দুইটি সংস্থার তথ্য

প্রতিবছর ১৮ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়

প্রতি ৩০ মিনিটে দেশে পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে একজন শিশু। এই হিসাব অনুযায়ী দিন শেষে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫০ জনে। প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এদের বয়স এক থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। মূলত ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। পরিবারের অসচেতনতা ও শিশুদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে এ ধরনের মৃত্যু ঘটছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। আশংকার কথা হচ্ছে, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার ক্রমাগত বাড়ছে। বেসরকারি পর্যায়ে কিছু প্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবে এই ব্যাপক সংখ্যক শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করলেও সরকারি পর্যায়ে নেই তেমন কোন উদ্যোগ। গতকাল রবিবার কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে পানিতে ডুবে মারা যায় শাহাদাত হোসেন (১৭)। বেলা ১১টায় উপজেলার চামড়া বন্দর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরে, দুপুর দেড়টার দিকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। শাহাদাত নোয়াখালী জেলার নূর হোসেনের ছেলে। সে বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে এসে ধনু নদীতে গোছল করতে নেমে মারা যায়। একই দিনে সিলেটে পানিতে মৃত্যু হয়েছে নাজিম উদ্দিনের (১২)। রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রাতারগুল জলার বনে সাঁতার কাটতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটে। সে জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুলের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র ও সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার উমনপুনর গ্রামের উসমান আলীর ছেলে। ১৫ আগস্ট দুপুরে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার সীমান্তবর্তী ভবানীপুর পুকুরে ডুবে প্রান্ত সরকার নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। প্রান্ত কালীবাড়ি মহল্লার যতন সরকারের ছেলে। বাড্ডায় পুকুরে পড়ে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। ঘরের পাশেই প্লাস্টিকের বল নিয়ে খেলার সময় হঠাত্ বলটি পুকুরের পানিতে পড়ে যায়। বল তুলতে গিয়ে প্রথমে পুকুরে নামে দশ বছরের মীম। পানির গভীরতা বেশি থাকায় মীমকে ডুবে যেতে দেখে তাকে উদ্ধারের জন্য দ্রুত পুকুরে নামে তারই মামাতো বোন সাত বছরের যুথী। এসময় তারা দুজনেই পানিতে তলিয়ে যায়। ৩ আগস্ট দুপুরে মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে বাড্ডা থানাধীন বেরাইদের ডগারদিয়া এলাকার ওস্তাকার বাড়িতে। শাহাদাত, নাজিম উদ্দিন, প্রান্ত ও মীম-যুথীর মতো এমন অসংখ্য শিশু প্রতিবছর পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে থাকে। ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার-বাংলাদেশ (আইডিআরসি-বি) ও বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে (বিএইচআইএস) এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে ২২ হাজার মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১৮ হাজারই শিশু। সবচেয়ে বেশি পানিতে ডুবে মারা যায় ৫ বছর বযসী শিশু। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৭ বছরের কম বয়সী ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রতিবছর ১৮ হাজারেরও বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। যা প্রতিদিন গড় হিসেবে দাঁড়ায় ৫০ জনে। এশিয়া মহাদেশে প্রতিবছর ৩ লাখ ৫০ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। বেশির ভাগ পানিতে ডোবার ঘটনা ঘটছে পুকুর, খাল এবং নদীতে। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে কোন ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। তবে বেসরকারি ভাবে কিছু প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু বাড়ার কারণ হিসেবে জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি, বাড়ির চারপাশে ছোট-বড় গর্ত এবং বন্যাকে দায়ী করে বলেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে প্রথমত দরকার অভিভাবকের সচেতনতা। পাশাপাশি শিশুদের সাঁতার শেখার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। বাড়ির আশেপাশে শিশুর নাগালের কাছে ডোবা বা পুকুর থাকলে তার চারপাশে বেড়া দেয়া প্রয়োজন। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১৭ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এ সংখ্যা বিশ্বের সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভের (বিএইচআইএস) গবেষণায় বলা হয়েছে, এক থেকে চার বছরের শিশুরাই এর সবচেয়ে বড় শিকার। সমীক্ষায় দেখা গেছে, এক থেকে ১৭ বছরের শিশুদের মধ্যে অন্য যে কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যৃর চেয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যা মোট শিশু মৃত্যুর ২৮ ভাগ। ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মঞ্জুর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, শিশু ডুবে গেলে পানি প্রথমত শিশুর ফুসফুসে চলে যায় এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। যার কারণে শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হয় ফলে শিশু দ্রুত মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। আর যদি পানিতে ডোবা শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তাহলে শিশুর পেটের পানি বের করে আনতে শিশুকে উপর করে শুইয়ে দিয়ে পিঠে চাপ দিতে হবে। শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে মুখে মুখ দিয়ে শ্বাস দিতে হবে। পানি থেকে শিশুকে উদ্ধার করার পর, শিশু কি ধরনের পানিতে ডুবেছিল তা জেনে সে অনুযায়ী পরবর্তী চিকিত্সা দিতে হবে। নোংরা পানিতে পড়লে ইনফেকশনের ভয় থাকে, সে অনুযায়ী চিকিত্সা দিতে হবে। আর যদি শিশু সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে ডোবে তাহলে শিশুর শরীরে লবণের পরিমাণ বেড়ে যায় তখন শিশুর খিচুনি ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে শিশুকে যতদ্রুত সম্ভব চিকিত্সা কেন্দ্রে নেয়া উচিত।