যেখানে পশু-পাখি মানুষের ভাষায় কথা বলে, সাগরে দুধের নহর বয়, রুপার গাছে সোনার ফল ফলে, রাঙা নদীর জলে দাবড়ে বেড়ায় হীরার দাঁড় রুপার বৈঠার সোনার নৌকা, মরা মানুষ জাদুবলে জিন্দা হয়ে ওঠে—সেই অপরূপ রূপকথার নারীরা কেমন? দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মহাশয়ের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র পাঁচটি রূপকথা নিয়ে কচাল শুরু করা যাক। এগুলোতে নারী সম্পর্কে কিছুটা বৈচিত্র্যের আভাস থাকলেও বিরক্তিকর মিল রয়েছে। দুটি রানিদের গল্প আর তিনটি রাজকুমারীদের। শুরুতে বিখ্যাত সুচ রাজার গল্প। রাজা তো সুচে জর্জরিত, অথর্ব। রানি কাঞ্চনমালার ভালোমানুষীর সুযোগ নিয়ে সতীন দুষ্ট রানি কাঁকনমালার উত্থান। তার পতন ঘটতেও দেরি হয় না। আসল রানি নির্ণয়ে রাঁধা-বাড়া ও আলপনার পরীক্ষার যে ফাঁদ পাতা থাকে, তাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে উঁচু জাতের ভালো মেয়ে কে আর নিচু জাতের বদ মেয়ের স্বরূপ কেমন। দ্বিতীয় গল্প লালকমল আর নীলকমলের মন্দ রানি মানুষের পর্যায়েই পড়ে না—সে রাক্ষসী, নিজের ছেলেকেও চিবিয়ে-চাবিয়ে ঢেলা বানিয়ে উগড়ে দেয়। বড় বড় অপরাধ করেও রাজাদের রাজাগিরি আর রাজত্ব বহাল থাকে, অন্যদিকে মন্দ রানিদের বাঁচারও হক নেই। অপরাধ প্রমাণ হওয়া মাত্র হেঁটে কাঁটা উপরে কাঁটা দিয়ে জ্যান্ত পুঁতে ফেলা হয় মাটির গর্তে। ভালো রানি সর্বদাই শান্তশিষ্ট, নির্লোভ। তাই স্বামী-সোহাগিনীও বটে। ভুল বোঝাবুঝির জন্য মাঝখানে দুঃখ-কষ্টের কূলকিনারা না থাকলেও শেষজীবনে নিরবচ্ছিন্ন সুখভোগই তার ভালো কর্মের ফল, মন্দ না-হওয়ার উপহার। পুরুষ নিয়ন্ত্রিত পরিবারের বা রাজ্যের শৃঙ্খলা ও স্থিতির ধারাটি তার সর্বংসহা মূর্তিকে আশ্রয় করেই প্রবহমান।
রাজকন্যারা যদিও কালে কালে এসব রানিদেরই স্থলাভিষিক্ত হন, মধ্যিখানে স্বল্পসময়ের ছোট্ট একটি বিরতি—
‘রাজকন্যা এখন তুমি কার?’
