আমি জগত্স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমর্পণে নিবেদন করছি। তিনিই তোমাদের
ধূলিকণা থেকে সৃষ্টি করেছেন...
—আল কোরআন, সুরা :৪০
সমস্ত দর্শনের প্রাচীনতম ধারণা ‘বিবর্তন’ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিল এবং আধ্যাত্মিক ধর্মতত্ত্বের সহস্রাব্দব্যাপী গভীর অন্ধকারে তা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু ডারউইন প্রাচীন কাঠামোয় নতুন জীবনীশক্তি প্রবাহিত করেছিলেন; অর্গল খুলে গিয়েছিল এবং প্রাচীন গ্রিসের চিন্তাধারা নতুনভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। অবশ্য প্রাচীন চিন্তাধারা পরবর্তী ৭০ প্রজন্মের ভ্রান্তির মাধ্যমে নেওয়া এবং কুসংস্কারের মাধ্যমে গৃহীত কোনো ধারণার চেয়ে এভাবে বিশ্বজগতের শৃঙ্খলার অধিকতর যথার্থ প্রকাশ প্রমাণিত হয়েছে।
—টি. এইচ. হাক্সলি, ১৮৮৭
পৃথিবীতে সমস্ত জীবসত্তা সম্ভবত কোনো এক খুব আদিমরূপ থেকে বংশধর রূপে উদ্ভূত হয়েছে, যাতে জীবন প্রথমবারের মতো সঞ্চারিত হয়েছিল।... যখন থেকে পৃথিবী সুনিয়ন্ত্রিত মহাকর্ষ সূত্রানুসারে চক্রাকারে ঘুরছে, তখন থেকে প্রাণের এই চিত্রের চমত্কারিত্ব হলো একটি খুবই সরল গঠন থেকে আরম্ভ করে অন্তহীন প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে আশ্চর্যজনক প্রাণের উদ্ভব হচ্ছে ও হয়েছিল।
—চার্লস ডারউইন, প্রজাতির উত্স (The Origin of Species), ১৮৫৯
দৃশ্যমান বিশ্বের সর্বত্র একদল পদার্থ উদ্ভূত হয়েছিল বলে মনে হয়। সূর্য ও পৃথিবীতে বিদ্যমান থাকা মৌলিক উপাদানের বেশ কিছু নক্ষত্ররাও ধারণ করে। এটা একটা দারুণ ব্যাপার যে, উপাদানগুলো নক্ষত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এদের মধ্যে কিছু আমাদের হাইড্রোজেন, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও লোহা পৃথিবীর জীবন্ত প্রাণীর সঙ্গে যুক্ত। এটা কি হতে পারে, কম করে হলেও, উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো আমাদের সূর্যের মতো, বিশ্বব্যবস্থার মূলে সহায়ক ও শক্তিদানকারী জীবিত প্রাণীদের আবাস হিসেবে অভিযোজিত করে?
—উইলিয়াম হগিনস ১৮৬৫
আমার সারাজীবন আমি বিস্মিত হয়েছি আর কোনো স্থানে প্রাণের সম্ভাবনা আছে কি না ভেবে। আর থাকলে তারা দেখতে কেমন হবে? কী দিয়ে তৈরি হবে? আমাদের গ্রহের সমস্ত জীবকুল জৈব-অণু দ্বারা গঠিত—এগুলো এমন এক জটিল আণুবীক্ষণিক কাঠামো, যেগুলোর মধ্যে কার্বন অণুগুলো মূখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রাণ-উত্পত্তির পূর্বে একটা সময় ছিল, যখন পৃথিবীটা অনুর্বর ও সম্পূর্ণ বিরান ছিল। এখন আমাদের পৃথিবী প্রাণের বন্যায় ভাসছে। কিন্তু কিভাবে এটা হলো? কেমন করে প্রাণের অনুপস্থিতিতে কার্বনভিত্তিক জৈব অণুগুলো তৈরি হয়েছিল? কিভাবে প্রথম প্রাণশীল বস্তুর উদ্ভব ঘটেছিল? কেমন করে প্রাণ আমাদের (মানুষের) মতো জটিল কাঠামোয় পৌঁছাল, যে আমরা আমাদের নিজেদের রহস্য উন্মোচনে সচেষ্ট?
এবং অগুনতি অন্যান্য গ্রহ, যেগুলো অন্যান্য সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, সেখানে কি প্রাণ আছে? বহির্জাগতিক প্রাণের অস্তিত্ব যদি থাকে, তবে তা কি পৃথিবীর মতো একই ধরনের জৈব অণুর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে? অন্য জগতের প্রাণ কি দেখতে খুব বেশি পৃথিবীর মতো? অথবা তারা হতবুদ্ধিকরভাবে ভিন্ন এবং অন্য পরিবেশের কাছে অন্য ধরনের অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন? আর কী কী সম্ভব? পৃথিবীতে প্রাণের প্রকৃতি এবং আর কোনো জায়গায় প্রাণ আছে কি না তার অনুসন্ধান হলো একই প্রশ্নের দুটো দিক—তাহলো আমরা কে, তার অনুসন্ধান।
নক্ষত্রগুলোর মধ্যেকার স্থানগুলো মহা অন্ধকারময়, সেখানে গ্যাসীয় মেঘ ও জৈববস্তু আছে। বেতার টেলিস্কোপের মাধ্যমে সেখানে কয়েক ডজন বিভিন্ন ধরনের জৈব অণুর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এ ধরনের জৈব অণুর প্রাচুর্য ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাণের উপাদান সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সম্ভবত প্রাণের উত্পত্তি ও বিবর্তন হলো—যদি পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় মহাজাগতিক অবশ্যম্ভাবিতা। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির শত শত কোটি (billions of planet) গ্রহের কতগুলোয় কখনোই প্রাণের উদ্ভব ঘটেনি। অন্যগুলোয় এটা ঘটে থাকতে পারে, কিন্তু তা ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা প্রাণের সরল গঠন হতে খুব দূরে কখনো যেতে পারেনি। জগতের অল্পকিছু অংশেই বুদ্ধিমত্তা ও সভ্যতার বিকাশ ঘটে থাকতে পারে, যারা হয়তো আমাদের চেয়েও এগিয়ে আছে।
প্রায়শ অনেকে মন্তব্য করে থাকেন যে, অদ্ভুত যোগাযোগ ও সৌভাগ্যের সুবাদে এই পৃথিবী জীবনের জন্য পরিপূর্ণভাবে উপযোগী—এখানে আছে মাঝারি তাপমাত্রা, তরল পানি, অক্সিজেনসমৃদ্ধ আবহমণ্ডল ইত্যাদি। কিন্তু এটা আংশিকভাবে হলেও কার্যকারণের একটি বিভ্রান্তি। আমরা পৃথিবীবাসীরা সর্বোত্তমভাবে পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত, কারণ এখানে আমরা জন্মেছিলাম, বড় হয়েছিলাম। ওই প্রাচীনতর প্রাণ কাঠামোগুলো যারা ভালোভাবে অভিযোজিত ছিল না, তারা টিকে থাকতে পারেনি। ওই সমস্ত প্রাণীর বংশধররূপে আমরা উদ্ভূত, যারা ভালোভাবে টিকেছিল। এই প্রাণ যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে উদ্ভূত হতো, তাহলে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, তা ওই জগত্ বা গ্রহের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকত।
পৃথিবীর সকল প্রাণীই পরস্পর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। আমাদের একটি সাধারণ জীবরসায়ন ও সাধারণ বিবর্তনীয় বংশগতি আছে। ফলে বলা যায়, আমাদের জীববিজ্ঞানীদের প্রায় অলঙ্ঘনীয় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারা কাজ করেন জীববিজ্ঞানের শুধু একটি প্রকার—প্রাণসংগীতের একটি নিঃসঙ্গ সুর (one lonely theme in music of life) নিয়ে। হাজার হাজার আলোকবর্ষ বিস্তৃত এই ক্ষীণ বেণু বাঁশির রেশটিই কি একমাত্র পরিপূর্ণ সুর? কিংবা এমন কি হতে পারে না যে শত কোটি কণ্ঠ অজস্র রাগ-রাগিনী ও সুরময় গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে কখনো সুর কখনো বেসুর ঐকতানে জীবন সংগীত গেয়ে যাচ্ছে গ্যালক্সি থেকে গ্যালাক্সিতে?
পৃথিবীতে প্রাণসংগীত (music of life) সম্পর্কিত ছোট্ট একটা গল্প আপনাদের বলি। ১১৮৫ সালের কথা, জাপানের সম্রাট ছিলেন সাত বছরের বালক নাম আনতোকু (Antoku)। তিনি ছিলেন হেইকি নামের সামুরাই গোষ্ঠীর নিছক স্বীকৃত প্রধান। এই হেইকিরা অন্য এক সামুরাই গোষ্ঠী জেঞ্জিদের (Genji) সঙ্গে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রত্যেকে দাবি করছিল তারাই বংশানুক্রমিকভাবে উচ্চবর্গীয়, তারাই রাজ সিংহাসনের ন্যায্য দাবিদার। এই ব্যাপারে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য তাদের সাক্ষাত্ ঘটল নৌপথে, জাপানের অভ্যন্তরীণ সাগরের দানো-উরাতে। সময়টা ছিল ১১৮৫ সালের ২৪ এপ্রিল। সম্রাট ছিল ওই যুদ্ধের বোর্ডশিপে। হেইকরা সংখ্যায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও সৈন্য পরিচালনার অভাবে পরাজিত হলো। অনেকে মারা পড়েছিল, আর যারা টিকেছিল, তাদের বেশিরভাগই সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিল এবং ডুবে গিয়েছিল। সম্রাটের দাদি স্থিরসংকল্প করলেন যে কিছুতেই শত্রুদের হাতে ধরা দেবেন না। তারপর যা ঘটেছিল, তা ‘দ্য টেইল অব হেইকি’তে অনেকটা এভাবে লেখা আছে :
‘ওই বছর বালক সম্রাটের বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর। অথচ তাকে দেখাচ্ছিল অনেক বয়স্ক। তাকে এত সুন্দর দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল, উজ্জ্বল আলোক বিকীর্ণ করছে এবং তার লম্বা, কালো চুল খোলা অবস্থায় পেছন দিকে নিচ পর্যন্ত ঝোলানো ছিল। মুখমণ্ডলে বিস্ময় আর উদ্বেগ নিয়ে তিনি ল্যাডি নিকে ( Lady N ii) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় তুমি আমাকে নিয়ে যাচ্ছ?’
তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন বালক সম্রাটের দিকে, তখন তার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছিল এবং... তার ঈষত্ ধূসর, নীল ও গোলাপি বর্ণবিশিষ্ট পদমর্যদাসূচক গাউনের ভিতর তার লম্বা চুল পেঁচিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিলেন। অসহায়ভাবে কাঁদতে কাঁদতে শিশু সম্রাট তার সুন্দর ছোট দুটি হাত একত্রে রাখলেন। তিনি প্রথমে পূর্বদিকে ঘুরে আইসের দেবতাকে (god of Ise) শেষ প্রণতি জানালেন। তারপর পশ্চিমে ঘুরে সেই একই প্রার্থনা Nembutsu (Amida Budha-এর কাছে একটি প্রার্থনা) পুনরাবৃত্তি করলেন। তখন লেডি নি শিশু সম্রাটকে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে সান্ত্বনা দিলেন এবং দুই বাহুতে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে বললেন, ‘সাগরের গভীরে আমাদের রাজধানী।’ অবশেষে তারা ঢেউয়ের অতলে তলিয়ে গেলেন।’
সকল হেইকি যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেল। শুধু ৪৩ জন স্ত্রীলোক বেঁচেছিল। সম্রাজ্ঞীর এই সহচরীরা যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটে জেলেদের কাছে ফুল ও তাদের দেহসৌষ্ঠব বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। হেইকিরা ইতিহাস থেকে প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওই সমস্ত রাজকীয় সহচরীদের একটা হতশ্রী গোষ্ঠী এবং তাদের পরবর্তী বংশধরেরা জেলে সম্প্রদায়ের মাধ্যমে ওই যুদ্ধের স্মৃতির স্মরণে একটি উত্সব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই উত্সবটি এখনো পর্যন্ত প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল পালিত হয়ে আসছে। হেইকি বংশোদ্ভূত জেলেরা শন ও কালো পাগড়ি পরে স্মৃতিচিহ্ন রাখার জায়গা আকমায় যায়, যেখানে ডুবে যাওয়া সম্রাটের জাকাল সমাধি (mausoleum) আছে। সেখানে তারা মঞ্চস্থ হওয়া একটা নাটক দেখে, যার বিষয়বস্তু হলো দানো-উরার যুদ্ধের ঘটনা। শত শত বছর ধরে এবং পরবর্তীকালে সাধারণ মানুষেরা ভেবেছিল যে অশরীরী সামুরাইরা ঘুরে বেড়াচ্ছে সাগরের অতলে মুক্ত হওয়ার জন্য এবং রক্তের দাগ, পরাজয় ও অপমানের চিহ্ন মোছার জন্য।
জেলেরা বলে হেইকি সামুরাইরা ঘুরে বেড়াচ্ছে এখনো অভ্যন্তরীণ সাগরের তলে কাঁকড়ার অবয়বে। যে কাঁকড়া এখানে পাওয়া যায়, তাদের পেছনে অদ্ভুত এক চিহ্ন দেখা যায়। যে চিহ্নের প্যাটার্ন ও খাঁজগুলো অস্বস্তিকরভাবে একজন সামুরাইয়ের চেহারার মতো। ফলে এই কাঁকড়া ধরা পড়লেই এটা না খেয়ে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় দানো-উরাতে ঘটা সেই বেদনাদায়ক ঘটনার স্মরণে।
এই কিংবদন্তি জন্ম দিয়েছিল একটি চমকপ্রদ সমস্যার। সমস্যাটি হলো কিভাবে কাঁকড়ার খোলে অবিকল খোদাইকৃত একজন যোদ্ধার ছবির উদ্ভব হয়েছিল? উত্তরটি প্রতীয়মান হয় যে, মানুষেরাই তৈরি করেছিল ওই মুখচ্ছবি। আসলে কাঁকড়ার খোলের এই প্যাটার্নগুলো ছিল বংশগতিসূত্রে প্রাপ্ত। কিন্তু মানুষের মতো কাঁকড়াগুলোর মধ্যেও অনেক ধরনের ভিন্ন ভিন্ন বংশগতির ধারা (different hereditary lines) আছে। (হামেশাই তাদের চেহারার মধ্যে হেরফের ঘটে, এভাবে দেখা দিতে পারে কোনোটিতে মানুষের মুখের আদল।) ধরা যাক, এই ধরনের চিহ্নযুক্ত কাঁকড়ার দূরবর্তী পূর্বপুরুষদের মধ্যে হঠাত্ করে কোনো একটি কাঁকড়াকে কেউ একজন উঠিয়েছিল, যার খোলসের ওপরের প্যাটার্নে খুব অল্প পরিমাণে হলেও মানুষের মুখের ছাপ ছিল। এমনকি এটাও হয়ে থাকতে পারে যে, দানো-উরা যুদ্ধের আগেও ওই ধরনের কাঁকড়া ছিল আর জেলেরা ওগুলো খেতে চাইত না। সেগুলোকে আবার সমুদ্রে নিক্ষেপ করে তাদের বিবর্তনিক প্রক্রিয়ার গতিকে অব্যাহত রাখল। যদি আপনি একটি কাঁকড়া হন এবং আপনার খোলস হয় সাধারণ তাহলে মানুষেরা আপনাকে খাবে, পরিণামস্বরূপ আপনার ধারা খুবই অল্প বংশধর রেখে যাবে। যদি আপনার খোলস, অল্প হলেও একটা মানুষের মুখচ্ছবির মতো দেখায়, তবে তারা আপনাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে বা ফেলে দেবে। ফলে আপনি রেখে যাবেন অধিক বংশধর। কাঁকড়াদের খোলসের ওপরের প্যাটার্নের ব্যাপারটা ছিল অল্প। এরপর কাঁকড়াদের অনেক প্রজন্ম পার হয়েছে, যে কাঁকড়াগুলোর খোলসের প্যাটার্নে সামুরাইয়ের মুখচ্ছবির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল, সেগুলো টিকে থাকার ক্ষেত্রে অধিকতর সুবিধা পেয়েছে যে পর্যন্ত না মুখচ্ছবি শুধু মানুষের মতো নয়, শুধু জাপানিদের মতো নয়, বরং ভয়ংকর বিদ্বেষপূর্ণ সামুরাইদের মতো হয়েছে। কাঁকড়ারা কী চায় তার সঙ্গে এইসব ব্যাপারের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে নির্বাচন বাইরে থেকে আরোপিত। আপনাকে যতই একজন সামুরাইয়ের মতো দেখাবে, ততই আপনার টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি। ফলাফলস্বরূপ অসংখ্য সামুরাই-কাঁকড়া এসেছে। অন্যগুলো প্রবলভাবে কমে গেছে।
এই ধরনের প্রক্রিয়াকে কৃত্রিম নির্বাচন (Artificial selection) বলে। হেইকি কাঁকড়ার ক্ষেত্রে জেলেদের মোটামুটি অসচেতনভাবে করা কাজগুলো ফলদায়ক হয়েছে এবং নিশ্চিতভাবে তা কাঁকড়াদের গভীর ইচ্ছা ছাড়াই। কিন্তু মানবজাতি হাজার হাজার বছর ধরে অত্যন্ত সচেতনভাবে নির্বাচন করে আসছে—কোন কোন উদ্ভিদ ও প্রাণী বাঁচবে, কোনগুলো মারা যাবে। আমরা শৈশবকাল থেকে খামার ও গৃহপালিত প্রাণী, ফল, গাছ ও শাকসবজির সঙ্গে পরিচিত। এদের দ্বারাই পরিবেষ্টিত। এগুলো কোথা থেকে এসেছে? তারা কি একদা বনে মুক্ত জীবনযাপন করেছিল। তারপর খামারে এসে অপেক্ষাকৃত কম কষ্টকর জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল? না, সত্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। তাদের বেশিরভাগই আমাদের হাতে তৈরি।
দশ হাজার বছর আগে ছিল না কোনো খামারের গরু অথবা সাদা শিকারি কুকুর, বড় শস্য দানা বা শস্যের ঢাউস ছড়া। যখন গার্হস্থ্য জীবনে এই সকল উদ্ভিদ ও প্রাণীর পূর্বপুরুষদের পোষ মানালাম, যখন প্রায়শ জীবগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম দেখাত, তখনই এদের প্রজননকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলাম। আমরা নিশ্চিত করেছিলাম নির্দিষ্ট কিছু ধারাকে এবং অধিকতর পছন্দনীয় হিসেবে তাদের পুনরুত্পাদনকে, যাদের গুণ আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। আমরা চাইলাম এমন ধরনের কুকুর, যারা আমাদের ভেড়ার পাল পাহারা দেবে। তখনই আমরা নির্বাচন করলাম ওই বাচ্চাগুলোকে, যাদের আছে দলবদ্ধভাবে শিকারে অভ্যস্ত প্রাণীর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য; যেমন :বুদ্ধিমত্তা, আনুগত্য ও শিকারের সহজাত দক্ষতা। আমরা যে আজ বিশাল সংখ্যক খামারি গরু পাই, তাহলো মানবজাতির দুধ ও পনিরের প্রতি উত্সাহের কারণে। আমাদের ধান বা ভুট্টো দশ হাজার প্রজন্ম ধরে চিমসে ও শুঁটকো থেকে আরো স্বাদ ও পুষ্টিকর হওয়ার জন্য জন্মাচ্ছে। বাস্তবিকই এটা এমন এক পরিবর্তন, যা মানব হস্তক্ষেপ ছাড়া পুনরুত্পাদনও হতে পারে না।
কৃত্রিম নির্বাচনের মূলকথা হলো, হেইকি কাঁকড়াই হোক, অথবা কুকুর বা গরু বা শস্যদানাই হোক, তাহলো উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষেত্রে অসংখ্য শারীরিক ও আচরণগত যে বৈশিষ্ট্য থাকে, সেগুলো বংশগতির মধ্যে প্রোথিত। তারা জন্মদান বা বংশবিস্তার করে সত্য। কিন্তু মানুষ তাদের নিজেদের প্রয়োজনে কিছু প্রকারভেদ বা প্রকরণকে (varieties) পুনরুত্পাদনে উত্সাহিত করে এবং অন্যগুলোকে বাধাদান করে। ফলে যে প্রকারটি অধিকতর পছন্দনীয় হিসেবে সহযোগিতা পায়; সেগুলো ব্যাপক সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়, আর যেগুলো বাধা পায়, সেগুলো দুর্লভ হয়ে পড়ে এবং বিলুপ্তির পথে চলে যায়।
যদি মানুষেরা উদ্ভিদ ও প্রাণীর নতুন নতুন প্রকরণ বা প্রকারভেদ তৈরি করতে পারে, তাহলে প্রকৃতি কেন পারবে না? প্রকৃতির এই ধরনের প্রক্রিয়াকে প্রাকৃতিক নির্বাচন বা ন্যাচারাল সিলেকশন বলে। পৃথিবীতে অল্প সময় ধরে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমরা পশু ও শাকসবজির মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটিয়েছি, সেগুলো এবং ভূত্বকের বিভিন্ন স্তরে জীবাশ্মের চিহ্ন থেকে এটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার যে, প্রাণ মহাকালব্যাপী মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। জীবাশ্ম সাক্ষ্য আমাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে ওই সব প্রাণীর কথা বলে, যারা একদা বিশাল সংখ্যায় ছিল এবং বর্তমানে যেগুলো সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে*। আজ যে সংখ্যক প্রজাতি পৃথিবীতে রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক প্রজাতি পৃথিবীর ইতিহাসে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা হয়েছে বিবর্তনের বলি।
পাদটীকা :*সনাতনী পশ্চিমা ধর্মমত বিপরীত ধারণাটিকেই বরং বলিষ্ঠভাবে লালন করে, যেমন ১৭৭০ সালে জন ওয়েসলি বলেছিলেন, ‘মৃত্যুকে কখনোই এমনকি দুর্লভ প্রজাতিও ধ্বংসের অনুমতি দেওয়া হয় না।’
