আত্মজীবনীর খণ্ডাংশ

উপক্রমণিকা

 

এই রচনার শুরুতে উপক্রমণিকা জাতীয় কিছু লেখার পরিকল্পনা ছিল না আমার। সাধারণত আমি তা লিখিও না। কিন্তু একজন শোকাহত পিতার অপত্যবোধ এবং তীব্র আবেগ আমাকে এই অংশটি সংযোজিত করতে বাধ্য করেছে। তাছাড়া আমার সংসারজীবন শুরু করার আগেই এ রচনার বর্তমান পর্ব শেষ হয়ে যেত। ‘আত্মজীবনীর খণ্ডাংশ’ শিরোনামের লেখাটি শুরু করার সপ্তাহ দুই-তিন পর আমার চোখের মণিতুল্য কন্যা ফারিহা নুসরাত জেরিন পূর্বা মাত্র তিনদিনের শারীরিক ব্যাধিজনিত জটিলতায় এই পৃথিবীর বন্ধন ছিন্ন করে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমায়। মাত্র একুশ বছরের সদ্য তরুণী কন্যাটি ছিল, এক অর্থে, আমার অস্তিত্বের অংশ। আমার সার্বিক সত্তার বড় এক জায়গাজুড়ে ছিল ও।

চলে যাওয়ার দুই সপ্তাহ পর ইংরেজি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় বসার কথা ছিল ওর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী ছিল। ছিল ওর বন্ধুদের মধ্যমণি।

কত স্বপ্ন ছিল ওর! প্যাশন ছিল সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্রসহ সুকুমার শিল্পের সব শাখার প্রতি। সাহিত্যের ছাত্রী হয়েও কম্পিউটার সায়েন্স ও তথ্যপ্রযুক্তির খুঁটিনাটি সম্পর্কে ধারণা রাখত। আমার এই অকালে ঝরে যাওয়া আদরের কন্যার স্মৃতি আমাকে আজীবন তাড়া করে ফিরবে। আমার ভেতরে যে শূন্যতা তৈরি করে গেল মেয়ে, তা কি এ জীবনে ভরাট হবে? জানি না। অন্তরাত্মা থেকে রক্ত ঝরছে। ঝরতেই থাকবে যতদিন বেঁচে থাকি।

 

আত্মস্মৃতি

করাচি সমুদ্রবন্দর থেকে একটি জাহাজ ছেড়ে যাচ্ছে। খানিকক্ষণ আগে ভেঁপু বেজেছে। তীব্র শব্দ। বন্দরের পন্টুন থেকে জাহাজটি পিছিয়ে আসছে। নিচে সিন্ধুনদ ও আরব সাগরের পানিতে জলের ঘূর্ণি। পানি ঘোলা। ব্যাকব্রাশ করা কাঁচাপাকা চুলের একহারা গড়নের একটি মানুষ রেলিং ধরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছেন। পেছন থেকে বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু আন্দাজ করা যায় তাঁর চোখ করাচি নগরীর ওপর। তাঁর ঠিক পেছনে জাহাজের একটি সাদা থামের আড়ালে দাঁড়ানো একটি বালক। বয়স ছয়। অনেকক্ষণ ধরে ও বাবাকে খুঁজছিল। প্রায় পুরো জাহাজ চষে ও এখানে এসে পেল তাঁকে। ওর প্রিয় আব্বা।

জাহাজ বেশকিছু দূর পিছিয়ে এসেছে। এবার বাঁক নেবে। বালকটিও দেখল, চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে করাচি। আব্বা নড়ছেন না। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন, মিলিয়ে যাচ্ছে নগর। এখানে এক গোরস্তানে অসংখ্য অচেনা মানুষের কবরের মধ্যে একটিতে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে তাঁর প্রিয় স্ত্রী। কত স্মৃতি। সবই আনন্দের, স্বপ্ন ও শান্তির। খুনসুটি ও ক্ষণস্থায়ী অভিমানের। হয়তো জীবনে আর এই নগরীতে ফেরা হবে না। আপাতঃগম্ভীর, শক্ত ধাঁচের মানুষ তিনি। বালক দেখল, তিনি কনুই দিয়ে চোখ মুছছেন। আব্বা কাঁদছেন! অথচ বালকের ভেতর কোনো আলোড়ন নেই, কোনো অনভূতি নেই। না বিষাদের, না হারানোর। জননীকে ঢাকা থেকে প্রায় পনেরো শ মাইল দূরের একটি শহরের কবরে রেখে ও বাবা এবং ভাই-বোনদের সঙ্গে ফিরে যাচ্ছে ঢাকায়। এ নিয়ে ওর মধ্যে কোনো শূন্যতা তৈরি হয় না। অন্তত এই মুহূর্তে। বাবা এবং অন্যান্যদের সঙ্গে যখন ও মায়ের কবরে কচি হাতে মাটি ছড়িয়ে দিচ্ছিল, তখনো ও ছিল নির্বিকার। অনেক অনেক বছর পরে যখনই বালকের চোখের সামনে মায়ের কবরে মাটি ছিটাবার দৃশ্যটা ভেসে উঠেছে, সেই বিকেলে ওর নির্লিপ্তির কথা ভেবে ও অবাক হয়েছে। হায়রে নিরাবেগ বালক-বয়স। বোধহয় ওই বয়সে আবেগের চাপে বহু শিশু বা বালকের ভেতর ক্রন্দন তৈরি হয় না। চোখ ভিজে আসে না।

বালকটি আমি। এই আত্মজীবনীর লেখক। আব্বা ও ভাইবোনসহ আমি চিরকালের মতো করাচি ছেড়েছিলাম ১৯৫৯-এ। ঊনসত্তরে আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র। ততদিনে আমার জীবনে একটি পরিবর্তন এসেছে। একজন নতুন মা এসেছেন আমার জীবনে। ২০১৬ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন আমার জীবনের অন্যতম কেন্দ্র। শৈশবে, কৈশোরে তাঁরই স্নেহ-ভালোবাসার ছায়াতলে আমি বড় হয়েছি।  

করাচিতেই আমি টের পাচ্ছিলাম, আমার ভেতর একটি বিষণ্নতা জন্ম নিচ্ছে। ঐ বিষাদ থেকে আমি আজও মুক্ত হইনি। সূর্যাস্তের ঠিক পরপর আমাকে পেঁচিয়ে ধরে একটা ব্যাখ্যাতীত বিষণ্নতা। গলার কাছে দলা পাকিয়ে জমে থাকে কান্না। ছোটবেলায় কোনো নির্জন জায়গায় গিয়ে একা একা কাঁদতাম। এখন উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। কিছু ভালো লাগে না। মেয়ে চিরকালের মতো চলে যাওয়ার পর ঐ বিষণ্নতা আরো তীব্রভাবে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।  রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত চলে এ অবস্থা। আমি এর নাম দিয়েছি ‘সান্ধ্য বিষাদ’। 

আমার জন্ম হয়েছিল ঢাকায়, ১৯৫২ সালের মার্চ মাসের ২ তারিখে। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে ভর্তি করার সময় অন্যান্য অভিভাবকের মতো আব্বা আমার বয়সও ছয় মাস কমিয়ে করেছিলেন ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৫২। যা হোক, আমার জন্মের পর আব্বার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চাকরির কারণে ভাইবোনসহ আমাদের প্রথম যেতে হয় যশোর। তখন আমার বয়স তিন বছর। সেখান থেকে ফের ঢাকা, তারপর সুদূর করাচি। এবং জীবনে আমার প্রথম বিমানভ্রমণ। আম্মা ইহলোক ছেড়ে চলে না গেলে আমাদের আরো দু বছর থাকতে হতো করাচিতে। কিন্তু আম্মার মৃত্যুর পর ছোট ছোট দুই ছেলে ও এক কন্যাকে আব্বা দেখভাল করতে পারছিলেন না। আমার ছোট ভাইটির বয়স তখন এক-দেড় বছর। ওর পরে আরো এক ভাই জন্মেছিল আম্মার মৃত্যুর ঠিক আগে। আব্বা আমার বৃদ্ধা দাদীকে নিয়ে এলেন গ্রাম থেকে দুই মাস বয়সী ভাইটির পরিচর্যার জন্য। দাদীকে আমরা বুবু ডাকতাম। কিন্তু ভাইটি বাঁচেনি। বুবু আসার কিছুদিন পর ওকেও করাচি গোরস্তানে আম্মার পাশে একটি ছোট্ট কবরে (আহা, এতটুকুন একটি কবর!) আমরা শুইয়ে দিয়ে এসেছি। বাসার লম্বা বারান্দায় জানাজার পর সাদা কাফনে মোড়া শিশু-লাশটি দু হাতে আড়াআড়িভাবে শুইয়ে আব্বা উঠে বসেছিলেন করাচির তখনকার রিকশায়, পাশে আমি। অনুভূতিহীন, শোকহীন, অশ্রুবিহীন। কয়েকজন পাড়া-প্রতিবেশী গোরস্তানে গিয়েছিলেন হেঁটে, এবং রিকশায়। বালক বয়স বড় নিষ্ঠুর। উইলিয়াম গোল্ডিং তাঁর ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইজ’ উপন্যাসে এটা দেখিয়েছেন। আমার ক্ষেত্রে কী হয়েছিল জানি না। হয়তো ছ বছর বয়সে আমি শুদ্ধতম অর্থেই ছিলাম অবুঝ এবং অবোধ। আম্মার মৃত্যুর দিন ভেতরের বারান্দায় লাশ শোয়ানো। বাড়িভর্তি মানুষ, মহিলারা কাঁদছেন। পুরুষরা চোখ মুছছেন বারবার। কেউ কেউ নিথর। আব্বা উদ্্ভ্রান্ত, বিভোল অবস্থায় এদিক-ওদিক হাঁটছেন। আমার এক খালুর কোলে আমি। উনি আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। আমার বিরক্তি লাগছিল। জোর করে কোল থেকে নেমে ঘুরে ঘুরে বাসার দৃশ্য দেখছিলাম। এত মানুষ। বেশ ক জন আমার চেনা। আত্মীয় ও পড়শি। অনেককে চিনি না।