‘আগে ছিলাম বাপের-মায়ের, তার পরে ছিলাম আমার, এখন তোমার।’
এ ‘আমার ছিলাম’ সময়ে যা কিছু জারিজুরি। রুপার বৈঠা আর হীরার হালের শুকপক্ষী নৌকা নিয়ে কলাবতী রাজকন্যা যোগ্য বরের তালাশে বেরিয়ে পড়ে দেশ-দেশান্তরে। এক দেশের রানিরা পড়িমরি করে ছোটে নদীর ঘাটে। ইচ্ছা মোতির ফুল দিয়ে হলেও রাজকন্যাকে ছেলের বউ করে ঘরে আনবে। মেয়ের দেমাগ বড়। অত সহজে ধরা দেওয়ার পাত্রী নয় সে। নোঙর তুলে নৌকার পাল উড়িয়ে দিয়ে গাইছে—
‘মোতির ফুল মোতির ফুল সে বড় দূর,
তোমার পুত্র পাঠাইও কলাবতীর পুর।
হাটের সওদা ঢোল-ডগরে, গাছের পাতে ফল।
তিন বুড়ির রাজ্য ছেড়ে রাঙ্গা নদীর জল।’ [কলাবতী রাজকন্যা]
আরেকটি রূপকথার রাজকন্যা কিরণমালা। সে সাত যুগের ধন্য বীরের খেতাবধারী। মায়া পাহাড়ের অভিযানে গিয়ে ভাইয়েরা ফেরে না, আরো অনেক রাজপুত্রের মতো পাথর বনে যায়। সেই বিপদসঙ্কুল পথেই কিরণমালার যাত্রা—‘কিরণমালা আগুনের মতো উঠে, বাতাসের আগে ছুটে; কে দেখে, কে না-দেখে!’ মায়া পাহাড়ের মায়ার হাতছানিতে কত রাজপুত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো, এ রাজকন্যাটি এক চুলও টলে না। ‘চক্ষের পাতা নামাইয়া তরোয়াল শক্ত করিয়া ধরিয়া, সোঁ সোঁ করিয়া কিরণমালা স্রস্র একেবারে সোনার ফল হীরার গাছের গোড়ায় গিয়া পৌঁছিল।’ রাজকন্যা সোনার ঝারি ঢেলে জল ছিটান, আর পাত্থর হয়ে যাওয়া লক্ষ লক্ষ রাজপুত্র গা-মোড়া দিয়ে উঠে বসে। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তারা জোড় হাতে কিরণমালাকে প্রণাম জানায়।
ডালিমকুমার গল্পের মেয়েটি ঘুমন্ত রাজকন্যা। বিয়ের রাতে তার নাক দিয়ে সুতাশঙ্খ বত্রিশ ফণা মেলে বেরিয়ে আসে। পরদিন বাসরঘরে কেবল হাড়গোড়, বরের চিহ্নমাত্র নেই। ডালিম কুমার নায়ক। অবধারিতভাবে সাপটি টুকরো টুকরো হবে তার হাতেই। এ বেলায় সাপ হচ্ছে নারীর ভয়াল যৌনতার প্রতীক—প্রথম রাতে অজস্র ফণা ছড়িয়ে পুরুষটিকে গ্রাস করে। বুক ধুকপুক, পা ঠকঠক-করা ভয় জয় করা ব্যতিরেকে পুরুষকেন্দ্রিক এ রূপকথায় রাজপুত্র বীর হবে কেমন করে! ডালিম কুমারের দুর্ধর্ষ অভিযানের শুরু এখান থেকেই।
এসব অভিজাত রূপকথার শুরুতেই রাজার সাত রানি, ক্ষেত্রবিশেষে কমসে কম দুই নারী। তার নিচে নয়। এক রাজার কেন সাত বা একাধিক রানি—এমন প্রশ্নের ঠাঁই নেই রূপকথায়। পুত্রহীন রাজার দ্বিতীয় বিবাহের ঘোষণা শুনে রানির মাথায় যে আকাশ ভেঙে পড়তে পারে, এমন ঘটনার সাক্ষাত্ মেলে হালের সংগৃহীত কিসসা-কাহিনিতে। ‘স্বামী আমার হইছে পাগল সন্তানের লাগিয়া। যেন আকাশ ভেঙে পড়ে...’ [উতলা সুন্দরী ও কাকাধরের খেলা, সংগ্রহ সাইমন জাকারিয়া]।
