চার যুগ পর দেশে ফিরে ঢাকা এয়ারপোর্টের এক্সিট লাউঞ্জে লাগেজসহ গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে মাসুদ কফিনে শায়িত নিজের হিমশীতল লাশটি দেখে এবং কবরবাসী স্বজনদের স্মরণ করে। মরহুম বাবা-মায়ের একান্ত ইচ্ছে ছিল, মৃত্যুর আগেও মা কথাটি বলে গেছে, বড়ছেলে মাসুদ বিদেশি বউ ও সন্তানদের নিয়ে দেশে যদি নাই ফেরে, অন্তত মরার পর যেন তার লাশটি দেশে আসে এবং বাবা-মায়ের পাশে কবর পায়। মায়ের শেষ ইচ্ছেটি স্মরণ করে ওয়াশিংটনের জর্জ ইউনিভার্সিটির রিটায়ার্ড প্রফেসর বড়ভাইকে দেশে আনার সব আয়োজন করেছে ছোটভাই মুকুল। ভেবেছে হয়তো, আমেরিকা থেকে লাশ আনার হাঙ্গামার চেয়ে, জীবিত অবস্থায় দেশে এনে মরতে দিলে কবরে শোয়ানোর কাজটা সহজ হবে। কিন্তু বাহাত্তুরে প্রবীণ মাসুদ, আমেরিকান-বাংলাদেশি প্রফেসর মাসুদুল হক পাটোয়ারি ওরফে ড. প্যাটারি যে স্বজনদের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে নয়, বরং ফিরে এল দেশেও নিজের মতো করে বাঁচার ও প্রেমের আনন্দ উপভোগ করতে; এই সত্যটা প্রকাশে সে লাগেজে চাটি মেরে কফিন ও কবরের কল্পনা তাড়ায় এবং চারপাশে কৌতূহলী দৃষ্টি ঘুরিয়ে চেনামুখ খোঁজে।
মুকুলকে ফ্লাইটের অ্যারাইভাল শিডিউল ই-মেইলে জানানো হয়েছে। ফোনেও কথা হয়েছে দীর্ঘক্ষণ। মুকুল বলেছে, গাড়ি নিয়ে নিজেই সে এয়ারপোর্টে থাকবে। মাসুদের ফোনে আমেরিকান সিমকার্ড। তবে এয়ারপোর্টে নিজের উপস্থিতির খবরটা যে কোনো দেশি ফোনের সাহায্য নিয়ে ভাইকে জানানো যায়। কিন্তু প্রায় অর্ধ শতাব্দীর প্রবাসজীবনে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার তেমন গরজ বোধ করেনি, যে কারণে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও ভাইকে কাছে পাওয়ার ছটফটানি নেই তার। মুকুল যদি তাকে রিসিভ করতে না আসে, একটা রেন্টকার নিয়ে গ্রামের বাড়ি ধর্মপুরে যাওয়ার দীর্ঘপথ একাই পাড়ি দিতে পারবে সে। মস্ত অ্যাডভাঞ্চার হবে সেটা। একমাত্র ছোট ভাইটি ছাড়া ঢাকায় তার অপেক্ষায় কেউ নেই, করারও কিছু নেই। প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত এক্সিট লাউঞ্জের বাউন্ডারি-রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত বহুসংখ্যক অভ্যর্থনাকারী, তারা কেউই মাসুদকে দেখে চোখ নাচায় না, হাত নাড়ে না। ভিড়ের উপেক্ষা যেন চিত্কার করে বলছে, ষোল কোটি মানুষের এদেশে একজন আমেরিকান-বাঙালি জীবিত কিংবা মৃত এলে কী, আর গেলেই বা কী!
ফুল হাতে কেউ তাকে স্বাগত-শুভেচ্ছা জানাতে এগিয়ে না আসায়, এমনকি নিজের অন্তরেও দেশে ফেরার আনন্দ-অনুভূতির তেমন সাড়া না পেয়েই সম্ভবত, মাসুদের প্রথম স্বাধীন স্বদেশে ফেরা এবং জাতির জনক শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের ঘটনা মনে পড়ে। জন্মভূমিতে বসে আত্মজীবনীর বাংলাদেশ পর্বটা রচনা করতে চায় মাসুদ, তাতে এ দুটি ঘটনার বিশদ বয়ান তুলে ধরবে। আপাতত সেই ঘটনা উত্থিত আনন্দ-আবেগের স্মৃতিটা মনে পড়ে। মাসুদের জীবনের প্রথম বিদেশযাত্রা ছিল প্রতিবেশী ইন্ডিয়ায়, ১৯৭১-এ। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে বয়সে তরুণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন ছাত্র। পাকিস্তান সামরিক শাসকদের লেলিয়ে দেওয়া সেনাবাহিনী সারাদেশে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করলে আশি লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। মাসুদও তাদের একজন হয়ে দীর্ঘ বিপদশঙ্কুল পথ পায়ে হেঁটে ও নৌকায় ভেসে অরক্ষিত বর্ডার পেরিয়ে ভারতে গিয়েছিল। শরণার্থীদের মধ্যে যুবশিবির থেকে ভারতে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল যারা, তাদের সিংহভাগই ছিল অল্প লেখাপড়া জানা কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির, একেবারে নিরক্ষর ও সদ্য গোঁফ-গজানো কিশোরও ছিল অনেক, কিন্তু মাসুদের মতো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে জড়িত নেতা পর্যায়ের লোকজন, রণাঙ্গণে অস্ত্র হাতে ফিজিক্যালি লড়েছে যতটা, ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মানসিক লড়াই চালিয়েছে বেশি। মাসুদও ছিল এদেরই একজন। পরিচিত এক নেতার সুপারিশে যুবশিবিরে ইনস্ট্রাকটরের দায়িত্ব পালন করেছে মাসতিনেক, মাসিক ভাতাও পেত কিছু। কিন্তু যুবশিবিরের ধরাবাঁধা জীবন, রোগ-জীবাণু সংক্রমণের পরিবেশ বেশিদিন ভালো লাগেনি। আবার অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর নাগালের মধ্যে যাওয়ার সাহস কিংবা ইচ্ছে—কোনোটাই হয়নি তার। পকেটে বেশকিছু টাকা ছিল। মাসুদ জয়বাংলার পরিচয়ে বিনাটিকেটে ট্রেন ভ্রমণ করে ইন্ডিয়ার বেশ কয়েকটি স্টেট ঘুরে বেরিয়ে সময় কাটিয়েছে। বয়স, পরিবেশ এবং স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষার কারণেও হতে পারে, ঐ সময়ে আনন্দ-উপভোগের তৃষ্ণাটাও ছিল প্রবল। বিনাটিকেটে ইন্ডিয়া দেখার মজা ছাড়াও বোম্বের নায়িকাদের আকর্ষণে হিন্দি সিনেমাও দেখেছে প্রচুর। এক দুঃসাহসী বন্ধু তাকে নিষিদ্ধপল্লিতেও নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে দেখা হওয়া মেয়েটির মানসিক ঔদার্য স্মৃতিতে অম্লান এখনো। একাত্তরে প্রবাসজীবনের ভোগ-দুর্ভোগ আনন্দ-বেদনার সব স্মৃতি ছাপিয়ে স্বাধীনতার পতাকার মতো পতপত করে জেগে ওঠে ডিসেম্বরের শেষদিকে বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে স্বাধীন দেশে ফেরার আনন্দ। ভারতযাত্রার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বদেশ-প্রত্যাবর্তনও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ সেইসঙ্গে ছিল বাড়িতে ফিরে স্বজনহারানোর খবর শোনার আশঙ্কা। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছার আগেই দুশ্চিন্তামুক্ত হয়েছিল মাসুদ। বাবা-মাসহ সবাই বেঁচে আছে। শেষপর্যন্ত তাদের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আসেনি, একজন মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া কেউ শহিদও হয়নি। মাসুদের ছোটভাই মুকুল এ সময় কিশোর, শহরে বোনের বাসায় থেকে জেলা হাইস্কুলে পড়ত। সেও গ্রামের বাড়িতে ছিল, ছুটে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ-আবেগে কেঁদে ফেলেছিল। চোখের পানি ফেলে বলেছিল, ‘ভাই, আমরা খবর পেয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে তুই শহিদ হয়েছিস।’ মুক্তিযুদ্ধে গিয়েও শহিদ না হওয়ার সৌভাগ্যও মাসুদের ঘরে ফেরার আনন্দ বাড়িয়েছিল অবশ্যই।
মাসুদ স্বাধীনতা আন্দোলনের কাণ্ডারি শেখ মুজিবের মুক্তিলাভ এবং স্বাধীন দেশে নেতার প্রত্যাবর্তন সদ্য স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় আনন্দদায়ক খবর হয়ে উঠেছিল মাসুদের কাছেও। পশ্চিম পাকিস্তানের ফাঁসির সেল থেকে মুক্তি পেয়ে নেতা লন্ডন-দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌঁছাবেন এবং রেসকোর্সে ভাষণও দেবেন। ৭ই মার্চের ভাষণ শোনার জন্য রেসকোর্সে ছিল মাসুদ, নেতার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন দিবসেও শরিক হওয়ার জন্য বাবা-মায়ের নিষেধ অগ্রাহ্য করে ঢাকা রওয়ানা হয়েছিল সে। তখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ জুড়ে হারানোর বিষণ্নতা, ভাঙা পথঘাট, বিশৃঙ্খলা ও অস্বাভিকতা সর্বত্র। ধর্মপুর থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে মাসুদের সময় লেগেছিল দু দিন। ১০ জানুয়ারি মিছিলের সঙ্গে এয়ারপোর্টে যেতে চেয়েছিল মাসুদ, কিন্তু এয়ারপোর্টে গিয়েও ভিড়ে নেতাকে কাছে থেকে দেখার এবং রেসকোর্সে তাঁর ভাষণ শোনার অনিশ্চয়তাবোধ থেকে, জনসভায় আগেভাগে উপস্থিত হয়েছিল মাসুদ। সেই প্রথম বেশ কাছে থেকে নেতাকে দেখেছে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ভাষণ দিতে গিয়ে নিজের দেশ ও জনগণকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে যখন কান্নাভারাক্রান্ত কণ্ঠে কথা বলেন এবং চোখ মোছেন, তখন অনেক মানুষের মতো মাসুদেরও বেশ কান্না পেয়েছিল। নেতা আবেগময় কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি’ কবিতার চরণ আবৃত্তি করে বলেছিলেন, কবিগুরু তোমার কথা মিথ্যে হয়েছে, বাঙালি মানুষ হয়েছে, বাঙালি স্বাধীন হয়েছে।
কোথাও মোবাইল ফোন বেজে ওঠায় প্রফেসর মাসুদের বাহাত্তুরে ভিড়ের সঙ্গে একাত্মতার আনন্দস্মৃতি ছিন্ন হয়। অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়ে আছে সে। পকেট থেকে নিজের ফোন বের করে দেখে, তার ফোনে মুকুল বা আর কেউ সাড়া জাগায়নি। এয়ারপোর্টে ফ্রি ওয়াইফাই ইন্টারনেটও কাজ করছে না বোধহয়। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর, মুকুলের বাসার বদলে ধর্মপুরে ফিরে যাওয়ার জন্য ভাড়ার-টেক্সি খোঁজা শুরু করবে মাসুদ। কেননা স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রায় অর্ধ শতাব্দী কালের মধ্যে বাঙালি কতটা স্বাধীন আর কেমন মানুষ হয়ে উঠছে, তা সরেজমিনে দেখে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটি লেখার কাজ শুরু করবে গাঁয়ের বাড়িতে পৌঁছেই। আমেরিকার অ্যাকাডেমিক জগতে জেনারেল ফিজিক্সের প্রফেসর মাসুদুল হক পাটোয়ারি যে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালেখির বাইরেও একজন বেস্টসেলার গ্রন্থকার, এ খবরটি এ দেশের ইংরেজি সাহিত্যের পাঠকসমাজও জানে না বোধহয়। তার ইংরেজিতে লেখা—জনৈক এশিয়ান ইমিগ্রান্টের দৃষ্টিতে আমেরিকান স্বপ্ন—গ্রন্থটি পাঁচ সপ্তাহ বেস্টসেলারের তালিকায় ছিল। অবসরগ্রহণের পর বাংলাদেশ নিয়ে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনার পরিকল্পনা প্রকাশনা জগতের নামী এডিটর বন্ধুকে জানালে উত্সাহ দিয়েছে সে। লেখার সময় ইউরোপ-আমেরিকান সংস্কৃতি ও ইংরেজিভাষী পাঠকদের কথা স্মরণে রাখতে বেশকিছু পরামর্শও দিয়েছে। এই যাত্রায় জন্মভূমিতে বসেও পরিকল্পিত আত্মজীবনী লেখার কাজ যদি শেষ না-ই হয়, প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ এবং গবেষণার কাজটি করবে অন্তত। নিজের কাজে বিঘ্ন ঘটলে, দেশের মাটিতে তাকে পুঁতে ফেলার আগ্রহী স্বজন-ভিড়ের কান্না অগ্রাহ্য করে ওয়াশিংটনেই ফিরে যাবে শিগগির।
মগজের ক্যালকুলেটর চালু করে মাসুদ হিসাব করে দেখে, তার প্রবাসজীবনের বয়স আসলে বিয়াল্লিশ বছর দুই মাস চার দিন। বলার সুবিধার জন্য সে চার যুগ কিংবা অর্ধ শতাব্দীকাল দেশছাড়া বলে—এ দেশের কবিরা যেমন বাংলার মাঠেপ্রান্তরে কিছুটা সময় হেঁটেও হাজার বছরের পথ চলার আনন্দ পায়। ভারতের শরণার্থী জীবনের স্বাদ নিয়ে স্বপ্নের স্বাধীন দেশে কাটিয়েছে মোট সাত বছর নয় মাস। সেই সময়েও দেখেছে মাসুদ দশটার ট্রেন কখনোই দশটায় ছাড়েনি, কোনো পরীক্ষাই নির্দিষ্ট সময়ে হয়নি। ইউনিভার্সিটিতে সেশনজট, রাস্তায় যানজট এবং সামাজিক জীবনের সর্বত্রই বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর অবস্থাই ছিল দৈনন্দিনতার অভিজ্ঞতা। সেই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হলেও বাঙালির মানুষ হওয়ার অভিযাত্রায় সময়জ্ঞানের উন্নতি যে খুব একটা ঘটেনি, সেটার প্রমাণ দিতে আত্মজীবনীতে ঠিক সময়ে ছোটভাইয়ের এয়ারপোর্টে না আসার ঘটনাটিও অবশ্যই উল্লেখ করবে মাসুদ।
অপেক্ষায় অসহিষ্ণুতার বোধ জাগতে না জাগতেই এক্সিট ওয়েতে একটা ল্যান্ডক্রুজারকে থামতে দেখে মাসুদ, সেই গাড়ি থেকে নেমে মুকুল ছুটে এসে বড়ভাইকে আলিঙ্গনে বাঁধে। একাত্তরে দেশে ফেরার পর যে কিশোরটি জড়িয়ে ধরলে যেমত আনন্দ-আবেগ জাগিয়েছিল, অতটা না হলেও, ভাইকে বুকে জড়িয়েই যেন এই প্রথম দেশে ফেরার সাফল্য ও শিরশিরে আনন্দ-অনুভূতি ফিরে পায় ড. মাসুদ। অপেক্ষার উদ্বেগ-একাকীত্ব কেটে যায় মুহূর্তেই।
‘স্যরি ভাই! ইমিগ্রেশন-কাস্টমসের ঝামেলা চুকিয়ে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছো কি?’
মাসুদ মগজের ক্যালকুলেটরে হিসাব না করেই জবাব দেয়, ‘না, দশ মিনিটের বেশি নয়।’
‘জ্যামে কিছুটা দেরি হয়েছে। আজ একটা ভালো দিনে দেশে ফিরেছো তুমি। আগে গাড়িতে ওঠো।’
মাসুদের ড্রাইভারও গাড়ি থেকে নেমেছে, সে বিনয়-বিগলিত সালাম দিয়ে বসের বড়ভাইকে স্বাগত জানায়। ট্রলি থেকে লাগেজ টেনে ঝটপট গাড়িতে তোলে। মুকুলও ভাইকে হাত লাগাতে না দিয়ে সাহায্য করে ড্রাইভারকে। সরকারি চাকরিতে থাকার সময় ইঞ্জিনিয়ার ভাইটিকে প্রফেসর মাসুদ ওয়াশিংটনে নিজ বাড়িতে তিনবার দেখেছে, ইন্টারনেটে ভিডিও কলে প্রায়ই দেখা ও কথা হয়, কিন্তু এবারের দেখাটা যেন অন্যরকম। সরকারি চাকরিতে রিটায়ার করে হজও করে এসেছে মুকুল, থুতনিতে পাকা দাড়ি এবং অগ্রজের তুলনায় মোটাসোটা ও মাথায় বড় টাক থাকায় অনেকে তাকেই বড় ভাবতে পারে। অথচ বয়সে মুকুল তার চেয়ে তিন বছর এক মাস উনিশ দিনের ছোট।
গাড়িতে ভাইয়ের পাশে বসে বসে মুকুল ড্রাইভারকে এসি বাড়াতে বলে।
‘না থাক, এখনো তো তেমন গরম পড়েনি বোধ হচ্ছে।’
‘দেশের আবহাওয়াও বড় উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে ভাই। ঠাণ্ডা, গরম, ঝড়, বৃষ্টি কোনোকিছুই যেন আর আগের নিয়ম মানতে চায় না।’
রিটায়ার করার পরও মুকুল বিজনেস, পলিটিক্স এবং সোশ্যাল ওয়ার্ক নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকে। ক্লাইমেট চেঞ্জের মতো গ্লোবাল প্রোব্লেমও তার বিষয় নাকি? প্রশ্নটা মনে জাগলেও ভাইয়ের ভালো খবরে সে আগ্রহ দেখায়।
‘তখন ভালো দিনে আসার কথা কী বলছিলি যেন।’
‘হ্যাঁ, রাস্তায় বিলবোর্ডে ব্যানার ফেস্টুন দেখ।’
মাসুদ উইন্ডোগ্লাসে চোখ রেখে রাস্তার দিকে তাকায়। সব বিলবোর্ড-ব্যানার-পোস্টারে জাতির পিতা শেখ মুজিবের ছবি, নিচে আরো বড় আকারে তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রীর ছবি। একটা ব্যানারে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রীপুত্র জয়েরও দীপ্ত প্রতিকৃতি। সব পোস্টার-ব্যানারে দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেওয়ার মতো কথাবার্তা। বাংলাদেশ সোনার বাংলা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে ওঠার নানারকম তথ্য, অঙ্গীকার ও স্লোগানের ছড়াছড়ি। আর একটি ব্যানারে দেশকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসানোর জন্য নৌকার কাণ্ডারি প্রধানমন্ত্রীকে লাখো কোটি অভিনন্দন।
প্রফেসর মাসুদ দেশে ফেরার প্ল্যান-প্রোগ্রাম পাকা করার পর থেকেই তো ইন্টারনেটে দেশের খবর নিয়মিত পড়ত। এবারের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের বিশাল বিজয় ও বিরোধী জোটের ভরাডুবির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সংবাদপত্র পড়েও বোঝার চেষ্টা করেছে। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের সংকট নিয়েও ভেবেছে। ভাইয়ের কাছে জানতে চায়।
‘ধর্মপুরের এমপি হওয়ার জন্য এবারে ইলেকশন করার কথা বলেছিলি, করলি না কেন?
‘এবারে নমিনেশন পাইনি, কিন্তু আগামীতে অবশ্যই পাবো ইনশাল্লাহ। প্রধানমন্ত্রী এবার তাঁর মিডিলইস্ট ট্যুরে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আমাকেও নিয়েছিলেন। এবার সুযোগ পেয়ে তোমার কথাও বলেছি তাঁকে। দেখি তুমি ধর্মপুরে যাওয়ার আগে প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিতে পারি কি না।’
মাসুদ চমকে ওঠে। ওয়াশিংটন নিউ ইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটি, বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের পলিটিক্স-কালচার নিয়ে মাতামাতি ও দলবাজি করে, তাদের সঙ্গে তার একেবারে যোগ নেই। দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী দূরে থাক, সরকারি বা রাজনৈতিক কোনো নেতার সঙ্গে সাক্ষাতের কথাও ভাবেনি। মাসুদ জবাব দেয়, ‘তোর মতো রাজনীতি নিয়ে আমার আগ্রহ নেই। আমি এসেছি নিজের কাজ করতে।’
‘নিজের কাজ তো সবাই করে ভাই, কিন্তু দেশের বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার টাচে না থাকলে কোনো কাজেই তুমি সাফল্য পাবে না। তোমাকে নিয়ে আমি অনেক প্রোগ্রাম ঠিক করে রেখেছি। তুমি ধর্মপুরে যাওয়ার আগে ঢাকায় একটা পার্টির আয়োজন করব। ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কয়েকজনকে ডাকব। তুমিও তোমার পুরনো বন্ধু, চেনা প্রফেসর ইন্টেলেকচুয়ালদের ইনভাইট করতে পারো।’
মাসুদ অনুজের সঙ্গে বাক্যালাপে আগ্রহ দেখায় না। ঘাড় ঘুরিয়ে চেনা রাজধানীর উন্নয়নের চেহারা চুপচাপ দেখে। দেশ ছেড়ে যখন যায়, তখন সর্বত্রই দারিদ্র্যের প্রকট চেহারা। বিদেশি দেখলেই ছুটে আসত ভিখিরির দল। সাধারণ ভিড়ের দিকে তাকালেও মনে হতো, প্রকাশ্যে ঘাপটি মেরে আছে চোর-বদমাশরা। স্বাধীনতা তখন পাঁচ-ছয় বছরের রুগ্ন শিশু, তার টালমাটাল পথচলা কেবলই পতনের ভয় জাগাত। সেই তুলনায় দেশ যে এখন উন্নত, রাজধানীর চেহারাতেও তা ফুটে উঠেছে। আর উন্নয়নের বড় দৃষ্টান্ত বোধহয় ইঞ্জিনিয়ার মুকুল নিজেও। মাসুদ দেশ ছাড়ার সময় সে ছিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। অতঃপর বিদেশে বসেই সে ইঞ্জিনিয়ার ভাইয়ের সরকারি চাকরি এবং চাকরিতে শনৈঃ উন্নতির খবর পেয়েছে। বড়ছেলের তুলনায় দেশেই ছোটছেলের মানুষ হওয়া ও প্রতিষ্ঠা দেখে বাবা-মাও গর্বিত ছিল সন্দেহ নেই। রিটায়ার করার পরও যে মুকুলের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার গতি ব্যাহত হয়নি, সেটা বড়ভাইকে দেখাতেও হয়তো তার দেশেফেরা নিয়ে মুকুলের এত আগ্রহ।
চাকরি ছাড়ার আগেই হাউজিংয়ের ব্যবসায় জড়িত হয়েছিল মুকুল। সরকারের পাবলিক ওয়ার্কস-এর শীর্ষ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সরকারি ভবন নির্মাণের পাশাপাশি, নিজস্ব কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মাধ্যমেও অনেক ফ্ল্যাটবাড়ি নির্মাণ করে মুকুল এখন দেশের বিত্তশালী শ্রেণির একজন। ঢাকাতেও রয়েছে তার একাধিক ফ্ল্যাট-বাড়ি। দেশের সঙ্গে বড়ভাই ও তার আমেরিকান কন্যাদের ভবিষ্যত্ সম্পর্ক নিরাপদ করতে মুকুল উত্তরায় তার কোম্পানির একটি ফ্ল্যাট গছিয়েছে। ঢাকায় ফ্ল্যাট মাসুদের এবং কন্যাদ্বয়ের ভবিষ্যত্ কতটা নিরাপদ করবে—এ ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয় নিয়েও সেই ফ্ল্যাটের দাম হিসেবে অবশ্য মুকুলের অ্যাকাউন্টে পঞ্চাশ হাজার ডলার ট্রান্সফার করেছে মাসুদ।
ভাইকে প্রথমে নিজের বাসাতেই তোলে মুকুল। আড়াই হাজার বর্গফুটের অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট। অ্যায়ারকন্ডিশনড, অ্যাটাচ্ড বাথ একটি কক্ষ হোটেলরুমের মতো ভাইয়ের জন্য সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে। লাগেজসহ ভাইকে রুমে তুলে বলে, ‘তুমি জামাকাপড় ছেড়ে একটু রিল্যাক্সড হও। আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই অপেক্ষা করছে তোমাকে রিসিভ করার জন্য। এয়াপোর্টে যেতে চেয়েছিল, আমি বাসায় ডেকেছি সবাইকে।’
ভাই ছাড়া অচেনা আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপারেও মাসুদের তেমন আগ্রহবোধ নেই।
প্রশস্ত ড্রয়িংরুমে পরিবারের সবাই অপেক্ষা করছিল দেশান্তরী অভিভাবককে স্বাগত জানানোর জন্য। মাসুদকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়ায়। মাসুদ গ্রামের হাইস্কুলে পড়ার সময় হেডমাস্টার পিতা ক্লাসে ঢুকলে ছাত্ররা যেভাবে উঠে দাঁড়াত, অনেকটা সেরকম। নারী, পুরুষ, শিশু মিলে পনেরো/ষোলো জন মানুষ। সকলের প্রতি চোখ ঘোরানোর সময় ব্রেন-কম্পিউটার গণনার কাজটি না করলেও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন হিসেবে অনুমান করে। মুকুলের একমাত্র ছেলে কানাডায়, মেয়ের বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে একটি। মাস দুয়েক আগেও ইন্টারনেটে ভিডিও কল দিয়ে সে বড়চাচুকে দেখার পাশাপাশি মেয়েকে এবং নিজের মুখও দেখিয়েছে। মাসুদ ভাইঝিকেও ঠিক শনাক্ত করতে পারে না। উপস্থিত চার জন মহিলার মধ্যে শাড়ি পরেনি কেউ। একটা মেয়ে জিন্স ও জামা পরেছে, তবে তারও মাথায় স্কার্ফ। বছর চারেকের একটি শিশু ফুলের তোড়া এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘নানু, ফুল নাও।’
এক হাতে ফুল নিয়ে মাসুদ অন্য হাতে মেয়েটিকে আদর করে, ‘থ্যাংকস। ও মাই ডার্লিং, তোমার সঙ্গে ভিডিও চ্যাট হয়েছে। মুকুল তোর নাতনি?’
নাতনির মা জিন্সপরা মেয়েটি এসে বড়চাচুর পা ছুঁয়ে সালাম করে, ‘বড় চাচু, তুমি দেশে আসায় আমরা সবাই যে কী খুশি হয়েছি!’
‘স্যরি রিয়া, তোমার বিয়েতেও আসতে পারিনি, আর তোমার মেয়ের জন্য তো গিফট আনা হয়নি। ডার্লিং তুমি কী গিফট নেবে?’
লাল চকলেট, শিশুর জবাব শুনে সবাই হাসে। রিয়া মাসুদের হাত থেকে ফুলের তোড়া নিয়ে তার ঘরে সাজিয়ে রাখতে যায়। মাসুদও সবার দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে বলে, ‘তোমরা দাঁড়িয়ে রইলে কেন? স্যরি, আমি তোমাদের সবাইকে চিনতে পারছি না।’
মুকুলই পরিচয় করিয়ে দেয় সবার সঙ্গে। রিয়ার হাজব্যান্ড ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিল, সে চাকরি ছেড়ে শ্বশুরের কোম্পানিতেই সি ও হিসেবে আছে। জামাই হাত মেলালে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা বলে, ‘বড়চাচুকে কদমবুচি করো বাবা।’ জামাই ফরহাদের পর আসে আরো একজন চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষ, সে মাসুদের বড়বোন রোজির ছেলে রয়েল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব হিসেবে কাজ করে। সে উঠে বড়মামার পা ছোঁয়ার আগেই মাসুদ তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রিয় মৃতা বোনটিকে ছোঁয়ার স্বাদ পায় যেন। স্কার্ফ মাথায় অন্য মেয়েটি এসে তাকে কদমবুচি করে, রয়েলের স্ত্রী, একটা কলেজে পড়ায়। অন্য দুজনের একজন ধর্মপুরের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে, ঢাকায় ফোন কোম্পানিতে চাকরি করে, অন্যরাও মুকুলের পরিবারের নিকটজন।
মুকুল তার স্ত্রীর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে রসিকতা করে, ‘শুধু রিয়া বা রয়েলদের বিয়েতে নয়, আমার বিয়েতেও তো আসতে পারোনি ভাই। রিয়ার মাকেও চিনতে পারছো না বোধহয়।
সেই মহিলা কদমবুচি করার ভয়ে মাসুদ হাত তুলে বলে, ‘নাইস টু মিট ইউ অল, সত্যি তোমাদের দেখে ভালো লাগছে।
‘আপনি পাটোয়ারি বংশের বড় অভিভাবক। কত বছর ধরে আপনার ফেরার অপেক্ষা করছি আমরা। কানাডা থেকে ছেলে আপনাকে দেখতে গিয়েছিল, সে ফোন করে বলেছে, বড়চাচুকে এত একা থাকতে হয়, দেশে থাকলেই ভাল থাকবেন। গতবার হজে গিয়ে পবিত্র কাবা শরিফেও আপনার জন্য দোয়া করেছি আমরা।’
ধর্মকর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীন ড. মাসুদ মনে মনে একটু ভয়ও পায়। মক্কার কাবাঘরে গিয়ে বড় ভাইয়ের জন্য কী কামনা করেছে মুকুল ও তার স্ত্রী? যে স্বজনদের সে ভালোভাবে চেনেও না, যাদের জন্য আমেরিকা থেকে একটা সামান্য গিফট পর্যন্ত আনার চিন্তা করেনি, তাকে কাছে পাওয়ার এই আনন্দোচ্ছ্বাস কতটা খাঁটি? প্রধান অতিথির সঙ্গে নিজেদের ছবি নেওয়ার জন্য একে একে সবাই মাসুদের চেয়ারের পাশে দাঁড়ায়, বাচ্চাটিকেও কোলে তুলতে হয়, সবার হাতের স্মার্টফোনের ক্যামেরা ফ্লাশ হতে থাকে। মাসুদ জানে, সে হয়তো অনেকের ফেসবুকেও চলে যাবে।
এরকম সামাজিকতায় অনভ্যস্ত কাঠখোট্টা প্রফেসর মাসুদ ঠাট্টার সুরে বলে, ‘তোমাদের খুশি দেখে মনে হচ্ছে আমি যেন কবর থেকে উঠে এলাম।’
‘সত্যি তা-ই মামা। ছোটবেলা থেকে শুধু আপনার গল্প শুনে গেছি, চোখে দেখার আশাও তো প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম।’
‘এখন দেখার সুযোগ যখন পেয়েছো কবর পর্যন্ত দেশের মাটিতেই ধরে রাখতে চাও সবাই। আমি আপনজনদের মৃত্যুতে আসতে পারিনি, কিন্তু আমি দেশে মরলে তোমরা আমার জানাজা, শোকসভায় শরিক হবে। রাইট?’
