এখানে কেউ কারো খোঁজ রাখেন না

ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক সময়ের ব্যাপক আলোচিত নায়িকার নাম নাসিমা খান। সেই স্কুলে পড়ার সময়ই যিনি নায়িকার খাতায় নিজের নাম লিখিয়ে দর্শকের মন জয় করেছিলেন তিনি নাসিমা খান। সংসার জীবনের কারণে একেবারে মধ্য বয়সে নাসিমা খান চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেও এখন অভিনয়ে খুব বেশি নিয়মিত না হলেও টুকটাক অভিনয় করছেন তিনি। ঢাকা, সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তানের এক সময়ের আলোচিত নায়িকা নাসিমা খান। তার দাদার বাড়ি বিক্রমপুর। তার দাদা একসময় ঢাকার লালবাগে এসে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। এখানেই তার জন্ম। তার অভিনীত প্রথম ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’। এরপর আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নেন। নাসিমা খান অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে ‘যে নদী মরুপথে’, ‘সূর্যস্নান’, ‘কার বৌ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’, ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’ ইত্যাদি। স্মৃতি সুখের হোক কিংবা দুঃখের, তা সতত মধুর। কোনো কোনো স্মৃতি থাকে, যা সব সময়ই উজ্জ্বল। যেন স্মৃতি বলে ঘটে বিভ্রম। বাংলা ছবির প্রারম্ভিক লগ্নের দিনগুলো ছিল ঠিক যেন তাই। নায়িকা নাসিমা খানের জবানিতে খুঁজে পাওয়া যাবে যার সরল উপস্থিতি। নাসিমা খান দীর্ঘদিন পর প্রেস মিডিয়ার সাথে নিজের জীবন নিয়ে কথা বলেছেন। সেই কথা জানাচ্ছেন নূপুর বন্দ্যোপাধ্যায় সবমিলিয়ে এখন কেমন আছেন আপনি? সত্যি বলতে কী সবমিলিয়ে আল্লাহর রহমতে এখন বেশ ভালো আছি। এই বয়সে এসে যতটুকু ভালো থাকা যায় তারই চেষ্টা করি। বেঁচে আছি এই তো শুকরিয়া। পরপারে চলে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতই বলা চলে। তারপরও প্রতিদিনই নতুন নতুন স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি আমার প্রিয় চলচ্চিত্রাঙ্গন নিয়ে, হয়তো সেই সোনালি দিন আবারও ফিরে আসবে। ফিরে আসবে সেই হলমুখরিত দিনগুলো। নতুন আশায় বুক বাঁধি। তবুও আশা রাখি। কারণ আমি এই বাংলাকে, বাংলা চলচ্চিত্রকে ভালোবাসি। এখন কোন চলচ্চিত্রে কাজ করছেন? না, এই মুহূর্তে আমার হাতে কোনো ছবি নেই। কিছুদিন পূর্বে আমার অভিনীত একটি নাটকই টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে। ‘লেডিস ফার্স্ট’। এটি পরিচালনা করেছেন এস এ হক অলিক। বাংলাভিশনে প্রচার হয়েছে। তাছাড়া রাশেদ বিপ্লবের নতুন ধারাবাহিক নাটক ‘প্রেমের ১৪৪ ধারা’-তে অভিনয় করেছি। এটি সম্পূর্ণ ঢাকাইয়া ভাষার একটি নাটক। সত্যি বলতে কী বয়স হয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো কাজ করার উত্সাহ যেমন পাই না ঠিক তেমনি পাই না শক্তিও। সবমিলিয়ে কোনোরকমে কাজ করে যাচ্ছি। সেদিন তো আপনারা খুব আনন্দ করলেন? হ্যাঁ, এই তো কিছুদিন আগে আমাদের সবার প্রিয় এটিএম ভাইয়ের জন্মদিন ছিল। ওইদিনই আবার আমার সাথে এটিএম ভাইয়ের শুটিং ছিল। আমি জানতাম না যে সেদিন তার জন্মদিন। হঠাত্ দেখি পরিচালক কাকে কাকে যেন ফুল আর কেক আনতে বললেন। আমি তখনও বুঝিনি। দুপুর যখন দুইটা বাজলো, তখন লাঞ্চ ব্রেক দেওয়া হলো। টেবিলের উপর কেক রেখে সবাইকে ডাকা হলো। আমি বললাম কী ব্যাপার। জবাবে পরিচালক এস এ হক অলিক বলেন, ‘ম্যাডাম আজ তো এটিএম ভাইয়ের জন্মদিন, তাই আমরা আজ একটু আনন্দ করব।’ শুনে তো আমি অবাক। এরপর আমরা সবাই এটিএম ভাইকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালাম। কেক খাইয়ে দিলাম। খুব খুশি হলেন তিনি। এটিএম ভাই বললেন, ‘বারবার আমাকে নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয় যে আমি মারা গেছি, যারা এমন করেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি—এই দেখেন আজ আমার নতুন জন্ম হয়েছে।’ সত্যিই সেদিন এটিএম ভাইয়ের জন্মদিনে খুব আনন্দ হয়েছে। চলচ্চিত্রে তো এমন আনন্দ এখন উঠেই গেছে? সত্যিই তাই, চলচ্চিত্রে এখন আর আগের মতো সবার মাঝে শ্রদ্ধাবোধ নেই, ভালোবাসা নেই। কেউ কারো সাথে প্রয়োজন ছাড়া একদমই যোগাযোগ করেন না। এই যেমন আমি প্রয়োজনেই সবার সাথে যোগাযোগ করি। আর অন্য কার সাথে করব আমি। নতুন যারা একর পর এক আসছেন তাদের কাউকে তো আমি চিনি না, জানি না। শুধুমাত্র নায়িকা শবনমের সাথেই আমার নিয়মিত যোগাযোগ হয়। এছাড়া আর কারো সাথেই নয়। তবে হ্যাঁ মাঝে মাঝে দু’একজন জার্নালিস্টের সাথে আমার যোগাযোগ হয়। তারা খুব বন্ধুবত্সল। চলচ্চিত্রে আপনার সম্পৃক্ততা কিভাবে? ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম একটু শান্ত স্বভাবের। যে কারণে আমার বন্ধুর সংখ্যা ছিল খুবই কম। কামরুন্নেসা স্কুলে পড়াকালীন অর্থাত্ ১৯৫৭ সালে পড়শী খান আতাউর রহমানের অনুপ্রেরণায় আমাকে অভিনয়ে যুক্ত করেন আমার বাবা। প্রথম অভিনীত ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’। পূর্ব বাংলার জেলেদের যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা জীবন নিয়ে নির্মিত এ ছবিতে আরও অভিনয় করেছিলেন নায়ক আনিস ওরফে খান আতাউর রহমান, তৃপ্তি মিত্র, জুরাইন, কাজী খালেক, ময়না, রেদোয়ান, মীনা লতিফ প্রমুখ। জয় কারদারের পরিচালনায় সে সময় ছবিটি মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে স্বর্ণপদক লাভ করে। ১৯৫৯ সালের ২৫ মে মুক্তি পাওয়া এ ছবিতে সহনায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছিলাম আমি। এ ছবিতে অভিনয় দেখে বেবী ইসলাম তার উর্দু ছবি ‘তানহা’তে অভিনয়ের জন্য নেন। ‘তানহা’ ছবিতে আমার সঙ্গে আরও অভিনয় করেন শবনম, সুমিতা দেবী, লাহোরের নায়িকা শামীম আরা প্রমুখ। নায়িকা হিসেবে আপনার প্রথম ছবি? নায়িকা চরিত্রে আমার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র যে নদী মরুপথে। ১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া চারটি ছবির মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। এ ছবিতে আমার নায়ক ছিলেন আনিস। সালাউদ্দিনের পরিচালনায় এ ছবিতে সংগীত পরিচালনাও করেন আনিস ওরফে খান আতাউর রহমান। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় নৈপুণ্য দেখাতে চেষ্টা করি আমি। একজন প্রতিষ্ঠিত নায়িকা হিসেবে আমার নাম দেশের বাইরে সিন্ধু, পাঞ্জাব বা বেলুচিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। পরিচালক মোহসীনের সহযোগিতা ও উত্সাহে উর্দু ছবিতেও নিয়মিত অভিনয় শুরু করি আমি। ‘সূর্যস্নান’-এ অভিনয়ের পর আপনাকে আবেদনময়ী নায়িকা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। ‘সূর্যস্নান’, ‘ধারাপাত’সহ বেশ কিছু ছবিতে তার অভিনয় দেখে সে সময় আমাকে আবেদনময়ী নায়িকার আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে পরবর্তী সময় আমার অভিনীত লাহোরের বেশ কয়েকটি ছবির মধ্যে ‘আসবন গ্যায়ে মত’ ছবিটি অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল। পুরোনো দিনের এসব ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে অসংখ্য স্মৃতি জমা রয়েছে আমার মনের গভীরে। পুরোনো দিনের প্রতিটি স্মৃতিই এখন এক-একটি মুক্ত দানার মতো জ্বল জ্বল করে। এর মধ্যে কার বৌ ছবিতে আমার ছিল একাধিক স্বামী। সুভাষ দত্ত, গোলাম মোস্তফা, হারুনসহ প্রায় হাফ ডজন নায়ক ছিল। অবশ্য আসল স্বামী ছিলেন হারুন। ছবিটা যেমন হাস্যকর ছিল তেমনি শুটিংয়ের সময়ও খুব মজা করেছি আমরা। সর্বশেষ কোন ছবিতে অভিনয় করেছেন? জাহিদ হোসেন পরিচালিত ‘জীবন যন্ত্রণা’ ছবিতে অভিনয় করেছি। ছবিটি এখনও মুক্তি পায়নি। এ ছবিটিতে অভিনয় করে আমি অনেক আনন্দ পেয়েছিলাম। এখানে আমি বাড়িওয়ালি চরিত্রে অভিনয় করেছি। এর গল্পও অনেক ভালো ছিল। কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে ছবিটি মুক্তি পায়নি। এটা সত্যি খুব দুঃখজনক। আপনি তো নায়িকা ছিলেন, কোন ছবিতে মায়ের চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন? আমার বিয়ে হয় ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে। এরপর বলা চলে অভিনয় থেকে অনেক দূরে সরে যাই। ১৯৯০ সালে ১৫ বছর পর মমতাজ আলী পরিচালিত ‘নতিজা’ ছবিতে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে আমি আবারও চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করি। একই সময়ে ‘আম্মা’, ‘সাক্ষাত্’সহ আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছি আমি। আর এখন কিভাবে কাটছে সময় আপনার? মন মেজাজ ভালো থাকে না। বয়স হয়েছে। হয়তো মনে মনে মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষা করছি। কোনো একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, হয়তো কেউ জানবে, কেউ জানবে না। কারণ আমাদের এখানে কেউ কারো খোঁজ রাখে না। খোঁজ রাখার রীতিটাই চালু হয়নি।