রয়ে-সয়ে কথা বলা বা চুপ মেরে থাকার বনেদি ভাব নেই এই রানির আচরণে। হালের দরিদ্র লোকশিল্পীদের হাতে পড়ে রাজা-রানি আমজনতার অংশ হয়ে গেছে। বাংলা একাডেমির নিয়োজিত সংগ্রাহক কাজেমউদ্দীন রাজশাহীর নবাবগঞ্জের ‘আটকুঁড়ে বাদশার কিসসা’ সংগ্রহ করেছেন যে কথকের কাছ থেকে, তিনি ক্ষেতখামারে কাজ করেন। নাম ভুলু মোল্লা। ভুলু মোল্লার কথকতায় শাহজাদি বিদ্যা-বুদ্ধি ও হিম্মতে রাজপুত্রদের সমতুল্য। তদুপরি সে জ্যোতিষ শাস্ত্রে পণ্ডিত। আপন মায়ের পেটের ভাই ছয় শাহাজাদার এ ব্যাপারে বোনের ওপর ঈমান নেই। যা হয়, আপন মায়ের পেটের বোন, তাই খানিকটা উদ্বিগ্ন—‘দ্যাখ বহিন তুই দিনরাইত এ্যাকেতো লেখা পঢ়া করিস তার উপরি যুদি সব সুময় ভাবিস তোর মাথাট্যাথা খারাপ হৈয়্যা যাইবে।’ শাহজাদি যখন জ্যোতিষ-বিদ্যা ফলিয়ে জানতে পারে এবং ভাইদের বলে—মালী-মালিনী তাদের আসল বাপ-মা নয়, তারা রাজার সন্তান, সত্ মায়ের ষড়যন্ত্রে আপন মা বোঁকা কলসিতে করে রাজার ফুলবাগানে পানি দেয়, তখন ভাইয়েরা ভাবে—‘কিচ্ছু লয়। বেশি পঢ়ার দরুন মাথা খারাপ হৈয়্যা গেছে।’ এই বেশি পড়া বোনই গোটা অভিযানের নেতৃত্ব দেয়। ছয় শাহজাদা তার ছায়ামাত্র; ভালো কিছু করতে না পারলেও অঘটন ঘটাতে ওস্তাদ। তবু শাহজাদি কদাচ তাদের কাছ-ছাড়া হয় না। এ নিয়ে আর দশটা রাজকন্যার মতো ওর হামবড়া ভাব নেই। বুদ্ধির খেলাই সে খেলে। নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর পিতা রাজাকে সত্মা রানিদের ষড়যন্ত্রসহ গোটা কাহিনিটি শোনায়। ভুলু মোল্লার কথকতায় অপরাধী রানিদের হেঁটে কাঁটা উপরে কাঁটা দিয়ে গর্তে পুঁতে ফেলা হয় না। শাস্তিস্বরূপ তাদের সেই বোঁকা কলসি হাতে দিয়ে রাজার ফুলবাগানে পানি সেচের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়—ব্যস এই পর্যন্তই।
বাংলা একাডেমির তরফে ময়মনসিংহের আবদুল মজিদ তালুকদারের কমল সওদাগরের কিসসা সওদাগর-স্ত্রী কুলসুমকে ঘিরেই আবর্তিত। স্বামী কমল সওদাগর স্ত্রীকে চারটি বিষয় পূরণ করার শর্ত দিয়ে বৈদেশ গমন করলেন। একদিকে ‘অসতী’ হওয়ার বড় বড় ফাঁদ, অন্যদিকে স্বামীর দেওয়া শর্ত—কুলসুম বুদ্ধির জোরে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলে সর্বক্ষেত্রেই জয়ী হন। ‘কুলসুম বিবি সতী কন্যা/ দুনিয়ার মাঝারে,/ কার বাপে শক্তি রাখে/ সতীত্ব নষ্ট করে।’ কমল সওদাগরের দেওয়া চারটি শর্তের একটি ছিল—স্বামীর অনুপস্থিতিতে ‘সতী থাইকা পুত ক্যামনি জন্ম দেওয়া।’ এ শর্ত পূরণে বেশ্যার ছদ্মবেশে কুলসুম নারী দিলালপুর বাজারে হাজির হয়, যেখানে কমল সওদাগর বাণিজ্যের মকশ করছে। একদিন যায় দুইদিন যায় তিনদিনের দিন, যে-স্বামী স্ত্রীকে বাড়িতে সতীত্বের পরীক্ষায় বসিয়ে রেখে গেছে, তার হাতে বেশ্যা বাড়ির দরজার কড়া নড়ে ওঠে। কুলসুমের সতী থেকে পুত্র জন্ম দিতে আর কোনো বাধাই থাকে না। সতীত্বের একঘেয়ে গল্পে এ কিঞ্চিত্ ভিন্ন স্বাদের।
