গাজা এখন ভূতুড়ে নগরী!
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৫
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। ইসরাইল গত ৮ জুলাই থেকে গাজায় ত্রিমুখী হামলা চালিয়েছে। এতে প্রায় দুই সহস্রাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে যাদের মধ্যে নিরাপরাধ নারী-শিশু তথা বেসামরিক নাগরিক রয়েছে। যারা মরে গেছে, তাদের হয়তো আর কোনদিন গাজায় আবার ইসরাইলি নৃশংসতা দেখতে হবে না। সহ্য করতে হবে না মৃত্যুযন্ত্রণা। কিন্তু যারা গুরুতর আহত হয়ে বেঁচে আছেন তাদের হয়তো জীবন যন্ত্রণা নিয়ে এই ধরায় দিন কাটাতে হবে। ভালভাবে বেঁচে থাকা মানুষগুলো হয়তো কোনোমনে পরিবার নিয়ে জীবন চালিয়ে যেতে হবে। কারণ তারা জীবন বাঁচতে যে বাড়িটি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সেই সুন্দর বাড়িটি এখন আর নেই। সেখানে কেবলই ধ্বংসস্তূপ। নেই বিদ্যুত্ ও পানি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী পাওয়াটাতো দুষ্করই বলা যেতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গাজায় এখন একটা ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে।
ইসরাইল গাজায় তাদের হামলার নাম দিয়েছে ‘অপারেশন প্রটেকটিভ এজ’। এর আগে ২০০৮-০৯ এবং ২০১২ সালেও ইসরাইলি হামলার শিকার হতে হয়েছে গাজাবাসীকে। ২০০৮-০৯ সালে হামলার স্থায়িত্ব ছিল ২২ দিন এবং ২০১২ সালে ছিল মাত্র ৮দিন। কিন্তু এবার ইতোমধ্যে ২২ দিন চলে গেছে। এখন পর্যন্ত স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কোনো সম্ভাবনা বা ছায়া দেখা যাচ্ছে না। তাই ইসরাইলি হামলা ভবিষ্যতে আরো যে দেখতে হবে সেটা খুব ভাল করেই জানেন গাজার বাসিন্দারা। কারণ এখনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণ গাজার নাগরিকরা দেখতে পাচ্ছেন না। গত সোমবার থেকে যুদ্ধবিরতি চলছে সেখানে। আজ সোমবার যুদ্ধবিরতি শেষ হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইল গাজায় হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ফিলিস্তিন।
যতো সব হতাহত: গাজায় যেসব বাসিন্দারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন তারা আবার ফিরতে শুরু করেছে। তবে বাড়িতে নয়, ধ্বংসস্তূপে। অনেকের চোখ হয়তো আটকে যাবে যখন দেখা যায়, বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেলেও শিশুরা তাদের প্রিয় খেলনাগুলো খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বৃদ্ধা তার হুইলচেয়ারটি খুঁজছেন। কারণ বেশিরভাগ নাগরিক পালিয়ে যাওয়ার জন্য ৫ মিনিটের বেশি সময় পাননি। যারা পালাতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা মৃত্যুর কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছেন।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজায় ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ২০১৫ জন। এর মধ্যে ১৯৪৮ জন ফিলিস্তিনের নাগরিক। ইসরাইলের পক্ষে হামাসের রকেট হামলায় মারা গেছে ৬৭ জন। এদের মধ্যে একজন থাইল্যান্ডের নাগরিক। দুইজন বেসামরিক নাগরিক। বাকি সব সৈন্য। ফিলিস্তিনদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক রয়েছে কমপক্ষে ১৪০২ জন। ৩২০ জনের পরিচয় জানা যায়নি। বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে ৪৫৬ জন শিশু। ২৩৭ জন নারী। বাকিরা পুরুষ। সশস্ত্র সদস্য রয়েছে ২২৬ জন। তবে নিহত এবং আহতদের তথ্য সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত কোনো তথ্য জানাতে পারেনি জাতিসংঘসহ কোনো মানবাধিকার সংস্থা। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের ম্যাথিয়াস বেহনক জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে ১৮ বছরের বেশি বয়সের নাগরিক বেশি। কিন্তু এর কারণ তিনি বলতে পারেননি। আল জাজিরা জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগের বয়স ২০ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। তবে নারী এবং শিশুদের বেশিরভাগের বয়স ১৫ বছরের নীচে। রক্ষা পায়নি ১০ দিন বয়সী এক শিশুও। তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন এইতান বুচম্যান জানিয়েছেন, তারা কমপক্ষে ২৫৩ হামাস সদস্য, ১৪৭ জন ইসলামি জেহাদি, বিভিন্ন সংগঠনের ৬৫ জন এবং ৬০৩ জন বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য যাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এই তথ্য সংক্রান্ত এই দাবি মেনে নিলে বেসামরিক নাগরিকদের নিহত হওয়ার সংখ্যা খুবই কম। আর এই তথ্য কোনো জাতিসংঘসহ কোনো মানবাধিকার সংস্থার তথ্যের মিল নেই। বরং বিস্তর ফারাক। আহত হয়েছে সাড়ে ১০ হাজার নাগিরক যাদের মধ্যে ২৮৭৭ জন শিশু রয়েছে। নিহতরা তো চলে গেছেন। কিন্তু আহতদের কী হবে? সমপ্রতি নরওয়ের ডাক্তার এরিক ফসে গাজার আল শিফা হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, গাজায় হামলায় ইসরাইল নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। গত ১৩ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে ডা. ফসে জানান, এই