গল্প

আর এক রাই

গাঁয়ে পাশাপাশি দুই বাড়ির দুটি বউ।

প্রায় সমবয়সী। কত হবে তাদের বয়স? বড়জোর উনিশ, বিশ!

একজনের নাম ফুল, আরেক জনের জবা।

গলায় গলায় ভাব তাদের।

প্রতি বিকেলেই একসঙ্গে কলসি কাঁখে ওরা চৌধুরীদের বাড়িতে যায় তাদের টিউবওয়েল থেকে এক কলসি করে খাবার জল তুলে আনাতে। চৌধুরীরা যথেষ্ট জনসেবী। পাড়ার লোকজনকে এক-আধ কলসি কলের জল দিতে কার্পণ্য করে না।

 যেতে আসতে প্রত্যেকদিনই বউ দুটিকে পার হয়ে যেতে হয় সরকারদের বিশাল ভিটাখানি। বড় রাস্তাটি যেখানে কোমর বেঁকিয়ে আবার সোজা চলতে শুরু করেছে, ঠিক সেখানেই চৌধুরীদের বাড়ির চৌহদ্দি শুরু। তাদের কাচারি ঘরটি একেবারে রাস্তা ঘেঁষে।

মাসখানেক হলো, এই সময় প্রতিদিন সেই কাচারি ঘরের সামনে খোলা বারান্দায় একটি বেতের চেয়ারে বসে থাকে এক যুবক। তাকে আগে কখনো এ গাঁয়ে দেখেনি ফুল কিংবা জবা। তরুণটির বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না। হালকাপাতলা গড়ন। সরু অথচ ঘন কালো গোঁফ। পরনে প্রায় প্রতিদিনই থাকে সাদা পায়জামা ও রঙিন কিংবা রেখা রেখা পাঞ্জাবি। পায়ে পেছন খোলা চামড়ার স্যান্ডেল। চোখে কালো ফ্রেমের ভারী কাচের চশমা। যখনই তাকে দেখে তারা, সে হয় বসে বসে বই পড়ছে, না হয় দু পায়ের ওপরে একটি বাঁধানো খাতা রেখে মাথা নিচু করে কিছু লিখছে। অথবা চুপচাপ তাকিয়ে রয়েছে রাস্তা কিংবা আকাশের দিকে। কিন্তু এই অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে থাকা দেখেই বোঝা যায় কোনোদিকে চেয়ে রইলেও বিশেষ কিছু দেখছে না সে। দেখতে দেখতে ভাবছে বুঝি কিছু।

একদিন হলো কী, ভরা কলসি কাঁখে দুই বউ যথারীতি ঘরে ফিরছে সেই চেনা পথ ধরে। হঠাত্ বলা নেই কওয়া নেই, কোথা থেকে একটা বিশাল কালো গাভী ছুটে এল তাদের দিকে। গরুটির গলায় তখনো ঝুলছে একটা লম্বা রশি—পাটের তৈরি—পাকানো। বুঝতে কষ্ট হয় না কারো, মালিক মাঠ থেকে খুঁটি খুলে ঘরে নেবার সময় ছুটে পালিয়েছে গাইটি। বহুদিন পর হঠাত্ একটু স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সাধ হয়েছে হয়তো তার। গরুটির কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাবার আশায় ওরা দুই বউ ভরা কলসি কাঁখে রাস্তার সীমানা ঘেঁষে জায়গিরদারদের বাগানের বেড়ায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রচুর জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রাস্তায় ছুটে আসা প্রাণীটির চলাফেরা, যাতায়াতের সুবিধের জন্যে। ওরা এটা করেছে, যাতে করে ওদের কোনো ঝামেলা না করে নির্বিঘ্নে গরুটি চলে যায় ওখান থেকে।

