বিপদসীমার ওপরে তিস্তা ও সুরমা
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৪, ২২:৩৩
সারাদেশে গত তিন দিনের প্রায় একটানা বর্ষণে বিভিন্ন স্থানে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বহু গ্রাম-জনপদ প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সুনামগঞ্জের সুরমা নদী এবং সিলেটের সারিঘাটে গোয়াইন নদীর পানিও গতকাল সন্ধ্যায় বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও তথ্য কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিরুল হোসেন গতরাতে ইত্তেফাককে জানান, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি সতর্ক অবস্থার কাছাকাছি রয়েছে। আগামী ৫ দিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র এবং এসব নদ-নদীর শাখা-প্রশাখায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে আবহাওয়া বিভাগ আগামী ২০ আগস্ট পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়ে জানিয়েছে, এ সময়ে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে উপকূলীয় এলাকায় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সঙ্গে সঙ্গে আজ দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশেও বৃষ্টি হবে। দেশের উত্তর-পূর্বাংশে ৩ দিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে। ভারী বৃষ্টির আশংকায় সাগরে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফেনীর পরশুরামের দু’টি এলাকায় বাঁধ ভেঙে ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কক্সবাজারে নাফ নদীর পানি বিপদসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ১ হাজার পরিবার।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢলে গত দু’দিন থেকে আবার তিস্তা ফুলে ফেঁপে রাক্ষুসী রূপ ধারণ করেছে। তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার প্রায় ২৫ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের সবক’টি গেট খুলে দেয়া হয়েছে। পাউবো সূত্রগুলো জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে তিস্তায় পানি বাড়তে থাকে। মধ্যরাতে পানি বিপদসীমার প্রায় ৩০ সে.মি উপর দিয়ে প্রাহিত হয়। ফলে তিস্তা পাড়ের গ্রাম ও চর গ্রামগুলোর হাজার হাজার মানুষ হাঁটু থেকে কোমড় পানিতে আটকে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের সবক’টি গেট খুলে রাখা হলেও তিস্তা বেষ্টিত ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার অন্তত ১৫-২০টি গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক পরিবারের ১৫/২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
মহালছড়ি (খাগড়াছড়ি) সংবাদদাতা জানান, খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক-এর উপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চৌংড়াছড়ি মগপাড়া ও মহালছড়ি কলেজ এলাকায় খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কের ৩/৪ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে সদ্য রোপণকৃত ধানক্ষেত পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক কৃষক।
পরশুরাম সংবাদদাতা জানান, প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে ফেনীর পরশুরামের মুহুরী ও কহুয়া নদীর দুটি অংশ শ্রীপুর ও ঘনিয়া মোড়া অংশের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। এতে ফুলগাজী উপজেলার প্রায় ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গ্রামের মানুষ শুক্রবার সকাল থেকে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। পানিতে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক মহাসড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ফেনীর সাথে পরশুরাম ও ফুলগাজীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফুলগাজী থানা ক্যাম্পাসে পানি উঠায় রান্না করতে না পারায় বাহির থেকে খাবারের ব্যবস্থা করছে।
ফুলগাজী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আবুল হোসেন জানান, প্রবল বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে শুক্রবার রাতে মুহুরী নদীর উত্তর শ্রীপুর অংশের মেরামতকৃত বাঁধে ফাটল ধরে ভেঙ্গে যায়। শুক্রবার সকালে ফাটল স্থানে প্রায় ৫০ মিটার ভেঙ্গে গেলে নদীর পানি গ্রামে প্রবেশ করে। একই সময়ে কহুয়া নদীর ঘনিয়ামোড়া অংশেও বাঁধ ভেঙ্গে যায়। দুটি স্থান দিয়ে নদীর পানি প্রবেশ করায় ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের শ্রীপুর, উত্তর শ্রীপুর, দক্ষিণ শ্রীপুর, গোসাইপুর, শালধর, নিলক্ষী, বিজয়পুর, লাঙ্গলমোড়া, নাপিত কোনা, ঘনিয়ামোড়াসহ ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিতে ওই সকল গ্রামের অর্ধশতাধিক ঘরবাড়িতে পানি জমে গেছে। এছাড়া দুই শতাধিক মাছের খামার, পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। অভ্যন্তরীণ রাস্তা-ঘাট প্লাবিত হওয়ায় চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। বাঁধের ভাঙন ক্রমেই বড় আকার ধারণ করছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রমজান আলী জানান, উত্তর শ্রীপুর গ্রামের মুহুরী নদীর বাঁধের মেরামতকৃত অংশে পুনরায় ভাঙ্গন দেখা দেয়ায় পনি উন্নয়ন বোর্ড মেরামতের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বৃষ্টি বন্ধ না হলে মেরামত করা যাবে না বলে তিনি জানিয়েছে।