হাতে গুনে বলার মতো দিন আর ক টাই বা আছে!
তিনি কখনো কবিতা লেখেননি। কবিতা কী করে লিখতে হয় সে কৌশলও তাঁর জানা নেই। কিন্তু এখন কবিতার মতো সেই শব্দগুলোই তিনি লিখে ফেলেছেন। শব্দগুলো মারবেলের মতো গড়িয়ে বেড়াচ্ছে সাদা জমিনের ওপর। বারবার তাতে চোখ বুলাচ্ছেন। চোখের দৃষ্টি স্থির করা যাচ্ছে না। প্রতিটি শব্দের ওপর থেকে দৃষ্টি পিছলে যাচ্ছে।
সকালে উঠে বাজার ফর্দ করতে বসেছিলেন আসিফ। ছেলেরা তাদের বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে বেড়াতে আসছে। বছরান্তে তারা একবার ক টা দিনের জন্য বাবা-মাকে দেখতে আসে। বাবা-মাকে দেখতে আসে নাকি ঢাকা শহরের জঞ্জাল থেকে মুক্তি পাবার জন্য নিরিবিলিতে এসে ক টা দিন হাঁফ ছাড়া। আনেকটাই রথ দেখতে এসে কলা বেচার মতোই ব্যাপারটা সে বেশ বুঝতে পারেন তিনি।
সকাল থেকে ঝুল বারান্দায় বেতের চেয়ারটাতে বসে আছেন আসিফ। বুলবুলি চা দিয়ে গেছে গরম গরম। সেও পড়ে পড়ে ঠাণ্ডা হয়েছে। ধোঁয়া উঠছিল কাপ থেকে, বাতাসে মিলিয়ে গেছে। চায়ের কাপে কেমন যেন একটা মরা সর পড়ে আছে। গরুর ঘন দুধের চা পছন্দ করেন তিনি। পছন্দের চা ভরা কাপ অভিমানে ভরে আছে। দ্বিতীয়বার চা চাইতে গেলে পাওয়া যাবে ঠিকই, কিন্তু খেসারত দিতে হবে দু-চারটে কথার টিপ্পনি সহ্য করে। যা একেবারেই পছন্দ নয় আসিফের। সেদিকেও তাঁর কোনো খেয়াল নেই। কবিতার মতো বাজার ফর্দের খাতায় লেখা শব্দগুলো কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আটকে ফেলেছে তাঁকে। বাজার ফর্দ করতে বসেছিলেন। কিন্তু তিনি তো এ কাজটি একা করেননি কোনোদিন। কাকলী বলেন আর তিনি লেখেন। ঘরে বসে বসে চাল, ডাল, চিনি-বাতাসা কোনটার কী দাম সব জানা আছে তাঁর। এখনো ঘুম ভাঙেনি কাকলীর। তাই চায়ের টেবিলে দেখা যাচ্ছে না তাঁকে। দোতলার এই বারান্দায় বসে দুজনে চা খান আর বাজার ফর্দ করেন, চলে সংসারের টুকিটাকি কথাবার্তা। আজ কাকলীর আসতে দেরি হচ্ছে।
মাঝারি সাইজের একটা ফ্রিজ আছে বটে কিন্তু কাকলী কখনো ফ্রিজে রাখা খাবারদাবার খেতে পারেন না। তাঁর প্রতিদিন টাটকা বাজার চাই। সেই বাজার শিলপাটায় বাটা মসলায় রান্না করবেন। কতদিন আসিফ কাকলীকে বলেছেন, ফ্রিজটা আছে কী জন্যে, প্রতিদিন প্রতিবেলা রান্নাঘরে যাবার দরকার কী? তার চাইতে আসো না সুখ-দুঃখের গল্প করি দুজনে! এ আকুতি তাঁর কানে পৌঁঁছায় কি না কে জানে।
তবে কাকলী রেগে যান এ কথা শুনে। বলেন, এই তো মোটে তিন জন মানুষ, তার রান্না করে ফ্রিজে রেখে দেবো? তারপর সারাটা দিন করবটা কী? এই কথা লতিয়ে আরো দশ কথা, বিশ কথা, এক শ কথা হবে। কানটা ঝালাপালা করে তুলবেন। তখন বাড়িটা ঝনঝন করতে থাকবে।
ঠিকই তো এবাড়িতে রান্নাবান্না ছাড়া সারাদিন করার মতো কাজ কীই বা আছে। কাজ তো সব কাজের লোকেই করে। কাকলী তদারক করেন। দাপুটে গলা। গত বর্ষায় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে পায়ে জোর ব্যথা পেয়েছিলেন। প্লাস্টার বেঁধে তিন মাস বিছানায়। সেই ভাঙা পা আর ভালো হয়নি। সেই ভাঙা পা নিয়ে সেই যে হুইল চেয়ারে উঠে বসেছিলেন তিনি আর নামতে পারেননি। তাছাড়া বহুদিন ধরে ডায়াবেটিসের সঙ্গে মেলবন্ধনের কারণে আনুষাঙ্গিক রোগব্যাধিগুলোর সঙ্গেও আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে। সকাল-সন্ধ্যা নিয়ম করে গুচ্ছের ওষুধ খেতে হয় তাঁকে। মাঝে মধ্যে এই এখন তখন অবস্থা। তার ওপর আছে শ্বাসকষ্টের শাসানি। হলে কী হবে তবু তাঁর সবদিকে নজর। খবরদারিতে কম যান না। বাড়ির কাজের লোকগুলেকে তটস্থ করে রাখবেন। তাঁর খবরদারিটা যদি একটু কম থাকত তাহলে বাড়িতে একটু শান্তি বজায় থাকত বলে আসিফের মনে হয়। হইচই তাঁর একদম পছন্দ নয়।