কিন্তু কী ছিল ঐ পশুর মনে কে জানে? কোন মতলবে সে সোজা এসে চড়াও হয় ফুলের ওপর। গরুটির চেপ্টা ও লম্বা মাথার ওপর ছোট ছোট দুটি ছাই রঙের শিং এবং শিংয়ের নিচে কোনাকুনি করা লম্বাটে দু খানা সতেজ উজ্জ্বল চোখ। শিং দুটো ঈষত্ নামিয়ে নিয়ে এসে সে ফুলের কাঁখের কলসিটাকে সমানে গুঁতোতে থাকে অযথা। তবুও যতক্ষণ সম্ভব কলসিটি ধরে রাখার চেষ্টা করে ফুল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই, হয়তো ভয়ের কারণেই অথবা শক্তির অসামর্থ্যে, একসময় ফুলের কাঁখ থেকে কলসিটা পড়ে যায় মাটিতে। কাত হয়ে পড়া ভরা পিতলের কলসির জলে ভেসে যায় শুকনো রাস্তা। কী করবে বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখে পাশে গুটিসুটি মেরে দাঁড়ানো জবা, ফুলের সঙ্গে আসা অন্য বউটি, যার দিকে ফিরেও তাকায় না কালো গরুটি।

 শুধু কলসিটা মাটিতে ফেলে দিয়েই কিন্তু ক্রোধ কমে না গরুর। সে ফুলের দিকে ছুটে আসে সম্পূর্ণ মাথা উঁচিয়ে। উপায় না দেখে জোরে দৌড়াতে গিয়ে ইটপাথরের এবড়োথেবড়ো রাস্তায় উঁচু হয়ে থাকা এক টুকরো ইটে হোঁচট খেয়ে সটান নিজের বুকের ওপর উপুড় হয়ে ধপাস করে পড়ে যায় ফুল। মুহূর্তের ভেতর কী ঘটে যায়। ভালোভাবে বুঝে ওঠার আগেই ফুল টের পায়, দুটো শক্ত হাত তার দুই বাহু ধরে তাকে মাটি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা শেষ বিকেলের ম্লান আলোয় ফুল দেখে তাকে। দেখে অবাক হয়। অপরিচিত মুখ নয় এটি। অথচ তাকে পরিচিতও বলা যায় না। সে কে, কী নাম তার, কিছুই জানে না ফুল। আর ফুলকে তো তার চেনার কথাই আসে না। বড়জোর এক পথচারী ফুল; তার কাছে।

ফুল দেখে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা এই নির্জন নিস্তব্ধতায় আশপাশে যখন আর কেউ নেই, তাকে দু হাতে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আর কেউ নয়, সরকারবাড়ির কাচারি ঘরের সামনে প্রতিদিন চেয়ারে বসে থাকা সেই যুবকটি।

মাটি থেকে তাকে তুলতে তুলতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে ফুলকে জিজ্ঞেস করে, ‘খুব লেগেছে কি?’ হয়তো প্রশ্নটা নেহাত সৌজন্যমূলক। কিন্তু ফুলের কানে তা অমৃতের মতো শোনায়। কী মধুর, কী মিষ্টি সে গলা! কী দরদ! আবেগ! কী দুশ্চিন্তা! আহা, সত্যি সত্যি লাগতেও তো পারত আরেকটু?

‘না, না,’ সংকোচে লাল হয়ে যায় ফুল।

ওমা! সে কী?

লোকটি করে কী? করে কী?