গার্হস্থ্যায়নের প্রভাবে বংশগতির পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটেছে। মধ্যযুগের প্রথম দিকের আগ পর্যন্ত ইঁদুরেরা গার্হস্থ্য জীবনে ছিল না (এটা ফরাসি মঠবাসী বা সন্ন্যাসীদের দ্বারা উদ্ভূত হয়েছিল, ওই বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে, সদ্যজাত ইঁদুরেরা হলো মাছ এবং সেই কারণে চার্চ পঞ্জিকায় নির্দিষ্ট দিনগুলোতে মাংস খাওয়ায় বিধিনিষেধ আছে); কফি ১৫ শতকে; চিনি গাছের চাষ ১৯ শতকে; এবং নেউলজাতীয় প্রাণিবিশেষ বা সলোম জাতীয় চর্ম এখনো গার্হস্থ্যায়নের সবচেয়ে প্রাথমিক অবস্থায় আছে। দশ হাজার বছরেরও কম সময়ে গার্হস্থ্যায়নের ফলে ১ কিলোগ্রামেরও কম অবস্থা থেকে ভেড়ার রুক্ষ পশম বৃদ্ধি পেয়ে সমভাবে বিন্যাসিত অবস্থায় ১০ বা ২০ কিলোগ্রামে পৌঁছেছে, পশমগুলো সূক্ষ্ম ও মসৃণ হয়েছে; অথবা গবাদি পশুর একবার দহনে দুধ দেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে কয়েকশ থেকে কয়েক লক্ষ ঘন-সেন্টিমিটার পর্যন্ত। যদি কৃত্রিম নির্বাচন এত অল্প সময়ে এত বড় রকমের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তাহলে প্রাকৃতিক নির্বাচন যে প্রক্রিয়া কোটি কোটি বছর ধরে কাজ করে এসেছে, তারা (লক্ষ লক্ষ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি সৃষ্টিতে) কেন সক্ষম হবে না? এই কথার উত্তর হলো উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতে আজ এত সৌন্দর্য এত বৈচিত্র্য হলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলাফল। বিবর্তন হলো বাস্তবস্তা (a fact), কোনো তত্ত্ব নয়।
বিবর্তনের কার্যপ্রক্রিয়া হলো প্রাকৃতিক নির্বাচন—এই মহা আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চার্লস ডারউইন ও আলফ্রেড ওয়ালেসের নাম। শত বছরেরও অধিক আগে তারা বলেছিল, প্রকৃতি হলো বহু সন্তানপ্রসূ; যা টিকে থাকবে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্ম হয় এখানে এবং পরিবেশ নির্বাচন করে ওই প্রকারগুলো, যেগুলো টিকে থাকার জন্য অপেক্ষাকৃত বেশি উপযোগী। মিউটেশনস—বংশগতিতে আকস্মিক পরিবর্তন—বংশবিস্তার করে সত্য। তারা বিবর্তনের কাঁচামাল সরবরাহ করে। পরিবেশ নির্বাচন করে ওই অল্পকিছু মিউটেশন বা পরিব্যক্তিকে, যারা টিকে থাকাকে উপযোগী করে। ফলাফলস্বরূপ পর্যায়ক্রমিক ধীর রূপান্তরের মাধ্যমে জীবন এক কাঠামো থেকে অন্য কাঠামোতে উত্তীর্ণ হয়, নতুন* প্রজাতির উত্পত্তি ঘটে।
*পাদটিকা :মায়াদের পবিত্র পোপল ভূহ গ্রন্থে বিভিন্ন প্রাণীদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, এগুলো হলো দেবতাদের মানব সৃষ্টিতে ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল। প্রথম দিকের প্রচেষ্টাগুলো ছিল খুবই অসফল, যার ফলে নিম্নশ্রেণির প্রাণীর উদ্ভব হয়েছে; সর্বশেষ প্রচেষ্টার আগেরটা অল্পের জন্য ব্যর্থ হয় এবং মানুষের বদলে বানর তৈরি হয়। চীনা উপকথায় আছে, পিয়ানকু (P’an Ku) নামের এক দেবতার শরীরের উকুন থেকে মানবজাতির উত্পত্তি। ১৮ শতকে ডি বাফন (de Buffon) প্রস্তাব করলেন যে, ধর্মগ্রন্থের (Scripture) বর্ণনার চেয়ে এই পৃথিবী অনেক বেশি প্রাচীন এবং সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ কোনোভাবে প্রাণ ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়েছে, আর নরবানরেরাই হলো মানুষের সেই বিস্মৃত পূর্বপুরুষ। যদিও ধারণাগুলো ডারউইন ও ওয়ালেসের মতবাদের বিবর্তনের প্রক্রিয়াকে সুনির্দিষ্টভাবে দেখায় না। তবুও তারা ডেমোক্রিটাস, এমপিডকলেস ও অন্যান্য আয়োনীয় বিজ্ঞানীদের মতবাদের মতোই ডারউইনীয় তত্ত্বের দিকে ঈঙ্গিত করে; যা ‘কসমস’ গ্রন্থের সপ্তম অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রজাতির উত্পত্তি গ্রন্থে ডারউইন যা বলেছেন
‘মানুষ মূলত পরিবর্তনশীলতা (variability) তৈরি করে না; সে অজান্তে জীবকে শুধু নতুন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয় এবং প্রকৃতি তারপর জীবতন্ত্রের ওপর কাজ করে এবং এর পরিবর্তন ঘটায়। প্রকৃতি প্রদত্ত পরিবৃত্তিগুলো থেকে মানুষ নির্বাচন করতে পারে এবং করে থাকে। এইভাবে সেগুলোকে ইচ্ছামতো সঞ্চিত করতে পারে। সে এইভাবে তার নিজস্ব লাভ ও আনন্দের জন্য প্রাণী ও উদ্ভিদকে অভিযোজিত করায়। সে এটা করতে পারে নিয়ম বা পদ্ধতিগতভাবে অথবা তার সময়ে সবচেয়ে উপকারী প্রাণী বা উদ্ভিদের কোনো স্বতন্ত্র শ্রেণিকে অসচেতনভাবে রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে, প্রজননে পরিবর্তন ঘটানোর কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই।... যেসব নিয়ম গার্হস্থ্যায়নের সময় এত দক্ষভাবে কাজ করেছে, সেগুলো কেন প্রকৃতিতে (Nature) মুক্ত অবস্থায় ঘটবে না, তার কোনো সহজবোধ্য কারণ নেই...। যতগুলো টিকে থাকে তার চেয়ে অধিকসংখ্যক জীবের জন্ম হয়।... যেকোনো যুগে বা যেকোনো ঋতুতে কোনো প্রাণের ক্ষেত্রে সামান্য সুবিধা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া অন্য প্রাণীদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, অথবা চারদিকের পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে যেভাবেই হোক সামান্যমাত্রায় অপেক্ষাকৃত ভালো অভিযোজন সাম্যাবস্থা উল্টে দেবে।’
ঊনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে দক্ষ তার্কিক ও বিবর্তনবাদ জনপ্রিয়করণের হোতা টমাস হাক্সলি লিখেছিলেন যে, ডারউইন ও ওয়ালেসের গবেষণা গ্রন্থ হলো, ‘একটি আলোর ঝলক, সেইসব মানুষের কাছে, যারা রাত্রির অন্ধকারে পথ হারিয়েছে, হঠাত্ করেই তাদের কাছে প্রকাশ করে একটি পথের দিশা, যে পথটি তাকে নিয়ে যেতে পারে সরাসরি তার বাড়িতে অথবা নাও নিতে পারে, তবে নিশ্চিতভাবে তার পথে যাবে...। ‘অরিজিন অব স্পিসিস’-এর মূল বক্তব্য আত্মস্থ করার পর প্রথমে আমার মনে হলো ‘কত বড় বোকা হওয়ায় একথাটা আগে ভাবিনি!’ আমার মনে হয় কলম্বাসের সঙ্গীরাও প্রায় একই কথা বলেছিলেন...। জীবের পরিবর্তনশীলতা, অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম, শর্তাধীনে অভিযোজন এসবই ছিল যথেষ্ট কুখ্যাত; কিন্তু ডারউইন বা ওয়ালেসের এই অন্ধকার দূর করার আগ পর্যন্ত আমাদের কেউই অনুমান করেনি যে, প্রজাতির বৈচিত্র্যময়তার সমস্যাটির কেন্দ্রের পথটি সেগুলোর মধ্যে দিয়ে গেছে।’
বিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচন—এই উভয় ধারণা সম্বন্ধে অনেক মানুষ, এমনকি এখনো কুত্সা বা অপপ্রচারের শিকার। আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীতে জীবনের সৌষ্ঠবের দিকে দৃষ্টিপাত করেছিল, প্রাণ গঠনের কার্যক্রমের নৈপুণ্য দেখে অবাক হয়েছিল এবং একজন মহান কারিগরের (Great Designer) অস্তিত্ব অনুভব করেছিল। সূক্ষ্মতম একটি পকেট ঘড়ি থেকেও অনেক বেশি জটিল সবচেয়ে সরল এক কোষী প্রাণী। কিন্তু তবুও ধরি, গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক হতে কতগুলো পর্যায়ের মধ্যদিয়ে এই পকেট ঘড়ির উদ্ভব ঘটতে পারে না অথবা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেরাই একত্রিত হয়ে তৈরি হতে পারে না। একটি ঘড়ি ইঙ্গিত করে ঘড়ি প্রস্তুতকারকের। এমন কোনো দিকই গোচরীভূত হয়নি, যার ভিতর পরমাণু ও অণুসমূহ কোনো উপায় স্বতঃস্ফূূর্তভাবে জড়ো হয়ে এমন আশ্চর্য জটিল ও সূক্ষ্ম কার্যরত মাহাত্ম্য নিয়ে প্রাণ গঠিত হতে পারে পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে। প্রতিটি জীবন্ত প্রাণী এমন বিশেষভাবে নকশা করা যে একটি প্রজাতি অন্যটিতে রূপান্তরিত হয় না, এই ধারণাটি আমাদের পূর্ব-পুরুষদের সীমাবদ্ধ ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ হতে প্রাপ্ত সকল জ্ঞানের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সংগতিপূর্ণ। মহান কারিগর কর্তৃক প্রতিটি প্রাণী অতি সতর্কভাবে গঠিত হয়েছিল ধারণাটি, এমন এক তাত্পর্য ও প্রকৃতির প্রতি শৃঙ্খলা এবং মানুষের প্রতি গুরুত্ব সরবরাহ করে, যা আমরা এখনো কামনা করি। একজন কারিগর হলো জৈবিক পৃথিবীর একটি প্রাকৃতিক, আবেদনপূর্ণ এবং একত্রে মানবজাতির ব্যাখ্যা। কিন্তু যেমন ডারউইন ও ওয়ালেস দেখিয়েছিলেন, আরেকটি উপায় আছে, যা সমানভাবে আবেদনপূর্ণ, সমানভাবে মানবিক এবং অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য :প্রাকৃতিক নির্বাচন, যা যুগে যুগে (aeon) জীবনগীতি আরো বাঙ্ময় করে তোলে।
হতে পারে জীবাশ্ম সাক্ষ্য মহান কারিগর বা স্রষ্টার ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ; সম্ভবত মহান কারিগর যাদের ওপর অসন্তষ্ট হন সেরকম কিছু প্রজাতিকে ধ্বংস করেন এবং উন্নততর নকশার ওপর ভিত্তিতে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এই চিন্তাধারা হলো একটু হতাশাব্যঞ্জক। প্রতিটি উদ্ভিদ ও প্রাণী হলো নিখুঁত সৌন্দর্য নিয়ে তৈরি; শুরু থেকেই কি কারিগরের সবচেয়ে উপযুক্ত অভীপ্সিত প্রজাতি তৈরির সামর্থ্য থাকা উচিত নয়? ফসিল চিহ্ন ইঙ্গিত দেয় শুদ্ধাশুদ্ধ (trial and error) প্রক্রিয়ার, ভবিষ্যতকে উপলব্ধি করার অক্ষমতার মতো ঘটনাসমূহ। এই ঘটনাগুলো একজন দক্ষ মহান স্রষ্টার ধারণার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ (যদিও অধিক দূরবর্তী এবং পরোক্ষ অস্থির প্রকৃতির উত্তেজনাপ্রবণ একজন কারিগরের সঙ্গে নয়)।