হামলায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী ডেন্স ইনার্ট মেথাল এক্সপ্লোসিভ (ডিআইএমই) ব্যবহার করেছে। এই রাসায়নিক অস্ত্রের আঘাতে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যায় যা কখনো চিকিত্সায় ভাল করা সম্ভব হয় না। যারা বেঁচে থাকেন এই ক্ষত নিয়ে তাদের ক্যান্সারের জীবাণু বহন করেই বেঁচে থাকতে হয়। তিনি জানান, এরকম অনেক রোগী এই হাসপাতালে এসেছেন এবং অনেকে ইতোমধ্যে মারাও গেছেন। এই অস্ত্রের আঘাতে চামলার উপরিভাগ পুড়ে কালো হয়ে যায় এবং অঙ্গের টিস্যুগুলো নষ্ট হয়ে যায়। হাড়গুলোর অবস্থা এমন হয় যে মনে হয় সেগুলো করাত দিয়ে কাটা হয়েছে। হাসপাতালের ডা. আইমান আল-শাহবানি বলেছেন, তারা অনেকের হাত পা কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। গাজার বর্তমান পরিস্থিতি যে খুব খারাপ এবং বেসামরিক নাগরিক হত্যা যে একটি শোকাবহ ঘটনা সেটি ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পর্যন্ত শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন। তবে তিনি এর দায় চাপিয়েছে হামাসের ওপর।
ধ্বংসের কারিগরের ধ্বংসলীলা: ইসরাইল গাজায় একরকম ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ইসরাইল সেনাবাহিনী অনেক সময় গাজায় তাদের অস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে। দেশটির এই ধ্বংসের খেলায় গাজায় নিজ বাড়ি ছেড়ে যেতে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন ৫ লাখ ২০ হাজার। জাতিসংঘের এক তথ্যে দেখা যায়, ১ কোটি ৫ লাখ লোক পানির অভাবে আছে। ১০ হাজার ৬৯০টি বাড়ি সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক ধ্বংস হয়ে গেছে। ১৪১টি স্কুল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় মোটেই বিদ্যুত্ নেই। যেসব এলাকায় বিদ্যুত্ আছে সেখানে দিন-রাত মাত্র ২ থেকে ৩ ঘন্টা বিদ্যুত্ পাওয়া যায়। ফিলিস্তিনের তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ১৫৫৬টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। ৮৪২৪টি বাড়ি আংশিক ধ্বংস হয়েছে। ২৪টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। স্কুল ধ্বংসের তালিকায় আছে ১৬৭টি যাতে ৯১০০ শিক্ষার্থী ক্ষতির শিকার হবে। ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এক লাখের বেশি শিক্ষার্থীর ওপর। ২০টি দাতব্য প্রতিষ্ঠানও রয়েছে ধ্বংসের তালিকায়। ইসরাইলি হামলায় মানুষ অন্যত্র চলে গেছে সাড়ে চার লাখ। ইসরাইলি সতর্ক সংকেতের কারণে বাড়ি ছেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার। আর বাড়ি ধ্বংস হওয়া ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ। পানির পাম্প এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক পর্যায়ে। ৮টি পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন স্টেশন ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। ১১৮টি মসজিদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। যার মধ্যে ৮১টি আংশিক ধ্বংস এবং ৩৭টি পুরোপুরি মাটির সাথে মিশে গেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। ১৫টি মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের তালিকার খাতায় উঠিয়ে দিয়েছে ইসরাইল। ব্যাংক এবং পোস্ট অফিসও বাদ যায়নি এই তালিকা থেকে। ৫২টি মাছ ধরার নৌকা ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী যাদের জীবন-যাপন করা এখন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। গাজায় হামলার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে বিস্ফোরক দ্রব্য গোলা। গাজায় ৬০ হাজার ১২৯টি গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধজাহাজ থেকে ১৫৬০টি, যুদ্ধবিমান থেকে ৬৯৯৩টি এবং ট্যাংক থেকে ৩৭৫৩১টি। বাকিগুলোর সঠিক হিসাব গত ২ আগষ্ট পর্যন্ত দিতে পারেনি ফিলিস্তিন। ইসরাইলের এইসব ধ্বংসলীলায় সর্বমোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৯০ মিলিয়ন বা ১৬৯ কোটি মার্কিন ডলারে। এর মধ্যে প্রত্যক্ষ ক্ষতির পরিমাণ ১২৯০ মিলিয়ন বা ১২৯ কোটি মার্কিন ডলার এবং পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩ শত মিলিয়ন বা ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। ইসরাইল জানিয়েছে, হামাসের পক্ষ থেকে হামাস ৩৩৫৬টি রকেট নিক্ষেপ করেছে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে। এর মধ্যে ইসরাইলি ভূখণ্ডে ২৩০৩টি রকেট আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে আবার ১১৬টি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এবং ৩৫৬টি সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়েছে। ৫৭৮টি রকেট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র আইরোন ডোম মিসাইল দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে। ৪৭৫টি রকেট পড়েছে গাজা ভূখণ্ডেই। ইসরাইল হামলায় কী পেল ইসরাইল এবং কীই বা পেল হামাস এই হিসাব-নিকাশ হয়তো আরো বহুদিন ধরে চলবে। কিন্তু এই হিসাবের মধ্যে গাজাবাসীর দুঃখ বাড়তে থাকবে চক্রবৃদ্ধি সুদের মতোই।