করে? তোকেই তো ওদের মানুষ করতে হবে রে। তাঁর স্বরে হতাশা আর শঙ্কা জড়ানো।
আনোয়ারা তার মায়ের পিঠ জড়িয়ে ধরে বলল, আমি সব পারব মা। তুমি যা যা আশা কর আমার কাছ থেকে সবই হবে।
পরদিন আনোয়ারার মা তার ছোট ভাইবোনদের নিয়ে যশোর চলে গেলেন। যাবার আগে বললেন, তোর বাবাকে সব বলব। ভালো দিক আছে ছেলেটার, আবার পরিবারের কথা ভাবলে একটু যেন পিছিয়ে আসতে ইচ্ছা করে। দেখি তোর বাবা কী সিদ্ধান্ত নেন। আমি বাড়িয়ে কিছু বলব না। ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়েছে এ কথার ওপর জোর দেবো।
কয়েকদিন পরই আনোয়ারা বুঝতে পারল তার বাবা মায়ের কথা শুনে খুব খুশি হননি, বরং কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। তিনি আশা করেছিলেন তাঁর স্ত্রী যশোরে ফিরে গিয়ে তাঁকে বলবেন যে ছেলে পছন্দ হয়নি। কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে ছেলে সম্বন্ধে ভালো কথাই শুনলেন। আনোয়ারার বাবা তখন রাগ করে তার মাকে হুমকি দিয়ে বললেন, লিখে কয় পয়সা রোজগার করবে ঐ ছেলে, এ্যা? একটা পুরনো সবুজ গাড়ি দেখিয়ে সে তোমার মেয়েকে পটিয়ে ফেলেছে। তোমাকে পাঠালাম সব খবর জেনে আসতে, তুমি ফিরে এসে বলছ ছেলে খুব ভালো। তার মানে ঐ ছেলে তোমাকেও বশ করেছে।
শুনে আনোয়ারা এত টেনশনের মধ্যেও হাসল মনে মনে। তার বাবা জানেন না যে, ঐ সবুজ গাড়ির অবস্থা এখন যাই তো, তখন যাই। ইঞ্জিন খুব খারাপ। কখন যে মুখ থুবড়ে পড়বে তার ঠিক নেই।
কয়েকদিন পর আনোয়ারার বাবা তাকে চিঠি লিখলেন, জানালেন যে তিনি তার পাড়ার এক বন্ধুকে নিয়ে ঢাকা আসছেন। ছেলেকে তিনি দেখবেন সামনাসামনি। কয়েকদিন পর তার বাবা সত্যি সত্যি ঢাকায় এলেন পাড়ার এক বন্ধুকে নিয়ে যাকে তারা সিকদার চাচা বলে ডাকে। তিনি প্রতিবেশীদের মধ্যে বাবার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কাউকে সঙ্গে আনলেন না। কেননা, তিনি জানেন যে, তারা তার এই সংকট দেখে সাহায্যের পরিবর্তে হাসিঠাট্টা করবে বেশি।
সৈয়দ হকের সঙ্গে তার বাবার আলাপের পর দুজনে ইমপ্রেসড হয়ে গেলেন। সৈয়দ হক কোনো অভিনয় বা ভান করে না, তার আচার-আচরণ এবং কথাবার্তা সবই স্বাভাবিক। তার স্বভাবসিদ্ধ সপ্রতিভতা দিয়েই সে আনোয়ারার বাবা আর সিকদার চাচার মন জয় করে ফেলল। তার বাবা সিকদার চাচাকে বললেন, ছেলেটা খুব আত্মবিশ্বাসী আর চটপটে। স্মার্ট। তার বাবার মুখের ইংরেজি কথাটা শুনে আনোয়ারার হাসি পেল। তিনি কবে যে এই শব্দটা শিখেছেন তা তার জানা নেই। তার চাচা বাবাকে বললেন, হ্যাঁ, ছেলেটা উন্নতি করবে। দেখেন না এখনই একটা গাড়ি কিনে ফেলেছে। আনোয়ারা দেখল, হকের গাড়ি কেনাটা তাদের পক্ষে দারুণ কাজ করল।
