আর্থিক ও মুদ্রানীতিতে বিস্তর ফারাক
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫৫
সরকারের গৃহীত আর্থিক ও মুদ্রানীতির প্রাক্কলনে বিস্তর ফারাফ রয়েছে। আর্থিক নীতিতে (বাজেট) মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে ৬ দশমিক ২ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হিসেব করে। আর গড় মূল্যস্ফীতির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা। অথচ সরকার বাজেটে তা ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার পরিকল্পনা করেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ দুটি সূচক আর্থিক ও মুদ্রানীতিতে দুই ধরনের লক্ষ্যমাত্রা থাকায় তা অর্জনে সংশয় সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া সরকারের প্রধান দুই নীতিতে দুই ধরনের হিসেব থাকায় মুদ্রানীতি ও আর্থিক নীতি প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও ফুটে উঠেছে। এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির হিসাব ঠিক রাখতে অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের হিসেবেও সমস্যা হতে পারে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য অর্থনীতিবিদ ড. শামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের বিষয়ে সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্কলনে অনেক বেশি ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও এ বছরের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে কোন বড় ধরনের ঋণাত্মক অভিঘাতের ভবিষ্যদ্বাণী নেই। তাই প্রাক্কলনের এ ব্যবধান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বহীনতার ইঙ্গিত বহন করে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভীষ্ট লক্ষ্যে একযোগে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
আর্থিক নীতি নির্ধারকরা মনে করেন, মুদ্রানীতি প্রণয়নের সময় প্রবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। কারণ, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বা ভিশন ২০-২১ এর প্রধান লক্ষ্য হলো ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। এ জন্য সরকার ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। যার মূল প্রতিপাদ্য হলো প্রবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত করা। ড. শামসুল আলম বলেন, নিয়মিত উচ্চ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে এবং দারিদ্র্য নিরসনে সহায়তা করবে। তাই মুদ্রানীতি ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। যাতে করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদ্যমান থাকে এবং নিয়মিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পকিল্পনার লক্ষ্যগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে এগুতে পারছে না। ফলে প্রচলিত ঋণ সম্প্রসারণ নীতিমালাকে এমনভাবে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন, যেন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককেই পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান মুদ্রানীতিতে ব্যাপক মুদ্রার প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি হলো ১৬ শতাংশ। যা স্বল্প মূল্যস্ফীতির জন্য সহায়ক হলেও প্রবৃদ্ধি বান্ধব নয়। শুধু মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরাই আর্থিক নীতিমালার জন্য যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগ বান্ধব ঋণ সম্প্রসারণের মাধ্যমে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনও এর অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। তবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু ঋণ প্রবাহ বাড়ালেই চলবে না। এজন্য বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অনিশ্চয়তা দূর করে গ্যাস-বিদ্যুত্ ও বিনিয়োগের জমির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকে অলস টাকা জমতে থাকবে। কিন্তু বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাড়বে না। তাই মুদ্রানীতি ও আর্থিক নীতির সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য তুলনামূলক কম হওয়াকে ‘সতর্ক পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, বাজেটের লক্ষ্যগুলোতে কিছুটা উচ্চাভিলাষ থাকে। তবে এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান অনেকটাই সতর্কতামূলক। মুদ্রানীতি নিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের সুদ হারের ব্যবধান বা স্প্রেড কমানো যাচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বড় হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ বিষয়গুলোর নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণ আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য জুলাই মাসে ২৬ তারিখ অর্থবছরের ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে সাড়ে ১৬ শতাংশ (বৈদেশিক ঋণসহ)। এর মধ্যে ১৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ঋণ। তবে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহের উচ্চসীমা বেঁধে দেয়া নিয়ে অর্থনীতিবিদরা সমালোচনা করছেন। তারা বলছেন, প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা থাকলে তা প্রবাহের সুযোগ দেয়া প্রয়োজন ছিল। কারণ আমাদের দেশে যে মূল্যস্ফীতি তা ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের কারণে নয় বরং পণ্য সরবরাহ সংকটের ফলে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। এজন্য বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ড. শামসুল আলম বলেন, গত অর্থবছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করার লক্ষ্য গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন কার্যকর সম্প্র্রসারণ বান্ধব মুদ্রানীতি যা নিম্ন সুদের হার, নমনীয় মুদ্রা বিনিময় হার পদ্ধতি দ্বারা পরিচালিত হবে। এর সাথে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যবস্থা জোরদার তত্ত্বাবধান ও বিধি-ব্যবস্থা থাকবে। আর্থিক নীতিমালার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মুদ্রানীতিই নিশ্চিত করতে পারে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন যা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন নিশ্চিত করতে পারে।