সরব ও নীরব সমর্থন দেয় সবাই। স্মার্ট ভাগ্নেটি বলে, ‘আপনি এখনই মরবেন কেন মামা? রিটায়ার করলেও ছোটমামার চেয়ে আপনাকেই বরং ইয়ং দেখায়। আমেরিকার অ্যাকাডেমিক-জগতে অনেক দিয়েছেন, এখন ইচ্ছে করলে দেশে থেকে দেশের শিক্ষাজগতেও অনেক কন্ট্রিবিউট করতে পারবেন।’
‘তুমিও মুকুলের মতো পলিটিক্স করো নাকি?’
ভাগ্নের হয়ে মুকুল জবাব দেয়, ‘সরকারি আমলারা ওপেন পলিটিক্স করতে না পারলেও পলিটিক্যাল গভমেন্টের গুডবুকে থাকতে হয় ভাইয়া। রয়েলও গুডবুকে ছিল বলে প্রোমোশন পেয়ে জয়েন্ট সেক্রেটারি হয়েছে, ভালো পোস্টিং পেয়েছে। সামনে সেক্রেটারিও হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।’
‘আগাম অভিনন্দন তোমাকে রয়েল। তোমার বাবা-মা বেঁচে থাকলে খুশি হতো।’
এ সময় অতিথিদের জন্য টেবিলে চা-নাস্তা আসে। রিয়া বড় চাচুর কাছে জানতে চায়, আগে ঠাণ্ডা কিছু বা লেমন জুস খাবে কি না? চা না কফি? মিষ্টি চলে কি না? তেলেভাজা কিছু?
মাসুদ এ সময়টা বিদেশে নিজবাড়িতে একা একা পরিমিত ওয়াইনপানে অভ্যস্ত। আমেরিকায় গেলে মুকুলও অগ্রজের সঙ্গে মদ্যপানে দ্বিধা-আপত্তি দেখায়নি। কিন্তু হজ করে এসে দাড়িওয়ালা মুরব্বিকে, বিশেষ করে পরিবার-পরিজনদের সামনে কি ওয়াইনের কথা বলা উচিত? মাসুদ আপতত রেডওয়াইন-আসক্তিকে চেপে রেখে লেমন জুস খায়, নাস্তার বিপুল আয়োজন থেকে একটা বিস্কুটসহ চিনি ছাড়া ব্লাক কফি নেয় একটা।
কফিতে চুমুক দিয়ে সত্যি কথা বলে সে, ‘দেশে পৌঁছেই তোমাদের সবাইকে দেখে আমারও ভালো লাগছে। সুখী জীবনের জন্য পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে রিলেশন্স মেইটেইনও জরুরি। এতকাল আমেরিকায় নিজের পরিবার আর কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বলে তোমাদের খোঁজখবর নিতে পারিনি।’
ওরা এবার প্রফেসর মাসুদের আমেরিকান জীবনধারা নিয়ে বিনীত কৌতূহল ও আগ্রহ দেখায়। বিদেশে গিয়ে মাসুদ যে সাদা চামড়ার খ্রিস্টান বিদেশিনীকে বিয়ে করেছিল, তার সঙ্গে সম্পর্ক দশ বছরও টেকেনি। মাসুদের যে পিয়া এবং হিয়া নামে দুই কন্যা, তারা কি প্রথম স্ত্রীর গর্ভের? আরেক জার্মান মেয়েকে দ্বিতীয় বিয়ে করার খবর রটেছিল দেশে। তার সঙ্গেও কি ডিভোর্স হয়েছে, নাকি আলাদা থাকে? বিয়ের পর দুই মেয়ে কি বাপের খোঁজ নেয়? একলা বাড়িতে মাসুদকে দেখাশোনা করে কে?
স্বজনদের এসব কৌতূহল নিরসন করতে গিয়ে মাসুদ ভাবে, তার আত্মজীবনীমূলক বইটিতে পারিবারিক সম্পর্ক ভাঙা-গড়ার কাহিনি সততার সঙ্গে সরস বয়ান দিয়েছে। সে গ্রন্থ এরা কেউ পড়েছে নাকি? মুকুলের বড় ছেলে উজ্জ্বল কানাডা থেকে নিউ ইয়র্কে কী কাজে গিয়ে ওয়াশিংটনে বড়চাচাকেও দেখতে গিয়েছিল। ভাতিজাকে নিজের রান্না খাইয়েছে মাসুদ। উজ্জ্বল জ্যাঠার বই নিয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে। বই ও প্রকাশকের নাম বলে মাসুদ তাকে নিউ ইয়র্কের বুকস্টোর বা অনলাইনে অ্যামাজন থেকে কিনে নিতে বলেছিল। ছেলে বইটি কিনে পড়েছে কি না এবং বড়চাচা সম্পর্কে দেশে কী কথাবার্তা বলেছে, মাসুদ জানে না, জানতেও চায় না। তার মা আবার বলে, ‘উজ্জ্বল বলেছে, বড়চাচু আমেরিকায় এত একা, আমার খারাপ লাগে। আপনার ভাইও বলেছে, আমি বেঁচে থাকতে ভাইকে আর একা থাকতে দেবো না।’
মাসুদ এবার প্রতিবাদ করে, ‘একেবারে একা আছি ঠিক নয়। ডিভোর্স হওয়ার পরও ন্যান্সি ও অন্য পুরনো গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ হয় প্রায়ই। হিয়া এবং পিয়া দুজনই নিজেদের জব আর বাচ্চা নিয়ে বেশ ব্যস্ত। তারপরও ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ ইয়র্ক থেকে বাপের খোঁজ নেয় নিয়মিত। কাছাকাছি বলে পিয়া তো প্রায় উইকেন্ডে গাড়ি হাঁকিয়ে ওয়াশিংটনে চলে আসে। গত সপ্তাহে ওর মাকে নিয়েও এসেছিল।’
ছাড়াছাড়ি হওয়ার পরও পুরনো স্ত্রী বা গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টা স্বজনরা কে কিভাবে নেয়, বোঝা যায় না। তবে মাসুদ নিজের বইটি দেশের কউকে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে, নিজের সম্পর্কে কথা বলতেও আর আগ্রহ দেখায় না। পুরনো স্বজনরা যে তার একাকীত্ব কাটাতে পারবে না, এই নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে সে ওদের হতাশ করতে বলে, ‘দেখ, আমি আসলে একা থেকে অভ্যস্ত। তোমাদের আশা কতটা পূরণ করতে পারব জানি না। কারণ দেশের জন্য কিছু করব, এতটা দেশপ্রেম আমার নেই। মরার পরও দেশের মাটিতে মিশে যাওয়ারও সাধ হয় না। আমি আসলে ডেডবডি মেডিক্যালে দিয়ে যেতে চাই। দেশে এসেছি আসলে একান্ত ব্যক্তিগত কিছু জরুরি কাজ করার জন্য।’
মুকুল আশ্বস্ত করে বলে, ‘তোমার লেখালেখি ও গবেষণার জন্য উত্তরায় নিজের ফ্ল্যাটে একা থেকে কিংবা ধর্মপুরের নতুন বাংলোতে বসেও করতে পারবে, সব ব্যবস্থাই করে রাখা হয়েছে। দেশের লোকজন তো তোমার কোয়ান্টাম ফিজিক্স আর লেখালেখি বুঝবে না, তারা উন্নয়ন চায়। রাস্তা-ব্রিজ কলেজ-হাসপাতালের মতো অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেখতে চায়।’
‘উন্নয়নের জন্য তো তোরা আছিস।’
ভাগ্নে বলে, ‘ছোটমামার সঙ্গে আপনাকে নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। মামার ইচ্ছে দেশেও নানার নামে কিছু একটা করার। বিশেষায়িত কোনো ইউনিভার্সিটি বা কলেজ করতে চাইলেও বর্তমান সরকারের আমলে অনুমোদন পাওয়া কঠিন হবে না। কারণ সব ক্ষেত্রেই প্রাইভেটাইজেশনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।’
‘ধর্মপুরে যাই তো আগে, তারপর দেখা যাবে কোথায় কী করা যায়।’
নিজেকে আড়াল করতে মাসুদ এবার উপস্থিত স্বজনদের বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জানার কৌতূহল দেখায়। প্রত্যেকের দিকে দৃষ্টি রেখে প্রশ্ন করতে থাকে নানারকম। জীবন্ত কিংবদন্তিসম প্রবাসী আত্মীয়ের কৌতূহলের খাদ্য হতে ওরাও বেশ আগ্রহী। দীর্ঘকাল পর স্বজনদের সান্নিধ্য, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে পারিবারিক বৃত্তের গণ্ডি বাড়িয়ে দেশের গভীরে, বর্তমান ছাড়িয়ে অতীতে, বিশেষ করে ধর্মপুরের অতীতে ঢোকার এই অভিযান বেশ লাগে মাসুদের।
রাতে বড়ভাইয়ের সামনে মাসুদের বাসায় ডিনারের আয়োজনও এলাহি রকমের। পোলাও, বিরিয়ানি, কয়েক রকম মাংস, মাছ সবই আছে। মাসুদ ভয় পেয়ে বলে, ‘আমাকে কি আমেরিকান খাদক ভেবেছো? রাতে আমি খুব সিম্পল খাই।’
মুকুল বলে, ‘মায়ের কথা স্মরণ করে তোমার জন্য আমি নিজে বাজারে গিয়ে তোমার প্রিয় পছন্দের মাছ কিনে এনেছি ভাই। ধর্মপুরের মাছুয়া মাসুদ কি আমেরিকায় থেকে দেশি মাছের স্বাদও ভুলে গেছে?’
‘মাছের নেশা দেখে মা যে আমার নাম মাছুয়া মাসুদ দিয়েছিল, মনে আছে তোর?’
‘মনে নেই আবার? তোমার ছোটবেলার কাণ্ডকীর্তি, ইউনিভার্সিটি জীবনের কীর্তিকাহিনির কথা ধর্মপুরে এখনো আলোচনা হয়।’
ভাগ্নে রয়েল উত্সাহ দিয়ে বলে, ‘মামা, দেশে থেকে দেশের জীবন নিয়েও এবার একটা বই লেখেন। দারুণ হবে। আমি আপনাকে সাহায্য করব।’
ভাগ্নেকে ধন্যবাদ জানিয়ে মাসুদ আজ প্লেটে ভাত তুলে নেয়। আমেরিকান অভ্যাস পাল্টে ছোটবেলার মতো হাত দিয়েই ভাতে মাছের ঝোল মাখে, দেশি পাবদা ও কই মাছের কাঁটা বাছে।
২.
ইঞ্জিনিয়ার ভাইয়ের বাড়িতে পারিবারিক সংবর্ধনার পর ঢাকায় প্রফেসর মাসুদের আপন গৃহে প্রবেশের ঘটনাটি তার জীবনে স্মরণীয় এবং আত্মজীবনীতে ঠাঁই পাওয়ার যোগ্য অবশ্যই। সরকারি চাকরি ছাড়ার পর মুকুলের ব্যস্ততা বেড়েছে। তারপরও বড়ভাইকে সময় ও সেবা দেওয়াটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। গৃহপ্রবেশের পার্টি আয়োজনের আগে অগ্রজকে তার ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে নিজেই গাড়িতে নিয়ে যায় সে।
ফ্ল্যাটের নকশা ও ভবনের ছবি আগেই ইমেইল করেছিল সে। ছয়তলা বিল্ডিংটি দেখতে সুন্দর। উত্তরায় এরকম দৃষ্টিনন্দন বিশটি ভবন বানিয়েছে মাসুদের আবাসন কোম্পানি। বাইরে থেকে দেখেও পছন্দ হয় মাসুদের। দারোয়ানদের তটস্থ সালাম-সেলুটেও মুকুলের উচ্চ অবস্থান স্পস্ট, একইরকম গুরুত্ব নিশ্চিত করার জন্য মাসুদকেও পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘আমার বড়ভাই, ফাইভ-এর মালিক। যে কোনো সময় ইন্টারকমে কল দিলেই ছুটে যাবে।’ লক খুলে পুরো ঘর-করিডোর আলোকিত করে ভাইকে ঘুরিয়ে চেনায় সব। আয়তনে মুকুলের বনানীর অ্যাপার্টমেন্টের চেয়ে ছোট, কিন্তু চৌদ্দশ বর্গফুটের তিন বেডের ঝকঝকে তকতকে ফ্ল্যাটবাড়ি একা মাসুদের জন্য অনেক বড়। সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রতিটি কক্ষই প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রে সাজানো। মুকুল টিভি অন করে টেবিলের ওয়াইফাই কানেকশনও দেখিয়ে দেয়।
মাসুদের ধারণা হয়, সে বোধহয় অন্যের সাজানো বাসায় ঢুকে পড়েছে, জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কার, মানে এসব ফার্নিচার, কোনো কিছুরই তো অভাব নেই দেখছি।’
‘সব তোমার। রিয়া-ফরহাদ পছন্দ করে কিনেছে সব। বুকসেল্ফ কিনেছে, কিন্তু বই নেই। এখনো টুকিটাকি হয়তো অনেককিছু লাগবে, তুমি লিস্ট করে দিও।’
‘কিন্তু আমি তোকে মাত্র পঞ্চাশ হাজার ডলার দিয়েছি।’
এবং তা দিয়ে যে এমন আসবাবসমৃদ্ধ ও সুযোগসুবিধায় ভরা ফ্ল্যাটের মালিকানা সম্ভব নয়, কথাটা ভাইকে সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে মুকুল বলে, ‘এখনই এত হিসাবনিকাশ নিয়ে বোসো না তো, তুমি এখানে থাকতে চাইলে টুকিটাকি হয়তো আরো অনেক কিছু লাগবে। দেশে তোমার জন্য যে কাজের লোক রেখেছি, তাদের ফোন করলেই চলে আসবে।’
মুকুলের বাসায় উঠে যে প্রশ্নটা মনে উঁকি দিয়েছিল, নিজ ফ্ল্যাটে উঠে তা প্রবল হয়ে ওঠে, আমেরিকায় কোনো ভাই যতই ধনাঢ্য হোক, ভাইয়ের জন্য এমনকি বাপ ছেলের জন্য ছেলে বাপের জন্য মাগনা এরকম সেবা-সম্পদ দেবে না। কিন্তু মুকুল এত করছে কেন?
ফ্রিজ খুলে মুকুল ভাইকে অনেক বোতল দেখায়, বড় হোটেল কক্ষে সাজানো মিনি বারই যেন। মাসুদের প্রিয় ওয়াইন ছাড়াও হুইস্কি বিয়ার সাজানো।
‘আমার বাসায় তো মনে হয় না খেয়েই আছো, এখানে থাকলে স্বাচ্ছন্দ্যে খেতে পারবে, তবে একা থাকলে অবশ্যই পরিমাণ বেশি নেবে না।’
মুকুল একটি ওয়াইনের বোতল ও দুটি গ্লাস নিয়ে নিজেই পরিমাণমতো ঢালে। বাসায় সে খায় না, তবে পার্টিতে ও সামাজিকতার দায় মেটাতে খেতে হয় প্রায়ই।
অনুজের সঙ্গে চিয়ার্স করে প্রফেসর মাসুদ বলে, ‘তুই আমার জন্য এত করছিস, আমার স্বপ্নের মতো লাগছে। মনে আছে রে মুকুল, তুই যখন রোজি আপার বাসায় থেকে জেলাস্কুলে সিক্সে কি সেভেনে পড়িস, তোকে নিয়ে একবার লুকিয়ে লক্ষ্মী হলে নাইটশো সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম।’
‘হ্যাঁ, পাকিস্তানি উর্দু সিনেমা।’
‘সেদিন যে আনন্দ পেয়েছিলাম, তারচেয়েও আমার বেশি আনন্দ হচ্ছে। তুই আমার জন্য এত করছিস!’
মুকুলের ফোন বেজে ওঠে। গ্লাস হাতে ভাইয়ের সামনে সে ব্যবসায়িক কথাবার্তা বলে। রাত আটটার আগে তাকে কোথাও পৌঁছাতে হবে। মুকুল বলে, ‘ধর্মপুরে যাওয়ার আগে যে কয়দিন উত্তরায় থাকতে চাও, একা থাকবে যেহেতু, সতর্ক থাকবে। যে কোনো সমস্যায় ফোন করবে। তোমার ফোনে আমাদের সবার নাম-নাম্বার সেভ করে দিয়েছি, গাড়ির দরকার হলেই ড্রাইভারকে বললেই ছুটে আসবে।’
ফ্ল্যাটের চাবি বুঝিয়ে দিয়ে ভাইকে গুডনাইট বলে চলে যায় মুকুল। মাসুদ একা ঘুরে ঘুরে নিজের নতুন ঠিকানা দেখে। ছোটবেলায় বাবা ঈদে দুই ছেলের জন্য নতুন জামা কিনে দিত। সেই নতুন জামা গায়ে দিয়ে যেমন আনন্দ হতো, কারটা বেশি ভালো তা নিয়ে দু ভাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো, সেরকম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি? আনন্দাবেগে বেহেড মাতাল অবস্থায় মাসুদ যদি একা বাসায় হার্ট অ্যাটাকে মরে যায়, তবে মাসুদের শেষ কাজ বাংলাদেশপর্বের আত্মজীবনীটি লেখা হবে না। তারচেয়েও বড় বিপদের কথা, আমেরিকান বাংলাদেশি প্রফেসর মাসুদুল হক পাটোয়ারির মৃত্যুসংবাদটি রহস্যজনক মনে হবে সবার কাছে এবং সন্দেহ জাগবে মুকুলের ওপর। না, মাসুদ দু দিন খায়নি বলে পরিমাণের বেশি এক পেগ ওয়াইনও আর নেবে না।
ফোন বেজে ওঠে, রিয়া ফোন করেছে। সে বড়চাচুকে একা ফ্ল্যাটে রাখার পক্ষপাতি ছিল না, এমনকি নিজের বাসাতেও রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু তার বাবাই ভাইয়ের একা থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মাসুদ ভাইঝিকেও ধন্যবাদ জানায়, নিজের ভালো থাকার সব ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। রিয়া ফ্ল্যাটের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড বলে দেয়, মাসুদ লেপটপ চালু করলে হয়তো প্রয়োজন হবে।
ভাইঝিকে আবারও ধন্যবাদ দিয়ে মাসুদ ব্যাগ থেকে তার লেপটপ বের করে। নিজের ফ্ল্যাটে নিঃসঙ্গ মরণ ঘটার আগে, লেখার কাজটি অবশ্যই এখান থেকে শুরু করবে। তাছাড়া গৃহপ্রবেশের এ অভিজ্ঞতা মেয়েদেরকেও জানানো দরকার। মুকুলের বাসা থেকেও হিয়া ও পিয়াকে ফোন করেছিল মাসুদ, রিয়াকেও ফোন এগিয়ে দিয়েছিল বোনদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। কিন্তু ওদের ইংরেজি-উচ্চারণ ভালো বুঝতে পারে না বলে ফোনালাপে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তবে বাসার রিসিপশনে তোলা ছবি ফেসবুকে বোনদের কাছে পাঠিয়েছে, বাংলাদেশে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে নতুন করে। কিন্তু মাসুদ নিশ্চিত, তার আত্মজারা রিয়ার আকুলতা ও আপু ডাকের মানে বোঝেনি। মাসুদ এখন ইমেইলে নিজস্ব ফ্ল্যাটে ওঠার আনন্দটা মেয়েদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে। কিছু ছবি পোস্ট করতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু মাসুদ ছবি তোলার কাজটিতে তেমন আগ্রহী নয়, পারেও না ভালো। ভাষার মাধ্যমে ছবি বানাতে যতটা পারে, ক্যামেরাচোখে বাস্তব বা শিল্প একদম বোঝে না। আলোকচিত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ পিয়াই বাপ সম্পর্কে এরকম মন্তব্য করেছে।
মাসুদ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের সেল্ফি পোস্ট করেনি। স্ট্যাটাস দেয়নি। অ্যাকাডেমিক সার্কেলের কিছু বন্ধুবান্ধব ও ছাত্রদের খবরাখবর জানতে ফেসবুকে চোখ বোলায় মাঝেমধ্যে। অবশ্য টুইটারে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে অনেক সেলিব্রিটির ফলোয়ার, তাঁদের মতামত শেয়ার বা বিরোধিতা করেও নিজস্ব মন্তব্য রেখেছে অনেক সময়। তার কিছু টুইট ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়েছিল, সিএনএ চ্যানেলের খবরে উদ্ধৃতও হয়েছে। তারপরও এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগ্রহ কমছে, সময়ও দেয় কম। এ যুগের ব্যক্তিমানুষের অসুখী একাকীত্ব কাটাতে নিজের পোষা কুকুরটি যতটা সক্ষম, ফেসবুক-টুইটার-ইনস্টাগ্রামে বিশ্বময় কয়েক মিলিয়ন বন্ধুরও তেমন সক্ষমতা নেই। পরিচিত এক সাইকোলজিস্ট বন্ধুর এমন মন্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছে জেনারেল ফিজিক্সের প্রফেসর মাসুদও। অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে গুগল নিমেষেই মিলিয়ন বিলিয়ন তথ্যের জোগান দিয়ে মানুষের তথ্যক্ষুধা মেটায় ঠিকই, নিজেকে বিশ্বের বিলিয়ন মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত ভেবেও হয়তো পুলক জাগে, কিন্তু সিলিকন ভ্যালির তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে মানুষের কী উন্নতি-অবনতি হচ্ছে, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় গবেষণা থেকে এ বিষয়ে এবার স্পষ্ট ধারণা নেবে ড. মাসুদ।
লেপটপ চালু করলে গুগল আজ ফ্রি সার্ভিস দেওয়ার আগে ওয়াশিংটনের প্রফেসর মাসুদের অবস্থান নিয়ে নিশ্চিত হতে চায় যেন। জিমেইলে ঢুকতে চাইলে পাসওয়ার্ড চায়, ইনবক্সে অটোমেইল পাঠিয়ে সতর্ক করে, বাংলাদেশ থেকে কেউ মাসুদের জিমেইল হ্যাক করার চেষ্টা করছে কি না? তার মানে গুগলের নজরদারিতে আছে ড. মাসুদও। বিশ্বের যেখানেই থাকুক, আমেরিকান পেনশনভোগী নিঃসঙ্গ এক প্রফেসরের গতিবিধি ও ব্যক্তিগত তথ্যাবলি গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন, অ্যাপেল ও মাইক্রোসফটের মতো জায়েন্ট টেক কোম্পানির অসীম ভাণ্ডারে জমা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিটায়ার করার বছরেই এআই এবং কোয়ান্টাম ফিজিক্স বিষয়ে এক কনফারেন্সে অংশ নিয়েছিল প্রফেসর মাসুদ। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বদলে সিলিকন ভ্যালির নব্য পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণে তথ্য সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের সাত বিলিয়ন মানুষকে শুধু প্রভাবিত করতে নয়, প্রয়োজনে আস্ত মানুষকেও কি হ্যাক করতে সক্ষম হবে? এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর মাসুদ তথ্যপ্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর দিক অপব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে ওই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার হ্যাকিংয়ের ঘটনাটিও উল্লেখ করেছিল। তার ধারণা, ডিজিটাল টেকনোলজি ও তথ্য-সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ শেষপর্যন্ত নীতিবান অ্যানালগ মানুষের হাতে থাকবে না। প্রবাসজীবনের নিঃসঙ্গতায় ইঞ্জিনিয়ার ভাই ও তার কন্যার ডিজিটাল টাচ তেমন মন ভরাতে পারেনি, কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশে ফেরার পর তাদের অ্যানালগ আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছে সে। কর্মোদ্যোগী মুকুল ফেসবুকে বা ইন্টারনেটে আধাঘণ্টাও সময় দেয় না, ঘুম থেকে উঠে এখনো ছাপানো পেপার না পড়লে তার বাথরুম হয় না, এসব তথ্য জেনে ভালো লেগেছে মাসুদের, যদিও তার নিজের জীবনধারা অনুজটির মতো নয় মোটেও।
ঢাকায় নিজের ফ্ল্যাটে ওঠার খবরটি ইমেইলে দুই মেয়েকে জানিয়ে মাসুদ ওয়েবপেজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের অ্যাকাডেমিক জগতের হালহকিকত জানার চেষ্টা করে। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আমেরিকায় দেখা হয়েছে। প্রফেসর মাসুদের পিএইচ ডি ছাত্রদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স বিভাগের প্রফেসর। মাসুদের ফেসবুক বন্ধুদের মধ্যেও আছে সে। প্রয়োজনীয় ইমেইল ছাড়াও দেশ থেকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল। মাসুদ প্রথমে তাকেই ফোন করে।
রসিদ প্রিয় শিক্ষকের অবস্থান জেনে এত খুশি যে, পারলে উত্তরায় এখনই চলে আসে। স্যারকে সংবর্ধনা, নিদেনপক্ষে পদার্থবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতি বিষয়ে প্রফেসর মাসুদের একক লেকচার-অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নিয়ে ডিনের সঙ্গে আলাপ করবে বলে জানায়। মাসুদ তাকে নিরুত্সাহিত করতে দেশে ফেরার কারণ জানিয়ে চেনাজানা কয়েকজন অধ্যাপকের খবরাখবর জানতে চায়। রসিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি ও ক্ষমতাসীন সরকারের তোষণমূলক সুবিধাবাদী অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। রসিদসহ পুরনো কিছু বন্ধুদের সঙ্গে শীঘ্রই দেখা হবার আশা জানিয়ে ফোন রাখার পর, প্রফেসর মাসুদ নির্জন ফ্ল্যাটে পায়চারি করতে করতে নিজেই যেন নিজের ভূত হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতা অর্জনের দশকেই দেশত্যাগের কথা ভাবতে গিয়ে মাসুদের ঐ সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও মনে পড়ে। সত্তর দশকটি নিজের জীবনের বাঁক ফেরানোর জন্য যেমন, তেমনি জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই। আত্মজীবনী লিখলে ঐ সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরবে মাসুদ। আপতত নাজমুল হাসানের বিপ্লবী প্রভাবে পড়ার স্মৃতিটা বেশি মনে পড়ে।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছিল উত্তপ্ত রণাঙ্গন যেন। একাত্তরের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ মুক্তির আন্দোলন-মিছিল-স্লোগানে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী নির্মম গণহত্যা চালিয়েও সেই আগুন নেভাতে পারেনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসমাজের মিছিল-স্লোগানের বদলে বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত ছাত্রদের রাজনৈতিক কোঁন্দল-সংঘর্ষে গুলিবোমার আওয়াজ যখন তখন শোনা যেত। মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রলীগ তখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের শপথ নিয়ে নতুন বিপ্লবী দলে যোগ দেয় একটি বড় অংশ, আর এক অংশ মুজিববাদ প্রতিষ্ঠায় তত্পর। এছাড়াও বাম দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রফ্রন্ট দেশের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ সম্পন্ন করার জন্য বিপ্লবী রাজনীতির অঙ্গীকার-হুঙ্কারে সীমিত ছিল না, অস্ত্রের ঝনাঝনানিও যখন তখন কাঁপিয়ে তুলত বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। এই সময়ে মুহসীন হলে প্রতিপক্ষ সশস্ত্র গ্রুপের হাতে কোহিনূরসহ ছাত্রকর্মীদের হত্যাকাণ্ড যুদ্ধের আতঙ্কময় পরিবেশকে জীবন্ত করে তুলেছিল। মাসুদ ছিল মুহসীন হলের ছাত্র, কোনো দলেরই সক্রিয় কর্মী ছিল না, তারপরও দুই পক্ষের বিরোধ দেখলেও পালাবার পথ খুঁজত। গোলাগুলির ঘটনায় মুহসীন হল থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা হলেও, একদিন সন্ধ্যাবেলা ফুলার রোডের নির্জন গাছতলায় ধরা খেয়েছিল মাসুদ। ‘এই দাঁড়াও’ হুঙ্কার শুনে ছুটে পালাবার সাহস হয়নি। ভয় নিয়ে দাঁড়ালে অস্ত্রধারী হুঙ্কারদাতা পিঠে পিস্তলের ধাতব স্পর্শ ঠেকিয়ে দলীয় পরিচয়টা আগে জানতে জিজ্ঞেস করেছিল, মুজিব তোর বাপ না? ‘ভাই, আমি কোনো দলে নেই, আমার কাছে যা আছে নিয়ে আমাকে ছেড়ে দাও।’ সত্য পরিচয় দেওয়ার পরও, হাতের ঘড়ি ও পকেটের মানিব্যাগ অস্ত্রধারীকে দিয়ে রক্ষা পেয়েছিল সে। পরে সে ছিনতাইকারীর দলীয় পরিচয় জানার চেষ্টা করেনি আর, কিন্তু আমেরিকায় গিয়েও সামান্য এ ঘটনার স্মৃতি মনে পড়েছে অনেকবার।