রূপকথা ও কিসসার স্বগোত্রীয় মনে হলেও কিংবদন্তি বাস্তবজীবনের অনেক কাছাকাছি। বাস্তবে শিকড় গেঁথে কিংবদন্তির গল্পগাছার বিস্তার। বিশেষত অতীতের কোনো আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা এর উপজীব্য। আর এর দাগ হয়তো রেখে গেছে বিলুপ্ত-প্রায় দুর্গ-প্রাকারে, প্রাসাদের ভগ্নস্তূপে, দীঘি-নালা, বিল-বাঁওড়, বাঁক বদল করা নদীর চর, পীরের থান বা মন্দিরে। কখনো তা-ও নেই। স্রেফ কোনো নাম—নামকরণের নেপথ্যের ঘটনা আর লোকসমাজের কল্পনার মিশেলে জন্ম নিয়েছে কিংবদন্তি। কখনো আবার পুরো নামও নয়, নামের অপভ্রংশ। যেমন বাংলা একাডেমির নিয়োজিত সংগ্রাহক চৌধুরী গোলাম আকবরের সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গলের ‘শিমবাড়ী’। ত্রিপুরার নির্বাসিত রাজকন্যাদ্বয়ের নাম ছিল নির্মাহ আর উর্মাই। বড় বোন নির্মাহর বাড়ি থেকে কিংবদন্তির নামকরণ শিমবাড়ী। রাজদ্রোহী দুই বোন। রাজা তাদের প্রেমিকদের হত্যা করার পর কন্যাদ্বয় বৈধব্যের ধ্বজা উড়িয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পরিণামে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড, অতঃপর তা মওকুফ করে গহিন বনে নির্বাসন। রাজদণ্ডাদেশের ব্যাপারে দরিদ্র প্রজাকূলের কিছুই করার ছিল না। তবে তারা বিদ্রোহী রাজকন্যাদের প্রেমকাহিনি মুখে মুখে অমর করে রেখেছে। যা প্রকারান্তরে রাজআজ্ঞার প্রতি অবজ্ঞারই নিদর্শন।
সুসং দুর্গাপুরের কমলা রানির আত্মত্যাগের জয়গান তো ময়মনসিংহের পালা-গীতিকার পাতায় পাতায়। জলশূন্য দীঘির তলায় তার নেমে যাওয়ার পেছনে প্রজার জলতেষ্টা নিবারণের পাশাপাশি স্বামীর ইজ্জত রক্ষার পণও হয়তো ছিল। বাংলা একাডেমির নিয়োজিত সংগ্রাহক আবদুল সাত্তার চৌধুরীর চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়ার ‘চাছর দীঘি’র রাজকন্যা এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম। তার জন্মবৃত্তান্তও বেশ আলাদা ধরনের। বৌদ্ধ রাজা ছাথো পুত্র নয়, কন্যাসন্তান লাভের আশায় বহুবিবাহ করেও ব্যর্থ হন। অবশেষে দীঘি কাটার মানতের ফলে যে কন্যাটির জন্ম হয়, সে কালে কালে বিদূষী, স্পষ্টভাষী অবশেষে ধর্মদ্রোহী। মূর্তি পূজায় নয়, নিরাকার সৃষ্টিকর্তায়ই তার বিশ্বাস। এমন মেয়েকে নিয়ে রাজা কী করবেন? আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত বাতিল করে পুরোহিতের পরামর্শে যৌতুক হিসেবে অর্পণ করেন আরাকানের দিকে পলায়নপর মোগল শাহজাদা শাহ সুজার হাতে। মুসলমান লোকসমাজে যদি এ কাহিনি বিকাশ ও পরিণতি লাভ করে থাকে, তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
