কত দ্বিধা এসে জড়ো হয়, কত অনিশ্চয়তা ঘূর্ণি তোলে আর কত ভয়ও খেলা করে—তারপরও কবির আদনান চেয়েছিলেন, শেষ জীবনটা গ্রামে কাটাবেন। একেবারে নির্জলা, নির্জন নিজের গ্রামে। শুধু চাওয়া নয়—নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষ তিনি, প্রার্থনাও করেছিলেন হূদয়ের অন্তঃস্থল থেকে বহুবার। কিন্তু বয়স বাড়ছে এখন, তাঁর চাওয়া-চাওয়ির উচ্চারণ প্রতিদিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। যদিও প্রার্থনার পালে হাওয়া লাগছে সকাল-বিকাল। একটু ফুরসত পেলেই প্রার্থনা করেন তিনি, আল্লাহ, আমাকে গ্রামে গিয়ে মরার তৌফিক দিও আল্লাহ।
আগে এরকম হতো না। আগে কবির আদনান মনে মনে নিজের হূিপণ্ডটাকেই টুকরো টুকরো করে যেনবা ইটের পাঁজা বানাতেন। তারপর সেইসব হূত্টুকরোগুলো দিয়ে আবার ঘরদোর তুলতেন। আশ্চর্য, তাতে একটুও শ্বাসকষ্ট হতো না তাঁর। কিন্তু ইদানীং প্রায়ই এই শহরে দম আটকে আসে তাঁর। আরো অদ্ভুত ব্যাপার, প্রায়ই এলোমেলা সব গাছ-গুল্মের নাম মনে পড়ে—যেগুলোর অস্তিত্ব তাঁর জীবনে ছিল বলেও মনে হয় না। প্রায়ই মনে হয়, ভোরের নেওরে তাঁর পায়ের গোড়ালি ভিজে উঠেছে আর তাতে কদম ফুলের পাপড়ির মতো ধূলি জমেছে। প্রায়ই তিনি দেখতে পান, কার্তিকের চাঁদ এসে তাঁর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একটা ভারী পাথর তখন তার বুকের ওপর চেপে বসে। দম আরো আটকে আসে। তিনি তখন তাঁর অপাপবিদ্ধ মেয়েদের মুখ মনে করার চেষ্টা করেন। তাতে হয় কি, আবারও নিঃশ্বাস নেওয়ার শক্তি ফিরে পান একটু একটু করে।
মেয়েদের হাতপা অবশ্য বড়ই হয়েছে কবির আদনানের। লেখাপড়া আর বিয়েও হয়ে গেছে দুজনের। বাকি আছে একজন। লেখাপড়া এখনো তার শেষ হয়নি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, ভার্সিটিতে সেশন জ্যাম না লাগলে আর দু বছরের মধ্যেই ভার্সিটি পেরুবে তাঁর এ মেয়ে। তারপর তার বিয়ে হলেই তিনি একেবারে গ্রামে চলে যাবেন। থাকবেন না আর এই মরার শহরটাতে। না, কোনো জোরাজুরি নেই—মিতার ইচ্ছে হলে ঢাকাতেই থাকবে, কিন্তু তিনি চলে যাবেন। দরকার হলে একা একাই যাবেন। কল্পনা না করলেও একটা দৃশ্যপট আপনাআপনিই ভেসে ওঠে তাঁর সামনে—প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙবে আজান শুনে। বুঝতে পারবেন জানালা দিয়ে কেমন হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। জীবনের গাঢ় রং দানা বাধছে দু চোখ জুড়ে। তিনি উঠে পড়বেন বিছানা থেকে। ফজরের নামাজ পড়ে সূর্য ওঠা দেখবেন সড়ক কিংবা খেতের আলপথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে। খুবই ইচ্ছা আছে তাঁর একটা ছোটখাটো সবজির বাগান করার। এই ইচ্ছাটা একেবারে মনের ভেতর খুব গোপনে পুষে রেখেছেন তিনি, এমনকি মিতাকেও বলেননি কোনো সময়।
বিশেষ করে একটা বেগুনের টাল তো তাঁকে করতেই হবে; প্রায়ই ভাবেন কবির আদনান—দেশি জাতের কাঁটাওয়ালা এই ছোট আকারের বেগুন তিনি খুবই ভালোবাসেন। অথচ ঢাকা শহরে এ বেগুন এখন আর পাওয়া যায় না। কতদিন যে তিনি ওই বেগুন খান না, তাও আর মনে পড়ে না। এইখানে, এই মরার শহরের সবগুলো মার্কেটই গফরগাঁওয়ের ওই গোবদা গোবদা বেগুনে ভরা। এখন আবার সেগুলোর আসল স্বাদও পাওয়া যায় না সার, কীটনাশক আর কলের মেশিনের বীজের তোড়ে। তাঁর ইচ্ছা আছে মনের এককোণে পড়ে থাকা সেই ছোট জাতের দেশি বেগুনের বাগান করার। যাতে পোকা ধরে, আবার ভালোও থাকে। সেই বেগুনের টালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, সুন্দর বেগুনিরঙা ফুল দেখতে দেখতে তাঁর মায়ের কথা মনে পড়বে। মা তাঁকে বলতেন, এমন এক দিন আসবে যেসময় বেগুন গাছের নিচে মানুষের হাট বসবে, সূর্য তখন আরো নিচে নেমে আসবে, মানুষ গরমে টিকতে পারবে না এবং এই সময়েই পৃথিবীতে কিয়ামত আসবে। এক হাতে বেহেশত আর আরেক হাতে দোজখ নিয়ে আসবে ইয়াজুজ আর মাজুদ। ইয়াজুজ আর মাজুদ কে জানো? প্রৌঢ় কবির আদনান তাঁর তরুণী মায়ের মিষ্টি কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শুনতে পান—ইয়াজুজ হলো পুরুষ আর মাজুদ হলো নারী। আমাদের মতো মানুষ হলেও ওরা পাকা শয়তান। জুলফিকার নায়েক আলাইহিস সাল্লামের সময় এদেরকে একটা গর্তের মধ্যে ঢুকিয়ে সিসা ঢেলে প্রাচীর তৈরি করে আটকে রাখা হয়েছে। ইয়াজুজ আর মাজুদের বড় বড় জিভ—ওরা সারারাত ধরে দেয়াল চাটতে চাটতে একেবারে পাতলা করে ফেলে। তারপর যখন আর একটু চাটলেই দেয়াল ভেঙে গর্ত বেরুবে, তখন তাদের মনে হয়, এহ্, অনেক রাত হয়ে গেছে। আজ থাকুক। কাল সকালে উঠে বাকিটুকু চাটব। কিন্তু পরদিন সকালে উঠে দেখে দেয়ালটা আবারও আগের মতো হয়ে গেছে। এই ইয়াজুজ আর মাজুদ একদিন ওই দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে পড়বে। মানুষকে বেহেশতের লোভ দেখিয়ে আসলে নরকেরই ঠেলে দেবে। এবং পৃথিবী তখন ধ্বংস হয়ে যাবে। কবির আদনানের মনে পড়ে, কোনোদিন রাতে স্কুলের পড়া অসম্পূর্ণ রেখে ঘুমাতে যেতে চাইলেই মা বলে উঠতেন, সকালে উঠে কিন্তু ইয়াজুজ মাজুদের মতো দেখবে, সব ভুলে বসে আছো! শুনে তিনি আবারও সুড়সুড় করে ফিরে এসে পড়তে বসতেন।
মেয়েদের দিকে তাকিয়ে, বিশেষ করে ছোট মেয়ের দিকে তাকিয়ে কবির আদনান স্বস্তি পান। মনে মনে মা’র উদ্দেশে বলেন, ‘মা, বেগুন গাছের নিচে মানুষের হাট বসার এখনো অনেক দেরি। দুনিয়ায় তোমার বংশধর আরো অনেক অনেকদিন বেঁচে থাকবে।’ গ্রামে তাঁর শেষবয়সের প্রথম শীত কাটবে এই বেগুনের টাল তৈরি করার কাজে। ইচ্ছা আছে, যেতে না চাইলেও ছোট মেয়েকে তিনি সেবছর গ্রামে নিয়ে যাবেন। বেগুনের ফুল দেখাতে দেখাতে এক সকালে তাকে তিনি মায়ের বলা ওই কথাগুলো জানিয়ে যাবেন। শুনে মেয়ে নিশ্চয়ই হেসে উঠবে, তবু তিনি শোনাবেন। পরদিন খুব সকালে ডেকে তুলবেন ওকে। এত ভোরে ঘুম ভাঙানোয় নিশ্চয়ই বিরক্ত হবে সে। কিন্তু তিনি সেই বিরক্তিকে একদম পাত্তা না দিয়ে বলবেন, ট্রেনের সময় হয়ে গেছে, তুই তাড়াতাড়ি ওঠ। নইলে আজ সারাদিনে আর শহরে যেতেই পারবি না। এখনই রওনা হ। আমি যাব না। আমি আর ফিরব না শহরে।
মেয়েরা অবশ্য কবির আদনানের এই ইচ্ছার ঘোরতর বিরোধী। এমনকি তাঁর স্ত্রী, মানে মিতা, যে গ্রামেই বড় হয়েছে এবং এই শহরে এসেছে বিয়েরও অনেক অনেক পরে। বড় মেয়ের বয়স তখন চার আর মেজো মেয়ের মাত্র বছর দুই। মেয়েরা তার এই ইচ্ছার শুধু বিরোধিতাই করে না, তারা এরকমও মনে করে, তিনি আসলে গ্রামে গিয়ে একদিনও থাকতে পারবেন না, থাকবেনও না। এসবই কথার কথা, কল্পনাবিলাস। কবির আদনান জানেন, এ নিয়ে তারা আড়ালে-আবডালে হাসাহাসিও করে। যেমন, হয়তো বড় মেয়ে বাসায় এসে তাঁর খোঁজ করছে, তিনি তখন বাথরুমে, শুনলেন ছোট মেয়েটি ইয়ার্কির স্বরে উত্তর দিচ্ছে, বাবা তো গ্রামে গেছে! এসব শুনে তিনি রাগ করেন না। কেবল মনে মনে হাসেন এবং ভাবেন, দেখিস, সত্যি সত্যি গ্রামেই যাব রে।
সেদিন বেশ রাতে হঠাত্ই তাঁর ঘুম ভাঙল। আজকাল অবশ্য তাঁর ঘুম অনেক পাতলা হয়ে গেছে, ঘুমও কমে যাচ্ছে, সেরকমই বলেছেন ডাক্তার। তাছাড়া হঠাত্-হঠাত্ প্রস্রাবও পায় বেশ। বেশ কয়েকবার ডায়াবেটিক টেস্ট করিয়েছেন। কিন্তু কোনোকিছুই ধরা পড়েনি। ডাক্তার বলেছেন, ডায়াবেটিক না থাকলেও তাঁর ডায়াবেটিক হওয়ার ভাব চলে এসেছে। আগাম পরামর্শ দিয়েছেন, সাতসকালে হাঁটার। ডাক্তারের কথার বাইরে যাননি তিনি। বিকেলে প্রতিদিন রমনা কিংবা রেসকোর্সে হাঁটেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে এখনো রেসকোর্স ময়দানই বলেন তিনি। মনেই থাকে না ওটার নাম পাল্টে গেছে। যৌবনে দেখা সেই ঘোড়দৌড়ের স্মৃতি, তার সঙ্গে সাতই মার্চের স্মৃতি, দশই জানুয়ারির স্মৃতি—সব মিলিয়ে ওই উদ্যানের কথা বলতে গেলে রেসকোর্সের ময়দান নামটাই মনে আসে তাঁর। হাঁটতে হাঁটতে গাছগাছালি আর লতাগুল্ম দেখার অভ্যাসও পাকিয়ে তুলেছেন এরই মধ্যে। বইমেলায় অনেক খোঁজ করে দ্বিজেন শর্মার বেশকিছু বই কিনেছেন। আরো কিনেছেন ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’। এগুলো পড়েন। কখন কোন গাছে ফুল ফুটেছে সেসব দেখেন। দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। এমনকি যখন অনেক আগাছার ভেতর অদ্ভুত সব পোকামাকড় দেখেন তখনো তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। ভাবেন, পৃথিবী এত বিচিত্র, এত সুফলা, এত উদার! হিংস্র, অহিংস্র, সুন্দর, অসুন্দর সবকিছুকে কেমন মিলিয়েমিশিয়ে রেখে দিয়েছে! তিনি সেই অবাক ভুবন দেখে বিচিত্র আনন্দে ডুবে থাকেন। কখনো এমটিভি দেখতে থাকা ছোট মেয়েকে অসাবধানে বলেও বসেন, মাঝেমধ্যে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিও দেখিস, তখন বুঝবি, পৃথিবীতে আমরা আসলে কত ক্ষুদ্র। কত কম জেনেও কত হামবড়া ভাব নিয়ে বেঁচে আছি। অথচ পৃথিবীতে কত কিছুআছে, কতভাবে বেঁচে আছে, কতভাবে বেঁচে থাকার সুখদুঃখ অনুভব করছে।
কিছু বলে না মেয়ে, শুধু মুচকি হাসে, তারপর মাথা এদিকসেদিক দুলিয়ে বলে, বাবা, সমুদ্র আর পাহাড় ছাড়া যেখানেই নিয়ে যাও আর যত কিছুই দেখাও না কেন নিজেকে আমার কখনো ছোট মনে হয় না।
শুনে কবির আদনানও হাসেন। সমুদ্র আর পাহাড় দেখার স্বপ্নে যে বিভোর থাকে, তার শেষ গন্তব্য তো হওয়ার কথা গ্রাম। কিন্তু তার এই গ্রামে যাবে কেন! আর গেলেই বা থাকবে কেমন করে! হিজাব পরতে হবে না হয় মাথায় ঘোমটা দিতে হবে, নিজের বাজার নিজে করতে পারবে না, কোনো ছেলের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিংবা চায়ের দোকানে বসে কথাবার্তা বলতে পারবে না—এইসব ভাবতে ভাবতে তাঁর মনে হয়, গ্রামে থাকার তো বিপদও অনেক!
ঘুম ভেঙে কারো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ পেয়ে কবির আদনান পাশের ঘরে গিয়ে দেখেন, বিছানায় শুয়ে তাঁর মেয়ে কাঁদছে। মন তার খারাপ হয়ে গেছে সত্যজিতের ‘শাখাপ্রশাখা’ দেখে। তিনি সান্ত্বনা দিতে গেলে মেয়ে অদ্ভুত দাবির ভঙ্গিতে বলে উঠল, তুমি কিছুতেই গ্রামে যেতে পারবে না। তুমি আমার কাছে থাকবে।
ঠিক আছে, আমি তোর কাছে থাকব। —মেয়েকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে তিনি ঘরে ফিরে ফের শুয়ে পড়লেন। আজকাল তিনি একা একাই ঘুমান। ডাক্তার তাঁকে ফ্যানের বাতাসে ঘুমাতে মানা করেছে, কিন্তু মিতা ফ্যান না ছেড়ে ঘুমাতেই পারে না। এমনকি এসি রুমেও ওকে ফ্যান চালাতে হয়। আসলে ফ্যান চলার শব্দ ছাড়া ওর ঘুমই আসে না। অতএব তিনি আলাদা ঘরে ঘুমান। শুয়ে শুয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে ভাবেন, মেয়েকে এই মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়া ঠিক হলো না। তিনি তো সত্যি সত্যিই গ্রামে চলে যাবেন এই মেয়ের লেখাপড়া শেষে, বিয়ে হলে। কিন্তু মেয়েটি খুবই জেদি, এই যে তিনি ঝোঁকের মাথায় ওর কাছে থাকার কথা বলে এলেন, ও সেটা ঠিকই মনে রাখবে এবং গ্রামে যাওয়ার সময় ভয়ানক হাঙ্গামা বাধাবে।
ভাবতে ভাবতে ভয়ানক এক দুশ্চিন্তায় তিনি একসময় ঘুমিয়ে গেলেন। আর ঘুমের মধ্যেই শান্ত, নিরুপদ্রব এক মৃত্যু হলো তাঁর। কেউ জানতে পারল না। জানতে পারল না তাঁর স্ত্রী, যার কাছে তিনি উন্মুক্ত ও সহজ ছিলেন শৈশবে মায়ের কাছেই থাকার মতো। জানতে পারল না তাঁর আদরের মেয়ে, যে ‘শাখাপ্রশাখা’ দেখে আপ্লুত হয়ে প্রতিজ্ঞা করেছে বাবাকে সারাজীবন নিজের কাছে রাখার। এমনকি তিনি নিজেও জানতে পারলেন না এরকম একটি ভয়ানক ঘটনা ঘটল তাঁর জীবনে। জানতে পারলেন না গ্রামে যাওয়া হলো না তাঁর—এমনকি মৃত্যু হলেও। গ্রামে নিয়ে গিয়ে কবর দেওয়ার ওই ঝামেলা এখন কে করবে? দেখা গেল, মেয়েদের কথাই সত্যি হয়েছে, শহরেই রয়ে গেলেন তিনি।
দুই
খুব সকালে বারবার কলিংবেলের শব্দে খুবই বিরক্তি লাগে মিতার। তারচেয়ে বিরক্তিকর হলো বিছানা ছেড়ে উঠে সেই দরজা খোলা। অবশ্য এসবই তাঁর অর্জিত অভ্যাস। মানুষের এ ধরনের অভ্যাস হতে পারে, তা-ই তো একসময় তাঁর জানা ছিল না। তাও বাঁচোয়া, দ্বিতীয় কাজটা কখনো করতে হয় না তাঁকে। কবির আদনানই দরজা খোলেন, তিনি ওঠেন মিতারও আগে। হাতমুখ ধুয়ে অপেক্ষা করেন খবরের কাগজের জন্যে। হকার যতক্ষণ না সেই পেপার দিয়ে যায় ততক্ষণ কবির আদনান কখনো আঙুল দিয়ে তবলা বাজান, কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কদাচিত্ বইও পড়েন। এই কাজটা তাঁর ইদানীংকার—রমনা আর রেসকোর্স ময়দানে হাঁটাহাঁটি শুরু করার পর। খবরের কাগজ হাতে নিয়ে তিনি প্রথমেই চলে যান শেষের পাতায়। সেখানে প্রায়দিনই কোনো না কোনো গাছ নিয়ে লেখা থাকে। হয়তো দ্বিজেন শর্মা, হয়তো বিপ্রদাশ বড়ুয়া না হয় মোকারম হোসেন—কেউ না কেউ একটা কিছু লিখবেই।
ঢাকার কোনখানে কোন গাছ রয়েছে, সেখানে ফুল ফুটেছে কি না, গাছটা কোন ধরনের, সে গাছের পাতা কেমন—এইসব পড়তে পড়তে দিনের শুরুটাই কবির আদনানের অন্যরকম হয়ে যায়। খবরের কাগজ নিয়ে তিনি তাই প্রথমেই খোঁজ করেন সেই ফিচারের। পেলে খুঁটিয়ে পড়েন আর চিন্তা করেন আজ বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে এটাই দেখতে যাব। না পেলে প্রথম পাতায় এসে ইচ্ছা হলে কোনো খবর পড়েন, না হলে আবার ‘চিরঞ্জীব বনৌষধ’ ধরনের কোনো বই খুলে বসেন। স্বামীর এই কাজকারবার দেখে মিতার মাঝে মাঝে লজ্জা লাগে। কমবয়সে লোকটা তাও মোটামুটি স্মার্ট ছিল। অথবা এমনও হতে পারে যে, তিনি তখন গ্রামে থাকতেন। লোকটাকে তো তখন সপ্তাহে মাত্র একটা দিনই পেতেন, শহর থেকে শেষ রাতের দিকে গিয়ে পৌঁছাতেন কবির আদনান, হ্যারিকেনের আলোয় ধূলিধূসরিত প্যান্টশার্টে কিংবা সকালে গোসল সেরে উঠে গায়ে চাপানো হালকা খাটো পাঞ্জাবিতে তাঁকে বেশ স্মার্টই মনে হতো। আসলে হয়তো তখনো তিনি একদমই স্মার্ট ছিলেন না। আর এখন তো একেবারেই গেছে। এত সকালে তো কোনো রিটায়ার্ড ভদ্রলোকের ঢাকা শহরে ঘুম থেকেই ওঠার কথা নয়। আর এ লোক কি না ঘুম থেকে তো উঠবেই, আবার হাতমুখ ধুয়ে বসে চোখ বুজে খালি আঙুলে টোকা দিয়ে মনে হয় বাদ্যযন্ত্র বাজাতে থাকবে। ওস্তাদ কিংবা রাগসংগীত বিশারদ কারো নাম জানা নেই বলে মিতা এ নিয়ে কোনো তুলনা করতে পারেন না। তাঁর কেবল লালন ফকির বা হাছন রাজার নাম জানা আছে। তুলনা দিতে গিয়ে তাই তাঁকে বলতে হয়, ঢাকা শহরের ফ্লাটবাড়িতে বসে উনি গাঁওগেরামের বাউলফকিরের মতো একতারা বাজান।
তবে এ নিয়ে কবির আদনান কিছু মনে করেন না। যদি মনে করতেন, ভাবতে গিয়ে মিতা একা একাই শিউরে ওঠেন, নিশ্চয়ই পিটিয়ে তাঁকে তক্তা বানাতেন। নিজের চোখেই তো কত ভদ্রলোক দেখলেন মিতা এই ঢাকা শহরে—ওপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট। এমনভাবে কথা বলে যে মনে হয় গলে পড়ল আগুন লাগা মোমের মতো। আর নারীর প্রতি শ্রদ্ধার কোনো অন্ত নেই। কিন্তু রাতবিরেতে, কারণে-অকারণে খিটিমিটি বাধিয়ে বউ পেটায়। এই তো পাশের বাসার মালিকই পেটায়। জানালা দিয়ে প্রতিদিনই স্পষ্ট দেখা যায়। অতএব কবির আদনান স্মার্ট না হলেও মিতা তাঁকে মনে মনে মাফ করে দেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এ লোকটার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বলেই তাঁকে প্রতিদিন সকালে কাজের মেয়ে এসে কলিংবেল বাজালেও দরজা খোলার জন্যে উঠতে হয় না বিছানা ছেড়ে। তাঁর স্বামীই ছিটকিনি খুলে ডাসা নামিয়ে খুলে দেন দরজা। কাজের মেয়ে বাড়িতে ঢুকেই সরাসরি রান্নাঘরে চলে যায়। তার জানাই আছে প্রথম কাজ কোনটা করতে হবে, দ্বিতীয় কাজই বা কোনটা। সে প্রথমেই থালাবাসন আর হাঁড়িপাতিল সবকিছু মেজে ফেলে। তার দ্বিতীয় কাজ হলো ময়দা পাকানো। প্রথম কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেই মিতা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েন। সারারাত ঘুমাতে ঘুমাতে হয়রান হয়ে পড়ার কারণে সামান্য গড়াগড়ি দিতে দিতে বিশ্রাম নেন। তারপর কাজের মেয়ে দ্বিতীয় কাজ শেষ করতে করতেই তিনি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়েন। সোজা গিয়ে ঢোকেন রান্নাঘরে। গা ঝাড়া না দিয়ে উপায় থাকে না তাঁর। শহরের এইসব কাজের মেয়ের খাসলত খুবই খারাপ। কেউ রান্নাঘরে না থাকলে দু-চারটা পিঁয়াজ-রসুন ঠিকই সরিয়ে ফেলে। ময়লা ফেলার পাত্রের মধ্যে করে মাছমাংস নিয়ে যায়। বিন্দুমাত্রও টের পাওয়া যায় না। প্রথম যেদিন বিষয়টা ধরতে পেরেছিলেন, সেদিন মিতা বিস্ময়ে কিছু বলতেই পারেননি। আর এখন কোন ছুঁতোয় যে ময়লার পাত্রের ঢাকনা সরিয়ে ভেতরটাকে ভালো করে দেখে নেবেন, তা ঠিক করতেই বেশ খানিকটা সময় চলে যায়।
কিন্তু আজ এতক্ষণ ধরে কলিংবেল বাজছে, কেউ দরজা খুলছে না! কলিংবেলের আওয়াজে ছোট মেয়ে উঠে পড়লে খবর আছে। একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার ধাত ওর একেবারেই নেই। তাছাড়া অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে সে। এ তো আর তাঁর স্বামী কবির আদনান নয় যে চোখে কোনো ঘুম থাকে না, তাই সাতসকালে বিছানা থেকে উঠে ফিটফাট বাবু হয়ে বসে থাকবে। ফিটফাট বাবুর আজকে কী হয়েছে কে জানে!