স্বাধনীতার দু বছর না গড়াতেই শেখ মুজিব নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। ভোটে তাঁর দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। কিন্তু সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। দ্রব্যমূল্য, খাদ্যসংকট, বেকারত্ব, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছিল দিনে দিনে। স্বাধীনতা পেয়েও বাঁচার আনন্দ ছিল না সংখ্যাগরিষ্ঠের। হতাশ মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল। রাজনীতিতে চরমপন্থিদের দৌরাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ছিল দেশজুড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ রক্ষী বাহিনী গঠন করেও কাজ হয়নি। এই অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলনের সময়ের মতো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশ গঠনের নতুন উদ্যোগ নেন শেখ মুজিব। একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েমের জন্য সংবিধান সংশোধন করে গঠন করেন বাকশাল। সমাজতান্ত্রিক দেশের গণতন্ত্র যেমন, তেমনি বাংলাদেশেও থাকবে একটিই পার্টি । নিজ দলের বিলুপ্তি ঘটিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের বাকশাল নামক নতুন দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাকশাল বিষয়ক এক ঘরোয়া আলোচনাসভায় আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী নেতা নাজমুল হাসানের সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় মাসুদের। নানা কথাবার্তার ব্যাখ্যায় নাজমুলের রাজনৈতিক জ্ঞানের গভীরতা মুগ্ধ করেছিল মাসুদকেও। কিন্তু কার নেতৃত্বে এবং কোন ব্যবস্থায় তবে এ দেশের মানুষের সার্বিক মুক্তি ঘটবে? দেশে তখন চীনাপন্থি, মস্কোপন্থি, ওপেন-আন্ডারগ্রাউন্ড মিলে অন্তত অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক দল। বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্রকে সঠিক রাজনৈতিক জ্ঞানে বিজ্ঞ করে তোলার দায় নিয়েছিল যেন নাজমুল হাসান। পঁচাত্তরে জাতির পিতার সপরিবারে নিহত হবার ঘটনার পরও তার এই দায় যেন আরো বেড়েছিল। স্বাধীন দেশে আবারও সামরিক শাসন ফিরে আসায় রাজনীতি আন্ডারগ্রাউন্ড-বিষয় হয়ে উঠলে মাসুদের আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে হারিয়ে যাওয়ার ভয়টা বড় হয়ে উঠেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে মেয়েটির সঙ্গে বন্ধুত্ব গভীর প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কে গড়াতে পারত, সে মাস্টার্স শেষ না হতেই স্কলারশিপ নিয়ে রাশিয়ায় চলে যায়। প্রেমে ব্যর্থ ও রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্ত মাসুদ এরপর নিজের মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে আমেরিকায় কিভাবে পালিয়ে গেল, পালাবার আগে যেসব কাণ্ডকীর্তি করেছে নিজের আত্মজীবনীতে অবশ্যই তার বিশদ বয়ান দেবে। এই স্বীকারোক্তির জন্য যদি তাকে এ দেশের মানুষ লুটেরা ছিনতাইকারী বা ধর্ষকের মতো জঘন্য অপরাধী ভাবে, তারপরও নিজের জীবনের গভীর গোপন সত্য লুকাবার চেষ্টা করবে না।
ধর্মপুরে যাওয়ার আগের দিন মাসুদের উত্তরার ফ্ল্যাটে তার দেশে প্রত্যাবর্তন ও গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে আয়োজিত ছোট পার্টিটি বেশ জমে ওঠে। সব ব্যবস্থা করেছে মুকুল ও ভাগ্নে রাসেল। বড় হোটেল থেকে ডিনারের খাদ্য ও পানীয় এবং বয়-বেয়ারার ভূমিকা পালনের জন্য মুকুলের কোম্পানির দুটি ছেলে এসেছে। অতিথিদের মধ্যে দুজন শুধু মাসুদের পূর্বপরিচিত, অরাজনৈতিক প্রফেসর রসিদ ও অন্যজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নাজমুল হাসান, অবসর নেওয়ার পরও যে সরকারবিরোধী বুদ্ধিজীবী ও বিরোধী দলীয় উপদেষ্টা হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। অন্য অতিথিরা মুকুলের ঘনিষ্ঠ, সরকার ও সরকারি রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, বিজনেস কমিউনিটির নেতাও আছে দুজন। অবসরপ্রাপ্ত এক অধ্যাপক, জাতীয় অধ্যাপক ও বড় বুদ্ধিজীবী হিসেবে সরকারি দলেও যে সম্মানিত, তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে জয়েন্ট সেক্রেটারি ভাগ্নে। মুকুল ভাইকে পরিচয় করিয়ে দেয় সবার সঙ্গে। পছন্দমতো পানীয়র গ্লাস নিয়ে মাসুদের দীর্ঘ প্রবাস ও কর্মজীবন নিয়ে আগ্রহ দেখায় সবাই।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখা রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক উত্তাপ-সংঘাত নিজের ঘরেও শুরু হওয়ার ভয়ে মাসুদ তার ওয়াইনের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে বলে, ‘দেখুন, আমি আমেরিকান নাগরিক হিসেবে দীর্ঘকাল এ দেশের রাজনীতির সংস্পর্শে ছিলাম না। চার যুগ পর দেশে ফিরে কোনো রাজনৈতিক দলের সংস্পর্শে আসার ইচ্ছেও নেই। ছোটভাই মুকুলের মতো রাজনীতি করার জন্য দেশে আসিনি। নানাদিকে বাংলাদেশের অগ্রগতির খবর আমেরিকায় বসেও পেতাম। এসব উন্নয়ন অগ্রগতির ফলে জন্মভূমির কী পরিবর্তন ঘটছে, ক্লাইমেট চেঞ্জ, ডিজিটাল রেভ্যুলেশন আর গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে হাজার বছরের চেনা জন্মভূমি কোথায় কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে, এসব বিষয়ে হাতেনাতে অভিজ্ঞতা লাভের জন্য দেশে ফেরা। এ নিয়ে কিছু গবেষণাধর্মী কাজ এবং আমেরিকান পাঠকদের জন্য টুকটাক কিছু লিখব হয়তো। আপনাদের মতো বিশিষ্টজনদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হওয়াটাও বড় প্রাপ্তি।
মাসুদের উদ্দেশ্যকে স্বাগত জানিয়ে তাকে সাহায্য করার জন্য এবার উপস্থিত অতিথিরা সবাই নিজ নিজ বক্তব্য প্রকাশে তত্পর হয়ে ওঠে। দেশে পৌঁছানোর দিনেই রাস্তায় বিলবোর্ড-ব্যানার-ফেস্টুনে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার যে তথ্যচিত্র দেখেছে, দু দিন ঘরে বসে টিভিতেও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে যেসব কথাবার্তা শুনেছে, উপস্থিত অতিথিদের বক্তব্যে তা-ই ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে শোনে মাসুদ। দেশের বর্তমান অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে জাতির জনকের সোনার বাংলার স্বপ্ন এবং তাঁর যোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বর প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।
হোস্ট মুকুল বলে, ‘আমরা তো উত্তরবঙ্গের সো কল্ড মঙ্গাপীড়িত এলাকার মানুষ। মাসুদ ভাই গ্রামের বাড়িতে গিয়েও অনেকদিন থাকবে বলেছে, ধর্মপুরে গেলেও সে মানুষের উন্নয়ন বা ক্রন্দন নিজেও দেখতে পাবে। নেত্রীর প্রতি জনসাধারণের আস্থা ও তার কারণটাও টের পাবে আশা করি।’
অতিথিদের খাবার টেবিলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মুকুল। যে যার পছন্দমতো প্লেটে খাবার তুলে নেয়। খেতে খেতেও আমেরিকা ও বিশ্বরাজনীতি নিয়ে কথাবার্তা বলে সবাই।
খাওয়ার পর ব্যস্ত ও ভিআইপি অতিথিরা ড. মাসুদুল হক পাটোয়ারির অনারে দু ঘণ্টা মূল্যবান সময় ও মতামত দান করে একে একে বিদায় নেয়। বিদায়ের আগে নাজমুল হাসান কানে কানে বলে, ‘গ্রাম থেকে ফিরে আসো, তোমাকে নিয়ে তোমার ফ্ল্যাটে আরো কিছু গোলমাল করা যাবে।’ আয়োজক ভাই ও ভাগ্নে পার্টির সাফল্য নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। মুকুল জানায়, ‘তোমার পছন্দমতো দেশে বড় একটা কিছু করার প্ল্যান-প্রোগ্রাম নিলে ফিন্যান্স এবং সরকারি সাপোর্ট-সাহায্য কোনোটারই সমস্যা হবে না ভাই। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দেওয়ার কথা উপদেষ্টা সাহেব আজো বলে গেছেন। ভালোয় ভালোয় ধর্মপুর থেকে ফিরে আসো আগে।’
৩.
কলেজ-ইউনিভার্সিটি জীবনে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত জনপদ ধর্মপুরে যেভাবে যাতায়াত করত মাসুদ, বাস অথবা ট্রেনযোগে, এবারেও সেভাবে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু গাঁয়ের বাড়িতে যেহেতু অনেকদিন থাকার পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অনেক কিছু কিনতে হয়েছে। মুকুলের স্ত্রী-কন্যারা কিনে দিয়েছে সব। মুকুলও সপরিবারে অগ্রজের সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছিল, কিন্তু মাসুদের এক কন্যা যেহেতু শিগগির পিতৃভূমি দেখতে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে, সে এলে মুকুল সবাইকে নিয়ে ধর্মপুরে যাবে এবং বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় ধরনের অনুষ্ঠান করবে। আপাতত ভাইয়ের যাত্রাকে আরামপ্রদ করার জন্য নিজের ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি ও ড্রাইভারকে দু দিনের জন্য ভাইয়ের সেবায় বরাদ্দ করেছে। ধর্মপুরে প্রয়োজনে আরো বেশিদিন গাড়িটি রেখে দিতে পারবে মাসুদ।
মাত্র সপ্তাহখানেক ঢাকাবাসে উত্তরার ফ্ল্যাটের একাকীত্ব কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সামাজিকতা ক্লান্ত করে তুলেছিল মাসুদকে। রাজধানীর বর্তমান চেহারা দেখতে বাইরে বেরুলে রাস্তার ট্রাফিক জ্যামও ছিল অতিষ্ঠ হওয়ার মতো। স্মৃতির ভূত তাড়ানোর অভিযানে নেমে, দেশে ফিরেও জন্মভূমি জায়গাটার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার মেয়াদ বাড়াতে ত্বর সইছিল না আর। মুকুলের গাড়ি-ড্রাইভার নিয়ে উত্তরার বাসা থেকে বেশ সকালবেলা যাত্রা শুরু করে সে।
যাত্রার শুরুতে বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে প্রথম। দেশত্যাগের আগে ছুটিতে এবং দুই ঈদে অবধারিতভাবে ঢাকা-ধর্মপুর যাতায়াত করেছে অসংখ্যবার। সেই সময়ে রাস্তাঘাট ও যানহান সবকিছুতেই দুর্ভোগের কারণগুলো প্রকটভাবে ফুটে থাকত। জনসংখ্যার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম। ভিড়ের চাপে ট্রেন বা বাস জার্নির ধকল সয়ে বাড়ি পৌঁছাতে পারাটা ছিল যুদ্ধজয়ের মতো। মধ্যপথে ফেরি-স্টিমারে যমুনা পেরুতেও সময় যেত তিন-চার ঘণ্টা। এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা, উঠতে-বসতে ভিড়ের ধাক্কা, বাসে ঝাঁকুনি, ট্রেনের দীর্ঘ অচলাবস্থা ইত্যাকার শতেক বিড়ম্বনা ভুগে, বাড়িতে ফিরে মা ডাক দিলেই সকল দুর্ভোগ ক্লান্তি যেন শরীর থেকে নিমেষেই মুছে যেত।
কিন্তু এবার গাঁয়ে ফিরে দেখবে, বাড়িতে রক্তসম্পর্কিত স্বজন বাবা-মা ভাই-বোন দূরে থাক, গাঁয়ের সব গোপন প্রেমিকা কি পরিচিত প্রিয় মানুষগুলোর কেউই হয়তো বা বেঁচে নেই। এ জন্য কি সর্বহারা এতিম বালকের মতো মাসুদের কষ্টবোধ হচ্ছে? কষ্ট ঠিক নয়, দেশান্তরী হওয়ার আগে তো পিতা-পুত্রের সম্পর্কের অবনতি এতটাই ঘটেছিল, যেন তারা পরস্পরের শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী।
মৃত্যুর আগে বাবা বড় ছেলের জন্য কীসব ওছিয়তনামা বা অভিশাপ রেখে গেছে, মাসুদ ঠিক জানে না। মুকুলই তাদের একমাত্র ছেলে হয়ে উঠেছিল। হার্ট অ্যাটাকে বাবার আকস্মিক মৃত্যুসংবাদটি মুকুল কান্নার গলায় তাকে জানিয়েছিল বাবা মারা যাওয়ার একদিন পরে। দেশে ফিরে মা-ভাইয়ের কান্না শেয়ার করতে না পারার অক্ষমতা নিয়ে বলেছিল, ‘আমি কী করতে পারি বল।’ মুকুল জবাব দেয়নি। বাবার মৃত্যুর পরও মুকুলের বাসায় বড়বোন রোজি আপা ও মায়ের সঙ্গেও কথা হয়েছে ফোনে। মায়ের কান্না শুনে পাষাণহূদয় মাসুদেরও কান্না পেয়েছিল, কিন্তু মা ফোনেও তাকে দেশে ডাকেনি। একজন শিক্ষক, গবেষক, গ্রন্থকার এবং আমেরিকান পরিবার ও সামাজিকতার দৈনন্দিনতায় ব্যস্ত থেকে নিজের অতীত ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে মাসুদ বছরের পর বছর। ভুলেই তো ভালো ছিল সে। কিন্তু অবসর নেওয়ার পর কাজের ব্যস্ততা যেমন কমেছে, নির্জন বাড়িতে একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতাও বেড়েছে। মৃত্যুচিন্তা ও মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা না ঘামালেও, মৃত্যু যে দরজায় কড়া নাড়তে এগিয়ে আসছে, অস্বীকার করার উপায় নেই। এ জন্যই কি শৈশব-কৈশোর ও প্রথম যৌবনের স্মৃতিগুলো ভূতের মতো আক্রমণ করতে শুরু করেছে?
ওয়াশিংটনে জর্জ ইউনিভার্সিটির সাইকোলজির অধ্যাপক বন্ধু রবার্ট গ্লিমেস মাসুদের স্মৃতিকাতরতা ও ডিপ্রেশন কাটাতে শিকড়ের কাছে ফেরার পরামর্শ দিয়েছিল। শৈশবের অভিজ্ঞতা অবলম্বন করে বিশ্বে অনেক মহত্ সাহিত্য রচিত হওয়ার দৃষ্টান্ত দিয়েছে। ড. মাসুদও শিকড়চ্যুত হওয়ার কাহিনি নিয়ে আত্মজীবনী লিখলে স্মৃতির ভূতের আক্রমণ থেকে অনেকটা মুক্ত হবে। অতএব ডিপ্রেশনমুক্ত হওয়ার জন্য হাওয়া বদলাতে, শিকড়ের রস থেকে বাঁচার রসদ জোগাড় করতেই কি বিয়াল্লিশ বছর পর তার দেশে ফেরা? উদ্দেশ্যটা মোটেও এরকম সরল নয়। প্লেনে লাশ হয়ে ফেরার নিয়তি এড়াতে জীবনের শেষ দিনগুলো জন্মভূমির আলো-বাতাস ও স্বজনদের সান্নিধ্য উপভোগ করতে করতে পারিবারিক কবরস্তানে চিরনিদ্রা দেওয়াটাকে ধর্মপুরে ফেরার উদ্দেশ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারত সে। কিন্তু মৃত্যুচেতনা তাকে এখনো এমন গ্রাস করেনি যে, এটাকেই ধ্রুবসত্য ভাববে। কবরে আটকা পড়ার ভয় থেকে মুক্ত থাকার জন্য কর্মোদ্যোগী মুকুলের মতো ধর্মপুরে ফিরে হয়তো অনেক কিছু করবে মাসুদ, হয়তো কিছুই করবে না, আমেরিকায় ফিরে যাবে আবার। শেষ পর্যন্ত যে কী করবে এবং কতদিন থাকবে বাংলাদেশে, এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও জরুরি মনে হয়নি তার কাছে। দুর্নিবার হয়ে উঠেছিল শুধু ফেরার টানটা।
শেষ পরিণতি নিয়ে আর ভাবতে চায় না মাসুদ। তবে শেষপর্যন্ত দেশে ফেরাটা তার জীবনের শেষপর্বের উল্লেখযোগ্য ঘটনা অবশ্যই। ফেরার আনন্দে প্রথম যৌবনের মতো প্রেমিকাকে ছোঁয়ার মতো রোমাঞ্চ জাগছে কি? ঢাকার রাস্তার জ্যাম ও দূষিত আবহাওয়া পেরিয়ে গাড়ি গ্রামীণ পরিবেশের হাইওয়ে ধরে ছুটে চললে মাসুদ এসি বন্ধ করতে বলে ড্রাইভারকে। উইন্ডো গ্লাস নামিয়ে দিয়ে দেশি বাতাসের ঝাপটা খায়, দু পাশের প্রকৃতি-পরিবেশ দেখে খুঁটিয়ে। এটা আসলে তার পুরনো অভ্যাসও। দেশে যখন ছিল, ট্রেনে বা বাসে দেশের ভেতরে যতবার ভ্রমণ করেছে, জানালা দিয়ে বাইরের অপসৃয়মাণ মাঠ-ঘাট-নদী-মানুষ বিশেষ করে মেয়েমানুষকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখত। তিন শতাধিক নদী আর অসংখ্য খালবিল নিয়ে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ছোট্ট দেশটা ভেতরে দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগাত কি? হয়তো জাগাত, নইলে দেশের মুক্তির স্বপ্ন-সংগ্রামে একাত্ম হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করতে একাত্তর সালে ভারতে গিয়েছিল কেন? শেষ বয়সে দেশে ফিরে বাঙালির মানুষ হওয়া, সামাজিক রূপান্তর ও দেশের উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি বুঝতে চাওয়ার আগ্রহের সঙ্গে শুধু আত্মজীবনী লেখার স্বার্থ নয়, দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের সদিচ্ছাও রয়েছে অবশ্যই।
দেশের ভেতরেই যাদের বাঁচা-মরা, সোনার বাংলাকে নিত্য ভালোবাসার জাতীয় সংগীত শোনে যারা, দৈনন্দিন বাঁচার স্বপ্ন-সংগ্রাম, প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিগত সমস্যা ও অপমৃত্যুর ভয় নিয়েও বোধহয় একধরনের জাতীয় সংহতির মধ্যে থাকে সবাই। ফলে দেশের সঙ্গে একাত্মতা ও দেশপ্রেমের আবেগটা নিজের ভেতরে টের পায় না তারা। কিন্তু প্রবাসজীবনের সকল প্রাপ্তি ও আনন্দ সত্ত্বেও সব ইমিগ্র্যান্টদের জীবনে হারানো দেশের প্রতি মায়া ও টান প্রবল হয়ে ওঠে বোধহয়। হারানো দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারত না বলে মাসুদের কষ্টটা ছিল আরো বেশি। ইউরোপ-আমেরিকার অনেকগুলো দেশ ভ্রমণ করেছে মাসুদ। আফ্রিকার কেনিয়াতেও বেড়াতে গিয়েছিল সপরিবারে। মুগ্ধ হওয়ার মতো বিশ্বের সেরা আকর্ষণীয় ল্যান্ডস্ক্যাপ, ট্যুরিস্ট স্পট, মানুষের সভ্যতার অপরূপ নিদর্শন, নানা জাতের মানুষ এবং মেয়েমানুষও তো জীবনে কম দেখেনি। যাপিত জীবনের স্মৃতিমন্থন করে নিশ্চিত হয়েছে মাসুদ, শৈশব থেকে প্রথম যৌবনে ভালোলাগা এবং ভালোবাসার যে অনন্য স্বাদ পেয়েছে, তেমন অবিনাশী অভিজ্ঞতা বিশ্বে আর কোথাও খুঁজে পায়নি, পাবেও না কোনোদিন।
যমুনা ব্রিজ পেরিয়ে বড় একটা হাইওয়ে রেস্তোরাঁয় বসে দুপুরের লাঞ্চ করে মাসুদ। ড্রাইভারকেও খাওয়ায় নিজের টেবিলে বসিয়ে। বসের আমেরিকান বড়ভাইকে ছেলেটি এত সম্মান দেখাতে তত্পর যে, বিনয়ভারে সর্বদাই নতমস্তক, স্বাচ্ছন্দ্যে খেতেও পারে না। মাসুদ তাকে সহজ করতে কথা বলে, ‘তুমি তো ধর্মপুরে যাওয়ার রাস্তাঘাট ভালোই চেনো?’
‘জে স্যার, বসরে নিয়া অনেকবার গেছি।’
‘তাহলে তুমি মন দিয়া গাড়ি চালাও, আমি মনে মনে তোমার আগে ছুইটা যাই। মনগাড়ির চাকা আছে?’
‘জে স্যার।’
বরিশালি ছেলেটা হাসতেও পারে না। মাসুদ তাকে ধূমপানের জন্য পালাতে দিয়ে, যাত্রাবিরতিতে রেস্তোরাঁয় ও পার্কিংয়ের ভিড় করা দূরপাল্লার বাসগুলোর যাত্রীদের খুঁটিয়ে দেখে। কিন্তু দেশি চেহারার আমেরিকান সাহেবের দেশে ফেরা নিয়ে কারো কোনো কৌতূহল নেই। কোনো ভিখিরি হাতও এগিয়ে আসেনি এখনো। ভিড়ের মাঝে লুঙ্গি পরা সাদা চুল-দাড়ির এক বৃদ্ধকে দেখে, স্মৃতির ঝাঁপি থেকে শৈশবে দেখা গাঁয়ের খড়মবুড়ো মনির দাদা যেন লাফ দেয়। হুবহু একইরকম চেহারা।
ধর্মপুরে তখনো জুতো-স্যান্ডেল পরা ভদ্রলোক দেখা যেত কদাচিত্। খালি পায়ে মাটির সঙ্গে মিশে দিনমান কাজ করত গাঁয়ের মানুষ। সকাল-সন্ধ্যা পরার জন্য কাষ্ঠপাদুকা ছিল চাষির ঘরেও। মনির দাদা চ্যাংড়াবয়সে এই খড়মের ব্যবসা শুরু করেছিল। প্রতি সপ্তাহে খালি পায়ে দশ মাইল দূরে মিরগঞ্জ হাটে যেত পাইকারি দরে খড়ম কিনতে, খড়মের বস্তা মাথায় নিয়ে ফিরত বাড়িতে। মাসুদের দাদা মেহের পাটোয়ারিও ছিল মনিরের স্পেশাল খড়মের খরিদ্দার, এটাও ছিল তার ব্যবসায়ের বড় গর্ব। অবসরে গাঁয়ের হুঁকোটানা আড্ডায় মনির দাদা গল্প জমাতে ছিল ওস্তাদ। গাঁয়ের চ্যাংড়ারাও তাকে ঘিরে ধরত শ্লোক-ধাঁধার আসর জমাতে। ধর্মপুরের সেরা মেধাবী ছাত্র মাসুদের বুদ্ধির দৌড় পরীক্ষা করতেও শ্লোক ধরত। অনেকগুলো মনে আছে এখনো। আড়াবাড়ি থাকি বারাইল টিয়া, সোনার টুপি মাথায় দিয়া, কী জিনিস সেটা? ধুম ঘর এক পই—ছাতির ড্যারা কয়া দিবার নই। উঠিতে ঝটাংপটাং বসিতে পাহাড়, লক্ষ লক্ষ জীব ধরে না করে আহার। এসব শ্লোক-ধাঁধার জবাব ছোটরাও চট করে বলতে পারত। খড়মবুড়া গাঁয়ের প্রকৃতি ও লোকজীবনের অনুষঙ্গ নিয়ে নিজেও ধাঁধা বানাত। রাস্তায় দেখা হলে মাসুদকে একদিন শক্ত ধাঁধায় ফেলেছিল বুড়ো। শুরু আছে শেষ নাই। তার নাম কী? মামায় দিছে একখান শাড়ি, গোছাইতে না পারি। কী সেটা? অনেক ভেবেও ধাঁধা দুটির উত্তর দিতে পারেনি মাসুদ। খড়মবুড়ো জবাব দিয়েছিল, রাস্তা। ‘এই আস্তাখান গোছাইতে পারবু রে দাদা? চ্যাংড়াকালে হাঁটা ধরছি, বুড়াকালেও হাঁটতেছি রে।’
নিরক্ষর খড়মবুড়ো সেদিন রাস্তা বলতে মানুষের বাঁচার পথকেও বুঝাতে চেয়েছিল কি? আসলে কী বলতে চেয়েছিল সে, কে জানে। মনির দাদাকে আর জিজ্ঞেস করার সুযোগ হবে না।
গাড়িতে বসলে একটা ছোট মেয়ে ফুলের মালা নিয়ে আসে, মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়েও চমকে ওঠে। বেইলি ফুলের ঘ্রাণ ছাপিয়ে স্মৃতিকোষে জাগ্রত হয় বিলের পাটপচানো কটুগন্ধটা। মেয়েটির সব কয়টি মালা কিনে নেয় মাসুদ, ত্রিশ টাকার বদলে একশ টাকার একটা নোট পেয়ে অবাক-স্তব্ধ থাকে কয়েক মুহূর্ত, তারপর দৌড়াতে থাকে।
মাসুদ ড্রাইভারকে বলে, ‘এই মালাগুলো ভূতকে দেবো? ভূতেরা খুশি হবে না?’
‘জে স্যার।’
‘ভূতকে বিশ্বাস করো?’