এরপর কথাবার্তা বলার জন্য আনোয়ারার বাবা ছেলের গার্ডিয়ানদের আসতে বললেন। কিন্তু গার্ডিয়ান পাবেন কোথায়! সব তো মরে গেছে। হকের মা বেঁচে আছেন, কিন্তু তিনি থাকেন কুড়িগ্রামে। তাছাড়া মহিলা হিসেবে তিনি অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে কি কথা বলবেন। হকের এক ফুফাত ভাই আছেন। কিন্তু তিনি তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী নন। ইতিমধ্যে পারিবারিক ব্যবসা হোমিওপ্যাথির অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এতই হিংস্রপ্রকৃতির সেই ফুফাত ভাই যে, হক এবং তার সম্বন্ধে বানিয়ে বানিয়ে এমন কথা বলবেন যার ফলে আনোয়ারার বাবার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। সুতরাং নিজের গার্ডিয়ান নিজেই সাজল সৈয়দ হক। নিজেই তার হবু শ্বশুরের সঙ্গে গুরুগম্ভীর হয়ে বিয়ের কথা চালাল। দেনমোহর কত, মেয়েকে বিয়ের সময় কী কী দিতে চায়, বিয়ের পর মেয়ে কোথায় থাকবে, এই সব নিয়ে কথা হলো। লক্ষ্মীবাজারের বাড়িতে বসেই পাকা কথা হলো যে, উনিশে নভেম্বর, উনিশশো পঁয়ষট্টি শুভবিবাহ সম্পন্ন হবে। বিয়ের অনুষ্ঠান হতে পারে ঢাকায় অথবা যশোরে, মেয়ের পক্ষ যেমন চায়। এইভাবে বিয়ের কথাবার্তা খুব সুন্দর এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পূর্ণ করল সৈয়দ হক আনোয়ারার বাবার সঙ্গে। তার বাবা লক্ষ্মীবাজারের বাসা থেকে ফিরে আসার সময় একান্তে পেয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হককে বলল, হেমিংওয়ে, তুমি যে একজন জাদুকর জানা ছিল না।
ছয়
আনোয়ারা সৈয়দ হকের দিকে তাকিয়ে বলল, ক দিন থেকে বেশ কাশছ। তোমার গায়ের জ্বরটাও যাচ্ছে না। ডাক্তার দেখিয়েছ?
হক যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে, সে-ই সেটা থেকে বেরিয়ে এসে বলল, আমার মাঝে মাঝে এমন হয়। এটা এমন কিছু না।
আনোয়ারা বলল, কোনো ওষুধ খাও না?
খাই। ম্যাকট্রিবল ট্যাবলেট। দিনে দুটো করে।
কে প্রেসক্রাইব করেছেন? আনোয়ারা জানতে চায়?
সৈয়দ হক বলে, ডক্টর মাহবুব বলে এক ডাক্তারের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে অনেকদিন থেকে। তিনি জিন্নাহ অ্যাভিনিউতে বসেন তাঁর চেম্বারে।
সৈয়দ হকের জ্বরটা এবার ক দিনের মধ্যে চলে গেল না, আগের মতো। সেইসঙ্গে তার কাশিও বাড়ল। দেখে আনোয়ারা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, এস মেডিক্যাল কলেজে। সেখানে আমার একজন জানাশোনা রেডিওলজিস্ট আছেন। তোমার একটা এক্সরে করিয়ে নিই।
এক্সরে? এক্সরে কেন? হক তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকায়।
এমনি চেকআপ। রুটিন বলতে পার।
এক্সরে করার ব্যাপারে সৈয়দ হকের খুব একটা আগ্রহ ছিল না, কিন্তু আনোয়ারার চাপে তাকে যেতে হলো মেডিক্যাল কলেজে। আনোয়ারার পরিচিত ডাক্তার খুব কম সময়ে এক্সরে করে বলল, আজ বিকেলেই রিপোর্ট পাবেন।
আনোয়ারা পরদিন সকালে এক্সরে রিপোর্ট হাতে দেখা করল সৈয়দ হকের সঙ্গে। তাকে খুব উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সৈয়দ হক তার দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু পাওয়া গেল? এক্সরে রিপোর্ট কী বলে?