নিজের ডান পা টি দ্রুত কাছে টেনে আনতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে ফুল।

সে টের পায়নি, ইটের টুকরোয় হোঁচট খাওয়ায়, তার খালি পায়ের আঙুলে লেগেছে বেশ। ফুল দেখে, তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা থেকে রক্ত ঝরছে তখন। লোকটি রাস্তায় পড়ে থাকা পিতলের কলসিটা কাত করে জল নিঙড়ে প্রথমে নিজের দু হাত ভালো করে ধুয়ে নেয়। তারপর বাঁ হাত দিয়ে ফুলের ডান পায়ের গোড়ালির পেছনটা ধরে কলসি থেকে অনেকখানি জল ঢেলে ফুলের পায়ের রক্তাক্ত বুড়ো আঙুলটি ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয় নিজের ডান হাতের আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে।

‘এই সব রাস্তায় কত রকমের যে জার্ম রয়েছে! ঘরে গিয়ে আবার পা টা ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে মুছে একটু অ্যান্টিবায়োটিক মলম লাগিয়ে নেবেন। এরকম সদর রাস্তায় খালি পায়ে কেউ হাঁটে?’ ফুল ছেলেটির মুখের দিকে তাকায়। শেষের বাক্যটি বলার সময় তার কণ্ঠস্বরে—বলার ধরনে কি ধমক ছিল? নাকি ছিল শাসন! ঠিক বুঝতে পারে না। তবে ফুল লক্ষ করে অন্যদিনের মতো আজো লোকটির ফর্সা পায়ে খয়েরি রঙের স্যান্ডেল।

আছাড় খেয়ে পেটের দিকে বিশাল টোলপড়া আধখালি কলসিটি ফুলের হাতে তুলে দেয় ছেলেটি। ফুলকে মাটিতে ফেলে দিয়ে গরুটি মুহূর্তে কোথায় কোন দিকে উধাও হয়ে যায় ওরা কেউ টের পায় না। এতক্ষণে দেখা যায় গরুর মালিকটিকে। গরুর নাম (কালা) ধরে ডাকতে ডাকতে রাস্তা দিয়ে তাকে এলোমেলো খুঁজে বেড়াতে শুরু করেছে।

‘আহা। কলসিটি একটু বাঁকা হয়ে গেছে। শাশুড়ি যদি বকে এজন্যে, বলবেন, আপনার পায়ের ব্যথার কাছে ওটা তেমন কিছুই নয়।’ বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে ওঠে ছেলেটি। ওর কথা বলার ধরনে এতক্ষণে ওপাশে দাঁড়ানো জবাও খিল খিল শব্দ করে হাসে। লোকটি একবার মুখ তুলে জবাকে দেখে। তারপর আর দেরি করে না। দ্রুত সরকারবাড়ির দিকে পা বাড়ায়।।

এরপর থেকে প্রতিদিন কলসি কাঁখে জল আনতে যাওয়ার সময় সরকারবাড়ির সামনে এলেই ছেলেটির কথা মনে পড়ে ফুলের। কলসি খালি হোক আর ভরা হোক, একবার ঐ মুখের দিকে তাকাবেই ফুল। কী অসীম মমতামাখা চোখদুটি দেখেছিল সে সেই বিকেলে! কেবল একটি পায়ের একটি আঙুলের ডগায় অতি সামান্য একটু ছোঁয়া! কিন্তু ওকথা ভাবতে গেলে এখনো শরীরে উষ্ণ এক শিহরণ টের পায় সে। অথচ কী আশ্চর্য! সেদিন বিকেলের পর আর একদিনও ছেলেটি ফুলকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি তার পা টা কেমন আছে। ভদ্রতা করেও তো মানুষ এই প্রশ্ন করে! অথচ মনে হয় তাকে চেনেও না সে। ক্বচিত্ এদিকে, মানে তার দিকে তাকায়।