‘জে স্যার।’
‘গাড়ি চালানোর সময় নিজের ওপর ভর হইতে দিও না কিন্তু।’
দু পাশের অচেনা বাজার, নানারকম স্থাপনা সবুজ খেতপ্রান্তর ভেদ করে গাড়ি ছুটে চলে। চেনা জেলাশহরটি এখন বিভাগীয় শহরে উন্নীত হয়ে সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে উঠেছে। শহরের ভিতর দিয়ে গাড়ি ধর্মপুরে যাওয়ার রাস্তায় উঠে ড্রাইভার ঘোষণা দেয়, আল্লায় চায় আর এক ঘণ্টায় পৌঁছব স্যার।
মাসুদ জন্মভূমির হাওয়াবাতাস খেতে আবারও উইন্ডোগ্লাস নামায়। চারপাশে তাকিয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পুরনো কাঁচা রাস্তাটিকে খোঁজে। বাইসাইকেলে চেপে এই রাস্তা ধরে শহরে যাতায়াত করেছে অনেকবার। শুকনো মৌসুমে ধূলিধূসর। রাস্তার ধূলিঝড় দু পাশের জংলি গাছপালা ও লতাগুল্মের সবুজ শরীরেও ধূসর শাড়ি পরিয়ে দিত। স্নান করে সবুজসতেজ হয়ে ওঠার জন্য অপক্ষো করত তারা বৃষ্টির। বর্ষাকালে কাদাপানি জমত যত্রতত্র। গরু ও মোষে টানা গাড়ি ছিল এই রাস্তার বড় বাহন। নানারকম মালপত্র বহন করত, গৃহবধূদের জন্য ছিল ছইঢাকা গরুগাড়ি। এছাড়া যানবাহন বলতে দ্বিচক্রযান সাইকেলই বেশি। পেছনে প্রচুর ধুলা উড়িয়ে ক্বচিত্ দু-একটা মোটরসাইকেল কিংবা চারচাকার মোটরগাড়ি ছুটে আসত।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও পথে একটাও গরুগাড়ি চোখে পড়ে না ড. মাসুদের। মসৃণ পাকা রাস্তায় শহরের মতো নানারকম যান্ত্রিক যানবাহন, বাইসাইকেলের চেয়ে মোটরসাইকেলের সংখ্যই বেশি। চেনা রাস্তাটির দু দিকের খেতপ্রান্তরে মাটির জমিগুলো এখনো মাটি হয়েই আছে বটে, তবে রাস্তার ধারে গজিয়ে উঠেছে ইটের তৈরি দোকানপাট, বাজার ও নানারকম স্থাপনা। একটি বিশালাকার কোল্ড স্টোরেজ ও ইটভাটাও চোখে পড়ে। পাঁচ-সাত মাইল অন্তর পরিচিত হাটবাজারগুলোও এতটা ফুলেফেঁপে উঠেছে যে, চিনতে পারে না মাসুদ। একদিকে মেঠোপথ ধরে একটি বালককে পাকা রাস্তার দিকে ছুটে আসতে দেখে, শৈশবে প্রথম এই রাস্তায় মোটরগাড়ি দেখার স্মৃতি মনে পড়ে মাসুদের।
পঞ্চাশ বছর আগে ধর্মপুর ছিল শহর-সভ্যতা থেকে একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ। একদিকে তিস্তা, আর একদিকে শাখা ঘাঘট নদী পরিবেষ্টিত সমতল এক শস্যভাণ্ডার। বড় নদী পেরুনোর জন্য খেয়ানৌকা ছিল অবশ্য, আর ছোট নদী ও খালের ওপরে ছিল বাঁশের সাঁকো। অধিকাংশ বাঁশসেতু ছিল পায়ের তলার মতো প্রশস্ত, এক বাঁশের তৈরি। ডিস্ট্রিক্ট বোডের্র কাঁচা রাস্তাটায় সব সেতু ও কালভার্ট পাকা হয়ে যাওয়ার পর ধর্মপুরে প্রথম মোটরগাড়ি যেদিন তিস্তার মুখ পর্যন্ত ছুটে যায়, সেটা ছিল সম্ভবত ধর্মপুরের বিচ্ছিন্নতা ঘোচানোর এবং একইসঙ্গে মাসুদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রথম বড় ধরনের ঘোষণা।
মাসুদ তখন প্রাইমারিতে পড়া গেঁয়ো বালক। বাড়ির কাজের মেয়ে সমবয়সী অঞ্জনি তাকে উত্তেজিত হয়ে প্রথম খবরটা দেয়, ‘পাগলা হাতি বারাইছে। হাতির পিঠে আজাও আছে। সবই দেখতে গেইছে, চল হামরাও যাই।’
ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাঁচা রাস্তায় প্রথম ধূলি ওড়ানো মোটরযান দেখতে ছোটরা তো বটে, ধর্মপুরের বয়স্ক গেরস্ত-চাষিরাও ছুটতে শুরু করেছিল। যান্ত্রিক যানটি প্রথমে ধর্মপুর হাটের কাছে থামায় গাড়ির ভেতরে সাদা চামড়ার একজন বিদেশি আরোহীকে দেখেছে যারা, কিন্তু চিনতে পারেনি, তারাও আরো ভালো করে দেখা ও জানার কৌতূহল নিয়ে গাড়ির পেছনে ছুটছে। গাড়ি দেখা ছাড়াও মোটরগাড়ির তিস্তা নদী পেরুনোর ক্ষমতা দেখা এবং সাহেবের গন্তব্য জানতেও কৌতূহলী মানুষ গাড়ির পেছনে ছুটছে।
অঞ্জনির পিছে ছুটতে ছুটতে মাসুদ রাস্তায় মোটর জিপের ওড়ানো ধূলিঝড় দেখে প্রথম। ধূলি উড়িয়ে কালো রঙের জিপটি যে আসলে হাতি নয়, সেটা তখন পর্যন্ত মোটরযান বা হাতি না দেখার কারণেই বালক মাসুদ বা অঞ্জনির বুঝতে দেরি হয়। ধূলির মধ্যে মিশে থাকা পোড়া পেট্রোলের গন্ধ এবং নৈশব্দ ছিঁড়ে অদ্ভুত এক গোঁ-গোঁ আওয়াজে মেতে ছোটবড় সবাই গাড়ির পেছনে ছোটে। পাগলা কুকুর কি শেয়ালকে মারার জন্য গাঁয়ের মানুষ যেভাবে হইহই করে ছোটে, অনেকটা সেরকম আওয়াজও দিচ্ছে কেউ কেউ। মাসুদ ও অঞ্জনিও নিঃশব্দে ছোটে।
তিস্তার ধু-ধু চর দেখে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়কটা হঠাত্ বটগাছ তলায় বাইম মাছের গর্তে ঢোকার মতো মুখ লুকিয়েছে যেখানটায়, জিপগাড়িটি সেখানে গিয়ে থামে। গাড়ি থেকে নামে সাদা চামড়ার এক আশ্চর্য মানুষ। তার চোখে কালো চশমা, মাথায় হেট, হাতে পাইপ, যাকে বিদেশি হুঁকা বলে শনাক্ত করে গাঁয়ের লোক।
গাড়ির রহস্যময় সাহেবটি চর দেখে, নদী খোঁজে, এবং চারপাশের ভিড়ও দেখে। কথা বলতে পারে না বোধহয়। হেসে অঙ্গভঙ্গির ইশারায় ভিড়কে কী যেন বোঝাতে চায়।
গাঁয়ের সাহসী ও দুষ্টু চ্যাংড়ার দল, যারা জিপ গাড়িটি টিপেটুপে এবং বুক ভরে পেট্রোলপোড়া গন্ধ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছে, পাগলা হাতি নয় মোটরগাড়িই আসলে, তারাও এবার গাড়ির আরোহী সাহেবের প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠে। নিজেরাও বানর-বিড়াল কি কুত্তা হয়ে নানারকম ভঙ্গি ও আওয়াজ করতে শুরু করে। হাস্যরোল ওঠে ভিড়ের মধ্যে।
হাস্য-পরিহাস উপেক্ষা করে ধর্মপুরের সত্যসন্ধানী বয়স্করা বলতে শুরু করেছিল :ব্রিটিশরা না দেশ ছাড়ি চলি গেইল বাহে। ফের ইংরেজ আসিল কোনঠে থাকি... ইংরাজ না হয়, পাকিস্তানি পাঞ্জাবি মনে হয়... আরে বাঙালি ডাইভারের কাছে শোনেন... এটা বিদেশি আমেরিকান সাহেব... নদী দেখতে এসেছে... তিস্তার উপর একটা বাঁধ হইবে... চরের নদীভাঙা মানুষকে সাহায্য দেবে।
বড়দের এ রকম কথাবার্তার মাঝখানে রাস্তাঘেঁষা বাড়ির এক কৃষক সাহেবের বসার জন্য একটি হাতলভাঙা চেয়ার এনে দিয়েছে। খাওয়ার জন্য গাছের দুইটি ডাব আর পানসুপারির বাটাও আনে একজন। সাহেব ডাব খায়, কয়েকজন পান খাওয়া শিখিয়ে দেওয়ার পর সুপারি ও বোঁটাসহ ছাগলের মতো চিবিয়ে খায় একটু। তার খাওয়া দেখেও মজা পায় অনেকে।
জীবনে প্রথম সাদা চামড়ার সাহেবকে দেখে সাহস সঞ্চয় করে বালকদের মধ্যে অবশেষে মাসুদই তার সামনে এগিয়ে যায় প্রথম। নিজের সামান্য ইংরেজি জানা বিদ্যা প্রয়োগ করে জানতে চায়, হু আর ইউ? হোয়াট ইজ ইওর নেম? এত বড় ভিড়ের মধ্যে একমাত্র বালকের কণ্ঠে ইংরেজি শুনে সাহেবটি অবাক এবং খুশিও হয়। মাসুদকে কাছে টেনে যা জবাব দেয় ইংরেজিতে, মাসুদ তার কথা বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারে না, মাথায় সাহেবের আদুরে সাবাশি অনুভব করে।
সাহেবের সঙ্গে মাসুদের ইংরেজি কথোপকথন শুনে যা বোঝার বুঝে যায় গ্রামের লোকজন। বালকটির পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সাদা চামড়ার ইংরেজ সাহেবের সঙ্গে ইংরেজিতে টক্কর দেওয়া কি যা-তা কথা! মাসুদকে যারা চিনত, তারা গর্বিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে চেনায় এবং সাহেবকেও চেনানোর চেষ্টা করে। ধর্মপুরের মাথা মেহের পাটোয়ারির নাতি, এয়াকুব হেডমাস্টারের ছেলে। বাপকা বেটা সিপাইকা ঘোড়া।
বিদেশে গিয়ে বহুবর্ণের বহুভাষী অগণিত সাহেব-মেমের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছে মাসুদ। কিন্তু শৈশবে দেখা প্রথম সাদা চামড়ার সাহেবটির কথা আজও যেভাবে মনে পড়ে, তেমনভাবে স্মৃতিতে জায়গা পায়নি আর কেউ। মাসুদের জীবনের ছোট্ট এই ঘটনার মধ্যেও হয়তো মাসুদের সাহেবদের দেশে যাওয়া এবং সাদা চামড়ার মেমকে বিয়ে করার মতো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত লুকিয়ে ছিল। গাঁয়ের লোক বুঝতে পারেনি, মাসুদ নিজেও কল্পনা করেনি।
গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভার জানায়, বাড়িতে আইসা পড়ছি স্যার। গাড়ি থেকে নামে মাসুদ, কিন্তু নিজের চেনা বাড়িটিকেও খুঁজে পায় না। আসার পথে রাস্তার ধারে অগণিত পাকা বিল্ডিংবাড়ি দেখেছে সে, সেরকম অনেকগুলো পাকাঘর ও গাছপালা ঘেরা বড় একটি ভিটাবাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়েছে ড্রাইভার। স্মৃতির সঙ্গে মেলায় মাসুদ। ধর্মপুরে পাটোয়ারি বাড়িটি ছিল সবচেয়ে বড় বাড়ি। দাদা মেহের পাটোয়ারি ছিল গাঁয়ের জোতদার, দুই স্ত্রী নিয়ে তার সংসারও ছিল অনেক বড়। বাড়িতে ছিল ষোলটি প্রশস্ত টিনের ঘর। দাদার মৃত্যুর পর বাড়ি ও সম্পত্তি যখন ছেলেদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে, তখনো বাড়িটিকে অখণ্ড পাটোয়ারিবাড়ি হিসেবে চিনত গাঁয়ের লোক। ছোটখাটো আরো বেশকিছু ঘরবাড়ি থাকলেও পাড়াটার নামও পাটোয়রিপাড়া। এখন স্মৃতির বাড়িটি খণ্ডবিখণ্ড। অনেকগুলো পাকা বাড়ি হয়েছে। তবে সব বাড়িঘরের মাঝে মাসুদের সামনের দোতলা বাংলো বাড়িটি যে আলাদা ও দৃষ্টি কাড়ার মতো সুন্দর, ছবি আগে দেখেছে বলে চিনতে দেরি হয় না মাসুদের।
মাসুদের উপস্থিতির ঘোষণা অচেনা কণ্ঠে ধ্বনিত হওয়ার খবর নিজের কানেও আসে, ‘ইঞ্জিনিয়ারের গাড়িতে আমেরিকার মানুষ আসল রে।’ এরপর চারদিক থেকে নানা বয়সের মানুষ ছুটে আসতে থাকে। মাসুদ বাড়িতে ঢোকার আগে কৌতূহলী স্বজনরা ঘিরে ধরে তাকে। গাঁয়ের স্বজনদের মধ্যে চেনামুখ খোঁজে মাসুদ। সাদা দাড়ি মাথায় টুপি ও আরবি গামছা জড়ানো বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটাই প্রথম সামনে এগিয়ে এসে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে চেঁচায়, ‘মাসুদ, শেষকালে বাড়িতে আসলি বাবা।’ মাসুদ মুহূর্তেই চিনতে পারে বাবার সত্ভাই ইব্রাহিম চাচাকে। মাসুদ দেশে ফিরবে শুনে ধর্মপুর থেকে একমাত্র ইব্রাহিমই আমেরিকায় ফোনকল দিয়েছিল। মাসুদ বুকে জড়িয়ে ধরলে আবেগে চোখের জল ফেলে ইব্রাহিম। চাচার চেয়েও বয়স্ক এক বৃদ্ধা লাঠির ওপর ভর দিয়ে সামনে আসে, সেও কান্নার গলায় মাসুদের মরহুম বাবা-মাকে ডাকে, ‘ও মাস্টার ভাই, ও ছোট ভাবী, কবর হইতে চায়া দেখো আইজ, তোমার মাসুদ আজ ফিরি আসছে।’
মাসুদ চিনতে পারে বাবার সেবান, জোবেদা ফুফু, ছোটবেলায় বেশ আদর করত তাকে। মাসুদ তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়, ‘ভালো আছো ফুফু। বাবা-মা নাই, কিন্তু তোমাদের দেখে ভালো লাগছে।’
ভাইপোকে স্বাগত জানিয়ে ইব্রাহিম হাজি এবার ভিড়কে শাসন করে, ‘আলাপ পরিচয় পরে হইবে, লংজার্নি করি আসছে, আগে বাংলোতে গিয়া একটু রেস্ট নাও বাবা, চা-নাস্তা করো, তারপর গোরস্তানে গিয়া বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করবে। আমি ইমামকে বলে রেখেছি।’
ড্রাইভার ও অচেনা দুজন যুবক গাড়ির জিনিসপত্র বাংলোতে ঢোকাতে শুরু করেছে। মাসুদ বাংলোয় ঢোকার পথে অচেনা একটি মেয়ে তাকে সালাম দেয়, মেয়েটাকে খুব চেনা মনে হলেও তার পরিচয় নিয়ে কৌতূহল দেখায় না। এখন ঘরে একা হয়ে বাথরুম ও বিশ্রাম নেওয়াটাই আসলে জরুরি হয়ে উঠেছে।
৪.
ধর্মপুরে প্রকৃতপক্ষে ডিজিটাল যুগ ও আমেরিকান হুজুগ শুরু হয় পাটোয়ারিদের ভিটায় এয়াকুব পাটোয়ারি হেডমাস্টারের নামে নতুন বাংলো বাড়িটি ওঠার পর। বাংলো নির্মাণের সময়ে মুকুল ইঞ্জিনিয়ার ঘোষণা করেছিল, দেশান্তরী বড়ভাই তার আমেরিকান মেম-কন্যাদের নিয়ে ধর্মপুরেও আসবে এবং থাকবে অনেকদিন। কাজেই তাদের আমেরিকা-সুলভ সুযোগসুবিধা দেওয়ার জন্য পাটোয়ারিদের ভিটাবাড়িতে আলাদা এই বাংলো।
ধর্মপুরের মানুষ, বয়স যাদের চল্লিশের নিচে তারা মাসুদ পাটোয়ারির নামও জানত না। তবে মুকুল ইঞ্জিনিয়ারকে সবাই চেনে। চাকরিতে থাকার সময়ে সরকারি গাড়ি নিয়ে বাড়িতে আসত মাঝে মাঝে। ধর্মপুরে দাদার নামে করা হেডমাস্টার বাবার হাইস্কুলটিও দোতলা হয়ে ওঠার মূলে আছে ইঞ্জিনিয়ার মুকুলের অবদান। বাজারের কাছে পাটোয়ারিদের মেলা জায়গাজমি এমনি পড়ে ছিল। ইঞ্জিনিয়ার মুকুল সেখানেও দোকান ও বিল্ডিংঘর তুলে ভাড়া দিয়েছে। তবে ইঞ্জিনিয়ারের সবচেয়ে বড় কীর্তি পাটোয়ারিপাড়া জামে মসজিদটি। এ মসজিদের কারণে বেশি নাম ছড়িয়েছে তার। এমন নজরকাড়া সুন্দর মসজিদ এ তল্লাটে দ্বিতীয়টি নেই। মসজিদের স্থাপত্য-নকশা ও নির্মাণ-নির্দেশনা থেকে শুরু করে নির্মাণ খরচের সিংহভাগ ইঞ্জিনিয়ার মুকুলই দিয়েছে।
মসজিদ কমিটির চেয়ারম্যান হাজি ইব্রাহিম পাটোয়ারি মসজিদ উন্নয়ন যজ্ঞ শুরু হলে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিলেন। মুকুল ইঞ্জিনিয়ারের নকশা অনুযায়ী মসজিদটি পাকা হচ্ছে ভালো কথা। কিন্তু কে না জানে বড় ইঞ্জিনিয়ার মানেই বড় ঘুষখোর। ঘুষ-দুর্নীতি কি ইসলামে জায়েজ? ঘুষের রোজি দিয়ে মুকুল ঢাকায় কয়টা বাড়ি-ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছে, চাকরি ছাড়া কীসের ব্যবসা ফেঁদেছে, এসব গোপন খবর গ্রামবাসী না জানুক, ইব্রাহিম পাটোয়ারি জানে অবশ্যই। পৈতৃক সম্পত্তি ভেঙেও মুকুল অনেক টাকা করছে। কিন্তু এখানেও আছে বড় ভেজাল। আপন বড় ভাইয়ের হক মেরে একাই ভোগদখল করছে সব। কাজেই ইঞ্জিনিয়ার হারাম রোজগার আল্লার ঘরে ঢেলে সাধু সাজতে চায়, এটা কি মেনে নেবে গ্রামবাসী?
ইব্রাহিম পাটোয়ারির এই বক্তব্য মসজিদ নির্মাণের সময়ে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। আল্লার ঘরে দান সংগ্রহের জন্য যে দানবাক্স আছে, সেখানে ফকির-ধনী, চোর-ঘুষখোর সবাই টাকা ফেলতে পারে। কিন্তু মুকুল ইঞ্জিনিয়ারের দানগ্রহণে চাচা ইব্রাহিম হাজি আপত্তি তোলে কেন? এমন প্রশ্ন তুলেছে কেউ কেউ। জবাবে সম্পত্তি নিয়ে হেডমাস্টার ভাইয়ের সঙ্গে ইব্রাহিম হাজির পুরনো বিবাদ এবং নিজের ছেলেদের তেমন মানুষ না হওয়া ও ভাইপোদের উন্নতি দেখে হিংসার বিষয়টা নিয়েও কানাঘুষা করেছে লোকজন। কিন্তু দেশত্যাগী মাসুদের প্রসঙ্গটি সামনে আসেনি। মসজিদ উন্নয়নে অধিকাংশ গ্রামবাসী এবং আলেম-মওলানাও মুকুল ইঞ্জিনিয়ারের পক্ষে ছিল। সুদৃশ্য মিনারে বাঁধা দুইটি মাইকের চোং নিয়ে আল্লার ঘর সরব এবং নামাজিদের জন্য উন্মুক্ত হলে ক্রমে চাপা পড়ে গিয়েছে হালাল-হারাম রোজগারের প্রসঙ্গটি। ইঞ্জিনিয়ার মুকুল গ্রামে এলে এখন বেশি বেশি সম্মান পায়। আগামী নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ার মুকুলের এমপি হওয়া নিয়েও আশাবাদী তার সমর্থকগণ। কাজেই স্বয়ং ইঞ্জিনিয়ারের কাছে হারিয়ে যাওয়া বড়ভাইয়ের দেশে ফেরার খবরটি শোনার পর থেকে বাংলো বাড়িটি ঘিরে মাসুদের দেশত্যাগ এবং প্রত্যাবর্তন ধর্মপুরে ইন্টারেস্টিং আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ইব্রাহিম পাটোয়ারি ছাড়াও গাঁয়ের বয়োজ্যষ্ঠ লোকজন, যারা ছোটবেলায় এয়াকুব হেডমাস্টার ও তার দুই ছেলেকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছে, মেহের পাটোয়ারি হাইস্কুলে পড়েছে যারা, তাদের সাক্ষ্যপ্রমাণে ইঞ্জিনিয়ার ভাইয়ের পাশে বড়ভাই মাসুদও জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে ওঠে।
ছাত্র হিসেবে মাসুদ এতই মেধাবী ছিল যে, তার ইংরেজি বাতচিত শুনে এক ইংরেজ বাল্যকালেও মাসুদের পায়ের ধুলা নিয়েছিল। হেডমাস্টার পিতা পারত না বলে লেখাপড়ার ফাঁকে সে ভাগের জোতজমিও তত্ত্বাবধান করেছে। গাঁয়ের হালুয়াদের সঙ্গে লাঙলের মুঠি ধরেছে নিজেও। একবার মাছুয়া ধোঁধার সঙ্গে মাছ শিকারে গিয়ে মস্ত এক বোয়াল পেয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে গিয়েও সে মস্তবড় কমান্ডার হয়েছিল। পাছে গাঁয়ের হালুয়া-মাছুয়াদের সঙ্গে মেলামেশা করে ছেলেরা মানুষ না হয়, এই ভয়ে হেডমাস্টার দুই ছেলেকেই পড়তে ঢাকায় রেখেছিল। এরপর মাসুদের বিদেশ যাওয়া ও দেশে না ফেরার কারণ নিয়েও নানা মত ও পরস্পরবিরোধী গল্পগুজব চালু হয়েছে। তবে দীর্ঘকাল বিশ্বের সেরা ধনী দেশে চাকরি করেছে এবং বিদেশি সাহেবের মেয়েকে বিয়ে করেছে বলে ধন-সম্পদের দিক থেকে ছোটভাইকে সে হার মানাবে অবশ্যই। এই অনুমান প্রায় সবারই। পৈতৃক ভিটায় আমেরিকান ধাঁচের বাংলো বাড়ি তৈরিতে ড. মাসুদের পাঠানো ডলার, ইঞ্জিনিয়ারের ঘুষের কামাই এবং পৈতৃক ভূসম্পত্তির আয় কী পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক আছে গ্রামে। তবে এমন সুন্দর দোতলা বাংলোবাড়ি ধর্মপুরে দ্বিতীয়টি নেই। এ বিষয়ে দ্বিমত নেই কারো। গ্রামের লোক বাড়িটার নাম দিয়েছে আমেরিকান বাংলো।
ভাইয়ের ঢাকায় পৌঁছার খবর বাংলোর কেয়ারটেকার ও কর্মচারীদের মোবাইলে জানিয়ে দিয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার। ধর্মপুরে ব্যবসা ও কৃষিকাজ তত্ত্বাবধানে ইঞ্জিনিয়ারের বাঁধা কর্মচারী তো ছিলই, বড়ভাই আসছে বলে কালু শেখের নাতনি হোসনে আরা বহ্নিকে বাংলোর ম্যানেজার-কাম রাঁধুনি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। কালু শেখ একসময়ে হেডমাস্টারের হালগেরস্থি সামলানোর প্রধান লোক ছিল। কলেজে পড়িয়েও নাতনিকে বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না বলে চাকরির জন্য ধরেছিল ইঞ্জিনিয়ারকে। ইঞ্জিনিয়ার বহ্নিকে বাংলোর ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়ে আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে যেন। কম্পিউটার কোর্স করা বহ্নি বাংলোর সকল কাজ তত্ত্বাবধান ছাড়াও প্রফেসরের অ্যাসিসটেন্ট হিসেবেও কাজ করবে।
মাসুদকে দেখার জন্য উতলা বৃদ্ধা ও বিধবা ফুফুকেও ইঞ্জিনিয়ার বহ্নির সঙ্গে বাংলোতে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মাসুদ ঢাকা থেকে রওনা হবার পরই নাতনির সঙ্গে বাংলোতে এসেছে অচলপ্রায় বুড়ো কালু শেখও। বাংলোর সামনে ইঞ্জিনিয়ারের চেনা গাড়ি দেখে কৌতূহলী গ্রামবাসী ছুটে আসে পাটোয়ারিবাড়িতে। গাড়ি থেকে নামার পরই বাড়ির প্রাঙ্গণে কিংবা বাংলোতে ঢুকে দেখার সুযোগ হয় না যাদের, খবর পেয়ে তারাও ভিড় জমায় বাংলোর বাইরে। মসজিদে আছরের জামাতে শরিক হয়েছিল যেসব গ্রামবাসী, নামাজ শেষে ইমাম হুজুর ও হাজি ইব্রাহিম পাটোয়ারির পিছে সবাই বাংলোবাড়িতে আসে মাসুদকে দেখতে।
ঢাকায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকার চেয়ে গাঁয়ের বাড়িতে আসা এবং অবস্থান যে ভিন্নতর অভিজ্ঞতা ও উত্তেজনার জোগান দেবে, মাসুদ আসার আগে থেকেই জানত। মুকুল আমেরিকায় গেলে পৈতৃক ভিটায় মরহুম পিতার স্মরণে কিছু একটা করার কথা বলেছিল। মাসুদ একটা লাইব্রেরি, স্মৃতি জাদুঘর কিংবা গাঁয়ের মেধাবী ছাত্রদের জন্য উত্সাহমূলক কিছু একটা করার জন্য বলেছিল। বাংলোর স্থাপত্য গঠনেও হয়তো অগ্রজের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছে মুকুল। নিচতলায় হলঘরটি ফাঁকা রেখেছে। ঘরে ঢুকে পিতার ছবির মুখোমুখি হয়ে মাসুদ রাস্তায় কেনা ফুলের মালাটি ছবিতে দেওয়ার কথা ভেবেছিল। কিন্তু ছবির ফুলের ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতা নেই এবং পিতৃস্মৃতির প্রতি সম্মান দেখানোর উপযুক্ত পথ পরে খোঁজা যাবে—এমন ভেবে ঘরে উপস্থিত নারী-পুরুষদের দিকে তাকিয়েছে। মুকুলের ড্রাইভারটি তাকে দোতলায় নিজের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। দোতলায় একটি সাজানো শোবার ঘর, পাশে বইপত্র ছাড়া স্টাডি ঘর। শোবার ঘরে এসি, সংযুক্ত বাথরুমে বাথটবসহ গরম ও ঠাণ্ডা পানির ব্যবস্থা। ভাইকে আমেরিকায় অভ্যস্ত সুযোগসুবিধা দিতে কার্পণ্য করেনি মুকুল। ঘরের জানালা খুললে এবং করিডোরে দাঁড়ালেও চৈত্রের উষ্ণ বাতাস, চেনা গ্রামীণ প্রকৃতি, দূরের ধানখেত মাসুদকে স্বাগত জানায়। আধাঘণ্টার মতো ওপরে একা কাটিয়ে নিচে নামে মাসুদ।
নিচে ছোট ফুফুসহ যারা অপেক্ষা করছিল, তাদের মধ্যে বাংলোঘরে বেমানান বৃদ্ধটি উঠে দাঁড়িয়ে মাসুদকে আবেগকম্পিত গলায় বলে, ‘হামাকে কি এলায় চিনবেন আপনে? আপনাকে শেষ দেখা দেখার জন্যে আল্লা বোধহয় কবরে পাঠায় রাই এলাও।’ বুড়ো কালু শেখকে চিনতে পারে মাসুদ। ফুফুকে জড়িয়ে ধরেছিল যেমন, তেমনিভাবে জড়িয়ে বলে, ‘কালু ভাই না, আমাকে হাল বাওয়া শিখিয়েছিলে, তোমাদের দেখার জন্যেই আসা’।
এরপর ছোট ফুফু ঘরে উপস্থিত পাটোয়ারিবাড়ির স্বজনদের চিনিয়ে দেয়। চাচাতো ভাইদের ছেলেমেয়ে ও পুত্রবধূ। দুটি মেয়ে মাসুদের পা ছুঁয়ে সালামও করে। যে মেয়েটিকে ঘরে প্রবেশের সময়ে দেখে চমকে উঠেছিল মাসুদ, তাকে এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাকে তো চিনতে পারলাম না।’
কালু শেখ এবার দাঁড়িয়ে বলে, ‘এইটা হামার নাতনি হয়, বড় ছেলের মেয়ে। বহ্নি। তোমার সেবাযত্ন করার জন্য ইঞ্জিনিয়ার বহ্নিকে চাকরি দিছে।’
জোবেদা ফুফু বলে, ‘বহ্নির নানীকেও মনে হয় চিনবে বাবা। মোমেনা, মাস্টার ভাই যাকে ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের চাকরি নিয়া দিছিল, সেই মোমেনারও নাতনি এই চেংড়ি। এর মাকে নিয়া মোমেনা দিনমান এই বাড়িতেই পড়ি ছিল এককালে।’
‘মোমেনা বু বেঁচে আছে এখনো?’
‘না, নানী তিন বছর হলো মারা গেছে।’
মাসুদ বহ্নিকে দেখে নতুন করে চমকে ওঠে, নবীন যৌবনে নিষিদ্ধ নারীকে স্পর্শ করার শিহরণ ও ভয় ছিল যেমন, এ চমকটাও কি সেরকম? নাকি স্মৃতির ভূত জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখে ভয় পায় মাসুদ? বহ্নিও তার পা ছুঁয়ে সালাম করলে পিছিয়ে এসে মাসুদ কালুকে বলে, ‘এ মেয়েকে মুকুল চাকরি দিয়েছে কেন?’