খবরের কাগজ রেখে গেছে বুলবুলি। সেদিকেও হাত বাড়াতে ইচ্ছে করে না আসিফের। হাতে গুনে বলার মতো দিন আর ক টাই বা আছে! শব্দগুলো তাঁর চোখ দখল করে আছে। আসলে বয়স হয়েছে। কত হলো? কোনোদিন জন্মদিন পালন করা হয়নি তবু হিসাব আছে। ষাট পেরিয়েছে বছর দুই হলো। এতটা বয়স হলে কতটা বুড়ো দেখায় আসিফ তা কখনো ভেবে দেখেননি। ঘরে একটা ড্রেসিং টেবিল আছে বটে কিন্তু আয়না দেখার বাতিক তাঁর খুব একটা নেই। সরকারের উচ্চপদে কাজ করতেন। এখন অখণ্ড অবসর। এই বয়সটা তো ভালো নয়। এই বয়সে কত কী যে চিন্তা আসে। সবচাইতে বড় চিন্তা দিন ফুরিয়ে আসছে। আসুক না, তাতে কি? টাকা খরচের মতো দিন তো ফুরোবেই। কিন্তু এতদিন কখনোই এই হাতেগোনা টাকা খরচের মতো জীবনের গোনা দিনগুলো ফুরিয়ে আসছে—এমন চিন্তা আসিফকে ধরতে পারেনি। ধরবেই বা কী করে। চিরদিনের নির্ঝঞ্ঝাটে মানুষ। তেমন কোনো চড়াইউতরাই পার হতে হয়নি তাঁকে। জীবনটা তাঁর ছকে কাটা মানুষের যেমন হয় ঠিক তেমনি। চিরদিন ভালো ছাত্র ছিলেন। স্কলারশিপ পেয়ে লেখাপড়া করেছেন। যেটুকু সংগ্রাম তা সেই ছেলেবেলায়। সেসব মনে করে সুখের দিনগুলোকে কখনো ম্লান করেননি।
কাল হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে তাঁর মাথার ভেতর বসে গেছে চিন্তাটা। হাতে গুনে বলার মতো দিন আর ক টাই বা আছে! মানে মৃত্যুচিন্তা। প্রশ্নটা রাত থেকে কতভাবে যে তাঁকে তাড়া করে ফিরছে তার হিসাব নেই।
হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ারে শুয়ে আছে ছোট ভাই জামিল। নানারকম যন্ত্রপাতি লাগানো তার শরীরে। মুখের ওপর অক্সিজেনের মাস্ক। দেখলে ভয় লাগে। জামিল তাঁর চেয়ে বছর তিনেকের ছোট। পিঠাপিঠি চার ভাইবোনের মধ্যে তারা দুই বেঁচে আছে। বোন দুটো ছোট বয়েসে মারা গেছে। বাবা-মাও যথাসময়ে তাদের মানুষ করে ঘরসংসার গুছিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছেন।
বারবার দৃশ্যটা আসিফের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মৃত্যুকষ্ট কী যে মারাত্মক! জামিল ঘোরের মধ্যে পড়ে আছে, কোনো চেতনা নেই, হাত-পা নড়ছে কি নড়ছে না। বুকের ছাতিটা কি ওঠানামা করছে, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। চোখ দুটো বন্ধ। অনেকদিন আগের বৃষ্টিজল জমে থাকার মতো চোখের কোটরে খানিকটা ঘোলাটে জল জমে আছে। সে হয়তো মৃত্যুকষ্ট আর সহ্য করতে পারছে না। অথবা সে কষ্ট তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে অথবা কোনো কষ্টই হচ্ছে না তার। এরকম দৃশ্য আসিফ কাছ থেকে কখনো দেখেননি। থেকে থেকে তাঁর বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে ওঠে।
ক্লিনিক জুড়ে আত্মীয়-স্বজনের ভিড়। কে যেন তাঁকে জাপটে ধরে ক্লিনিকের বাইরে নিয়ে এল। তিনি চোখের ভেতর কেবলই ধূসর রাস্তা দেখতে পাচ্ছেন—কূল-কিনারাহীন রাস্তা। এই সব রাস্তায় কি গাড়ি-ঘোড়া চলে? হয়তো চলে। হয়তো চলে না। বৃষ্টি হবার আগে দূর থেকে মৃদু মেঘ ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেই শব্দের সঙ্গে মিলেমিশে একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে আসছে।
—আসলে ক্লিনিক্যাল ডেড বলতে যা বোঝায় তা দু দিন আগেই কমপ্লিট হয়ে গেছে। এটা জাস্ট ওই আর কি। টাকা আছে, এইসব যন্ত্রপাতি লাগিয়ে বাঁচিয়ে রাখার নামান্তর আর কি। এছাড়া আর কিছু নয়।
পাখিরা ডানা ঝাপটে দূরে কোথাও উড়ে যাওয়ার মতো ভেসে ভেসে বেড়াছে কথাগুলো। ভেসে বেড়ালেও ঘুরতে ঘুরতে দলবাঁধা কবুতরের মধ্যে কিছু কিছু কবুতর যেমন ঝুপ ঝুপ করে বসে পড়ত ছেলেবেলার সেই রূপপানা টিনের চালের ওপরে। কিছুতেই উঠতে চাইত না। কী যেন হতো তাদের। সকালের কথাগুলো মনের মধ্যে স্থির হয়ে বসে আছে কবুতরগুলোর মতো আর ক টা দিনই বা আছে!