১৯৫০ সালের প্রারম্ভে আমি ছিলাম আন্ডার গ্র্যাজুয়েট, আমার এইচ. জে. মুলারের গবেষণাগারে কাজ পাওয়ার দারুণ সৌভাগ্য হয়েছিল। মুলার ছিলেন একজন বিখ্যাত বংশগতিবিদ এবং বিকিরণে প্রাণিদেহে যে পরিব্যক্তি বা পরিবর্তন ঘটে, তা আবিষ্কার করেছিলেন। মুলারই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি কৃত্রিম নির্বাচনের উদাহরণ হিসেবে আমার মনোযোগ হেইকি কাঁকড়ার দিকে নিয়ে যান। বংশগতিবিদ্যার ব্যবহারিক দিকটা শেখার উদ্দেশ্যে ফলের মাছি, Drosophila melanagaster নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমি অনেকগুলো মাস ব্যয় করেছিলাম। Drosophila melanagaster (এটা কালো শরীরের কৃষ্ণকায় শিশির প্রেমিক) হলো দুটো পাখা এবং বড় বড় চোখের ক্ষুদ্র-নম্র একটি প্রাণী। আমরা তাদের রাখলাম তরল পদার্থ পরিমাপক-১০ আউন্স অথবা ওষুধের ক্ষেত্রে ২০ আউন্স বিশিষ্ট দুধের বিশেষ বোতলগুলোতে। জনক জিনের পুনর্বিন্যাসে এবং প্রাকৃতিক ও আবেশিত মিউটেশনে নতুন কী জিনের আবির্ভাব ঘটে, তা দেখার জন্য আমরা দুটো প্রকরণের মধ্যে সঙ্কর ঘটাতাম। টেকনেশিয়ানেরা বোতলের মধ্যে যে চিটাগুড় রেখেছিল, তাতে এই প্রজাতির স্ত্রীরা ডিম জমাতে পারত; বোতলগুলোর ছিপি এঁটে দেওয়া হতো; এবং আমরা অপেক্ষা করতাম দুই সপ্তাহ ধরে উর্বর ডিম থেকে শুককীট, পরে তা থেকে মুককীট, আর তা থেকে পূর্ণাঙ্গ মাছি পাওয়ার জন্য।
একদিন আমি স্বল্প ক্ষমতার বায়নোকুলার মাইক্রোস্কোপ দিয়ে নতুন জন্মানো পূর্ণ বয়স্ক দলের ড্রসফিলাকে দেখছিলাম, সামান্য ইথারে এদের স্থবির করে রাখা হয়েছিল। আর আমি ব্যস্তভাবে উটের চুলের ব্রাশ দিয়ে দিয়ে বিভিন্ন প্রজাতি পৃথক করছিলাম। খুব অবাক হয়ে আমি লক্ষ করলাম খুবই ভিন্ন এক জিনিস :সাদার পরিবর্তে লাল চোখের মতো ছোট পরিবর্তন নয় অথবা গলাবৃত কোনো গ্রিবা-লোম না থাকার পরিবর্তে গ্রীবা লোম থাকা নয়। বরং বিষয়টা ছিল অন্য এবং বেশ ভালো কার্যক্ষম, লক্ষণীয় পাখা এবং লম্বা পশমময় শুঙ্গযুক্ত এক ধরনের ভিন্ন প্রজাতি। আমি সিদ্ধান্ত টানলাম, নিয়তি সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজাতির উদ্ভব ঘটিয়েছে মাত্র একটি প্রজন্মের ব্যবধানে, মুলার যা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন, যদিও তা তাঁর নিজের ল্যাবরেটরিতেই ঘটেছে। তাঁর কাছে এটা ব্যাখ্যা করা আমার জন্য ছিল একটা দুঃসাধ্য ও অস্বস্তিকর ব্যাপার।
সাহসে ভর করে তাঁর অফিসে দরজায় টোকা দিলাম। চাপা গলায় বললেন, ‘ভিতরে এসো।’ যে মাইক্রোস্কোপে তিনি কাজ করছিলেন তাঁর স্টেজ ছোট্ট একটি ল্যাম্পে আলোকিত ছিল; তাছাড়া সম্পূর্ণ ঘরটি অন্ধকারে ডুবে ছিল। এরকম নিরানন্দ পরিবেশে আমার বক্তব্য উপস্থাপনে বারবার হোঁচট খাচ্ছিলাম। আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রজাতির মাছি আবিষ্কার করেছি। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, চিটাগুড়ের মুককিট থেকেই এর উদ্ভব ঘটেছে। আমি মুলারকে কোনোভাবে বিব্রত করতে চাইনি কিন্তু... ‘এটি কি ডিপটেরার চেয়ে লেপিডপটেরার বেশি কাছাকাছি?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। আর তাঁর মুখ তখন নিচ থেকে ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। আমি জানতাম না এর কী অর্থ, তাই তাঁকেই ব্যাখ্যা করতে হলো, ‘এর কি বড় বড় পাখা আছে? এর কি পশমময় শুঙ্গ আছে?’ আমি বিষণ্নভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে মত দিলাম।
মুলার মাথার ওপরের বাতিটি জালালেন এবং মৃদু হাসলেন। এটা একটা পুরোনো গল্প। এটা এক ধরনের নিশি প্রজাপতি বা মথ, যা ড্রসোফিলা জেনেটিকস গবেষণাগারগুলোতে অভিযোজিত হয়েছিল। এটি ফলপোকার মতো নয় বা ফলপোকার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কও নেই। এটি যা চায় তাহলো ফলপোকার চিটাগুড়। উদাহরণস্বরূপ, ফলপোকাগুলোকে যুক্ত বা মুক্ত করতে দুধের বোতলের ছিপি খোলা ও বন্ধ করার জন্য ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানদের যে সামান্য সময় দরকার, তাতেই মা মথ অতিদ্রুত সু-স্বাদু চিটাগুড়ে ডিম পেড়ে বেরিয়ে আসে। আমি কোনো ম্যাক্রোমিউটেশন আবিষ্কার করিনি। আমি কেবল হোঁচট খেয়েছিলাম প্রকৃতির অন্য একটি চমত্কার অভিযোজন প্রক্রিয়ায়, যা নিজেই একটি মাইক্রোমিউটেশন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলাফল।
বিবর্তনের মূলমন্ত্রই হলো মৃত্যু ও সময়—এটি হলো অসংখ্য প্রাণরূপের সেই মৃত্যু, যারা পরিবেশের সঙ্গে অসম্পূর্ণরূপে অভিযোজিত হয়েছিল; আর এটি হলো সেই সময় যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিব্যক্তির (মিউটেশনে) দীর্ঘ পর্যায়ক্রমের জন্য ব্যয়িত হয়েছে, যেগুলো ঘটনাক্রমে অভিযোজিত হয়েছিল, যা উপযুক্ত মিউটেশনের বিন্যাসগুলোর পুঞ্জীভবনের জন্যও ব্যয়িত হয়েছে। ইয়নের চেয়ে অনেক ছোট যে সহস্রাব্দ তাকে বোঝার ক্ষেত্রে আমরা যে দুর্বোধ্যতার সম্মুখীন হই তার ফলেই কিছু পরিমাণে ডারউইন ও ওয়ালেসের মতবাদের বিরোধিতা গড়ে ওঠে। যে জীবের আয়ুষ্কাল সাত কোটি বছরের এক নিযুতাংশ মাত্র, তার কাছে এই সুদীর্ঘ সময়টি কিভাবে প্রতিভাত হয়? আমরা হলাম প্রজাপতির মতো, যারা একটি দিনকে মহাকাল ভেবে বসে আছে।
এখানে এই পৃথিবীতে যা ঘটেছিল, তা সম্ভবত অনেক জগতের বা গ্রহে প্রাণের বিবর্তনের সাধারণ ঘটনাও হতে পারে। কিন্তু আমরা যদি প্রোটিন রসায়ন অথবা ‘নিউরোলজি অব ব্রেন’ -এর মতো অনুপুঙ্খ ব্যাপারগুলো বিবেচনা করি তাহলে পৃথিবীর এই গল্পগুলো সমস্ত মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে অনন্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস ও ধূলিকণা জমাট বেঁধে ৪ শত ৬০ কোটি বছর আগে এ পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা ফসিল রেকর্ড হতে জানি প্রাণের উত্পত্তি ঘটেছিল এর পরপরই, সম্ভবত প্রায় ৪ শত কোটি বছর আগে, আদিম পৃথিবীর জলাশয়ে অথবা মহাসাগরে। অবশ্য প্রথম জীবন এককোষী প্রাণের মতো এতটা জটিল অবস্থায় ছিল না, উদ্ভবের পর থেকেই এককোষী প্রাণ উচ্চস্তরের শৃঙ্খলাপূর্ণ গঠন কাঠামো অর্জন করেছিল। প্রথম স্পন্দন ছিল খুবই সরলমানের। ওই প্রাচীন দিনগুলোতে, সূর্য থেকে আগত অতিবেগুনি রশ্মি ও বিদ্যুত্ চমকানি আদিম আবহমণ্ডলে সরল হাইড্রোজেন-সমৃদ্ধ অণুগুলো ভেঙে পৃথক করেছিল, সেই টুকরো অংশগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংযুক্ত বা মিলিত হয়ে আরো জটিল অণু তৈরি করল। এই আদিম রাসায়নিক উপাদানগুলো মহাসাগরে দ্রবীভবনের মাধ্যমে ক্রমশ জটিলতার দিকে অগ্রসর হওয়া এক প্রকারের জৈব সুপ তৈরি হচ্ছিল, যে পর্যন্ত না একদিন, আকস্মিকতার মাঝে, একটি অণু জৈব স্যুপের অন্যান্য অণুকে নির্মাণের উপাদান (বিল্ডিং ব্লক) হিসেবে ব্যবহার করে নিজের প্রতিরূপ তৈরিতে সামর্থ্য হয়েছিল স্থূলভাবে। (এ বিষয়ে আমরা পরবর্তী সময়ে আবার ফিরে আসব)।
এটি ছিল ডি-অক্সিরিবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ)-এর সবচেয়ে প্রাচীন পূর্বপুরুষ। বলা যায়, পৃথিবীতে প্রাণ নিয়ন্ত্রণকারী অণু বা মাস্টার মলিকিউল। মইয়ের আকারের এই অণুটি স্ক্রুর মতো পেঁচিয়ে হেলিক্সে পরিণত হয়েছে। মইয়ের সিঁড়িগুলো ৪টি বিভিন্ন আণবিক অংশেই পড়ে, যেগুলো জেনেটিক কোডের ৪টি অক্ষর দিয়ে গঠিত হয়। নিউক্লিটাইড বলে কথিত এই ধাপ বা সিঁড়িগুলো নির্দিষ্ট প্রাণ গঠনের জন্য বংশগতির নির্দেশাবলি লিপিবদ্ধ করে। পৃথিবীতে প্রত্যেক প্রাণ কাঠামোর আছে ভিন্ন ভিন্ন একগুচ্ছ নির্দেশাবলি, লেখা হয় মূলগতভাবে একই ভাষায়। প্রাণীগুলোর ভিন্নতার কারণটি হলো তাদের নিউক্লিক অ্যাসিডের নির্দেশাবলির পার্থক্য। পরিব্যক্তি বা মিউটেশন হলো নিউক্লিটাইডের পরিবর্তন, যা পরবর্তী প্রজন্মে বহমান, যা সত্যিকারভাবে বংশ বিস্তারে অংশ নেয়। যেহেতু পরিব্যক্তি মাত্রই নিউক্লিটাইডের অনিয়ন্ত্রিত বা দৈবপরিবর্তন তাই পরিব্যক্তির প্রায় সমস্ত পরিবর্তনের বেশির ভাগই ক্ষতিকর বা জীবাত্মক, যেগুলো অকার্যকর এনজাইমের অস্তিত্ব কোডবদ্ধরত। কোনো প্রাণীর অপেক্ষাকৃত কার্যকর অবস্থার দিকে পরিবর্তন আনতে পরিব্যক্তির লেগে যায় দীর্ঘকাল। কিন্তু তারপরও এক সেন্টিমিটারের কোটি ভাগের একভাগ দৈর্ঘ্যের নিউক্লিটাইডের ছোট্ট অথচ ভালো একটা পরিবর্তন অবসম্ভাবনাময় বা বিরল এক ঘটনা, তবে এভাবে বিবর্তন এগিয়ে চলেছে।
৪ শত কোটি বছর আগে, পৃথিবী ছিল স্বর্গ উদ্যানের অণু বাগান। তবে সেখানে কোনো ধ্বংসাত্মক জীবাণু ছিল না। কিছু অণু নিজেদের পুণরুত্পাদন করত অদক্ষভাবে, তারা নির্মাণ উপাদানগুলোর (বিল্ডিং ব্লকগুলো) জন্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করত এবং নিজেদের স্থূল প্রতিরূপগুলো পরিত্যক্ত হতো। পুনরুত্পাদন, পরিব্যক্তি ও স্বল্প দক্ষ প্রকারভেদের নির্বাচনমূলক বিলোপের মাধ্যমে বিবর্তন ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল, এমনকি অণু-পর্যায়েও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা পুনরুত্পাদনে ক্রমশ দক্ষ হয়ে উঠল। ফলস্বরূপ বিশেষ এক ধরনের কাজের উপযোগী অণুগুলো গ্রন্থিবদ্ধ হয়ে অণুগুচ্ছ তৈরি করল, আর এরাই হলো প্রথম জীবকোষ। আজ উদ্ভিদ কোষের রয়েছে ক্লোরোপ্লাস্ট নামক ক্ষুদ্র অণু কারখানা, যেগুলো সালোক সংশ্লেষণের দায়িত্বে রয়েছে—সূর্যালোক, পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইডকে কার্বোহাইড্রেড ও অক্সিজেনে রূপান্তরিত করা। রক্তকোষে রয়েছে মাইটোকন্ড্রিয়ন নামের ভিন্ন ধরনের এক অণু কারখানা, যা খাদ্য ও অক্সিজেনের সমন্বয়ে কার্য উপযোগী শক্তি উত্পাদন করে। এই কারখানাগুলো আজ যদিও প্রাণী ও উদ্ভিদ কোষে ঠাঁই নিয়েছে, অথচ কোনো একসময় তারাই হয়তো মুক্ত-স্বাধীন জীবকোষ হিসেবে বিদ্যমান ছিল।
তিনশ কোটি বছর আগে, কতগুলো এককোষী উদ্ভিদ একত্রিত হয়েছিল, সম্ভবত একটি একক জীবকোষের একবার বিভাজনের পরও কোনো এক মিউটেশনে ওই কোষটিকে পৃথক হওয়া থেকে বিরত রেখেছিল। এভাবেই প্রথম বহুকোষী জীবের উদ্ভব ঘটল। আমাদের শরীরের প্রত্যেক কোষই স্ব-নিয়ন্ত্রিত, এই মুক্ত অংশগুলো নিয়ে সবাই সাধারণ মঙ্গলের জন্য একবার একত্রিত হয়েছিল। এবং আমরা এক কোটি কোটি কোষের সমন্বয়ে তৈরি। আমরা, আমাদের প্রত্যেকে, বহুকোষী প্রাণের একীভূত রূপ।