আনোয়ারা গম্ভীর মুখে বলল, তোমার শরীর খুব খারাপ। এতদিন ডাক্তার দেখাওনি কেন? আমাকে বললেও পারতে। আমি কত স্পেশালিস্টকে চিনি।
সৈয়দ হক বলল, কী হয়েছে আমার? ডাক্তার কী বললেন?
আনোয়ারা বলল, ডাক্তার বললেন, তোমার দুটো লাংসেই ইনফেকশন। শিগগির চিকিত্সা করাতে হবে।
কিসের ইনফেকশন? সৈয়দ হক কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করল?
আনোয়ারা এবার সৈয়দ হকের মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, তোমার যক্ষ্মা হয়েছে। টিবি। তবে চিকিত্সা করলে ঠিক হয়ে যাবে।
শুনে সৈয়দ হক প্রথমে একটু চমকাল। তারপর হেসে বলল, কবি-লেখকদের এই রকমই হয়ে থাকে। এতে চিন্তার কী আছে? অনেক নামী-দামি লেখকের এই রাজরোগ হয়েছে। আমি তাহলে জাতে উঠলাম।
আনোয়ারা সৈয়দ হকের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার ভঙ্গি দেখে অবাক হলো। সেইসঙ্গে একটু হতাশও। তাকে এখনো সিরিয়াস মনে হচ্ছে না তার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে। সে গম্ভীর মুখে বলল, এটা খুব খারাপ অসুখ। সময়মতো চিকিত্সা না হলে...। সে কথা শেষ করে না।
না হলে?
আনোয়ারা বলল, খুব ক্ষতি হবে। দারুণ ক্ষতি হবে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আর অবহেলা করা যায় না। চল, আজ বিকেলেই মহাখালী টিবি ইনস্টিউটে তোমাকে নিয়ে যাই। ঐ হাসপাতালের প্রধানের ছেলের সঙ্গে আমার জানাশোনা আছে। আজকেই অ্যাপোয়নমেন্ট করে নেব। সেদিন দুপুরেই ক্লাসের পর আনোয়ারা, কোহিনুর আর তার স্বামী মিলে তাদের ক্লাসমেট বাবলুর বাবার কাছে গেল হককে নিয়ে। ডক্টর লুত্ফুর রহমান টিবি হাসপাতালের সুপার। তাঁর কাছে যাওয়ার আগে বাবলুকে বলা হয়েছে, সে যেন তার বাবাকে বলে হাসপাতালে সৈয়দ হকের ভর্তির ব্যবস্থা করে দেয়। হাসপাতালে ভর্তি করতে গেলে এমন ধরাধরি করতে হয় জানা ছিল তাদের সবার। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ভর্তি হওয়া নিয়ে না, হাসপাতালের খরচ নিয়ে। ডাক্তার লুত্ফুর বললেন, হকের চিকিত্সা করতে অন্তত তিন মাস লাগবে। খরচ হবে কম করে হলেও সাতশো টাকা। শুনে আনোয়ারার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল যেন। সে জানে সৈয়দ হকের কাছে অত টাকা নেই। সৈয়দ হকও একটু বিচলিত হলো শুনে। তারপর তার স্বভাবসুলভ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে বলল, ভেবো না টাকা জোগাড় হবে।
সেদিন সন্ধ্যায় সৈয়দ হক ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে মুনীর চৌধুরীর বাসায় গেল। তিনি বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। তাকে দেখে কাজের ছেলেকে এক কাপ চা দিতে বললেন। সেইসঙ্গে বিস্কুট। সৈয়দ হক আসার আগে থেকেই তার মুখে রুমাল চাপা দিয়ে রেখেছে, কথা বলছে মুখ রুমাল চাপা রেখেই। চায়ের কথা শুনে সে প্রবলভাবে মাথা নাড়ল। কিছু বলল না। মুনীর চৌধুরী বললেন, চা খাবে না? খেয়ে এসেছ বুঝি? তা এক কাপ চা সবসময়ই খাওয়া যায়।
তাঁর কথা শোনার পরও সৈয়দ হক মুখ থেকে রুমাল না সরিয়ে অস্ফুট স্বরে কিছু বলল। কী বলল তা বোঝা গেল না। মুনীর চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন, অমন করছ কেন? মুখে রুমাল চাপা দিয়ে রেখেছ, কারণ কী?