অতএব মিতাকে বিছানা ছেড়ে উঠতেই হয় আজ। তিনি গেট খুলতে যাওয়ার আগে উঁকি দেন স্বামীর ঘরে। কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন! রাগের চোটে একবার ভেতরে গিয়ে ধাক্কা মেরে বিছানা থেকে তুলে দেওয়ার ইচ্ছা জাগে তাঁর। কিন্তু তাড়াতাড়ি দরজাই খুলতে যান তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে। শুধু একবার মনে হয়, আহ্ রে, সারাজীবন লোকটা সাতসকালে দরজা খুলে গেল। আজ না হয় তিনি নিজেই খুলবেন দরজাটা। ঘুমাচ্ছে যখন শান্তিমতো ঘুমাক। অতএব নীরবে দরজাটা খুলে দেন তিনি। আর কাজের মেয়েটা বোধহয় ভারি অবাক হয় তাঁর চেহারা দেখে। কিন্তু কিছু বলে না। কেবল ‘খালার ঘুম তো আইজ বেশ সকালেই ভাঙছে’ বলে চলে যায় রান্নাঘরের দিকে।
মিতা আবারও স্বামীর ঘরে এসে ঢোকেন। অসুখবিসুখ করল না কি আবার? না হলে তো এত ঘুমানোর কথা নয়। তবে বিছানার দিকে এগোতে নিয়েও তিনি থমকে দাঁড়ান। খুবই মায়া লাগে। অনেকদিন, অনেক মাস, অনেক বছর পর স্বামীর জন্যে মায়া হয় তাঁর। কেমন নির্বিবাদে ঘুমিয়ে আছে, মনে হয় ঘুমায়নি সারাজীবন। হয়তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে গ্রামের। ভাবতেই মুখের কোণে মিতার একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে। সেই কবে থেকে শহরে আছেন, কিন্তু গ্রামের মায়া কাটল না কবির আদনানের। প্রায়ই বলেন, আর কত প্রতিদিন রাস্তায় বেরিয়েই ধোঁয়া টানব! তাছাড়া, মিতা জানেন, রিকশার ভাড়া ঠিক করতে গিয়ে প্রতিদিনই রিকশাওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া বাধে কবির আদনানের। ওদিকে বাসে তো আর উঠতে পারেন না। একে শরীরে কুলায় না, তার ওপর অত ভিড় ঠেলে বাসে উঠে বেশির ভাগ সময়েই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আগে তাও টাউন সার্ভিসের বাসগুলো বেশ বড় ছিল, তারপর কী যে ভূত চাপল ///জিয়া/// সাহেবের/// মাথায়, ///তাঁর আমলেই তো রাস্তায় ওই উটকো মিনিবাস নামল।/// সেই বাসে চড়লে আর দাঁড়ানো যায় না মেরুদণ্ড সোজা করে। মাথা ঠেকে যায় ছাদে। আর মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হলে সিট পেতে হয়, সিট পাওয়ার জন্যে তাঁদের তাহলে এই নিজেদের বাসা ছেড়ে সায়েদাবাদ, মিরপুর ধরনের লাস্ট স্টপেজ কিংবা স্টার্টিং স্টপেজের কাছে বাসা নিতে হয়। তাতেও সিট পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। মিতাকে একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন কবির আদনান, কবে না কি সাতসকালে মিরপুর বারো থেকেও ওই মিনিবাসে চড়েছিলেন তিনি, কিন্তু সিট পাননি। মিরপুর থেকে মতিঝিল তো আর রিকশায় আসা যায় না। তাঁকে তাই বাধ্য হয়ে মিনিবাসেই চড়তে হয়েছিল। সিট পেলেন ফার্মগেটে এসে, তাও ড্রাইভারের পেছনে গিয়ারের ওপরে। ধোঁয়া আর গরমে তাঁর পাগল হওয়ার দশা। এইরকম একটা শহরে তো থাকাই উচিত না। কিন্তু তাঁকে বাধ্য হয়েই থাকতে হলো প্রায় সারাজীবন। বাপে একটা ভয়ানক ভুল করেছিল ঢাকায় জায়গা কিনে। আর সেই ভুলের মাসুল দিলেন তিনি, তাও বলা চলে গায়ে পড়ে। কী যে ভূত চেপেছিল তাঁর মাথার ভেতর, গ্রামের ভাইগুলো যখন ঢাকার জায়গার বদলে তাঁর গ্রামের কয়েক একর জমি লিখে দিতে বলেছিল, তখন তিনি কোনো আপত্তি করেননি আর তাদের প্রস্তাবে। বরং খুশিই হয়েছিলেন। একসময় সেইসব ভাইদের ছেলেপেলেদের একটু হাত-পা গজালো আর তারা এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করতে করতে ঢাকা শহরের গুরুত্ব বুঝতে শিখল তখন শুরু হলো আসল খেলা।
একবছর রোজার ছুটিতে বাড়ি গেলে তারা সবাই জোট পাকিয়ে কবির আদনানকে ঘিরে ধরল। বলল, আপনার ওই ঢাকার বাড়ি ভুল করে লিখে দেওয়া হয়েছে। আপনার ভাইরা গ্রামে থাকে, তাই বুঝতে পারেনি ঢাকায় একটা জায়গা থাকা কত জরুরি। আমরা লেখাপড়া শিখেছি, আমরা ঠিকই বুঝি। ওই বাসার একটা তলায় আপনারা থাকবেন। আরসব তলা আমাদের লিখে দিতে হবে।
কবির আদনান অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর জায়গাজমির অনেকটাই এরা লিখে নিয়েছে ঢাকার ওই জায়গার বদলে। যতটুকু জায়গা নিয়েছে তাতে মনে করার কোনো কারণই নেই যে, ঢাকার জায়গার গুরুত্ব এরা বুঝতে পারেনি। আসলে এরা এই গ্রামটাতেই তাদের রাজত্ব স্থাপন করতে চেয়েছে, ভেবেছে এখানে দাপট দেখানোর চেয়ে দুনিয়াতে গুরুত্বপূর্ণ আর কী আছে! অথচ এখন ছেলেদের তারা লেলিয়ে দিয়েছে তাঁর পেছনে! অথচ এর মধ্যে তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঢাকায় সেই জায়গার ওপর বাড়ি তুলেছেন। নিজে দালান তুলে সেই দালানই আবার তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে! তিনি তাই খেপে গিয়েছিলেন। তাতে খানিকটা থতমত খেয়ে তাঁর ভাতিজারা পরে প্রস্তাব দিয়েছিল, ঠিক আছে, তাঁকে তাহলে তাঁর গ্রামের বাড়ি আর জায়গাজমি সব দিয়ে দিতে হবে।
অদ্ভুত প্রস্তাব! কবির আদনান তা দিতে যাবেন কেন। গ্রামের ওই ঘরও তো তিনি নিজে তুলেছেন। ঢাকায় তাঁর বাড়ি থাকলেও কোনোকিছু আসে যায় না। শেষ জীবনটা তিনি গ্রামে কাটাবেন, এটা তিনি শহরে পা বাড়ানোর আগেই ঠিক করে রেখেছেন। এমন নয় যে তিনি নতুন করে জায়গাজমি কিনতে পারবেন না। ঠিকই পারবেন। কিন্তু বাপদাদার বাড়ি বলে কথা। উত্তরাধিকারিত্বের অহংকারে তিনিও গর্জে উঠেছিলেন। তারপর তাঁর আর ভাইদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় ক্ষীণ হলেও একটা সম্ভাবনা ছিল, ভাইদের ছেলেদের কেউ তেমন শিক্ষিত হলে তাঁর কোনো মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলেও হতে পারে। কিন্তু এমন ঝগড়াঝাটির পর সেই অভাবনীয় সামান্য সম্ভাবনার রেশও মুছে গেছে অনেক অনেক বছর আগেই। এর মধ্যে চোখে পড়ার মতো ঘটনা হলো, তাঁর সেইসব ভাতিজাদের কেউ এমএ বিএ দূরে থাক, এইচএসসি পাসও করতে পারেনি। ভাতিজারা তাঁকে ঘিরে ধরে জোর করে দলিলে সাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করার পর গ্রামের বাড়ির মায়া অবশ্য ত্যাগ করতে হয়েছে তাঁকে। তারপর থেকে কখনো বাড়ি গেলে তাঁকে উঠতে হয় পাড়াপ্রতিবেশীর বাড়ি। তাতে অবশ্য কোনো সমস্যা হয় না তাঁর। কারণ গ্রাম থেকে অনেকেই আসে তাঁর এ বাসায়। কেউ পিজি হাসপাতালে ডাক্তার দেখাবে বলে, কেউ আবার ইন্টারভিউ দিতে, কেউ সরকারি অফিস-আদালতে নিজেদের কাজকর্মে। হোটেলে থাকার হ্যাপা এড়াতে এরা তাঁর বাসাতেই ওঠে।
অতএব গ্রামে গেলেও কবির আদনানের থাকাখাওয়ার অসুবিধা হয় না তেমন। পাড়াপ্রতিবেশীদের বাড়িতে ওঠেন বলে ভাইরা না কি কোনো কোনো সময় খুব দুঃখ করে—এরকম শুনলেও কখনো সেটার চাক্ষুষ প্রমাণ পাননি তিনি। কেউ এসে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে তাঁকে সাধাসাধিও করেনি কোনো সময়। এমনকি গ্রামের মসজিদে পাশাপাশি বসে নামাজ পড়েছেন তিনি তাঁর ভাইদের সঙ্গে, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলেনি। সত্যি কথা বলতে গেলে, তাঁরও কখনো ইচ্ছা হয়নি ওদের কারো সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলার।
স্বামীকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন মিতা, তুমি ওইসব জায়গাজমির মায়া ছেড়েছুড়ে দাও। ঢাকা শহরের এই বাসার ভাড়া তুলে খেলেই আমাদের জীবন কেটে যাবে। আমরা মরে যাওয়ার পর মেয়েরা এ বাসা নিয়ে যা খুশি তা-ই করবে। কী করবে সেটা ওদের ব্যাপার। আমাদের মেয়েদের তো আর এমন কোনো ঘরে বিয়ে হয়নি যে সয়সম্পত্তির জন্যে এসে জামাইবাড়ির লোকজন গলা টিপে ধরবে। আমাদের কী দরকার আবার শেষ বয়সে গ্রামে গিয়ে ওই বাড়িঘরের জায়গার জন্যে থানাপুলিশ করার। তাছাড়া তোমার পেনশনের টাকাপয়সা পাওয়া যাবে। গ্রাম থেকে বার বার এসে ওসব কে তুলবে?
বলতে বলতে মিতা তাঁর স্বামীর দিকে প্রশ্নবোধক চোখ নিয়ে তাকিয়ে থেকেছেন। কিন্তু স্বামী তাঁর খুবই পিছলা মানুষ। এইসব ব্যাপারে তিনি যা-ই বলেন না কেন, সোজাসুজি কোনো উত্তর দেন না কবির আদনান। খালি সামান্য হেসে মুখ ফিরিয়ে নেন। তখন খুব রাগ হয় মিতার। মনে হয় উঠে গিয়ে লোকটার গলা টিপে ধরবেন। তারপরই তিনি অবশ হয়ে পড়েন। তাঁর মনে পড়ে, এই স্বামীর সঙ্গে বিয়ের পরও অনেক বছর ‘আপনি আপনি’ করে কথা বলতেন তিনি। ভয় করতেন। স্বামীই তাঁকে ধীরে ধীরে কী করে যেন এই ‘তুমি’ সম্বোধনের ঘোরের মধ্যে নিয়ে এলেন। তাও এই ঢাকা শহরে আসার পরে। তখন তাঁরা প্রায়ই সিনেমা দেখতে যেতেন গুলিস্তান সিনেমা হলে, কখনো মুন নাকি আজাদ—এরকম কত হলে। সিনেমা দেখতে দেখতে, উত্তম-সুচিত্রাদের দেখে দেখে তিনি স্বামীকে তুমি বলা শিখলেন। এইসব মনে পড়ায় তাঁর সব রাগ জল হয়ে যায়। তিনি মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকেন, শীতল মেঝে তাঁর সব রাগ শুষে নেয় মুহূর্তের মধ্যে।
স্বামীর বিছানার দিকে তাকিয়ে এতদিন পরে সেইসব দিনগুলো মিতা অনুভব করেন হঠাত্ করে। মনে পড়ে, প্রথম তিনি কবে নিজের থেকে স্বামীকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, কবে প্রথম তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন বিয়েরও অনেক পরে। এবং এসব মনে পড়ায় তাঁর হঠাত্ মাথায় কী এক ঘোর চেপে যায়। মনে হয়, আচ্ছা লোকটাকে এখন আচমকা সেইসব দিনের মতো হঠাত্ ঝাঁপ দিয়ে জড়িয়ে ধরলে কেমন হবে? কিইবা হবে! হাইপ্রেসার তো হয়নি এখনো! পা টিপে টিপে কবির আদনানের বিছানার দিকে এগিয়ে যান তিনি। এবং আচমকা তাকে জড়িয়ে ধরেন এবং মুহূর্তেই তাকে ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীফাটানো চিত্কার দিয়ে ওঠেন।
তিন
এখন মিতা বুঝতে পারেন, সবকিছুই পাল্টায়। প্রতিমুহূর্তেই পাল্টায়। কিন্তু চলার ঘোরে তা হয়তো তাঁরা গায়ে মাখেন না। কিন্তু তবু তা গায়ে লেগে থাকে। তবে সবকিছুই সেই পরিবর্তন চোখে না পড়লেও খুব সহজেই বোঝা যায়, একটা মৃত্যু কতকিছু পাল্টে ফেলে! সেই পাল্টানোর খানিক ঘটে একেবারে বাইরে, একেবারে চোখে পড়ার মতো হয়ে। তবে প্রায় সবটাই ঘটে খুব ভেতরে, খুব নিঃশব্দে, খুব ক্রন্দনে এবং কিছুই তার চোখে পড়ে না।
এমনকি মানুষ বুঝতেই পারে না, ভেতর থেকে সে পাল্টে গেছে পুরোপুরি। পাল্টে গেছে বৃষ্টিমুখর দিনের থেকে একেবারে খটখটে মাটিফাটা রোদের দিনে। প্রথম ক দিন মন খুব খারাপ থাকে সবার। প্রথম ক দিন নৈবেদ্যর চাপে মৃত মানুষ আরো মৃত হয় তাই। মুখে মুখে শোকেতাপে উচ্চারিত হতে থাকলেও মূলত সে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়তে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে রাশ আলগা হয়ে আসে, ধীরে ধীরে মৃত মানুষ আবারও শ্বাস নিতে থাকে, শ্বাস নিতে নিতে মিশে যায় জীবিতের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে। এভাবে একটি মৃত্যু কিংবা প্রতিটি মৃত্যু প্রাত্যহিক জীবন হয়ে ওঠে। সে তার পূর্বসূরি কিংবা উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে মিলেমিশে প্রতিবেলা কাজ করে, রাতে ঘুমায় কিংবা জেগে থাকে, একটি পাখির বাসা খুঁজে পেয়ে আনন্দে চিত্কার করতে থাকে, অনেক রাতে তক্ষকের ডাক শুনলে অযথাই শঙ্কিত হয়।
আনুশকার তাই মনে থাকে না চল্লিশা কাছে চলে এসেছে। বাবার উপস্থিতি-অনুপস্থিতি তার প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে কয়েকদিনের মধ্যেই এত বেশি মিলেমিশে যায় যে, মৃত্যুর কথা আর মনে আসে না। মিতা যখন তাকে বলেন, ‘তোর বন্ধুদের বলে দিস আসতে’ তখন সে বুঝতেই পারে না কী নিয়ে কথা বলছেন মা। সে তাঁর মুখের দিকে তাকায় জিজ্ঞাসু চোখে, বলে, কেন?
তীব্র তিরস্কার এসে ভর করে মিতার চোখে মুখে শরীরে। এই মেয়েকে নিয়ে হয়েছে তাঁর যত মুশকিল। অবশ্য জন্মের সময়েই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এ সন্তান তাঁকে ভোগাবে সারাটা জীবন। এমনকি প্রথম সন্তান জন্মের আগেও এত অসুবিধা আর যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়নি তাঁকে। দ্বিতীয় মেয়ে হওয়ার সময় তো মনেই হয়নি কোনো কিছু পেটে ধরেছেন তিনি। কিন্তু এ মেয়ে পেটে আসার সময়েই একদিন প্রচণ্ড বমনের মধ্যে দিয়ে জানান দিল, আসছে—অচিরেই আসছে সে। ওরকম বমি বমি যন্ত্রণা আগেপরে আর কোনো সময় গ্রাস করেনি তাঁকে। কাউকে দেখেনওনি বমি বমি হওয়াতে কিংবা বমি হওয়ার পর ওভাবে কাতর হতে। তারপর থেকে একটা রাতও সুস্থির হয়ে ঘুমাতে পারেননি তিনি। যখন তখন তলপেটের ভেতর ছোট ছোট লাথি তাঁকে অস্থির করে রাখত। দাঁড়াতে পারতেন না, বসতেও না। একেবারে শেষের দিকে আছাড় খেয়ে পড়েই গেলেন বাথরুমে গিয়ে এক সকালে। তবু এক সুপ্ত আশায় সবকিছু সহ্য করেছিলেন, যে সুপ্ত আশা এরকম অবস্থায় সব মায়েরই থাকে—এবার একটি ছেলে হবে।
কিন্তু কোনো ছেলে হলো না। প্রথমবার সিজারিয়ান, পরেরটা স্বাভাবিক, এই মেয়ে আবার সিজারিয়ান। তখন তো এতকিছু জানা যেত না। তাহলে হয়তো আগেই জেনে ফেলতেন তাঁরা, ছেলে নয় এবারও মেয়ে আসছে। না জানাতে ভালোই হয়েছে তাঁর, নইলে কষ্ট আরো বাড়ত। তারপরও মিতার একটু একটু ইচ্ছা ছিল, ছেলেসন্তানের জন্যে আরো একটু চেষ্টাতদবিরের। কিন্তু কবির আদনানই বিগড়ে গেলেন, বললেন, ‘দরকার নেই আর, এমন তো নয় ছেলে হয়ে আমাকে উদ্ধার করবে’। শুনে মিতা দীর্ঘশ্বাস চেপেছিলেন; তখনো ভাইদের সঙ্গে কবির আদনানের সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ বাধেনি। মিতা তাই ভেবেছিলেন, গ্রামের বাড়িতে কিংবা নিজের বাড়িতে গিয়ে মুখ দেখানোর আর কোনো উপায় রইল না। যে জিজ্ঞেস করবে তাকেই বলতে হবে, ‘তিনটি মেয়ে আমার’, এর চেয়ে বড় বিড়ম্বনা আর কী হতে পারে? অথচ কবির আদনান একেবারেই নির্বিকার, তিনি গবেষণা করছেন মেয়ের নাম কী রাখা যায়? বড় মেয়ের নাম দিলরুবা, মেজোর নাম মেহবুবা। এসব নামের মধ্যে কোনো দোষ নেই, কিন্তু কবির আদনান ছোট মেয়ের যে নাম ঠিক করলেন তা শুনে তিনি প্রথমে বুঝতেই পারলেন না মানুষটা নাম বলছে, না কি অন্য কিছু! আনুশকা—এটা কোনো নাম হলো? এই নাম তিনি পেলেনই বা কোনখানে! কিন্তু কবির আদনান অনড় নিজের সিদ্ধান্তে। কিছুতেই অন্য কোনো নাম রাখতে দেবেন না। সোজা বলে দিলেন, আগেরগুলোর নাম তিনি মিতা বা মিতার বাবার ইচ্ছেতেই রেখেছেন, এবার আর তা হবে না। তিনি কয়েকদিন মেয়েটিকে বরং নানার দেওয়া নাম উম্মে সালমা নামে ডাকার চেষ্টা চালালেন। এই নাম মিতার দাদা আগেও রাখার চেষ্টা চালিয়েছিলেন, কিন্তু শুনতে কেমন লাগে জন্যে মিতা নিজেই গা করেনি। এখন আনুশকা নাম শুনে তিনি বাধ্য হলেন একটা ছুঁতো দাঁড় করাতে, দেখ, আমার দাদা এর আগেও এই নামটার কথা বলেছে। কিন্তু আমরা খারিজ করে দিয়েছি। অথচ এইটা তার খুবই প্রিয় নাম। বুড়ো মানুষ, কয় দিনই বা আর বেঁচে থাকবে। নামটা রাখলে দাদা খুশিই হবে।
কবির আদনান তেরচা চোখে তাকিয়েছিলেন, তোমার নাম কে রেখেছে?
মিতা জানেন, কবির আদনান এ প্রশ্নের উত্তর অনেক আগেই জেনে নিয়েছেন তাঁর কাছে থেকে। তবু আজ জানতে চাইছেন ঘটা করে। হয়তো মনে নেই। তিনি তাই জবাব দিয়েছিলেন, ‘আব্বা রেখেছিল।’
‘তোমার বাবা যে তোমার নানার দেওয়া নামের চেয়ে সুন্দর নাম রেখেছিলেন সেটা তুমি বোঝ? তুমি জান, উম্মে সালমা নামের মানে জানো?’
‘কী?’
‘অ অ, জানো না! শোনো, এই নাম রাখার মানে হলো, তোমার মেয়ে বড় হওয়ার আগেই তাকে এক মেয়ের মা বানিয়ে দেওয়া! উম্মে সালমা নামের অর্থ সালমার মা। শুধু আরব দেশ না, পৃথিবীর সব দেশেই নারীদের পরিচয়হীন করে ফেলার রেওয়াজ আছে—সামন্ততন্ত্রে একটু বেশি করেই আছে। তাই অনেক জায়গায়ই লোকজন মেয়েদের নাম ধরে ডাকে না খুব একটা। অমুকের বিটি, অমুকের বউ, অমুকের মা—আমরাও কিন্তু বহু মেয়েকে এরকম ভাবেই চিনি। কিন্তু নাম জানি না। তারাও নাম বলে না। উম্মে সালমা আরব দেশের সেরকম একটা নাম। বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে উম্মে শব্দ জুড়ে দিয়ে একজন নারীর অতীতকে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া একটা নাম। তার আর কোনো আলাদা অস্তিত্ব নেই, পরিচয় নেই। তোমার মেয়েকেও কি তুমি তা-ই করতে চাও?’
এতসব সিরিয়াস কথা বললেও কবির আদনান প্রশ্ন ছুড়তে ছুড়তে একটু হেসেও ফেলেছিলেন। তখন দিলরুবা ছোট, মেহবুবা তো আরো ছোট। তবু বাবাকে ওইভাবে হাসতে দেখে তারা দুজনেও হাসতে শুরু করেছিল। একরাশ অভিমান নিয়ে তিনি তখন মরিয়া হয়ে বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, অন্য নাম রাখ। এই নাম তো ছোট করে ডাকা যাবে না। ছোট করে ডাকতে হলেই বলতে হবে আনু... আর তোমাদের গ্রামের এক নাপিতের নামও দেখেছি আনু। এই নাম রাখা যাবে না।’
কিন্তু তাঁর কোনো ওজর আপত্তি শোনেননি কবির আদনান। নাম ছোট করার প্রস্তাবও খারিজ করে দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘নাম আর কত ছোট করবে? তুমি কি দিলরুবাকে রুবা নামে ডাকো নাকি? মেহবুবাকে বুবা বুবা কর নাকি?’