কালু শেখ নাতনির গুণগান করে, ‘বহ্নি অশিক্ষিত নয়, ধর্মপুর কলেজে বিএ পর্যন্ত পড়ছে, কম্পিটার না কীসের ট্রেনিংও নিছে, রান্নাবাড়ির কাজও ভালোই পারে। নিজের দাদার চাইতেও তোমাকে বেশি সেবাযত্ন করবে ইনশাল্লাহ।’ দেশে আসার পর থেকে মুকুলের লক্ষ্মণসুলভ ভ্রাতৃসেবা মনে অনেক সময় প্রশ্ন জাগিয়েছিল, নিজে মাসুদ রামের মতো কিংবদন্তি নয় বলেই হয়তো সেসব প্রশ্নই আবার বড় হয়ে উঠতে চায়। এ সময় একজন বাংলো ঘরে ঢুকে মাসুদকে জানায়, বাইরে হাজি সাহেব ও মসজিদের ইমাম এসেছে। বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে ডাকে।
ধর্মপুরে আসার আগে মুকুলও সতর্ক করেছিল ভাইকে, মানো না আর মানো, শুক্রবার মসজিদের জামাতে অন্তত যেও, গাঁয়ের দশ জনের সাথে দেখাসাক্ষাত্ হলে ওরাও খুশি হবে।
সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে মাসুদ বাংলোর বাইরে যায়। উপস্থিত মুসল্লিদের সালামও দেয়। ইব্রাহিম হাজি সবাইকে নিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে যায়।
পাকা মসজিদের উল্টা দিকে পারিবারিক গোরস্তান। খুব শৈশবে দেখা দাদাকে এই কবরস্থানে কবর দেওয়ার ভিড় ও স্মৃতি চকিতে মনে পড়ে। কবরস্থানের ছয়টি বাঁধানো কবরের মধ্যে দুটিতে শুয়ে আছে মাসুদের হেডমাস্টার বাবা এবং মা। কবরের মাটিতে মিশে যাওয়া বাবা-মায়ের হাড়মাস কল্পনার বদলে মাসুদ গোরস্তানের সবুজ লতাগুল্ম ও বড় গাছগুলো তাকিয়ে দেখে।
উপস্থিতি টুপিধারী মুসল্লি-জনতা কবরবাসীদের উদ্দেশে দোয়া-দরুদ পড়ছে। ছোটবেলায় মা ও দাদার কাছে বেশ কিছু আরবি সুরা-কালাম শিখেছিল মাসুদ। সে এতকাল স্মরণ করার প্রয়োজন হয়নি, আজ জরুরি প্রয়োজনেও সেগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করে না। বরং মুকুলের কথা ভাবে। মুকুল ধর্মে আছে, রাজনীতিতেও গেছে, চাকরি ও ব্যবসায় চুটিয়ে টাকা বানাচ্ছে। কেন এত করছে মুকুল? ভোটে দাঁড়িয়ে এমপি মন্ত্রী হতে চায় কেন? নিছক দেশপ্রেম কিংবা জনসেবা করার মহত্তর বাসনা থেকে? নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অগ্রজকেও পাশে রাখতে চায় কেন? মাসুদ নিজের অনাগ্রহ বোঝাতেই যেন, গোরস্তানে দাঁড়িয়েও বাংলোয় ছেড়ে আসা বহ্নি নামক মেয়েটির কথা ভাবে। রাস্তায় কেনা ফুলের মালাটি মোমেনার স্মরণে বহ্নিকেই দেওয়া যায় বরং।
কবরবাসীর জন্য নীরব শ্রদ্ধানিবেদন ও কিছুক্ষণ নিঃশব্দ দোয়াপাঠ শেষে ইমাম সাহেব এবার হাত তুলে আল্লার দরবারে সরবে প্রার্থনা জানায়। সবাই হাত তোলে বলে মাসুদও হাত তোলে। ইমাম হুজুর কবরবাসী মাসুদের পূর্বপুরুষ নয় শুধু, এ যাবত্ যত মুসলমান কবরে শুয়ে আছে, তাদের আত্মার শান্তির জন্য আল্লার কাছে আকূল প্রার্থনা করে। আর চোখ বুজে মাসুদ নিজের বিজ্ঞান-দর্শন চিন্তাগুলো স্মরণ করে। কান ইমামের প্রার্থনার বয়ান গ্রহণ করতে পারে না বলে মন আত্মভাবনায় বিভোর হয়ে ওঠে ক্রমে।
ধর্মবিশ্বাসীদের মতে পুনর্জন্ম ও পরকালের বিষয়টা সত্য হলে আজ পর্যন্ত আল্লার সৃষ্ট যত মানব কবরবাসী হয়েছেন, রোজ হাশরের মাঠে একসঙ্গে সবাই জিন্দা হয়ে উঠলে তাঁদের সংখ্যা হবে কত? আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষরা প্রায় ষাট হাজার বছর ধরে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবী নামক গ্রহে। মানবপ্রজাতির দুই লক্ষ বছরের বিবর্তনের হিসাব ধরলেও কবরবাসীদের সংখ্যাটা নেহাত কম হবে না। ফিজিক্স পড়ার আগে বায়োলজিতেও আগ্রহ জন্মেছিল মাসুদের, ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন ও বিবর্তনবাদ পড়ে সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে ধর্মের ব্যাখ্যাকে ভিত্তিহীন মনে হয়েছিল তরুণ বয়সে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, শতভাগে শিক্ষিতের দেশ খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও শতকরা ৪৬ জন মনে করে, মানবজাতির আদি পিতা হিসেবে আদম-হাওয়া বিষয়ক ধর্মগ্রন্থের গল্পগুলো আক্ষরিকভাবে সত্য। কোন দার্শনিক যেন, সম্ভবত ভোলতেয়ার বলেছিলেন, ঈশ্বর যদি না-ও থাকত, মানুষের প্রয়োজনেই তাকে আবিষ্কার করাটা জরুরি হয়ে পড়ত। মানবজাতির ইতিহাস বিষয়ে জনৈক দার্শনিক-ঐতিহাসিকের বেস্টসেলার গ্রন্থের সাম্প্রতিক ব্যাখা মনে পড়ে মোনাজাতে দাঁড়িয়েও। আজ পর্যন্ত বিশ্বে আবির্ভূত সকল ধর্মীয় মিথ ও গল্পকে মানব সমাজ গঠনে, সামাজিক ঐক্য ও পারস্পরিক সহাযোগিতা প্রদানের অতি প্রয়োজনীয় গল্প হিসেবে দেখিয়েছেন লেখক। আর মানবসৃষ্ট সকল গল্পের মধ্যে টাকাকে সবচেয়ে বড় গল্প হিসেবে মন্তব্য করেছেন, যাকে বিশ্বাস করে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ। মুকুলও কি ধর্ম-টাকা এইসব গল্পের জোরেই ধর্মপুরের মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে? করুক, মাসুদ ছোট ভাইয়ের পথে যাবে না অবশ্যই। তা বলে বিজ্ঞানের ব্যাখা দিয়ে সৃষ্টিতত্ত্বের প্রচলিত গল্পকে মিথ্যে প্রমাণ করতেও দেশে ফেরেনি সে। সেলফিশ জিনের প্রভাবে হয়তো বা, বাবা-মা-ভাইসহ পরিবারের জন্য প্রতিটি মানুষের স্বার্থপর ভালোবাসা স্বাভাবিক। মাসুদ তার স্বার্থপর ভালোবাসা শুধু পরিবার-গোত্র কিংবা জাতীয় গণ্ডির মধ্যে আটকে না রেখে, গোটা মানবজাতির জন্য ব্যাপ্ত করতে চায়। আর এ কাজে আল্লাহ এবং তার সৃষ্ট ধর্ম যদি তাকে সাহায্য করে, ক্ষতি কী? অবশ্যই আল্লাকে ধন্যবাদ দেবে সে।
ঠিক তখনই গোরস্তানের নীরবতা সচকিত করে তাকে। চোখ মেলে সে দেখতে পায় মোনাজাত শেষের আমিন বলে সবাই হাত নামিয়েছে, মুগ্ধ কিংবা সন্দেহভরা দৃষ্টিতে প্রফেসরের বাড়তি মোনাজাত লক্ষ করছিল সবাই। মোনাজাতের জন্য প্রসারিত হাত চুম্বন করে মাসুদ পাশের মসজিদটির দিকে তাকায়। পাশে দাঁড়ানো চাচা ও ইমামকে শুনিয়ে বলে, ‘আমাদের টিনের মসজিদটি এত সুন্দর হয়েছে, ভিতরে ঢুকে একটু দেখা যাবে না?’
নামাজের সময় নয় এটা, তারপরও মাসুদকে মসজিদ দেখাতে নিযে যায় উত্সাহীরা। মসজিদের জন্য মুকুলের অবদানের কথা নতুন করে শোনায় মাসুদকে। মসজিদের ভিতরের ঝকঝকে তকতকে চেহারা ও টাইলস বসানো মেঝে দেখে মুগ্ধ মাসুদ মন্তব্য করে, বাহ, ভেতরে ঢুকলেই তো মানুষের নামাজ পড়তে ইচ্ছে করবে, তা-ই না? খুব সুন্দর হয়েছে।’
ইমাম হুজুর জানতে চায়, ‘আপনাদের আমেরিকাতেও নিশ্চয় এরকম আল্লার ঘর আছে?’
‘হ্যাঁ, আমেরিকায় সব ধর্মের মানুষ আছে। যে যার ধর্ম পালনের এবং ধর্ম না মানারও স্বাধীনতা আছে।’
মাসুদ তার আমেরিকান পরিচয় আড়াল করতেই যেন এবার চাচাকে শুনিয়ে বলে, ‘চাচা, আপনার মনে আছে, ছোটবেলায় দাদার সঙ্গে এই মসজিদে যখন নামাজ পড়তে আসতাম, তখন চটের উপর নামাজ পড়তাম আমরা। ফজু মুন্সির মক্তবে আল্লাহর গ্রন্থ কোরান পড়া শিখতেও আসতাম।’
চাচাও বেশ উত্সাহী হয়ে ওঠে, ‘আমেরিকায় গিয়া কি ধর্মপুরের কথা স্মরণ করার সময় হতো তোমার?’
‘ছোটবেলার বহু স্মৃতি যখনতখন মনে পড়ে চাচা।’
‘ছোটবেলায় তুমি যে কীরকম মেধাবী ছিলে, সেই গল্প আমি অনেককে বলেছি। লেখাপড়ার ফাঁকেও বাবার হালগেরস্থি দেখেছো। আব্বা মরার পর তার খড়ম দুটি পায়ে দিয়ে বলতে, আমি দাদা হবো। মনে আছে মাসুদ? একবার আমার মোটরসাইকেল দাবড়ে টাউনেও গিয়েছিলে। মনে আছে?’
চাচার মোটরসাইকেলে চড়া দূরে থাক, স্পর্শ করেনি কখনো মাসুদ। চাচার স্মৃতিতে খড়ম মোটরসাইকেলের গল্প কেন ঢুকেছে, নাকি এখন ঢোকাচ্ছে, মাসুদ বুঝতে পারে না। তবে লোকটার সঙ্গে নিজেও হারানো দিনে ঢুকতে আগ্রহী হয়ে বলে, ‘চাচা, আমাকে পুরনো বাড়িভিটটা ঘুরে দেখান তো। সবই তো অচেনা মনে হচ্ছে।’
মাসুদকে পুরনো বাড়িভিটা দেখানোর দায়িত্ব পালনে ইব্রাহিম হাজির সঙ্গে অন্য নামাজিরাও তার পিছু নেয়। কথাবার্তা হতে থাকে পুরনো দিন নিয়ে।
৫.
ধর্মপুরে যখন বিদেশি কনডম ছোট চ্যাংড়াদের হাতে বেলুন হয়ে উড়তে শুরু করেছিল, সেটা ছিল আসলে ধর্মপুরের সনাতন সমাজ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ-ঘোষণাও। মাসুদ তখন সবে সাবালক হচ্ছে। দুষ্টু ছেলেদের হাতে জন্মনিয়ন্ত্রণের কনডম বেলুন কিংবা গোল ঘুড়ির মতো উড়তে দেখে জিনিসটার প্রকৃত কার্যকারিতা যেমন কল্পনা করেছিল, তেমনি এর উত্স সম্পর্কেও আন্দাজ হয়েছিল তার। রেডিওর ব্যাটারি কেনার জন্য মায়ের বিছানার তলায় একদিন টাকা খুঁজতে গিয়ে বেশকিছু কনডমের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখে চমকে উঠেছিল সে। ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের চাকরি পেয়ে মোমেনাই আসলে এসব গাঁয়ের সব বাড়িতে মাগনা বিতরণ করে বেড়াচ্ছিল। চোরের মতো একটি কনডম সরিয়ে পকেটে রেখেছিল সে।
কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষণে কৌতূহলবশে কনডমটি গোপনে নিজের অঙ্গে ধারণ করে মাসুদ নিজের বেড়ে ওঠা পরিমাপের জন্য। কিন্তু জীবনে প্রথম ব্যবহূত সেই কনডমটি যুদ্ধজয়ের দৃঢ় অস্ত্র কিংবা বর্ম হয়ে ওঠে মোমেনার কথা ভাবতে গিয়ে। মাসুদের দৃষ্টিতে সেই সময়ে মোমেনাই গাঁয়ের সেরা সুন্দর রমণী। বিয়ের বছরের মধ্যে স্বামী মরে যাওয়ায় তার দুর্ভাগ্য নিয়ে বিদ্রূপ করে আড়ালে বলত অনেকেই ‘ভাতারখাকি মোমেনা’। পরিবার পরিকল্পনার সরকারি চাকরিটা নেওয়ায় মোমেনার চরিত্র নিয়েও গাঁয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছিল। তাকে আগলে রেখেছিল আসলে চাকরিদাতা হেডমাস্টারের পরিবার। বয়সে বছর দুয়েকের ছোট হয়েও মাসুদও যে তাকে আগলে রাখার মতো যোগ্য লায়েক হয়েছে, নায়কোচিত ভূমিকাও পালন করেছে, মোমেনা হয়তো তা জানে না। কিন্তু যে জিনিস গাঁয়ের বেহদ্দ গরিব চাষাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সে মাগনা বিতরণ করে, সেই জিনিস কি মাসুদের বাবা-মাকেও বিলানো তার ঠিক হয়েছে? এমনিতে ভালোলাগার গোপন মাসুল আদায় করতে মাসুদের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে মোমেনা।
এটি ঘিরে অতপর মোমেনা ও মাসুদের মধ্যে যে নিষিদ্ধ সম্পর্কের বিস্তার, যে সম্পর্ক ধর্মপুরের ধর্ম ও প্রচলিত নীতি-নৈতিকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মতো এবং যে যুদ্ধের পরিণামে মাসুদ একদিন পরিবার ও গ্রাম থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়েছে, আত্মজীবনীতে তার সত্ বিবরণ দেওয়ার আগে সেই সময়ে ধর্মপুরের সমাজ ও নারী-পুরুষের সম্পর্কের স্বরূপটিও সঠিক উপলব্ধি করা দরকার।
মাসুদ তখন বাবার হাইস্কুলের ছাত্র। ধর্মপুরে মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো স্কুল নেই। গাঁয়ের মানুষের ধারণা ছিল, আল্লাহ মেয়েদের দুনিয়ায় পাঠিয়েছে ঘরকন্নার কাজ আর সন্তান উত্পাদনের জন্য। নারীশিক্ষায় আগ্রহী ছিল না গাঁয়ের সম্পন্ন গৃহস্থ-চাষিরাও। এমনকি মাসুদের বড়বোন রোজি স্কুলে যায় দেখে জোতদার দাদাকেও সে বলতে শুনেছে, ‘লেখাপড়া শিখিয়া তোর কী লাভ রে চেংড়ি, বিয়া দিলে তো খালি ফড়ফড় করি ছাওয়া ফোড়াবু।’ কোরান পড়া শিখতে বাচ্চা মেয়েরা মায়ের শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে কিংবা ওড়নার হিজাব পরে মসজিদের মক্তবে যেত। প্রাইমারি স্কুলেও যেত অনেকে, কিন্তু বাবার হাইস্কুলে ছাত্রীসংখ্যা ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। তাদের মধ্যে হেডমাস্টারের বড় মেয়ে রোজি ও তার বান্ধবী মোমেনাও ছিল। যেহেতু সোমত্ত হয়ে ওঠার পর গ্রামসমাজে একটি ছেলেতে ও মেয়েতে মেলামেশা, এমনকি কথাবার্তা বলাও ছিল গভীর সন্দেহ জাগানো ঘটনা, নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ ব্যাপার। স্কুলে কিশোরী মেয়েদের আগলে রাখার ব্যাপারে হেডমাস্টার তাই ছিলেন বেশ সতর্ক। ক্লাসে যখন শিক্ষক থাকত না, মেয়েরা হেডস্যারের রুমে থাকত। ঘণ্টা বাজলে ক্লাসে যেত, আবার শিক্ষকের সঙ্গে বেরিয়ে আসত ক্লাস থেকে। মাসুদও স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এবং বাড়িতেও বোন ও তার বান্ধবীর পাহারাদারের ভূমিকা নিয়েছিল অনেকটা।
মোমেনা ছিল গাঁয়ের সাধারণ মাঝারি কৃষক হাসমতের ছোট মেয়ে। হাসমত বেঁচে থাকতে পাটোয়ারিবাড়ির আধিয়ার ছিল, এখন বাপের ভূমিকা নিয়েছে তার ছেলে জলিল। জলিল হেডমাস্টারের বেশকিছু আবাদি জমি বর্গায় চাষাবাদ করে, মায়ের সঙ্গে দূরবর্তী কী এক সম্পর্কের সুবাদে হেডমাস্টারকে মামা ডাকে। তবে হেডমাস্টারের পরিবারের সঙ্গে তাদের মাখামাখি সম্পর্ক ছিল মূলত মোমেনার কারণেই। রোজির সমবয়সী হওয়ায়, একসঙ্গে খেলাধুলার পাশাপাশি রোজির উত্সাহে মোমেনা বছর কয়েক স্কুলেও পড়েছে। কিন্তু ছেলেদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে পারেনি যে হাসমত, মেয়েকে সে কোন আশায় পড়াবে? চোখে ধরার মতো সেয়ানা হয়ে উঠতে না উঠতেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে ঘর-সংসারে বন্দি করে দায়মুক্ত হতে চায় গাঁয়ের সকল বাবা-মা। তাই হেডমাস্টারের মেয়ের সুবিধার্থে মোমেনাকে অবিবাহিত কুমারী রাখেনি বেশিদিন। কিশোরী বয়সেই মোমেনা ছিল চোখে ধরার মতো সুন্দর। মাসুদের দৃষ্টিতেও বোনের চেয়ে মোমেনাই ছিল সেরা সুন্দরী। হাইস্কুলে বছর দুয়েক পড়িয়েই, দেখেশুনে ম্যাট্রিক পাস বরের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল তার বাপ-ভাইয়েরা। জামাইকে সাইকেল-ঘড়ি যৌতুক দিতে জমিও বন্ধক রেখেছিল হাসমত। মোমেনার বিয়েতে সপরিবারে দাওয়াতও খেয়েছে হেডমাস্টার। শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় কেঁদে বলেছিল মাকে, ‘মাসুদকে না হয় আমার সাথে দেন মামি। একদিন পরে ভাই সাইকেলে নিয়ে আসবে।’ মোমেনার শ্বশুরবাড়ির যাত্রী হতে দেয়নি বাবা-মা, মাসুদও আগ্রহবোধ করেনি। তবে মোমেনার বিদায়ী কান্না স্মরণ করে মাসুদও মন খারাপ করে ছিল অনেকদিন।
বড়ই অলক্ষুনে মেয়ে মোমেনা। বিয়ের দুই বছর না পুরতেই জোয়ান স্বামী, অসুখবিসুখ ছাড়াই একদিন বিছানা থেকে মেঝেতে ধপাস পড়ে গিয়ে মারা যায়। মোমেনার তখন একটি বাচ্চা হয়েছে। বিধবা হওয়ার পরও বাচ্চা নিয়ে স্বামীর সংসারেই থাকতে চেয়েছিল সে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির গ্রামে ভাতারখাকি ডাইনি অপবাদ রটেছে, তার চরিত্র নিয়েও কথা উঠেছিল। শ্বশুরবাড়িতে বেশিদিন জায়গা হয়নি। কোলের মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি ধর্মপুরে ফিরে এসেছে আবার। মেয়ের এই করুণ পরিণতি দেখার আগেই মৃত্যু হয়েছিল হাসমতের।
ম্যাট্রিক পাসের পরই হেডমাস্টারের মেয়ে রোজিরও বিয়ে হয়েছে শহরে। বান্ধবী নেই, বাপের বাড়িতে এসে মোমেনা আবার আগের মতোই যাতায়াত শুরু করেছিল মাস্টারবাড়িতে। বড় বোনের অভাব পূরণে মাসুদ-মুকুলকেও আপন ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহের চোখে দেখত মোমেনা। মাসুদকে একদিন প্রস্তাব দিয়েছিল, ‘রোজির বাসায় আমাকে নিয়ে একদিন বেড়াতে যাবি মাসুদ? দাঁড়া, মামিকে আগে বলে দেখি।’
মোমেনার যে আবারও বিয়ে হবে এবং বিয়ে হওয়াই উচিত, তার চেহারার দিকে তাকালে যে কেউ বলবে এ কথা। স্বামীকে হারিয়ে তার রূপ-যৌবন আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল যেন। মাসুদও একদিন হেসে প্রস্তাব দিয়েছিল, ‘তোমাকে দেখেশুনে এবার টাউনে ভালো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে মোমেনা বু। ম্যাট্রিক পাসের পর আমিও তো টাউনে থাকব, তোমার টাউনের বাসায় যেতে পারব তখন।’
‘এক স্বামীর জীবন খেয়েছি। আর বিয়েই করব না আমি। গ্রামের লোক আমার সম্পর্কে কী বলে শুনিস নাই?’
‘ওসব কুসংস্কার বিশ্বাস করি না আমি। রোজি আপার মতো তোমাকেও আবার ভালো পাত্র খুঁজে বিয়ে দেবো আমরা। মাকে বলেছি আমি।’
‘আমার জন্য তোর এত দরদ কেন রে মাসুদ?’
সেদিন মোমেনার প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি মাসুদ, নিজেও সঠিক কারণটা জানত না বলেই হয়তো। সঠিক জবাব খুঁজতে গিয়েই বিধবা মোমেনার প্রতি আসক্তিটাও অস্বাভাবিক তীব্রতর হয়ে উঠেছিল। এসময় মোমেনার দ্বিতীয় বিয়ের পথ প্রশস্ত করতে, নাকি চিরতরে বন্ধ করে দিতে—কে জানে, এয়াকুব হেডমাস্টার একদিন বাড়িতে মোমেনার বড় ভাই জলিলকে ডেকেছিল।
‘থানা ফ্যামিলি প্ল্যানিং অফিসে মাঠকর্মী হিসেবে কিছু মহিলা নিয়োগ করবে। ভালো বেতন, কাজ দেখাতে পারলে ভবিষ্যতে আরো উন্নতি হবে। চেষ্টা করলে তোদের মোমেনাকে হয়তো ঢোকানো যায়। কিন্তু ওকে দিয়ে কি এ চাকরি করাবি তোরা?’
‘যা ভালো বোঝেন আপনি, করেন মামা। আপনার ওপর আর কী কথা!’
সিদ্ধান্তের ভার হেডমাস্টার মামার ওপর ছেড়ে দিয়ে জলিল ফিরে গিয়েছিল। পরদিন সকালে ছুটে এসেছিল মোমেনা নিজেই। ভাই ও বিধবা মায়ের সংসারে শিশুকন্যাসহ নিজের অসহায় অবস্থা তুলে ধরে বায়না ধরেছিল, চাকরিটা তার চাইই, যত কঠিন হোক কাজ, সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। আর চাকরিটা হলে নিজে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে চাকরির আরো যোগ্য করে তুলবে, আর মেয়েকেও ভবিষ্যতে মামার স্কুলে পড়াতে পারবে।
শিক্ষার প্রতি মোমেনার এরকম দুর্বলতা দেখে হোক, আর নিজের মেয়ের বান্ধবী হওয়ার কারণেই হোক, এয়াকুব মাস্টার নিজে ছোটাছুটি করে মোমেনাকে চাকরিটা নিয়ে দিয়েছে। মোমেনা এখন সপ্তাহে একবার বড় ভাইয়ের সাইকেলের পেছনে বসে থানাসদরের অফিসে যায়। একটা ছাতা মাথায় দিয়ে ঘাড়ে পরিবার পরিকল্পনার ব্যাগ নিয়ে পায়ে হেঁটে ধর্মপুরের পরিচিত গ্রাম-পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় প্রতিদিন। ঘোরাঘুরির চাকরি হলেও, মোমেনার মাসিক বেতন সরকারি প্রাইমারি স্কুলশিক্ষকের সমান।
ধর্মপুরে মাসুদের শিক্ষাজীবনের সময়টা ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও জমিদারি প্রথা গত হওয়ার পরও, দেশের শাসকদের ধর্মপুরের মানুষ রাজার মতো মান্যগণ্য করত, ভয়ও পেত। পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানকে আরো বেশি ভয় পাওয়ার কারণ, গদি দখল করে সে মার্শাল ল জারি করেছিল। এমনিতেই ব্রিটিশ আমল থেকেই খাকি পোশাকের পুলিশ ডাণ্ডা হাতে গ্রামে এলে ভয়ে জঙ্গলে কিংবা মাচানের ডুলিতে গিয়ে লুকাত গাঁয়ের নিরপরাধ নিরক্ষর মানুষজন। খাজনা আদায়ের জন্য জমিদারের পাইক-পেয়াদা এলেও ভয় পেয়েছে তারা। আইয়ুব খানের রাজত্বে তার হুকুম পালনের জন্য পুলিশ পাইক-পেয়াদা ছাড়াও আছে মিলিটারি, যাদের হাতে বন্দুক-রাইফেল ছাড়াও কতরকম অস্ত্র।
ক্ষমতায় এসে আইয়ুর খান তার প্রিয় দেশবাসীর বড় শত্রু হিসেবে মশা-মাছিকেও টার্গেট করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি মানুষের শত্রু হিসেবে দেশে মশা-মাছির সংখ্যা তখন শত কোটি ছাড়িয়ে গেছে। অতএব মশা-মাছির জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। হুকুম হয়েছিল প্রতিটি বাড়ির আশপাশের ডোবা-নালা ঝোপঝাড় পরিষ্কার এবং পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
ধর্মপুরের সাধারণ মানুষরা সরকারি আইন-কানুনের ব্যাপারগুলো পাটোয়ারি বাড়ির মাধ্যমে নিশ্চিত হতো। কারণ দেশের খবর শোনার জন্য রেডিও-ট্রানজিস্টার ছিল একমাত্র বড়বাড়িতে। সরকারের কোর্টকাচারি ও থানাপুলিশেরও এ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অনেকটা নিকট আত্মীয়সুলভ। কাজেই আইয়ুব খানের হুকুম সম্পর্কে পাটোয়ারিরা নিশ্চিত করলে গাঁয়ের প্রতিটি গেরস্তচাষি উঠে পড়ে লাগে ডোবা-নালার কচুরিপানা সাফ এবং ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার কাজে।
দিন কয়েকের মধ্যে গাঁয়ের অবাঞ্ছিত জায়জঙ্গল ও কচুরিপানা সাফা হওয়ায় সত্যি সত্যি গাঁয়ের চেহারা কিছুদিনের জন্য পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু এতেও মশা-মাছির ঘরবাড়ি ধ্বংস না হওয়ায় সরকারিভাবে শুরু হয় ম্যালেরিয়া নির্মূল অভিযান।
মশক নিধনের কটুগন্ধি ঔষধ পানিতে গুলিয়ে, তা স্প্রে-মেশিনে ঢুকিয়ে বাড়িতে ঢুকে ঘরে ঘরে স্প্রে করত সরকারি লোকেরা। বাড়িসংলগ্ন ডোবানালাতেও ছিটাত। বিষাক্ত কেমিক্যালের গন্ধে কটুগন্ধে ভারী হয়ে উঠত গাঁয়ের বাতাস। ঔষধ ছিটানোর পর প্রত্যেক বাড়ির দরজায় কি বাঁশের খুঁটিতে আলকাতরা দিয়ে এম লিখে নম্বরও দিয়েছে তারা। ঔষধের গন্ধ মিলিয়ে গেলেও সেই নম্বর মাসুদ বহুদিন অম্লান দেখেছে নিজেদের ঘরের দরজায়। ম্যালেরিয়া নির্মূল অভিযানে কাজ হয়েছিল। স্মৃতিতে ম্যালেরিয়া-ঔষধের অপসৃয়মাণ গন্ধ শুঁকে শুঁকে মশার উপদ্রব ছাড়া কয়েকদিন শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছিল গ্রামবাসী, এমনকি গোয়ালের গরুগুলোও। কেবল গ্রামের মাছুয়া ধোঁধা একদিন পাটোয়ারি বাড়িতে এসে অভিযোগ জানায়, ‘ম্যালেরিয়ার ঔষধে খালি মশা-মাছি মরে নাই, ডোবার মাছেরও সর্বনাশ হইছে। ঐ ডোবার পানিতে মেশিন ধুইছিল সরকারি অফিসার। ঔষধের বিষ খাইয়া বড় মাছ তো মরছে, মাছের আন্ডাবাচ্চাও ধ্বংস হইছে।’
মাছুয়া ধোঁধা ছিল ধর্মপুরের সবচেয়ে বড় মত্স্যবিশারদ। কিন্তু সেদিন ডোবায় মাছ না পাওয়ার দুঃখ সরকারি লোকজনের ওপর চাপানোটা তেমন আমল দেয়নি গাঁয়ের লোকজন।
মশা-মাছি মারার সময়টাতে ধর্মপুরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও সরকারি অভিযান শুরু হয়। পাটোয়ারি বাড়ির রেডিওতে জন্মনিয়ন্ত্রণের গান হতো প্রতিদিন। ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট, সংখ্যা বাড়লেই সংসারে অভাব-অনটন বাড়ে। গাঁয়ের সাধারণ মানুষকে এসব কথা বোঝানোর জন্য রেডিওতে গান ও জীবন্তিকা মাসুদও শুনেছে। রেডিও শুনতে আসা গাঁয়ের লোকজন ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের গান শুনে হাসি-তামাশা করত নিজেদের মধ্যে। মানুষের জন্ম, মৃত্যু, রেজেক এবং দৌলত—এই চারটি জিনিস দেওয়া কিংবা নেওয়ার মালিক কে? অবশ্যই আল্লাহ তাআলা। কাজেই আল্লাহ যে মানুষকে দুনিয়ায় পাঠাতে চায়, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করে মোমেনা, এমনকি আইয়ুব খানের বাপও কি পারবে তা রোধ করতে?