বাংলা একাডেমির নিয়োজিত সংগ্রাহক আবদুর রহমান ঠাকুরের ‘বহরা মওলার বুড়ি’—প্রকারান্তরে খেপুর মা বুড়ির নামে মানিকগঞ্জ জেলার একটি বিলের নাম রয়েছে। খেপুর মা বুড়ি মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের এক সিপাহশালারের বজরার রাঁধুনি। বজরায় করে নানা আকাম-কুকাম করতে করতে বাদশার সিপাহশালার যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর থেকে মুর্শিদাবাদ। খেপুর মা রোজ বিকালে বজরা থেকে নেমে গাঁয়ে যায় সিপাহশালারের জন্য মেয়ে জোগাড়ের ধান্দায়। পাপে বাপেরেও ছাড়ে না। খেপুর মা’র মৃত্যু ঘটে স্থানীয় এক লাঠিয়ালের হাতে। আর সিপাহশালার সৈন্যসামন্ত ও বজরাসমেত ডুবে মরে অলৌকিকভাবে। রাজকর্মচারীর কাহিনির এখানেই শেষ। দূরের মানুষ দূরেই থাকে। কিন্তু খেপুর মা কাহিনির কথকদের সমশ্রেণির, তার ওপর হয়তো নারী বলেই তার গর্হিত কাজ মৃত্যুর পরও ক্ষমা পায় না। ঘৃণা, ক্রোধ, প্রতিশোধ পাল্টাপাল্টি চলতেই থাকে। মরে খেপুর মা নিকৃষ্ট ভূত হয়ে আসে। বিলে গোসল করতে আসা মানুষদের চুবিয়ে মারে। নিজেও মারধর খায়। ফকির-দরবেশ এনে এক বিল থেকে তাড়ালে আরেক বিলে আশ্রয় নেয়। শেষ অবধি খেপুর মাকেই পরাজয় বরণ করতে হয়। এখন ‘মইদ্দে মইদ্দে ধবধবা সাদা কাপড় পইর্যা মাইনষের ছ্যামায় আইস্যা খাড়ায় আর কয়—আঁমারে আঁর মাঁরিস না।’
যতই ভূত-প্রেত হয়ে কাহিনিতে হাজির থাকুক, কিংবদন্তির নারী রক্তমাংসেরই মানুষ। তাই এ ব্যাপারে লোকসমাজের ভাবনার সীমা-পরিসীমা নিরূপণ অপেক্ষাকৃত সহজ কিংবদন্তির বেলায়।
রূপকথা বা কিসসা বা কিংবদন্তির কে রচনাকারী বা এর আদিরূপটি কেমন, সেসব খুঁজতে যাওয়া বৃথা। ব্যাপক ও সুচিন্তিত গবেষণায় নারীর রচনার কিছু কিছু আলামত সেসব গল্পে হয়তো আবিষ্কার করা সম্ভব।
অনুমান হয়, পুরুষ লোকশিল্পী মঞ্চে উঠে যে যাত্রা-পালা করেন, কিসসা বলেন, তার অনেকাংশই নারীর কাছ থেকে ধার করা, ঘরোয়া পরিবেশে ছোটকালে দাদি-নানির কাছে শুনেছেন হয়তো। আমরা জানি সে রান্নাই হোক বা শিল্পসাহিত্যই হোক, যখন বাজারে ওঠে বা এর দাম-দস্তুরের ব্যাপার থাকে, নারীকে পেছনে ঠেলে সামনে এগিয়ে যায় পুরুষ। তাতে নারীর টাকাকড়ির লোকসান হয়, তা শুধু না। পুরুষ লোকশিল্পীর পরিবেশনা বা কথকতা থেকে প্রায়শ মৌখিক কাব্যের জনয়িত্রীর ভাবনাগুলো হারিয়ে যায়, যার উদ্ধার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পুরুষের এ পরিবেশনায় গল্পের কাঠামোটিই হয়তো থাকে—আনুষঙ্গিক অনেক কিছুই বদলে যায়। তাতে দর্শক-চাহিদা বা লোকশিল্পীর নারী-সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণা বা রুচিরও প্রতিফলন ঘটে। কোনো লিখিতরূপ না থাকায় এমনকি একই শিল্পীর ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশনায় কাহিনির ছোটখাটো রদবদল হয়। সতী ও স্বতন্তরা সংকলনগ্রন্থের জন্য ‘মা মাই চম্পার জারিগান’ বা ‘বনবিবির কিসসা’ রেকর্ড করার সময় আমার এ ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তবু এমন সব কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা গানে গানে জারি রেখেছেন বলে আখতার হোসেন বয়াতিকে সালাম।