জীবনে প্রথম মৃত্যুর প্রভাব আমার ওপর পড়েছিল অদ্ভুতভাবে। খুব মনে পড়ে একটি দৃশ্য। বাসার সামনের আঙ্গিনায় বালক আমি জঙ্গল-জিলিপি গাছের নিচে পা ছড়িয়ে বসে আপনমনে বানিয়ে চলেছি সারি সারি খেলনা কবর। এটি আম্মাকে করাচির বিশাল গোরস্তানে কবর দিয়ে আসার মাসখানেক পরের দৃশ্য। এর এক-দেড় বছর পর আমি দুরারোগ্য সান্ধ্য বিষণ্নতায় আক্রান্ত হই। অন্যদের বেলায় কী হয় জানি না। এই সাতষট্টি বছর বয়সেও আমি ঐ ব্যাধিতে ভুগছি। সূর্যাস্তের পর অনেকটা সময় আমার কিছু ভালো লাগে না। দুঃসহ এক বিষণ্নতায় ছেয়ে থাকে মন। উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি।

করাচি নিয়ে আমার প্রচুর সুখস্মৃতি আছে। অধিকাংশই আম্মার মৃত্যুর আগের। পরেরও। আমাদের বাসা ছিল মার্টিন রোড এলাকায়। সামনে খোলা জায়গা। বাগান। পরিচর্যার অভাবে একটা-দুটো ফুলগাছ কানোরকম বেঁচে আছে। অধিকাংশই মৃত। একটা ‘জাঙ্গাল-জিলাবি’ গাছ ছিল ওখানে। বেশ বড়সড়। তেঁতুল গাছের মতো ঘন সবুজ পাতা। প্রচুর চড়ুই ও ছোটজাতের পাখি আসত। ‘জাঙ্গাল-জিলাবি’ সিম জাতীয় একটি ফল। জিলিপির মতো পেঁচানো। পাকলে রং হয় সবুজ-হলদে। খোসা ছাড়ালে সাদা আঁশসহ সিম দানার মতো সারি সারি বিচি। দানার ওপরের মিষ্টি, নরম আঁশটুকুই ফল। করাচির অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা খুব খায় ওটা। আমাদের বাসার পেছনটাও ছিল ঝোপঝাড়ে ভরা একটা খোলা জায়গা। ওখানে লুকোচুরি খেলা যেত। আমাদের পাশের বাসায় বেশ ক জন অল্পবয়সী ও বড় ছেলেমেয়ে। এদের মধ্যে আমার বয়সী বালক নাজিমুদ্দীন ছিল আমার খেলার সাথী। জীবনের প্রথম বন্ধু। ওর ছোটবোন আজরা, তার সঙ্গেও আমার দিনের একটা বড় সময় কাটত। এ দুজনের বড় ছিল খালেদা, জাহিদা, রাশিদা। ওরা আম্মাকে খুব পছন্দ করত। আম্মা তখন তরুণী। খুব মিশুক ছিলেন। বয়সে ছিলেন  জাহিদা, রাশিদার চেয়ে সামান্য বড়—এখন আন্দাজ করি। সবার বড় বোন মাহমুদা ঘর থেকে বেরুত না। অথচ ছোট চার বোন সুযোগ পেলেই আমাদের বাসায় এসে আম্মার সঙ্গে কাটিয়ে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কাজ চালাবার মতো উর্দু রপ্ত করেছিলেন আম্মা। ওরাও ভাঙা-ভাঙা বাংলা শিখেছিল।  সবার বড় মালেক ভাই, চাকরি করতেন। এদের বাবা ছিলেন পাগড়ি পরা, শ্মশ্রুমণ্ডিত দীর্ঘদেহী এক ভদ্রলোক। প্রায়ই দেখতাম আমাদের বাসার সম্মুখ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, বা বাসায় ফিরছেন। আমাকে দেখলে থুতনি ধরে আদর করে দিতেন।

আমার জীবনের প্রথম খেলার সাথী নাজিমুদ্দীন ও আজরা। ছোটবোন তখন আপনমনে একা একা পুতুল খেলে। ভাইটি খুব ছোট। আমি তখনো স্কুলে যাই না। নাজিমুদ্দীন যেত, যতদূর মনে পড়ছে। আমি পড়তাম আম্মার কাছে। সপ্তাহে দু তিনদিন একজন শিক্ষক আসতেন বাসায় বিকেলে। তিনি বাঙালি হিন্দু। খুব হাসিখুশি। মুখে ছিল বসন্তের গাঢ় দাগ। আমার আজন্ম নমস্য গুরু। এই পরিচয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন আমার স্মৃতিতে। কারণ তাঁর কাছে আমার আনুষ্ঠানিক পাঠপর্ব শুরু হয়। বর্ণমালার পরিচয় হয়েছে আম্মার কাছে। কিন্তু তিনি আমাকে পড়তে শিখিয়েছিলেন, সবগুলো বাংলা বর্ণ, স্লেটে লিখতে শিখিয়েছিলেন। জানি না আমার জীবনের সেই প্রথম শিক্ষক কোথায় আছেন আজ! এখন বুঝতে পারি, সম্ভবত সংখ্যালঘু কোটায় তিনি ঐ সময়ের পূর্ব-পাকিস্তান থেকে সরকারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে করাচিতে বদলি হয়ে এসেছিলেন। অথবা হয়তো অন্য কোনো চাকরিও করতেন, ফাঁকে ফাঁকে গৃহশিক্ষকতা। তখন পাকিস্তান ছিল রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র। কিন্তু প্রচুর বাঙালি ছিলেন তখনকার করাচিতে। এর-ওর বাসায় ছুটি-ছাটায় যাওয়া-আসা হতো।

আমার এখনো মনে পড়ে, বড়দের আলাপের অন্যতম একটি বিষয় ছিল নদীর মাছের অভাব। করাচিতে সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যেত প্রচুর। আমরা বাসায় নিয়মিত বাসমতী চালের ভাত খেতাম। রুটিতেও অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম আমি। স্বচ্ছন্দে উর্দু বলতে পারতাম। ঢাকায় তখন রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলন হয়ে গেছে। ওই ঘটনার চার-পাঁচ বছর পর সে সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। জানা বা বোঝার বয়সই তখন আমার হয়নি। অথচ আমি তখন একজন বাঙালি শিক্ষকের কাছে বর্ণমালা বা নামতা শিখছি; তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়ে পড়ছি, ‘অজগর ঐ আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে।’

আমার জন্ম ১৯৫২-এর মার্চে, ঢাকায়। একুশে ফেব্রুয়ারির ন দিন পর।

 

দুই

১৯৫৯-এ আমরা ফিরে এলাম ঢাকায়। সঙ্গে প্রচুর সাংসারিক লটবহর থাকায় আসতে হয়েছিল আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে বিশাল জাহাজে। যতদূর মনে পড়ে সাতদিন লেগেছিল। শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে বারো ঘণ্টার যাত্রাবিরতি। আমি পুরো জাহাজ চষে বেড়াচ্ছি একা একা। মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছি। আব্বা পাগলের মতো খুঁজে আমাকে বের করে আনছেন। জাহাজে আমরা সবাই আছি। আম্মা ছাড়া। এ নিয়ে তখনো আমার মধ্যে কোনো শূন্যতা তৈরি হয়নি। তবে আব্বা একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন সমুদ্রের দিকে। বুবু মধ্যে মধ্যে কেঁদে ওঠেন আমাদের ভাইবোনদের কাউকে জড়িয়ে ধরে। দেখতে দেখতে জাহাজ এসে ভিড়ল চট্টগ্রাম বন্দরে। করাচি গিয়েছিলাম পিআইএ-র অতিকায় বিমানে চড়ে। আম্মা ছিলেন দুই ভাইবোনের পাশে। ফিরলাম সবাই। আম্মা ছাড়া। তিনি রয়ে গেলেন করাচি গোরস্তানে একটি কবরে।

ঢাকায় পাকাপাকিভাবে আসার আগে আব্বা আমাদের তিন ভাইবোনকে রেখে এসেছিলেন আশুগঞ্জে আমাদের গ্রামের বাড়িতে। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি। তাঁকে কাজে যোগ দিতে হয়েছিল করাচি থেকে ফিরে আসার পরপর। নতুন মা। ধীরে ধীরে আরো ভাইবোন।