সৈয়দ হক মুখ থেকে রুমাল একটু সরিয়ে ফ্যাসফেসে গলায় বলল, স্যার, আমার যক্ষ্মা হয়েছে। শুনে মুনীর চৌধুরী প্রথমে একটু চমকে উঠলেন। তারপর সাহস দিয়ে বললেন, ওই অসুখ অনেকেরই হয়। আজকাল খুব ভালো ওষুধ বেরিয়েছে। আগে ছিল না যার জন্য ঐ রোগ হলেই রোগী মারা যেত। এখন সময়মতো চিকিত্সা করলে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠা যায়। তুমিও উঠবে। চিন্তা কোরো না। এখন চা খাও দেখি।
সৈয়দ হক রুমাল আরো একটু সরিয়ে বলল, খুব ছোঁয়াচে রোগ স্যার। আমি চা খেলে কাপে টিবির বীজানু লেগে থাকবে।
এবার মুনীর চৌধুরী তাকে ধমক দিয়ে বললেন, রাখো তো তোমার আজে বাজে কথা। নিশ্চিতে চা খাও। ঐ কাপ গরম পানি দিয়ে ধুলেই হয়ে যাবে। তারপর বললেন, চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছ?
সৈয়দ হক বলল, সেই জন্যই এলাম আপনার কাছে।
মুনীর চৌধুরী বুঝতে না পেরে বললেন, আমার কাছে? মানে আমি কোনো ডাক্তার চিনি কি না সেটা জানতে?
সৈয়দ হক বলল, ডাক্তার বলেছেন, চিকিত্সা করতে সাতশো টাকা লাগবে। আমার কাছে কোনো টাকা নেই স্যার।
মুনীর চৌধুরী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর শান্ত স্বরে বললেন, টাকা নেই, না? হ্যাঁ, সাতশো অনেক টাকা। তারপর খুব নিশ্চিত মনে বললেন, চা খেয়ে বাড়ি যাও।
সৈয়দ হক বুঝল, মুনীর স্যার তাকে সাহায্য করতে পারবেন না। সে অর্ধেক চা খেয়ে মন খারাপ করে লক্ষ্মীবাজারের বাড়িতে চলে এল। রাত দশটার দিকে কে যেন এসে তার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ছে বলে মনে হলো। সে একটু বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলল। দেখল একটা সাইকেল নিয়ে এক পিয়ন দাঁড়িয়ে আছে। পোস্ট অফিসের? মনে মনে ভাবল সে। পিয়ন তার হাতের দিকে একটা খাম বাড়িয়ে দিয়ে বলল, স্যার পাঠাইছে।
সৈয়দ হক অবাক হয়ে বলল, স্যার? কোন স্যার? কী এই খামে? বলতে বলতে সে খামটা খুলল। ভেতরে টাকা। সে গুনে দেখল—সাতশো। তার গোনা শেষ হওয়ার আগেই পিয়ন বলল, মুনীর স্যার পাঠাইছে।
পিয়নের বলার দরকার ছিল না। সৈয়দ হক টাকা দেখেই বুঝতে পেরেছে। কৃতজ্ঞতায় তার দুই চোখ পানিতে ভরে এল। সে চোখের পানি মুছতে মুছতে দরজা বন্ধ করে শোবার ঘরে এসে ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকাল। সে আগে এ রকম কিছু ভাবেনি, এই মুহূর্তে মনে হলো ওপরে কেউ একজন আছেন।
পরদিন সকালেই মহাখালী টিবি হাসপাতালে ভর্তি হলো সৈয়দ হক। আনোয়ারাই নিয়ে গেল তাকে সেখানে। চিকিত্সা শুরু হলো সঙ্গে সঙ্গে। আনোয়ারা সাহস দিয়ে বলল, এই তো ক দিনেই ভালো হয়ে যাবে। স্ট্রেপটোমাইসিন খুব পাওয়ারফুল ইনজেকশন। এটা নিয়মমতো দেওয়া হলে তোমার লাংসের ইনফেকশন ভালো হয়ে যাবে।
সৈয়দ হক বলল, তিন মাস থাকতে হবে হাসপাতালে?