হেডমাস্টারের ছেলে, উপরন্তু তুখোড় মেধাবী ও ভালো ছেলে হিসেবে গাঁয়ে সুখ্যাতি ছিল বলেই বোধহয়, একদিন প্রশ্নটা মাসুদকেও জিজ্ঞেস করেছিল গাঁয়ের নিরক্ষর চাষি মনির দাদা। ধর্মপুরের মানুষের কাছে আল্লাহই হচ্ছে পরম সত্য, যার বিরুদ্ধে কথা চলে না। চরম মিথ্যেবাদী লোকটাও আল্লাহর দোহাই দিলে চট করে অবিশ্বাস করতে পারে না কেউ।
স্কুলের পরীক্ষায় মাসুদ প্রতি বছর ফার্স্ট হলে মেধার চেয়েও হেডমাস্টারের সঙ্গে সম্পর্কটাকেও গুরুত্ব দিত অনেকে। কিন্তু নিজের স্কুলে যে সন্তানদের প্রতিও সে পক্ষপাত করে না, এটা বোঝাতে দুই ছেলেকেই শহরের স্কুল-কলেজে পড়ানোর প্রস্তুতি ছিল তার। বড় মেয়েকে এ কারণেই শহরের চাকরিজীবী ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে। সন্তানের মেধার প্রমাণ দিতে ধর্মপুর হাইস্কুলে থাকতেও একবার আন্তঃজেলা রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য মাসুদকে আদেশ দিয়েছিল বাবা। সেই সময় দেশে উন্নয়নের এক দশক উদ্যাপনের মাধ্যমে আইয়ুব খানের সুশাসনের কীর্তি দেশব্যাপী প্রচারের জন্যে সরকারি পর্যায়ে নানারকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ধর্মপুর হাইস্কুলেও সার্কুলার এসেছিল এ বিষয়ে আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য। সার্কুলার ছাড়াও কিছু বইপত্র দিয়ে বাবা মাসুদকে বলেছিল, ‘এমন রচনা লিখবে, যাতে গোটা জেলায় ফার্স্ট হয়ে স্কুলের সুনাম বাড়াতে পারো। তাহলে গ্রামের কেউই বলতে পারবে না—হেডমাস্টার নিজের ছেলেকে ফার্স্ট করে দিয়েছে।’
বাবার স্কুলের সুনাম বাড়াতে মাসুদ তার রচনায় আইয়ুব খানের শাসনামলের অনেক সুকীর্তির মধ্যে শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, ম্যালেরিয়া নির্মূল প্রকল্প, নদীতে বাঁধ নির্মাণ, সবুজ বিপ্লব তথা ইরি ধান ইত্যাদি নানা বিষয়ের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বয়ান দিয়েছিল। তবে এসব উন্নয়নের বেশিরভাগ তথ্য-উপাত্ত খুঁজে বের করেছিল সে বইপত্র ঘেঁটে। তবে বিতর্কিত পরিবার-পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা ও দুঃসাহসী প্রয়োগ সম্পর্কে লিখতে মোমেনাই তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে বেশি।
প্রকৃতপক্ষে, মোমেনা পরিবার পরিকল্পনা অফিসে সরকারি চাকরিটা পাওয়ার পরই ধর্মপুরে ফ্যামিলি প্ল্যানিং সাড়া জাগানো ঘটনা হয়ে ওঠে। এর একটি প্রধান কারণ সম্ভবত মোমেনা নিজেও। যেখানে মেট্রিক পাস করেও ছেলেরা চট করে চাকরি পায় না, সেখানে মোমেনা সামান্য লেখাপড়া সম্বল করে সরকারি চাকরি পেয়েছে। ধর্মপুরে সে-ই প্রথম চোখে ধরার মতো সোমত্ত মেয়েমানুষ, যে স্বামীর কিংবা বাপের ঘরসংসারে অন্তরীণ থাকার বদলে জন্মনিয়ন্ত্রক কনডম-বড়ির ঝোলা কাঁধে নিয়ে বেপর্দা গাঁয়ের পথে ঘুরে বেড়ায়। অন্ধকারে নারী-পুরুষের গোপন গভীর সম্পর্কটা অনেকটাই প্রকাশ্যে ও ল্যাংটা হয়ে ওঠে মোমেনাকে দেখলেই।
রেডিওর প্রচারণা পারেনি, কিন্তু মোমেনা চাকরি শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে বিদেশি কনডম গাঁয়ের বালকদের হাতে বেলুনের মতো উড়তে শুরু করেছিল। ছোট বাচ্চারাও কনডমে পানি ভরেও খেলত। কিন্তু এগুলো যে আসলে জন্মনিয়ন্ত্রণের জিনিস, সেটা বয়স্করা অল্পসময়েই বুঝে গেছে। মাস্টারবাড়ির বড় হালুয়া কালু শেখ একদিন মাসুদের সামনে এক ছেলেকে ধমক দিয়েছিল।
‘এই চ্যাংড়া, তোর বাপের চ্যাট এমন করি ফোলাছিস ক্যা?’
ছেলেটি ভড়কে গিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের মেজাজ দেখিয়ে বলেছিল, ‘এটা তোমার বাপের চ্যাট।’
‘এগুলি তোকে মোমেনা দেয় নাই?’
‘না, এগুলি মুই হামার বাড়ির শিকার ওপর পাইছোঁ।’
কালু শেখও সেদিন মোমেনার ওপর বিরক্ত হয়ে মাসুদকে বলেছিল, ‘তোমার মোমেনা বু গাঁয়ের চ্যাংড়াদের চরিত্র খারাপ করি দেবে। ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের চাকরি নেওয়ায় গ্রামের মানুষ এলায় তার নামে কত বদনামি গায়।’
মোমেনার পক্ষ নিয়ে মাসুদ সেদিন কালুকেও সতর্ক করে বলেছিল, ‘মোমেনা বু-কে আব্বাই চাকরি নিয়ে দিয়েছে। তার নামে বাজে কথা বললে কিন্তু আব্বাকে বলে দেবো আমি।’
এরপর কালু শেখ বা গাঁয়ের অন্যরাও মোমেনার নামে মাসুদের সামনে বাজে কথা বলার সাহস পেত না।
৬.
মাসুদদের বাড়ি আর মোমেনাদের বাড়ি ঠিক এ-বাড়ি ও-বাড়ি নয়। তবে পাশাপাশি গ্রাম, মাঝখানে রয়েছে ধু-ধু এক প্রান্তর—অগণিত দো-ফসলি ভুঁই নিয়ে জায়গাটা নিম্নভূমি। গাঁয়ের লোকেরা বলে বোয়ালমারির দোলা। পাটোয়ারিদের বেশির ভাগ আবাদি জোত-জমি এই দোলায়। ভাগাভাগির পরও হেডমাস্টারের ভাগে পড়েছে বিশ বিঘা মাটির চৌদ্দখানা ভুঁই। মাসুদদের জমির কাছাকাছি বাড়ি বলে মোমেনার বাপ-ভাইয়েরাও মাসুদদের জমির প্রধান বর্গাদার।
শুকনো মৌসুমে মোমেনাদের গ্রামে পৌঁছার জন্য প্রান্তরের মাঝ দিয়ে একটা প্রকৃতিক পথ জেগে ওঠে। ওই গ্রামের লোকজন পাটোয়ারিপাড়া কিংবা হাটে যাতায়াতের জন্যে ভুঁইবাড়ি খেতবাড়ির মাঝ দিয়েই চলাচল করে সাধারণত। একজনের পায়ের দাগ ধরে আরেকজন হাঁটে। ফলে ধান-পাট কেটে নেওয়ার পর যে নিধুয়া পাথার, সেখানে মাথার সিঁথির মতো পথের নিশানা ফুটে ওঠে। চাষমই দিয়ে ওরাই আবার নিজেদের পায়ের নিশানা মুছে দেয়। কিন্তু চষা জমিতে, এমনকি ধানপাট বোনার পরও কচি উদ্ভিদের সবুজ গালিচার মাঝ দিয়েই বরং চিকন মেঠো পথটা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। ঋতুবদলের সঙ্গে প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে আউশের ধান-পাটের মতো ধর্মপুরে এরকম সর্পিল পথ গজিয়ে ওঠাটাও যেন প্রাকৃতিক, ধানপাটের কিছু সবুজ চারা পায়ের ঘষায় মরে গিয়ে মানুষের চলার পথকে নির্বিঘ্ন করে দিত।
ভুঁইবাড়িতে ধান কি পাটখেত ডাগর হয়ে উঠলে অবশ্য পথটা ঢাকা পড়ে যায়। আর বর্ষাকালে দোলাবাড়ি যখন পানিতে সয়লাব হয়, কোনো বছর যখন বানের পানি ঢোকে, বোয়ালমারির দোলাকে মনে হয় মস্ত এক বিল। পানি জমলে বোয়াল ছাড়াও নানারকম মাছের ঘরবসতি ডাঙা থেকেও প্রায়ই চোখে পড়ে। এ সময়টায় দোলায় আমন ফসল কাটা বা মাছ শিকারের নেশা ছাড়া গাঁয়ের লোকজন দোলায় নামে না সাধারণত। অনেকটা ঘোরা হলেও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড বা ইউনিয়ন কাউন্সিলের গড়া মেঠোপথ ধরেই হাঁটাচলা করে।
মোমেনাকে ভালো লাগার ভাবাবেগে উথালপাথাল রাত কাটানোর পরদিন, রাতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য মাসুদ সকালে উঠেই দোলাবাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। মোমেনা এখন ছাতা মাথায় নিধুয়া পাথারের সিঁথিপথ ধরেই চলাচল করে। অনেক দূর থেকেও চোখে পড়ে সবুজ সমুদ্দুর ভেঙে তার হেঁটে আসার দৃশ্য। বাতাসে ধানখেতে ঢেউ জাগলে, কখনো বা মোমেনার শাড়ির আঁচলও ওড়ে।
নিজেদের বাড়িতেও মোমেনাকে অনেক সময় একা পায় মাসুদ, কিন্তু একান্তে কথা বলার নির্জনতা তছনছ হতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। বাড়িতে মা ছাড়াও মেলা রকম কাজের লোক। ঢেঁকিঘরে অঞ্জনির মায়ের ধানভানার ঢকঢকাস আওয়াজ। এ কারণে মাসুদ বাড়ির বাইরে নির্জনতা খোঁজে। মোমেনা বাড়ি থেকে কাজে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নিধুয়া পাথারের সিঁথিপথে মুখোমুখি হবে আজ, একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলবে তারা। পাথারে সম্ভব না হলে গাঁয়েরই অন্য কোথাও নিভৃত-নির্জনে মোমেনাকে আহ্বান করে মাসুদ অপেক্ষা করবে আজ।
মাসুদের দেহমনে মোমেনার জন্য অপেক্ষার অস্থিরতার মতো প্রকৃতিতেও আজ বসন্তের দোলা লেগেছে যেন। আমগাছের ভরা মুকুল বাতাসে ঘ্রাণ ছড়ায়। বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়ে উঁচু শিমুল গাছটায় লাল ফুল ফুটেছে। সকাল বেলাতেও নিজেদের বাঁশঝাড়ের জঙ্গলে কোকিলের ডাক শোনে মাসুদ। আর মোমেনার কাছে দ্রুত পৌঁছানোর জন্যে ধানখেত পাটখেত আয় আয় করে ডাকছে যেন। পাথারের মাঝে একা অপেক্ষা করলে লোকজনের মনে সন্দেহ জাগতে পারে। মাসুদ তাই মোমেনার ডিউটিতে যাওয়ার সময় না হওয়া পর্যন্ত বাড়ির সামনেই অপেক্ষা করে।
এক ঘণ্টার অপেক্ষাও এক বছরের মতো ভারী হয়ে উঠলে মাসুদ সাইকেল নিয়ে বাইরে বেরুনোর জন্য তৈরি হতে থাকে। মাকে কারণ দেখায়, ‘ও মা, আমার তো স্কুল নাই। বিলের ধারে যে জমিগুলি, সেখানে এবার ইরি ধান লাগাতে বলেছি আধিয়ারদের। ওরা না করলে নিজেরই করাব। আমি একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখি।’
মা উত্সাহভরে সম্মতি দেয়। শিক্ষক স্বামীকে দিয়ে পারেনি, তাই মাসুদ ঘর-গেরস্থালি সামলানোর কাজে মাকে সাহায্য করলে খুশি হয় মেহেরজান। ছেলের প্রশংসা গর্বভরে করে সবার কাছে, ‘মাসুদ শুধু পড়ালেখায় ভালো না, বাপের চেয়েও অনেক বেশি সাংসারিক।’
বাড়ির বাইরে গোটা গ্রামের লোকজনই যেন একটি গোত্রবদ্ধ পরিবার। আত্মীয় না হলেও, আত্মীয়তার সম্পর্ক মেনেই সম্বোধন করতে হয় সবাইকে। আর নিকট আত্মীয়ের চেয়েও মাস্টারের ছেলে মাসুদকে বেশি আদরস্নেহ দেখায় গ্রামবাসী। মাসুদের দাদার মৃত্যুর পর তার বাবা ও চাচারাই এখন নতুন জমিদার বা গোত্রপ্রধানের ভূমিকায়। এ কারণে মাসুদকে ভয়ও পায় অনেকেই। রাস্তায় দেখা হলেই কথা বলে, ‘কোনঠে যান বাহে? স্কুল যান নাই ক্যানে বাবা?’ এরকম প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে মাসুদ আজ সাইকেল বেশ জোরে চালিয়ে মোমেনাদের বাড়িতে যায় প্রথম।
বিয়ের আগে মোমেনা রোজি আপার সঙ্গে স্কুলে পড়ার সময় বোনের দূত হয়ে তাদের বাড়িতে ঘন ঘন যাতায়াত করেছিল মাসুদ। মোমেনার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর খুব একটা আসা হয়নি। তবে যতবার এসেছে, ততবারই মোমেনার মা আপন ফুফুর মতো আদরযত্ন করেছে। আদরযত্ন মানেই নানারকম খাওয়া। আজ অনেকদিন পর ওদের বাড়ির উঠানে ঢুকে মাসুদ মোমেনার বড় ভাই জলিলকে খোঁজে প্রথম।
‘ও বেটি, জলিল ভাই কই?’
মাসুদকে দেখে বাড়ির সবাই ছুটে আসে। জলিলের বউ হাতের ঝাড়ু ফেলে দিয়ে এগিয়ে আসে, তার কথা ও হাসিতে অভ্যর্থনা বড় আন্তরিক।
‘কত বড় সাগাই ঘাটা ভুলাক খায়া এ বাড়িতে আসিল আইজ! আইস দেওরা, বইস ঘরত।’
মাসুদ চারদিকে তাকিয়ে মোমেনার বদলে মোমেনার ভেজা শাড়ি-শায়া আঙিনায় ঝোলানো বাঁশের তারে দেখতে পায়। ভাবীর কাছে জলিল ভাইয়ের হদিস চায় তবুু।
মোমেনার মা জানায়, ‘মাস্টার ভাই হামার পোড়াকপালী মোমেনাকে কী একখান চাকরি নিয়া দিল বাবা! মাইনষে কত কথা কয়!’
‘বইনের চাকরি বাঁচাইতে তোমার ভাই নিছে ড্রাইভারের চাকরি। ভুঁই নিড়ানো কাম ছাড়িয়া সাইকেলের পাছত বইনকে নিয়া থানা অফিসে গেইছে বেতন তোলার জন্যে।’
মাসুদ তার হতাশা আড়াল করতে মোমেনার প্রসঙ্গ চাপা দিতে চায়, ‘আমাদের ডোবার ভুঁইতে এবার ইরি ধান আবাদ করার কথা বলেছিলাম জলিল ভাইকে। ঠিক আছে, পরে আসব আলাপ করতে, এখন যাই।’
ভাত, নান্তা, নিদেনপক্ষে একটু পান-সুপারি খাওয়ার জন্যে শাশুড়ি-বউয়ের যৌথ অনুরোধ উপেক্ষা করে মাসুদ বেরিয়ে যাওয়ার মুখে তার সাইকেলে ধরে দাঁড়ায় তিন/চার বছরের একটি শিশু মেয়ে। মোমেনার বুড়ি মায়ের কাছে জানতে চায়, ‘ও নানী, এইটা হামার কে হয়?’
‘মামু হয়। এইটা হামার মোমেনার বেটি বাবা। মা যায় চাকরি করতে, আর এ চেংড়ি সারাদিন খালি মোকে জ্বালায়।’
মাসুদ ভেবেছিল মেয়েটা জলিল ভাইয়ের মেয়ে বোধহয়, কিন্তু মোমেনার মেয়েকে দেখে সে চমকে ওঠে (পঞ্চাশ বছরের বেশি কাল পরে মোমেনার ঐ মেয়েটির কথা ভেবে মাসুদ আরো বেশি চমকে উঠেছে, কারণ ঐ মেয়ের মেয়ে বহ্নি যে একদিন বাংলোবাড়িতে ড. মাসুদ পাটোয়ারিকে সাহায্য করার কাজে চাকরি পাবে, অতদূর ভবিষ্যতের কথা সে কি কল্পনা করেছিল? নবীন যৌবনে দূরদর্শিতার গুণ সামান্যতম ছিল না বোধহয়)।
কৈশোর থেকে শুরু করে বর্তমানের মোমেনা মাসুদের স্মৃতিতে ও কল্পনায় গাঁয়ের সেরা তন্বী এক যুবতী, রহস্যভরা আকর্ষণীয়া এক নারী। কারো মা বা ভগ্নি নয়, ভালোলাগার নেশা জাগানো শুধুই একটি মেয়ে—যাকে একান্তে ভালোবাসার কথা বলার জন্যে মাসুদ আজ বেপরোয়া। কিন্তু এত বড় একটা শিশু যার পেট থেকে বেরিয়েছে, তেমন এক নারীর জন্যে মাসুদের গোপন কামনা-বাসনা নিজের কাছেও কেমন লজ্জার ও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। অস্থিরতা তাতে কমে না, বাড়ে বরং। ভালো লাগার তীব্র আকর্ষণ নবীন যৌবনে যে তীব্র উত্তেজনা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, ধর্মপুরের গোটা লোকসমাজ তা রোধ করতে পারেনি, মোমেনার ঐটুকু মেয়ে তা কী করেই বা রোধ করবে?
মোমেনাদের পাড়া থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার বদলে মাসুদ বরং নিজেও থানা অফিসে যাওয়ার কথা ভাবে। প্রেমের জন্যে প্রেমিকরা কত ত্যাগ স্বীকার করে! মাসুদ না হয় আজ একটা দিন ছোটাছুটির কষ্ট ভোগ করবে। থানা সদরে গেলে পরিবার পরিকল্পনা অফিস এবং মোমেনাকে খুঁজে পাওয়া তার জন্যে কঠিন কাজ নয়। থানা সদরে কিংবা অফিসে কথা বলার জন্যে মোমেনাকে নিভৃতে পাওয়া যাবে না, কিন্তু ফেরার সময় মাসুদ বললে মোমেনা তার সাইকেলে উঠতেও দ্বিধা করবে না নিশ্চয়। সাইকেলের সামনের রডে বসিয়ে মাসুদ আজ মোমেনার চুলের ঘ্রাণ পাবে, সরাসরি তার মুখ দেখার সুযোগ না পেলেও গোটা মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখতে দেখতে কথা বলবে, যা এতদিন বলতে পারেনি।
মোমেনার মতো ধিঙ্গি মেয়েকে নিয়ে সাইকেলে কেউ ‘ডবল কেরি’ করে না সাধারণত। কিন্তু কারো সাইকেলে ভর করা ছাড়া প্রতি সপ্তাহে গাঁয়ের ছয়-সাত মাইল কাঁচা রাস্তা ভাঙার জন্যে মোমেনার বিকল্প উপায় কী? শহরের পাকা রাস্তার রিকশা ধর্মপুরের কাঁচা রাস্তায় আসেনি তখনো। মেয়েদের জন্যে একমাত্র বাহন ছইঘেরা গরুগাড়ি আছে অবশ্য। সচ্ছল গেরস্তঘরের বউয়েরা গাঁয়ের বাইরে দেড়-দু মাইল দূরে কোথাও নাইয়র যেতেও ছইয়ের দু মুখ শাড়িকাপড়ে ঢেকে গরুগাড়িতে সওয়ার হয়। কিন্তু ধর্মপুরে গরুগাড়ি এত সস্তা নয় এবং মোমেনাও এমন বড় চাকরি করে না যে, প্রতি সপ্তাহে অফিস করার জন্যে গরুগাড়ি ভাড়া করবে। বাধ্য হয়ে কিংবা বোনের রোজগারের হিস্যা পাওয়ার লোভেই হয়তো, জলিল সাইকেলসহ বোনের বাহন হয়েছে। আজ না হয় ফেরার পথে মোমেনা মাসুদের বাহন হবে।
মোমেনাই একমাত্র গন্তব্য হয়ে ওঠায় এক ঘণ্টারও কম সময়ে মাসুদ থানা সদরে পৌঁছে যায়। পথে পরিচিত অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কিন্তু মিথ্যে জবাব শুনে বা না শুনে মাসুদের ভেতরের বেপরোয়া প্রেম আঁচ করেনি কেউ। এয়াকুব মাস্টারের ছেলের জন্যে গাঁয়ের পথেঘাটে খালি পায়ে ঘোরার বদলে সাইকেল-মোটরসাইকেলে শহর-বন্দর-স্টেশনে ছোটাছুটি করাই যেন স্বাভাবিক। মাসুদ সাইকেল চালাবার ক্লান্তি নিয়ে চাচার মোটরসাইকেলটির কথা ভাবে। মালিক চাচা বলেই মাসুদ এখনো সেই মোটরসাইকেল চালানো শেখেনি। কলেজে ভর্তি হলে সে নিজের জন্যে না হোক, শহুরে দুলাভাইয়ের জন্যে একখানা মোটরসাইকেল কিনে দিতে বলবে আব্বাকে। তাহলে মাসুদ প্রতি সপ্তাহে মোটরসাইকেলে চড়ে শহর থেকে বাড়ি যাতায়াত করতে পারবে, প্রয়োজনে মোমেনাকে পেছনে বসিয়ে রোজি আপার বাসায় বেড়াতেও নিয়ে যেতে পারবে।
থানা সদরে মোমেনাকে খোঁজার আগেই, সি ও অফিসের উল্টোদিকে, স্টেশনের রাস্তাসংলগ্ন চায়ের দোকানের সামনে, পানের দোকানে দাঁড়ানো জলিল ভাইকে দেখতে পায় মাসুদ। জলিলই তাকে আগে চিনেছে, চেঁচিয়ে ডাকে, ‘ও মাসুদ, তুই এখানে কেন! কোনঠে যাইস?’
জলিলের পরনে লুঙ্গি, মুখে পান এবং জামার ওপরে কাঁধে গামছাখানাও রয়েছে। ধর্মপুরে যে ক জন গেরস্ত-চাষির বাইসাইকেল আছে, তাদের মধ্যে জলিল একজন। সাইকেলে ধান-চালের বস্তা নিয়ে হাটে যায়। দু দিন আগেও দুটি লম্বা বাঁশ ঘাড়ের বদলে সাইকেলে করেই সে বহন করেছে। মোমেনার মতো নিজেও কিছু লেখাপড়া শিখেছে জলিল, কিন্তু বোনের মতো চেহারায় ভদ্দরলোকি ছাপ নেই বিন্দুমাত্র। জলিল যে গেঁয়ো চাষা, চেহারা দেখে অনুমান করবে যে কেউ। তবে থানা সদরে এসেও গাঁয়ের সাধারণ হালুয়া চাষার মতো অসহায় নয় সে। বোন চাকরি করে, নিজে সাইকেল চালায় এবং থানা সদরে এসে পান খায় বলেই হয়তো মাসুদের মতো প্যান্টপরা যুবককেও আজ চেঁচিয়ে ডাকতে পারে জলিল।।
সাইকেল থেকে নেমে মাসুদ অজুহাত শোনায়, ‘স্টেশনের পত্রিকার দোকানে একটি পেপার পড়তে আসলাম জলিল ভাই। পরীক্ষা হয়ে গেছে, বাড়িতে কাজ নেই, কী আর করি।’
জলিল হেসে মন্তব্য করে, ‘পড়তে পড়তে তোর ব্রেনটাই মনে হয় আউট হয়া যাইবে রে। মোমেনা ঠিকই কয়, বই ছাড়া তুই আর কিছু বুঝিস না। কাণ্ড দেখ, একখান পেপার পড়ার জন্যে এতদূর ঘাটা আইসে মানুষ! আয়, চায়ের দোকানে বসি আগে চা খা এক কাপ।’
জলিল ভাইয়ের সাইকেলের ওপর নিজের সাইকেল হেলান দিয়ে রেখে মাসুদ চায়ের দোকানে ঢোকে। সেখানে উপস্থিত অচেনা খদ্দেরদের দৃষ্টিতে কৌতূহল ফুটে উঠতে দেখে, জলিল গর্বের সঙ্গে পরিচয় দেয়, ‘চেনেন এ চ্যাংড়াকে? হামার ধর্মপুর হাইস্কুলের হেডমাস্টার এয়াকুব পাটোয়ারির বড় বেটা, সম্পর্কে হামার মামাতো ভাই। প্রতি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়, বৃত্তিও পাইছে, ম্যাট্রিকেও ফার্স্ট ডিভিশন পাইবে ইনশাল্লাহ।’
মাসুদকে না চিনলেও তার হেডমাস্টার পিতাকে থানা সদরে অনেকেই চেনে। চায়ের দোকানে উপস্থিত খদ্দেরদের একজন চেনার স্বীকৃতি দিয়ে মন্তব্য করে, ‘বাপকা বেটা, সিপাইকা ঘোড়া।’
চায়ের দোকানের মালিকটিও মাসুদের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি রেখে বলে, ‘তোমার বাপ থানার অফিসে আসলে মোর দোকানে বসি চা খায়। আর তোমার এই ফুফাতো ভাই তো এলায় বাকি খাবারও ধরছে। বইনে চাকরি নিছে, ঐ অফিসের মেলা মানুষই আমার কাস্টমার।’
‘মোমেনা আজ বেতন পাইবে, তোমার টাকা আইজ শোধ করি দিম বাহে। দে রে ম্যাচিয়ার, মাসুদকে একটা রসগোল্লা আর চা দে। নাকি দুইটা মিষ্টি খাবু রে মাসুদ? তোকে পেট ভরায় মিষ্টি খাওয়াইলেও মোমেনা বিল শোধ করি দেবে।’
‘না ভাই, আমি মিষ্টি খাব না। তা মোমেনা বু কোথায়?’