ঢাকায় আমরা এসে উঠলাম সেন্ট্রাল রোডে। গাছগাছালি-ছাওয়া প্রায় সুনসান একটি এলাকা। আমাদের বাসাটা ছিল টিনশেড। সামনে সায়েন্স ল্যাবরেটরির দেয়াল-ঘেরা বিশাল বাউন্ডারি। মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গা। পুবে সামান্য হেঁটে গেলে হাতিরপুলের পাশে বিশাল পাওয়ার হাউজ। পাশ দিয়ে গেছে ঢাকা-চট্রগ্রাম রেল লাইন। ফুলবাড়িয়া থেকে ট্রেন ছাড়ত। গভীর রাতে আমরা আধো-ঘুমের মধ্যে ট্রেনের হুইসেল শুনতাম। পাওয়ার হাউজে কয়লাবাহী গাড়ির শান্টিং হতো ভোররাতে। সন্ধ্যারাতের পর থেকে শেয়াল ডাকতে শুরু করত। গভীর রাতে পেঁচা ডাকত। খোলা জায়গা, দূরে দূরে ঘরবাড়ি, মেঠোপথ, ভুট্টাখেত ইত্যাদি নিয়ে সেন্ট্রাল রোডে আমাদের পাড়াটি ছিল একটি বালকের মনকে আবেশে আচ্ছন্ন করার মতো একটি জায়গা। স্থানীয় একটি প্রাইমারি স্কুলে মাস ছয়েক পড়ার পর আব্বা আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন সরকারি ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে, ১৯৬১ সালে।

আমি শুরুতেই ভর্তি হলাম ক্লাস ফোরে। সে বছরই স্কুলটির যাত্রা শুরু। নিরিবিলি পরিবেশ, স্থাপত্যশৈলী এবং সর্বোপরি পাঠদান পদ্ধতির বিচারে এই স্কুলটিই ঐ সময় স্বীকৃতি পেল তত্কালীন পূর্ব-পাকিস্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে। ১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তিন তারিখে ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের উদ্বোধন হলো। সমস্ত স্কুলজুড়ে চুনকাম আর নতুন ফার্নিচারের গন্ধ। এ স্কুলে বেঞ্চের বদলে সবার জন্য আলাদা আলাদা টেবিল-চেয়ার। হেডস্যার আগাগোড়া বিদ্যোত্সাহী ও সংস্কৃতিমনস্ক শিক্ষক খান মুহম্মদ সালেক। এই স্কুল ছিল তাঁর জীবনের একটি ব্রত ও স্বপ্ন। তিলে তিলে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তুলেছেন, যতদিন যুক্ত ছিলেন স্কুলটির সঙ্গে। ক্লাস ফোর থেকে এসএসসি—১৯৬১ থেকে ১৯৬৮, এই চারটি বছর ছিল আমার জীবনের অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ সময়। এই স্কুল শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, আমাকে দিয়েছে ভবিষ্যত্ জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কিত পাঠ। স্কুলের পাশেই ঢাকা কলেজ। আসা-যাওয়ার পথে রোজ দেখি সীমানা প্রাচীরের ওপারে দেশের বিখ্যাত কলেজটিকে, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি কবে যে কলেজের সোপানে পা রাখব। আদৌ কি ভর্তি হতে পারব ঢাকা কলেজে? ভাগ্য নিঃসন্দেহে সুপ্রসন্ন ছিল।

১৯৬৯-এ স্বচ্ছন্দেই ভর্তি হয়ে গেলাম ঢাকা কলেজে। বলা যায় প্রবেশ করলাম এমন এক জীবনে, যেখানে আমি স্বাধীন। চলাফেরায় কড়াকড়ি নেই। শিক্ষকদের নজরদারি নেই পদে পদে। সবচেয়ে বড় কথা, কলেজে এক গাদা বই-খাতাভর্তি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে যেতে হয় না। একটা দুই নম্বর খাতা এবং একটা কি দুটো বই নিলেই চলে। অনেকে প্যান্টের ব্যাক পকেটে খাতাটি দুই ভাঁজ করে গুঁজে চলে আসত ক্লাসে। ঢাকা কলেজে আমাদের প্রিন্সিপাল ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষক জালাল উদ্দীন। তিনি ছিলেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের একজন নিভৃতচারী পণ্ডিত। ছিপছিপে, ফর্সা ও ঋজু মানুষটির হাঁটাচলা ছিল দেখার মতো। আমরা ওঁকে ক্লাসে পাইনি। উনি মাঝে মাঝে অ্যাডভান্সড ইংলিশ ক্লাসের ছাত্রদের পড়াতেন। আমরা ইংরেজির নোমান স্যারের ক্লাসও পাইনি। তবে পেয়েছিলাম শওকত ওসমান এবং আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকে বাংলার শিক্ষক হিসেবে।

তিন

ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময় প্রথম দেখি রাজপথে ছাত্র আন্দোলন। হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে তখন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্রদের মিছিলে স্লোগানে ঢাকার রাজপথ উত্তাল। অনেক স্কুলের ছাত্রও সেসব মিছিলে যোগ দিচ্ছে। ঢাকা কলেজের ছাত্ররা আমাদের মিছিলে নেয়ার জন্য এসেছে কয়েকবার। সরকারি স্কুল। হেডস্যার এবং অন্যান্য শিক্ষকরা স্কুল চলাকালে আমাদের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিলেন। ১৯৬৯-এ যখন গণআন্দোলন শুরু হলো, আমি এবং আমার প্রাক্তন স্কুলের সহপাঠীরা তখন রীতিমতো যুবক, সবার মুখে দাড়ি-গোঁফের রেখা। কলেজের ছাত্র আমরা। কে ঠেকায় আমাদের। কলেজের ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে তখন কোনোরকম ক্লাস সেরে রোজ মিছিলে যাই। কোনো কোনোদিন বাসা থেকে বেরিয়ে কলেজের ভেতর ঢুকিই না। যোগ দিই কলেজ প্রাঙ্গণের সভায়, তারপর যাই মিছিলে। সমস্ত ঢাকা তখন মিছিলের শহর। যখন-তখন পুলিশ আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করছে, টিয়ার গ্যাস ছুড়ছে। আর আমরাও গলা চিরে স্লোগান দিচ্ছি, ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’, ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব,’ ‘আইয়ুবশাহী নিপাত যাক’ ইত্যাদি। এরই মধ্যে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়ে চলেছে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা। গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে, এক দুপুরে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো সরকারের মুখপত্র ‘মর্নিংনিউজ’ পত্রিকা, এর উল্টোদিকে মুসলিম লীগ নেতা লশকরের বিশাল একতলা বাড়ি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঠিক বর্ধমান হাউজের (বর্তমান বাংলা একাডেমির পুরনো ভবন) আদলে তৈরি একটি সরকারি বাংলো। পরে শুনেছি, ওটা একসময় ছিল ঊনিশশো পঞ্চাশের দশকে পূর্ব-বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের বাসভবন। তাঁর আমলেই ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বের হওয়া ছাত্রদের মিছিলে গুলি চলে পুরনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। এদিকে পুরো ঢাকা তখন আন্দোলনের নগরী। সমস্ত শহরে আগুন, টিয়ার গ্যাস, পুলিশের গুলি। নির্বিচারে ধরপাকড় চলছে।

ঠিক এ সময় অথবা কিছুদিন আগে, আমি প্রথম শুনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি। প্রথমবার শোনামাত্রই এ দুটি শব্দ আচ্ছন্ন করে ফেলে আমার পুরো সত্তাকে। কী জাদু যে ছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে! এটি গেঁথে গিয়েছিল আমার মর্মমূলে। এবং আজো সেভাবে গাথা আছে। ৬৯-এর গণআন্দোলনে ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ এবং ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’—এই তিনটিই ছিল সর্বব্যাপী স্লোগান। 

দেখতে দেখতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত বাংলাদেশে। প্রতিদিন খবরের কাগজে নতুন নতুন খবর। সরকার নিয়ন্ত্রিত রেডিও পাকিস্তান আন্দোলনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব। আমরা তখন ক্লাস করছি না। দিন কাটে মিছিলে-স্লোগানে। এরমধ্যে ১৯৬৮-৬৯-এর উত্তাল গণবিক্ষোভের মুখে স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করতে বাধ্য হলেন। ওটা ছিল ফেব্রুয়ারি মাস। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে এবং বেশকিছু বাঙালি সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিকে কারাবন্দি করা হয়েছিল। জেল থেকে ঐ সময়ের দুই বাঙালি জননেতা মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবের একজনের মুক্তির দাবি গণআন্দোলনে এক নতুন বেগ সঞ্চার করে। জনতা শেখ মুজিবকে জেল থেকে বের করে আনল। ভাসানী মুক্তই ছিলেন। ছাত্রনেতাদের সঙ্গে তিনি তখন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ঐ সময় সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবকে তাঁদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বরণ করে নিলেন ছাত্রজনতা। পুরো বাঙালি জাতি তখন তাকিয়ে আছে শেখ মুজিবের দিকে। এদিকে কারাবন্দি ছাত্রনেতাদেরও তখন একে একে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। সরগরম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। অনেক ছাত্রনেতা জেল থেকে বেরিয়েই আসছেন ঢাকা কলেজে। তাত্ক্ষণিক মিটিং-মিছিল হচ্ছে। ঢাকা কলেজের ছাত্রনেতারা আছেন তাঁদের পাশে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ঢাকা কলেজের আগে-পরের ভিপি গোলাম মুক্তাদির, জি.এস. নজরুল, শাহেদ রেজা, নেতৃবৃন্দ রেজাউল, আক্কাস, হান্নান, নাসের, মুনীর প্রমুখ এবং অবশ্যই শেখ কামালের নাম। স্মৃতি-প্রতারণার কারণে হয়তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ নাম বাদ পড়ে গেছে। মূলত সাহিত্যের পাঠক, হুমায়ূন কবীর, নাসিমুল কাদের চৌধুরী, হাবিবুল হাসান এবং আমিও থাকতাম প্রায় প্রতিটি জমায়েতে। ওগুলো হতো কলেজের ঘাসে ঢাকা প্রশস্ত আঙ্গিনায়।