আনোয়ারা বলল, হ্যাঁ, তা-ই তো বললেন ডাক্তার।
সৈয়দ হক বলল, এখানে এতদিন আমি একা থাকতে পারব না। ডাক্তারকে বলে দেখো তো চিকিত্সার সময় কমানো যায় কি না?
আনোয়ারা বলল, পাগলামি কোরো না। ডাক্তার যা বলেন তার কথামতো চলতে হবে তোমাকে। মনে রেখো এটা খুব খারাপ অসুখ।
পনেরো দিন পর সৈয়দ হক একটু হতাশার সঙ্গে বলল, এখনো কাশছি। জ্বরও ছেড়ে যায়নি। আমি কি সত্যিই ভালো হব মঞ্জু?
অবশ্যই হবে। ডাক্তার তা-ই বলেছেন। আমিও তা-ই মনে করি। তুমি দুশ্চিন্তা কোরো না।
সৈয়দ হক সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ আমাকে সেরে উঠতে হবে। বাঁচতে হবে আরো বহুদিন। আমার সব কাজই তো অসমাপ্ত। যেসব গল্প-কবিতা, উপন্যাস লিখব সেসব কিছুই লেখা হয়নি। কুড়িগ্রাম নিয়ে এপিক লেখার যে স্বপ্ন আমার তা তো শুরুই করা যায়নি। দেশে লেখক হিসেবে আমাকে ক জন জানে? আমাকে বিখ্যাত লেখক হতে হবে। শুধু নিজদেশে খ্যাত নয়, বিদেশেও পরিচিত হতে হবে। তারপর সে হঠাত্ আনোয়ারার দিকে দুই হাত বাড়িয়ে অনুনয়ের স্বরে বলল, লেখার জন্যই আমাকে বাঁচতে হবে মঞ্জু। আমাকে বাঁচতে হবে।
আনোয়ারা তার হাত চেপে ধরে বলল, অবশ্যই তুমি দীর্ঘজীবী হবে। তুমি শিগগির সুস্থ হয়ে উঠবে।
সৈয়দ হক সোজা হয়ে শুয়ে ক্লান্ত স্বরে বলল, আমার এখানে একা একা ভালো লাগে না। চারদিকে রোগী আর ওষুধের গন্ধ। আমি অসুস্থ সবসময় এ কথা জানিয়ে দেয়।
হাসপাতালে এক মাস থাকার পর সৈয়দ হক ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে তার লক্ষ্মীবাজারের বাড়িতে চলে গেল। আগের মতোই তার চিকিত্সা চলতে থাকল। প্রায় প্রতিদিন আনোয়ারা গিয়ে দেখাশোনা করল তার। এক মাসের মধ্যে সৈয়দ হকের স্বাস্থ্যের উন্নতি হলো। জ্বর কমে গেল। কাশির গমকও আগের মতো থাকল না। সে বিছানায় বসে বইপত্র পড়ল। মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে টেবিলে বসে ছোটখাটো লেখাও লিখল। বেশিরভাগই ভবিষ্যত্ লেখার স্কেচ এবং নোট।
তিন মাস পর সৈয়দ হক সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আনোয়ারা। নভেম্বরের আর মাত্র এক মাস বাকি। আব্বা-আম্মা সৈয়দ হকের সঙ্গে কথা বলে নভেম্বর মাসেই বিয়ে ধার্য করেছেন। সৈয়দ হকের যক্ষ্মা ধরা পড়ার পর সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। এখন তাকে সুস্থ দেখে আনোয়ারার বুক থেকে একটা মস্ত বড় পাথর নেমে গেল। সে তার বাবা-মাকে সৈয়দ হকের এই অসুখের কথা জানায়নি। তাদের জানালে বাবা অন্তত বেঁকে বসতেন। একটা অজুহাত খুঁজে পেয়ে বলতেন, যক্ষ্মা রোগীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন না। সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে যেত। আনোয়ারা তখন কী করত তা এখনো তার কল্পনায় আসে না। যা-ই হোক, সেই সংকট থেকে উত্তীর্ণ হওয়া গিয়েছে এবং সময়মতো। চুড়িহাট্টার কাউকে কিছু বলতে হয়নি। তারা জানে সবকিছু ঠিকমতো চলছে। আনোয়ারার বিয়ে হবে তার পছন্দমতোই কিন্তু বাবা-মা’র সম্মতি নিয়ে। সে ডাক্তার, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। ইচ্ছে করলেই বাবা-মা’র সম্মতি না নিয়েই বিয়ে করতে পারত। তেমন কিছু করলে গোষ্ঠীর কারো কাছে তাঁরা মুখ দেখাতে পারতেন না। তাঁদের মেয়ে সে রকম কিছু করেনি। এটা ভেবে তার মা তো বটেই, বাবাও খুশি।