বনবিবির কিসসা সম্পর্কে ধারণা থাকলেও মা মাই চম্পার কাহিনি অনেকেরই অজানা। ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের সঙ্গে শাহ গাজীর যুদ্ধ, মুকুট রায়ের পরাজয়, রাজকন্যা চম্পাবতী ও গাজীর বিবাহ ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর সঙ্গে যত্সামান্য মিল থাকলেও সাতক্ষীরার লাপসা গ্রামে চম্পাবতীর নামে যে দরগা রয়েছে, মা মাই চম্পা জারিগানের উত্পত্তি সেখান থেকে। বাসর রাতে চম্পাবতীকে ঘরে একা রেখে আল্লাহর নির্দেশে ধর্মপ্রচারে বেরিয়ে যান গাজী। দুটি বিড়ালরূপী বাঘের বাচ্চা সঙ্গে করে স্বামী পরিত্যক্তা নারীর নানা পথ ঘুরে মধ্যরাতে লাপসা গ্রামে আগমন, ইন্দ্রজালিক ক্ষমতা বিস্তার, পরিশেষে তাঁর রহস্যময় অন্তর্ধান জারিগানের প্রতিপাদ্য বিষয়।
খালের ধারে, লাবসার আর দশটা বসতবাড়ির মতো শান-শওকতহীন মা মাই চম্পার মাজার শরিফ। প্রবেশ পথের প্রাচীন স্বর্ণচাঁপার গাছের ফোটা ফুল আর এর সৌরভ, বেশ কিছু অজানা পাখির কূজন গৃহস্থ বাড়ি থেকে একে আলাদা মহিমা দিয়েছে। শুক্রবার ঈমানদার ভক্তদের আনাগোনায় আটপৌরে জায়গাটি জমজমাট হয়ে ওঠে। মানতের পশু-পাখি হাঁকডাক ছাড়ে, চাতালের চুলায় শিরনি চড়ে। রোগবালাই, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই মায়ের দরগায় সপ্তাহান্তে ভক্তকুলের ধরনা দেওয়া। ভগ্নপ্রায় অন্ধকার ঘরে শালু কাপড়ের আচ্ছাদনে ঢাকা মায়ের রওজা। মা মাই চম্পার জারিগানের বরাত দিয়ে বলা যায়—ঠিক এ জায়গায় সতীত্ব রক্ষার জন্য একদিন চম্পাবতী সীতার মতো পাতালে প্রবেশ করেছিলেন। স্বামী ধর্ম প্রচারক, যোদ্ধা শাহ গাজী কোথা থেকে খবর পেয়ে ছুটে আসেন। রাজা রামচন্দ্রের মতোই স্ত্রীকে টেনে তুলতে যান। তাতে শাড়ির আঁচলের একটুখানি শুধু তাঁর হাতে রুমালের মতো উঠে আসে। মাটি চম্পাবতীকে ছাড়েনি। গায়েব হয়েও মা এভাবে লাবসায় রয়ে গেছেন। বেঁচে থাকতে আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবলে মানুষের উপকার করেছেন, অদৃশ্য থেকেও এখন করে যাচ্ছেন।
সবশেষে নারীর রচনা প্রসঙ্গে একসময়ের জনপ্রিয় যাত্রা রূপবান নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে।