গ্রামে তখন আক্কাস ওঝার বাড়িতে প্রথম টিনের ঘর উঠল। আক্কাস ইলেকশন করল সেবছর। বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান হয়ে গেল। নামের শেষে ওঝা উঠে গিয়ে চেয়ারম্যান বসল। কী আশ্চর্য, তারপর থেকে লোকজন আক্কাস ওঝার চাইতে আক্কাস চেয়ারম্যান বলতে যেমন বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত তেমনি স্বাচ্ছন্দ্যে তার উঠোন বাড়ি ঘিরে টিনের আটচালা বাড়ি উঠল। সেই বাড়ির চালের মাথায় টিন কেটে এক বাহারি ময়ূরপঙ্খি বসিয়ে দেওয়া হলো। বিকেলে ডাকাতের বিলে মানুষ হাওয়া খেতে এসে অবাক চোখে সেই বাহারি বাড়ি দেখত। আক্কাস চেয়ারম্যানের বিদ্যা ছিল না, ছিল মাথাভরা বুদ্ধি। বুদ্ধির জোরে টাকাপয়সা রাখার জায়গা হতো না বাড়িতে। শহরে যেত ব্যাংকে রাখতে। টাকার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বভাব-চরিত্রেরও পরিবর্তন হলো। এই আক্কাস চেয়ারম্যনের কাছ থেকে তাঁকে অনেকবার চারিত্রিক সার্টিফিকেট নিতে হয়েছে।
তো সেবছরই স্কুল পাস করেন আসিফ। বিরাট ঝড়-বন্যা হলো। বাড়িঘর ভেসে গেল। লাশ ভাসল কচুরিপানার মধ্যে। তাঁর স্কুল মাস্টার বাবার একমুঠো জমির আধামুঠো ধানও ভেসে গেছে সেই ঝড়-বন্যায়। বাবা তাঁকে আক্কাস চেয়ারম্যানের কাছ থেকে টাকা ধার করে গঞ্জের কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। জামিল তখন ক্লাস এইটে। মাত্র চার জন মানুষের সংসার, তারপরও টানাটানি যায় না। বাবার সামান্য বেতনের চাকরিতে তাঁদের লেখাপড়া। অভাবের অজুহাতে তাঁদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলেও কিছু বলার ছিল না। কিন্তু বাবা তা কখনো করেননি বলেই এই বয়স পর্যন্ত আসিফ প্রাণভরে কৃতজ্ঞতা জানান মৃত বাবাকে। তো সেই চকচকে টিনের চালের বাড়িটা ঠিক যেন রুপার একখানা টোপর। সেখানে একটু বেলা হলে খই ফোটানো রোদ্দুর পড়ে ভারি একটা দেখবার জিনিস হতো বটে। চালের ওপর বসে থাকত সারবাঁধা কবুতর। হাততালি দিলে ডিগবাজি খেতে খেতে একেবারে আকাশের দেশে। প্রথম প্রথম ক দিন ঘটা করে অনেকেই দেখেছে। জামিলের স্কুলে যেতে দেরি হতো সে দৃশ্য দেখতে গিয়ে। বাবা একদিন জানতে পেরে এমন নির্মমভাবে মেরেছিলেন তাকে যে সেই রুপাপানা বাড়ির দিকে ঘাড় বাঁকা করতেও সে সাহস পেত না। জামিল তার এই শেষ সময়ে কি সেই বাড়িটা দেখতে চাইবে শেষ ইচ্ছে হিসেবে? আসিফ দিব্বি দেখতে পাচ্ছেন, মধুপুর গ্রাম শহর থেকে প্রায় এক শ কিলোমিটার দূরে এক নিভৃত অঞ্চলে তাঁর ছোট্ট বাংলো প্যার্টানের বাড়ির ব্যালকনিতে বসে। এই তো সেদিনের ঘটনা। সেই ঘটনা দেখতে দেখতে তাঁর আবার মনে হয় ক টা দিনই বা আছে! দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যাবে। ক্লিনিক থেকে বের করে আসিফকে বাড়ি পৌঁছে দিল তাঁর এক বন্ধু। বাড়িতে পা দিয়েই তাঁর সবকিছু শূন্য মনে হতে লাগল তাঁর। দৌড়ঝাঁপ যা করার দূর সম্পর্কের এক ভাই সেই করছে। সঙ্গে জামিলের বন্ধুবান্ধবই কি কম আছে?