ল্যাবরেটরি স্কুলের শেষ পর্যায় থেকে হুমায়ূন, হাবিব, নাসিম ও আমি—আমরা চার জন একে অপরের হরিহর আত্মা। আমাদের বন্ধুত্বের মূলসূত্র সাহিত্য ও গ্রন্থপ্রেম। কবি হাবীবুর রহমানের পুত্র হুমায়ূনের বাসায় ছিল ওর বাবার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক উপন্যাস ও ছোটগল্পের সংকলনে ওটার র্যাকগুলো ছিল ঠাসা। স্কুলজীবন থেকেই ওই পাঠাগারে প্রতি ছুটির দিন আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। বিষয় অনিবার্যভাবে সাহিত্য। লালবাগের আমলিগোলার জগন্নাথ সাহা স্ট্রিটে ছিল হুমায়ূনদের বাসা। সেন্ট্রাল রোড থেকে যেতাম আমি, নাসিম আসত গ্রিন রোডের সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার থেকে। শ্যামলী থেকে রবীন্দ্রসংগীতের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে আসত হাবিব। স্বাধীনতার পর বিটিভির কয়েকটা সিরিয়ালে অভিনয় করে ও ব্যাপক পরিচিতি পায়। শিল্পী হিসেবে ওর নাম ছিল হাবিবুল হাসান। কোনো একটা সিরিয়ালের একটা মজার চরিত্রের নামে মাখনা মিয়া নামেও ও পরিচিত ছিল। প্রায় পাঁচ বছর আমাদের চার বন্ধুকে আচ্ছন্ন বয়ে রেখেছিল সাহিত্য, বিশেষ করে বাংলা গদ্যসাহিত্য। আমি তখনো কবিতায় ঝুঁকিনি। তবে জীবনানন্দ দাশ ভালো লাগত, কিছু পর শামসুর রাহমান হয়ে দাঁড়ালেন আমার প্রিয় কবিদের একজন। কবিতা লেখার কথা আমি কখনো ভাবিনি। আমার আগ্রহ ছিল ছোটগল্পে। টুকটাক দু একটা গল্প লিখেও ফেলেছি তখন। হুমায়ূন এবং নাসিমও গল্প লিখত।

লাইব্রেরি-ঘরে আমাদের নিভৃত আড্ডায় আমরা কোনো কোনোদিন স্বরচিত গল্প পড়তাম। যে কোনো একজনই পড়তাম, তারপর সেটা নিয়ে হতো আলোচনা। ধোলাইও হতো। এসব গল্প খুব কমই মুদ্রিত হয়েছে। সে ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ ছিল না। তখন ঢাকায় নিরীক্ষামূলক ছোটগল্পের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের আচ্ছন্ন করে ছিল বিশ-ত্রিশ এবং চল্লিশ দশকে রচিত গল্প-উপন্যাস। তখন গোগ্রাসে পড়ছি তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণ, বুদ্ধদেব বসু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের রচনা। বলতে গেলে কোনো উল্লেখযোগ্য লেখক আমরা বাদ রাখিনি। আমাদের পাঠ-তালিকায় একে একে এসে গেছে সমরেশ বসু, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, বিমল কর, সতীনাথ ভাদুড়ী প্রমুখ লেখকও। সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শওকত আলী আসেন আরো পরে। 

ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ার সময় আমাকে পেয়ে বসেছিল গোয়েন্দা উপন্যাস পড়ার নেশা। কিছু পর ঝুঁকে পড়ি নীহাররঞ্জন গুপ্তে। বিশেষ করে লেখকের গোয়েন্দা কিরীটি রায় হয়ে দাঁড়ায় আমার রোল মডেল। আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরা এই নেশা থেকে আমাকে ছাড়িয়ে আনে আমাদের লালবাগের আড্ডা, বিশেষ করে অকালপ্রয়াত হুমায়ূন কবীর। এই হুমায়ূনই আমাকে দিয়ে লেখায় আমার জীবনের প্রথম কবিতা। এটি ছাপা হয়েছিল ১৯৭২-এ লালবাগ ছাত্রলীগ প্রকাশিত একুশের সংকলনে। বাঁধানো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত সংকলনটির নাম ছিল ‘উত্তরণে অমরত্ব’। তবে আমার অল্প-বিস্তর কবি-পরিচিতি জোটে বাংলাদেশ লেখক শিবিরের নির্বাচিত কবিতা সংকলন ‘হে স্বদেশ’-এ কবিতা মুদ্রিত হওয়ার পর। ওটাও বেরিয়েছিল ১৯৭২ সালে, এবং এর কিছুকাল পর সে বছরই অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা-র সাহিত্য পাতায় মুদ্রিত হয় আমার আরেকটি কবিতা, শিরোনাম ‘সাবিত্রী বোসের রুমাল’। আমার অনুরাগী বন্ধুবান্ধব এবং বহু অচেনা পাঠক কবিতাটির স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা করে। মোটামুটি এভাবে শুরু হয় আমার কবিতাযাত্রা। কিন্তু আমি ছোটগল্প ছাড়িনি। কবিতার পাশাপাশি চলতে থাকে আমার গল্প লেখা এবং মুদ্রণ।

ঊনসত্তর এবং পরবর্তী সত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে ফিরে যাই। বিক্ষুব্ধ জনতার চাপে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ক্ষমতা ছাড়ার মধ্য দিয়ে তখনকার মতো শান্ত হলো পূর্ব-পাকিস্তান। কিন্তু তার জায়গায় ফিরে এল এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ এবং একইসঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। পূর্ব-পাকিস্তানে তখন মার্শাল ল। আইয়ুব ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে গেছেন জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে। সামরিক সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি তখন দেশের সর্বময় কর্তা। তাঁর ওপর নির্ভর করছে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন এবং সার্বিক ভবিষ্যত্। আসলে পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রক্রিয়া তখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে। ইয়াহিয়ার ক্ষমতার আসার পর প্রদেশে রাজনৈতিক তত্পরতা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। ইয়াহিয়াকে নিয়ে নানাধরনের কানাঘুষো চলছে। আপাদমস্তক সামরিক ব্যক্তি হিসেবে তিনি রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝেন না। তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালিদের বিমুখ করবেন না, অর্থাত্ তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আগে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শেখ মুজিবসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু বাঙালির জনপ্রিয় নেতা ঐ বৈঠকে আওয়ামী লীগের ছয় দফার ভিত্তিতে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ছিলেন অটল। এ ব্যাপারে তিনি বিন্দুমাত্র আপোস করতে রাজি ছিলেন না। বৈঠক ব্যর্থ হলো। নতুন চাল কি না পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষ তখনো বোঝেনি—ইয়াহিয়া ক্ষমতা নেয়ার পরপরই ১৯৭০-এ সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন।

প্রাথমিক বিভ্রান্তির ঘোর কাটার পর পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালিরা বুঝতে পারল সমগ্র পাকিস্তানে সত্যি সত্যি একটি জাতীয় নির্বাচন হতে চলেছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জনতা ব্যালটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানাল। নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের ফলে শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লীগ তখন পাকিস্তানের সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মূলত সাহিত্যমগ্ন, আমরা চার বন্ধুও তখন রাজনৈতিকভাবে সচেতন, এবং মাঝে মাঝে সক্রিয় হয়ে উঠছি। আমাদের বয়সী কলেজে পড়ুয়া তরুণেরা তখন পূর্ব-পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন এবং শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার স্বপ্নে বিভোর। স্বপ্নের রঙিন ঘোর লাগতে শুরু করেছে আমাদের চোখে। ঠিক ঐ সময় ১৯৭১-এর মার্চের এক তারিখে বিনামেঘে বজ্রাপাত হলো যেন। ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেছেন। প্রায় এক বছর শান্ত থাকার পর সারা পূর্ব-পাকিস্তান আবার উত্তাল হয়ে উঠল। রাস্তায় নেমে এল আবালবৃদ্ধবনিতা। সবাই বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। আমরাও তখনকার মতো সাহিত্যপাঠে ইতি টেনে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শামিল হয়েছি। একের পর এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে চলেছে। আমরা তখন সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। আমি ও হুমায়ূন ইংরেজিতে, নাসিম কমার্সে এবং হাবিব বাংলায়। কিছুদিন ক্লাস করার পর বই-খাতা নিয়ে আর ইউনিভার্সিটি যাই না। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গণে আমাদের বিচরণ তখন অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই রাজপথের মিছিল শেষ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। ওখানে চলতে থাকে সভা-সমাবেশ একটার পর একটা। অধিকাংশ বক্তা তখনকার তুখোড় ছাত্রনেতারা। কে ছিলেন না ঐ তালিকায়? নিয়মিত রক্ত গরম করা বক্তৃতা দিয়ে যেতেন তোফায়েল আহমেদ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী, শেখ ফজলুল হক মণি, আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, মাহবুব উল্লাহ, মতিয়া চৌধুরী প্রমুখ।

 