বারো বছরের উজিরজাদী রূপবান বারো দিনের শিশু-স্বামী শাহজাদা রহিমকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করে। গোটা কাজটিই তাকে বনবাসে আর ভিনদেশের এক মালিনীর বাড়ি থেকে অশেষ কষ্ট সয়ে করতে হয়। এমন কষ্ট যে, মুখে কথা নেই, সংলাপের জায়গায় আদ্যোপান্ত তার করুণ সুরের গান। সুখ নেই কিসমতে। বিধি লিখেননি। যখন সুখের মুখ দেখার কথা, বয়ঃসন্ধিক্ষণে স্বামী প্রেমে পড়ে রাজকন্যা তাজেলের। এ. কে. রামানুজনের১ পর্যবেক্ষণের আলোকে বলা যায়—রূপবান যাত্রার কাহিনি অজ্ঞাতনামা নারীর সৃষ্টির লক্ষণযুক্ত। কেননা নারী রচিত কাহিনিতে যা যা থাকার কথা, তার প্রায় সবই আছে এখানে। নারী রচিত কাহিনি প্রসঙ্গে যেমন রামানুজন বলেছেন, ‘বিয়ে দিয়ে গল্পের শুরু, শেষ নয়। বিচ্ছেদ একটা ঘটে, তারপর মেয়েটি পুরুষটিকে ত্রাণ করে।’ অন্য লোকগল্প প্রসঙ্গে রামানুজন নিচের কথাটি বললেও তা থেকে আমরা তাজেলের আবির্ভাবের একটি ব্যাখ্যা পেয়ে যাই—‘মেয়েদের মনে যে নিরন্তর ভয় থাকে, স্বামীকে সে ধরে রাখতে পারবে না—কৌশলী ও চতুরা কোনো কম বয়সী প্রতিদ্বন্দ্বিনী স্বামীকে নিয়ে যাবে, এ গল্প যেন তারই সাক্ষ্য বহন করে।’
এ বক্তব্যটি রূপকথা-পর্বের ‘কাঁকনমালা কাঞ্চনমালা’র বেলায়ও খাটে।
তবে এ ভয় পতির জন্য রূপবানের মতো সর্বস্বত্যাগী নারীর যতটা, অন্যদের বেলায় বোধ করি ততটা নয়। যে মেয়ে বারো দিনের শিশুর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব শুনেই গেয়ে উঠেছিল—‘আমার যৌবন বৃথায় যাবে গো/ ও দাইমা এ কি বিধির লিখন গো/ শোন দাইমা দাইমা গো,’ তাকে স্বামী লালন-পালন করে আরো অনেকগুলো বছর কাটিয়ে দিতে হয়। এ শুধু যৌবন বৃথা যাওয়া না-যাওয়ার ব্যাপার নয়, উজিরজাদিকে প্রায় মিসকিনের মতো বছরের পর বছর শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যেও দিন-গুজরান করতে হয়েছিল। কূলে যখন তরী ভিড়বে, তখনই ভরাডুবি।
পাদটীকা :এ কে রামানুজন (১৯২৯-১৯৯৩)-এর জন্ম ভারতের মহীশুরে। কবি ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাউথ এশিয়ান ল্যাংগুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনসের উইলিয়াম ই. কোলাভিন অধ্যাপক এবং কমিটি অন সোশ্যাল থট-এর সদস্য ছিলেন।
সহায়ক গ্রন্থ
ঠাকুরমার ঝুলি, শ্রীদক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার :মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি., ১৪০৬ বঙ্গাব্দ, কলিকাতা।
সতী ও স্বতন্তরা—বাংলা লোকসাহিত্যে নারী, সম্পাদক শাহীন আখতার; দিব্যপ্রকাশ, ২০০৭, ঢাকা।
ভারতের লোককথা, সংকলক ও সম্পাদক এ কে রামানুজন, অনুবাদ মহাশ্বেতা দেবী; ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া; ১৯৯৮, কলকাতা।
৪. জসীম উদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ (প্রথম খণ্ড); পলাশ প্রকাশনী, ১৯৯০, ঢাকা। v