কার সঙ্গে কি, পান্তাভাতে ঘি! অতএব তিনি আনুশকার আর কোনো নাম রাখার সুযোগসুবিধাই পাননি। এই আনুশকা যত বড় হতে লাগল ততই তাঁর জ্বালাযন্ত্রণাও বাড়তে শুরু করল। দিলরুবা আর মেহবুবাকে মানুষ করতে এত ধকল যায়নি তাঁর। এই মেয়ে অনেক আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, বড় হয়ে সে বিদেশ যাবে, বিয়েটিয়ে করার ইচ্ছে নেই। বাপের প্রশ্রয় পেয়েছে বলেই আনুশকা পারে এরকম আলতুফালতু কথা বলতে। অথচ ছোটবেলায় তো ভালোই ছিল মনে হয়। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়েও ওর যাবতীয় চঞ্চলতা সমালোচনার যোগ্য মনে হতো না মিতার কাছে। কখনো তিনি রাগতেন, কখনো আবার হাসতেন ওর আশ্চর্য সব কাণ্ড দেখে। কিন্তু পিরিয়ড শুরু হওয়ার পরও সে একইরকম কাণ্ডকারখানা করবে, এইটা কি চিন্তা করা যায়? অথচ কবির আদনানের কাছে সেসব ছিল মামুলি ব্যাপার।
মেয়ে যখন হাইস্কুলে পড়তে শুরু করল তখন থেকেই তিনি একটুআধটু তাঁর নিজের ভাষায় বলতে গেলে হেদায়েত করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো লাভ হলো না। আর লাভ হবে কেমন করে, যেখানে অমন একটা বাবা আছে।
একদিন মিতা তিষ্ঠাতে না পেরে স্বামীকে বলে বসলেন, ‘এখনো সময় আছে, একটু শাসন করে মেয়েটাকে জাতে তোল, নইলে তোমার এই মেয়ের কপালে দুঃখ আছে।’
শুনে কবির আদনান বলেছিলেন, ‘শোন, রবি ঠাকুর বলে গেছেন, ‘ছেলেদের সাহস মেয়েদের চেয়ে অনেক কম, লজ্জা অনেক বেশি।’ আমার এই মেয়ে হলো রাবীন্দ্রিক কন্যা। তার সাহস অনেক বেশি, লজ্জা অনেক কম। এ নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।
এইসব উটকো প্রশ্রয়ে আনুশকার সাহস আরো বেড়ে গেছে। এটা তো এখন পরিষ্কার, এই মেয়ে ভার্সিটি ছাড়ার আগে কোনো ছেলেকে মুখই দেখাবে না। একটু স্নো পাউডার লিপস্টিক মাখতেও রাজি হয় না কোনো সময়! খালি পানি দিয়ে মুখ ধোয়। তাও ভালো চুলে-শরীরে শ্যাম্পুসাবান মাখে। এই করলে কি ভালো দেখায়? চেহারা খোলে? খালি বইপত্র নিয়ে পড়ে থাকলে চলে? এই যে এত বয়স হয়ে গেছে, তারপরও তো মিতা নিয়ম করে ডিম ভেঙে, দুধ দিয়ে, টক দই মাখিয়ে, ডাল বেটে কতকিছু করে চামড়াটাকে ঠিক রেখেছেন। অথচ মেয়ে তাঁর এখনই হাত গুটিয়ে বসে আছে।
মিতার আর দু মেয়ের এরকম চাকরিবাকরি কিংবা লেখাপড়ার বাতিক ছিল না। এটা ভাবতে তাঁর ভালোই লাগে। যে বাড়ির মেয়েদের ঘরের বাইরে কাজ করতে হয় সে বাড়িকে কি আর খানদানি বাড়ি বলা চলে? তাঁর বাবার অবস্থা তেমন ভালো নয়, কিন্তু এটুক খানদানি ভাব ঠিকই আছে। বাপ তাঁর এইজন্যে বেছে বেছে কবিরদের পরিবারে মিতার বিয়ে ঠিক করেছিল। চাকরিবাকরি করা ছেলে, গ্রামে থাকে না; অতএব মেয়েকে বাইরের কাজ তো করার প্রশ্নই ওঠে না, ঘরের কাজও তেমন করতে হবে না। তিনি নিজে বইপত্র পড়তে পারেন, ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের বই পড়তে তাঁর সবচেয়ে ভালো লাগে, তাছাড়া চিঠিপত্রও লিখতে পারেন। এর বেশি লেখাপড়া করে কী হবে তা নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না। তাঁর বোনের তো বিয়ে হয়েছে আরো ভালো ঘরে। এখন কল্যাণপুরে বাড়িঘর বানিয়ে নিজের সংসার নিয়ে তাঁর বোন আর বোনজামাই তো মনে হয় তাঁর চেয়েও ভালোভাবে রয়েছে। তাছাড়া ভাইরা লেখাপড়া করেছে। কেউ চাকরি করে। কেউ করে ব্যবসা। অবস্থা বেশ ভালোও তাদের, খানিকটা বাবার প্রায়-শেষ সম্পত্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করে, খানিকটা মাথার বুদ্ধি দিয়ে। বড়ভাই তো ঢাকায় বাড়িও বানিয়েছে বোনজামাইয়ের মতো কল্যাণপুরেই জায়গাজমি কিনে। তাঁদের মধ্যে বাবার সেই খানদানি ভাব দেখতে পেলে মিতার মনে ভারি ফুর্তি লাগে। এই ভাইটা তাঁর মতোই মেয়েদের চাকরিবাকরি করা পছন্দ করে না জন্যে খুবই প্রসন্ন তিনি তার ওপরে।
মিতার তো মনে হয়, ঠিক বয়সে বিয়েশাদির প্রস্তাব আসে না বলেই লোকজন মেয়েদের ভার্সিটিতে পড়ায়। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে তাঁর মতোই পনেরোতে, এজন্যে তিনি শোকর গুজর করেন আল্লাহতায়ালার কাছে। যেভাবে বিয়েটা হলো তাতে তো তিনি মনে করেন, দিলরুবার ওপর আসলে আল্লাহর সরাসরি বরকত নেমে এসেছে। একটা বিয়েতে আমন্ত্রণ ছিল তাঁদের—আর তিনি চাইছিলেন শুধু স্বামী-স্ত্রী মিলে সেই বিয়েতে যেতে। কিন্তু দিলরুবা গোঁ ধরে বসেছিল, সঙ্গে যাবে বলে। তিনি তো সেদিন ওকে মারতেই গিয়েছিলেন ওর এই আদিখ্যেতা দেখে। কিন্তু কবির আদনান ঠেকিয়েছিলেন তাঁকে, তারপর সঙ্গে নিয়েছিলেন দিলরুবাকেও। সেই তেজগাঁওয়ে বিয়েবাড়িতে যেতে যেতে গোটা রাস্তায় তিনি আর কথাই বলেননি কবির আর দিলরুবা দুজনের সঙ্গে। এমনকি মেহবুবা একবার কথা বলে উঠলে তিনি তাকে ধমকে দিয়েছিলেন। নেহাত তাঁর নিজের খালাতো ভাইয়ের বিয়ে, খালা নিজে এসে দাওয়াত করে গেছেন, না হলে তো তিনি সেখানে যাওয়ার প্রোগ্রামই বাতিল করে দিতেন। কবির আদনানের তরফের খালাতো ভাই হলে তো তাঁর এই সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দেরি হতো না। কিন্তু মেয়ের ওপর রাগ করে তো নিজের খালার ওপর অবিচার করা যায় না। যেতে যেতে চুপচাপ তিনি শুধু ভাবছিলেন, কখন পৌঁছাবেন বিয়েবাড়িতে। তাহলেই তো তাঁকে আর এই বাবা-মেয়ের চেহারা দেখতে হয় না। অথচ আল্লার কী কাজ, সেই বিয়েবাড়িতেই আশরাফের বাবার মতো এক খানদানি বংশের মানুষ হঠাত্ তাঁর মেয়েকে দেখে পছন্দই করে ফেলল নিজের ছেলের পাত্রী হিসেবে। বিয়েবাড়িতেই একফাঁকে আশরাফের বাবা আর মা তাঁদের দুজনকে ডেকে নিয়ে বলেছিল, ‘আমাদের আশরাফ, ভার্সিটিতে জিওগ্রাফি পড়ায়, ওই যে ওই কোনার টেবিলে ভাইবোনদের সঙ্গে বসে আছে। আপনারা দেখে নেন একটু, তারপর অনুমতি দেন তো আপনার মেয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো।’ দিলরুবার ওপর আল্লাহর বরকত না থাকলে কি আর এরকম ঘটনা ঘটতে পারে?
মেজো মেয়ের বিয়ে নিয়েও কোনো ঝামেলা হয়নি তাঁদের। যদিও মিতার তো মনে হয় তার একটু বেশি বয়সেই বিয়ে হয়েছে। মেহবুবা তখন ডিগ্রি পড়ে। বাসার কাছেই বাংলা কলেজে। ভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারত, কিন্তু মিতার তা ভালো লাগেনি। যদিও বড় জামাই তাঁর বড় মেয়েকে নিয়ে ক্যাম্পাসেই থাকে, আর মেয়েও তো একেবারে মাটির মতো, মাটি থেকে চোখ তুলে তাকায় না রাস্তাঘাটের কোনো পুরুষের দিকে, বেতাল কিছু হওয়ার কোনো সুযোগ নেই তার পক্ষ থেকে, তবু তিনি সায় দেননি কবির আদনানের কথায়। মেহবুবা কলেজে ভর্তি হলেই তিনি বলেছিলেন বড়জামাইকে, ‘এবার ওর জন্যে একটা পাত্র দেখ।’
তা শুনে আশরাফ হেসে ফেলেছিল, এত তাড়াতাড়ি? শুনে তাঁর রাগই হয়েছিল, নিজে যে ১৫ বয়সের মেয়েকে বিয়ে করেছিল সে কথা একটুও মনে নেই জামাইয়ের! তখন তো দিলরুবাকে দেখে জিভের ডগায় আর না না শব্দ ওঠেনি। অথচ এখন শালীর বিয়ের কথা শুনেই মনে হচ্ছে, এত তাড়াতাড়ি!? মানুষজনের বোধবুদ্ধি মনে হয় দিনে দিনে কমে আসছে, নইলে বিয়েশাদি এত দেরিতে হবে কেন! তা যা-ই হোক, মেহবুবার বিয়ের প্রস্তাব ওই আশরাফই নিয়ে এসেছিল, তার এক কলিগের ছোটভাইয়ের সঙ্গে। সেই ছেলে কয়েকমাস পরই পিএইচডি করতে ইংল্যান্ডে যাবে। যাওয়ার আগে বিয়ে করবে, বউকেও নিয়ে যাবে সঙ্গে করে। এইভাবে তাঁর দুইটা বড়সড় ঝামেলা চুকেবুকে গেছে।
কিন্তু আনুশকাকে নিয়ে ঝামেলা হবে, তা তো আগেভাগেই বোঝা যাচ্ছে। কবির আদনান মারা যাওয়ায় ভালো হলো না মন্দ হলো কিছুই বুঝতে পারছেন না মিতা। একবার মনে হয়, এ খুব বিপদই হলো। ছোট মেয়েটি এমনিতেই তাঁর কথা শোনে না, বাবা মারা যাওয়াতে তাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে পোষ মানানোর মতো কেউই থাকল না। যতদিন মেয়ে ঘরে আছে, ততদিন কেবল ওকে নিয়েই টেনশনে থাকতে হবে। অষ্টপ্রহর এমন এক মেয়ের সঙ্গে থাকা, তাও তো কম ঝক্কির নয়। আবার মনে হয়, না, ভালই হলো। এবার তিনি মেয়ের রাশ ঠিকমতো টেনে ধরবেন। চাকরিবাকরির ঝামেলায় যেতেই দেবেন না। এই চল্লিশা পার হলেই তিনি মেয়ের জন্যে পাত্র খুঁজতে শুরু করবেন। মেয়েকে বুঝিয়েসুঝিয়ে ঠিক করার জন্যে দরকার হলে কিছুদিন বাসায় এনে রাখবেন বড় জামাই আর বড় মেয়েকে।
তবে সবচেয়ে বড় ঝামেলা এখন, এত বড় এই বাড়িটার দেখাশোনা করা। ইচ্ছে হলে এ বাসারই কোনো এক তলায় বড় মেয়ে আর বড় জামাইকে এনে রাখা যায়। কিন্তু তারা তো আবার ভার্সিটির কোয়ার্টারেই থাকে। সেখানে একটা বাসা পাওয়ার পর থেকে আশরাফ তো নিজের বাবার বাড়িতেও থাকে না। মাঝখানে দীর্ঘদিন কাটিয়ে এল অস্ট্রেলিয়ায়। ফেরার সময় তাঁর জন্যে একটা ওভেন নিয়ে এসেছে। তা পেয়ে মন ভরে গেছে তাঁর। তবে মাঝেমধ্যে মনটা কেমন করে ওঠে মেহবুবাদের জন্যে। ওরা বোধহয় আর কোনোদিন ফিরবে না এই দেশে। ইংল্যান্ডে লেখাপড়ার পাট চুকানোর পর দেশে ফিরে কয়েক বছর কাজকর্ম করে মেজো জামাই আবার চলে গেছে স্পেনে গোটা পরিবার নিয়ে। তারপর আছে তো আছেই, ফেরার কোনো ইচ্ছে আছে বলে মনে হয় না।
তাহলে এত বড় এই বাসায় মিতা কী করবেন, আনুশকারও বিয়ে হয়ে গেলে? এত ভালো আচার বানাতে পারেন তিনি; সেই আচারই বা কে খাবে! দিলরুবার তিন ছেলেমেয়ে; নাতনি তাও শখ করে এটা সেটা খায়, বয়ামভর্তি আচার নিয়ে যায়। কিন্তু কী এক ভূত চেপেছে আশরাফ আর দিলরুবার ঘাড়ে—তারা নাকি মেয়েকে এইচএসসির পর পাঠিয়ে দেবে সেই বোম্বে শহরে। যদিও তার এইচএসসি পাস করার অনেক দেরি, তবুও ভেবে গা কেমন রি রি করে ওঠে তাঁর। আর মেহবুবারা তো ফিরবেই না, এলেও বড়জোর দু-এক মাস ঘুরে বেড়াবে। চলে যাবে তারপর। আর আনুশকাকে যদি বিয়ে দেন জোরজবরদস্তি করে তাহলে ও যে আর এ বাসামুখো হবে না তাতে তো কোনো সন্দেহই নেই। তার মানে এ বাসায় থাকতে হবে তাঁকে একা একা। বাসায় শুধু তিনি, এমনকি কারো ফেরারও সম্ভাবনা নেই অফিস কিংবা বাজার সেরে, রাস্তা থেকে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে; কেবলই একা তিনি, কারো জন্যে দরজাটা খুলে দিতে হবে না—ভাবতেই গলা তাঁর শুকিয়ে আসে।
আর তাই মিতা যখন আনুশকার প্রশ্নবোধক মুখটা দেখেন, শোনেন সে বলছে, বন্ধুদের কী বলতে হবে, তখন তিনি ঝরঝরিয়ে কেঁদেই ফেলেন।
চার
অবশ্য এটা স্বীকার করতেই হবে মিতাকে, একটি মৃত্যুর সঙ্গে যত ঝামেলা থাকে, দৌড়াদৌড়ি ঝাঁপাঝাঁপি থাকে, সেসবের কোনোটাই পোহাতে হয়নি তাঁকে। খবর পেয়েই তাঁর ভাইরা এসেছিল, তাদের প্রায় সবাই তো এই ঢাকা শহরেই থাকে। এখন তো তাদেরও শেষ ঠিকানা এই ঢাকা মিতাদের মতো। আর খালারা তো অনেক আগে থেকেই ছিলেন। এই মিরপুর এক নাম্বারে ওঠার পরই তিনি দেখেছিলেন, চারপাশ খাঁখাঁ করছে। কল্যাণপুরের দিকে তো তাকানোই যেত না। সেই কল্যাণপুরে বড়ভাই যখন জায়গা কিনল, তখন মিতা ভেবেছিলেন টাকাগুলো রীতিমতো জলেই গেল বোধহয়। বড়ভাই এ কাজ করতে গেল আবার তাঁরই বোনের পরামর্শে। আগেই তারা জায়গা কিনে বাসা বানানোর কাজ শুরু করেছিল সেখানে। কিন্তু বড়ভাইয়ের জন্যে যে জায়গা ওরা খুঁজে বের করল সেটার অবস্থা তখন আরো খারাপ। ওইখানে মাটি ফেলে জলা ভরাট করেও বাড়ি বানানোর মতো অবস্থা ছিল না তখন। খালি কি জলা? জঙ্গল, রীতিমতো জঙ্গল। দিনের বেলায়ও মানুষজন লাঠি দিয়ে ঝোপঝাড়ে বাড়ি দিতে দিতে সামনের দিকে এগোয়। অথচ সেই একই জায়গা দেখে এখন অবাক হতে হয়। কল্যাণপুরের বাসস্ট্যান্ডটার কাছে হওয়া ওই মার্কেট দেখে তিনি এখন অবাক হয়ে যান। ঝকঝকে, পরিপাটি। তিনতলা অথবা চারতলায় নাকি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বসবে। এসবের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে ভেতরের দিকে। সেই রাস্তার এদিকসেদিক এখন ধীরে ধীরে বাড়িঘর উঠছে। বাড়িগুলোকে তাই এলোমেলো মনে হয়। এগারো নাম্বারের পাকা রাস্তার মাঝামাঝি নেমে একটা মাটির রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে দু টা না তিনটা বাড়ি পার হওয়ার পর খানিকটা জায়গা জুড়ে বাসাবাড়ি তাঁর ভায়ের। এখনো জলা, এঁদোডোবা আর এবড়োখেবড়ো মেঠো রাস্তা ছড়িয়ে আছে তাঁর সেই ভাইয়ের বাসার ধারেকাছে অনেক অনেক জায়গা জুড়ে।
খবর পেয়েই মিতার ভাইবোনরা চলে এসেছিল। যদিও সেই খবর পৌঁছানোর অবস্থাই তো তাঁর ছিল না তখন। কাজের মেয়েটা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আনুশকা হাউমাউ করে কাঁদছে আর তিনি নিজেও তো বাদ নেই সেই তালিকা থেকে। এতলা ওতলা থেকে লোকজন ছুটে এসেছিল। তিনতলায় শরীয়তপুরের শাহজাহান সাহেব থাকেন, কেবলই তাঁর বাসায় ডিজিটাল টেলিফোন লেগেছে, তিনিই চেষ্টা করতে লাগলেন এখানে সেখানে খবর দিতে। ভাইদের নিয়ে কোনো সমস্যা হলো না, টেলিফোনেই খবর দেওয়া গেল তাদের। সেই প্রথম হাড়ে হাড়ে টের পেলেন মিতা এই বস্তুটা কত প্রয়োজনীয়। আশরাফের বাসায় টেলিফোন নেই। তাকে খবর দেওয়ার জন্যে কে যে কাকে পাঠাল তা আর খেয়াল করেননি তিনি সেই সময়ে। গ্রামের বাড়িতে আর কাকেই বা খবর দেবেন! ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই হয়ে গেছে এতদিনে, তাছাড়া খবর দেওয়ার মতো সম্পর্ক থাকলেও তা তো আর পৌঁছানো যেত না। গ্রামে গিয়ে পৌঁছাতেই সারাদিন লেগে যায়। আর খবর পেয়েই তো রওনা হওয়া যায় না, ট্রেন কিংবা বাসেরও তো টাইমটেবল আছে। অতক্ষণ কি আর লাশ আটকে রাখা যায়। কেবল মেজো মেয়ের জন্যে দুঃখ হচ্ছিল তাঁর সেই সময়ে। বাবাকে দেখার আর ভাগ্য হলো না তার, এমনকি মারা যে গেছেন সে খবরটাও পেল না ঠিক সময়ে।
এতকিছুর মধ্যেও আনুশকা যে আনু্শ্কাই তা আবারও বুঝতে পারলেন মিতা। এতবড় একটা শোক, কত ধরনের আত্মীয়স্বজন আসে, তার কি ঠিকঠিকানা আছে? এরকম একটা সময়ে শত্রুও যদি আসে, তাকে কি আর অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া যায়? কিন্তু আনুশকা হঠাত্ই ঝড়ের মতো এসে দাঁড়াল তাঁর কাছাকাছি। তিনি তখন খালা আর কয়েক বয়সী মহিলার সঙ্গে বসে বসে কোরআন পড়ছিলেন। দোয়া ইউনুস; এই সুরা পড়লে বালামুসিবত থেকে রেহাই দেন আল্লাহ।
আনু্শ্কা এসে সরাসরি বলল তাঁকে, ‘মা, তোমার বড় বোনের ওই ছেলেকে তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যেতে বল।’
প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি। তাই বলেছিলেন, ‘কোন ছেলে?’
‘যেয়ে দেখ, কোন ছেলে। তোমার তো মনে না পড়ারই কথা। নিজের বোনের ছেলে তো!’
আচমকা মিতার মনে পড়েছিল তাঁর বড় বোনের মেজো ছেলের কথা। আনুশকা যখন এইচএসসি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে তখন সে চিঠি লিখেছিল। প্রেমের চিঠি। চিঠি পেয়ে ভয়াবহ খেপে গেল আনু্শ্কা। যা তা বলে অপমান করেই ক্ষান্তি দেয়নি সে, সেই থেকে ছেলেটার এ বাসায় আসা নিষেধ। তাছাড়া আনু্শ্কা নিজেও আর কখনো যায় না তার বোনের সেই কল্যাণপুরের বাসায়। তাঁর বোনের ছেলেটা এমন কি খারাপ তা বুঝতে পারেন না মিতা। এরকম পাত্র পাওয়ার জন্যে আনুশকার চেয়েও ভালো ভালো মেয়েরা হাপিত্যেশ করে। বিআইটিতে লেখাপড়া করেছে, এখন ইঞ্জিনিয়ার। এরকম পাত্রই তো খোঁজে লোকজন। এরকম ছেলের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর তাকে অপমান করা কি আনু্শ্কার মতো মেয়ের সাজে? কবির আদনান হাতের কাছে না থাকলে তিনি মেয়েকে জুতাপেটা করতেন। সেই ছেলে যদি তার খালুর মৃত্যুর খবর পেয়ে এ বাসায় আসে, তাতে কি সবকিছু অপবিত্র হয়ে যায়?
আগের সেই সব ভুলভ্রান্তি এখন থেকেই ঝেড়ে ফেলা শুরু করা দরকার। তাই তিনি কোরআন পড়া বন্ধ করে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, এসেছে তো কী হয়েছে? খালুর মারা যাওয়ার খবর পেয়ে সে আসতে পারে না?
আনু্শ্কা কটমট করে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় না, ওর ভেতরে কোনো মৃত্যুশোক বা বেদনা আছে। বলে, না, আসতে পারে না। তুমি ভালো করেই জান, আসতে পারে না। তুমি ওকে চলে যেতে বল। না গেলে আমি বাইরের ঘরে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করব। সেটা করলে কিন্তু তোমাদেরই জাত যাবে।
অন্য কোনো সময় হলে মিতা রেগে যেতেন। তাছাড়া পরিস্থিতিও তো এক অর্থে তাঁর অনুকূলেই। এখন আর কবির আদনান নেই যে মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলবেন, এই... এই... ওয়েট... ওয়েট...। কিন্তু কুলখানির দিনে মেয়ের সঙ্গে তর্কাতর্কি করা কেমন দেখায়। তবে মেয়েরই বা আক্কেল কোন ধরনের যে এরকম একটা দিনেও পুরনো জেদ দেখায়!
তিনি অসহায়ের মতো এদিকসেদিক তাকিয়েছিলেন। দিলরুবাকে খুঁজছিলেন তিনি আশরাফকে গিয়ে আনুশকার এই আচরণের কথা জানিয়ে সবকিছু সামাল দিতে। তারপর বিব্রত হয়েছিলেন কাছেই বসা বড় বোনের চোখে চোখ পড়তেই। তার চোখমুখ রক্তশূন্য হয়ে গেছে। মিতাকে সে বলেছিল, তুই বয়। আমি দেখছি।
কথা তো আর চাপা থাকে না। এই ঘটনা ঠিকই চাউর হয়ে গেল। চোখ কোরআন শরিফের পাতায় থাকলে কী হবে, কান তো সবার খোলাই ছিল। চল্লিশার সেই মিলাদ অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরও একেবারে কাছের আত্মীয়স্বজন থাকল আরো খানিকক্ষণ। রান্নাঘরে যেতে যেতে তিনি হঠাত্ করেই শুনলেন তার বড় বোনকে মেজো মেয়ে মেহবুবার বড় জা বলছে, না না, মেয়েমানুষের তো এত ঝাঁজ থাকা উচিত না। ওনারা খুবই খারাপ করেছেন এত লাই দিয়ে। পুরুষ মানুষের তো একটু খামখেয়ালি থাকেই...