মোটামুটিভাবে দুইশ কোটি বছর আগে যৌন প্রজননের উদ্ভব ঘটেছিল বলে মনে হয়। তার আগ পর্যন্ত বংশগতির নির্দেশাবলিতে পরিব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত ধারাবাহিকতায়—অক্ষরের পর অক্ষরের পরিবতর্েনর নির্বাচন ঘটিয়ে নতুন প্রকারের জীবের আবির্ভাব ঘটত। বিবর্তন অবশ্যই বিরক্তিকর রকমের ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া। যৌনপ্রজননে দুটো জীব তাদের ডিএনএ সংকেত লিপির প্যারাগ্রাফ, পৃষ্ঠা ও বই বিনিময়ের করে নতুন প্রকরণের উদ্ভব ঘটায়; যা নির্বাচনের ছাঁকনিতে যাচাইয়ের অপেক্ষা করে। যৌন প্রজননে নির্বাচিত জীবেরা—যারা এতে নিরুত্সাহী তারা দ্রুত বিলুপ্ত হয়। তবে এটি শুধু দুইশ কোটি বছর আগের অণুজীবের বেলায় সত্য নয়, আজকের মানুষেরাও ডিএনএর অংশ বিনিময়ের জন্য উদগ্রীব।
প্রায় একশ কোটি বছর আগে, উদ্ভিদসমূহ সমেবেত কাজের মাধ্যমে পৃথিবীর আবহমণ্ডলে এক চমকপ্রদ পরিবর্তন ঘটায়। সবুজ উদ্ভিদ উত্পন্ন করে অক্সিজেন অণু। যেহেতু সেসময় পৃথিবীর আবহমণ্ডল ছিল হাইড্রোজেনে সমৃদ্ধ আর সাগর-মহাসাগর ছিল সবুজ উদ্ভিদে পরিপূর্ণ। ফলে আবহমণ্ডলের হাইড্রোজেন-সমৃদ্ধ চরিত্রকে একমুখী পরিবর্তন ঘটিয়ে অক্সিজেন গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়। আর সেই সঙ্গে শেষ হতে থাকে অজৈব প্রক্রিয়ায় জীবের উপাদান সৃষ্টির অধ্যায়। কিন্তু অক্সিজেনের প্রবণতা হলো জৈবিক অণুকে ভেঙে ফেলা। এর প্রতি আমাদের আসক্তি থাকা সত্ত্বেও এটি অরক্ষিত জৈবিক বস্তুর জন্য মৌলিকভাবে বিষ। অক্সিজেন যৌগসম্পন্ন আবহমণ্ডলের রূপান্তর প্রাণের ইতিহাসে মহাসংকটময় অবস্থা তৈরি করেছিল এবং বিপুল সংখ্যক প্রাণী অক্সিজেনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অসামর্থ্য হয়, ফলে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তারপরও বোটালিজম ও টিটেনাস বেসিলির মতো অল্প কিছু সংখ্যক আদিমজীব টিকে থাকতে সামর্থ্য হয়েছে, এমনকি আজকের মুক্ত অক্সিজেন-সম্পন্ন আবহমণ্ডলেও। পৃথিবীর আবহমণ্ডলে নাইট্রোজেন হলো অনেকটা নিষ্ক্রিয় গ্যাস এবং সেই কারণে অক্সিজেন অপেক্ষা অধিক সহনীয়। কিন্তু এটাও জীব প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট। এভাবে পৃথিবীর আবহমণ্ডলের শতকরা ৯৯ ভাগই জীবীয় উেসর (biological origin)। আকাশ হলো প্রাণগোষ্ঠীর মাধ্যমে তৈরি।
প্রাণের ৪০০ কোটি বছরের ইতিহাসে বেশির ভাগ সময় রাজত্ব করেছে নীলাভ-সবুজ শৈবালের মতো অনুজীবেরা, যেগুলো সাগর-মহাসাগর আবৃত্ত ও পরিপূর্ণ করে রেখেছিল। তারপর ৬০ কোটি বছর পূর্বে, শৈবালের একচেটিয়া রাজত্ব বা প্রভাব ভেঙে পড়ে এবং সদ্য উদ্ভবিত নতুন রূপের প্রাণের বিপুল বৃদ্ধি ঘটে, এই ঘটনাকে ক্যামব্রীয় বিস্ফোরণ বা ক্যামব্রিয়ান এক্সপ্লোরেশন বলে। পৃথিবী সৃষ্টির প্রায় পরপরই জীবনের বিকাশ ঘটেছিল, তাই বলা যায় পৃথিবী সদৃশ গ্রহগুলোয় জীবনের উত্পত্তি হলো অবশ্যম্ভাবী রাসায়নিক প্রক্রিয়া। কিন্তু তিনশ কোটি বছরে জীব-জগত্ নীলাভ-সবুজ শৈবাল থেকে খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি, তাতে মনে হয়, বিশেষ অঙ্গপ্রতঙ্গসম্পন্ন প্রাণের বিকাশ ঘটা কঠিন, এমনকি প্রাণের উত্পত্তি থেকেও। সম্ভবত অনেক গ্রহ আছে অণুজীবে পরিপূর্ণ কিন্তু বড় কোনো পশু ও শাকসবজি নেই।
ক্যামব্রীয় বিস্ফোরণের পরপরই সাগর-মহাসাগর নানা কাঠামোর বিভিন্ন প্রাণে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। প্রায় ৫০ কোটি বছর আগে, ট্রাইলোবাইটরা বিপুল সংখ্যায় ছড়িয়ে পড়েছিল, তাদের গঠন ছিল খুবই সুন্দর, বড় বড় পোকার মতো ছোট ছিল; কিন্তু সমুদ্র সমতলে তারা শিকার করে বেড়াত। তারা চোখে পোলারাইজড আলোকে চিহ্নিত করার জন্য ক্রিস্টাল পুঞ্জীভূত করেছিল। কিন্তু বর্তমানে কোনো জীবন্ত ট্রাইলোবাইট নেই; তারা ২০ কোটি বছর ধরেই নেই। যে সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণী দ্বারা পৃথিবী বসবাসের উপযোগী হয়েছিল, তাদের কারোরই আজ প্রাণময় চিহ্ন নেই। এবং অবশ্যই বর্তমানে বিচরণশীল কোনো প্রাণীরই একসময় কোনো অস্তিত্ব ছিল না। প্রাচীন শিলাতে আমাদের মতো প্রাণীদের কোনো চিহ্ন নেই। প্রজাতিরা পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে উদ্ভব ঘটে, মোটামুটি একটা সময় বসবাস করে আবার সময়ের অস্থিরতায় হারিয়ে যায়।
ক্যামব্রীয় বিস্ফোরণের আগে, প্রজাতি থেকে প্রজাতির উদ্ভবের গতি যথেষ্ট মন্থর ছিল বলে মনে হয়। অংশত এটা এই কারণে ঘটে যে, ক্রমশ সুদূর অতীতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভীষণভাবে আমাদের তথ্য ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে আমরা আধবোজা চোখে তাকাই; আমাদের গ্রহের আদি ইতিহাসে কম প্রাণীরই শক্ত প্রতঙ্গ ছিল এবং নরম জীবগুলো স্বল্প কিছু ফসিল অবশেষ রেখে গেছে। তবে ক্যামব্রীয় বিস্ফোরণের পূর্বে নাটকীয়ভাবে নতুন কাঠামোর জীব উত্পত্তির অতি ধীর গতিই হলো বাস্তব; জীবকোষ গঠন ও প্রাণ রসায়নের কষ্টসহিষ্ণু জটিল বিবর্তন বহিঃঅবয়ব গঠনে এমন কোনো তাত্ক্ষণিক ছাপ ফেলেনি, যা জীবশ্ম রেকর্ডের মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব। ক্যামব্রীয় বিস্ফোরণের পর আশ্চর্য সব নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটতে থাকে শ্বাসরুদ্ধকর গতিতে। প্রথম মত্সকুল এবং প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণীর দ্রুত পর্যায়ক্রমিক আবির্ভাব ঘটে। যে উদ্ভিদ আগে সমুদ্রে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো স্থলভাগে উপনিবেশ গড়তে শুরু করে; প্রথম প্রতঙ্গের উদ্ভব ঘটলে, এর বংশধরেরা স্থলভাগের প্রাণীকুলের উপনিবেশ তৈরির পথ প্রদর্শকে পরিণত হয়েছিল; উভচর প্রাণীর সঙ্গে পাখাবিশিষ্ট পতঙ্গের আবির্ভাব ঘটল, জীবগুলো ছিল অনেকটা ফুসফুসসম্পন্ন মাছের মতো, যারা স্থলে ও জলে টিকে থাকার উপযোগী হয়েছিল; প্রথম গাছ ও প্রথম সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর আবির্ভাব ঘটল; এলো ডায়নোসরেরা; স্তন্যপায়ীদের উদ্ভব ঘটল, তারপর প্রথম পাখিরা এলো; ফুলের আগমন ঘটল; ডায়নোসরেরা বিলুপ্ত হয়ে গেল; ডলফিন ও তিমিদের পূর্বপুরুষ সবচেয়ে আদিম দন্তুর তিমি বর্গীয় প্রাণীর আগমন ঘটেছিল এবং একই কালপর্বে প্রাইমেটদের আবির্ভাব ঘটেছিল—বানর, নরবানর ও মানুষের পূর্বপুরুষ। এক কোটি বছরেরও কম সময়ের আগে মগজের লক্ষণীয় বর্ধিত আয়তনসহ এমন এক ধরনের জীবের উদ্ভব ঘটল, যা অনেকাংশে মানুষের মতো। তারপর ২০/৩০ লক্ষ বছর (a few million years) পূর্বে প্রথম সত্যিকারের মানুষের উদ্ভব ঘটল।
মানুষেরা বনে-জঙ্গলে বেড়ে উঠেছিল; এগুলোর জন্য আজও আমাদের স্বাভাবিক আকর্ষণ রয়ে গেছে। কত মনোমুগ্ধকর একটি গাছ, টান টান করে আকাশের দিকে ডালাপালা মেলে থাকে। এর পাতাগুলো সালোকসংশ্লেষণে সূর্যরশ্মিকে সঞ্চিত করে। সুতরাং গাছেরা পার্শ্ববর্তীদের সঙ্গে ছায়া বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নামে। একটু ভালোভাবে তাকালে প্রায়ই লক্ষ করা যায় দুটো গাছ পরস্পরকে ঠেলছে এবং অবসাদগ্রস্তের মতো হালকাভাবে ধাক্কা দিচ্ছে। গাছগুলো হলো বিশাল ও সুন্দর যন্ত্র, সূর্য-রশ্মির শক্তিপ্রাপ্ত, ভূমি হতে পানি এবং বায়ু হতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিচ্ছে, এই পদার্থগুলোকে খাদ্যে রূপান্তরিত করছে নিজেদের জন্য এবং সেই সঙ্গে আমাদেরও। উদ্ভিদীয় কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করার উদ্দেশে উদ্ভিদ কার্বোহাইড্রেট ব্যবহারের মাধ্যমে একে শক্তি-উত্স হিসেবে তৈরি করে। এবং আমরা প্রাণীরা, যারা মূলত উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল পরজীবী, তারা ছিনিয়ে নিই (steal) সেই কার্বোহাইড্রেট, যাতে আমাদের কর্মকাণ্ড চালাতে পারি।
আমরা শ্বাস গ্রহণের সময় প্রাপ্ত অক্সিজেন রক্তে দ্রবীভূত করি। আর খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে কার্বোহাইড্রেট সংগ্রহ করে রক্তে দ্রবীভূত অক্সিজেনের সঙ্গে অসচেতনভাবেই যুক্ত করি। ফলে সেই শক্তি তৈরি হয় যা আমাদের চালিয়ে নিয়ে বেড়ায়। এই প্রক্রিয়ায় আমরা কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে দিই, যাকে উদ্ভিদ আবার রিসাইকেল বা নবায়নে আরো অধিক কার্বহাইড্রেট তৈরি করে। কী চমত্কার পারস্পরিক সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা—উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রত্যেকেই একে অন্যের নিঃসৃত উপাদান শ্বসনরত, এক ধরনের গ্রহব্যাপী মুখ থেকে পেট পর্যন্ত (mouth to-stnoma) বিস্তৃত। বিস্তৃত চক্রটি চালিত হয় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরের নক্ষত্র থেকে শক্তি আহরণের মাধ্যমে।
জানা মতে, এক হাজার কোটি প্রকারের জৈব-অণু থাকলেও সেগুলোর মাত্র পঞ্চাশটি জীবনের মূল কার্যক্রমে ব্যবহূত হয়। বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে পরিমিত ও দক্ষভাবে একই রকমের বিন্যাস বারবার যুক্ত হয়। পৃথিবীতে প্রাণের একেবারে মূলে তাকালে আমরা দেখব প্রোটিন অণু যা নিয়ন্ত্রণ করে কোষ রসায়নকে এবং নিউক্লিক অ্যাসিড অণু যা বহন করে বংশগতির নির্দেশাবলি আর সকল উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষেত্রে ওই অণুগুলোকে আমরা মূলগতভাবে অভিন্ন লক্ষ করি। একটি ওক গাছ ও আমি একই উপাদানে তৈরি। যদি আমরা অনেক পেছনে যাই, তাহলে দেখব আমাদের আছে একই সাধারণ পূর্বপুরুষ।
গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রের জগতের মতো জীবকোষও জটিল ও সুন্দর এক ব্যবস্থা। কোষের এই ধরনের বিস্তৃত কার্যপ্রক্রিয়ার উদ্ভব ঘটেছে চারশ কোটি বছর ধরে কষ্টসহিষ্ণু পথে। কোষীয় প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে খাদ্যাংশগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়। আজকের রক্তের শ্বেত কণিকা হলো গতকালের ক্রিমড স্পিনিয়াক। কিভাবে কোষ এটা করে? ভেতরটা হলো গোলকধাঁধাতুল্য ও সূক্ষ্ম স্থাপত্য, যা রক্ষণাবেক্ষণ করে আপন কাঠামোকে, রূপান্তর ঘটায় অণুগুলোকে, সঞ্চিত করে শক্তিকে এবং নিজস্ব প্রতিরূপ তৈরির জন্য প্রস্তুত হয়। যদি আমরা একটি কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারতাম, তাহলে দেখতাম—আণবিক কণাগুলোর অনেকে হলো প্রোটিন অণু, কতগুলো প্রবল উত্তেজক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত, অন্যরা অপেক্ষারত মাত্র। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন হলো এনজাইম, যারা কোষের রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এনজাইমগুলো হলো বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোড়া দেওয়ার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মতো, প্রত্যেকেই আণবিক স্তরের একেকটি নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ; ধরি, এক ধরনের এনজাইম ৪র্থ ধাপে বর্ণিত কাজ করে যা হলো নিউক্লিওটাইড গুয়ানোসাইন ফসফেট গঠন করা, অথবা ১১ ধাপে বর্ণিত কাজে দক্ষ, যা চিনির অণু ভেঙে শক্তি বের করে, এই শক্তিটি অন্যান্য কোষীয় কাজ সম্পন্ন হওয়ার জন্য দরকার। কিন্তু এনজাইমগুলো এই প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে না। তারা তাদের নির্দেশাবলি দায়িত্বপ্রাপ্ত ওগুলো হতে পাঠানো নির্দেশের ভিত্তিতে গ্রহণ করে এবং বাস্তবিকই নিজেদের নির্মাণ করে। প্রধান ওই অণুগুলো হলো নিউক্লিক অ্যাসিড। তারা বসবাস করে আলাদা অবস্থায় গোপনীয় জায়গায় কোষের গভীরে, নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে।
যদি আমরা একটি রন্ধ্রের মধ্যদিয়ে কোষের নিউক্লিয়াসে প্রবেশ করতে পারতাম, তাহলে আমরা দেখতাম সেমাইয়ের ফ্যাক্টরির মতো কতগুলো জিনিস—বিশৃঙ্খলভাবে বহুসংখ্যক কয়েল ও স্ট্রান্ড, সেগুলো হলো নিউক্লিক অ্যাসিডের দুটো প্রকার :একটি হলো ডিএনএ, যা জানে কী করতে হবে এবং অন্যগুলো আরএনএ, যা ডিএনএর তৈরি তথ্যাবলি কোষের বাকি অংশে বহন করে নিয়ে যায়। এগুলো হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা বিবর্তনের চারশ কোটি বছরে উত্পন্ন হতে পেরেছিল, কিভাবে একটি কোষকে, একটি গাছকে, অথবা একটি মানুষকে তৈরি করতে হবে সে সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তথ্যাবলি ধারণ করে। মানুষের ডিএনএতে তথ্যাবলির পরিমাণ, যদি সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করা হয় তাহলে তা জায়গা নেবে একশ মোটা খণ্ডের গ্রন্থে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিএনএ অণু খুবই কম ব্যতিক্রম ঘটিয়ে কিভাবে নিজেদের অভিন্ন প্রতিরূপ তৈরি করতে হয়, তা জানে। তারা জানে বিস্ময়করভাবে বেশি।
ডিএনএ হলো ডাবল হেলিক্স, সর্পিল সিঁড়ির মতো দুটো প্যাঁচানো সুতা। এটা হলো উপাদান সম্বলিত সুতার যে কোনোটির বরাবর নিউক্লিটাইডের ধারাক্রম বা শৃঙ্খলা যেগুলো হলো জীবনের ভাষা। পুনরুত্পাদনের সময় হেলিক্সগুলো পৃথক হয়ে পড়ে বিশেষ পাকখোলা প্রোটিনের সহায়তায়, কোষ নিউক্লিয়াসের সান্দ্র তরলে চারদিকে ভাসমান নিউক্লিওটাইড নির্মাণ উপাদান দিয়ে প্রত্যেকে অন্যটির অভিন্ন কপি সংশ্লেষণরত। একবার পাকখোলা যদি নিয়ন্ত্রণাধীন হয়, তাহলে ডিএনএ পলিমারেজ নামে একটি উল্লেখযোগ্য এনজাইম তার সাহায্যগুলো নিশ্চিত করে যে প্রতিরূপ তৈরির কাজগুলো প্রায় নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। যদি কোনো ভুল থাকে, তাহলে এমন ধরনের এনজাইম আছে যারা কেটে ভুলটিকে বের করে এবং সঠিকগুলো দ্বারা ভুল নিউক্লিওটাইডগুলোকে প্রতিস্থাপিত করে। এই এনজাইমগুলো হলো বিস্ময়কর ক্ষমতাসম্পন্ন আণবিক মেশিন বা মলিকুলার মেশিন।
নিজের একদম নিখুঁত প্রতিরূপ তৈরি করা ছাড়াও যা বংশানুগতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। নিউক্লীয় ডিএনএ সরাসরি কোষের কার্যক্রমকে পরিচালনা করে; আবার এটা হলো সেই বিপাকক্রিয়া, যা সম্পন্ন হয় বার্তাবাহক আরএনএ নামে অন্য নিউক্লিক অ্যাসিড সংশ্লেষণের মাধ্যমে। যাদের প্রত্যেকে চলে যায় বহিঃনিউক্লীয় অঞ্চলে এবং সেখানে এনজাইমের গঠনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে। সবকিছু সম্পন্ন হলে একটি একক এনজাইম অণুর উদ্ভব ঘটে, যেটি কোষ রসায়নের কোনো নির্দিষ্ট কার্যধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে সেই সময়।
মানুষের ডিএনএ হলো শতকোটি নিউক্লিওটাইডের সমান লম্বা একটি মই। নিউক্লিওটাইডের সম্ভাব্য সমাবেশগুলোর বেশিরভাগ অর্থহীন :তারা এমন সব প্রোটিনের সংশ্লেষণ ঘটায় তা কোনো উপযোগী কার্যক্রম সম্পন্ন করে না। শুধু নিউক্লিক অ্যাসিড অণুগুলোর অতি সীমিত সংখ্যা হলো আমাদের মতো জটিল প্রাণ গঠনের জন্য কোনো না কোনোভাবে উপযোগী। এমনকি এটা হলেও নিউক্লিক অ্যাসিডগুলোকে একত্রে রাখার উপযোগী সংখ্যাও হতবুদ্ধিকরভাবে বিপুল—সম্ভবত বিশ্বে ইলেকট্রন-প্রোটনের সর্বমোট সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। সেই মতানুসারে এ পর্যন্ত যত মানুষ বাস করে গেছেন তারচেয়েও ব্যাপক সংখ্যক স্বতন্ত্র মানুষ সম্ভব :মানব প্রজাতির নতুন অস্তিত্বের সম্ভাবনার বিস্তৃতি হলো অপরিমেয়। প্রত্যাশা মাফিক যেকোনো বৈশিষ্ট্যের কথা চিন্তা করি না কেন, তা উত্পন্ন করার জন্য ভবিষ্যতে হয়তো নিউক্লিওটাইডগুলোকে ইচ্ছা মাফিক শৃঙ্খলায় সমবেশ ঘটাতে সক্ষম হব। এটা একটি মারাত্মক ও উদ্বেগজনক সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ছবি ইঙ্গিত করে।
পরিব্যক্তি ও নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিবর্তন কাজ করে। প্রতিরূপ তৈরির সময় এনজাইম ডিএনএ পলিমারেজ কোনো ভুল করলে পরিব্যক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে। কিন্তু এটা ভুল খুব কমই করে। তেজষ্ক্রিয়তা অথবা সূর্য হতে আসা অতিবেগুনি বা মহাজাগতিক রশ্মি বা আবহমণ্ডলের রাসায়নিক পদার্থের কারণে পরিব্যক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে, যেগুলোর সবাই নিউক্লিটাইডগুলোকে অথবা নিউক্লিক অ্যাসিডগুলোকে ঠিকমতো গ্রন্থীভুক্ত করার ব্যাপারে পরিবর্তন ঘটাতে পারে বা বাধা দিতে পারে। যদি পরিব্যক্তির হার খুব বেশি হয়, আমরা ৪০০ কোটি বছরের কষ্টসহিষ্ণু জটিল বিবর্তনের বংশানুসৃতি হারাব। এটা যদি খুবই কম হয় তাহলে এমন কোনো নতুন প্রকরণের উদ্ভব ঘটবে না যা ভবিষ্যত্ পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের সহায়ক হবে। প্রাণের বিবর্তনের জন্য প্রয়োজন পরিব্যক্তি ও নির্বাচনের মধ্যকার মোটামুটি একটা সাম্যাবস্থা। যখন সাম্যাবস্থা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, তখন উল্লেখযোগ্য মাত্রার অভিযোজন সম্ভব।
কোনো একক ডিএনএ নিউক্লিটাইডে একটি পরিবর্তন সেই ডিএনএ সংকেতলিপি সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট প্রোটিনের অভ্যন্তরে কোনো একক অ্যামিনো অ্যাসিডে একটি পরিবর্তন ঘটায়। ইউরোপীয় বংশধররূপে উদ্ভূত মানুষদের লাল রক্তকোষ স্থূলভাবে বর্তুলাকার দেখায়। আফ্রিকায় বংশোদ্ভূত কিছু মানুষের লালরক্ত কোষ দেখায় কাস্তের বা অর্ধচন্দ্রের মতো। অধচন্দ্রাকৃত কোষ অপেক্ষাকৃত কম অক্সিজেন বহন করে এবং ফলাফলস্বরূপ সঞ্চারিত করে এক প্রকারের রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়া। তারা ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ তৈরি করে। বলা বাহুল্য মরার চেয়ে রক্তস্বল্পতা অধিক ভালো। মানুষের সাধারণ কোষে ডিএনএর এক হাজার কোটির একটি একক নিউক্লিটাইডের পরিবর্তনের ফলাফল হলো রক্তের ক্রিয়াকলাপের ওপর বড় ধরনের প্রভাব—এতটাই ব্যাপক যে লাল রক্তকোষের ফটোগ্রাফগুলোয় তাত্ক্ষণিকভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে। অন্যান্য বেশিরভাগ নিউক্লিটাইডের পরিবর্তনের ফলাফল সম্পর্কে আমরা এখনো অজ্ঞ।
আমাদের মানুষদের একটা গাছ হতে অনেক ভিন্ন দেখায়। সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়, একটা গাছ অপেক্ষা আমরা ভিন্নভাবে জগতকে উপলব্ধি করি। কিন্তু আমরা যদি গভীরে প্রবেশ করি, প্রাণের আণবিক ভিত্তিতে, তাহলে আমরা দেখব গাছগুলো ও আমরা মূল উপাদানগতভাবে অভিন্ন। আমরা উভয়ই বংশগতির জন্য নিউক্লিক অ্যাসিড ব্যবহার করি; আমরা উভয়ই প্রোটিনকে এনজাইম হিসেবে আমাদের কোষ রসায়নকে নিয়ন্ত্রণে কাজে লাগাই। খুবই তাত্পর্যপূর্ণভাবে আমরা উভয়েই একই কোড বুক, নিউক্লিক অ্যাসিডের তথ্য প্রোটিনের তথ্যে রূপান্তরে যথাযথভাবে ব্যবহার করি এবং আমাদের গ্রহে যত ধরনের প্রাণ আছে, তারা কার্যত সবাই এই কাজ করে থাকে*। আণবিক পর্যায়ের ঐক্যের ব্যাখ্যা থেকে একথা বলা যায় যে, আমাদের গ্রহের প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আমাদের সবাই—গাছ, মানুষ, অ্যাংলার মাছ, রুটির ছত্রাক ও জলের শ্যাওলা—প্রাণ উত্পত্তির একটি একক এবং সাধারণ অবস্থা হতে বংশধর হিসেবে উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু কিভাবে জটিল অণুর উদ্ভব ঘটেছিল?