জামিলের সংসার বলতে এমন কিছু নেই যে তার অবর্তমানে সেই সংসারের ভার বহন করতে হবে তাঁকে। বাড়িতে ঢুকেই মুখোমুখি হলেন কাকলীর। তাঁর চেহারা দেখে কাকলী রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলেন। বোঁটা থেকে ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার মতো মৃত্যু যখন কোনো আপনজনকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় সে চেহারা দেখে বোধহয় অভ্যস্ত নন কাকলী। তুমি এত ভেঙে পড়েছ কেন? আল্লার রহমতে জামিল আবার সুস্থ হয়ে উঠবে।
আসিফ জানেন জামিল যে পথে যাত্রা শুরু করেছে, সে পথে কেবল যাওয়া আছে, ফেরা নেই। পথটির রং ধূসর। ছেলেবেলায় একবার সাঁতার শিখতে গিয়ে প্রায় ডুবেই গিয়েছিল জামিল। পানিটানি খেয়ে একেবারে মরমর অবস্থা। দেখতে পেয়ে তিনি তাঁকে পুকুর থেকে তুলে এনেছিলেন। সেদিনও সে এমনি ঘোরের মধ্যে। তাঁর অতি নিবিড় স্নেহ সেই ঘোরের মধ্যেও জীবনকে জড়িয়ে রেখেছিল। আজ আবার তেমনি করে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল তাঁর ছোট ভাইটিকে। আজ প্রায় তিন মাস জামিল হাসপাতালের বিছানায়। বড় ভয়ঙ্কর দুঃসময় তার। কষ্ট হচ্ছে তার। অথবা কোনো কষ্টই অনুভব করতে পারছে না। যারা দেখছে সে কষ্ট দেখে অবুঝের মতো চোখে জল ফেলছে। মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে ঢুকতে না পারলে কেউ বোঝে না কী এর ভাষা, কিভাবে সে ভাষা বদলায়। প্রতিনিয়ত জীবনযাপনের যে সুখ সে কি মৃত্যুর মধ্যেও থাকে? না, তিনি জানেন না। মৃত্যুর এই অবচতন অন্ধকারে কোনো নীলাভ ভূখণ্ডের স্বপ্নে ভাইটি তাঁর বিভোর হয়ে আছে কি না তিনি তা ভাবতে চেষ্টা করেন।
কে যেন বলছিল—বলছিল মুখে পানি দেওয়া হয়েছে? অনন্তকে খবর দেওয়া হয়েছে? আরো কী সব নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। সেসব কথা কে শুনছে না শুনছে কারো যেন খেয়াল করার কোনো প্রয়োজন নেই। যন্ত্রের মতো দুজন নার্স এসে দক্ষ হাতে শরীর থেকে সমস্ত যন্ত্রপাতি খুলে নিল। তারপর সাদা চাদরে মুখ ঢেকে দিয়ে তারা চলে গেল। মুখে কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করল না। এও একরকম ভাষা। মৃত্যুর মতো এত বড় ব্যাপার জানানোর জন্য কোনো ভাষা খোঁজার দরকার হলো না, শুধু একটা সাদা পর্দা টেনে দেওয়া—যেন মঞ্চের নাটক শেষ হলো এইমাত্র।
না, শেষ দৃশ্য বলতে যা বোঝায় আসিফ তা দেখেননি। তার আগেই তাঁকে বের করে আনা হয়েছিল। দূরের কাছের বহু আত্মীয়স্বজন ভিড় করে ছিল, কিন্তু তিনি ঠিক কাউকে চিনতে পারছিলেন না। তাঁর ভেতরেই চকিতে একটা মুখ হঠাত্ করে ক্লোজ শটে ঢুকতে না ঢুকতেই স্লিপ কেটে বেরিয়ে গেল। অবশ্য তাঁর শরীরটা যেন কার পায়ের ওপর ভর করে হাঁটছিল। সেই হাঁটাপথ আসিফ আবিষ্কার করলেন পাকা সড়ক পার হয়ে গাছপালা, ধানখেত পার হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে—দিগন্তে। সেই ধানখেতের প্রান্তে যখন তিনি এসে দাঁড়ান তখন তাঁকে দলছুট এক বিপন্ন সোনালি চিলের মতো মনে হয়। সেখান থেকেই তিনি যে কাকে খোঁজেন! মধুপুর গ্রামের ভেতরে এসে মহেশপাড়ার কাছে এসে জেলা বোর্ডের কাঁচা রাস্তা ছেড়ে তিনি যখন ধানখেতে নেমে আলপথ ধরেন তখন সোনালি চিল ধীরে ধীরে লম্বা এক মানুষের মতো হাঁটতে থাকেন। সেই পথটা ধরে তিনি একাই চলছেন একাকীত্বের নদীতে ডুবসাঁতার কাটতে কাটতে। নিজের এই ডুবসাঁতারের মধ্যেই আবার সেই মুখটি তিনি দেখতে পেলেন। শ্যামলা রঙের মেয়ে। চেখে আশ্চর্য ধার আর মুখখানি ভারি মিষ্টি।
তার স্মৃতি তাঁকে পীড়া দিতে থাকল। মেয়েটিকে একবার কোথায় যেন দেখেছিলেন আসিফ। খুব সম্ভব জামিলের সঙ্গে। হ্যাঁ জামিলের সঙ্গেই তো, গুলশানের একটি অভিজাত মার্কেটে। মেয়েটি জামিলের একেবারে গায়ের সঙ্গে মিশে হাঁটছিল। কত আর বয়স হবে। বড়জোর কুড়ি থেকে বাইশ-পঁচিশের মধ্যে। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না হয়ে যায় সেজন্যে নিজেই একটু আড়ালে থেকে গেছেন। আটান্ন বছরের জামিলকে দেখে মনে হচ্ছে সবে ত্রিশের ঘর পেরিয়ে চল্লিশের দিকে হাঁটছে। ওর শরীরের গঠনটাই একটু বয়সচোরা। স্মার্ট, দৃঢ় পদক্ষেপে লম্বা লম্বা পা ফেলে ইংরেজি ছবির নায়কদের মতো মার্কেট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল। পাশে মেয়েটি। হবে হয়তো বিদেশি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির মর্যাদাসম্পন্ন পদটি তাকে এমন স্বভাবের আর আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে। তিনি নিজে ওরকম কিছু হতে পারেননি। না পারলেও ভাইটিকে দেখে তাঁর খুব ভালো লাগে। অবশ্য ও ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম।
ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে পালা করে তাঁরা রেশনের দোকানের সামনে দাঁড়াতেন। খুব ভোরে আজানের পর ফজরের নামাজ পড়ে বাবা বের হতেন কোনো সপ্তাহে তাঁকে নিয়ে আবার কোনো সপ্তাহে জামিলকে সঙ্গে নিয়ে। ছেলেকে রেশনের দোকানে দাঁড় করিয়ে তিনি বাজারে যেতেন। কিছু কাঁকর মেশানো মোটা চাল-ডাল, গম, চিনি, মাঝে মধ্যে খানিকটা ভোজ্য তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা। এসব যে বাজারে পাওয়া যায় না তা নয়। তবে যে বাজারে পাওয়া যায় তার নাম কলোবাজার। সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। চারদিকে শুধু নাই নাই। রিলিফ, রেশন, কালোবাজার শব্দগুলো শুনতে শুনতে তারা একরকম ঝানু হয়ে উঠেছিল। রেশনে অল্পদামে পাওয়া সেটুকুই ছিল মহার্ঘ। সে একটা সময় গেছে বটে। তো যেদিন আসিফ লাইনে দাঁড়াতেন সেদিন নিজেকে বড় অসহায় লাগত। বড় কাঙালের মতো মনে হতো নিজেকে। অথচ তিনি লক্ষ করে দেখেছেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জামিলের অসহায় লাগা তো দূরে থাকুক, তাকে রীতিমতো অন্যরকম লাগত যেন সবকিছু জয় করবার জন্যই সে ওখানে দাঁড়িয়েছে। কিভাবে যেন সময়ের অনেক আগেই সে রেশন নিয়ে বাড়ি ফিরত। এসব কারণে ছোট ভাইটিকে কারণে-অকারণে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিতেন।
একই শহরে থাকেন কিন্তু ইদানীং তাঁদের মধ্যে দেখা হয় কম। সামাজিক পারিবারিক অনুষ্ঠান ছাড়া দেখা হয় না বললেই চলে। অথচ ছেলেবেলায় বড় ভাইয়ের ওপর খুব নির্ভরশীল ছিল জামিল। লেখাপড়া থেকে শুরু করে সবকিছুতে সাহায্য পেত বলেই বড় ভাইকে খুব মান্য করত সে। খাবার টেবিলে আসিফ কাকলীর কাছে কথাটা তুললেন খুব ক্যাজুয়ালি। এমনভাবে কথাটা তুললেন যাতে তাঁর ভেতরের কৌতূহল বেরিয়ে না আসে।
কথাটা শুনে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন খানিকক্ষণ। সংসারের কোনো কথা তো কখনো জানতে চান না আসিফ। বলতে চাইলেও শুনতে চান না গভীরভাবে। এই এত বছরের সংসারজীবনে তিনি কেবল দেখে এসেছেন তাঁর স্বামীর গণ্ডি অফিস আর বাড়ি। বইপত্র, খবরের কাগজ এসবই মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। আজ জামিল সম্পর্কে নিজেই কথা তোলাতে কাকলী খুব অবাক হলেন। পাপড়ি আর জামিলের সংসারে ফাটল ধরেছে সে তো আজ কম দিন হলো না। জামিল তো খুব চালাক-চতুর—সে ফাটল দিয়ে যে জল ঢুকবে তার কোনো সুযোগ রাখেনি।
ক্লাসের বন্ধু পাপড়িকে বিয়ে করে জামিল বেশ সুখেই ছিল। তাদের দুই ছেলেমেয়ে। সবাই বড়ই হয়ে গেছে প্রায়। কিন্তু পাপড়ির শরীরে আগের সেই জৌলুস নেই। মেদবহুল শরীর এখন অনেক দুর্বল। কী কী সব অসুখ ধরেছে। তার ওপরে প্রেশার। মেজাজটা তার বরাবরই তুঙ্গে। বয়সও হয়েছে। ঘর-সংসার ছেলেমেয়ে নিয়েই ব্যস্ত থাকে সে বেশি। জামিলের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়ে ওঠে না। পাপড়ি মনে করে এই বয়সে আর কী। তাই বিছানাও আলাদা। যদিও জামিল প্রতিদিনই নিয়ম করে বাড়ি ফেরে। তাই তাকে নিয়ে কখনো কোনো সন্দেহের কারণ খোঁজেনি পাপড়ি।
—ইদানীং অনন্ত নাকি বাড়ি এসে প্রায় তার মাকে কী সব বলত।
—অনন্তটা কে?
—হায় আল্লাহ! কোন জগতে থাকো? জামিলের ছেলে অনন্ত। এত ভালো ছেলে, ঢাকা ইউনিভার্সিতে চান্স পেল না। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়ে।
—ও হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আজকাল এতকিছু মনে রাখতে পারি না।
—কবেই বা তুমি কী মনে রেখেছ? আমি না থাকলে তোমার সংসার ভেসে যেত।
—তা ঠিক। আসিফ সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমর্পণ করে ফেলে। নইলে কথার মোড় ঘুরে যেত। শুরু হতো আরেক কাহিনি।
—ওই ছেলেই তো সব উদ্ধার করল।
—উদ্ধার করল মানে? কী উদ্ধার করল? চিরকালের নির্লিপ্ত আসিফের ভেতরে কে জানে কেন একটা অজানা তোলপাড় উঠল। কৌতূহলটা দমন করতে পারে না।
—সব কথা শুনলে তুমি সহ্য করতে পারবে না। তোমাকে তো কিছু বলিনি তোমার শরীরের কথা ভেবে। তা ঠিক আর যা-ই করুক তার শরীরের প্রতি কাকলীর খুব নজর। ছোটখাটো একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। তাঁর নজরদারিতে ছিলেন বলেই তিনি আবার চলে ফিরে বেড়াচ্ছেন। নইলে এতদিনে তাঁকেও বিছানা নিতে হতো।
—অনন্ত নাকি প্রায়ই দেখে গুলশানের এক ফ্ল্যাট তার বাবাকে যাতায়াত করতে। খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে তার বাবা চার বছর ধরে একটি মেয়েকে বিয়ে করে সেই ফ্ল্যাটে রেখেছে। সব শুনে টুনে পাপড়ি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনি। তাই সে নিজে সেই বাড়িতে গিয়েছে।
উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে আসিফ প্রায় উঠে দাঁড়িয়েছেন। —পাপড়ি গিয়ে কী দেখল?