আনুশকার ওপর রাগে মিতার শরীর থরথরিয়ে কাঁপতে থাকে। পুরনো এক ঘটনা নিয়ে আজ আবার নতুন করে কানাকানি হচ্ছে! শোনার পর কেউ এটা বিশ্বাস করবে, কেউবা করবে না। কেউ মনে করবে তাঁর মেয়েরই দোষ, কেউ আবার ছেলেকে দোষ দিলেও মেয়েকে সন্দেহের চোখে দেখবে। বলবে, নিশ্চয়ই ছেলেটলানী স্বভাব আছে, নইলে ছেলেই বা আগবাড়িয়ে চিঠি লিখবে কেন। পাগলকে সাঁকো নাড়াতে না করলেই তো পাগল বেশি করে সাঁকো নাড়ে! কবিরের মৃত্যুর চেয়েও বড় এক আশঙ্কা আনুশকা সেই থেকে। কুলখানির পর থেকে আজও তিনি সুস্থির হতে পারছেন না কী এক অজানা আশঙ্কায়।
সব কিছু থিতিয়ে এলে আর জীবনটাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এলে মিতার নতুন করে কান্না এল কোনো ছেলে নেই জন্যে। জীবনের এত দায় তো আর কন্যাদের দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। এই যে ইলেকট্রিসির বিল, গ্যাসের বিল, ব্যাংক থেকে টাকা তোলা, বাজার করা এগুলো সামাল দেওয়া কি কম ঝামেলার ব্যাপার! এসব তো পরের কথা, বাসাভাড়া মাসে মাসে আদায় করাও তো একটা ভয়াবহ ব্যাপার। ঢাকা থেকে এত দূরে কেউ থাকতেই চায় না। জুনিয়র কর্মকর্তারা থাকে—কেবল চাকরি পেয়েছে বলে, এখনো তত বেশি বেতন পায় না বলে কিংবা হিসাবনিকাশ না করেই বিয়ে করে ফেলেছে বলে। আর থাকে কর্মচারীরা, ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা। হিসাব খুবই স্পষ্ট—বাসাভাড়া কম, তাই তারা এত দূরে থাকে।
তাও ভালো, কবির আদনান বাড়ির তিনতলা তুলে যেতে পেরেছিলেন। দোতলার পুরোটাতেই থাকেন তাঁরা। আর নিচ-ওপর মিলিয়ে থাকে ভাড়াটেরা। এই বাসা যদি হতো পল্টন, মতিঝিল কিংবা ধানমন্ডির দিকে, তাহলে তাঁদের কপালই হতো অন্যরকম। সেখানে এখন যেরকম বাসাবাড়ি উঠছে, সেগুলো দেখলে মনে হয়, কবির আদনানের এই বাড়িটা একটা বেহেশত্খানা। বাসার সামনে ফুটবল খেলার মতো জায়গা না থাকলেও ছুটোছুটি করা যায়। তিনদিকে ইটের আর সামনে গ্রিলের প্রাচীর। বাসার রুমগুলোও তো নেহাত ফেলনা নয়। এখন সবাই মোজাইক করলেও বাড়ির মেঝের দশা কয়েক বছরেই বারোটা বানিয়ে ফেলে। কিন্তু এ বাসার মেঝে মোটেও সেরকম নয়। অনেক পরে টাইলসের চল শুরু হলে কবির আদনান বাথরুম আর কিচেনে টাইলস লাগিয়েছেন সব তলাতেই। সে অনুপাতে বাসাভাড়া খুবই কম। বাড়ির মালিক হিসেবে তাদের মনে হয় তা-ই। তবে ভাড়াটেদের কথা অনুযায়ী, এরকম জায়গায় বাসাভাড়া এত রাখা ঠিক নয়। মিতা এসব কথা গায়ে মাখেন না, কবির আদনানকেও মাখতে দেননি।
ভাড়াটেরা প্রথম প্রথম সহানুভূতি দেখিয়ে খোঁজখবর নিত। কিন্তু তাও দিনে দিনে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। তিনতলায় শরিয়তপুরের শাহজাহান সাহেবের সঙ্গে তাঁর বৃদ্ধা মা-ও থাকেন। তিনিই শরীর ভালো থাকলে নিয়মিত আসেন। কিন্তু তাঁর ছেলে আর ছেলের বউ নাকি ব্যাপারটা পছন্দ করে না। ব্যবসা করেন বলে শাহজাহান সাহেবের মেজাজ নাকি চড়েই থাকে। নিচতলার ডানদিকের ভাড়াটের বউয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে মিতার ভালোই লাগে। কিন্তু সে কখনো আলাপ করতে আসে না। নিজে দু-তিনবার গিয়ে দেখেছেন, তাঁকে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেই গল্প করে সেই ভাড়াটের বউ। এই ভাড়াটে লোকটা নাকি এই এক নাম্বার গোলচত্বরেই কী এক সেলাই মেশিন কোম্পানির দোকানে বেচাবিক্রি দেখাশোনা করে। ইংলিশে যতই বলুক, ম্যানেজার—কাজেকর্মে তো দোকানদারই, তার বউয়ের এইসব আটফাটাং মিতার ভালো লাগে না। কবির আদনান বেঁচে থাকলে তিনি নিজেই এ ফ্যামিলির লোকজনকে বিদায় করে দিতেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দু-চারটা কথাবার্তা বলে। অবশ্য দরজা খুলে দেওয়ার পর বসতে বলতেন ভদ্রতা করে। কিন্তু না বসলে জোরাজুরি করতেন না। অথচ এরাই এখন কথাবার্তা বলতে চায় না আর। ভয়ে ভয়ে থাকে, বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই—তাদের দিয়ে হয়তো কোনো কাজ করাবেন, এই ভয়ে গুটিয়ে থাকে। ভাবতেই রাগ ধরে তাঁর।
মিতা চিন্তা করেন, মানুষ বুড়িয়ে গেলে কমপ্লেইন বেড়ে যায় বহুগুণ। কে জানে হয়তো শাহজাহান সাহেবের মায়ের অবস্থা অনেকটা তা-ই। হয়তো তাঁর ছেলে আর ছেলের বউ ঠিকই কথাবার্তা বলে, খাওয়াদাওয়া করায়; কিন্তু তারপরও বয়সজনিত এক অতৃপ্তির কারণে বৃদ্ধা সবসময় অভিযোগ আর অনুযোগ করে বেড়ান একেকজনের কাছে। সেজন্যেই বোধহয় ছেলে কিংবা ছেলের বউ মিতাদের ঘরে আর আসতে দিতে চায় না তাঁকে। এরকম একটা যুক্তি দাঁড় করাতে পেরে কেন যেন মিতা পরিতৃপ্ত হন ভীষণরকম। আর দু ভাড়াটে আবার দরকার ছাড়া তেমন আসাযাওয়াই করে না তাঁদের বাসায়। এমনকি মাসের ভাড়াটা দিতেও মনে হয় রাজ্যের আলসেমি করে।
তাহলে আর কে-ইবা আসবে মিতার কাছে এই বাতাসে, বেলা-অবেলায়, কাজে-অকাজে! বড় মেয়ে মাঝেমধ্যে আসে। কিন্তু তার তো নিজেরই সংসার রয়েছে, সে আর কত আসবে। এখন সপ্তাহে একদিন বা দু দিন আসাযাওয়া করে—তাও আনুশকা তাদের বাসায় গিয়ে নিয়ে আসে বলে। পরে অবশ্য চলে যায় একা একাই। তবে কোনো কোনো সপ্তাহে জামাই আসে। সে সপ্তাহে দিলরুবার মুখ বাড়তি আরো একবার দেখা হয় তাঁর।
এত বড় একটা বাসায় মিতা একা একা হাঁপিয়ে ওঠেন। একা একাই থাকতে হয় তাঁকে প্রায় পুরোদিন। কাজের মেয়ের সঙ্গে কতক্ষণ আর কথা বলা যায়। আর ওই এক বিটিভির প্রোগ্রাম হয়ই বা কতক্ষণ, দেখবেনই বা কতক্ষণ। সে প্রোগ্রামও আবার দিনে থাকে না। রাজশাহীর দিকে নাকি বহরমপুরের টিভি চ্যানেল দেখা যায়! একেবারে পরিষ্কার সব অনুষ্ঠান। সেইসব অনুষ্ঠানের কথা এর ওর মুখে শুনে মাঝে মাঝে মনে হয় যে, বরং রাজশাহীতেই চলে যাবেন। ওখানেই থিতু হবেন। তাও উত্তম-সুচিত্রা, দিলীপকুমার-মধুবালা-সুরাইয়া-নার্গিসদের সিনেমা দেখতে দেখতে শেষ জীবনটা কোনোমতে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। আনুশকা যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ তাও সান্ত্বনা থাকে যে, না, কথা বলার মতো একজন তাঁর ধারেকাছেই আছে। অবশ্য আনুশকা নিজেকে নিয়েই মেতে থাকে। ঘুম ভাঙতেই সে পড়ার টেবিলে চলে যায়, হুড়মুড়িয়ে এটাসেটা খেয়ে বেরিয়ে পড়ে ভার্সিটির দিকে। কিন্তু মিতার খুবই বিশ্রী লাগে সাতসকালেই ওকে গোসল করতে দেখে। এই মেয়ের সাতসকালে গোসল করার দরকার কী! অবিবাহিতা মেয়েদের এত সকালে গোসল করার দরকার কী! তারা গোসল করবে রয়েসয়ে, বেলা করে, মা-ভাবীরা গালিগালাজ করে গোসল করতে বাধ্য করবে তাদের। সে হিসেবে আনুশকার গোসল করা উচিত ভার্সিটি থেকে ঘেমে নেয়ে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে। কিন্তু মেয়ে তাঁর সকালে উঠেই ফিটফাট হয় গোসল সেরে। যদিও খালি গোসল দিলে কি ফিটফাট হওয়া বোঝা যায়! তাও ভালো, মাথায় চুল রয়েছে, তাই ভিজে থাকে, মনে হয় স্নান সেরেছে। তাছাড়া ওর শুকনো চুল যতই আঁচড়ানো হোক না কেন, কিছুতেই মনে হয় না চিরুনি পড়েছে দু-এক সপ্তাহের মধ্যে। এর চেয়ে গোসল না করে যদি খানিকটা স্নো-পাউডার মাখত, ঠোঁটে লিপস্টিক দিত তাও ভালো দেখাত। আর চুলটা শুকনো দেখে লোকজন ভাবত, এখনো বিয়ে হয়নি। সাজগোছের মধ্যে তো ওই, কপালে টিপ দেওয়া। অথচ এই টিপ দেওয়াই আবার চোখে লাগে তাঁর। কিভাবে যে মেয়েকে জাতে তোলা যায়, তা চিন্তা করতে করতে স্বামীর মৃত্যুশোক মাথা থেকে চলে যায় তাঁর।
এখন এক হতে পারে, মিতা চিন্তা করেন, মেয়ের বিয়ে তাড়াতাড়ি দিয়ে দেবেন। জামাইকে ঘরে রাখবেন। মেজো জামাই যে এদেশে আর ফিরবেই না, তা এতদিনে বোঝা হয়ে গেছে তাঁর। বাকি আছে বড় জামাই। তারও যে কী মতিগতি, ভেবে পান না তিনি। তবে দেশে থাকলেও সে তো আর এই বাসায় থাকতে আসবে না। তাহলে এই বিশাল বাসার কী হবে, কবির আদনান কেন এই বাসা বানাতে গেলেন! ভাবতে গেলে মাথা আউলাঝাউলা হয়ে যায় তাঁর। যতই মনে করেন, কিছুতেই কিছু ভাববেন না এসব নিয়ে, ততই একই চিন্তা বার বার ঘুরে ফিরে আসে। ঢাকা শহরে জায়গাজমি থাকুক আর ওই গণভবনের মতো বাড়িঘর থাকুক, আনুশকাকে কেউ জেনেশুনে বিয়ে করবে বলে তো তাঁর মনে হয় না। তার চেয়ে বড় ব্যাপার, আনুশকাকে রাজি করানো। এই মেয়ে তো গতকালও শুনিয়েছে তাঁকে সাতসকালে খাওয়ার টেবিলে বসে, ‘মা, আমি কিন্তু এই পরীক্ষাটা দিয়েই আইএলইটিএস শুরু করব। একটা স্টাইপেন্ড যদি পাওয়া যায়...’ বলতে বলতে ওর গলাটা কেমন সুখে-আহ্লাদে ভরাট হয়ে আসতে থাকে। কিন্তু মিতা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠেন। একেবারে চলে যাওয়ার চাইতে বিয়ে না করে এই যে ও এ বাসাতেই আছে— এও তো অনেক ভালো। কথাবার্তা না হোক, রাগারাগিই হোক—কিন্তু একটা জীবন্ত মানুষ আশপাশে থাকা অনেক ভালো। তাছাড়া, এই ঢাকা শহরে এখন দখল আর বেদখলের খেলা শুরু হয়েছে। এই যে তিনি একটামাত্র প্রাণী—স্বামী নেই, পুত্র নেই, কন্যাজামাই নেই—কেউ চাইলে এ বাসা দখল করে নিতে আর কতক্ষণ লাগবে?
মিতা আতঙ্কিত হন। সাঁতরে কূল পান না, অকূলে ভাসেন। মাঝে মাঝে তো তিনি সাহসই পান না দরজা খোলার। ভয় করে, ডাকাত এল কি না। পেপার পড়তে পড়তে এই দুশ্চিন্তা তাঁর মাথার মধ্যে ভালোভাবে জেঁকে বসেছে। আগে তিনি পেপার পড়তেন না কোনোদিন। সত্যি কথা বলতে গেলে, পড়ার অভ্যাসই তো উঠে গেছে তাঁর জীবন থেকে। দরকার হয় না কোনোকিছু পড়ার। অদরকারেও পড়তে হবে, এমন কোনো অভ্যাস নেই তাঁর। কবির আদনান মারা যাওয়ার পর ভেবেছিলেন, বাদ দেবেন পেপার রাখা। মাঝখান থেকে খালি খালি মাসে মাসে বেরিয়ে যায় খানষাটেক টাকা। কিন্তু পেপার রাখা বাদ দেওয়ার কথা শুনে আনুশকা তিড়িংবিড়িং করে উঠল। অতএব তিনি চেপে গেলেন। বয়স হয়েছে, এখন এই মেয়ের সঙ্গে ঝগড়াবিবাদ করে মন খারাপ করে থাকার কোনো মানে হয় না। আর যেহেতু পেপার রাখাই হয়, যেহেতু তিনি বাসায় প্রায় একাই থাকেন, যেহেতু কাজ করতে করতে একসময় কাজও আর হাতে থাকে না, সেহেতু পেপার পড়া ছাড়া অন্য কোনোকিছু করার থাকে না তাঁর।
এই পেপার পড়তে পড়তে ইদানীং মিতার মনে হচ্ছে, সারাদেশে ডাকাতি ছাড়া আর কিছু হয় না। বিশেষ করে ঢাকা শহরে। লোকজন অদ্ভুত কায়দায় ডাকাতি করে। দুপুরবেলা বাসায় এসে ভিক্ষা চাইতে থাকে। ভেতর থেকে ক্ষমা চাইলেও বার বার কলিংবেল টিপে কিংবা কড়া নেড়ে ভিক্ষা চাইতে চাইতে কান ঝালাপালা করে ফেলে। তখন রেগেমেগে গালিগালাজ করার জন্যে কেউ দরজা খুলে দিলেই দেখে মূর্তিমান ডাকাত দাঁড়িয়ে আছে। যারা আসে তারা নাকি আগে থেকেই খোঁজখবর নিয়ে আসে। নিশ্চয়ই এ ধরনের ডাকাতের দল এতদিনে এ বাসার খবর পেয়ে গেছে!
মিতার তাই বাসার দরজা খুলতে ভয়ই লাগে। দরজার ফুটো দিয়ে তাকিয়ে তিনি আন্দাজ করে নেওয়ার চেষ্টা করেন, কে এসেছে। কিংবা বারান্দায় গিয়ে প্রথমে দেখেন আশপাশের পরিস্থিতি কেমন, বাসার গেইটের অবস্থা কী, সিঁড়ির মুখে কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে কি না, গেটের বাইরে কোনো বেবি বা মাইক্রো জাতীয় কোনোকিছু রয়েছে কি না। তারপর পরিস্থিতি অনুকূল মনে হলে তিনি বেশ চড়া গলায় ‘কে-এ-এ... কে-এ? এই ভরদুপুরে কড়া নাড়ে-এ কে-এ-এ?’ বলতে বলতে দরজা খুলে দেন। হয়তো দেখেন ফকির অথবা তাবলিগ জামাতের লোকজন কিংবা তিনতলার বদলে দোতলায় কড়া নেড়ে ফেলা অতিথি। এরকম কোনো না কোনো অদ্ভুত লোকজন এসে প্রায়ই কড়া নাড়ে তাঁর দরজায়। এসবই ষড়যন্ত্র, নইলে বাসার আর কোনো ফ্লোরে কড়া না নেড়ে কেবল তাঁর বাসাতেই কড়া নাড়ছে বলে মনে হবে কেন! আগে তো তাঁদের বাসায় এত কড়া নাড়ত না কেউ; হঠাত্ করে তাঁদের বাসাতেই বা কড়া নাড়া বেড়ে গেল কেন, তা তিনি কিছুতেই বুঝতে পারেন না।
কড়া নাড়ার আওয়াজ আর ভঙ্গি নিয়ে চিন্তা করতে করতেই মিতার মনে হয়, কেউ বোধহয় কড়া নাড়ছে। তিনি চিন্তায় পড়ে যান। এই অবেলায় কে কড়া নাড়ে? আনুশকার আসার কথা তো আরো খানিক পরে। ডিপার্টমেন্টে ক্লাস না থাকলে সে হয় দিলরুবাদের কোয়ার্টারে চলে যায়, রেস্ট নেয়, না হয় লাইব্রেরিতে ঢোকে। সব মিলিয়ে সন্ধ্যার আগে ও ফিরতেই পারে না। এখন না বিকেল, না সন্ধ্যা। এ সময়ে ফকিররা কড়া নাড়ে না, ডাকাতির যেসব ঘটনা পেপারে পড়েছেন কিংবা কারো মুখে শুনেছেন তা থেকেও মনে হয় না যে ডাকাত পড়েছে বাসায়। আর ডাকাত বা ফকিরদের কড়া নাড়ার আওয়াজ এত মোলায়েম হওয়ার কথা নয়। কেন যেন খুব নিশ্চিন্তেই তিনি দরজা খোলেন। দেখেন গ্রাম থেকে তাঁর ভাশুর আর দেবর এসেছে। নিশ্চয়ই কবির আদনানের মারা যাওয়ার খবর পেয়েছে। নইলে তাদের কি আর এত সাহস আছে যে এ বাসায় আসবে!
মিতা এদের বাসার ভেতর ঢুকতে দেবেন কি না ভেবে পান না।
পাঁচ
কতদিন আগে থেকে, জানা নেই আনুশকার; তার শুধু মনে আছে, ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার দিনই সে দেখেছিল, কলাভবনের সামনে একটা প্লাটফরমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তিনজন, আর তাদের দেখতে দেখতে ড্রয়িং খাতায় পেনসিল দিয়ে কী যেন মেলাচ্ছে আরো একজন। খুব কৌতূহল হয়েছিল, কিন্তু কেউ বলতে পারছিল না। শেষমেশ সেই ড্রয়িংখাতা হাতের মানুষটার কাছে গিয়েই সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিছু মনে করবেন না, এখানে কী হচ্ছে?’
ড্রয়িংখাতা হাত থেকে নামিয়ে মানুষটা তার দিকে তাকিয়েছিল গভীর চোখে। আনুশকা থতমত খেয়েছিল, ধরেই নিয়েছিল কড়া কথা শুনবে, তাই তড়িঘড়ি করে বলেছিল, ‘আমি ভর্তিপরীক্ষা দিতে এসেছি। ঠিক জানি না তো! কিছু মনে করবেন না।’
তো মানুষটা মনে হলো না সে কথা শুনতে পেয়েছে। সে শুধু গম্ভীর গলায় বলল, ‘মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য হবে। অপরাজেয় বাংলা।’
তা সেই অপরাজেয় বাংলার কাজ কবে যে শুরু হয়েছিল, কবেই বা আবার বন্ধ হয়ে গেল সেসবের কোনোকিছুই জানা নেই আনুশকার। অসমাপ্ত একটা কাজ পড়ে রয়েছে, ওটা বোধহয় আর কোনোদিনই শেষ হবে না, সেরকমই ধরে নিয়েছিল সে। তবে ধারণাটা পাল্টে গেল একদিন।
ক্যাম্পাসে আসতে আসতে সেদিন একটু দেরিই হলো। একটা ট্রাক হঠাত্ করেই সামনে এসে ঘুরতে গিয়ে আড়াআড়ি হওয়ার পর কিছুতেই আর ঘোরার সুযোগ পাচ্ছিল না। ভার্সিটির বাসটাও তাই পারছিল না সামনে যেতে। এই নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে মারামারি প্রায় লাগার দশা। শেষ পর্যন্ত যে মারামারি হয়নি, সেটাই সৌভাগ্য তাদের। এইসব হাঙ্গামায় নষ্ট হলো প্রায় মিনিট বিশেক সময়। তাড়াতাড়ি পা চালাচ্ছিল সে কলাভবনের দিকে। কোনো ক্লাস ধরার জন্যে নয়। ফিলিপাইন থেকে নাকি এক ভদ্রলোক এসেছেন, সেমিনার পেপার পড়বেন ধানের ওপর। কিংশুক বলেছিল, ‘ইচ্ছে হলে তুমি আসতে পার। হাইব্রিড ধান নিয়ে কথাবার্তা হবে, শুনে রাখ। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক জয়েন্ট সেক্রেটারিরও আসার কথা। বলা যায় না, তোমাকে দেখে তার ছেলের জন্যে পছন্দ করে ফেলতে পারে। তোমাদের ফ্যামিলিতে তো আবার অনুষ্ঠানে পাত্রপাত্রী পছন্দ করার বা হওয়ার রেওয়াজ আছে।’
তা আনুশকা কি আর বুঝতে পারে না, শেষের কথাগুলো তাকেই ঠেস দিয়ে বলা! কবে কোনদিন যেন সে বড় আপার বিয়ের গল্প করেছিল রাখী, হাবিবা, কায়েস, আতা আর কিংশুকদের কাছে। তার ধারণাই ছিল না যে কিংশুক মনে রেখেছে সেই ঘটনা। এবার এই উপলক্ষে সেইটা সে বুঝিয়ে দিল, লেখা হচ্ছে, লিখে রাখা হচ্ছে কোনোখানে এইসব তাম্রলিপিতে। সেমিনারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে নিতে পারেনি সে। আতা, কায়েস, কিংশুকরা এরকম মাঝেমধ্যেই তাকে এ অনুষ্ঠান সে অনুষ্ঠানে যেতে বলে। কখনো সে যায়, কখনো বা যায় না। আতা আর শাহেদের সাধাসাধির কারণটা সে বুঝতে পারে। কিন্তু কিংশুক কেন বলে, এখনো তা ঠাহর করতে পারে না সে। কখনো মনে হয়, হয়তো সহপাঠী বলেই বলে, বন্ধু মনে করে বলে। কিন্তু সহপাঠী আর বন্ধুকে আলাদা করে বুঝতে পারে না সে। হয়তো আলাদা তারা, হয়তোবা এক, হয়তো কখনো আলাদা কখনো এক; কিন্তু কাউকে শুধু সহপাঠী বলতে গিয়ে খুবই নিঃসঙ্গ লাগে তার। আবার একজন ছেলের সঙ্গে একজন মেয়ের রক্তসম্পর্ক বাদেও যে নির্দোষ সামাজিক সম্পর্ক থাকে, ব্যক্তিগত বন্ধন থাকে, কতদূর পর্যন্ত তা বন্ধুত্বই হবে, তা নিয়ে ভাবতে গিয়েও খাবি খায় সে। বন্ধুত্ব কি এমন কিছু না, যা সবসময়ই পারস্পরিক সম্পর্কে সীমারেখা অতিক্রম করে চলে? বন্ধুত্বের সীমান্তরেখাকে ক্রমশ বাড়িয়ে চলে, আরো বাড়ানোর দাবি করতে থাকে? আর সে জন্যেই কি নারীপুরুষের বন্ধুতা কোনো কোনো সময় সাম কাইন্ড অব লাভ অ্যান্ড সেক্স হয়ে পুরো বন্ধুত্বকেই হত্যা করে ফেলে? কিন্তু একটা-দুটো এমন উদাহরণের জন্যে কি সব নারী-পুরুষ বন্ধুকেই কাঠগড়ায় তুলে ঘুমাতে যেতে হবে?
এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরে আনুশকা। খুঁজে ফেরে আর ভাবে, বাবা তার খুব খারাপ সময়ে মরে গেল। এখন একজন বন্ধু আর দার্শনিক কোনখানে পায় সে! কোথায় পায় জীবনের পাকেচক্রে জমে থাকা বিবমিষাকে নেড়েচেড়ে দেখবার চোখ! অথচ বাবা কী নিশ্চিন্তে টুপ করে মরে গেল! তার ওপর বাবার এত ভরসা! এখন এই যে সে একটা বিদেশি উপন্যাস পড়ছে—পড়তে পড়তে বমি চলে আসছে, আবার রেখে দিতেও পারছে না! কেন পারছে না! এই প্রশ্নের উত্তর সে পায় কোনখানে! শরীর নিয়ে মানুষ কতদূর যেতে পারে, তা জানবে বলে? একজন ব্যক্তি কতটুকু মুক্ত হতে পারে, আরেকজন মানুষকে কতটুকু মুক্ত ভাবতে পারে, তা জানবে বলে? কী অদ্ভুত কাহিনি—স্বামীর সামনে থেকেই এক মেয়েকে তার ছেলেবন্ধু নিয়ে যাচ্ছে, আনুশকা আর মনে করতেই চায় না সেই বইয়ের কথা, কিন্তু তবু মাঝেমধ্যেই কথাগুলো এলোমেলোভাবে ভাসতে থাকে তার মাথার ভেতর, ‘দেখ আমরা বন্ধু, তুমি ওর স্বামী হতে পার, কিন্তু বন্ধুত্বের অধিকার আরো বেশি। কী, বিশ্বাস হয় না তোমার? তাহলে দেখ। ওকে নিয়ে আমি সামনের ঘরে ঢুকছি। তুমি কিহোল দিয়ে ইচ্ছে করলে তাকিয়ে দেখতে পার, আমি আলিঙ্গন করব।’ এহ্, তার গা ঘিন ঘিন করছে এসব পড়ে। আতা তাকে পড়তে দিয়েছে এই বইটা। কিন্তু সে বুঝেও বুঝতে চায় না, কেন এ বই পড়তে দিয়েছে। বুঝতে পারার দায় অনেক বেশি। তখন হয় বন্ধুত্বকে বিদায় দিতে হয়, না হয় মূল্য দিতে হয়। এ জন্যেই কি বন্ধুত্ব কারো কারো কাছে অব্যক্ত কিছু?