চার

এক অবিস্মরণীয় ঘটনা অপেক্ষা করছিল জাতির জন্য। সেদিন মার্চের ২ তারিখ, ১৯৭১। অন্যান্য দিন যেরকম যাই, সেদিনও আমি দশটা-এগারোটার দিকে বাসা থেকে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম ক্যাম্পাসে। দ্রুত হেঁটে গেলে কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের পথ। বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের সামনের রাস্তা থেকেই হালকা ভিড়। মানুষের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা। লাইব্রেরি বাঁয়ে রেখে ক্যাম্পাসের দিকে যত যাই, ভিড় তত ঘন। মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছে, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘জয় বাংলা’ ইত্যাদি। মানুষ ছুটছে বটতলার দিকে। আমি ভাবলাম, কোনো বড় ছাত্রনেতা বুঝি আসবেন। নাকি স্বয়ং শেখ মুজিব। ধমনিতে শিহরন খেলে গেল। ভিড়ের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে আমি কলাভবনের সামনের জায়গাটায় পৌঁছালাম। দেখি পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য। সবার চোখ কলাভবনে ঢোকার বাঁ দিকে ছোট গেটটার সিঁড়ির ওপরের ছাদের দিকে। মানুষ গিজগিজ করছে। বেশকিছু ছাত্রনেতাকে দেখলাম উত্তেজিতভাবে কথা বলছেন। লাউড স্পিকারে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হতে যাচ্ছে কি এখন? আমার বন্ধুদের কাউকে দেখলাম না। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করতে জানাল, একটু পর ছাত্রনেতারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবেন। উত্তেজনা সামলে রাখতে পারছিলাম না আমি। কী দারুণ ঘটনা! পাকিস্তানের বদলে এখন তোলা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা? তার অর্থ বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে?

মাইকে ঘোষণা হলো, এখন তোলা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম ঐ সময়ের দু-তিন জন প্রধান ছাত্রনেতা একটা চিকন বাঁশের মাঝামাঝি জায়গায় প্যাঁচানো একখণ্ড চৌকোনা কাপড়ের ভাঁজ খুলে দড়ি টেনে টেনে ওপরের দিকে তুলছেন। আহা, আমাদের প্রাণপ্রিয় পতাকা। সবুজ জমিনে একটা গোল লাল জায়গা—মানে সূর্য। ওতে সোনালি রঙে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র। পতাকা বাঁশের ডগায় উঠছে ধীরে ধীরে। সমবেত জনতা গগণবিদারি স্লোগান দিচ্ছে। ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ ইত্যাদি। বেশকিছু তরুণ-তরুণীর গলায় ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি ...।’ অল্পসময়ের মধ্যে সমাপ্ত হলো পতাকা উত্তোলন পর্ব। আটচল্লিশ বছর আগের ঘটনা। যতদূর মনে হচ্ছে, সেদিনের ঐতিহাসিক মুহূর্তটিতে উপস্থিত ছিলেন আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ ছাত্রনেতা।

দেখতে দেখতে এসে গেল ৭ মার্চ, যেদিন শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার কথা। মার্চের প্রথম দিন থেকেই পুরো দেশ বিক্ষুব্ধ। আমি এবং আমার বন্ধুরা উত্তেজনায় ভুগছি—স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়ে গেছে, স্বাধীনতার ঘোষণা কবে হবে। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের জনসভার জন্য পুরো বাঙালি জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আমাদেরও দিন কাটছে প্রবল উত্তেজনায়, তাতানো অপেক্ষায়।

৭ মার্চ বিকেলে শেখ মুজিবের জনসভা। পুরো পূর্ববাংলা তাকিয়ে আছে ঐ মাহেন্দ্রক্ষণটির দিকে। আব্বা তখন সদ্য সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। অবসর-পূর্ব এক বছরের ছুটি কাটাচ্ছেন। পেনশনের টাকা হাতে আসতে এখনো দেরি। আব্বার ওটা নিয়ে কোনো উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা নেই। তিনি পূর্ব-পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান। তাঁর অটল বিশ্বাস, শেখ সাহেব ৭ মার্চের জনসভায় স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। দুটো বাজার পরপর আমরা অর্থাত্ আব্বা, আমি, আমার এক খালু, খালাতো ভাই হেলাল এবং পাড়ার অন্যান্যরা রওনা দিলাম রেসকোর্সের দিকে। সেন্ট্রাল রোড থেকে রেসকোর্স ময়দানে দ্রুত হেঁটে গেলে লাগে আধঘণ্টারও কম সময়। শাহবাগ এলাকায় পৌঁছে দেখি, চারদিক থেকে মিছিল আসছে। কিশোর-তরুণ-প্রৌঢ়-বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ আছে ওসব মিছিলে। তরুণী এবং বয়স্ক মহিলারাও আছেন। গগণবিদারী স্বাধীনতার স্লোগান ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। অধিকাংশ মানুষের হাতে বাঁশের লাঠি। আমরা যখন রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছালাম, মাঠ তখন দ্রুত ভরে যাচ্ছে। আমরা ঠেলেঠুলে সামনের দিকে গিয়ে পত্রিকা বিছিয়ে বসলাম। আমি বসিনি। বারবার দাঁড়িয়ে গিয়ে দেখছিলাম সভাস্থলের দিকে আসতে থাকা জনস্রোত। আমি এর আগে কখনো বড় জনসভায় যাইনি। হাতিরপুল এলাকার এ বাসায়, ও বাসায় প্রায়ই গুপ্তসভা হতো। আমার প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা-মামা সৈয়দ কুতুবুর রহমান আমাকে সেসব আন্ডারগ্রাউন্ড মিটিংয়ে নিয়ে যেতেন। মূলত ন্যাপের মোজাফফর আহমদ, মহীউদ্দিন এবং কম্যুনিস্ট পার্টির নেতারা আসতেন সেসব গুপ্তসভায়। কথা হতো নিচু গলায়। কারণ গোয়েন্দারা মিটিংয়ে আসা নেতাদের ওপর নজর রাখত।

আমি এক সময় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম নৌকার আকৃতিতে বিশাল মঞ্চ তৈরি হয়েছে। মঞ্চের সামনে কিছু জায়গা বাঁশের ঘেরাও দিয়ে রাখা। ওখানে রয়েছেন মহিলারা। এর কিছুটা পেছনে আমরা। সবাই অস্থির। কখন নেতা আসবেন। চারদিকে নানা গুজব। কারণ হেলিকপ্টার উড়ছিল মাথার ওপর। কেউ কেউ বললেন শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া মাত্র হেলিকপ্টার এবং জেটবিমান থেকে জনসভার ওপর গুলিবর্ষণ হবে। মানুষ ওসবের তোয়াক্কা করছে না। সবার দৃষ্টি মঞ্চের দিকে। পুরো রেসকোর্স কানায় কানায় ভরছে না দেখে আমার একটু খারাপ লাগছিল। আব্বা বললেন, অনেক মানুষ এখনো পথে। ওরা এসে গেলে মাঠ ভরে যাবে। আমি আশ্বস্ত হলাম।