—কী আর দেখবে? যা দেখার তা-ই দেখল। পাপড়িকে তো চেনোই। সেই মুহূর্তে হুড়হুড় করে টেনে ওদের মিরপুরের বাড়িতে নিয়ে এল জামিলকে। তারপর কত কাণ্ড! ছেলেমেয়েরা একরকম জোর করেই সমস্ত কিছু লিখিয়ে নিয়েছে পাপড়ির নামে। বউ ছেলেমেয়ের চাপে, লোকচক্ষুর ভয়ে জামিল ওই পথ থেকে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু এরপর থেকেই তো অসুস্থ হয়ে পড়ল। এক ছাদের নিচে ছিল ঠিকই, কিন্তু দুজন দুজনকে অবিশ্বাস করা ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না। এই অসুস্থতার মধ্যে জামিলের দিকে ফিরেও তাকাত না পাপড়ি। চাকরবাকর দিয়ে ঘরে খাবার পাঠিয়ে দিত। ছেলেমেয়েরাও কেউ কাছে যেত না তেমন।
কাকলীর মুখে এইসব শুনতে শুনতে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠেন আসিফ। এতকিছু হয়ে গেছে, অথচ তিনি কিছুই জানেন না। তিনি শুনেছিলেন ওদের বাড়িতে কী সব ঝামেলা চলছে। ছেলেমেয়েরা জায়গাজমি নিয়ে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিজেদের নামে লিখে নিতে চায়। এই সময় ভাইটি তাঁর অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওবাড়ি থেকে ক্লিনিকে কেউ তেমন একটা যেত না। যা কিছু দেখাশোনা জামিলের বন্ধুবান্ধবরাই করেছে। আজকাল এমন বন্ধুবান্ধব বড় একটা দেখা যায় না। সারাক্ষণ ভিড় করে থাকত তার বন্ধুরা। এইসব ভিড়ের ভেতরে ক্লিনিকে জামিলের কেবিনের বাইরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকত একটি অল্প বয়সের মেয়ে। শ্যামলা মায়াময় মুখটা। দুটো চোখে বেদনার জল টলমল করছে। জামিলের কাছে তার চাওয়াপাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু কিসের টানে সে ক্লিনিকে যায়?
দোতলা ফ্ল্যাটবাড়ি, ফুলের বাগান, সাজানো ঘরদোর গোছানো সংসার তো সব শেষ হয়ে গেছে তার এই লোকটির জন্য। কিন্তু তবু ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। তবু আসে ফিরে ফিরে। জামিলের জন্য তার মায়া হয়। সেও তো একরকম নিঃস্ব। একজন সর্বহারা মানুষ আরেকজন সর্বহারা মানুষকে সমবেদনা জানাতে আসে। জামিলের শেষ মুহূর্তে ক্লিনিকের দরজায় দাঁড়িয়ে এই মেয়েটিই একমাত্র ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। সে শব্দ বাতাসে মিশে একটা শোকের আবহ তৈরি করেছিল। আসিফ সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে মানুষের ভিড়ে মেয়েটিকে দেখার চেষ্ট করেছিল। জামিলের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা কাউকে নয়। সেই মায়ামাখানো মুখটা ভিড়ের ভেতরে একঝলক ভেসে উঠেছিল। ওদের কারো আসার সময় হয়নি জামিলকে শেষ বিদায় জানাতে। নিয়ম করে ক্লিনিকে গিয়ে তিনি ভাইকে দেখে আসতেন। সেসময় দেখতেন মেয়েটি একটা জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে আছে দূরে, যেন একটা ছায়া। কখনো কোনো কথা হয়নি। নীরবে তাকিয়ে থাকত কেবল।
কাকলী এসে বসেন চায়ের টেবিলে। বেতের আরাম কেদারা টাইপের সোফায় হেলান দেওয়া আসিফের চেহারাটা দেখে তাঁর বড় মায়া হয়। ঠাণ্ডা চায়ের কাপের সামনে বসে আছে দীর্ঘকায় ফর্সা মানুষটি। মাথার চুলে কাশফুল উড়ছে। বুলবুলিকে ডেকে আবার চা দিতে বলেন কাকলী। চা এলে দুজনে চুপচাপ চায়ে মনোযোগ দেন। আজ আর কোনো কথা বলার ইচ্ছে করে না তাঁদের। কী এক বিষণ্নতায় ছেয়ে আছে দুজনকে। সামনেই বসে আছেন কাকলী তবু মুখের দিকে তাকাতে সাহস পান না আসিফ। এই বয়সেও তাঁর বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় তির তির করে কাঁপতে থাকে।
কাকলী জিজ্ঞেস করেন, কী এত ভাবছ?