এর আগে আনুশকাকে আরো একটা বই পড়তে দিয়েছিল আতা। সেটা বোধহয় কুন্ডেরার ‘জোকস’। বইয়ের মধ্যে একটা ছোট চিরকুট ছিল। অবশ্য তাতে তার উদ্দেশে কোনো চিঠি লেখা ছিল না। কিন্তু কতকগুলি নম্বর লেখা ছিল। কেন যেন তার কৌতূহল জেগেছিল। আশ্চর্য, কেন যে ওই সর্বনাশা কৌতূহল জেগেছিল! কেন যে বইটার ওই নম্বরের পাতাগুলো বের করে সে পড়েছিল আলাদাভাবে! আর জেনেছিল, সবগুলো পাতাতেই কী ভীষণ তীব্র যৌনতা। ছেলেদের এই আকুলতায় তার মজা লাগে, হাসি লাগে, মাঝেমধ্যে গা ঘিনঘিনিয়েও ওঠে। একটু মিশতেই ছেলেরা কেমন টলে পড়তে থাকে এবং উত্তেজক কথাবার্তার মধ্যে ডুব দিতে খুব বেশি সময় লাগে না তাদের। কেউ কেউ খুবই ভয়ঙ্কর নিরীহ, তারা শুরু করে এভাবে, ‘আপা, একটা মজার জোকস বলব, কিছু মনে করবেন না, জোকস হিসেবে নিয়েন কিন্তু...’। ছেলেরা বোধহয় ভাবতেই পারে না, মেয়েদের বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য ছাড়াই ছুড়ে দেওয়া কোনো হাসিকে, কোনো চোখ নাচানিকে বেহুদাই ইঙ্গিতময় আর উদ্দেশ্যপূর্ণ মনে হতে পারে তাদের কাছে। যেহেতু তা ভাবতে পারে না, সেহেতু তারা খুব সহজেই ঘূর্ণি খায় চরম উত্তেজনার মধ্যে। মেয়েদের ততক্ষণই তা মজা লাগে, যতক্ষণ সেই ঘূর্ণি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তা না হলেই গা ঘিনঘিনিয়ে ওঠে। আতা আর শাহেদের কথাবার্তা শুনে মাঝেমধ্যে এরকমই লাগে আনুশকার। কিন্তু কিছু বলে না। নিরাপদ কোনো সহপাঠী পাওয়া আসলে খুবই দুষ্কর। আর কিংশুককে তো তার বাধ্যানুগত মনেই হয় না কোনো সময়। তবে রিকশায় চড়ে কোথাও যেতে হলে এ কারণেই সে কিংশুকের কথা আগে ভাবে; একা আর ফাঁকা পেয়ে সারা রাস্তা সে অন্তত আনুগত্য দেখানোর পাশাপাশি বেছে বেছে উদ্দেশ্যমূলক ঘটনা কিংবা জোকস শুনাবে না।
তবে রিকশায় যাওয়া এক কথা আর সেমিনার শুনতে যাওয়া আরেক কথা। ধান গাছ সংক্রান্ত একটা নিরস সেশান সে শুনতে যাবে কিংশুকের সঙ্গে নেহাত সাবজেক্ট রিলেটেড টপিক বলে! চিন্তাটাকে একসময় বাতিল করে দিয়েছিল সে।
কিন্তু বিকেলেই সিদ্ধান্ত পালটাতে হলো। লাইব্রেরির সামনে করবী গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে নীলা আর রাখী তখন বলাবলি করছিল, এস্ত্রাদার লেকচার শুনতে যেতেই হবে। তাছাড়া এস্ত্রাদার সঙ্গে তাদের একসময়ের শিক্ষক পুরনো টিচার কৌশিক আহমেদও এসেছেন বক্তব্য দিতে। একটা মজার ব্যাপারও আছে, দুজন একসঙ্গে কেবল এই সেশানটাতেই অংশ নেবেন; অতএব যেতে হবেই।
শুনে আনুশকাও নিজের সিদ্ধান্ত পালটে ফেলেছিল। এই কৌশিক আহমেদের কথা মাঝেমধ্যেই শুনতে হয় তাকে জুনিয়র টিচার আর ক্লাসের ছেলেমেয়েদের মুখে। কেউ কেউ রেফারেন্সও দেয় তাঁর বইয়ের। নিজের চারপাশে এক দুর্বোধ্য দেয়াল তোলা মানুষ তিনি—তাঁর চেনাজানা সবাই এরকমই বলে। তখন কেবল ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে সে, সব কিছুতেই কৌতূহলী হওয়ার সময় তখন। আনুশকা তাই ঠিক করেছিল, যাবে সেমিনারে। তবে সেখানে যাওয়ার পথেই তার চোখে পড়েছিল, একটি ছিপছিপে মেয়ে আর কয়েকজন ছেলে ঘোরাফেরা করছে কলাভবনের সামনে। নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করছে তারা সেই অসমাপ্ত ভাস্কর্যের দিকে চেয়ে চেয়ে। দেখে সে থমকে দাঁড়িয়েছিল। একজনকে সে দেখল ছেনি হাতে চেষ্টা করছে পাথর কাটার। চেহারাটা চেনা চেনা লাগল, কিন্তু কিছু মনে করতে পারল না। পাথর কাটতে কাটতেই আশপাশের কয়েকজনের কাছে কী যেন বলছিল মানুষটা। রীতিমতো উত্তেজনাকর ঘটনা, পাথর কেটে কেটে এরকমভাবে কাজ করা আর কখনো নিজের চোখে দেখেনি। পাথর কেটে একটা ভাস্কর্য তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, মাঝখানে তা থেমে গিয়েছিল, এখন পুনরায় শুরু হচ্ছে, এটা কি ছোট ঘটনা? তার ওপর সেই কাজ আবার একাত্তর স্মরণে। কতদিনই তো তার মনে হয়েছে, আমাদের এই দেশে শহীদ মিনার ছাড়া আন্দোলনের আর কোনো স্মারক নেই। আর সেই শহীদ মিনারে রয়েছে বিমূর্ত এক চেতনা। কিন্তু মূর্ত কিছুই নেই—তা কি মূর্ত হলেই লোকে ভাস্কর্যকে মূর্তি ভেবে ভুল করবে বলে?
সেই ভাস্কর্যের কাজ দেখতে দেখতে সেদিন আনুশকার দেরি হয়ে গিয়েছিল। সে গিয়ে দেখেছিল এস্ত্রাদার সেমিনার পেপার পড়া প্রায় শেষের দিকে। তাও ভালো, সেমিনার পেপার সাইক্লোস্টাইল করে সবাইকে দেওয়া হয়েছিল। এস্ত্রাদার বক্তব্যের সারকথাই ছিল, ভূমির তুলনায় বাংলাদেশে মানুষের অনুপাত অনেক বেশি। অতএব চাই ধানের উচ্চ ফলন। ব্যস, এইটুকুই। সেমিনার পেপারের উপসংহার শুনতে শুনতে খুব হতাশ হয়েছিল সে। ম্যারমেরে এইটুকু কথা শুনতে সে সেই মিরপুর থেকে দৌড়াদৌড়ি করে এতদূরে এল? রাখীকে সে বলেছিল ফিসফিসিয়ে, ‘বোগাস আর কি। বেহুদাই এলাম এই কথা শুনতে।’ বেশ কয়েকজন বক্তার এ কথা সে কথা শোনার পর তারা কৌশিক আহমেদের প্রথম কথাটা শুনেই নড়েচড়ে বসেছিল। সভাপতি বা অন্য কাউকে সম্বোধন না করে সরাসরি বক্তব্য দিতে শুরু করেছিলেন তিনি, ‘আমার তো মনে হয়, এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত—এই দোহাই টেনে ধানের উচ্চফলনের জন্যে যারা নানারকম প্রেসক্রিপশান দিচ্ছেন, তারা আসলে না জেনে না শুনে দেশের বারোটা বাজাতে চলেছেন।’
কৌশিক আহমেদ কথা বলতে শুরু করেছিলেন বাংলা ভাষায়। কিন্তু খানিক পর বলতে শুরু করেছিলেন ইংরেজিতেই। অনেকদিন বাইরে থাকতে থাকতে তাঁর ইংরেজিও কি বিদেশিদের মতো জটিল হয়ে গেছে? অত মনোযোগ আর রাখতে পারেনি তারা। তবু ওর মধ্যেই আনুশকারা টের পেয়েছিল, উচ্চফলনের এই ব্যাপারটাকে তারা সবাই তেমন কিছু মনে না করলেও এটা একটা বিরাট বিতর্ক। ছোট ছোট ক্ষমতাহীন দেশগুলো জনসংখ্যার চাপের মুখে তা গিলে নিচ্ছে। বড় আনন্দ পাচ্ছে। কিন্তু এতে ভবিষ্যতের সমস্যা হবে আরো ভয়াবহ। বক্তব্যের শেষ প্রান্তে কৌশিক আহমেদ আবারও বাংলার কাছে ফিরে এসেছিলেন, প্রথমে ইংরেজিতে তারপর আবারও দৈববাণীর মতো শোনাচ্ছিল তাঁর কথাগুলো :আমাদের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর বন্যাপ্রবণ দেশকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে বলেই যে এসব কথা বলছি, তা কিন্তু নয়। প্রকৃতি চায় বৈচিত্র্য, এই বৈচিত্র্য থাকার সুবিধা হলো প্রকৃতির বিরূপতার মুখে প্রকৃতিরই কোনো উপাদান আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়। কিন্তু বৈচিত্র্যহীন উচ্চফলনের একঘেয়ে চরিত্র সেই শক্তি জোগাতেই পারে না। আমি জানি, এদেশে ক্ষমতায় এখন সামরিক জান্তা। কিন্তু যখন সামরিক জান্তা ছিল না, তখনো যে পরিস্থিতি ভালো ছিল, তা তো নয়। সবাই চায়, খেতে বেশি ধান হোক, ধান তুলে বিক্রি করে তারা নতুন গরু কিনবেন, মেয়ের বিয়ে দেবেন, ঘর তুলবেন, ছেলেকে কলেজে-ভার্সিটিতে পড়াবেন। খুবই সঙ্গত আকাঙ্ক্ষা সকলের। এই আকাঙ্ক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আমি যেসব কথা বলেছি বা বলব তাতে মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে, আমি বোধহয় চাই না দেশটা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক, আমি বোধহয় চাই অন্য কোনো দেশের ওপর আমরা নির্ভরশীল থাকি এইসব খাদ্যের ব্যাপারে। আমি শুধু বলব, প্রকৃতি অমিত শক্তির অধিকারী, আমাদের তাই কৃত্রিম কোনো বীজের কাছে যাওয়াই উচিত নয়। কেন, এই যে প্রতি বছর বর্ষা আঘাত হানে, কেবল সেই বর্ষাকালের কথাই চিন্তা করুন, এমন ধান কি আমাদের নেই, যা তখন পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে? এরকম অসংখ্য উদাহরণ আমি দিতে পারি, যদি আপনারা শুনতে রাজি থাকেন। যখন কোনো ফসল নেই, তখনই কি আমরা পাই না টাটকা সব শীতের সবজি বাড়ির আশপাশের জায়গা থেকে? এসবের কিছুই কিন্তু থাকবে না আর এস্ত্রাদাদের দাওয়াই নিলে। আমি জানি, তিনি খুবই নিবেদিত মানুষ। কিন্তু মানুষের নিবেদিত হওয়াই যথেষ্ট নয়। সেই দিন আর খুব বেশি দেরি নেই যেদিন উর্বরতা হারানো খেতের সামনে বসে আমাদের কাঁদতে হবে। কিন্তু কেঁদে কোনো ফল হবে না, অমিয় চক্রবর্তী যে লিখেছেন, ‘কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে’, আমাদের নিয়তি তারচেয়ে বেশি কিছু নয়।’
কৌশিক আহমেদ এত বেশি আস্থার সঙ্গে এই কথাগুলো বলেছিলেন যে সবাই চুপচাপ বসেছিল তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরেও। তারপর হঠাত্ করেই সবাই একনাগাড়ে হাততালি দিয়ে উঠেছিল। তাঁর বলা সব কথা মনে থাকেনি আনুশকার। কিন্তু শেষের ওই কবিতার লাইনটা—আরে বাপ রে, এত লাগসই, আর মানুষটার তা মনেও করল কী লাগসই সময়ে! এরকম হয় তাহলে! একবার তখন মনে হয়েছিল, সবাই গিয়ে কৌশিক আহমেদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, তারও উচিত একবার কথা বলা। এমনকি রাখী, হাবিবা আর নীলাদেরও দেখল, গিয়ে এমনভাবে কথা বলছে যে মনে হচ্ছে ওদের টিউটোরিয়াল গ্রুপের টিচার। অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় খুব নস্টালজিক হয়ে পড়েছে। কিন্তু ওরকম দেখেই সে আবার পিছিয়ে এসেছিল, না বাবা, দরকার নেই কৌশিক আহমেদের সঙ্গে কথা বলার। তারচেয়ে চুপচাপ থাকা অনেক ভালো। সেদিন তার সঙ্গে নীলা গল্পে গল্পে মিরপুরে চলে গিয়েছিল। আনুশকা বাসায় ফিরে কবির আদনানকে প্রথমেই বলেছিল, ‘বাবা, আমাদের ভার্সিটিতে না সেই ভাস্কর্যের কাজ আবার শুরু হয়েছে। যে তিনজনের ফিগার থাকবে সে তিনজনকেই আজ দেখেছি আমি। মেয়েটা না সিলেটের এক কলেজে পড়ে। আমি নাম জানতে চেয়েছিলাম, বলল হাসিনা আহমেদ।’
শুনে নীলা নাকি বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল। কোথায় এতবড় একটা চমত্কার লেকচারের কথা বলবে, তা না—! স্কাল্পচার বানানো তো ইচ্ছে হলে দৈনিকই দেখা যায় আর্ট ইনস্টিটিউটে গিয়ে। তা নিয়ে এত কথা বলারই বা কী আছে!
আজকেও কলাভবনের সামনে দিয়ে রাখীর সঙ্গে যেতে যেতে আনুশকা একই দৃশ্য দেখে। স্ট্যাচু হয়ে দু ছেলে আর সেই একহারা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর খুব মনোযোগ দিয়ে পাথর খোদাই করে চলেছে আরেকজন। এইসব দেখতে দেখতে মনে হয় তার, চারুকলায় পড়লেই বোধহয় বেশি ভালো হতো তার। সে একটু উদ্ভ্রান্ত বাউলের মতো ঘুরে বেড়ালেও কিছু মনে করত না মানুষজন, বলা কি যায়, হয়তো সাতখুনও মাফ করে দিত। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। আর কয়েকদিনের মধ্যেই তার ক্লাস শেষ হয়ে যাবে। তারপর পরীক্ষা। পরীক্ষা হলে হয়তো ক্যাম্পাসে আসারই তেমন দরকার হবে না তার।
পড়াশোনা শেষ হয়ে যাচ্ছে ভেবে মাসকয়েক আগেও খারাপ লাগত আনুশকার। সেশন জ্যাম দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচত। যাক, ভালোই হলো, আরো কিছুদিন নির্বিবাদে ছাত্রী হয়ে থাকা যাবে। কিন্তু এখন আর ভালো লাগে না। কেবলই মনে হয় কবে শেষ হবে এই লেখাপড়া। এই ‘অপরাজেয় বাংলা’ যাতে না হয় সেজন্যে দিন কয়েক আগে কয়েকজন ছেলে সিগনেচার ক্যাম্পেইন শুরু করেছিল। ছেলেগুলো নাকি শিবির করে। কিন্তু ফাঁদে পড়ে গেল রোকেয়া হলের সামনে গিয়ে সিগনেচার ক্যাম্পেইন করার সময়। ছাত্রীরা ছেলেগুলোকে ঘিরে ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করে দিল। কী এক ক্রোধে দূর থেকে সেও জোরে জোরে বলতে লাগল, মার... মার... জোরে মার...। আর তারপরই মনে হলো, আচ্ছা এই নিয়ে যদি বড় ধরনের মারামারি হয়? ভার্সিটি বন্ধ হয়ে যায়? তখন তো পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে! ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। মারামারিটা নেহাত কম হলো না। অনেকেই আহত হলো, তবে ভার্সিটি বন্ধ হলো না। এই ভাস্কর্যটা শেষ হোক, তা সে নিজেও চায়। আরো অনেক অনেকদিন বাঁচতে চায় সে। চায় শেষ বয়সে এইখানে এসে এর পাদদেশে বসে থাকা ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীদের এই কথা বলতে, ‘এই ভাস্কর্য যখন হচ্ছিল, তখন আমি এখানকার ছাত্রী ছিলাম। প্রতিদিন বসে বসে দেখতাম, কিভাবে কাজটা করা হচ্ছে।’ ভার্সিটি বন্ধ হলে তো কেবল পরীক্ষা নয়, এই কাজও বন্ধ হয়ে যাবে। সে ভেবেই পায় না, ‘অপরাজেয় বাংলা’ বানানো হচ্ছে দেখে এদের এত গায়ে লাগছে কেন।
লাইব্রেরির দিকে যেতে যেতে রাখীকে বলে আনুশকা, ‘দাঁড়া একটু দেখি।’
বলে আনুশকা দাঁড়িয়ে পড়ে। দেখতে থাকে ‘অপরাজেয় বাংলা’কে। স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন। রোদ এসে পড়েছে তাদের চোখেমুখে। কিন্তু স্থির, অনড় তারা। খুব বিরক্ত রাখী চুপচাপ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আনুশকা তা বুঝতে পেরেও গায়ে মাখে না। সে একবার সামান্য সামনে গিয়ে, আরেকবার আরো পেছনে গিয়ে এদিক সেদিক দাঁড়িয়ে অপরাজেয় বাংলার প্রস্তুতিপর্ব দেখে চলে। মনে হয়, পেছনের কলাভবনটা না থাকলে কিংবা আরো গজ বিশেক দূরে থাকলে এটার চেহারা আরো খুলত। আরো বেশি বন্ধনহীন, মুক্তির জন্যে একাগ্র মনে হতো এদের। তবে এরা যখন এ জায়গাটাই বেছে নিয়েছে নিশ্চয়ই সেটার পেছনে কোনো কারণ রয়েছে। হতে পারে, এরচেয়ে খোলামেলা কোনো জায়গা আর পাওয়া যায়নি। গাছের একটা পাতা মাথার ওপর টুপ করে গড়িয়ে পড়ে তাকে সচকিত করে তোলে। এক কাপ চা খেয়ে নিতে হবে লাইব্রেরিতে ঢোকার আগে। রাখীকে বলে সে, ‘চল, মধুর ক্যান্টিন থেকে এক কাপ চা টেনে নিই।’
‘না, ওইখানে যাব না।’ বেশ বিরক্তি নিয়েই বলে রাখী। এইসব আদিখ্যেতা ভালো লাগে না তার। চা তো লাইব্রেরির সামনেও পাওয়া যায়। চা তো চা-ই; চায়ের আবার মধু কী, হাকিম কী, মোল্লা কী! তাছাড়া ডাকসুর নিচে এদিকেই আছে ক্যাফেটেরিয়া। সেখানে বসা বরং অনেক ভালো মনে হয় তার। বেরুনোর সময় প্রেস লিমিটেডের বইখাতার দোকানে সামান্য ঢু মারা যাবে। বই অবশ্য কেনা হবে না। কিন্তু খাতা বানানোর শাদা কাগজ কেনা তার খুবই জরুরি।
‘ঠিক আছে চল, কোনখানে যাবি। তোর যেখানে খুশি, সেখানেই চল। কিন্তু চা আমার খেতেই হবে। না হলে লাইব্রেরিতে গিয়ে মাথা ঘুরবে। দেখেছিস, লাইব্রেরির ফ্যানগুলো কেমন ঘরর ঘরর আওয়াজ তুলে চক্কর মারতে থাকে?’
তা ঠিক। ফ্যানের ঘরর ঘরর আওয়াজে মাঝেমধ্যে পুরো রুমের ছাত্রছাত্রীরাও চমকে ওঠে। আনুশকাও কোনো কোনো সময় এরকম আওয়াজে সচকিত হয়ে ওঠে, হঠাত্ করেই মনে হয়, কোথায় আমি, এখানে কেন? আর বাবা কোথায়? এইভাবে বাবা হঠাত্ করে তার চিন্তায় ফিরে আসে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে সে নিজেকে বোঝায়, ‘শোন, তুমি এখন লাইব্রেরিতে। পড়াশোনা করছ। এই বইটা কিন্তু আজ ভাগ্যগুণে পেয়ে গেছ, হাতছাড়া হয়ে গেলে মিলতে নাও পারে আর। এর আরো তিনটে কপি স্টোররুমে থাকার কথা। কিন্তু সেই তিন কপিই নাকি তিন টিচারের কব্জায় রয়েছে। রিডিং রুমে আছে মাত্র দুটা কপি। সেগুলোর মধ্যে অনেক পাতা নেই, অনেক ছবি অযথাই কেটে নিয়েছে কেউ; এই বই দেখে পড়া আর না পড়া সমান। কিন্তু তবু সে পড়ে পড়ে বোঝার চেষ্টা করে উধাও হয়ে যাওয়া পাতাগুলোয় কী লেখা ছিল। বইয়ের শেষে বিবলোগ্রাফিটা অবশ্য খুব সুন্দরভাবেই রয়েছে। ওই অংশটার প্রতি তেমন কোনো দুর্বলতা নেই কারো। সেই বিবলোগ্রাফি দেখে সে বোঝার চেষ্টা করে এ বইতে কোনোকিছু না পাওয়া গেলে আর কোন বইয়ে কাজ চলতে পারে। ক্লাস নিতে নিতে তাদের স্যার কয়েকটা ম্যাড়মেড়ে নোট দিয়েছে। এরচেয়ে ভালো নোট সে নিজেই লিখতে পারে। যদিও নোট দেওয়ার সময় স্যার খুব গম্ভীর কণ্ঠে বলেছেন, ‘শোন তোমরা, এইসব নোট দিয়ে পরীক্ষা দিয়েই কিন্তু আমি সিক্সটি ফোর পার্সেন্ট মার্কস পেয়েছিলাম।’
তার মানে প্রশ্নের উত্তরে এইসব নোটই লিখতে হবে। কিন্তু স্যার পরীক্ষা দিয়েছিলেন তো সেই ষোলো বছর আগে। এর মধ্যে কি অবস্থা বদলায়নি? আর কোনো ভালো বই বেরোয়নি এসব টপিকের ওপরে? স্যারের কি জানা নেই সেসব বইয়ের কথা? এখনো স্যার সেই ষোলো বছর আগের নোট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং একই জিনিস পড়াচ্ছেন। এই স্যার নাকি পরীক্ষার খাতায় তাঁর নিজের নোট না পেলে ভেবে নেন যে এই স্টুডেন্ট তেমন ভালো নয়। টেবিলে বসতে বসতে সে বলে রাখীকে, ‘আবিদ স্যারের নোটগুলো দেখেছিস? কেমন হলদে হয়ে গেছে?’
‘হবে না? জানিস না, মাঝখানে ইন্ডিয়াতে পিএইচডি করতে যাওয়ার সময় স্যার নোটগুলো কী করেছিল?’
‘ক্-কী করেছিল?’
‘আহ্হারে, তুই এখনো শুনিসনি? স্যার নাকি যাওয়ার আগে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মাটি খুঁড়ে একটা কোলার মধ্যে নোটগুলো রেখে গিয়েছিল। যাতে কেউ চুরি করতে না পারে অথবা ভোলে অন্য কোনো কাগজপত্রের সাথে বিক্রি না হয়ে যায়।’
‘এইসব গপ্পো পাস কোত্থেকে!’—হাসতে থাকে আনুশকা।
‘না রে, ইয়ার্কি না। আমার মনে হয় ঠিকই রেখেছিল। এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নোটগুলোকে! মাটির নিচে কোলার ভেতর রেখে ওপরে স্যার নাকি তাঁর মায়ের নামাজ পরার জলচৌকিটা বসিয়ে দিয়েছিল। একেবারে নিরাপদ হেফাজতে রাখা আরকি।’
‘বুঝলাম তো। কিন্তু এইসব গাঁজাখুরি গপ্পো বাজারে এল কোত্থেকে?’
‘তুই যদি বলিস, কিংশুক গাঁজাখুরি গপ্পো ফেঁদেছে, তাহলে তা-ই! কাল সন্ধ্যায় সবাইকে বলছিল টিএসসিতে। তুই তো ছিলি না তখন।’
‘অ-অ। কিংশুক বলেছে!?’