দেখতে দেখতে রেসকোর্স ময়দান লোকে লোকারণ্য। চারদিকে শুধু  স্লোগান—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘জয় বাংলা’। একইসঙ্গে চলছে বাঁশের লাঠি উঁচিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মহড়া। সবার অধীর প্রতীক্ষা, কখন আসবেন বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিব, কখন দেবেন স্বাধীনতার ঘোষণা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্র। টগবগে তরুণ। কলেজের শুরুতেই বাঙালি জাতীয়তাবাদে দীক্ষা হয়ে গেছে। ‘পাকিস্তান’ শব্দটা তখন আমার কানে অসহ্য লাগে। অথচ ঐ দেশে আমার মা আর এক ছোট ভাইয়ের কবর। বোধহয় জীবনে আর সেখানে যাওয়া হবে না। এখনো হয়নি। আমার বয়স এখন সাতষট্টির ওপর। কী এক রক্তাক্ত টানাপোড়েন! একদিকে জন্মদাত্রী জননী, অন্যদিকে দেশমাতৃকা, যার মধ্যে প্র্রোথিত আমার পুরো অস্তিত্বের শেকড়। মাকে ভুলিনি, তাঁর নিঃসঙ্গ কবরটি ভুলিনি। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং পাকিস্তানের নিগড় থেকে দেশকে মুক্ত করার অঙ্গীকার ঐ তরুণ বয়সে আমার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমি প্রথম দেখি আমার বাসার পাশে সেন্ট্রাল রোডে। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। ১৯৬৪ সাল। আমরা চার-পাঁচজন বন্ধু হাতিরপুলের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাত্ দেখলাম কয়েকজন মাঝবয়সী মানুষ একটা লাইটপোস্টের পাশে দাঁড়িয়ে কোনো বিষয় নিয়ে উত্তেজিতভাবে কথা বলছেন। ওদের মধ্যে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামাপরা একজন মানুষ উচ্চতায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। আমাদের মধ্যে কেউ একজন বলে উঠল, ‘ওই দ্যাখ্্, শেখ মুজিবর।’ আমি তাঁর নাম শুনেছি বাসায়, ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতায় তাঁর ছবিও দেখেছি। সামনা-সামনি দেখলাম ঐ প্রথম। পত্রিকার ছবির সঙ্গে তাঁকে মেলাতে একটু সমস্যা হচ্ছিল। কিছুক্ষণ একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকার পর আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না, উনিই শেখ মুজিব। তাঁর ভরাট গলা, কথা বলার ভঙ্গি সবই অন্যদের চেয়ে আলাদা। ওখানে এলাকার বিখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা কালু চৌধুরীও ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কথা বলতে বলতে অদূরে দাঁড়ানো আমাদের দিকে তাকাচ্ছিলেন একটু পরপর। এক সময় তিনি হাতের ইশারায় আমাদের কাছে ডাকলেন। আমরা খানিকটা সংকোচের সঙ্গে এগিয়ে গেলাম। আমার ভয় হচ্ছিল, তিনি আমাদের বকা দেবেন। ও মা! কাছে যেতেই তিনি আমাদের সবাইকে পরম স্নেহে দু হাতে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিলেন। তাঁর প্রথম প্রশ্ন, ‘কোন স্কুলে পড়ো তোমরা?’ আমরা যার যার স্কুলের নাম বললাম। আমার স্কুলের নাম বলতে আমার দিকে তিনি বিশেষভাবে তাকালেন। সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুল তখন ঢাকার সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে নেতা বললেন, ‘মন দিয়া পড়াশোনা করবা। খেলাধুলাও করবা। কিন্তু পড়াশোনা আগে। মনে থাকবে?’ আমরা সবাই একসঙ্গে মাথা ঝাঁকালাম। মাথায় বঙ্গবন্ধুর হাতের স্পর্শ আমি এখনো অনুভব করতে পারি। অবশেষে নেতা উঠে এলেন বিশাল মঞ্চে। তিনি বক্তৃতা শুরু করলেন, ‘ভাইয়েরা আমার...।’ তারপর এক অনবদ্য, দীর্ঘ কবিতা। ফুলের মালার মতো কথার পিঠে কথা গাথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বক্তৃতা। আমি তখনো কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তৃতা শুনিনি। শুনলাম জীবনে ঐ প্রথম। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রইলাম বঙ্গবন্ধুর ভাষণে। পুরো মাঠ স্তব্ধ, আচ্ছন্ন—সবার চোখ মঞ্চে মাইকের সামনে নানা ভঙ্গিতে দু হাত নাড়িয়ে, তর্জনি উঁচু করে বক্তৃতারত নেতার দিকে। ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, এই ঐতিহাসিক ঘোষণার ভেতর দিয়ে শেষ হলো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। মুহূর্তে মুক্তিকামী লাখো জনতার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে, করতালিতে আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে প্রকম্পিত হতে থাকল পুরো রেসকোর্স ময়দান। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। হুড়োহুড়ি নেই। সবাই নানা স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত করে রাস্তায় উঠে আসছে। আমরা তরুণরা বুঝে নিলাম স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়ে গেছে। এবার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। পরদিন থেকে পুরো বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন। অন্যদিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ভুট্টো, ইয়াহিয়া প্রমুখের সঙ্গে শেখ মুজিবের আলোচনা। অচিরেই বোঝা গেল, ওটা ছিল আলোচনার নামে প্রহসন। হাজারো মানুষের সঙ্গে আমরা রোজ তবু হোটেলের সামনে, কখনো পাশে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি আলোচনার ফলাফলের জন্য। পাকিস্তানি শাসকচক্র এবং ক্ষমতালিপ্সু ভুট্টো তখন বঙ্গবন্ধুকে সম্বোধন করতে শুরু করেছেন ‘পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে। কী নির্মম ভণ্ডামি! সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। তিনি পূর্ব-পাকিস্তানে কোনোধরনের বাঙালি হত্যাযজ্ঞ এড়িয়ে তখনকার নির্বাচন-পরবর্তী অচলাবস্থার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাইছিলেন। বাঙালির মহান নেতা ততদিনে বুঝে ফেলেছিলেন, ঐ আলোচনা ছিল পাকিস্তানি শাসকচক্রের কালক্ষেপণের চাল। পুরোটাই ছিল নাটক। ওরা ঠাণ্ডা মাথায় আলোচনার নেপথ্যে একটি নির্বিচার গণহত্যা চালাবার ছক আঁটছিল।

পাঁচ

১৯৭১-এর পঁচিশে মার্চ রাতের আগে ঢাকার মানুষ আগে কখনো পরপর তিনটা গুলির শব্দও শোনেনি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরুর রাতে বাঙালি আতঙ্কে, বিস্ময়ে শুনল ভারী মেশিনগানের গুলি ও কামানের গোলার শব্দ। সারারাত ঢাকার চারদিকের আকাশ ছিল লাল। চারদিকে আগুন আর ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের আর্তচিত্কার। বাসা সেন্ট্রাল রোডের ভেতরের দিকে বলে এসবের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমাদের। ২৫ মার্চ সারারাত আমরা নির্ঘুম কাটাই। ২৬ ও ২৭ মার্চ দিনরাত একটানা কারফিউ। ২৮ মার্চ সকালের দিকে তিন ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হলো। সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার ক জন বন্ধু মিলে বেরিয়ে পড়লাম। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় তখন গুলিতে ঝাঁঝরা লাশ। রক্ত হিম করা ধাতব শব্দে টহল দিচ্ছে ট্যাঙ্কের বহর। ট্যাঙ্কের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় শরীরের অর্ধেক বের করা পাকিস্তানি সেনাদের আঙুল মেশিনগানের ট্রিগারে। চারদিকে সতর্ক, কঠিন দৃষ্টি। আড়চোখে ঐ যমদূতদের দেখতে দেখতে আমরা পুরো নীলক্ষেত এলাকা ঘুরি দ্রুত পায়ে। দেখলাম কামানের গোলায় বিধ্বস্ত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে শহিদ মিনার। রেসকোর্সের একপাশে রমনা কালী মন্দিরে আগুনে পুড়িয়ে মারা মানুষের লাশের স্তূপ। ফুটপাতে ইতস্তত ছড়ানো ভবঘুরে মানুষের লাশ। সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য দেখলাম জগন্নাথ হলের মাঠে। মাঠের মাঝখানে সবুজ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে কাঁচা মাটি। আমাদের মধ্যে একজন দেখাল একটা হাত মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আছে। ওটা ছিল একটা গণকবর। পরে শুনি, বন্দুকের মুখে হলের ভেতর থেকে ছাত্রদের বের করে মাঠে এনে ওদের দিয়ে গর্ত খোঁড়ায় নরপশুরা। তারপর ওদের গর্তের কিনারে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে। ছাত্ররা একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে অন্য ছাত্রদের এনে ঐ সব গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করায়। হিটলারের নািস বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের পর এরকম বর্বরতা তখনো পৃথিবীতে ঘটেনি। পরে শুনেছি জগন্নাথ হলের মাঠে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ একটি আট মিলিমিটার মুভি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন পার্শ্ববর্তী শিক্ষকদের আবাসিক ভবনের বাসিন্দা এক দুঃসাহসী তরুণ লেকচারার।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হলো ঢাকাবাসীদের শহর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে চলে যাওয়ার হিড়িক। ত্রিপুরা যাওয়ার আগে আমি বাসার সবার সঙ্গে গিয়ে উঠলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার অন্তর্ভুক্ত এক গ্রামে। ওটা ছিল আমার মামাবাড়ি। তখনো জানি না আমার প্রিয় বন্ধুদের কে কোথায়। পরে শুনেছি নাসিম বর্ডার ক্রস করে কলকাতায় গিয়ে উঠেছে, এবং যোগ দিয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। ১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পড়েছে।

দিনটি ছিল এপ্রিলের মাঝামাঝি। এক দুপুরে তিতাসের পাড়ে বসে আছি। ওটার কূল ঘেঁষেই আমার মামাবাড়ি। হঠাত্ গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার শরাফত মামা হন্তদন্ত হয়ে মামাবাড়ির উঠানে এসে হাজির। খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে এ পাড়ায় আসতে হয়। মামার লুঙ্গি মালকোচা করে পরা। তাঁর সঙ্গে খাকি প্যান্ট আর গেঞ্জিপরা দুই তরুণ। এদের একজনকে বয়সে বড় বলে মনে হলো। তিন জনেরই কাঁধে রাইফেল। পেছনে গ্রামের আধাপরিচিত তাগড়া জোয়ান এক কিশোর। ওর পাশে আরেকজন মাথায় একটা কাঠের বাক্স। মাটিতে রাখা একটা ফিল্ডগান, অর্থাত্ কামান। আমি তখন জীবনে ঐ অস্ত্রটি প্রথম দেখি। পরে জেনেছি সব।

মামা একনাগাড়ে বলে গেলেন, চকের ওপাশে বড় মেঘনা দিয়ে একটা পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ যাবে কিছুক্ষণ পর। ইপিআর-এর ওয়্যারলেসে খবরটা ধরা পড়েছে। জাহাজটা এলাকার সব গ্রাম আক্রমণ করবে। এগুলোতে নাকি মুক্তবাহিনীর ট্রেনিং হচ্ছে। আমি দেখলাম স্যান্ডো গেঞ্জি প্যান্টপরা দুই তরুণের একজনের হাতে ওয়্যারলেস। উর্দুতে বেশ কিছু মানুষ একসঙ্গে কথা বলছে। বুঝে নিলাম এরা ইপিআর বাহিনীর সৈনিক। উত্তেজনায় আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না, যখন মামা বললেন ওরা নদীর পাড়ে পাটখেতের ভেতর থেকে জাহাজ আক্রমণ করবেন। চওড়া মেঘনা আমার মামাবাড়ি থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। সারি সারি পালতোলা নৌকা, লঞ্চ চলাচল করে সারাক্ষণ। তখন অবশ্য এগুলোর সংখ্যা থেমে গেছে। নদীটা আসলে দেড়-দুই মাইল দূরে। এপ্রিলের কাঠফাটা রোদে আমরা যখন পাটখেতের ভেতর দিয়ে জোর কদমে হেঁটে, দৌড়ে নদীর কাছে গিয়ে পৌঁছালাম, ঘামে আমাদের গোসল হয়ে গেছে। যে কিশোর দুজন কামান আর গোলার বাক্স বয়ে আনছিল, ওদের শোচনীয় অবস্থা। কিন্তু ওদের মুখ সতেজ। পেশি টানটান। আমি নিজের মুখটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম।