আরো সপ্তাহখানেক পরে হঠাত্ একদিন ফুল আর জবা যাচ্ছে জল আনতে। ফুল লক্ষ করে, সরকারবাড়ির কাচারি ঘরের সামনে আজ কেউ বসে নেই। সেই কাঠের চেয়ারটি খালি পড়ে আছে। বলতে গেলে সমস্ত কাচারি ঘরটিই ফাঁকা ধু-ধু করছে। ফুল ভাবে, কোনো কারণে আসতে দেরি হচ্ছে তার। প্রতি বিকেলে যে এখানে বসে থাকে সে আজ আসবে না—এটা তো হয় না! ফেরার পথে নিশ্চয় দেখবে তাকে। ফেরার পথেও কাচারি ঘরের সামনেটা ফাঁকা। কেউ বসে নেই চেয়ারে। হঠাত্ ফুলের কাছে কাঁখের পূর্ণ কলসিটিকে সম্পূর্ণ শূন্য মনে হয়। অথচ প্রচণ্ড ভারী। কলসির ওপরে জলের দিকে তাকিয়ে, যেন বিরক্ত হয়েছে তেমন সুরে, জবার উদ্দেশে বলে, ‘ধ্যাত্! একটা গান্ধিপোকা পড়েছে জলে।’

বলেই সবটা জল উপুর করে রাস্তার ধারে মাটিতে ফেলে দিয়ে আবার চৌধুরীদের বাড়িতে গিয়ে জল ভরে আনে ফুল আস্তে আস্তে টিউবওয়েলের হাতল চেপে চেপে। কিন্তু সরকারদের কাচারি ঘরের সামনেটা তখনো রয়ে যায় আগের মতোই ফাঁকা। কেউ এসে বসে না সেখানে। একইরকমভাবে চলে পরের দিনও।

তার পর দিন।

তার পর দিন।

তার পরের দিন।

পুরো এক সপ্তাহ।

একদিন সকালে কলসি ছাড়াই, সরকারদের বাড়িতে এসে হাজির ফুল। এ বাড়ির ছোট মেয়ে মায়ার সঙ্গে খানিকটা জানাশোনা আছে তার। তাই অসময়ে ফুলকে একা এ বাড়িতে আসতে দেখে কেউ অবাক হয় না। এটা সেটা কথার পর  মায়াকে সঙ্গে নিয়ে কাচারি ঘরের সামনে যেখানে এখনো সেই চেয়ারখানা পাতা, সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় ফুল। কোনো কথা না বলে কেবল শূন্য চেয়ারটির পিঠটার ওপর আলগা করে তার হাত দুটি রাখে। মায়া চেয়ারটির দিকে তাকায়। কী মনে করে নিজের থেকেই বলে, বি এ পরীক্ষা শেষে তার মেজোকাকির ছোটভাই কিছুদিনের জন্যে বেড়াতে এসেছিল এখানে।  প্রতি বিকেলে এ জায়গাটায় বসে বসে গল্পের বই পড়তে ও হাওয়া খেতে খুব পছন্দ করত সে। কবিতাও লিখত মাঝে মাঝে। পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। পাস করেছে সে। এই গেল সপ্তাহেই জানতে পেরেছে। তাই বাড়ি ফিরে গেল। আরো নাকি পড়ার ইচ্ছা আছে তার।

‘ওঃ। আর কোনো শব্দ বেরুল না ফুলের কণ্ঠ দিয়ে। তার বোঝা উচিত ছিল এ গাঁয়ের মানুষ সে নয়। চলে তো যাবেই একদিন।

তবু প্রতি বিকেলে চৌধুরীদের বাড়িতে কলসি কাঁখে জল আনতে যাওয়ার সময় তার কথা মনে পড়ে ফুলের। মনে পড়ে সেই উল্টাপাল্টা দিনটির কথা। পাগলা গরুর পাগলাটে চোখদুটোর কথা। কোনো কারণ ছাড়া শিং উঁচিয়ে তার দিকে ধেয়ে আসার সেই ভয়ার্ত দৃশ্যের কথা। আর তারপর তার সেই সোজা উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়া। সে স্পষ্ট টের পায় তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে অন্য এক পুরুষের উষ্ণ স্পর্শ। ফুল নিচু হয়ে নিজের হাত দিয়েই ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটির ডগায় হাত বোলায়।

জবা জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে রে?’

‘ব্যথা পেয়েছি! আবার। সেখানেই। বড্ড যন্ত্রণা!’v