ঠোঁটটা বাঁকা করে বলে রাখী, ‘কিংশুক বলেছে জন্যেই এত নিরামিষ কথা মনে হচ্ছে। কায়েস না হয় আতা হলে অবশ্য আরো রসিয়ে রসিয়ে বলতে পারত, স্যার তাঁর পার্সোনাল চেম্বারে—’
‘ব্যস, ব্যস, ব্যস। আর বলতে হবে না। রাবিশ!’ আনুশকা থামিয়ে দেয় রাখীকে। অনেকবারই খেয়াল করেছে সে, কায়েসদের এইসব কথাবার্তা রাখী বেশ রসিয়ে রসিয়ে শোনে এবং নিজেও ঘুরেফিরে বলতে ভালোবাসে। কিন্তু আনুশকা এখনো হজম করতে পারে না এসব। শোনে, কিন্তু খুবই নিস্পৃহভাবে। এখন চা পানের মেজাজই চলে যায় তার। ঠক করে চায়ের কাপটা নামিয়ে সে বলে, ‘চল, আর চা খেতে হবে না।’
আনুশকা জানে, মনে মনে ওদের দুজনকেই বেশ পছন্দ করে রাখী। আর তাই মাঝেমধ্যে বাজিয়ে দেখতে চায় আনুশকার আগ্রহ কার ব্যাপারে বেশি, নাকি একেবারেই নিস্পৃহ সে। আজও তা-ই করছে। ভাবতেই গা জ্বলতে থাকে তার। আর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে রাখী বলে তাকে, ‘কিংশুকের কি ওই গল্প ছড়ানো ঠিক হয়েছে, বল?’
কিছু বলতে চায়নি আনুশকা, কিন্তু কেন যেন ফস করেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ‘তুই-ই তো বললি, কায়েস কিংবা আতা হলে কী বলত। সেটা কি আরো বেশি খারাপ নয়?’
‘কিন্তু বলেনি তো এখনো। আর কিংশুক তো যা বলার বলে বসে আছে।’
‘কিংশুককে জিজ্ঞেস কর কেন বলেছে।’ একটু থেমে আবার বলে আনুশকা—‘শোন, এইসব রাবিশ ব্যাপার নিয়ে বেশি চিন্তা করবি না। ওদের যত সহানুভূতি দেখাবি, তত বেশি পেয়ে বসবে।’
আনুশকা চুপচাপ হাঁটতে থাকে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে। তারপর রাখী যখন বলে, ‘আরে, আমাকে তো কিছু জিনিসপত্র কিনতে হবে এখান থেকে’, তখন সে ভেতরে না গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। ‘অপরাজেয় বাংলা’র পাথর কাটার শব্দ এখান থেকেও শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে স্লোগানের শব্দও। বোধহয় মধুর ক্যান্টিন থেকে কোনো ছাত্রসংগঠন মিছিল বের করেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এতদিন এই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করল, অথচ একদিনও মিছিল করতে হলো না। কী অবিশ্বাস্য ব্যাপার! বুড়ি হয়ে গেলে কেউ যদি এই প্রশ্ন করে! কিছুই বলার থাকবে না তার। একবার বলেওছিল সে বাবার কাছে, ‘বাবা, আমার তো খুব ইচ্ছে হয় মিছিল করার। এই যে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে স্লোগান দেয়, আমিও যদি দেই, ব্যাপারটা বেশ ভালোই হবে, নাকি বল?’
‘তা-ই? ভালো লাগবে তোর?’
‘হ্যাঁ। খুবই ভালো লাগবে। কিন্তু কোনো অর্গানাইজেশানকে তো পছন্দই হয় না। আবার অর্গানাইজেশানের আইডোলোজি ভালো লাগলেও লোকগুলোকে ভালো লাগে না। তাহলে কি মিছিল করা ঠিক হবে?’
‘না, উচিত হবে না। একটা কথাই তো আছে, আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও। যদি দেখিস, লোকগুলো ভালো নয় সেটা অবশ্যই চিন্তা করার ব্যাপার। তবে এ-ও মনে রাখিস, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে ভালো লাগে কি না, কারো আচরণ ভালো কি না এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আইডোলজির ব্যাপারে তার টোটাল এটিচুড কী। সেটা যদি ঠিক থাকে, অনায়াসে একসঙ্গে কাজ করা যায়। তখন তো একটা কমন গোল থাকে, নাকি? এই ধর, নেহেরু, মৌলানা আজাদ আর সর্দার বল্লভরায় প্যাটল; কিংবা ধর একদিকে গান্ধীজি আরেকদিকে সুভাষ বোস—একজনকে পছন্দ করলে আরেকজনকে পছন্দ করা দুষ্কর। কিন্তু তাঁদের সবারই তো কমন গোল ছিল, তাই তাঁরা সকলেরই শ্রদ্ধার পাত্র। আমরা আমাদের নেতাদের এভাবে সামগ্রিকভাবে পছন্দ করতে শিখিনি। অবশ্য তাঁরা নিজেরাও সেরকম পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেননি। কিন্তু যদি এভাবে শ্রদ্ধা করতে পারতাম কিংবা আমাদের শ্রদ্ধা করা শেখানো হতো, তাহলে কিন্তু গোটা জাতির ভাগ্যই বদলে যেত।’
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা দিয়ে স্যান্ডেলের কোনাতেই ঠোকা মারতে মারতে চিন্তা করে আনুশকা, আজকাল প্রায়ই বাবার কথা মনে হয়। কিন্তু কাউকে তো তা বলা যায় না। মাকে বললে মা নিশ্চয়ই কান্নাকাটি শুরু করবে। বড় আপা কিংবা তার স্বামীও গম্ভীর হয়ে যাবে। রাখী কিংবা নীলাদের বললে ওরা সান্ত্বনা দিতে শুরু করবে। কী দরকার এত ঝামেলার। তারচেয়ে কাউকে না বলাই ভালো। মুহূর্তের মধ্যে ঠিক করে ফেলে সে, আজ তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু ঠিক করলেই কি ফেরা যায় তাড়াতাড়ি?
বাড়ি ফিরে কাপড়চোপড় পাল্টানোর আগেই মিতা উত্তেজনা মেশানো গলায় বলেন আনুশকাকে, ‘আজ বিকেলে কী হয়েছে জানিস?’
‘কী হয়েছে?’
আনুশকার সাদামাটা উত্তরে মনে মনে আহত হন মিতা, তবুও গলার স্বর না পাল্টিয়ে বলতে থাকেন, ‘বিকেলে হঠাত্ কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। ভেবেছিলাম কোনো ফকির এসেছে বাসায়। তাই দরজা খুলতেই চাইনি। কিন্তু কী বলব! বারবার কড়া নাড়ছে! শেষে বিরক্ত হয়ে দরজা খুলেই দেখতে পেলাম তোর বড় চাচা আর ছোট চাচা এসেছে।’
‘ছোট চাচা আর বড় চাচা? কোথায়?’ আনুশকা খুব অবাক হয়ে যায়। এদের কারো চেহারা মনে নেই তার। এদের কারো সঙ্গে তো তাদের আর পারিবারিক যোগাযোগও নেই। এরা যদি কোনোদিন খুব ছোটবেলায় তাকে কোলে নিয়ে আদরও করে থাকে, তবু সে তা মনে করতে পারবে না। এত ছোটবেলার কথা কারো মনে থাকে না, কেউ হয়তো গুরুজনদের কাছ থেকে বারবার সেই একই গল্প শুনতে শুনতে একসময় ভাবতে শেখে, তার সবকিছু দিব্যি মনে আছে, কিন্তু আসলে তা মোটেও সত্যি নয়। এরকম সত্যের মতো মিথ্যাও আনুশকার মনে জমা হতে পারেনি। তার অবাক গলা তাই খটাখট শব্দ তুলে মিতার কানে এসে ধাক্কা মারে। যে উত্তেজনা নিয়ে তিনি ঘটনাটা বলতে শুরু করেছিলেন, সেই উত্তেজনা মুহূর্তের মধ্যে মিইয়ে যায়। যেন এক প্রতিহিংসা বোধ সাঁতরাতে থাকে তাঁর স্মৃতির করোটি জুড়ে। দাঁতে দাঁত ঘষে তিনি বলতে থাকেন, ‘কোথায় আবার? আমি দরজা থেকেই বিদায় করে দিয়েছি।’
আনুশকা ক্লান্তস্বরে বলে তাঁকে, ‘এটা কিন্তু মা তুমি ভালো করনি। ধরো, বাবা যদি বেঁচে থাকতেন আর চাচারা কেউ আসতেন আমাদের বাসাতে, তিনি কি তাঁদের গেট থেকে তাড়িয়ে দিতেন? কিংবা ধরো, আমি যদি এখন তাঁদের বাড়িতে যাই, তাঁরা কি আর তাড়িয়ে দেবেন? এটা তুমি ঠিক করনি। ভবিষ্যতে তাঁরা কখনো এলে অবশ্যই ড্রয়িংরুমে বসাবে। থাকতে চাইলে বাসাতেই থাকতে দেবে।
মিতার চোখ মুহূর্তের জন্যে জ্বলে ওঠে অন্ধকারের বিড়ালচোখের মতো। তিতিবিরক্ত মেশানো কণ্ঠে তিনি বলে ওঠেন, ‘বা-বা-বা..., বাপের গোষ্ঠীর লোকজনের দিকে তো ভালোই দরদ দেখি। কেন, এদের তাড়ালে কষ্ট লাগে কেন? আমার বোনপোকে দেখলে তো তোমার মেজাজের ঠিক থাকে না। কেন, আমার বোনপো কি ওদের চেয়ে বেশি খারাপ কাজ করেছে?’
আনুশকার ঝগড়া করতে ইচ্ছে করে না। তাই শুধু বলে, ‘মা, অযথাই তুমি রাগ করছো। সত্যি কথা বলতে গেলে, তোমার বোনের ছেলেকে আমি মন থেকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি। কোনো রাগ নেই আমার তার ওপরে। কিন্তু আমার রাগ করায় বা ক্ষমা করায় কোনোকিছু আসে যায় না। প্রতিটি মানুষেরই জানা উচিত, যে কোনো কাজেরই একটা পরিণতি আছে। আর সেটা তাকে ভোগ করতে হবেই। তোমার বোনের ছেলে যা করেছে তার পরিণতি তাকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে। ভোগ মানে কিন্তু কেবল আনন্দ নয় মা, ভোগ মানে ভুগতে ভুগতে শেষ হওয়াও। চাচাদেরও অবশ্যই ভুগতে হবে। তাঁরা তো আর তাঁদের সম্পর্কের ওপর জাস্টিস করতে পারেননি যে রেহাই পাবেন। কিন্তু বাবা তাঁদের নিশ্চয়ই মাফ করে গেছেন। আর তিনি যখন মাফ করে গেছেন আমরা তো অন্তত খারাপ ব্যবহার করতে পারি না। হ্যাঁ, হতে পারে বেঁচে থাকলে তিনিও তোমার মতোই তাদের দুজনকে বাসার মধ্যে বসতে দিতেন না। কিন্তু তিনি কী করতেন তা নিশ্চিত না হয়ে আমরা কেন গায়ে পড়ে বাবাকে ছোট করতে যাব, বল?’
আনুশকা এত ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে যে মিতা খুবই অবাক হয়ে যান। মেয়ের আজ হয়েছে কী? এভাবে কি ও আর কোনো সময় কথা বলেছে? রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, মনে হয় ওর কলিজার পাশে থাকা পিত্তথলিটা কেউ কেটে নিয়েছে আজ। তিনি আনুশকার কথার কোনো জবাবই দিতে পারেন না। আনুশকা তাঁর সামনে দিয়ে বাথরুমে চলে যায়, বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়, নিজের ঘর থেকে খাওয়ার টেবিলে আসে, খাওয়ার টেবিল থেকে আবার নিজের রুমে চলে যায়—কিন্তু তাদের আর কোনো কথা হয় না। কোনো কথা ছাড়া, কোনো অভিব্যক্তি ছাড়া তারা দুটি প্রাণী পাশাপাশি থাকে একই বাসার ভেতর, সমস্ত সুর আর সঙ্গতি থাকার পরও তাদের বীণাতার একত্রে কোনো ঝংকার তুলে ছড়িয়ে পড়ে না ইথারে ইথারে। কেবল অনেক রাতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার শব্দ পেয়ে মিতা নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে আনুশকার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখেন, টেবিলের ওপর মাথা রেখে কাঁদছে মেয়েটা, দরদরিয়ে তার গাল বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা, সেই ধারা ঠেকানোর জন্যে ঠোঁটের ওপর ঠোঁট চেপে ধরছে দাঁতের সম্মিলনে; কিন্তু কান্না থামছে না কিছুতেই।
পরদিন দুপুরে, যখন আনুশকা ক্যাম্পাসে চলে গেছে, আবারও কড়া নাড়ার শব্দ শুনে মিতা দরজা খুলে দেন প্রথমবারেই। কেননা তাঁর মনে হয় কবির আদনানের ভাইরা আবারও ফিরে এসেছে, আবারও কালকের মতো অন্তত এটুকু জানতে চাইছে যে, কবর দেওয়া হয়েছে কোন গোরস্থানে। নাহ্, আজ আর তিনি ভুল করবেন না গতকালের মতো। তিনি তাই দরজা খুলে দেন এবং দেখেন ধোপদুরস্ত দুজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের একজন বলে তাঁকে, ‘এখানে তো কবির আদনানরা থাকেন, তা-ই না?’
‘জি, আপনারা?’
‘আমরা রাজউক থেকে এসেছি।’
রাজউক থেকে যখন এসেছে, তখন বসতে দিতেই হয়। মিতা তাদের বসতে দেন, চা বানিয়ে দেন, চায়ের সঙ্গে নাড়ু-মোয়াও দেন। কিন্তু তারপরও তার জন্যে কোনো প্রীতিকর কথাবার্তা অপেক্ষা করে না। ‘ঠিক আছে, চা খেয়ে নিন, তারপর না হয় আপনাদের কথা শুনব’ বলে তাদের বসিয়েছিলেন মিতা। কিন্তু কোনো প্রীতিকর কথাই শুনতে পান না তাদের কাছে থেকে। যাওয়ার আগে তারা বলে, ‘আপনাদের বিরুদ্ধে একটা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আপনারা এই জমির দলিল নকল করেছেন, জোর করে দখল করে বাসা তুলেছেন।’
মিতার ভেতর থেকে কী এক ক্রোধ হিসহিসিয়ে ওঠে। কালকেই তাঁর মাথায় একবার এরকম দুঃশ্চিন্তা এসেছিল, একা এক বিধবা বয়স্কা মানুষ তিনি, আনুশকার চাচারা এই বাড়িঘর জায়গাজমি দখল করার জন্যে আসেনি তো! কেবল আনুশকার জন্যেই কাল রাতে সেই চিন্তাটা বেশি দূর এগোতে পারেনি। ঠকে গেলেন, খুব ঠকে গেলেন। একটু প্রস্তুতি নেওয়ারও সময় পেলেন না তিনি। নিশ্চয়ই তাঁর ভাশুর আর দেবররা কোনো তালগোল পাকিয়েছে। নিশ্চয়ই সেজন্যেই ঢাকায় এসেছে।
তবু নিজেকে ঠাণ্ডা রাখেন মিতা। আর কথাও বলেন চোখে চোখ রেখে, ‘আপনারা হয়তো ভুল করেছেন। আমার শ্বশুরআব্বা এই জায়গা কিনেছেন। পরে তাঁর ছেলেরা সবাই মিলে আমার স্বামীকে এ জায়গা লিখে দিয়েছেন। দলিলপত্র সবকিছুই ঠিকঠাক আছে আমাদের। দরকার হলে আপনারা চিঠি পাঠান, আমরা সবকিছুর প্রমাণ দেখাতেও পারব।
‘হ্যাঁ, অবশ্যই দেখাবেন। তবে কথা হলো কি, তার আগে আমাদের একবার কথা বলার কথা, প্রাইমারি ইন্সপেকশন আরকি! আমরা তা করে গেলাম। আমাদের অবশ্য মনে হয়, আপনিই ঠিক বলছেন না। শাহজাহান সাহেবের কাগজপত্র সবকিছু আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি। একেবারে এক শ ভাগ খাঁটি। আজ হোক কাল হোক আপনাদের এ বাসা ছেড়ে দিতে হবে।
মিতা ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে, বলে কী এরা? শাহজাহান সাহেব মানে তো তাদের তিনতলার ওই ভাড়াটিয়া। এ বাসায় বসে থেকে সে এ বাসারই মালিককে উচ্ছেদ করবে! তলে তলে এত! মিতার গলা শুকিয়ে আসতে থাকে। বলে কি এরা?
লোক দুটো চলে যায়। আর মিতার সারা শরীর যেন হিমশীতল ইউরোপ হয়ে শুয়ে থাকে মানচিত্রের ওপর। কী হলো, কিভাবে হলো, কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি। এখন কী করবেন, সেটাও মাথায় ঢুকছে না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড় জামাইয়ের কাছে গিয়ে পরামর্শ নেবেন? নাকি কল্যাণপুরে যাবেন? কিন্তু সেই সুযোগে যদি বাড়িটা ওই বদমাশটা দখল করে নেয়! ইস রে, একটা টেলিফোন যদি থাকত! ক্ষোভে দুঃখে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে মিতার আর রাজ্যের রাগ গিয়ে পড়ে কবির আদনানের ওপর—অবিবেচক একটা, এতকিছু করতে পারল, আর বাসায় একটা টেলিফোন নিতে পারল না। তাহলে কাউকে অন্তত এই খবরটা দিতে পারতেন, তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়া তিনতলায় বসে বাড়ি দখল করার ফন্দি আঁটছে। বাথরুমে গিয়ে মাথায় পানি ঢেলে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু না, তাঁর হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে, চোয়াল থরথর করে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতেই ঠিক করেন মিতা, কিছুতেই বাইরে বের হওয়া যাবে না। বের হলেই সব যাবে। তারচেয়ে তিনি অপেক্ষা করবেন, আনুশকা আসুক, তখন তাকেই না হয় আবারও পাঠানো যাবে মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের কাছে টেলিফোন করতে।
কিন্তু অতক্ষণ আর অপেক্ষা করতে হলো না মিতাকে। বেলা গড়িয়ে আসরের দিকে যাওয়ার আগেই একদল লোক এসে জোর করে বাসা থেকে নামিয়ে দিল মিতাকে। ঘরের সব জিনিসপত্র বাইরে ছুড়ে ফেলে দিল তারা। মিতা চিত্কার করলেন, আর্তনাদ করলেন এবং বুঝলেন কোনো বাসা থেকেই কেউ এখন বাইরে বেরিয়ে আসবে না। বিছানার চাদর-বালিশ, তোশক থেকে শুরু করে যাবতীয় জিনিসপত্র এলোমেলো জমা হয়ে থাকল বাসাটার সামনে আর হইচই করতে লাগল লোকগুলো প্রচণ্ড স্বরে। শাহজাহান সাহেবকে কোথাও মিতা দেখতে পেলেন না। কিন্তু নিশ্চিত তিনিই আছেন এসবের পেছনে। দু-চার জন লোক অবশ্য আশপাশ থেকে এগিয়ে এসেছিল মিতার চিত্কারে—কিন্তু অস্ত্র হাতে একবার ধাওয়া দিতেই সিধা হয়ে গিয়েছিল তারা। আর লোকগুলো তখন আবারও ক্ষিপ্ত কণ্ঠে গালিগালাজ শুরু করেছিল অদৃশ্য কোনো প্রতিপক্ষের উদ্দেশে।
মিতা কী করবেন ভেবে পান না। নিজের বাসার গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। পুলিশের কাছে যাওয়া দরকার—একমাত্র রাস্তা সেটাই। কিন্তু সেখানে কি একাই যাবেন? এর মধ্যে আনুশকা এসে যদি কোনো ঝামেলায় পড়ে! হাত-পা তাঁর ঠাণ্ডা হয়ে আসে—কেবলই ঠাণ্ডা হয়ে আসে। বয়স বাড়ছে এখন। কতদিন হলোই তো নিজেকে শাসাচ্ছেন তিনি, দরকার নেই, এসব নিয়ে কোনো চিন্তা করার দরকার নেই। কিন্তু চিন্তা তো চলেই আসে। একবার ভাবেন একটা রিকশায় করে চলে যাবেন ক্যাম্পাসে মেয়ের বাসায়। আরেকবার ভাবেন, কাছেই ভাইবোনদের বাসা কল্যাণপুরে, বরং সেখানেই যাওয়া ভালো। কিন্তু আনুশকা তাহলে ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে বিপদে পড়ে যাবে, কাউকেই খুঁজে পাবে না। অতএব তিনি বাসার সামনেই উদ্বাস্তু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন আর দেখতে থাকেন, তার সাজানো ঘরবাড়ি কী করে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙেচুরে খান খান হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর কান্না পেতে থাকে। তিনতলার এই ভাড়াটের এত বেশি ভালো ব্যবহারের কারণটা কী তা এতদিনে তিনি বুঝতে পারেন। খুব অস্থির হয়ে একবার ফেরিওয়ালার কাছে পানি চান। তারপর পানি খেয়ে আবার অপেক্ষা করতে থাকেন। মনে হয়, কখনো এ অপেক্ষার পালা শেষই হবে না। এত জিনিসপত্র ছিল বাসায়, তা তিনি আদৌ বুঝতে পারেননি। তিনি তো কেবল আপন মনে কাজ করে গেছেন। অনেক জিনিসপত্রের মধ্যে থেকে তিনি এতদিনে সেই কাগজের পাখাটা খুঁজে পান, যেটা দেখেছিলেন তাঁর কৈশোরকালে। এটা দিয়ে একটা কিছু করতে গেলেই বিপদ ঘটে। অথচ দেখতে এত ভালো লাগে! তিনি তাই কোনোকিছু না করে মাঝেমধ্যে দেখে নেন সেই কাগজের পাখাকে। হঠাত্ কোত্থেকে এক দশাসই লোক এসে মিতার সামনেই গেটটা বন্ধ করে। তারপর ভেতর থেকে শাসিয়ে ওঠে—‘যা ভাগ বুড়ি। কী চাস এখানে?’