‘আছে অফিসে। এক কাজ কর, তুই চা টা খায়া পেপার-টেপার পড়ি আয়, একসাথে বাড়ি ফিরমো আইজ। মোমেনার আজ বেশি দেরি হবে না কইছে।’
‘আমি তো বাড়িতে তোকে আজ খুঁজেছি জলিল ভাই। এবারে ডোবার জমিতে ইরি ধান লাগাবি বলছিলি যে, লাগায় দেখ না একবার।’
জলিল কিছুটা অবাক চোখে মাসুদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাসুদ ভাবে, এতক্ষণে কি তাকে সন্দেহ করছে? তা নয়, আসলে আবাদের কথা ওঠায় উত্সাহিত হয়েছে জলিল।
‘চা টা খায়া চল তো মোর সাথে, তুই সাথে গেইলে অফিসারটা ভালো ব্যবহার করবে এলায়।’
মাসুদ ভেবেছিল, চা খেয়ে তাকে হয়তো মোমেনার অফিসেই নিয়ে যাবে। কিন্তু কুম্ভি পাতার বিড়ি ধরিয়ে জলিল ইরি ধানের গল্প শোনায়।
হোসেনপুরে ইরি ধানের চাষ নিজে দেখে এসেছে সে। ধানের গাছ খাটো, কিন্তু তার থোপা শিষ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এত ফলন এ দেশে আর কোনো ধানের বীজ দিয়ে কেউ কখনো করতে পারেনি। এক দোন জমিতে কম করে ১৪/১৫ মণ ধান। আউশ তো দূরের কথা, হৈমন্তিক আমন ধানের আবাদের চেয়েও ডবল। এবং মাত্র সাড়ে তিন মাসেই ফলন হয়। তবে ইরি ফলন দেয় যেমন, খায়ও তেমন বেশি। বীজ সংকট এবং আবাদ করতে ব্যয় অনেক বেশি বলে ইরি আবাদের দিকে ধর্মপুরের চাষিরা নজর দেয়নি এখনো। কিন্তু জলিল বীজ সংগ্রহের তালে আছে। সরকারি ইরির স্কিম মাসুদদের ডোবার জমিগুলোতে ঢোকাতে চায় সে। এ কারণে জলিল সেদিন থানা কৃষি অফিসেও ঢুঁ মেরেছিল। কিন্তু শালার অফিসরটা পাটোয়ারি চেয়ারম্যান ও হেডমাস্টার মামার কথা বলার পরেও তাকে পাত্তা দেয়নি। ফ্যামিলি প্ল্যানিং অফিসে চাকরি করা বোনের কথা শুনে বোনকে নিয়ে ডেকেছিল। কিন্তু মোমেনা যেতে রাজি হয়নি। এইসব বিবরণ শুনিয়ে জলিল মন্তব্য করে, ‘আসলে অফিসারটা বোধহয় ঘুষ চায় রে। চল, আজ দুইটা টাকা ঘুষ দিয়াই ইরি ধানের বেচন চামো।’
সাইকেল দু খানা চায়ের দোকানের মালিকের জিম্মায় রেখে মাসুদকে নিয়ে জলিল সত্যিই থানা কৃষি অফিসে যায়। সি ও অফিস পেরিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অফিসটাও দেখিয়ে দেয় মাসুদকে। বাইরে থেকে মোমেনার ছায়াটিও নজরে আসে না।
কৃষি অফিসের লোকটাকে জলিল হেডমাস্টার বাবার নাম ধরে মাসুদের পরিচয় দেওয়ার পর তার ছাত্রজীবনের কৃতিত্বের গল্প করে না শুধু, হেডমাস্টারের হাল-গেরস্তির সমস্যাও তুলে ধরে।
বাবার কারণেই হয়তো, মাসুদকে তুমি সম্বোধন করে চেয়ারে বসতে বলে লোকটা। জলিল পেছনে দাঁড়িয়ে কথা বলে।
‘তোমার আব্বা তো শিক্ষক মানুষ, নিজের জায়গাজমি বর্গা দিয়েই খালাস। তোমাদের মতো লেখাপড়া জানা ছেলেরা কৃষিতে মনোযোগ না দিলে আমাদের দেশে সবুজবিপ্লব সম্পন্ন হবে না। আমরা নানাভাবে বোঝানোর পরও তো গাঁয়ের কৃষকরা মান্ধাতা আমলের চাষবাস বাদ দিতে চায় না।’
মাসুদ রচনায় কৃষিবিপ্লবের ক্ষেত্রে উফশী ইরি ধানের উল্লেখ করলেও চাষাবাদ সম্পর্কে জলিলের পাশে শিশু। চুপ করে থাকে সে। জলিল জোর আবেদন জানায়, ‘হামরা ইরির বেচন আর সরকারি সাহায্য পামো কি না সেই কথা বলেন স্যার। বেচন পাইলে মাসুদরাও ইরি ধান লাগাবে এবার। দোলাবাড়িতে বিলের পাশে ওমার জমি, পানির কোনো অভাব হবে না।’
‘ঠিক আছে, আমি ধর্মপুরে যাব। তোমার আব্বা ও চাচাকেও চিনি আমি, তাদের সঙ্গে ইরির স্কিম নিয়ে আলাপ করে আসব একদিন। তোমরা ইরি ধান চাষ করলে অবশ্যই সাহায্য করব আমরা।’
জলিল এইটুকুতে খুশি হয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, ‘ঠিক আছে স্যার, হেডমাস্টার মামুকে খালি আমার নাম কইবেন, জলিল। আমার নাম মনে না থাকে যদি, আমার বইন মোমেনার নাম কইবেন, সেও তো আপনার মতো ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের সরকারি ফিল্ড অফিসার হইছে।’
লোকটার মুখে শ্লেষের হাসি ফুটলে মাসুদ উঠে দাঁড়ায়। সরকারি লোকটাকে সালাম দিয়ে জলিলকে নিয়ে বাইরে বেরিয়েই শাসনের গলায় বলে, ‘সব জায়গায় মোমেনা বু’র কথা বলিস কেন জলিল ভাই? লোকে কী ভাববে?’
‘আরে লোকে কী ভাবে ভাবুক। হামার চৌদ্দপুরুষের মধ্যে মোমেনা সরকারি অফিসে চাকরি পাইছে প্রথম। এটা কি কম কথা! মানুষ শালা হিংসার চোটে এলায় কত বদনাম করা শুরু করছে তার। চল দেখি, মোমেনার কত দেরি।’
অফিসের বারান্দায় মোমেনা মাসুদকে দেখে খুশি হয় যতটা, চমকে ওঠে তারচেয়েও বেশি। জানতে চায়, ‘কী রে মাসুদ! তোকে কেউ পাঠায় দিছে, নাকি এমনি আসছিস?’
ইরি ধানের স্বপ্নে জলিলের মন তখনো চাঙ্গা ছিল, মাসুদকে আটকানোর ইতিবৃত্ত সে বোনকে শোনায়। আর মাসুদ রাতের স্মৃতি ও কল্পনার চোখে দেখা মোমেনার সঙ্গে অফিসের মোমেনাকে মিলিয়ে দেখছিল তখন। অফিসে আরো বেশকিছু মহিলা কর্মীর ভিড়। তাদের পাশে মোমেনা অবশ্যই চোখে পড়ার মতো এবং বয়সেও অনেক কম। কিন্তু এই মেয়েকে ভালোবেসে মাসুদ কী চাইবে আর কিবা পাবে, নিজেও বুঝতে পারে না যেন।
অফিসের বারান্দায় তাদের দাঁড় করিয়ে রেখে মোমেনা ভেতরে ঢোকে। মিনিট কয়েক পর বেরিয়ে এসে ভাইয়ের সামনে মাসুদকে অনুরোধ জানায়, ‘মাসুদ চলে যাস না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমার কাজ হয়ে যাবে। তারপর একসঙ্গে ফিরব। তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে আমার।’
এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না, অফিসের কাজ সেরে আধা ঘণ্টার মধ্যে ব্যাগ ছাতা নিয়ে বেরিয়ে আসে মোমেনা। মাসুদকে আড়াল করে মোমেনা ভাইয়ের হাতে টাকা তুলে দেয়, কেনাকাটা বিষয়ে কী যেন কথাবার্তা বলে। টাকা হাতে পেয়ে জলিল খুশির সঙ্গে প্রস্তাবটা দেয়।
‘মাসুদ চল, মোমেনা আজ বেতন পাইছে। তোকে আইজ ক্যারোলিন জামার কাপড় কিনিয়া দেবে। চল স্টেশনের কাছে বড় কাপড়ের দোকানটায় যাই। মোমেনা তুই না হয় ততক্ষণ অফিসেই থাক।’
বোনকে সাইকেলে তুলে অফিস করাতে নিয়ে এলেও, তাকে নিয়ে বাজারে কেনাকাটা করার কথা ভাবতে পারে না জলিল।
প্রথম মাসের বেতন পেয়েই মোমেনা মাসুদদের বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিল বলে বাবা রেগে গিয়েছিল। মাসুদ বাবার চেয়েও বেশি রেগে যায়।
‘এরকম করলে কিন্তু আমি এখনই চলে যাব।’
‘রোজি তোকে কিছু দিলে কি না করতিস?’
‘ঠিক আছে, রোজি আপার বাসায় বেড়াতে গেলে তখন না হয় টাউন থেকে কিছু কিনে দিও। এখন চলো তো। জলিল ভাই, আমার দেরি হলে মা চিন্তা করবে।’
মোমেনা আর চাপাচাপি করে না, মাসুদের প্রস্তাবটা নিঃশব্দে মেনে নেয় যেন। জলিল দরকারি কী কেনাকাটা করার জন্যে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে তাদের দুজনকে অফিসের সামনের গাছতলায় রেখে অদৃশ্য হয়।
মাসুদ একান্তে কথা বলার জন্যে মোমেনাকে যেরকম পরিবেশে চেয়েছিল, হঠাত্ করে সেরকম একটা সুযোগ পেয়ে যায় সে। পরিবেশটা নির্জন নয় অবশ্য। অফিসের মেলা লোকজন আসছে, যাচ্ছে, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে অনেকেই। কিন্তু এরা গাঁয়ের চেনা নিন্দুক সমাজ নয়। অচেনা লোক যা খুশি ভাবুক, মাসুদ মোমেনার দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকে। রাতের নিভৃত জরুরি কথা খুঁজতে গিয়ে বুক ঢিপঢিপ করে তার। কিভাবে শুরু করবে মাসুদ? তুই ও বুবু সম্পর্ক বাদ দিয়ে কথা বলে।
‘তুমি তখন কী জরুরি কথা আছে বললে?’
‘হ্যাঁ, আজকেও তোর কথা ভেবেছি। তুই আমার অফিসে আসবি ভাবতেই পারিনি।’
মোমেনার কথা শুনে, তার দিকে তাকিয়ে থেকে চেহারায় ভালো লাগা মেয়েটিকে অনেকখানি খুঁজে পেয়ে মাসুদের বুকের গোপন আলোড়ন বেড়ে যায়।
‘কী জরুরি কথা?’
‘আমি প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবো। মামাকে বলেছি। তুই আমাকে পড়া মাসুদ। ম্যাট্রিকটা পাস করতে পারলে এই অফিসেই আমার ভালো চাকরি হবে। গ্রামে গ্রামে আর ঘুরতে হবে না। টাউনের অফিসেও বদলি হতে পারব। অফিসের বড় স্যারও আমাকে বলেছে। তুই তো পরীক্ষা দিয়ে বসে আছিস। আমাকে কিছুদিন পড়া রে মাসুদ, তুই পড়ালেই আমি পাস করতে পারব।’
‘এমনিতেই গ্রামে তোমার নামে কতরকম কথা শুনি। তারপরও আমি পড়ালে আরো বাজে কথা রটবে হয়তো।’
‘মানুষের কথা ধরলে আমি এই চাকরি করতে পারতাম না। তবে গ্রামে আর বেশি ঘুরব না। ফাঁকি দেওয়ার বুদ্ধি অফিসের লোকরাই শিখিয়ে দিয়েছে।’
কথা আর এগোতে পারে না, জলিলকে আসতে দেখা যায়। জলিল কাছে আসার আগেই মোমেনা চাপাস্বরে বলে, ‘ফেরার সময় তোর সাইকেলে যাব কিন্তু। নিতে পারবি আমাকে?’
মাসুদও এই প্রথম তার বলবার কথা জোরালো কণ্ঠে বলে ফেলতে পারে, ‘এখনো কি ছোট খোকা আমি!’ নয় যে, বোঝাতে মাসুদ ঠোঁটে দৃশ্যমান গোঁফের রেখা অযথাই চুলকায়।
মোমেনা মাসুদকে দেখে এবং মুচকি হাসিও দেয়।
মোমেনা সিটের সামনে রডে বসলেই মাসুদের সুবিধা হতো, পেছনে কাউকে ক্যারি করার অভ্যাস নেই তার। কিন্তু মোমেনা নিজেই ভাইয়ের সাইকেলের বদলে মাসুদের সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে জোড়া পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে। জলিল আপত্তি করে বলে, ‘রাস্তা খারাপ—তুই কি ডবল ক্যারি করতে পারবি মাসুদ?’
মোমেনা ঠাট্টার ভঙ্গিতে জবাব দেয়, ‘একদিন মোমেনা বুবুর জন্যে কষ্ট করুক মাসুদ। তুই জোরে চালায় যা ভাই। বাড়িত গিয়া মাসুদের জন্যে ভাবীকে একটা মুরগি জবাই করতে কইস।’
মোমেনার এ ধরনের গায়ে পড়া আন্তরিকতা যেন মাসুদের চেয়েও বেপরোয়া আজ। মাসুদ তাকে জরুরি কথা বলার জন্যে গতরাত থেকে যেরকম উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে, মোমেনাও কি একইভাবে অপেক্ষা করছিল? মাসুদ যদি তাকে পড়ানোর দায়িত্ব নেয়, তবে লেখাপড়ার আড়ালেও দুজনের আর একটা গোপন-মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠুক, মোমেনা কি তা-ই চায়?
সাইকেলের পেছন দিকে মোমেনার অস্তিত্বভার মাসুদের সাইকেলের গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে না। কাঁচা রাস্তা। তারওপর থানার কাছে বলে রাস্তা মোটেও নির্জন নয়। সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে মাসুদের সাইকেলের পেছনে বসা মোমেনাকে। চেনা লোক দেখে ফেললে ধর্মপুরে কথা রটাবে। লোকজনের ভাবার সুবিধা করে দিতেই যেন জলিল ভাইয়ের সাইকেল ক্রমশ ব্যবধান বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে চলে।
অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে আসার পর মাসুদ যখন আরো জোরে চালানোর চেষ্টা করে, পেছন থেকে মোমেনা তার জামা টেনে ধরে কী যেন বলে। আর মোমেনার কথা শুনতে মাথা পেছন দিকে একটু ফেরাতেই ভারসাম্য টলে যায়। সাইকেল এদিক ওদিক কাঁপে, ব্যালেন্স হারায় মাসুদ। মোমেনা লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে সাইকেলের ওপরই উল্টে পড়ে। আর সাইকেলসহ মাসুদ একদম ধরাশায়ী।
একজন সাইকেল আরোহী এবং পায়ে হাঁটা দুটি লোক হায় হায় করে ওঠে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়া মোমেনা-মাসুদের তামাশা দেখতে এখন আর ওদের বাধা নেই। ওদিকে জলিল এতটা সামনে এগিয়ে গেছে যে, সে টেরও পায় না।
অচেনা পথচারী মন্তব্য করে, ‘বেটিছাওয়া মানুষক সাইকেলে চড়াইলে তো এরকম হইবে। অল্পের জন্যে পাগারে উল্টি পড়েন নাই। তা হইলে দুইজনকেই পাগারের পানি খাওয়া লাগত।’
মোমেনা নিজেকে সামলে নিয়েছে ততক্ষণে। মাসুদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘তুই দুঃখ পাইছিস নাকি মাসুদ?’
খুব বেশি চোট পায়নি মাসুদ। তবে বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল বলে মোমেনার হাত ধরেই তাকে উঠে দাঁড়াতে হয়। তামাশা দেখা পথচারীরা আড়াল হতেই মাসুদ অভিযোগের সুরে বলে, ‘আমার জামা টেনে ধরছিলে কেন?’
মোমেনা হেসে জবাব দেয়, ‘কই! তুই তো ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখতে গিয়ে উল্টে পড়লি। ইস, আমার জন্যে দুঃখ পাইলি আজ!’
‘আমি ব্যথা পাইনি। ভাগ্যিস চেনা লোকজন কেউ দেখেনি।’
‘আর সাইকেলে চড়তে হবে না, তার চেয়ে গল্প করতে করতে চল দুজন হেঁটে যাই।’
এ সময় জলিল সামনে থেকে সাইকেল চালিয়ে ছুটে আসে। সাইকেলওয়ালা লোকটার কাছেই হয়তো বোনের দুর্ঘটনার খবরটি পেয়েছে সে। দূর থেকে থেকেই চেঁচিয়ে জলিল ভাই জানতে চায়, ‘কী হইছে রে মাসুদ, একসিডেন্ট হইছে নাকি?’
ভাই আসছে দেখেও মোমেনা মাসুদের জামার ধুলা ঝেড়ে দেয়। মাটিতে পড়ে গিয়েও বড় রকমের চোট পায়নি কেউ। জলিল জোর করে এবার বোনকে নিজের সাইকেলে তুলে নেয়। তাতে করে পেছন থেকে মাসুদ মোমেনাকে দেখার সুযোগ পায় বেশি, মোমেনাও ঘাড় ঘুরিয়ে মাঝে মাঝে মাসুদকে দেখে। অকারণে হাসেও।
৭.
একদিন মাস্টারবাড়িতে এসে মোমেনা রাস্তায় অবাঞ্ছিত বিপদের কথাটি মাসুদকেই জানায় প্রথম। গফুর মওলানার সঙ্গে পথে হঠাত্ দেখা হয়ে যাওয়াটাও একটা মারাত্মক দুর্ঘটনার মতো আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে তার মনে। মাসুদের সাইকেল থেকে উল্টে পড়েও সেদিন ভয় নয়, বরং মজা পেয়েছিল। কিন্তু মওলানা লোকটাকে আজ সাইকেলে আসতে দেখে রাগে মোমেনার বুক ঢিপঢিপ করেছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ যে শরিয়ত বিরোধী কাজ—সেটা যে কোনো ধর্মীয় সভায় জোরেসোরে প্রচার করে লোকটা।
গফুর মওলানা ধর্মপুর দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে বলে হাইস্কুলে পড়ার সময় পথেঘাটে অনেকবার দেখা হয়েছে মোমেনার। স্কুলে যাওয়ার পথে রোজি, মাসুদসহ অন্য ছেলেরা থাকত। কিন্তু মাদ্রাসায় ছাত্রী ছিল না বলেই বোধহয় হাইস্কুলের অল্পসংখ্যক ছাত্রীদের ওপরে মওলানার নজরটা ছিল তীক্ষ। মাসুদরা সঙ্গে থাকার কারণে লোকটা চশমা খুলে তাকাতে কিংবা সাইকেল থেকে নেমে কথা বলতে সাহস পেত না। মাসুদ যথারীতি সালাম দিত। আর রোজি একদিন হেসে মন্তব্য করেছিল, ‘হুজুরের নজর বড় খারাপ।’
যথারীতি মাথায় পাগড়ি ও চোখে কালো চশমা পরে মওলানা সাইকেলে মোমেনার দিকে ছুটে আসছিল। ছাতা সঙ্গে থাকলে মোমেনা নিজেকে আড়াল করতে পারত। কিন্তু আজ শুধু কয়েকটি বাড়ি ঘুরে মাসুদের সঙ্গে দেখা করবে বলে ছাতা নেয়নি। তবে কাঁধের ব্যাগে যথারীতি অফিসের খাতাপত্র, কনডম-বড়ি রয়েছে। দূর থেকে মওলানাকে চিনেও, মোমেনা তাকে না দেখার এবং না চেনার ভান করে হাঁটে। রাস্তার নতুন কালভার্টের পাকা শানের ওপর বসে ছিল ও পাড়ার পরিচিত রহিমুদ্দি জ্যাঠা। মোমেনা তার দিকেও তাকায় না। কিন্তু না তাকিয়েও মোমেনা বুঝতে পারে, তাকে ভালোভাবে জরিপ করার জন্যেই মওলানার সাইকেলের গতি মন্থর হয়েছে। মোমেনাকে অতিক্রম করে, রহিমুদ্দির সালামের জবাব দিতেই যেন মওলানা সাইকেল থেকে নামে এবং মোমেনাকে শুনিয়েই জিজ্ঞেস করে, ‘এই মেয়েটা কাঁয় বাহে? চেনা চেনা লাগল।’
রহিমুদ্দি জবাব দেয়, ‘হুজুর, এইটাই হামার হাসমতের বেটি জলিলের বইন মোমেনা। ফেমিলি পেলানিংয়ের চাকরি নিছে।’
‘ডাক দেন তো, ডাক দেন একটু।’
রহিমুদ্দি চেঁচিয়ে ডাকলে মোমেনা না শোনার ভান করে আর এগোতে পারে না। ঘুরে দাঁড়ায়। ভেতরে একটা চাপা ক্রোধও ফুঁসে ওঠে। মোমেনা কয়েক পা এগিয়ে রহিমুদ্দির কাছে দাঁড়ায়, ‘কী হইছে জ্যাঠো?’
গফুর মওলানা ভদ্রভাবে বলে, ‘তুমিই তাহলে ফ্যামিলি প্ল্যানিং অফিসে চাকরি নিয়েছ? ভালো। তা চাকরি করো আর যা-ই করো, বাইরে বোরখা ছাড়া একলা মেয়েমানুষের এইভাবে ঘুরে বেড়ানো কি ঠিক? তোমার সম্পর্কে ধর্মপুরে মানুষের মুখে মেলা কথা শুনতে পাই।’
বদনামের মোকাবেলা করতে, পাশে রহিমুদ্দি জ্যাঠা থাকার কারণেও হতে পারে—মোমেনার প্রতিবাদী মেজাজ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল হঠাত্।
‘বোরখা না পরলেও আমি কারো দিকে তাকাই না, কিন্তু আপনি চশমা পরেও তো আমার দিকে তাকায় আছেন। স্কুলে পড়ার সময়েও তো বোরখা ছাড়াই যাতায়াত করতাম, হেডমাস্টার মামার মেয়েও বোরখা পরত না, তাদের কিছু বলতে পারেন না?’
কোনো বেগানা মেয়েমানুষ মুখোমুখি এরকম তর্ক করবে, এটা ছিল মওলানার কাছে কল্পনাতীত ব্যাপার। মুখ ফিরিয়ে সে রহিমুদ্দির কাছে বিস্ময় প্রকাশ করে, ‘বলে কী বাহে মেয়েটা!’
‘আমরাও তো অফিসে আপনার সম্পর্কে মেলা কথা শুনতে পাই। ফ্যামিলি প্ল্যানিয়ের বিরুদ্ধে ওয়াজ করেন, ফতোয়া দেন। এইসব ফতোয়া গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে না ঝেড়ে অফিস-আদালতে গিয়া সরকারকে শোনাইতে পারেন না?’
অপ্রস্তুত রহিমুদ্দি দাঁড়িয়ে মোমেনাকে শাসন করে, ‘হুজুর মানুষের সাথে কেমন ঝগড়া করে বাহে!’
মোমেনা আবার মুখ ফিরিয়ে হনহন করে হাঁটে। পেছন থেকে মওলানার মন্তব্য কানে আসে, ‘ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া অবশ্যই হবে, তোমার বিষয়ে চেয়ারম্যান আর হেডমাস্টারের সঙ্গেও কথা বলব আমি।’
রাস্তার ঘটনা শুনিয়ে মোমেনা মাসুদের কাছে জানতে চায়, ‘কী বোঝাপরা করবে রে মওলানা? তোর বাপ-চাচার কাছে কী নালিশ জানাবে?’
মাসুদ বলে, ‘রাস্তায় ফালতু লোকের সাথে এত কথা বলো কেন? আমি দেখি রহিমুদ্দি দাদার কাছে ভালো করে শুনে আসি।’
‘যা, আমি মামা-মামিকেও বলে রাখি। না হলে শয়তান মওলানা আবার কোথায় কী প্যাঁচ লাগাবে!’
দু দিন পর মোমেনার পক্ষ নিয়ে গফুর মওলানার সঙ্গে লড়াই করার সুযোগ নিজেদের বাড়িতেই পেয়ে যায় মাসুদ। হেডমাস্টার ভাইয়ের সমর্থন পেয়ে ইব্রাহিম চাচা তরুণ বয়সে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও হয়েছে। মাদ্রাসা কমিটিরও চেয়ারম্যান সে, মাদ্রাসার শিক্ষকদের অনেকেই আসে তার কাছে। কিন্তু এবারে স্কুল ছুটির দিনে গফুর মওলানা এসেছে হেডমাস্টার বাবার কাছে। কাচারি ঘরের বারান্দায় হেলানো সাইকেলখানা দেখে অতিথিকে চিনতে পারেনি, কিন্তু ঘরের ভেতরে গফুর মওলানার সঙ্গে বাবাকে খোশগল্প করতে দেখে মাসুদ চমকে ওঠে। কেন এসেছে লোকটা? হেডমাস্টার পিতার কাছে এলাকার শিক্ষিত লোকজন ও শিক্ষার্থী ছাত্ররাই আসে বেশি। আপন ছোটভাই ও তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠদের বাবার রাজনৈতিক শত্রু হিসেবেই জানে মাসুদ। আজ তবে কী নিয়ে এত খোশগল্প?
কৌতূহলী মাসুদ বারান্দায় উঁকি দিতেই ভেতর থেকে বাবা ডাকে, ‘ও মাসুদ, মওলানার জন্য একটু চা-পান নিয়ে আয়।’
মোমেনাকে রাস্তায় অপমান করার পর থেকে মাসুদ মওলানার সঙ্গে তর্ক করার জন্যে তৈরি হয়ে আছে। কিন্তু মোমেনার কাছে সব শুনেও মা বোধহয় বাবাকে বিষয়টা জানায়নি এখনো। চায়ের কথা বলতে গিয়ে মাকেও নিজের পক্ষে টানার জন্যে বলে সে, ‘মোমেনাবুকে সেদিন অকারণে অপমান করল গফুর মওলানা। আজ উচিত শিক্ষা দেবো শয়তানটাকে।’
‘অপমান তো মোমেনাই করেছে। তুই কিছু বলতে যাস না। তোর আব্বা রাগ করবে।’
চায়ের কাপ ও পানের বাটা হাতে ঘরে ঢুকে মাসুদ আজ মওলানাকে সালাম পর্যন্ত দেয় না। উল্টো গফুর মওলানাই স্নেহের হাসিতে উদ্ভাসিত হয়।
‘কী বাবাজি, ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে বাবার স্কুলের সুনাম বাড়াতে পারবে তো? তোমার আব্বা তো টাউনের স্কুল থেকে তোমাকে পরীক্ষা দেওয়ার কথা ভাবছে শুনলাম।’
মাসুদ বিনীত কণ্ঠেই মোমেনার প্রসঙ্গটি তোলে, ‘চাচা, একটা কথা বলি। সেদিন আমাদের মোমেনা বুবুকে নাকি রাস্তায় অপমান করেছেন। ও তো ঠিকই বলেছে, পরিবার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কিছু বলার থাকলে আপনি সরকারকে বলেন, সরকারই তো চাকরি দিয়েছে ওকে। ও বেচারাকে আজেবাজে কথা বলে লজ্জা দেন কেন?’
‘মোমেনার বিষয়টা নিয়েই তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে আসলাম বাবা। কিন্তু তুমি আমাদের রত্ন, তোমাকে নিয়ে আমাদের কত আশাভরসা। মুরব্বিদের সমস্যার ব্যাপারে নাক না গলানোই ভালো। না কি বলেন হেডমাস্টার ভাই?’
বাবা একইসঙ্গে ছেলেকে এবং মওলানাকেও সমর্থন করে কথা বলে, ‘হ্যাঁ। কিন্তু মাসুদ তো অযৌক্তিক কথা বলেনি মওলানা। জনসংখ্যা এদেশের প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা মোকাবেলার জন্যে সরকারকে আমেরিকা জাতিসংঘ সবাই চাপ দিচ্ছে। কিন্তু আপনারা হাদিস-কোরানের ব্যাখ্যা দিয়ে পাবলিককে ভুল বোঝালে তো মুশকিল।’
পিতার সমর্থনে উত্সাহী মাসুদ ঘরের বাইরে এসেও ভেতরের কথাবার্তা শোনার জন্য কান পাতে।
‘আমি যতদূর জানি, আপনাদের দল শেখ মুজিবের মুক্তি ও আইয়ুব খানের পতনের জন্যে আন্দোলন করছে, কিন্তু আপনি দেখছি, সরকারের পক্ষে কথা বলছেন হেডমাস্টার ভাই।’
‘জনগণের মঙ্গলের জন্যে যে কর্মসূচি দরকার সেটা তো সাপোর্ট করতেই হবে। সরকার পাবলিকের স্বার্থে শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাতে যেসব পাইলট প্রজেক্ট নিয়েছে, সেগুলো বাতিল করার জন্যে তো আমরা আন্দোলন করতে পারি না।’
‘কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে ভাই ইসলামের হেফাজতের জন্য। আমরাও তো ভাই ইসলাম, কোরান-হাদিসের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারি না। আমাদের দলও দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা চায়।’
‘আমি ইসলাম আর কোরান-হাদিস নিয়ে তর্ক করতে চাই না মওলানা। তা বলেন, আসলে কী জরুরি ব্যাপারে আলাপ করার জন্য বাড়িতে আসলেন?’