মামা আমাকে দল থেকে আস্তে করে বেরিয়ে গিয়ে নদীর পাড়টা রেকি করে আসতে বললেন; বিশেষ করে খেয়াল করতে বললেন দূরে জাহাজের উঁচু মাস্তুলগুলো দেখা যায় কি না। আমাকে আর উঠতে হলো না। দুই ইপিআর জওয়ানের বড় জন জোরে বলে উঠলেন, ‘হাতিয়ার রেডি। সাউন্ড আসতেছে। কুইক!’ শরাফত মামা আমাকে তাঁর পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে বললেন। একটা বড় বায়নোকুলার দিলেন হাতে। আমার খুব উত্তেজনা হচ্ছিল, ভয়ও লাগছিল সামান্য। দেখতে দেখতে জাহাজটা আমাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে এসে গেল। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম ডেকের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর সৈনিকরা কামানে গোলা ভরছে। একজন একটা টুলের ওপর দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে কিছু বলছিল। বাকিরা মাথা নিচু করে শুনছিল। স্ট্যান্ড-অ্যাট-ইজ ভঙ্গিতে সবাই দাঁড়ানো। অন্যদিকে বেশকিছু সৈনিক প্যারেড করছে, আরেক দল বাতাসে বেয়নেট চার্জের মহড়া করছে। দেখতে দেখতে বিশাল জাহাজটা আমাদের প্রায় চোখের সামনে। শরাফত মামা বললেন, ‘রাইফেলে কাজ হবে না। ফিল্ডগান লাগবে। হেভি শিপ।’ সঙ্গে সঙ্গে ইপিআর-এর এক সৈনিক কামানে শেল ঢোকালেন।  জোরে জোরে বললেন, ‘কানে হাত।’ সঙ্গে সঙ্গে গগণবিদারী শব্দ। আমি বায়নোকুলারে দেখলাম বেশকিছু পাকিস্তানি সেনা লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। মনে হলো হঠাত্ আক্রমণে ওরা হতভম্ব। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওরা পরিস্থিতি সামলে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করল। ওদেরটাও ফিল্ডগান। অনবরত গোলার স্প্লিন্টার উড়ে যাচ্ছে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে। আমরা সবাই মাটির সঙ্গে মিশে উপুড় হয়ে শুয়ে আছি। কামানের গোলা ছুড়ছিলেন যে ইপিআর সৈনিক, তিনি অবিরাম চার্জ করে যাচ্ছিলেন। শেল ভরছিল দুই কিশোরের একজন। শরাফত মামা অবিরাম গোলাবর্ষণের মধ্যে চিত্কার করে বলে উঠলেন, ‘এবার রিট্রিট। ওরা আমাদের চেয়ে অনেক পাওয়ারফুল। এবার এয়ারফোর্সের প্লেন এসে পড়বে। লেট আস মুভ ব্যাক। আমাদের অপারেশন সাকসেসফুল।’ মামা কথা শেষ করতে পারলেন না। এক ডজন স্যাবার জেট বিদ্যুত্গতিতে উড়ে গেল আমাদের মাথার ওপর দিয়ে। ইপিআরের দুই জওয়ানের সিনিয়র জন বললেন, ‘স্টপ অল মুভমেন্ট। ঘাসের সঙ্গে মিশে মাটিতে লাশের মতো আমরা এখন পড়ে থাকব। কতক্ষণ জানি না। আগে প্রাণ বাঁচাতে হবে। তারপর যুদ্ধ। অনেক যুদ্ধ আছে সামনে। জয় বাংলা।’

 হাতে, পিঠে, মুখে পাটখেতের হলুদ বিছা হাঁটছে। শরীর অবশ হয়ে আছে। আবার জেটগুলো আমাদের ওপর দিয়ে আরেকটা চক্কর দিয়ে গেল। আমার হাত থেকে বায়নোকুলারটা নিয়ে চোখে লাগিয়ে বেশ কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখলেন একজন সৈনিক। তারপর বলে উঠলেন, ‘সর্বনাশ, এক্ষণ ওঠেন সবাই। জাহাজ পাড়ে ভিড়তেছে। আমাদের এই জায়গা ছাড়তে হবে। নাইল্যা খেত উঁচা আছে। কুজা হইয়া সবাই গ্রামের দিকে চলেন। কামানের দায়িত্ব আমি নিলাম।’ এপ্রিলের তীব্র রোদে ঘামে জবজবে হয়ে যথাসম্ভব নিচু হয়ে এগুতে থাকলাম। শরাফত মামার খুব সাহস। তিনি এক ফাঁকা মাথা উঁচু করে জাহাজের অবস্থানটা দেখে বললেন, ‘জাহাজ পাড়ে ভিড়ছে। শালারা নামার পাঁয়তারা করতেছে। মনে হয় ভয়ও পাইছে। ও ভাই, মারেন না আরো কয়খান শেল!’

‘পাগলামি কইরেন না। এখন পাগলামির সময় না। আগে জান বাঁচান। আইজ রাইতে সব গ্রাম ঘেরাও দিয়া গুলি কইরা মানুষ মারব। তার পরে গ্রাম জ্বালাইয়া দিব। বিকালের মধ্যে সব গ্রাম খালি করতে হইব। আগান। হাত পাও ছিলা গেলেও আগান।’ ইপিআরের বয়স্ক সৈনিক ভদ্রলোক একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন।

দ্রুত বিকেল নেমে এল। তারপর দেখতে দেখতে সন্ধ্যা। মামাবাড়ি পৌঁছে দেখি লোকজন বাক্স-তোরঙ্গ গোছাচ্ছে, গাট্টি-বোঁচকা বাঁধছে। সবার চোখমুখ সন্ত্রস্ত, ফ্যাকাশে। নানা গম্ভীরভাবে সবকিছু তদারিক করছেন। তিনি বলছেন, তিনি বাড়ি ছাড়বেন না। তিনি চলে গেলে গোয়ালভর্তি গরুগুলি কে দেখবে। একথা শুনে মহিলাদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল। ‘আমি বুড়া মানুষ। মিলিটারি আমারে কিছু করবে না।’ আমরা সন্ধ্যার আগে-আগে বড়মামার শ্বশুরবাড়ি মোহিনীপুরের দিকে রওনা হয়ে গেলাম। সারারাত হাঁটতে হবে। ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর কে যেন চিত্কার করে বলে উঠল, ‘সবাই পিছে দেখেন।’ দেখলাম অন্ধকার প্রান্তরের ওপারে দাউ দাউ করে গ্রাম জ্বলছে। আকাশের বর্ণ লাল। মানুষের আর্তচিত্কার ভেসে আসছে। ঐ শব্দ ছাপিয়ে রক্ত হিম করা কামানের গোলার শব্দ। একটা শব্দ অচেনা মনে হলো। ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন বলল, ‘মেশিনগান চালাইতাছে।’ পড়িমড়ি করে আছাড় খেয়ে, ধুলোকাদা আর রক্তমাখা অবস্থায় আমরা যখন মোহিনীপুর পৌঁছালাম, ঘড়িতে রাত সাড়ে তিনটা।

তিনদিন ছিলাম আমরা, সব মিলিয়ে মামাবাড়ির পঁচিশ-ত্রিশজন মানুষ, মোহিনীপুর গ্রামে। যখন মামাবাড়ি ফিরে এলাম, পুরো বাড়ি তছনছ। গোয়ালঘর ফাঁকা। একটা গরুও নেই। নানা নদীর পাড়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। নদীর ওপারে জ্বলন্ত গ্রামের পর গ্রাম দেখে গরুগুলো দড়ি ছিঁড়ে যে যার মতো ছুটে বেরিয়ে গেছে। তার ওপর ভারী কামানের গোলার শব্দ। নানা বুদ্ধি করে স্বাধীন বাংলার পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন একটা লম্বা লগির মাথায়। তিনি ছিলেন এলাকার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তাঁর কাছে একটা পতাকা রাখা ছিল, যেটা তাঁকে ওড়াতে হতো ১৪ আগস্ট পাকিস্তান দিবসে। সরকারের নির্দেশ। খোঁজাখুঁজির পর দুটো গরু পাওয়া গেল। বাকিগুলো হারিয়ে যায় চিরতরে।

