আজব যত পাঠাগার

মানুষের চিন্তাশীলতা, সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে আদি ও অকৃত্রিম- বইয়ের কোন বিকল্প নেই। এ কারণে লোকজনের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিজ্ঞজনেরা। কিন্তু মুশকিল হলো বইয়ের দাম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এক্ষেত্রে ভরসা পাবলিক লাইব্রেরিগুলো। কিন্তু সেখানে গিয়ে বই পড়ার সময় নেই অনেকেরই। বিষয়টি অনুধাবন করে পশ্চিমা বিশ্বে ইদানিং চালু হয়েছে অন্যরকম কিছু পাঠাগার যেগুলো মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছে দিতে পারে বই। সে রকম কিছু ‘আজব’ পাঠাগারের কথাই তুলে ধরা হলো— সী-বিচে পাঠাগার সাগর তীরে সাধারণত প্রচুর লোক সমাগম হয়ে থাকে। আনন্দ-ফুর্তির মাঝে বিশ্রামের সময়টুকুতে যদি তাদের হাতে বই ধরিয়ে দেয়া যায়, তাহলে তা পড়তে আগ্রহী হতে পারেন। এ বিষয়টি চিন্তা করে বুলগেরিয়ার বাসিন্দা হারম্যান কোম্পেরনাস আলবেনায় সাগর তীরে নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলেন ছোটখাট এক পাঠাগার, যাতে আছে আড়াই হাজারেরও বেশি বই। সকলেই যাতে পড়তে পারে, সেজন্য ১০ রকম ভাষার বই দিয়ে সাজানো হয়েছে এই ‘সার্ফ স্যান্ড লাইব্রেরি’। লোকজন এই লাইব্রেরির প্রতি যথেষ্ট আকৃষ্টও হচ্ছে। এখান থেকে বিনা পয়সায় বই নিয়ে আরামে শুয়ে শুয়ে তা পড়ার মজাই যে আলাদা। চিঠির বাক্সে! মানুষ এতই বই বিমুখ হয়ে পড়েছে যে তাদের বই পড়ায় আকৃষ্ট করতে শেষ পর্যন্ত বাড়ির সামনে ছোট্ট চিঠির বাক্সতেও কিনা ফ্রি বই সরবরাহ শুরু হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ৯টি দেশে গড়ে উঠেছে ৩শ’ থেকে ৪শ’টি এ রকম ‘পিচ্চি লাইব্রেরি’। গাধার পিঠে! ভেনিজুয়েলার পার্বত্য রাজ্য ত্রুজিলোতে ভ্যালে ডেল মম্বয় ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে ২০০৯ সালে চালু হয় এই ‘গাধার পিঠে পাঠাগার’ কার্যক্রম। অল্প সময়ের মধ্যে বাচ্চাদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এটি। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিশুদের হাতে বই পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে এর জুড়ি নেই। পাবলিক বাসে ব্রাজিলের একজন বাস ভাড়া সংগ্রাহক (বাস কালেক্টর) অ্যানটোনিও দ্য কনসিকাও তার অধীনস্থ পাবলিক বাসে গড়ে তুলেছিলেন ছোট্ট এক লাইব্রেরি। পাঠকরা যাতে বই পড়ে উপকৃত হন, সেজন্য সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে ১১ বছর আগে বাসে এই পাঠাগার তৈরির কাজে হাত দেন এই মহত্ ব্যক্তিটি। শুরুটা করেছিলেন একটা কার্ডবোর্ড বাক্স ভর্তি কিছু বই নিয়ে। বর্তমানে বাসে একদিকে একটি শেলফে রাখা থাকে বই। যাত্রীরা সেখান থেকে পছন্দমতো বই নিয়ে পড়েন। যাত্রীরা বই ফেরত দিল কিনা অ্যানটোনিও এখন আর সে ব্যাপারে মাথা ঘামান না। তার উদ্দেশ্য হলো বইগুলো আরও বেশি লোকে পড়ুক। অ্যানটোনিও’র স্বপ্ন সব পাবলিক বাসেই তার মতো পাঠাগার গড়ে উঠুক। ট্যাঙ্ক সদৃশ পাঠাগার আর্জেন্টিনার বিভিন্ন শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ট্যাঙ্ক সদৃশ আজব এক ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার। সংগ্রামী শিল্পী রাউল লেমসফ তৈরি করেছেন তার ‘ব্যাপক ধ্বংস ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র’ নাম দেয়া এই পাঠাগারটি। তবে এই অস্ত্র হচ্ছে অশান্তিকে ধ্বংস করার জন্য, বইয়ের অমৃত বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাকে শান্তির পথে ফিরিয়ে আনার জন্য। এই ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারে আছে ৯শ’রও বেশি বই। ফোন বুথেও! ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ওয়েস্টবুরি সাব মেনডিপের একটি পরিত্যক্ত ফোন বুথে গড়ে ওঠে আজব এই লাইব্রেরিটি। ব্রিটিশ টেলিকম কোম্পানি ফোন বুথটি তুলে নিতে চাইলে স্থানীয় লোকজনের প্রবল বাধার মুখে তা পারেনি। শহরের লোকেরা চাঁদা তুলে বই কিনে সাজান তাদের ‘ফোন বুথ পাঠাগার’। পরবর্তীতে পাঠকরাই হন এই লাইব্রেরির বইয়ের যোগানদাতা। বইয়ের আদলে পাঠাগার ভবন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস সিটিতে গড়ে উঠেছে বইয়ের চেহারার অদ্ভুত সুন্দর এই পাঠাগারটি। বই পড়ার প্রতি লোকজনকে আগ্রহী করে তুলতেই এটি করা। ক্যানসাস সিটিতে গেলে উইয়ানডট স্ট্রিট এবং বালটিমোর এভিনিউ’র মাঝে অবস্থিত বিশ্ব বিখ্যাত ২২টি বইয়ের আদলে গড়া এই পাঠাগারটি দেখে আসতে ভুলবেন না কিন্তু।