জরুরি কথা আসলে মওলানার পারিবারিক সমস্যা নিয়ে। হেডমাস্টারকে তাকে যা-ই ভাবুক, মওলানা চেয়ারম্যান ইব্রাহিম পাটোয়ারিকে যেমন, তেমন এয়াকুব হেডমাস্টারকেও আপন বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করে। এজন্য পারিবারিক সমস্যায় পড়েও তাদের সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়ার জন্য ছুটে এসেছে।
এরপর রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে মওলানা তার পারিবারিক সমস্যার কথা এমনভাবে বর্ণনা করে, যেন হেডমাস্টার তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মাস্টারের আদর্শ পরিবারের গল্প সবার কাছেই করে মওলানা। কিন্তু নিজে সেরকম আদর্শ পরিবার গড়ে তুলতে পারেনি, কারণ তার প্রথম স্ত্রী মোটেই সংসারী নয়, আর বারো মাসেই অন্তত তেরোটা অসুখে ভোগে। পেটের সন্তানদেরও সে খেদমত করতে অপারগ। বাস্তব অবস্থা ও প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের নবীজিও একাধিক বিবাহ করেছেন। ইসলামেও পুরুষের জন্য চার স্ত্রী রাখা জায়েজ। নিজের পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য গফুর মওলানার আরেক স্ত্রীকে ঘরে আনাটা ফরজ কাজ হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় বিবাহের জন্য মওলানা ধর্মপুরের মোমেনাকেই পছন্দ করেছে অনেক ভাবনাচিন্তা করে। প্রথম স্বামীকে হারিয়ে মেয়েটি ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের চাকরি করায় গ্রামে নানা কথা রটছে। মওলানা তাকে বিয়ে করলে মেয়েটারও একটা গতি হবে, তাকে নিয়ে গাঁয়ে আর কু-কথাও রটবে না। দেনমোহর হিসেবে মোমেনার নামে সে দুই দোন জমি লিখে দেবে। মোমেনার প্রাক্তন স্বামীর বাচ্চাটারও দায়িত্ব নেবে মওলানা। আর বিয়ের পরও সে যদি সরকারি চাকরিটা করতে চায়, করতে পারবে অবশ্যই। শুধু বাইরে চলাফেরার সময় একটু পর্দানশীল হলেই চলবে।
বাইরে দাঁড়িয়ে মওলানার কুমতলব বুঝতে দেরি হয়নি মাসুদের, কিন্তু সব বুঝেও পিতার ধৈর্য তাকে প্রায় ধৈর্যহারা করে ফেলে। উপরন্তু মওলানার প্রস্তাবটা শুনে বাবা তার গালে একটা চড় দিতেও পারে না বলে ক্রোধে মাসুদের বুক ধকধক করে।
ঘরে এয়াকুব মাস্টার বিরক্তির কণ্ঠে বলে শুধু, ‘ছি! আমার কাছে এ প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন কেন? আমি কি বিয়ের ঘটকালি করি, নাকি নিজে দুই বিয়ে করেছি? গ্রামের বিচারসালিশেও থাকি না। ইব্রাহিমকে বলেন।’
‘আমি চেয়ারম্যানকেও বলেছি। সে আপনার মতটা আগে নিতে বলল।’
মাসুদ আর স্থির থাকতে পারে না। বাবা আছে বলেই ঘরে ঢুকে মওলানাকে উচিত শিক্ষা দিতে না পারলেও, তার সাইকেলখানা নিচে ফেলে দেয়। সাইকেল পতনের শব্দে ভেতরের প্রস্তাব কতটা বাধাগ্রস্ত হয়, ফিরেও তাকায় না সে। বাড়ির ভেতরে ছুটে যায়।
মাকে উত্তেজিত কণ্ঠে খবরটা জানানোর পরেও একটুও অবাক হয় না মা। হেসে বলে, ‘জানি। তোর চাচাকে দিয়ে জলিলের কাছে প্রস্তাবও পাঠিয়েছে মওলানা। জলিল বলার আগে মওলানাই তোর বাপকে হাত করতে এসেছে।’
‘লোকটাকে আব্বার অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া উচিত। যাতে এরকম চিন্তা করার সাহস না পায়।’
‘মোমেনার বয়স কম, দেখতে সুন্দর, তার ওপর সরকারি চাকরি করে মাসে মাসে বেতন পায়। এরকম প্রস্তাব তো আসবেই। আবার বিয়েশাদি না করে একা কতদিন থাকবে মেয়েটা?’
‘মোমেনা বু রাজি হবে না এমন প্রস্তাবে।’
‘মওলানা তো তবু শিক্ষিত, অবস্থাও ভালো। জায়গাজমি বেশি থাকলে সব গেরস্তই দুই বিয়ার চিন্তা করে। তোর আব্বাও-বা কোনদিনবা দ্বিতীয় বিয়া করে এ বাড়িতে আনে।’
গফুর মওলানা এবং একইসঙ্গে মা-বাবার উদ্দেশ্যে ছোট্ট একটা ছি দিয়ে মাসুদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
৮.
শহরে বোনের বাসায় ছোট ভাই মুকুলের জলবসন্ত হয়েছে শুনে মাসুদই তত্ক্ষণাত্ সাইকেল নিয়ে শহরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মাসুদের মা যাওয়ার জন্য নিজেই প্রস্তুতি নিতে থাকে। মুকুলের জন্য অনেকগুলো ডাব, মেয়ের বাসার জন্য চাল, মুড়ি, চিড়া, মুরগি, মাছ ইত্যাদি হরেক উপঢৌকনে গরুগাড়ি প্রায় ভরে ফেলে। রোজির বাসায় কাজের জন্য মাছুয়ার মেয়ে অঞ্জনিকেও নেয়। ঘর-গেরস্থালির সব দায়দায়িত্ব মাসুদ ও কয়েকজন লোকের ওপর ভাগ করে দিয়ে সন্ধ্যায় কালুর বলদজোড়ার গরুগাড়িতে উঠে বসে।
সারারাত গরুগাড়ি চালিয়ে ভোরবেলা শহরে পৌঁছার পর মাসুদের মাকে রেখে পরদিন সন্ধ্যার মধ্যেই আবার ফিরে আসে কালু। এসে বাড়ির সবাইকে আশ্বস্ত করে, মোটে দুই-তিনটা জলবসন্তের ফুসকুড়ি বেরিয়েছে, হেসেখেলে বেড়াচ্ছে মুকুল। রোজিও ভালোই আছে, কালুকে ঘরে বসিয়ে গোশত-ভাত খাইয়েছে, বলদজোড়াকেও ভাতের ফেন খেতে দিয়েছিল।
মাসুদের মা ঢেঁকিঘর ও রান্নাঘরের দায়িত্ব অঞ্জনির মা ও কুঞ্চির মাকে দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কুঞ্চির মায়ের রান্না খেতে না পারায় বাবা স্কুলে যাওয়ার আগে মাসুদকে বলে, ‘কী রেঁধে রেখেছে এসব! মোমেনাকে খবর দিও, তোমার মা না আসা পর্যন্ত কয়দিন রান্নাবাড়ি করে দিয়ে যেতে পারবে।’
মাসুদ অভিভূত বোধ করে। মা শহরে যাওয়ায় মোমেনার সঙ্গে মেশার রাস্তাটা তো এমনিতেই অনেক প্রশস্ত হয়েছে। তারওপর বাবা এরকম বলায় মনে হয়, মোমেনার প্রতি মাসুদের ভালো লাগা এবং দুজনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটা হয়তো বাবারও অজানা নয়। আর এই সম্পর্কটা বাবার কাছে দোষেরও কিছু নয়। তাছাড়া গফুর মওলানা বিয়ের প্রস্তাব দিলেও বাবা নিশ্চয়ই মোমেনার স্বাধীনভাবে চাকরি করার পক্ষে। প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে চাওয়ায় মোমেনাকে আরো উত্সাহ দিয়ে বলেছে, ‘প্রাইভেটে দিতে হবে না, ভালো করে পড়ো, রেগুলার ছাত্রী হিসেবে তোমাকে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করব আমি।’
গফুর মওলানার বিয়ের প্রস্তাবের পর এ বাড়িতে আসেনি আর। মাসুদ বাবার কথামতো মোমেনাদের বাড়িতে খবর দিয়ে আসার পর, চাকরির ডিউটি শেষে মাস্টারবাড়ির রান্নার কাজ করতে ছুটে আসে সে।
মাসুদ ভালো ছাত্রের মতো বই নিয়ে ঘরেই থাকে দিনমান। মোমেনা রান্নাঘরের কাজ শেষ হলে, পড়ার জন্য আজ তার ঘরে আসবে অবশ্যই।
অবশেষে একসময় আসে মোমেনা। ভেতরে এসে ঘরের দরজাটা চাপিয়েও দেয়।
‘আমার আর পড়া হবে না রে মাসুদ! ’
‘কেন, তুমি পরীক্ষা দেবে শুনে আব্বা তো খুশি হয়েছে। আমিও তোমাকে সাহায্য করার জন্য বসে আছি।’
মোমেনা আজ বাড়ি ফাঁকা পেয়েই হয়তো মাসুদের আরো ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার জন্য তার কান টেনে দিয়ে বলে, ‘ইহ্, কী আমার মাস্টার রে! একদিনও তো পড়াতে গেলি না।’
মোমেনা আজ মাসুদের বিছানায় তার পাশেই বসে।
‘তোমার আবার বিয়ের কথা হচ্ছে শুনে যাইনি।’
‘হ্যাঁ, গফুর মওলানা ছাড়াও আর দুজন প্রস্তাব দিয়েছে ভাইয়ের কাছে। পুরুষগুলার মরারও ভয় নাই। মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ে করে সবগুলিকে মারি।’
‘তোমাকে পেলে কেউ মরবে না, আরো বেশিদিন বাঁচবে।’
‘তুইও এ কথা বলছিস। আসলে আমি ছাড়াও আমার সরকারি বেতনটা পাওয়ারও লোভ মানুষের।
‘আমি তো গফুর মওলানার সঙ্গে তোমার হয়ে ঝগড়াও করেছি।’
‘শুনেছি। সেইজন্য কয়েকদিন এ বাড়িতেও আসিনি।’
মোমেনা না এলেও মাসুদ প্রতিদিনই, বোয়ালমারি দোলার দিকে তাকিয়ে মোমেনাকে দেখার অপেক্ষায় থাকে, মোমেনার কথা ভেবে অনেকসময় লেখাপড়াতেও মন দিতে পারে না।
‘ভাই-ভাবীও কতদিন আর বাচ্চাসহ বিধবা বোনের দায়িত্ব পালন করবে বল? তুইও তো একদিন শহরে চলে যাবি। তখন তোর সাথে আমাকেও নিবি মাসুদ? আমি না হয় বাচ্চাটাসহ রোজির বাসায় থেকে তোদের রান্নাবাড়ির কাজ করব, টাউনের অফিসে যদি বদলি হতে পারি চাকরিটাও থাকবে। আমার এই গ্রাম আর একদম ভালো লাগে না রে মাসুদ।’
‘রোজি আপার বাসায় মুকুল থাকবে, আমি টাউনের কলেজে ভর্তি হলে আব্বা টাউনে আমার জন্য হয়তো আলাদা বাসা ভাড়া নেবে। তখন আমার বাসাতেও থাকতে পারবে তুমি।’
‘আহা, শখ কত! বিয়ে না করে তোর সঙ্গে থাকতে গেলে লোকে বদনাম রটাবে।’
‘টাউনে আমরা কী করি না করি, গ্রামের লোক কি আমাদের দেখতে যাবে?’
‘না দেখুক গাঁয়ের লোক, তোর কি আল্লাহ-খোদারও ভয় নাই মাসুদ?’
ভয়ের চেয়ে মাসুদের ভালো লাগাটা যে অনেক বেশি জোরালো, সেটা বোঝানোর মতো উপযুক্ত ভাষা খুঁজে পায় না। মোমেনার দিকে তাকিয়ে থাকে। মোমেনাই চোখ নামিয়ে নেয়।
‘তুই আরো বড় হয়ে গেলে তখন কি আর তোর কাছে ঘেঁষতে পারব? ছোট আছিস বলে খালি বাড়িতে এরকম গল্প করতে পারছি।’
‘খালি ছোট ছোট করো, আমার সাথে গায়ের জোরে পারবে তুমি?’
মোমেনা আবার মাসুদের কান টেনে ধরে শাসন করে, ‘আহা রে, কী আমার বীর পালোয়ান!’
মাসুদ তার কান টানার প্রতিশোধ নিতে প্রথমে মোমেনার হাত ধরে চাপে, মোমেনা সহাস্য উহ্ আহ্ ধ্বনিতে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে, মাসুদের টানের কাছে পরাস্ত হয়ে মাসুদের বুকেই আশ্রয় নেয় মুহূর্তের জন্য। মাসুদ দু হাতে জড়িয়ে ধরতে গেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে, ‘মামা বললে রাতে তোদের বাড়িতেই থাকব আজ, মাকেও বলে এসেছি।’
বাইরে উঠানে তখন কারো উপস্থিতি, মোমেনাকে খুঁজছিল কেউ। মাসুদের মা বাড়িতে না থাকলেও হেডমাস্টারের চক ফাঁকা থাকে না কখনো। স্থায়ী কাজের লোক ধোঁধার বউ, কুঞ্চির মা ও কালু শেখরা তো আছেই, সেইসঙ্গে পাটোয়ারি বাড়ির অন্য শরিকের লোকজনও আসে যখন তখন। মোমেনা উটকো লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা ও রাতের রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থকে।
মনের মানুষকে নাগালের মধ্যে পাওয়ার আনন্দ-উত্তেজনায় মাসুদ এতটা বিহ্বল বোধ করে যে, মোমেনার সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে সারা বিকেল বাড়ির বাইরেই থাকে। ভাবতে থাকে মোমেনার কথাই। বান্ধবী রোজি নেই তবু রাতে মোমেনা কেন এ বাড়িতে থাকতে চায়, থাকলে কোন ঘরে থাকবে এবং রাতে কী ঘটতে পারে, এসব আগাম ভাবনা-কল্পনায় আচ্ছন্ন থাকে মাসুদ।
রাতের খাওয়া শেষে মোমেনা মাসুদের ঘরে তার পড়ার সাথী হয়ে অপেক্ষা করে। হেডমাস্টার বাড়িতে ফিরেই বলেছে, মোমেনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে তার। সময়মতো মোমেনাকে ডাকবে সে। জরুরি কথা গফুর মওলানার প্রস্তাব, মোমেনার চাকরি কি পরীক্ষা দেওয়া নিয়ে? নাকি মাসুদের সঙ্গে মোমেনার মেলামেশা নিয়েও আজ কথা বলবে আব্বা? মাসুদ বা মোমেনা কেউই সঠিক জানে না। তবে কথা যা-ই হোক, বিষয়টা যে জরুরি, আন্দাজ করে দুজনেই। শোনার অপেক্ষায় পড়ার টেবিলে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করে।
অবশেষে কুঞ্চির মা এসে জানায়, মোমেনাকে ঘরে ডাকছে হেডমাস্টার।
মোমেনা উঠে যায়। কৌতূহল মেটাতে মোমেনার সঙ্গী হওয়া কিংবা আব্বার ঘরে গিয়ে কান পাতার কথা ভাবতে পারে না সে। মোমেনা ফিরে এসে তাকে বিস্তারিত জানাবে, শোনার অপেক্ষায় বইয়ের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। আব্বার ঘরে মোমেনা কতক্ষণ ছিল, মাসুদ ঘড়ি ধরে সময় মাপেনি, তবে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘতর এবং রাত নিঝুম হয়ে উঠতে থাকলে, ধৈর্যহারা হয়ে সে পড়ার টেবিল থেকে দু-একবার গলাখাকারিও দিয়েছে।
একসময় তাড়া খাওয়া মানুষের মতো মোমেনা মাসুদের ঘরে ঢুকে নিজেই দরজা ভেজিয়ে দেয়। ভয়ে-উত্তেজনায় অস্বাভাবিক চেহারা। কী বলল আব্বা? মাসুদের প্রশ্নের জবাবে সে ঠোঁটে আঙুল তুলে মাসুদকেও চুপ থাকতে বলে। অস্বাভাবিক-উত্তেজিত চেহারা মোমেনার। মাসুদের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ ছলছল করে। কী হয়েছে প্রশ্ন নিয়ে ঘনিষ্ঠ হয় মাসুদ।
বাইরে আব্বার গলাখাকারি এবং মাসুদের ঘরের বাইরে তার কণ্ঠ, ‘ও মাসুদ, মোমেনা কি চলে গেছে?’
মোমেনা কানে কানে শিখিয়ে দেয়, ‘বল যে বাড়ি গেছে।’ তার চলে যাওয়াটা সত্যি করতেই যেন ঝটিতি মাসুদের খাটের তলায় গিয়ে লুকায়।
‘ও তো বাড়ি চলে গেছে মনে হয়।’
‘ঠিক আছে, তুমি লেখাপড়া করো।’
আব্বা চলে যাওয়ার পর মাসুদ আতঙ্কমুক্ত হওয়ার জন্য ঘরের দরজা লাগিয়ে দিয়েছে, হারিকেনের আলোও কমিয়ে দিয়েছে। এরপর মাসুদের জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় যে রাতটি গভীর হয়ে ওঠে, অবিস্মরণীয় সেই রাতের কথা দেশে এবং বিদেশে বসেও অসংখ্যবার ভেবেছে সে। আমেরিকায় গিয়ে নানা বর্ণের নারীর সঙ্গে প্রেম ও প্রাপ্তির স্বাদকে তুচ্ছ করে জীবনের প্রথম প্রেমের স্বাদ স্মরণ করতে গিয়ে কান্না-উথলানোর মোমেনার শরীরের গন্ধ, চুম্বনের লোনা স্বাদ, এমনকি তার অবাঞ্ছিত চুলটিকেও স্মরণ করেছে। আত্মজীবনীতে প্রফেসর মাসুদ অবিস্মরণীয় রাতের ঘটনার নির্মোহ ও খুঁটিনাটি বয়ান দেবে নিশ্চয়ই। কিন্তু পরদিন পিতার মুখোমুখি হয়ে তার ভূমিকা কি নায়কোচিত ছিল?
মোমেনার রাতেই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মিথ্যে খবরটি দেওয়ার পর আব্বা রাতেই তাদের বাড়ি গিয়েছিল কি না, মাসুদ ঠিক জানে না। জলিল বা আর কেউই রাতে মোমেনাকে খুঁজতে আসেনি। বদ্ধ ঘরের বিছানায় মোমেনাকে পাওয়া না পাওয়ার নিঃশব্দ লড়াই শান্তিতে ঘুমাতেও দেয়নি দুজনকে। বাড়িতে ভোররাতে মোরগের ডাক শুনেই মোমেনা বিছানা থেকে নেমে বলেছিল, ‘আমি এখন যাই।’
চুপিচুপি মোমেনাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য ঘরের দরজা খুলতেই উঠানে দাঁড়ানো হেডমাস্টারকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছে দুজনেই। আব্বা কি তাদের দুজনকে হাতেনাতে ধরার জন্য মাসুদের ঘরের সামনে সারারাত দাঁড়িয়েই ছিল? ভোরের নামাজের প্রস্তুতি নিতে পানির বদনা হাতে ঠিক ওই সময়ে বাথরুমে যাচ্ছিল হেডমাস্টার। তার চোখে ধরা পড়ে মোমেনাই প্রথম ছুটে পালাতে শুরু করেছিল, কিন্তু মাসুদ তার পিছু ছুটে যায়নি, দরজা চাপিয়ে দিয়ে ঘরে একা হয়েছিল।
মাসুদের জীবনে আজ পর্যন্ত চমকপ্রদ ও অবাঞ্ছিত যত ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে কৈশোরে পিতার সঙ্গে এই মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাটাই এক নম্বরে। এ ঘটনার পরিণাম ও নিজের করণীয় নির্ধারণ করতে গিয়ে বিছানায় মড়ার মতো পড়ে ছিল অনেকক্ষণ। প্রতিদিনের মতো ধর্মপুরে ভোর ও সূর্যোদয় দেখে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেছে। সকালে বাইরে যাওয়ার আগে আব্বা মাসুদকে ঘরে ডেকেছিল।
‘রাতে মোমেনা তোমার ঘরে ছিল, আমাকে মিথ্যে বলেছিলে কেন?’
মাসুদ বুক ফুলিয়ে মোমেনাকে ভালোবাসার কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তার বদলে মিনমিনে কণ্ঠে জানায়, ‘মোমেনাবুই মিথ্যে বলতে বলেছিল।’
‘আমার বাবা, তোমার দাদা বেঁচে থাকলে এরকম ঘটনার কী বিচার করতো জানো? ছোটবেলায় নিশ্চয় দেখেছো, গাঁয়ের ছেলেরা পশুপ্রবৃত্তির কাছে পরাস্ত হলে বাবা খড়মের দোররা মেরে কীরকম শাস্তি দিয়েছে। আমি সেরকম শাস্তি দেবো না। সামনে তোমার ফাইনাল পরীক্ষা। গ্রামে থেকে লেখাপড়া করলে তোমার রেজাল্ট ভালো হবে না। তুমি বইপত্র জামাকাপড় গুছিয়ে আজকেই রোজির বাসায় চলে যাও। আমি কাল নিজে গিয়ে টাউনের হাইস্কুল থেকে তোমার ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে আসব।’
বাবা চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়ার পর বাড়িতে তার অবস্থান আধাবেলাও দীর্ঘ করার সাহস হয়নি। কাউকে কিছু না বলে ধর্মপুর থেকে চুপচাপ চলে গিয়েছিল সে।
ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর, কলেজে এবং ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে মাসুদ বাড়িতে ফিরে এসেছে, কিন্তু মোমেনার সঙ্গে আর কখনোই দেখা হয়নি তার। মাসুদ ধর্মপুর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে গফুর মওলানার সঙ্গেই বিয়ে হয়েছিল তার। ১৯৭১ সালে গফুর মওলানা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভূমিকায় এবং রাজাকারদের সমর্থক ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজাকার গফুরকে শাস্তি দিয়ে মোমেনাকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারত মাসুদ। মুক্তিযুদ্ধের পর তো বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা বেশেই ইন্ডিয়া থেকে ফিরেছিল সে। কিন্তু গফুর মওলানা-বিরোধী কোনো অপারেশন চালাবার কথা কল্পনাও করেনি। শহরে নিজের লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থেকে দেশ থেকে পাকাপাকিভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রস্তুতিতেই ব্যস্ত থেকেছে। আশ্চর্য যে, আমেরিকায় যাওয়ার পর সাক্ষাতে কিংবা ফোনে মুকুলের সঙ্গে যোগাযোগের সময় মোমেনার কথা একবারও জিজ্ঞেস করেনি সে।
৯.
বাংলোর দোতলায় লেপটপের সামনে লিখতে বসে মাসুদ আজ মোমেনার কথা ভেবে অস্থির বোধ করে। সেই রাত মোমেনার জীবনে কী প্রভাব ও পরিণতি বয়ে এনেছিল, তা মোমেনার কাছে আর কখনোই জানা যাবে না। কিন্তু আশ্চর্য যে, মোমেনার নাতনি বহ্নিও তাকে স্বাগত জানাতে এ বাড়িতেই অপেক্ষা করছিল। বহ্নি তার মা কিংবা নানীর কাছে মাসুদ সম্পর্কে কী শুনেছে, সেই গল্পও শোনা হয়নি। একদিন তাকে নিয়ে প্যারালাইসে শয্যাশায়ী মুমূর্ষু বৃদ্ধ জলিল ভাইকে দেখতে গেলেও মোমেনার প্রসঙ্গ ওঠেনি একবারও। বহ্নির সঙ্গে মন খুলে কথাবার্তা বলারও সময় পায়নি মাসুদ।
বহ্নিকে ডাকতে মাসুদ নিচে নামে আজ। নিচে প্রশস্ত বসার ঘরের পাশের বেডরুমটাতে মেয়েটির থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। বাংলোয় একা যুবতী মেয়ের অবস্থান নিয়ে লোকজন যাতে বাজে কথা রটাতে না পারে, সেই সতর্কতা থেকেই হয়তো বা বৃদ্ধা জোবেদা ফুফুরও বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করেছে মাসুদ। রাতে ফুফুর সঙ্গেই থাকে মোমেনা, তার সেবাযত্ন করে। মাসুদ নিচে নেমে ফুফুকেই খোঁজে প্রথম, ফুফুআম্মা ঘুমিয়েছো?
ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বহ্নি, ‘আম্মা তো মনে হয় ঘুমিয়েছে। কিছু লাগবে স্যার, কফি বানিয়ে দেবো?’
‘এখন কফি খাব না। ফ্রিজে যে বোতলগুলো রাখতে বলেছিলাম, একটা বোতল নিয়ে তুমি উপরে আসো একটু, কথা বলি।’
ওয়াইনের বোতল হাতে বহ্নি ভয়ে ভয়ে মাসুদের ঘরে যায়। তাকে সহজ করার জন্য বলে মাসুদ, ‘আমি ওষুধের মতো নিয়মিত একটু একটু খাই। তুমি কি পড়াশোনা করছিলে?
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘তোমার সঙ্গে তো তেমন কথাবার্তা হয়নি, ওই চেয়ারটায় বসো, একটু গল্প করি।’
বহ্নি চেয়ারটায় বসে, কিন্তু এখনো সহজ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না যেন।
‘তুমি আমাকে প্রথম থেকে স্যার স্যার বলছো। ধর্মপুরে সবাই তো একটা না একটা সম্পর্কের সুতায় বাঁধা। তুমি মোমেনাবু ও জলিল ভাইয়ের নাতনি, সে হিসেবে তো আমারও নাতনি।’
‘নানীর সঙ্গে আপনাদের দূরসম্পর্কের কীরকম আত্মীয়তা ছিল শুনেছি। আর দাদা তো আপনাদের হালুয়া-আধিয়ার হিসেবে জীবন কাটিয়েছে। এ কথা গ্রামের সবাই জানে। ওসব পুরনো সম্পর্কের কি কোনো দাম আছে স্যার?’
‘এ কথা বলছো কেন?’
মোমেনা কি মরার আগে মাসুদের কথা বিশেষভাবে কিছু বলে গেছে নাতনিকে। মৃতা নানীর হয়ে প্রতিশোধ নিতে চায় সে।
‘তোমার মাকে এই এতটুকুন দেখেছি আমি। আর তোমার চেহারা যে অনেকটা মোমেনাবুর মতো, এ কথা কেউ বলেছে তোমাকে?’
‘নানী তো আমার চেয়েও সুন্দর ছিল।’
‘তোমার নানী কতদিন আগে কিভাবে মারা যায়?’
‘চার-পাঁচ বছর হলো, পেটে আলসার কি ক্যানসার হয়েছিল।’
‘গফুর মওলানার সঙ্গে যে তার আবার বিয়ে হয়, মরার আগে পর্যন্ত সেই সংসারেই ছিল? গফুর মওলানাও তো মারা গেছে শুনলাম।’
‘হ্যাঁ, ওই সংসারেও নানীর তিন ছেলেমেয়ে, তারা সবাই বেঁচে আছে এখনো।’
‘তোমার সঙ্গে তাহলে বিশেষ যোগাযোগ ছিল না বোধহয়।’
‘ভাইয়ের বাড়িতে এলে আমাদের বাড়িতেও আসত। আপনাদের সবারই খোঁজখবর নিত।’
‘আমার খোঁজ নিত কিভাবে? এ বাড়ির লোকজন তো আমার খোঁজখবর তেমন জানত না।’
‘ইঞ্জিনিয়ার স্যারের কাছে আপনার খবর জানত সবাই। ধর্মপুরের মানুষ আপনাদের দুই ভাইকে নিয়ে কত গর্ব করে! আপনাকে না চিনেও আপনার সম্পর্কে কত গল্প করে।’
মাসুদ ওয়াইনের গেলাসে চুমুক দিয়ে গল্প জমানোর আগ্রহ নিয়ে বলে, ‘কী বলে, কী শুনেছো আমার সম্পর্কে শুনি।’
বহ্নির অস্বস্তি-ভয় তবু কাটে না। মাসুদের মদ্যপান দেখেই কি?
‘দেখো, জন্মভূমি ধর্মপুর, আত্মীয়-স্বজন—সবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দীর্ঘকাল আমি একা পড়ে ছিলাম বহ্নি। হারানো ভালোবাসা আর দেশের টানে ফিরে এলাম এত বছর পর। ভালোবাসার সম্পর্ক ছাড়া একা একা বাঁচা বড় কষ্ট বহ্নি।’
বহ্নি বাংলোর নির্জন রাতে রহস্যময় মানুষটার ভালোবাসার কষ্ট কিংবা একা হওয়ার গল্প শোনায় আগ্রহ বোধ করে কতটা কে জান, হঠাত্ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘স্যার, আম্মা বোধহয় এখনো জেগে আছে। আপনি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন আজ, পরে আপনার সঙ্গে গল্প করব।’
প্রফেসর মাসুদের সম্মতির অপেক্ষায় না থেকে তাকে একলা রেখেই বহ্নি নিচে নেমে যায় নিঃশব্দে।v