*পাদটিকা :এ পৃথিবীর সকল জীবের সকল অংশেরই জেনেটিক কোড অভিন্ন প্রতীয়মান হয়নি বলে প্রমাণ মেলে। কম করে হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে জানা যায়। যেমন :মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ তথ্য থেকে প্রোটিন তথ্যে প্রতিলিপি তৈরির কাজে ওই একই কোষে বিদ্যমান নিউক্লিয়াসের জিন কর্তৃক ব্যবহূত সংকেত থেকে ভিন্নতর। এ বিষয়টি মাইটোকন্ড্রিয়া ও নিউক্লিয়াসের জেনেটিক কোডের সুদীর্ঘকালের ব্যবধানের প্রতি ইঙ্গিত করে। এটি এই ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ যে মাইটোকন্ড্রিয়া শত কোটি বছর আগে স্বাধীন সত্তা হিসেবে কোষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মিথোজীবী সম্পর্কের মধ্যদিয়ে একীভূতভাবে অবস্থান করছিল। ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণে এককোষী জীবের উদ্ভব এবং বহুকোষী জীবের বিস্তারের মধ্যকার সময়ে কী রূপ বিবর্তন সংঘটিত হচ্ছিল তার একটি উত্তর হলো :দৈবচক্রে মিথোজীবিতার এই বিকাশ ও উদ্ভবের সূক্ষ্ম ক্রিয়াকাণ্ড।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গবেষণাগারে, অন্যান্য জিনিসের মধ্যে, প্রাকজীবীয় জৈব রসায়নের ওপর প্রাণসুরের কিছু নোট বা মূল উপাদান তৈরির জন্য আমরা কাজ করি। আমরা আদিম পৃথিবীর গ্যাসীয় উপাদানগুলোকে একত্রে মিশাই এবং স্ফুলিঙ্গ দিই :হাইড্রোজেন, পানি, অ্যামোনিয়া, মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড এতে ছিল। ঘটনাক্রমে, বর্তমানে সবগুলো বৃহস্পতিতেও বিদ্যমান, এমনকি মহাবিশ্বের সর্বত্র। বজ্রপাতের অনুরূপ স্ফুলিঙ্গ, যা প্রাচীন পৃথিবীতেও এবং এখনকার বৃহস্পতিতেও বিরাজমান। বিক্রিয়ার প্রথমে পাত্রটি ছিল স্বচ্ছ :মূল গ্যাসগুলোও রঙহীন, অর্থাত্ সামগ্রিকভবে অদৃশ্য ছিল। কিন্তু ১০ মিনিট বিদ্যুত্ স্ফুলিঙ্গ দেওয়ার পর দেখি একটা অদ্ভুত বাদামি রঞ্জক কাচের জারের চারপাশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। পাত্রের ভেতরটা আস্তে আস্তে মোটা বাদামি আলকাতরা বা টারের আবরণে অস্বচ্ছ হয়ে গেল। যদি আমরা প্রাচীন সূর্যের মতো অতিবেগুনি রশ্মিও মিশ্রিত গ্যাসের মধ্যদিয়ে প্রয়োগ করতাম তাহলে মোটামুটি একই ফল পাওয়া যেত। টার হলো জটিল জৈব-অণুর খুবই সমৃদ্ধ সমাবেশ, যেখানে প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিডের উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। বোঝা গেল জীবনের উপাদানগুলো খুব সহজেই তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের গবেষণা প্রথম করেছিলেন স্ট্যানলি মিলার ১৯৫০-এর দশকের প্রথম দিকে, তখন তিনি ছিলেন রসায়নবিদ হ্যারল্ড উরের গ্র্যাজুয়েট ছাত্র। উরে দৃঢ় মতামত দিয়েছিলেন যে আদিম পৃথিবী হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ ছিল, যেমন মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চল; একসময় এই হাইড্রোজেন পৃথিবী থেকে মহাশূন্যে চলে গেছে, কিন্তু অতিভর সম্পন্ন বৃহস্পতি থেকে হাইড্রোজেন বের হয়ে যেতে পারেনি; এবং পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছিল হাইড্রোজেন উধাও হওয়ার আগে। উরে পরামর্শ দিয়েছিলেন গ্যাসগুলোকে বিদ্যুত্ স্ফুলিঙ্গ দাও, তারপর কেউ একজন জিজ্ঞেস করেছিল এ ধরনের পরীক্ষায় কী কী তৈরি হওয়ার আশা করছেন তিনি। উরে উত্তর দিয়েছিলেন ‘বেইলস্টাইন’ (Beilstein)। বেইলস্টাইন হলো বৃহদায়তন বিশিষ্ট ২৮ খণ্ডের জার্মান সংক্ষিপ্ত সার, যেখানে রসায়নবিদদের জানা সমস্ত জৈব অণুর তালিকা আছে।
আদিম পৃথিবীতে শুধু সহজলভ্য গ্যাসসমূহ এবং রাসায়নিক বন্ধনকে ভেঙে ফেলার সামর্থ্যসম্পন্ন যেকোনো শক্তিউত্স ব্যবহারে আমরা উত্পন্ন করতে পারি প্রাণের মূল কাঠামোর উপাদানগুলো। কিন্তু আমাদের পাত্রে তৈরি হয় শুধুই প্রাণসুরের স্বরগুলো (আওয়াজগুলো)—প্রাণসুর নিজে নয়। আণবিক নির্মাণ কাঠামোর উপাদানগুলোকে অবশ্যই একত্রে মিলতে হবে সঠিক অনুক্রমে। প্রাণ মানেই অ্যামিনো অ্যাসিড অপেক্ষা অধিক কিছু, যা প্রোটিন তৈরি করতে পারে; প্রাণ মানেই নিউক্লিটাইড অপেক্ষা অধিক কিছু, যা নিউক্লিক অ্যাসিড তৈরি করতে পারে। তারপরও যথাযথভাবে এই নির্মাণ কাঠামো উপাদানগুলোর লম্বা-শৃঙ্খল বিন্যাসের মধ্যদিয়ে গ্রন্থিত করার ব্যাপারে পরীক্ষাগারে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। আদিম পৃথিবীর পরিবেশে অ্যামিনো অ্যাসিডগুলোকে একত্রিত করে প্রোটিন সদৃশ অণুতে পরিণত করা গেছে। তাদের কতগুলো ক্ষীণভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন এনজাইমগুলো করে। নিউক্লিটাইডগুলো একত্রিত হয় অল্প কয়েক ডজন একক সম্পন্ন লম্বা নিউক্লিক অ্যাসিড স্ট্রান্ডের শৃঙ্খলে। সঠিক পারিপার্শ্বিক অবস্থায় টেস্টটিউবে খাটো নিউক্লিক অ্যাসিডগুলো তাদের নিজেদের অবিকল অনুকৃতি সংশ্লেষণ করতে পারে।
কেউ এ পর্যন্ত আদিম পৃথিবীর গ্যাস ও পানি এমনভাবে একত্রে মেশাতে পারেনি, যাতে পরীক্ষার শেষে টেস্টটিউব থেকে কোনো কিছু হামাগুড়ি দিয়ে বেড়িয়ে এসেছে বা এসেছিল। সবচেয়ে ছোট জীবন্ত বস্তু গঠিত হয় ১০ হাজারেরও কম পরমাণু দিয়ে, যা ভাইরোড নামে পরিচিত। তারা চাষাবাদকৃত উদ্ভিদে বিভিন্ন রোগ ঘটায় এবং সম্ভবত খুবই সম্প্রতি সরল প্রাণের তুলনায় অপেক্ষাকৃত অধিক জটিল প্রাণবস্তু থেকে তাদের উদ্ভব ঘটেছে। বাস্তবিকই, যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই ভাবি না কেন, বর্তমানে এর চেয়েও সরল প্রাণ কল্পনা করা কঠিন যদি সেটা জীবন্ত হয়। ভাইরোডস ভাইরাসের মতো নয়, এর আবার প্রোটিনের আবরণ আছে এবং সামগ্রিকভাবে নিউক্লিক অ্যাসিড দিয়ে গঠিত। এগুলো সরল রৈখিক অথবা আবদ্ধ বৃত্তাকার জ্যামিতিসম্পন্ন আরএনএর একটি একক স্ট্রান্ডের চেয়ে বেশি কিছু নয়। ভাইরোড খুবই ছোট হতে পারে কিন্তু তখনো হয়ে ওঠে সতেজ কারণ এগুলো সর্বব্যাপী, চিরপরজীবী জীবাণু। ভাইরাসের মতো এগুলো খুব সরলভাবেই বেশ বড় আকৃতির একটি সুষ্ঠু কার্যকলাপসম্পন্ন কোষের অণু পর্যায়ের কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা করে এবং একে আরো কোষ তৈরির ফ্যাক্টরি থেকে ভাইরোড তৈরির ফ্যাক্টরিতে পরিণত করে।
জানা সবচেয়ে ছোট মুক্তজীবী প্রাণ হলো PPLO (প্লিওরোপনিউমোনিয়া সদৃশ প্রাণিসত্তা) এবং এ জাতীয় ক্ষুদ্র প্রাণী। এগুলো প্রায় ২৫ কোটি পরমাণু দিয়ে গঠিত। এ ধরনের প্রাণ, আরো স্ব-নির্ভরশীল হওয়ার কারণে ভাইরোড ও ভাইরাসের চেয়ে অধিকতর জটিল। কিন্তু আজকের পৃথিবীর পরিবেশ সরল প্রাণ গঠনের জন্য খুব একটা উপযোগী নয়। আমাদের একটি জীবন তৈরির জন্য কঠিন শ্রম দিতে হবে। অগ্রগামী জীবাণু বা শিকারি প্রাণীদের সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের গ্রহের প্রথম দিককার ইতিহাসে, যেভাবেই হোক, সূর্যের আলোয় হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ আবহমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ জৈব অণু উত্পন্ন হতো, তখন খুবই সরল, অ-পরজীবী প্রাণ উদ্ভবের একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। প্রথম জীবসমূহ হয়ে থাকতে পারে অনেকটা মুক্ত জীবন্ত ভাইরোডের মতো শুধু অল্প কয়েকশ নিউক্লিটাইডের লম্বা একটি শৃঙ্খল। প্রথম দিককার প্রাণ থেকে শুরু করে এই ধরনের জীব সৃষ্টির পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ এই শতাব্দীর শেষ (বিংশ শতাব্দীর) নাগাদ আরম্ভ হতে পারে। জেনেটিক কোডের উত্পত্তির ধারণার সহযোগিতা নিয়ে প্রাণের উত্পত্তি সম্বন্ধে অনেক কিছু বোঝা গেছে। যদিও আমরা এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছি মাত্র ৩০ বছর ধরে। প্রকৃতি এদিকে থেকে ৪০০ কোটি বছর এগিয়ে আছে। সবকিছুর বিচারে, আমাদের অগ্রগতি মন্দ নয়।
এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনোটিই পৃথিবীর পরিবেশে অনুপম নয়। প্রথম দিককার গ্যাসসমূহ এবং শক্তি উত্সগুলো মহাবিশ্বের সর্বত্র একইরকম। আমাদের পরীক্ষাগারের পাত্রে ঘটার মতো রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে জৈববস্তুগুলো এবং বিভিন্ন উল্কাপিণ্ডে প্রাপ্ত অ্যামিনো অ্যাসিড উত্পাদনের জন্যও দায়ী। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অন্য শতকোটি জগতে কিছু অনুরূপ রসায়নের উদ্ভব ঘটে থাকবে। প্রাণের অণুতে পরিপূর্ণ মহাবিশ্ব।
কিন্তু এমনকি অন্যান্য গ্রহের প্রাণও যদি এখানকার প্রাণের মতো একই অনু রসায়নের ওপর গড়ে ওঠে তাহলে এটা আশা করার কোনো কারণ নেই যে, এগুলো আমাদের পরিচিত প্রাণের সাদৃশ্য হবে। বিবেচনা করি, পৃথিবীতে বিশাল বৈচিত্র্যময় প্রাণী জগতের কথা, যাদের প্রত্যেকে একই গ্রহে থাকে এবং অভিন্ন তাদের অণু জীববিজ্ঞান। যেসব প্রাণীর কথা আমরা এখানে জানি, সেগুলো থেকে অন্যগ্রহের ওই অন্যান্য পশু-পাখি ও তরুলতা মূলগতভাবে ভিন্ন। কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশগত সমস্যার কেবলমাত্র একটি সর্বোত্তম সমাধান থাকতে পারে আর সে কারণে বিবর্তনের গতি একমুখী হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সংবেদনশীল যন্ত্র হিসেবে দুই চোখের (বায়নোকুলারভিশন) অপরিহার্যতা। তবে সাধারণভাবে বহির্জাগতিক প্রাণের ক্ষেত্রে বিবর্তনিক প্রক্রিয়ার বিশৃঙ্খল চরিত্রে সৃষ্টি হওয়া উচিত খুবই ভিন্ন জীব, যা আমরা জানি তার যেকোনোটির চেয়ে।