পাঁচ
এমন নয় যে কবির আদনানের পরিচয় ছিল না ক্ষমতাবান মানুষদের সঙ্গে। বরং পরিচয় বললে কমই বলা হয়, আসলে এ ধরনের মানুষদের সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় ঘনিষ্ঠতা। শহরের প্রকরণ ও উল্লাসের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার পর মিতার কাছে তাঁকে যতই ‘খেত’ ‘খেত’ লাগুক না কেন, তাঁর বন্ধুদের মতে তিনি ছিলেন কেতাদুরস্ত চাকরিজীবী। আমলা হতে না পারলেও আমলাতন্ত্রের সঙ্গেই মানসিক সখ্য ছিল তাঁর। ছিল সকাল বিকেল ওঠাবসা। তিনি ছিলেন অনেকটা ব্রিজের মতো, আমলাতন্ত্র আর আমলাতন্ত্রের বাইরের গুরুত্বপূর্ণ সব সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে। কিন্তু সমস্যা হলো তিনি বেঁচে নেই আর। তাঁর সেইসব সুখ্যাতির সুতো ধরে মিতা উতরে যাওয়ার জন্যে যাবতীয় চেষ্টা চালালেন। খুব ছুটোছুটি করলেন কয়দিন। সঙ্গে সঙ্গে ছুটোছুটি করল তাঁর ভাই বা জ্ঞাতিগোষ্ঠীর চেনাজানা সকলে। ছুটোছুটি করতে করতে কখনো কখনো মনে হতো তাঁর, হয়তো সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে আজকেই। এই তো কল্লোল বলল, ‘পুলিশের সঙ্গে কথা হয়েছে, পুলিশ আগামীকালই বাসা থেকে শাহজাহানকে বের করে দেবে খালা, তারপর বাসায় আপনাদের তুলে দেবে আবার!’ ওদিকে এস্টাবলিশমেন্টের শিকদার সাহেবের কাছে টেলিফোন করার পর তিনি মিতার গলার স্বর শুনেই বলে উঠলেন, ‘আমি সব শুনেছি ভাবী। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু কাজের কাজ হয় না কিছুই।
এইসব দেনদরবার করতে সুবিধা হয় জন্যে মিতা গিয়ে উঠলেন কল্যাণপুরের ভাইয়ের বাসায়। নীলক্ষেতে আশরাফদের বাসায় উঠলে সচিবালয় আর রাজউকে যাওয়াআসার আরো সুবিধা হতো। কিন্তু তাহলে আবার ছোটাছুটি করার সময় ভাইদের ঠিকমতো পাওয়া যেত না। তাছাড়া আশরাফের বাসায় টেলিফোন নেই, অনেক কথাবার্তা তো টেলিফোনেই করে ফেলা যায়, অনেক সময়ও বাঁচে। তাঁর বরং ভাইয়ের বাসাতেই ওঠা ভালো। মিতা প্রথম প্রথম খুব উত্সাহ নিয়ে এইসব কাজ করে চললেন। আর প্রতিটি কাজ করার সময়েই তাঁর মনে হতে লাগল, কোনো ছেলে নেই জন্যেই এত দুর্গতি পোহাতে হচ্ছে তাঁকে। ছেলে থাকলে কেউ বাসা দখল করারই সাহস পেত না কোনো সময়। আর দখল হলেও এভাবে দৌড়াদৌড়ি তাঁকে করতে হতো না।
কিন্তু শাহজাহান সাহেব অনেকদিন ধরে চিন্তা করে অনেক আটঘাট বেঁধেই নেমেছিলেন। এই ঢাকা শহরে তিনি এসেছিলেন একটা চটের ব্যাগে দুটো লুঙ্গি, একটা গামছা আর দুটা জামা নিয়ে। পরে এসেছিলেন পায়জামা-পাঞ্জাবি, তবে পায়ে জুতা ছিল। উঠেছিলেন ফকিরাপুলের মেসে। তারপর কত সংগ্রাম। এখন তিনি মুখে মুখে কষ্ট করার গল্প শোনান, কিন্তু মনে মনে হাসতে হাসতে ভাবেন, ঢাকা শহরে চুরি-বাটপারি-ডাকাতি ছাড়া বড়লোক হয়েছে কোন শালায়!? এই যে তিনি এতদূর এসেছেন, তা কি আর এমনি এমনি আসতে পেরেছেন! হাতি কাদায় পড়ার আগ পর্যন্ত সমীহ করতে হয়, কাদায় পড়ার পর মারতে হয় লম্বা লাথি। জগতের নিয়ম এইরকমই, শাহজাহান সাহেবের কোনো সন্দেহ নেই এ ব্যাপারে। ব্যবসাপাতিতে একটু হাওয়া লাগলে তিনি নিজেই বুঝতে পারলেন, এখন আর শাহজাহানপুরের ওই একতলা টিনের চালাওয়ালা ঘরটায় থাকলে চলবে না। ভদ্রলোকদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হয়, মাঝেমধ্যেই কাউকে না কাউকে বাসায় নিয়ে আসতে হয় আদরযত্ন করে খাওয়ানোর জন্যে। কিন্তু ওই বাসায় ড্রয়িংরুমই বা কোথায়, বসার মতো ভালো সোফাই বা পাতবেন কোনখানে। একটা সময় মানুষ কষ্ট করে ঠিকই, কিন্তু আরেক সময় গলার রাশ ছেড়ে দিতে হয় আস্তে করে। এখন তাঁর রাশ ছেড়ে দেওয়ার সময়।
টিনের চালার একতলা ঘর নয়, পুরোদস্তুর ফ্ল্যাট ফ্ল্যাট ভাব, কিন্তু হওয়া চাই ছিমছাম, কম ভাড়ার। এরকম একটি বাসা খুঁজতে খুঁজতে তিনি এই মিরপুরে এলেন। এ বাসা সে বাসা দেখতে দেখতে কবির আদনানের বাসা দেখে মনে ধরল শাহজাহান সাহেবের। ভাড়া নেওয়ার জন্যে ঘুরেফিরে দেখতে দেখতেই তিনি ভেবে রেখেছিলেন, এ বাসাটার একটা ব্যবস্থা করতে পারলে ভালোই তো হয়। কোনো কোনো সময় মনের মধ্যে অলস অবসরে এ নিয়ে তিনি নাড়াচাড়াও করেছেন বেশ। কিন্তু কিছুতেই পুরো ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না অতকিছু করতে গেলে। তিনি তাই তক্কে তক্কে ছিলেন এবং পুরো ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো একটা মটকাও পেয়ে গেলেন। বাকি ছিল বাসাটার পুরোপুরি দখল করে নেওয়া। এবার সেটাও হলো। একবার ভেবেছিলেন, যাক না আরো বছরখানেক। তারপর ভাবলেন, লোহা গরম থাকতে থাকতেই ছ্যাঁক দেওয়া ভালো। কয়েকদিন পর এরা শোকযন্ত্রণা সামলে উঠবে, তখন আর ফাঁকফুকর খুঁজেই পাবেন না।
মিতা যেরকম ভেবেছিলেন, সেরকম আর হয়েই উঠল না। আইনকানুন খুবই জটিল ব্যাপার। কোর্ট থেকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, এই বাসার মালিক শাহজাহান সাহেবকে কোনো হয়রানি করা যাবে না, বাড়িসংক্রান্ত মিথ্যা অভিযোগ এনে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া যাবে না, তাছাড়া তিনি যেহেতু বাড়িসংক্রান্ত মিথ্যা মামলার আশঙ্কা করছেন সেহেতু তাঁকে এ জাতীয় মামলার ক্ষেত্রে আগাম জামিনও দেওয়া হলো। এইরকম একটি আদেশ নিয়ে শাহজাহান সাহেব বেশ ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাড়ি দখল করেই শাহজাহান সাহেব গেটে দারোয়ান বসিয়ে দিলেন। সেই দারোয়ানের ওপর নির্দেশ দেওয়া হলো, অযথা কাউকে যেন বাসার মধ্যে ঢুকতে দেওয়া না হয়। আর ভাড়াটে যাঁরা আছেন, তাঁদের আপাতত কোনোমতেই রাত দশটার বেশি বাসার বাইরে থাকা যাবে না।
ভাড়াটিয়াদের নিয়ে শাহজাহান সাহেব মিটিংও করলেন এক রাতে। বললেন, ‘শোনেন, আপনাদের হয়তো মনে হচ্ছে আমি কোনো খারাপ কাজ করেছি। বাসার মালিককে টেনেহিঁচড়ে বাসার বাইরে বের করে দিয়েছি। কিন্তু আসল ঘটনা অন্যরকম। এতদিন আপনাদের বলতে পারিনি, কিন্তু এখন অবশ্যই জানানো উচিত।’
এইভাবে বাসার ভাড়াটিয়ারা সেদিন জানতে পারেন, এই জায়গার মালিক আসলে শাহজাহান সাহেব। একবার একটা দুর্ঘটনায় পড়ে তিনি কবির আদনানের কাছে থেকে কিছু টাকা কর্জ নিয়েছিলেন এই জায়গাটাকে বন্ধক রেখে। তা তখন তো এদিকে তেমন কোনো ঘরবাড়ি নেই। সন্ধ্যা এলেই ঘুটঘুটে আঁধার নেমে আসে আর শেয়াল ডাকে। কবির আদনান সেরকম ঘুটঘুটে আঁধারে তাড়াতাড়ি এই জায়গার ওপর একটি ঘর তুলে বসেন। জায়গাটায় শাহজাহান সাহেব অনেক মেহগনি গাছ লাগিয়েছিলেন। সেগুলোর তখন মৃত্যু ঘটে। সেই সব মেহগনি কবির আদনান বিক্রি করেন চড়া দামে। শাহজাহান সাহেব তখন থাকতেন পুরান ঢাকার দিকে। এসব খবর জানতে পেরে ছুটে আসেন আর ঘর তোলার কারণ জানতে চান। তাতে তিনি খুবই লজ্জিত হন আর উত্তর দেন, ‘আমি তো মনে করেছিলাম এই টাকা আপনি আর শোধ করতে পারবেন না। তাই ভাবলাম একটা দালান তুলি, কোনোমতে থাকতে পারব, বাসাভাড়া বাঁচবে।’ শাহজাহান সাহেব কথাবার্তা বলেন বেশ মনোমুগ্ধকরভাবে আর তাঁর গল্পটাও বেশ চমত্কার সত্যি সত্যিই মনে হয়, কারণ ঢাকা শহরে তো এরকম প্রায়শই ঘটে। শাহজাহান সাহেব বলেন, ‘আমি তখন তাঁকে বললাম, আমার কাছে না শুনে আপনি এটা কিভাবে করলেন? তিনি বললেন, ব্যাপারটা খুবই খারাপ হয়ে গেছে ভাই। আপনি কিছু মনে করবেন না। ওই টাকার কথা ধরে নেন যে, আমি ভুলে গেছি। ওই কর্জ আর শোধ করতে হবে না আপনাকে। আমি কবির আদনান সাহেবের এই কথা শুনে বলি, তা কেন হবে? আপনার কর্জের টাকা আপনি ঠিকই পাবেন। কিন্তু তাই বলে তো আপনি আমার জায়গার ওপর বাসা তুলতে পারেন না। আমাকে তখন তিনি কী বলেছিলেন, জানেন? বলেছিলেন, শাহজাহান সাহেব, আপনাকে আমি এইটুকু প্রতিশ্রুতি দিতে পারি যে, এই বিল্ডিং বানানো হয়ে গেলে এর যে কোনো একটা ফ্লোর আপনাকে ছেড়ে দেবো আমি। তো সেই বিল্ডিংও বানানো হয়ে গেল। একদিন আমি খোঁজখবর নিতে এলাম। উনি তখন বললেন, দেখেন ভাই, এখনই তো আপনাকে পুরো ফ্লোর দেওয়া যাচ্ছে না। আপনি বরং কিছুদিন ওপরের ফ্লোরের একটা অংশে থাকেন। এইসব কথা কিন্তু উনি নিজে থেকেই বলেছেন। বুঝলেন, নিজে থেকেই বলেছেন, বাসা বানাতে অনেক টাকা লাগছে। অনেক লোনও হয়েছে—তাই বাসা ইনকমপ্লিট রেখেই ভাড়া দিতে শুরু করেছি। তবে আপনাকে ভাড়া দিতে হবে না। আপনি তো এখানকার ফ্ল্যাটেরই মালিক। আমি সবকিছু একটু গুছিয়ে নিই—তখন আপনাকে পুরো ফ্লোর ছেড়ে দেবো। এখন উনি মারা গেছেন, আমি ওনার স্ত্রীকে যতই বলি না কেন এই ঘটনার কথা, তিনি তা বিশ্বাসই করেন না। জানেন কিন্তু সবই, কিন্তু বলেন যে, এসব মিথ্যা কথা। আবার আমার জায়গাজমির দলিলও ছাড়েন না। বাধ্য হয়েই আমাকে এ কাজটা করতে হয়েছে ভাই। তাই বলে ভাববেন না, আমরা আইনের বাইরে কোনো কিছু করছি। আদালত আমাদের সঙ্গে আছে। আপনাদের এই নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না। আপনারা আপনাদের মতো কাজকর্ম করবেন, ঠিকমতো বাসায় ফিরবেন, ঠিকমতো ভাড়া দেবেন। এর বাইরে আপনাদের কাছে আমার কিছু চাওয়ার নাই—খোদাতালার কাছেও আমার বাড়তি কিছুই চাওয়ার নেই। আর যদি চান, তাহলে বাসা ছেড়েও দিতে পারেন।’
খুবই সাজানো গোছানো কথা—ভাড়াটিয়ারা বরং শাহজাহান সাহেবের প্রশংসা করলেন, তাঁর বউয়ের রান্নাবান্নার প্রশংসা করলেন। তারপর নিজেদের ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লেন। শুধু ভাড়াটিয়া আলম খান কয়েকদিন পর জানালেন, অফিসের আরো কাছে চলে যাবেন তিনি। অতএব থাকবেন না আগামী মাস থেকে। কিন্তু আর কেউই কিছু জানালেন না—বাসা ছাড়া মানেই তো বাড়তি ভাড়া গোনা, বাসা খোঁজার ঝামেলা করা, অতএব রয়ে গেলেন তাঁরা।
কয়েকদিন অনেক চেষ্টা করলেন মিতা বাসার অন্য সব ভাড়াটিয়াদের নিয়ে কল্যাণপুরে বসে কথাবার্তা বলার। তাদের চেয়ে উত্কৃষ্ট সাক্ষী আর কে হতে পারে! তারাই তো বলবে, কার কাছে ভাড়া দিত তারা—দিত শাহজাহান সাহেব পর্যন্ত। অতএব তিনি খুঁজতে শুরু করলেন তাদের। একদিন গেলেন মিরপুরের সেলাই মেশিন বিক্রির দোকানের শাখাটিতে। সেখানেই কাজ করে নিচতলার ভাড়াটিয়া আলম খান। সে মনে হয় চমকে উঠল ভূত দেখার মতো। তারপর তাড়াতাড়ি বাইরে এসে বলল, ‘আপা, আপনার এভাবে ঘোরাফেরা করা ঠিক নয়। শাহজাহান সাহেব যে কত খারাপ মানুষ তা এ কয়দিনেই আমার বোঝা হয়ে গেছে। আপনার সঙ্গে কথা বলছি দেখলে পালায়েও বাঁচতে পারব না।’
মিতা বললেন, আলম সাহেব, শাহজাহান সাহেবের মতো আরো শাহজাহান সাহেব আছে। আপনাদের ভয়ের কিছু নাই। আমি আপনাদের সবার সঙ্গে বসতে চাই। জানেন তো কল্যাণপুরে আমার ভাইবোনের বাসা—সেইখানে। আপনারা বাসায় ছিলেন, এখনো আছেন। আমি ঠিকানা দিচ্ছি, একটা তারিখ ঠিক করেন। তারপর সবাই মিলে একদিন কল্যাণপুরে বসি, আপনাদের সঙ্গে পরামর্শও করি। আপনারা ছাড়া আমার এই দুর্দিনে আর কে আছে, বলেন?
শুনে আলম সাহেব কাঁপতে কাঁপতে পড়ে যান আর কি। কোনোমতে ঢোক গিলে বলেন, ‘আমি আর কী পরামর্শ দেবো আপা। আপনি দেখেন অন্য সবার সঙ্গে কথা বলে। বেঁচে আছি এই অনেক আপা, আমাকে আর জড়াবেন না এসবের মধ্যে। আমি এ মাসের প্রথমেই বাসা ছাড়ার নোটিশ দিয়েছি।’
আলম খান আর বলেন না যে বাসা ছাড়ার কথা শাহজাহান সাহেবের কাছে বলার পর তিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘আপনি খুবই বুদ্ধিমান মানুষ আলম সাহেব। আকাশের অবস্থা বুঝতে পারেন।’ তারপর হাসতে হাসতে আবার বলেছিলেন, ‘আপনি কি কোনো অ্যাডভান্স দিয়েছিলেন? এ মাসের ভাড়া দেবেন না?’
‘ওহ্। একদম ভুলে গেছি।’ আলম খান তাড়াতাড়ি প্যান্টের পকেটে হাত চালান করে চলতি মাসের ভাড়া বের করে এনেছিলেন।
কেবল আলম খানই নয়, মিতা একে একে সবার কাছেই গেলেন। কলাবাগানের এক অফিসে অদুদ আলীর কাছে, এই অফিসটা খুঁজে বের করতে হিমশিম খেতে হলো তাঁকে। এত ঘুপচি একটা অফিস আর সাইনবোর্ডটাও এত অস্পষ্ট যে বারবার অফিসটার সামনে দিয়ে যাওয়ার পরও বুঝতে পারেননি। একে ওকে বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল সেটা। তারপর গেলেন ফার্মগেটে রওশন সাহেবের অফিসে। তিনতলায় একেবারে শাহজাহান সাহেবের মুখোমুখি বাসা তাঁর। তিনি অবশ্য হেসে হেসে কথা বললেন। কিন্তু জানিয়ে দিলেন স্পষ্ট করেই, এই বয়সে কোর্টকাচারিতে দৌড়াদৌড়ি করার কোনো শখ নেই তাঁর।
মিতা আর কী করবেন! এ এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়া কি সম্ভব তাঁর পক্ষে! অতএব ঘন ঘন পুত্র না থাকার বেদনায় আক্রান্ত হতে লাগলেন তিনি। আর রাগও হলো তাঁর স্বামীর প্রতি, ‘মারা যেতাম তো আমি যেতাম, তোমার তাতে কী? আরেকবার ছেলের জন্যে চেষ্টা করলে কী এমন ক্ষতি হতো?’ পরপর দু বার মেয়ে হওয়ার পরেই তো গ্রামের একেকজন একেক পরামর্শ দিয়েছিল তাঁকে। কেউ বলেছিল, অমুক পীরের কাছে যেতে। কেউ বলেছিল, ছেলে চাওয়ার জন্যে ওইসব কাজ করতে হয় একেবারে শেষ রাতে, তাও মাঘমাসের শীতে। এক ডাক্তার আবার বলেছিল, ওসবের আগে ভিনেগার মেশানো পানি ঢেলে নিতে। তখন মিতা মাঝেমধ্যেই গ্রামে থাকতেন, কবির আদনানও যেতেন সেই সুবাদে। তিনি এলেই কথায় কথায় তাঁকে এসব জানাতেন মিতা। শুনে কবির আদনান হাসতেন হা হা করে। হাসতেন আর বলতেন, ‘শোন, আল্লার ওপর ভরসা রাখ’। কথাটা তিনি ঠিকই বলেছেন, কিন্তু ভরসা রেখে তো আবার সেই মেয়েই হলো! অবশ্য লোকে যতই মেয়ে বলুক, আনুশকার যা চালচলন, তাতে তো ছেলে ছেলেই মনে হয়। কিন্তু এই ঘটনার পর ও আরো কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে!
তাহলে! তাহলে কী করতে পারেন মিতা! আহাজারি—আহাজারি করা ছাড়া এখন আর কোনো গতি নেই তাঁর। তিনি সেটাই করতে থাকেন মনে মনে। বাবা তাঁর মারা গেছেন অনেক আগেই। আর বাবা মারা গেলে যা হয়—ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই। এই ভাই আর বোনরা কিংবা তাদের ছেলেমেয়েরা তাঁর জন্যে কি-ইবা করবে আর, দৌড়াদৌড়িই বা করবে কতক্ষণ! খুবই অস্থির লাগে তাঁর, শেষ জীবন কি এভাবেই তাঁকে কাটাতে হবে পরের বাড়িতে শুয়েবসে? কখনো ভাইয়ের বাড়ি, কখনো বোনের বাড়ি, কখনো আবার জামাইবাড়ি, এভাবে একেক বাড়ির ডালভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে তাঁকে? কয়দিন খেতে দেবে? খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষে চড়-থাপ্পড়ের চেয়েও শক্ত কথাবার্তা শুনতে হবে তাঁকে? ভাবতে ভাবতে তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। আশরাফ যে এত নিরীহ, সেই আশরাফও তো একেকদিন বলত তাঁদের, এতদিন ধরে কোনো ভাড়াটিয়াকে বাসায় রাখতে নেই। তাহলে মায়া পড়ে যায়, না হয় কোনো বিপদ ঘটে। তা-ই তো হলো, বিপদেই পড়তে হলো তাঁদের।
আনুশকার সঙ্গেও আর দেখা হয় না মিতার নিয়মিত। দিলরুবাদের বাসায় গেলে সে কাছে আসে। কিছুক্ষণ কথা বলে, তারপর তারা দুজনেই কোনো কথা খুঁজে পান না। দু মেয়ে হওয়ার পর এই এক মেয়ে তাঁর—কিন্তু তেমন কোনো সখ্যই হয়নি তাঁর এই মেয়েটির সঙ্গে। তিনি তো আসলে ছেলে চেয়েছিলেন, যখনই দেখতেন আনুশকাকে তখনই সেই আকাঙ্ক্ষার কথা মনে পড়ে যেত। ও যখন একদম ছোট ছিল, তখন এ নিয়ে কোনো খেদ-ক্ষোভ বের হয়নি তাঁর ভেতর থেকে। কিন্তু আনুশকা যত বড় হতে থাকল, ততই সেই খেদ আর ক্ষোভ বেরিয়ে আসতে শুরু করল মা-মেয়ের একেকটি মতান্তরের মধ্যে দিয়ে। একেকটি মতান্তর আনুশকাকে নিয়ে গেল তাঁর বাবার আরো কাছে আর মা সরে যেতে লাগলেন অনেক দূরে। তিন মেয়ে যদি একসঙ্গে কাছে আসত, আনুশকা তাদের সবার ছোট, অথচ তিনি পক্ষপাত দেখাতেন বড় দুজনকে। দিলরুবা আর মেহবুবা নিজেরাই একসময় কী না কী বুঝত, আস্তে আস্তে ছোটবোনের কাছে গিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে কথা বলতে থাকত। কী বলত ওরাই জানে, আনুশকা একসময় হেসে উঠত। আবার তাঁর দিকে চোখ পড়তেই মুখটা গম্ভীর করে ফেলত। তিনি তখন তিন মেয়ের ওপরেই খেপে যেতেন এবং বলতেন হাসাহাসি বাদ দিয়ে লেখাপড়া করতে।
আনুশকা কি এখনো সেইসব মনে রেখেছে? নাকি তিনিই বেশি বেশি ভাবছেন? আগে কখনো এসব ঘটনার কথা তাঁর মনে হয়নি। কিন্তু এখন মনে পড়ে। যতটা মনে পড়ার কথা তারচেয়েও বেশি বেশি মনে পড়ে।
প্রয়োজনীয় সব কথা শেষ হওয়ার পর দিলরুবা যদি আসে কথাবার্তা চালাতে তাদের কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু শুধুমাত্র দুজন মুখোমুখি বসে কোনো কথা আর মুখে জোগায় না। হয়তো আনুশকা বলে, ‘মা, দেখছ তো, এই বাসা আবার দখল করা মুখের কথা নয়। তুমি বরং অন্য কিছু ভাবো। অন্য কিছু করো। আরেকটা উপায় আছে। বাসাটা মাস্তান দিয়ে আবার দখল করে নেওয়া। দখলে থাকলে সবকিছু সই। উকিলরা একটা না একটা পথ ঠিকই বের করে দেবে আর দেখবে, হাইকোর্ট থেকে শাহজাহান সাহেবের মতোই আরেকটা রুল জারি হয়ে যাবে। বাসা যদি পেতে চাও তাহলে এই একটা পথই খোলা আছে মা। তুমি বললে আমি এই পথে বাসাটা দখল করার চেষ্টা চালাতে পারি। দখল করার পর বাসাটা আমরা কোনো ডেভেলপারকে দিয়ে দেবো। তখন এসব কিছু ওরাই সামলাবে। আমার মনে হয় না মা কাজটা তেমন কঠিন হবে।’
মিতা আঁতকে ওঠেন। বলে কি এই মেয়ে! এইজন্যেই তো তাঁর এ মেয়েকে ব্যাটা-ব্যাটা মনে হয়। ভাবসাব, কথাবার্তা কোনোকিছুতেই মেয়ে মেয়ে ছাপ নেই। কেবল শরীর, চাউনি, হাসি আর কণ্ঠস্বরটাই মেয়ে মেয়ে। তিনি খুব কড়া গলায় বলে ওঠেন, ‘আনুশকা, বাড়ি নিয়ে কোনো চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। তুমি লেখাপড়া শেষ করেছ, এখন আমাদের কর্তব্য তোমাকে বিয়ে দেওয়া। তুমি বিয়ের জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নাও।’
‘মা, আমি তো আগেই বলেছি, চাকরি করব, বিদেশ যাব।’ হাসতে থাকে আনুশকা—‘আমি তো সেই ছোটবেলা থেকেই বলে আসছি মা।’
‘এইসব আদেখ্লাপনা তুমি অনেক দেখিয়েছো। এতদিন তোমার বাবা বেঁচে ছিল, তিনি সহ্য করে গেছেন। আমি এইসব সহ্য করব না।’
‘তুমি যে সহ্য করবে না, সেটা আমি ভালো করেই জানি। এতদিন বাবা বেঁচে ছিল, তাই তুমি সহ্য করেছো, সেটাও জানি। বাবা তো মরে বেঁচে গেছে। কিন্তু আমার বিয়ে হলে তোমার কী হবে, সেটা কি তুমি বুঝতে পারো? সেটা কি তুমি একটুও টের পাও? তুমি কি জানো, তুমি তখন বেঁচে থেকেও মরে যাবে?’
মিতার মুখে কথা জোগায় না। দিলরুবা বোধহয় রান্নাঘরে ছিল, সেখান থেকে স্পষ্ট শুনছিল তাদের কথাবার্তা। এবার সে প্রায় দৌড়ে আসে, ‘এসব তুই কী বলছিস আনুশকা? ছিঃ’
আনুশকা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। চুপচাপ চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। এইখানে বেশ ক টি কড়ইগাছ আচ্ছন্ন করে রেখেছে আকাশটাকে। অনেক তারার মধ্যে তারা হয়ে প্রিয়জনের হারিয়ে যাওয়ার গল্প ভেসে আসছে মৃদু বাতাসে। একসময়ে যে গল্প সত্যি মনে হয়, অন্য কোনো সময়ে আবার সেই গল্পকেই মিথ্যা বলে ভাববার কথা মনে করে হাসি পায়। অথচ সেই একইজনের মধ্যে ফিরে আসে আরো এক দুঃসহ সময়, যখন সে গল্পকে বিশ্বাস করার ইচ্ছে জাগে আবার। আহ্, মনের মধ্যে বিশ্বাস জেগে ওঠার শক্তি কত প্রবল, বিশ্বাসকে জাগিয়ে তোলার মতো অবিশ্বাসী হূদয় কত অকৃপণ! তার সামনে অজস্র তারা ঝরে পড়তে থাকে আকাশ থেকে। সে মনে মনে প্রতিটি তারা কুড়িয়ে তুলতে থাকে তার ওড়নার কোঁচড়ে। না হয় তার প্রিয়জন নয় এরা, কিন্তু কারো তো প্রিয়। তাছাড়া কোনটা যে তার, তাও কি জানা আছে তার!