—কই না, কিছু না তো। আসিফের ভেতরে ভেতরে একটা অজানা ভয় ছটফট করতে থাকে।
ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনিরা অনেকদিন পর আসছে বলে বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে চুনকাম চলছে। বেলা বেড়েছে অনেকটা। লোকজন ডাকাডাকি করছে। কজকর্ম কাজের লোকে করলেও কাকলী হুইলচেয়ারে বসে নিজেই দেখাশোনা করেন। তাঁর শরীরের কথা চিন্তা করে আজ নিশ্চয়ই অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেবেন কাকলী সেই আয়োজনই চলছে।
আসিফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। তিনি আবার ডুবে যান ক্লিনিকের সেইসব ভিড়ের মধ্যে। ভিড়ের মধ্যে ভেসে ওঠা সেই নিষ্পাপ মুখটি। হবে হয়তো কোনো অসহায় পরিবারের মেয়ে। যেভাবেই হোক একটা সংসার তো পেয়েছিল মেয়েটি। লেখাপড়া যা-ই থাকুক না কেন, এ সমাজে একটা মেয়ের জন্যে সংসারের আশ্রয়ই হচ্ছে শেষ আশ্রয়। এই মুহূর্তে তাঁর মনে হয় তাকে খুঁজে দুটো কথা বলতে পারলে সে বোধহয় একটু সান্ত্বনা পেত। ওকে দেখেই কেন তাঁর বয়স ফুরিয়ে যাওয়ার কথা মনে হলো? আসলে তা নয়। তিনি এলোমেলো চিন্তা করছেন। সেসব চিন্তার একটাই সূত্র, দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। বয়স চলে যাচ্ছে। বয়স কোথায় যাচ্ছে? মৃত্যুর দিকে। সেই মৃত্যুর দিকেই ছুটছে সবাই। এমনিতেই বয়স যত বাড়ছে ততই ঘুমহীন একটা বাজে অসুখের শিকার হচ্ছেন তিনি। ডাক্তারের কথামতো ঘুমের ওষুধ খান বটে তবে গভীর ঘুম তাঁর কখনোই হয় না। হালকা ঘুমের মধ্যে তিনি অদ্ভুত আর বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেন। চোখের সামনে সারারাত একমাত্র ভাইয়ের মৃত্যুদৃশ্য ভেসে গেল। কখনো মায়ের মুখ, কখনো বাবার মুখ, কখনো বা আরো একটি মুখ ভেসে ওঠে তাঁর ভারী চোখের পাতায়, যে মুখটি এদের কেউ নয়। তার সঙ্গে আসিফের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ সম্পর্কের কাছে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেছেন। এই সম্পর্কের কাছে এলে তিনি ভুলে যান জীবন, সমাজ এমন কি কাকলীর কথা। জীবনে যে জায়গা থেকে তাঁর যত অতৃপ্তি তা যেন পূরণ হয়ে যায় এ সম্পর্কটির কাছে এলে। তখন তিনি একটা ঘোরের মধ্যে থাকেন। এভাবে কতগুলো বছর কেটেছে তিনি জানেন না। বছরের পর বছর তিনি নিভৃতে ঢুকেছেন এক নিদ্রাহীন জগতে। বিছানায় যেতে ভয় করে। লোকজন, আত্মীয়, বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়ে আসিফ নির্জন হয়ে যান।
ছেলেবেলার কথা বড় মনে পড়ে আসিফের। ছেলেবেলার কথা মনে হলেই তাঁর অন্নকল্পের কথা মনে পড়ে। আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টির দিনে গোলপাতার ঘরের বারান্দায় তারা চার ভাইবোন চালভাজা খাচ্ছে। মা একবাটি বকফুল ভেজে তাদের থালার সামনে ধরতেন। তা-ই দিয়ে তাদের ভাত খাওয়া হতো মহা আনন্দে। সে আনন্দ আসিফ সারা জীবন খুঁজে বেড়িয়েছেন। ইদানীং এই সম্পর্কের কাছেই তিনি সেই আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন। কারো কাছে বলা যায় না এসব কথা। এই বয়সে সমাজ-সংসার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সবার কাছে এমন বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন যে এসব প্রকাশ পাওয়াও অন্যায়। শুধু অন্যায় নয়, ঘোরতর অন্যায়। তবু এই সম্পর্কের কাছেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সুস্থ বোধ করেন। অথচ কোনো গোপন অসুখ ঢেকে রাখার মতো তাঁকে লুকিয়ে রাখতে হয় বুকের ভেতর অতি যত্নে। নইলে যে সমাজ টেকে না। ঘর টেকে না। কী আশ্চর্য এর নাম কি সংসার? এই কঠিন প্রশ্ন তাঁকে ক্লান্ত করে তোলে।