এগুলো থেকে আমি বলতে পারি না একটা বহির্জাগতিক প্রাণীকে কেমন দেখাবে (দেখাতে পারে)। আমি ভীষণভাবে সীমাবদ্ধ এই সত্য দ্বারা, তাহলো আমি জানি এক ধরনের প্রাণের কথা, পৃথিবীর প্রাণ। কেউ কেউ, বিশেষত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির লেখক ও চিত্রশিল্পীরা অনেক সময় অনুমানের সাহায্যে বর্ণনা দেন অথবা অন্য জগতের প্রাণীরা কেমন দেখাতে পারে তার ওপর ছবি আঁকেন। আমি ওই ধরনের বহির্জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির বেশিরভাগ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে থাকি। আমার কাছে মনে হয় আমরা এরমধ্যে যে সমস্ত প্রাণ কাঠামোর কথা জানি তার ওপর খুব বেশি আস্থা রেখে তারা এই ধরনের প্রাণের কাঠামো তৈরি করেন। যেকোনো নির্দিষ্ট প্রাণের বিকাশ ঘটার জন্য একটা দীর্ঘ ধারার স্বতন্ত্র, প্রায় অসম্ভব কিছু পদক্ষেপের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আমি মনে করি না অন্য গ্রহের বা অন্যকোনো স্থানের প্রাণ দেখতে হবে অনেকটা সরীসৃপ, অথবা একটা কীট-পতঙ্গের বা মানুষের মতো, এমনকি সঙ্গে থাকবে ক্ষুদ্র প্রসাধন সমন্বয় (cosmetic adjustment) হিসেবে সবুজ চামড়া, বিন্দুবত্ কান ও শুঙ্গ। কিন্তু তারপরও আমাকে যদি আপনারা চাপ দেন বা জোর করেন তারা কী রকম হবে বলতে, তাহলে আমি চেষ্টা করতে পারি কল্পনা করার বেশ ভিন্ন একটা ধরনকে:
বৃহস্পতি হলো আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ। বৃহস্পতির মতো বিশাল গ্যাসীয় গ্রহে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, মিথেন, পানি ও অ্যমোনিয়া-সমৃদ্ধ আবহমণ্ডল রয়েছে। এই ধরনের গ্রহে কোনো উপযুক্ত শক্ত পৃষ্ঠ নেই, বরং ঘনত্বসম্পন্ন একটি মেঘময় আবহমণ্ডল আছে, যার মধ্যে আকাশ থেকে জৈব-অণুগুলো পড়ছে অনেকটা স্বর্গ হতে খাদ্য পড়ার মতো, আমাদের পরীক্ষাগারে উত্পন্ন জৈব অণুগুলোর মতো। যেভাবেই হোক এই ধরনের গ্রহে প্রাণের প্রতিকূলে চরিত্রগত বাধা আছে :এই আবহমণ্ডলটি খুবই ঝঞ্ঝাপূর্ণ এবং গভীরে প্রচণ্ড উত্তপ্ত। একটা প্রাণীকে অবশ্যই নীচে পড়া ও ঝলসানো থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্ক হতে হবে।
এই ধরনের খুবই ভিন্নরকম একটি গ্রহে প্রাণের বিকাশ যে প্রশ্নের বাইরে নয়, এটা দেখানোর জন্য কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার সহকর্মী ই. ই. স্ল্যাপটার ও আমি একটা হিসাব কষেছিলাম। অবশ্যই এভাবে নিখুঁত করে কিছু বলা সম্ভব নয় ওই ধরনের জায়গায় প্রাণ কাঠামো কেমন হবে? আসলে আমরা দেখাতে চাচ্ছিলাম রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মকানুন মেনে এই ধরনের একটি গ্রহ বা জগতে প্রাণী অধ্যুষিত হওয়া সম্ভব হতে পারে।
এরকম একটা পরিস্থিতিতে একটি জীবন্ত বস্তুকে টিকে থাকতে গেলে ঝলসে যাওয়ার আগে তাকে পুনরুত্পাদনে যেতে হবে এবং আশা করা যায় যে পরিচলন প্রক্রিয়ায় তাদের বংশধরদের কিছু সংখ্যককে আবহমণ্ডলের অপেক্ষাকৃত উঁচু ও শীতল স্তরের দিকে নিয়ে যাবে। ওই ধরনের প্রাণীগুলো খুব ছোট হতে পারে। আমরা তাদের ডাকবো সিঙ্কার বলে। কিছু কিছু হতে পারে ফ্লোটার, কতগুলো বিশাল হাইড্রোজেন বেলুন, অভ্যন্তর থেকে হিলিয়াম ও অধিকতর ভারী গ্যাসগুলোকে বের করে দিয়ে হাইড্রোজেন ও হালকা গ্যাসগুলোকে ধরে রাখবে; অথবা তারা একটা উত্তপ্ত বায়ুভরা বেলুনও হতে পারে যা তাদের অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা ব্যবহার করে প্লাবতাকে স্থির রাখবে। যে খাদ্য এরা গ্রহণ করে তা থেকে অর্জিত তাপশক্তি ব্যবহার করেই এরা এই কাজটি করে থাকে। পরিচিত পার্থিব বেলুনের মতোই, একটা ফ্লোটারকে যতই গভীরে নিয়ে যাওয়া হয় তার ওপর প্রযুক্ত আবহমণ্ডলের প্লবতা (buoyant) ততই বেড়ে যায় যা ফ্লোটারকে ঠেলে দিতে চায় আবহমণ্ডলের আরো উঁচু, শীতলতর, নিরাপদ অঞ্চলের দিকে। একটি ফ্লোটার সম্ভবত খাবে পূর্বপ্রস্তুত জৈব অণুগুলোকে, অথবা এটা নিজেকে গড়ে তুলতে পারে সূর্যের আলো ও বায়ুমণ্ডল থেকে, পৃথিবীর উদ্ভিদেরা যেভাবে শক্তি অর্জন করে। এইভাবে একটা অবস্থা পর্যন্ত বড় হবে ফ্লোটাররা, হবে আরো দক্ষ। স্ল্যাপ্টার ও আমি কল্পনা করেছিলাম, ফ্লোটাররা কিলোমিটার থেকে কিলোমিটার প্রশস্ত হবে—এত বড় যে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তিমির চেয়েও বড়—একটা শহরের আকার-আকৃতির মতো।
ফ্লোটাররা নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে গ্যাসীয় পদার্থের দমকা আঘাতে—অনেকটা রামজেট অথবা রকেটের মতো দ্রুত। আমরা তাদের অলসভাবে বিচরণশীল প্রাণী হিসেবে কল্পনা করেছিলাম, অন্তত দেখে তাই মনে হবে। তবে তাদের চামড়ায় থাকবে কিছু অভিযোজনক্ষম পরিবর্তনশীল প্যাটার্ন যা আসলে এক ধরনের ছদ্মবেশ, যা থেকে বোঝা যায় ফ্লোটারদেরও আত্মরক্ষার প্রয়োজন হয়। কারণ এই ধরনের আবহমণ্ডলে কমপক্ষে পারস্পরিক পরিবেশগত উপযুক্ত বাস্তুস্থিতিস্থান আছে : শিকার ধরা। শিকারিরা (Hunter) হলো দ্রুতগামী ও কৌশলী। তারা ফ্লোটারদের খাবে তাদের শরীরের জৈব অণুগুলো ও তাদের সঞ্চিত বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন উভয়ের জন্য। ফাঁপা সিঙ্কারদের (Hollow sinker) বিবর্তন ঘটে থাকতে পারে প্রথমদিকের ফ্লোটারদের মধ্যদিয়ে এবং স্বচালিত ফ্লোটারদের প্রথম দিকের শিকারি প্রাণীতে বিকাশ ঘটে থাকতে পারে। সেখানে খুব বেশি শিকারি থাকতে পারে না, কারণ তারা যদি সমস্ত ফ্লোটারদের খেয়ে ফুরিয়ে ফেলে তাহলে খাদ্যের অভাবে তারাই ধ্বংস হয়ে যাবে।
পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নশাস্ত্র মেনে নেয় এই ধরনের প্রাণকাঠামো। শিল্পকলা তাদের বিভিন্ন গুণাদি ও সৌন্দর্য দ্বারা মনমুগ্ধকর করে তোলে। প্রকৃতি এই ধরনের অনুমান অনুসরণ করতে বাধ্য না। কিন্তু যদি শত কোটি প্রাণী অধ্যুষিত জগত্ থাকে এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে তাহলে সেখানে অন্তত কিছু সংখ্যক জগতে সিঙ্কার, ফ্লোটার ও হান্টারদের মতো প্রাণীরা থাকবে, যা আমাদের কল্পনায় তৈরি হয়েছে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নশাস্ত্রের নিয়ম মেনে।
জীববিজ্ঞান হলো এমন একটা বিজ্ঞান, যার পদার্থবিজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাসের সঙ্গে বেশি মিল। বর্তমানকে বোঝার জন্য আপনাদের জানতে হবে অতীতকে এবং জানতে হবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিস্তৃতির মধ্যদিয়ে। জীববিজ্ঞানে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক তত্ত্ব নেই, যেমন নেই ইতিহাসে। কারণগুলো একই :উভয় বিষয় এখনো খুবই জটিল আমাদের কাছে। আমরা আমাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানি অন্যক্ষেত্রগুলো বোঝার দ্বারা। বহির্জাগতিক প্রাণের একটি ঘটনা—কোনো বিষয় না, তারা কী পর্যায়ের প্রাণ—জীববিজ্ঞানের বিস্তৃতি বৃদ্ধি করবে। প্রথমবারের মতো জীববিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবে আর কী কী ধরনের প্রাণ কাঠামো সম্ভব। যখন আমরা বলি বহির্জাগতিক প্রাণের অনুসন্ধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ তখন একথা বোঝাই না যে আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি বহির্জাগতিক প্রাণের ব্যাপারে—আমরা শুধু একথা বলতে চাচ্ছি যে এই অনুসন্ধান মূল্যবান।
আমরা এ-পর্যন্ত শুধু একটি ছোট্ট জগতে প্রাণের একটি সুর শুনেছি। কিন্তু অবশেষে আমরা শুনতে আরম্ভ করেছি মহাজাগতিক ঐকতানের অন্যান্য সুর।
কৃতজ্ঞতা :শামসুদ্দিন আহমেদ, খালেদা ইয়াসমিন ইতি, এস এম জিয়া হায়দার, ফরহাদ আহমেদ জেনিথ, ডিসকাশন প্রজেক্ট
পুনরায় পড়ার জন্য
অধিক টেকনিক্যাল বৈজ্ঞানিক রচনাগুলো তারকা চিহ্নিত
অধ্যায়-২
Attenborough, David. Life on Earth: A Natural History. London: British Broadcasting Corporation, 1979
*Dobzhansky, Theodosius, Ayala, Francisco J., Ste0bbins, G. Ledyard and Valentine, James. Evolution. San Francisco: W.H.Freeman, 1978.
Evolution. A Scientific American Book. San Francisco: W.H. Freeman, 1978.
Gould, Stephen Jay. Ever Since Darwin: Reflections on Natural History. New York: W.W. Norton, 1977.Handler, Philip (ed.).
Biology and the Future of Man. Committee on Science and Public Policy, National Academy of Sciences. New York: Oxford University Press, 1970. Huxley, Julian.
New Bottles for New Wine: Essays. London: Chatto and Windus, 1957.Kennedy, D. (ed.).
Cellular and Organismal Biology. A Scientific American Book. San Francisco: W.H. Freeman, 1974.
*Kornberg, A. DNA Replication. San Francisco: W.H. Freeman, 1980.
*Miller, S.L. and Orgel, L. The Origins of Life on Earth. Englewood Cliffs, N.J.: Prentice-Hall, 1974.
Orgel, L. Origins of Life. New York: Wiley, 1973.
*Roemer, A.S. “Major Steps in Vertebrate Evolution.” Science, Vol. 158, p. 1629, 1967.
*Roland, Jean Claude. Atlas of Cell Biology. Boston: Little, Brown, 1977.
Sagan, Carl. “Life.” Encyclopaedia Britannica, 1970 and later printings.
*Sagan, Carl and Salpeter, E.E. “Particles, Environments and Hypothetical Ecologies in the Jovian Atmosphere.”
Astrophysical Journal Supplement, Vol. 32, p. 737, 1976.
Simpson, G.G.
The Meaning of Evolution. New Haven: Yale University Press, 1960.Thomas, Lewis.
Lives of a Cell: Notes of a Biology Watcher. New York: Bantam Books, 1974.
*Watson, J.D. Molecular Biology of the Gene. New York: W.A. Benjamin, 1965.
Wilson, E.O., Eisner, T. Briggs, W.R., Dickerson, R.E., Metzenberg, R.L., O’Brien, R.D., Susman, M., and Boggs, W.E.
Life on Earth. Stamford: Sinauer Associates, 1973. v