সমস্যা দেখা দিল, বিয়ে কোথায় হবে? নিয়ম অনুয়ায়ী মেয়ের বাড়িতেই, যশোরে চুড়িহাট্টায় বিয়ে হওয়ার কথা। তারপর জামাই তার বউকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসবে। কিন্তু চুড়িহাট্টায় বিয়ে করার ব্যাপারে আনোয়ারার মনে প্রবল দ্বিধা এবং দ্বন্দ্ব। সৈয়দ হকের জানাশোনার পরিধি অনেক। সবাই নামকরা ব্যক্তি। শিল্পী, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, সাংবাদিক এবং অধ্যাপক। ঢাকার বুদ্ধিজীবী মহলের সবার সঙ্গে তার পরিচয়। তাদেরকে বরযাত্রী হিসেবে তাকে যশোরে নিতে হবে। কিন্তু যশোরে তাঁরা থাকবেন কোথায়? বিয়ের মজলিশ কোথায় হবে? চুড়িহাট্টায় এসব কিছুই হওয়ার সুযোগ নেই। ভেবে ভেবে আনোয়ারা কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পেল না। কোহিনুরকে বলতেই সে হাসিমুখে বলল, এটা একটা সমস্যা? ঢাকাতে তেজগাঁয় আমার বাড়ির সামনে শামিয়ানা খাটিয়ে তোর বিয়ে হবে। সবাই আসতে পারবেন। খুব ধুমধাম করে আমরা বিয়ে দেবো। শুনে আনোয়ারা খুশিতে কোহিনুরকে জড়িয়ে ধরল। আবেগ মেশানো গলায় সে বলল, তুই না থাকলে আমার যে কী হতো?
বেশ ধুমধাম করেই বিয়ে হলো আনোয়ারা আর সৈয়দ হকের। যশোর থেকে আনোয়ারার বাবা-মা, ভাইবোন এবং নিকট আত্মীয়রা এলেন। ঢাকায় যেসব গণ্যমান্য এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সৈয়দ হকের জানাশোনা এবং ওঠাবসা তাঁরা সবাই এলেন বিয়ের মজলিশে। সরকারি নিষেধাজ্ঞার জন্য পোলাও কিংবা বিরিয়ানি খাওয়ানো গেল না অতিথিদের, কিন্তু কোহিনুর এবং অন্য বন্ধু এবং বান্ধবীরা মিলে স্যান্ডুউইচসহ অন্য যেসব খাবারের আয়োজন করল তা শুধু পর্যাপ্ত ছিল না, ছিল সুস্বাদুও। খেয়ে সবাই প্রশংসা করল।
রাতে বউকে নিয়ে লক্ষ্মীবাজারে নিজের বাড়িতে গেল সৈয়দ হক। সেখানে তার মা এবং বোনেরা বিয়ের মজলিশ থেকে আগেই গিয়ে তাদের বরণ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা দুজন দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার পর ফুলের বৃষ্টি শুরু হলো তাদের ওপর। এত ফুল সৈয়দ হকের বোন আর ভাইয়েরা কোথা থেকে জোগাড় করেছে কে জানে। মিষ্টিমুখ করার পর তাকে নিয়ে বাসর ঘরে ঢুকল সৈয়দ হক। ফুল দিয়ে সাজানো বিছানার ওপর বসে আনোয়ারা মুখ নিচু করে থাকল। দেখে একটু হাসল সৈয়দ হক। তারপর কাছে এসে তার চিবুক ধরে ওপরে তুলে ধরে বলল, আমরা শেষ পর্যন্ত বিয়ে করে ফেললাম মঞ্জু। দীর্ঘ দু বছর কোর্টশিপের পর। একটা রেকর্ড করলাম বটে আমরা।
আনোয়ারা হাসিমুখে বলল, হেমিংওয়ে!!!!