সে ঝরে পড়া তারা কুড়িয়ে চলে।
অনেক পরে আনুশকা আবারও ফিরে আসে ঘরের ভেতর। মিতা শুয়ে ছিলেন। সে তাঁর শিয়রের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মিতা তাঁকে আসতে দেখেন এবং মনে মনে শঙ্কিত হন। আজ নীলক্ষেতে আসাই ভুল হয়েছে তাঁর। একবার তো ভেবেছিলেন, কী হবে নীলক্ষেতে গিয়ে—দু-তিন দিন পরে গেলেও তো হয়। কিন্তু ওখানে এভাবে বসে থাকলেও নিজের কাছে নিজেকে অনাহুত মনে হয়। মনে হয় বাসার সবগুলো চোখ দেখছে তাঁকে। দেখছে আর ভাবছে এ বুড়ি এ বাসায় পারমানেন্ট হয়ে গেল! অতএব তিনি বাসে চেপে বসেছিলেন। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করা আজকাল ভারি ঝামেলা। সঙ্গে কাউকে আনতে হয়। কিন্তু এসব ঝক্কি সহ্য করলেও মনে মনে বেশ ভালো লাগে তাঁর। মনে হয় যাক, সবার সামনে অন্তত এটা প্রমাণ করা গেল যে নীলক্ষেতে তাঁর কাজ রয়েছে। তবে এভাবে আসাযাওয়ায় সমস্যাও রয়েছে। আজ তিনি তা প্রথমবারের মতো হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। দিনে দিনে হালকা হয়ে আসছে তাঁর আঁচলের গিঁট। প্রথম প্রথম কোথাও বেরুনোর সময় ভাইবোনরা টাকাপয়সা জোর করে হাতে গুঁজে দিত, জানতে চাইত কাছে টাকাপয়সা আছে কি না। ধীরে ধীরে তাদের উত্সাহ কমে আসছে। আজ হাতে টাকাপয়সা দেওয়া দূরে থাক, মুখ তুলে একবার জানতেও চায়নি টাকাপয়সার দরকার হবে কি না। আজ নীলক্ষেতে যাওয়ার কথা তুললে তাঁর ভাই মুখ না তুলেই বলেছে ধীরে ধীরে, ‘ঠিক আছে যাও। এই কল্লোল, তোর ফুপুর সঙ্গে যা।’
অথচ আজকেই মিতার কাছে একদম টাকা নেই। ভাই ওভাবে কথা বলায় তাঁর পায়ের তলার নিচে থেকে যেন মাটি সরে গিয়েছিল। কোনোমতে বলেছিলেন তিনি, ‘কল্লোলের হাতে বাসভাড়াটা দিয়েন।’
তা শুনে মুখ তুলে মিতাকে ভালো করে দেখে নিয়ে বড় ভাই উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলেছিল, ‘ওহ্... সেইটা বলবে তো। আমার কি আর এই বয়সে সব কথা সবসময় মনে থাকে!’
পরে টাকা দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘এইভাবে আসাযাওয়া করে তো লাভ নেই। তুমি এখানে ওখানে দৌড়াদৌড়ি করার আগে ভালো করে চিন্তা করে দেখ, আসলে তুমি কী করবে। এমনি এমনি টাকাপয়সা খরচ করার তো কোনো মানে হয় না। যদি মনে হয়, ওটা ফিরে পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই, তাহলে বরং ওই টাকা দিয়ে অন্য কিছু করা ভালো। না কী বলো?’
মিতা এখন নীলক্ষেতে তাঁর মেয়ের বাড়িতে বিছানায় শুয়ে সেই মুহূর্তের কথা চিন্তা করে একেবারে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে যান।
শিয়রে দাঁড়িয়ে আনুশকা বলে তাঁকে, ‘স্যরি মা, আমি ওসব কথা ভেবে বলিনি। তুমি আমাকে মাফ করে দিও।’
মিতা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন, ‘মাফ কেন চাইছিস? তুই তো ঠিকই বলেছিস... তুই ছাড়া আমাকে আর কে দেখবে এখন? তুই-ই তো দেখবি...’
তারা দুজন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে আনুশকা বলে, হ্যাঁ, মা। আমি দেখব... আমিই দেখব মা।
ছয়
‘জীবনে আমি কোনোদিন চিঠি লিখিনি, চিন্তা করতে অবাকই লাগে কিংশুক, এটাই আমার প্রথম চিঠি। এর আগে আমার কোনোদিন কোনো চিঠি লেখার দরকারও হয়নি। আর আজকে যে লিখছি তাও কোনো দরকারে নয়। মনে হচ্ছে, এতদিন শুধু চিঠি পেয়েছি, আজ বরং একটা চিঠি লিখি। কাকে লিখব ভাবতে গিয়ে মনে হলো মায়ের কথা, তোমার কথা। মাকে কী লিখব সেটা ভালো করে ভাবতে হবে। এখনো আমাদের সম্পর্কটা বোধহয় খানিকটা হিসাবনিকাশেরই রয়ে গেছে। কিন্তু তোমাকে কোনো ভাবনা ছাড়াই চিঠি লেখা যায়। এখানে আমার অফুরন্ত অবসর। কোনো বন্ধু নেই, পরিজন নেই। বিকেল গড়িয়ে এলে আমাকে ভাবতে হয়, এখন আমি কী করব। মনে হচ্ছে চিঠি লেখার অন্তত একটা সুবিধা আছে—অনেক দূরে থাকার কারণে যাকে লেখা হচ্ছে তার প্রতি সুবিচার করা যায়। তাত্ক্ষণিকভাবে কোনোকিছু বলতে গেলে, সম্পর্ক যত নিবিড়ই হোক না কেন, একটা দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। চিঠিতে সেরকম কোনো আশঙ্কা থাকলেও সেই দূরত্ব যে তাত্ক্ষণিকভাবে হয় না এ কথাটা বলা যায় জোরেসোরেই।
এখানে আসার পর কতদিন যে হয়ে গেল, তাও মনে আসছে না। দিনক্ষণ, সময়কে গুনতে ভুলে গেছি বোধহয়। তোমাদের কারো সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। না থাকাই স্বাভাবিক। আমরা তো যোগাযোগ রাখার দিব্যিও দেইনি। এইখানে আমি আর আমার মতো আরো তিনজন মেয়ে কাজ করছি। কখনো হেঁটে, কখনো মোটরবাইকে করে। যখন মোটরবাইক চালিয়ে যাই, বুঝতে পারি সবাই তাকিয়ে আছে। কারো তাকানোর মধ্যে নির্ভেজাল অবাক হওয়া, কারো চোখে আবার পৃথিবী পাপে ভরে যাওয়ার সমূহ আতঙ্ক। প্রথম কয়েকদিন কাটল ভয়াবহ অস্বস্তির মধ্যে। অথচ এরকম হওয়ার কথা ছিল না। তোমার কি মনে আছে, বিশেষত আমি এরকম পরিস্থিতিতে কাজ করার কথা বলতে গেলে খুবই এক্সাইটেড হয়ে পড়তাম? কিন্তু চিন্তা করা এক জিনিস আর কাজ করা আরেক জিনিস। এক্সাইটেড হওয়ার কোনো সুযোগই পাচ্ছি না, পরিস্থিতি সামাল দিতেই পেরিয়ে যাচ্ছে সময়। তারপরও অবাক হওয়ার মতো ঘটনা হলো, না চাইলেও হঠাত্ হঠাত্ অবসর ছলকে ওঠে কাজের ভেতর থেকে। সেই অবসর নিয়ে আমি কী করব ভেবে পাই না। একটা বই নিয়ে এসেছিলাম। মনে হয়, বারবার পড়তে পড়তে মুখস্থই হয়ে যাবে।
যে বাড়িতে আমি থাকি সেটা নেহাত খারাপ নয়। বাসায় চিরদিন এক ঘরে একা একা থেকে এসেছি। এখন কোনো কোনো রাতে ঘুম ভেঙে চিন্তা করি, পাশে কাউকে নিয়ে শোয়ার কথা আমি কোনোদিন আদৌ চিন্তা করেছি কি না। এখানে আমার পাশে এ বাড়ির তিন তিনটা মেয়ে শুয়ে থাকে। এই বাড়িতে কোনো টেবিল নেই। আমি হাঁটুর ওপর খাতা রেখে লিখছি। শেষ কবে এভাবে লিখেছিলাম সেকথাও মনে পড়ে না। এরা কেউ কোনোদিন সাবান মাখেনি গায়ে, শ্যাম্পু মাখার তো প্রশ্নই ওঠে না। গা এরা কচলে কচলে পরিষ্কার করে ফেলে। চুল পরিষ্কার করার দরকার হলে এঁটেল মাটি না হয় তেল থেকে বেরুনো খইল মাথায় ঘষে। বাড়ির মালিকের বুড়ি মা, প্রায়বুড়ো বউ, ছেলেবউ আর মেয়ে সবাইকে আমি সাবান আর শ্যাম্পু মাখানো শিখালাম একদিন। ওদের গায়ে মাখার জন্যে মাঝে মাঝে শ্যাম্পু আর সাবানও দেই। তারপরও প্রতিদিন গোসল বা হাতমুখ ধোয়ার সময় এগুলো বের করলে দেখি, ব্যবহূত হওয়ার চিহ্ন সুস্পষ্টভাবেই উঁকি দিচ্ছে। কেন যে এমন করে, ভেবে পাই না। হয়তো তাদের কাছে বিস্ময়কর এই সাবান-শ্যাম্পু মেখে শরীর-চুল পরিষ্কার করে ফেলা। কত অনায়াসে এরা কেবল পানি দিয়ে শরীর ধুয়ে পরিচ্ছন্ন রাখে, তা ভেবেও অবাক লাগে। আমার জন্যে ভাত খাওয়ার আলাদা কোনো পাত্রও নেই। এ বাড়িতে মোট চারটা সানকি আছে। সেগুলোতেই ঘুরেফিরে খাওয়া হয়। এবং এভাবে খেতে অস্বস্তি বোধ করে না ওরা। একবার ভেবেছিলাম, একটা প্লেট কিনে আনব। আবার ভাবলাম, তাতে হয়তো ওরা বিস্মিত হবে, কিন্তু আহতও হবে। অতএব কিনতে যাইনি আর।
আমরা শুই মেঝের ওপর। প্রতিরাতেই মাটিতে খড় পাতা হয়, তার ওপরে কাঁথা। কোনো কোনোদিন খড় পাওয়া যায় না। তখন মাটিই যথেষ্ট। বাড়ির ছেলেরা অবশ্য শোয় মাচার ওপর। আর সৌভাগ্যবতী শুধু সেই মেয়েমহিলারা যাদের স্বামী নামের জিয়নকাঠি মরণকাঠি আছে। তারাও ঘুমায় মাচা কিংবা চৌকির ওপর। আমি কিংবা এ বাড়ির বুড়ি মা এবং তার দুই নাতনি এরকম সৌভাগ্যের মুখ এখনো দেখিনি। মাঝে মাঝে খড় না পাওয়ার কারণ খুবই সোজা—গরুরও খাওয়ার মতো খড় নেই। কিংবা ভেজা খড় কাল রোদে দিয়ে শুকাতে হবে। সবাইকে রাত সাতটার মধ্যেই শুয়ে পড়তে দেখি। আমি বাড়তি রাত জাগার অভ্যাস ছাড়তে পারিনি বলে অতিরিক্ত কেরোসিন কিনে আনি। কিন্তু বলাই বাহুল্য, যখন থাকি না সেই কেরোসিনের পাত্রেও দেখি টান পড়েছে। জানি না, কোনদিন আমাকে নিয়েই টানাটানি শুরু হয়!
তোমার নিশ্চয়ই কৌশিক আহমেদের কথা মনে আছে? সেই যে এক সেমিনারে এসে আমাদের অনেক কিছু শুনিয়ে গেল? কাজ করতে করতে আমার মাঝেমধ্যে সেদিনের কথা খুব মনে পড়ে। এখানে অনেক রকম ধান, অনেক রকম বীজও তাদের। যেদিন আমি আসি সেদিনই দেখলাম, উঠোনের মধ্যে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে কুতকুতি খেলছে। খেলতে খেলতে বাচ্চাগুলো জোরে জোরে বলাবলি করছে, ‘ধানের মধ্যে খামা/ মানুষের মধ্যে মামা/ গরুর মধ্যে দামা।’ এদের মায়েদের একেকজনের কাছে আমি একেকদিন একেকরকম গল্প শুনি। আমরা যে ঘরটায় শুই, সেটার মধ্যেই আরেকদিকে গুদাম। সেখানে বাঁশের মাচার ওপর-নিচে কত যে কোলা, কত যে পাতিল। সেইসব কোলা আর পাতিলে থাকে রাজ্যের ধান ও শস্যবীজ। অনাগত সব শস্যের পাশাপাশি শুয়ে থাকি আমরা। একদিন এক মহিলা কথায় কথায় বলল, বর্ষায় এখানে সবকিছু ডুবে যায়। তখন যে ভয়ানক কষ্ট হয়, তা নাকি আমার পক্ষে সহ্য করা কোনোদিনই সম্ভব নয়! ওদেরই নাকি সহ্য হয় না তা। তবু সেই বর্ষাই পছন্দ ওদের সবার। ওদের কাছে বর্ষা না হওয়ার মানে ভবিষ্যতে না খেয়ে মরে যাওয়া। বড় বড় অনেক বিলও আছে ধারেকাছে। সেগুলোর মধ্যে রাজ্যের আগাছা। একবার নামটাম শেখার চেষ্টা করেছিলাম এর ওর মুখে শুনে শুনে। কোনোটার নাম ভেউলো, কোনোটার ছামনা, কোনো কোনোটার নাম আবার ভটকা কিংবা চেচো, কোচরো কিংবা অন্যকিছু। এত আগাছা পৃথিবীতে আছে যে চোখেই পড়ে না এদের, অথচ এদেরও কত নাম, কত পরিচয় (যেমন মানুষের মধ্যেও কত অমানুষ, সেই অমানুষদেরও কত নাম, কত পরিচয়)। বর্ষার পানিতে এসব আগাছা পচতে থাকে। আর যতদিন যায়, এইসব পচা আগাছা ধীরে ধীরে পচে মাটিকে কালো করে ফেলে। এরকম জমিতেই মই দিয়ে আর মুগুর পিটিয়ে মাটির দলা ভেঙেচুরে সমান করে ফেলে চাষিরা।
হয়তো তোমার হাসি পাচ্ছে আমার এসব কথা শুনে। হয়তো তোমার এসব কিছুই জানা আছে ভালো করে। কিন্তু কী করব বলো, আমি তো আর কখনো গ্রামে থাকিনি যে এসব আমার জানা হবে, দেখা হবে। আর আমি তো না জেনেও জানবার ভান করতে শিখিনি। আমার সব নতুন জানার মধ্যে আমি নিজেই এক অদ্ভুত বিস্ময় জেগে উঠতে দেখি। মানুষকে তো বেড়ে উঠতে হয় তার পারিপার্শ্বিকতার ভেতর দিয়েই। তাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করারও কোনো মানে নেই। আর এমনও তো নয় আমাদের দেশের শহুরে মানুষেরা সেই বিদেশিদের মতো, যারা বছরের কোনো এক সময়ে কয়েক মাসের জন্যে গ্রামে চলে আসে বউ ও ছেলেপুলে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের কৃষক নামের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। শহুরে কোনো পেশার চেয়ে কৃষি পেশার ঐতিহ্যকেই তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বোধহয় কিংবা নিজেদের উত্সকে খুঁজে নেয় এইভাবে। কৌশিক আহমেদ তো এদের কথাই বলেছিল বোধহয়? তুমি দেখ, আমার মনে হয়, আমাদের কোথাও গুরুতর এক খুঁত রয়েছে, ভুল হয়েছে আমাদের শিক্ষাদীক্ষাতেই। আমরা কৃষক কিংবা জোলা, কলু কিংবা খুলু যে ফ্যামিলি থেকেই যাই না কেন, লেখাপড়া করার পর সেই পরিচয় পকেটে লুকিয়ে ফেলি। আমরা এক মুহূর্তে রুটলেস হয়ে যাই। চাল পাই, ডাল পাই, তেল পাই, নুন পাই... ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাই। মাসের গোনা বেতন, ঝুঁকিহীন জীবন, অথচ তারপরও এদের কারো জীবন বা যৌনজীবন আনন্দময় হয়েছে বলে মনে হয় না আমার। ভালো কথা, আমি অনেক ধানের নাম শিখেছি। এর কোনোটা আছে, কোনোটা আবার নেই। শুনবে তুমি? ঝিলেসাইল, নাজিরসাইল, তালমুগুর, হলদেবাটা, খাজুরছড়ি, বড়ানগেতি...। শুনেছো তুমি এসব ধানের নাম কখনো?
এখন মনেই হয় না, কখনো আমি ভার্সিটির রাস্তা দিয়ে তোমাদের সঙ্গে হেঁটে বেরিয়েছি, ‘অপরাজেয় বাংলা’ দেখে আমরা থমকে দাঁড়িয়েছি (আচ্ছা, ওটার কাজ কি শেষ হয়েছে?), ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে তুলে দিতে এসেছো আমাকে তুমি। মনে হয়েছে বাসটা আমাকে নিয়ে চলে যাচ্ছে অন্তহীন এক নিরুদ্দেশে। আর তুমি দাঁড়িয়ে আছো; উদ্ভ্রান্ত নির্লিপ্ত চোখের এলোমেলো এক দ্রাবিড় তরুণ। আমি জানতাম, এই শেষ। তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। নিজের সঙ্গে এই শেষ বোঝাপড়া আমার। কিন্তু কী আশ্চর্য, কাগজকলম হাতে নিয়ে তোমার কথাই মনে হলো। আমি জানি না, তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে কি না। কিন্তু জানি, আমাদের বাড়িটা আর কোনোদিন ফিরে পাব না, যে বাড়িতে বাবা যত্ন করে চন্দ্রমল্লিকা লাগিয়েছিলেন আর বেসুরো গলায় গান গাইতেন, ‘ও আমার চন্দ্রমল্লিকা, বুঝি চন্দ্র দেখেছে/ যেন কোন শুক্লাপঞ্চমী চোখে স্বপ্ন এঁকেছে...’। সেই সময় আমি জানতামই না শুক্লাপঞ্চমী কাকে বলে। এখন ধীরে ধীরে জ্যোত্স্নার আলো চোখ মেলে তাকাতে শুরু করলে, এ বাড়ির উঠোনে নেমে আসতে শুরু করলে আমি তা বুঝতে পারি। আমি এখন পঞ্জিকা গুনতে শিখেছি। দিব্যচোখে দেখতে পাই, আমার আর কখনো বিদেশ যাওয়া হবে না। আর্কাইভ, মিউজিয়াম আর লাইব্রেরির ঘ্রাণ আমি কখনো চিনতে পারব না। মাকে বলে এসেছি, তুমি বরং আপার বাসাতে থাকো। জামাইয়ের বাসা হলেও নিজের ভাইবোনের বাসার চেয়ে অনেক স্বস্তিতে থাকবে। আর থাকো বা না থাকো, আমি আপার ঠিকানাতে প্রতি মাসে টাকা পাঠিয়ে দেবো। ঢাকায় কোনো চাকরি না হওয়া পর্যন্ত ব্যবস্থা এই।
প্রথম প্রথম মনে হতো, ঢাকায় কবে ফিরে যেতে পারব। এখন আর মনে হয় না। এই মুহূর্তে বাইরে বেরুলেই আমার চোখে পড়বে, সারি সারি আলো জ্বলছে বিলের ভেতর। আলোকের ফাঁদ পাতা হয়েছে সেখানটায়। নতুন চাঁদ আকাশে। ঝাঁকে ঝাঁকে পোকামাকড় ধেয়ে আসছে নতুন লাগানো ধানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে। এদের মেরে ফেলার জন্যে বিলের মধ্যে ঠিক সন্ধ্যার সময়েই বারো হাত পরপর মাথায় মশাল জ্বালানো লম্বা বাঁশ বসিয়ে দিয়েছে কৃষকেরা। দেখতে কী যে ভালো লাগে! এক অনাস্বাদিত উত্সবের গন্ধ এসে আমার চোখেমুখে ঝাপটা মারে। কয়েকদিন আগে পাশের এক গ্রামে গিয়ে এক বুড়ির কাছে অদ্ভুত এক গল্প শুনেছি। একসময় এখানে না কি এত পুঁটি মাছ পাওয়া যেত যে, সেই মাছ জ্বাল দেওয়া হতো বাইরের খোলা জায়গায় বড় বড় চুলা তৈরি করে বড় বড় হাঁড়িতে। আর সেই পুঁটি মাছ এত ভালো ছিল যে, জ্বাল দিলে তার শরীর থেকে তেল বেরুত, তেলের পুরু স্তর পড়ে যেত হাঁড়ির পানির ওপর। বড় বড় বোতলে তুলে রাখা হতো সেই তেল। তারপর তা দিয়ে সারা বছর মাটির প্রদীপ জ্বালাত তারা। ভীষণ আক্ষেপ সেই বুড়ির, কী দিন এসেছে, তেলের জন্যে দূরে থাক, খাওয়ার মতো পুঁটিমাছই এখন আর পাওয়া যায় না।
এখন আমি বুঝতে পারি, বাবা কেন গ্রামে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন শেষ বয়সে। সেই প্রাচুর্য না থাকুক, সেই প্রাচুর্যের স্মৃতিই হয়তো তাঁকে বেঁচে থাকার শক্তি দিত। কিংবা সেই স্বর্ণগ্রাম ফিরে পাওয়ার জন্যে নতুন এক সংগ্রামের প্রস্তুতিতে তিনি হয়তো ফের তরুণ হয়ে উঠতেন। আমার কি মনে হয় জানো, আমারও আর শহরে ফেরা হবে না! প্রতিদিন এই মেঠো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হবে, বাবা এরকম রাস্তা দিয়ে হাঁটতে চেয়েছিলেন, ওই তো বটের ঝুরি, তিনি ক্লান্ত হয়ে ওটার নিচে বসে দম নিতে চেয়েছিলেন আর জানতে চেয়েছিলেন এই শুক্লাপঞ্চমীর চাঁদ কিভাবে স্বপ্ন আঁকে যোজন যোজন দূরের ছোট্ট তুচ্ছ দীনদরিদ্র চন্দ্রমল্লিকার পাপড়ি জুড়ে।
প্রতিদিনই আমি কাজের মধ্যে ডুবে যাব এবং প্রতিদিনই আমার অবসর ফুঁড়ে জেগে উঠবে এসব কথা। আমি তা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখব আর আমার সামনে দিয়ে হয়তো পোকায় খেয়ে ফেলা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে খালি গায়ে শাপলার মালা পরা গ্রামবালিকা দৌড়ে যেতে যেতে আমার সেই অবসর ভেঙে ফেলবে; তারপর সে আবার ফিরে আসবে এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে সেই শাপলার ডগা কচমচিয়ে খেয়ে পরিতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। আর একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস জেগে উঠবে আমার ভেতর ছোটবেলায় খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে মাকে খুব জ্বালিয়েছি চিন্তা করে। আমি ওকে ডাক দিয়ে জানতে চাইব, ‘এই তুই তোর গলায় ওটা কী পরেছিলি রে? ওটা আবার খেয়ে ফেললি কেন?’
সেই বালিকা খিলখিল করে হেসে উঠবে, তারপর লজ্জায় চোখ ফেরাবে, আবার খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে পেছন ফিরে চুলার ধারে বসে থাকা তার মাকে বলবে, ‘এ-এ মা, কী য্যান কয়, বুজি না। কী কয় মা?’
সে আমার ভাষা বুঝতে পারে না ভেবে খুব কান্না পাবে আমার। কিন্তু সে হেসে হেসে আমাকেই ফের উপহাস করবে, আমার ভাষা বুঝতে পারেনি বলে, আমার ভাষা দুর্বোধ্য বলে। আমার তখন ভালো লাগবে। এমন কান্না আমি আর কোথায় পাব, কোথায় পাব এমন ভালোলাগা? আমি জানি, এখানেও হিংসা আছে, রক্তপাতের উল্লাস আর উন্মত্ততা আছে। তারপরও সুখ এইটুকু, এখানে আমি আকাশ দেখতে পারি। চোখের একেবারে কাছে হারিয়ে যাওয়ার মতো সবুজ দেখতে পারি। আমি আগের মতো চা পান করতে ভুলে গেছি কিংশুক, কিন্তু প্রচুর ঝাল দেওয়া তরকারি খেতে শিখেছি।
কিংশুক, তুমি বরং একবার আসো এখানে। আমি অবশ্য ঝামেলায়ই পড়ব, তুমি কে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে। তবে তোমার ভালো লাগবে। আর যদি ভালো না লাগে—এমন তো নয় এখান থেকে বেরুনোর পথ নেই। তুমি তখন ফিরে যেয়ো। তোমাকে বিদায় দিয়ে ফিরে এসে ঘরের দাওয়ায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি না হয় আচমকা সেই কবিতাটা বলে উঠব, ‘কেঁদেও পাবে না তাকে, বর্ষার অজস্র জলধারে’...’ v