কিছুদিন পর দূর-দূরান্ত থেকে শরণার্থীরা দল বেঁধে আসতে থাকে নবীনগর লঞ্চঘাটে। ওখান থেকে লঞ্চে করে ওরা যাচ্ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে কসবায় পৌঁছে ত্রিপুরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে, অর্থাত্ আগরতলা শহরে এবং বিভিন্ন এলাকায়। মামাবাড়ি বা ঢাকার বাসার কাউকে কিছু না জানিয়ে আমিও ঠিক করলাম শরণার্থীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে ত্রিপুরা চলে যাব। সেখান থেকে মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্প। যাওয়ার দিন নবীনগর ঘাটে অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে লঞ্চের অপেক্ষা করছি। দশটা-এগারোটা বাজে। সবকিছু ঠিকঠাক মতো চললে বিকেল চারটার মধ্যে আমি আগরতলা পৌঁছে যেতে পারব। সেখান থেকে দীর্ঘ, দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে মেলাঘর। ওই পথটুকু নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় ছিলাম। অনেকে যানবাহন না পেয়ে হেঁটে চলে যায় ত্রিপুরার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। আর আমি যাব মেলাঘরে। সেখানে যাওয়ার সঙ্গী পাব কি না কে জানে! এসব নিয়ে ভাবছি, হঠাত্ কাঁধে হাতের স্পর্শ। পেছনে তাকিয়ে দেখি বড়মামা। থতমত খেয়ে গেলাম।

এইখানে কী? মামা জিজ্ঞেস করলেন।

কিছু না। মানুষ দেখতাছি। এত মানুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাইতেছে। কারণটা কী। আমি ঢোঁক গিলে বললাম।

তুই বুঝি জানস না? তোর হাতে ব্যাগ ক্যান? আমার হাতে নীল রঙের চৌকোনা লম্বাটে একটা ব্যাগ ছিল। আগেকার দিনে ডাক্তাররা এটা নিয়ে রোগীদের ভিজিটে যেতেন।

আমি একটা যুতসই উত্তর খুঁজছিলাম। কী বিপদে পড়া গেল।

মেলাঘর যাইতাছস? এখন এই নামই লইস না। কসবা বর্ডারে গণ্ডগোল হইতাছে। অনেক মানুষ মারা গেছে। আমি তোরে কুমিল্লা বর্ডার দিয়া পার কইরা দিমু। সঙ্গে গ্রামের আরো অনেক ছেলে যাবে।

মন খারাপ হয়ে গেল আমার। মুখে কিছু বললাম না। বড়মামা বলে কথা। আমার সাত মামার মধ্যে সবার বড়। কুমিল্লা বর্ডার দিয়েও আমার আর ত্রিপুরা যাওয়া হয়ে ওঠে না। মামা বলেন বর্ডার ‘গরম’। সময় এলে বলবেন। পরে বুঝলাম, উনি আমাকে একা মেলাঘর পাঠাতে চাইছিলেন না। মামার গ্রামের ছেলেরা এপ্রিলের শুরুতেই ওপারে চলে গেছে। তার ওপর আমি মামাদের একমাত্র বোনের ছেলে। আম্মা ছিলেন সাত ভাই চম্পার মতো। তাঁর মৃত্যুর খবর নিয়ে যে টেলিগ্রাম আসে করাচি থেকে চৌদ্দ বছর আগে, সেটা পোস্ট অফিস থেকে সংগ্রহ করেন এই মামাই। টেলিগ্রামটি হাতে নিয়ে মামা প্রায় সারাদিন নিজের কাছে রেখেছিলেন। হাউমাউ করে কেঁদেছেন কখনো নদীর পাড়ে, কখনো নৌকায় বসে মাঝগাঙে। এহেন মামা আমাকে অজানা গন্তব্যে ছাড়তে চাইছিলেন না। বোধহয়, তাঁর আশঙ্কা ছিল আমি মুক্তিযুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরে আসতে পারব না। মেলাঘর আমার যাওয়া হয়ে ওঠেনি সেবার। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত কাজে ঢাকা থেকে আগরতলা গিয়েছিলাম জুলাই মাসে। আমি তখন ঢাকাকেন্দ্রিক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে হাতিরপুলের একটি গোপন আস্তানা থেকে সাইকোস্টাইল মেশিনে ‘স্বাধীনতা’ নামে হাতে লেখা একটি বুলেটিন বের করি। ঐ আস্তানায় আগরতলা এবং কলকাতার অনেক বুলেটিন ও পত্রিকা আসত। নানা ছদ্মবেশে এবং বিভিন্ন গোপন পদ্ধতিতে আমরা কয়েকজন তরুণ ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকাটি ঢাকার বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতাম। খুবই বিপদসঙ্কুল কাজ ছিল ওটা। আমি এবং আমার এক বন্ধু একবার বাজারের ব্যাগে ভরা বুলেটিনের বান্ডিলসহ রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পের সামনে ধরা পড়ে গেলাম। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সে কী অমানুষিক নির্যাতন। নেহাত ভাগ্যের জোরে প্রাণে বেঁচে যাই।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ঢাকা ছিল জনশূন্য শহর। জনসংখ্যার ষাটভাগ চলে গেছে গ্রামাঞ্চলে। সরকারি চাকরিজীবীরা ছাড়া ঢাকায় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ছিল না প্রায়। পাকিস্তানি বাহিনী চাপ দিয়ে কিছু স্কুল-কলেজ খুলিয়ে রেখেছে। ছাত্রছাত্রী নেই। এক-দুই জন শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষক বা প্রিন্সিপাল হাজির থাকেন। রাস্তায় মানুষ নেই প্রায়। পথচারীরা ভয়ার্ত মুখে দ্রুত চলাচল করে। অধিকাংশ মানুষের মাথায় টুপি। শার্টে, পাঞ্জাবিতে কলেমা বা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ লেখা কাগজের ব্যাজ। ঘর থেকে বেরিয়েই মানুষ ভেবে নেয়, কোন রাস্তা ধরে গেলে পাকিস্তানি বাহিনী বা রাজাকার-আলবদরের ক্যাম্প সামনে পড়বে না। আমি তখন অন্যদের সঙ্গে ঢাকার ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার মুদ্রণ এবং বিতরণ নিয়ে ব্যস্ত। সেন্ট্রাল রোডের বাসায় আব্বা, আমি এবং আমার এক নানা। একজন মামাও ছিলেন কিছুদিনের জন্য। আগস্টের দিকে শহরে ক্র্যাক প্লাটুনের অপারেশন শুরু হয়ে গেছে। রাত আটটা-নটার দিকে শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর এলোপাথাড়ি গুলি। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্র্যাক প্লাটুনের গ্রেনেড এবং এলএমজির প্রত্যুত্তর। ভোররাত পর্যন্ত চলে এসব খণ্ডযুদ্ধ। ঢাকায় তখন যে ক জন মানুষ আছে, সবাই রাতভর গোলাগুলির শব্দে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। গুলি বা গ্রেনেড ফাটার শব্দ না শুনলে ঘুম আসে না। দিনের বেলা ঢাকা আতঙ্কের নগরী। সন্ধ্যার পর শহর চলে যায় ক্র্যাক প্লাটুন এবং অন্যান্য গেরিলা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। এগুলোর একটি ছিল গ্রীন রোডের আজিজ বাহিনী। বেশ ক টি দুঃসাহসী অপারেশন চালায় গ্রুপটি ধানমন্ডি, ফার্মগেট ও নিউমার্কেট এলাকায়। আজিজ ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের ছাত্র ছিল। বরাবর একটু দুর্ধর্ষ ধরনের। দুঃখ হয় এই ভেবে যে, ঢাকার মুক্তিযুদ্ধকালীন অপারেশন নিয়ে যেসব ইতিহাস লেখা হয়েছে সেগুলোতে তেমনভাবে আজিজ বাহিনীর উল্লেখ নেই। অথচ ও ছিল আপাদমস্তক একজন গেরিলা যোদ্ধা।

ছয়

ডিসেম্বর প্রথম সপ্তাহ থেকে ঢাকা বিমান বন্দরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে পূর্ব-পাকিস্তানকেন্দ্রিক পাকিস্তান এয়ারফোর্সের সব বিমান ধ্বংস হয়ে গেছে। চারদিক থেকে বিভিন্ন অঞ্চল মুক্ত করে ঢাকার দিকে এগিয়ে আসছে যৌথবাহিনী। দেখতে দেখতে এসে গেল বিজয়ী যৌথবাহিনীর কাছে পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিন, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি হলো ঢাকার তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে। গুজব ছিল সারেন্ডারের আগে পাকিস্তানি বাহিনী ঘরে ঘরে ঢুকে বাঙালি নিধন করবে, মর্টার শেল মেরে শহর গুঁড়িয়ে দেবে। মূলত এসবের কিছুই হলো না। ১৬ ডিসেম্বর বিকেল চারটায় যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডারের প্রধান জেনারেল নিয়াজি। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এখনকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভুদ্যয়ের ঐ ঐতিহাসিক মুহূর্তের একজন নগণ্য সাক্ষী ছিলাম আমিও। পুরো অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত থেকে অন্যান্যদের সঙ্গে গলা চিরে স্লোগান দিই ‘জয় বাংলা’। তারপর খণ্ড খণ্ড মিছিলের সঙ্গে ঘুরি শহরময়।

১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত এবং স্বাধীন হলো এবং একইসঙ্গে জন্ম নিল আমার পূর্ণাঙ্গ লেখকসত্তা। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পর কলম সরিয়ে রেখেছিলাম। ১৭ ডিসেম্বর সেই ফাউন্টেন পেনে আবার কালি ভরলাম দোয়াত থেকে। লিখলাম আমার প্রথম কবিতা ‘জানু ভেঙে বসে আছি পদ্মপাতায়’। মুদ্রিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কবিতা-সংকলন ‘হে স্বদেশ’-এ ১৯৭২ সালে। আমার কলম থামেনি। থামবেও না যতকাল বেঁচে আছি। v