ঘরের হলুদ আলো নিভিয়ে সবুজ আলো জ্বেলে সৈয়দ হক ফুল বিছানো বিছানায় এসে বসে আনোয়ারার কাঁধে হাত রাখল। তারপর হেসে বলল, সুখবর আছে।
কী? আনোয়ারা উত্সুক হয়ে তাকাল ঘাড় ফিরিয়ে।
সাপ্তাহিক চিত্রালীর চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। সৈয়দ হকের মুখে হাসি।
শুনে খুব অবাক হলো আনোয়ারা। সৈয়দ হকের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে ঠাট্টা করছে কি না।
বুঝতে পেরে সৈয়দ হক বলল, সত্যি বলছি। চাকরিটা ছেড়ে দিলাম।
আনোয়ারা তার মুখ থেকে দৃষ্টি না ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কেন? চাকরি ছাড়লে কেন?
বা রে, চাকরি করলে আমাদের হানিমুন হবে কী করে? তোমার সঙ্গে যখন খুশি ঘুরে বেড়ানো যাবে চাকরি করলে? সৈয়দ হকের চোখে কৌতুক।
আনোয়ারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চিন্তিত স্বরের বলল, সংসার? সংসার চলবে কী করে?
সৈয়দ হক ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, চলবে। চিত্রনাট্য লিখব, সিনেমার গান লিখব। ওরা অনেক টাকা দেয়। তাছাড়া বাংলাবাজারের প্রকাশকদের জন্য পাঠ্যপুস্তকের নোটবই লেখা তো আছেই। তারাও টাকা মন্দ দেয় না।
শুনে আনোয়ারা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মেঝের দিকে তাকাল। সেখানে সাদা রঙের আলপনা আঁকা। নকশা দেখতে দেখতে তার মুখে চিন্তার ছায়া পড়ল। আসলে এই মুহূর্তে নকশাগুলো তার চোখে পড়ছে না। সে একটা কিছু গভীরভাবে ভাবছে।
সৈয়দ হক আনোয়ারাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, লেখক হতে হবে আমাকে। অনেক ভেবে দেখলাম চাকরি করে বড় লেখক হওয়া যাবে না। সেই জন্য চাকরির জগত্ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর আনোয়ারার মুখ তার দিকে ফিরিয়ে সে বলল, খবরটা শুনে তুমি কি খুশি হওনি?
আনোয়ারা মুখে হাসি এনে বলল, তুমি হেমিংওয়ের মতোই সাহসী।
সৈয়দ হক তার মুখটা আরো কাছে এনে বলল, তুমিও সাহসী কম না।
কেমন? আমি সাহসী হলাম কিভাবে? আনোয়ারা সৈয়দ হকের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
এই যে আমাকে একটা গল্প পড়ে ভালোবাসলে। তারপর বিয়ে করলে।
আনোয়ারা হেসে বলল, ‘তিন পয়সার জ্যোছনা’। আমাদের জন্য খুব মহার্ঘ সেই গল্প। এমন গল্প কেউ কোনোদিন লেখেনি। v