একই বিছানায় ঘুমান কাকলী আর আসিফ। কাকলী মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি নিজেই সেবা করেন তাঁর। একান্ত নির্ভরতায় কাকলী তাঁর বাহুর ওপরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। তখন ছেলেমেয়েরা আসে। শত কাজ ফেলে ছেলের বউরা আসে, আসে নাতি-নাতনিরা। খালি বাড়িটা ভরে ওঠে। কাকলীকে ঘিরে চলে নানা হইচই, আনন্দ। কেননা তখন কাকলী সবাইকে দেখে দেখে সুস্থ হয়ে য়ান। আসিফ তখন একা হয়ে যান। মেয়েরা মাকে ঘিরে থাকে। বাবার কাছে বড় একটা আসে না। না এলেই ভালো। তাদের শাড়ি গহনা আর সিরিয়ালের গল্প আরো কীসব জাগতিক গল্প শুনে শুনে তিনি ক্লান্ত হয়ে যান। দোতলার ঝুলবারান্দায় বসে থাকেন একা। ঠিক সেই সময়টাতে প্রাণ ব্যাকুল হয়ে ওঠে সেই সম্পর্কটির জন্য। অথচ কেউ কিছু জানতে পারে না। ভাগ্য ভালো বুকের ভেতর কী হয় তা কেউ দেখতে পায় না। দেখতে পেলে কীসব যে অনাসৃষ্টি হতো তার ঠিক নেই। না, কোথাও তিনি কোনো অনাসৃষ্টি করেননি। দক্ষ শিল্পীর মতো আসিফ সংসার তৈরি করেছেন। সবাইকে নিয়ে জড়িয়ে আছেন। সেখানে কোনো খুঁত রাখেননি। সবাইকে পথ দেখিয়েছেন। এই সময় তাঁর কেন জানি মনে হয়, তিনিই কেবল রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন। একমাত্র ভাইয়ের মৃত্যুদৃশ্য তাঁর দিনরাত্রি পাল্টে দিয়েছে। সবাইকে অপরিচিত মনে হয়। মনে হয় স্বার্থপর। সংসারে যাদের সঙ্গে আসিফের রক্তের সম্পর্ক তাদের কাউকেই তিনি চিনতে পারছেন না। কোনো বীজ রোপনের সাক্ষ্য নেই, সবাই নিজস্ব গতিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কেবল যে সম্পর্কটি তাঁর রক্তের নয়, আইনের নয়, দৃশ্যমানও নয়, তা-ই তাঁকে নাড়ি ধরে টানছে। এর কী ব্যাখ্যা তিনি ভেবে পান না।
হাতেগোনা দিন আর ক টাই বা আছে? সেই যে সকালে বাজার ফর্দের খাতায় লেখা শব্দগুলো—সেই শব্দগুলোর ভেতর আসিফ আবার ডুবে যান। ডুবতে ডুততে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছেন। তারপর নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম। এভাবে কতক্ষণ যে কেটে গেছে তা তিনি নিজেই জানেন না। চোখের পাতা দুটো পড়ে আছে নির্লিপ্ত।
—এই, এই শুনছ, এমন করছ কেন তুমি? কী হয়েছে তোমার?
আসিফ চোখ খুলে দেখেন কাকলী ঝুঁকে আছেন তাঁর মুখের ওপর।
—কই কিছু না তো।
—চোখ বন্ধ করে কী করছিলে?
—দেখছিলাম।
—চোখ বন্ধ করে দেখছিলে? আশ্চর্য! কী দেখছিলে?
—দেখছিলাম হাতেগোনা দিন আর ক টা আছে!
—মানে কী?
—মানে হচ্ছে সব ছেড়েছুড়ে তো একদিন চলে যেতে হবে।
—কী বলছ এসব? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? আমাকে একা ফেলে তুমি কোথায় চলে যেতে চাও? বলতে বলতে অত্যন্ত ছেলেমানুষের মতো কেঁদে ফেলেন কাকলী। কেঁদে কেঁদে ছেলেমেয়েদের টেলিফোন করতে শুরু করেন। তা দেখে হো হো করে হাসতে শুরু করেন। ওই হাসতে হাসতেই ব্যাপারটা ঘটে গেল।
হাসপাতালভরতি লোকের অনেক উত্সুক চোখের সামনে জ্ঞান ফিরল আসিফের। দম বন্ধ অবস্থায় আসিফ কার সঙ্গে কথা বলছিলেন? সেই জন্মের থেকে তিনি এই জীবনটার সঙ্গে আছেন। কতদিনের সখা। এই জীবনটাকে তাঁর ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের মতো মনে হয়। চাঁদটারই বা দোষ কী! তবে কি তিনি সেই ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের সঙ্গে কথা বলছিলেন? আর ক টা দিন! ঘোরের মধ্যে যোগ-বিয়োগ করছিলেন আসিফ। সেই ঘোরের মধ্যে শুনতে পান দূর থেকে ভেসে আসা একটা কণ্ঠস্বর। আসিফের মাথায় হাত রেখে বসে আছেন কাকলী। কিন্তু তিনি তাঁর অস্তিত্বও টের পান না। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে তৈরি হয় এক স্বপ্নবত্ দৃশ্য। তিনি ভারি আরাম বোধ করেন। গোপনে বেড়ে ওঠা সম্পর্কটি যেন তরল হতে হতে তাঁর রক্তকণায় মিশে যেতে থাকে। সেখানে তৈরি হয় এক নৈসর্গিক বাগান। ফুলের বাগান। ফুলে ফুলে প্রজাপতি উড়ছে। ভোরের রেললাইনে ঝুমঝুম করে গাড়ি চলে যাচ্ছে দূরে বহু দূরে। দূর থেকে কিছু মেঘ এসে ঢেকে দিয়ে যায় চাঁদ, আকাশ। বরফের গুঁড়োর মতো বৃষ্টি ঝরতে থাকে। সেই বৃষ্টির শব্দে তাঁর শরীর আবার সতেজ হয়ে ওঠে। অন্য জগতে বেঁচে থাকার অনন্ত ইচ্ছেরা তাঁর সমস্ত শরীর জুড়ে প্রবল ঝাঁকুনি দিতে থাকে। v