অনিশ্চয়তায় ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট

শেয়ার বিনিয়োগকারীদের বহুল প্রত্যাশিত ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট প্রণয়ন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। গেল বছরের শেষদিকে আইনটি সংসদে পাস করার পর্যায়ে চলে আসলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। সে সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, জাতীয় নির্বাচনের (৫ জানুয়ারি) পর পরবর্তী নতুন সরকার আইনটি পাস করবে। নির্বাচনের পর সাড়ে ৭ মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন সরকার আইনটি পাস করেনি। আগামী সংসদ অধিবেশনেও এটি উঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে জানা গেছে আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে। বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ (বিএসইসি) শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা এ আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরেই। অর্থনীতিবিদরাও কোম্পানির হিসাবায়নে স্বচ্ছতা আনার জন্য এ অ্যাক্টের গুরুত্বের কথা বলছেন। এর প্রেক্ষিতে সরকার আইন প্রণয়নে পদক্ষেপ নেয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর গেল বছরের শেষ দিকে পরিণত পর্যায়ে এসেও শেষ পর্যন্ত সেটি আলোর মুখ দেখেনি। সে সময় আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয় এবং তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইনের কিছু বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) ঘোর আপত্তি রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তারা এ খসড়া আইনের কিছু বিষয়ের সমালোচনা করেছেন। এদিকে আইনটির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আইনগত পর্যালোচনার জন্য ভেটিং ও তারপর কালক্ষেপণের আগেই গত সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তবে পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট-২০১৩ পাস করবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। অথচ এখনো এটি অনেকটাই ঝুলে গেছে। বর্তমানে এটি ভেটিং পর্যায়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। আগামী সংসদ অধিবেশনেও তা উঠার সম্ভাবনা খুব কম। এদিকে আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ৮ বছর আগে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া কিছুটা অগ্রসর হলেও পরবর্তীতে তা থেমে যায়। এবারও এ আইনটি পাস না হয়ে ঝুলে যাওয়ার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট দ্রুত পাস করা দরকার। অন্যথায় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ভুল হিসাব রক্ষণ, দুর্নীতি, অনিয়ম, বিনিয়োগকারীদের প্রতারণা এবং কর প্রশাসনের জন্য পৃথক হিসাব প্রস্তুত করার মতো ঘটনা বন্ধ হবে না। তারা বলছেন, দুর্বল আর্থিক রিপোর্টের কারণেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ আইন পাস করার ক্ষেত্রে আইসিএবি’র যে সব বিষয়ে আপত্তি রয়েছে সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান করেই আইন পাস করা প্রয়োজন। ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টের যে খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে তাতে তথ্য গোপন করে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক রিপোর্ট তৈরির অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল ও ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। যদি এই অপরাধে শাস্তির পরও কাউন্সিলের নির্দেশ অমান্য করে তাহলে প্রতিদিনের জন্য ৫ হাজার টাকা করে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কাউন্সিল থেকে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়ার পরও তা অমান্য করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। জরিমানার পরও অপরাধ অব্যাহত রাখলে প্রতিদিন আরও ২ হাজার টাকা করে জরিমানার বিধান থাকছে। গঠন হবে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট কাউন্সিল ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টের অধীনে একটি কাউন্সিল গঠন করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হবেন। অন্য সদস্যরা হবেন সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান, বীমা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) প্রেসিডেন্ট, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একজন অতিরিক্ত সচিব এবং আইসিএবি, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যাকাউন্টস ম্যানেজমেন্টের সদস্যরা। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের, সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন সঠিকভাবে প্রণয়ন, না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কাউন্সিল। কাউন্সিল নিরীক্ষকদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের দলিল, কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারবে। আর্থিক অপরাধের জন্য কোম্পানি ও অংশীদারিত্ব মালিকের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারবে। ঢাকায় হবে কাউন্সিলের প্রধান কার্যালয়। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টের বিধান অনুযায়ী এই কাউন্সিল গঠন করা হবে।