নিরাপত্তাহীনতায় রাবি শিক্ষার্থীরা
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:৪২
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা নেই শিক্ষার্থীদের। ছিনতাই, চাঁদাবাজির শিকার হওয়া ছাড়াও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দ্বারা নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের।
সম্প্রতি হঠাত্ করেই বেড়ে চলেছে শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা। গত ছয় দিনে তিন শিক্ষার্থীকে মারধর করেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এরা হলেন- অর্থনীতি বিভাগের কামরুজ্জান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মেহেদী হাসান ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেখার শাহরিয়ার। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মারধরসহ বিভিন্নভাবে অত্যাচারের শিকার হলেও রহস্যজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঈদের ছুটি শেষে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর গত ৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের টুকিটাকি চত্বরে কামরুল হাসান নামের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়। এক ছাত্রলীগ নেতার পায়ের সঙ্গে পা লাগায় তাকে মারধর করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কৃষি উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক রাসেল মাহমুদ ও ছাত্রলীগ কর্মী বনি। ছাত্রলীগের বেদম প্রহারে আহত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় কামরুলকে।
গত ১২ আগস্ট ছাত্রলীগের হাতে মারধরের শিকার হন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান ফটকের সামনে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে তাকে মারধর করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক কাজী আমিনুল ইসলাম লিঙ্কনসহ কয়েকজন নেতাকর্মী।
এই ঘটনার একদিন পরেই গত ১৪ এপ্রিল আবারো বিশ্ববিদ্যালয়ের টুকিটাকি চত্বরে মারধরের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ইফতেখার শাহরিয়ার নামের আর এক শিক্ষার্থী। একজন ছাত্রীকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মানব সম্পদ উন্নয়ন বিষয় সম্পাদক সাবরুন জামিল সুষ্ময় ও ছাত্রলীগ কর্মী আবু খায়ের মোস্তফা ওরফে রিনেট এবং হিরোক। শাহরিয়ার গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
ওয়াকিবহাল সূত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে রিনেট ও হিরোক ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। গত বছর ১লা জুন বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুরে ছাত্রদল আয়োজিত অনুষ্ঠানে রিনেটকে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব, রাজশাহী মহানগর সভাপতি, সাবেক মেয়র ও সাংসদ মিজানুর রহমান মিনুর হাত থেকে ফুল নিতে দেখা যায়। এ সময়ে তিনি মিজানুর রহমান মিনুর হাত ধরে ছাত্রদলে থাকার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন বলে জানা যায়। অথচ গত কয়েক মাসে তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নামে চাঁদার দাবিতে ক্যাম্পাসে অনেক শিক্ষার্থীকে মারপিটের অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে হিরোক ছিলেন রাবি ছাত্রদলের বিগত আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পাপনের সহযোগী। গত বছরের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর হিরোক ছাত্রদলের হয়ে জিয়া হলের ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের হুমকি-ধামকি দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ গত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর হিরোক রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানার কর্মী হয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক হলে আশ্রয় নিয়ে অপকর্ম শুরু করেন বলে জানা যায়। রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা জানান, রিনেট ও হিরোকের ছাত্রদল করার বিষয়টি আমরা আগে জানতে পারিনি। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।
তবে শাহরিয়ারের বাবা আব্দুস সালেক সিরাজগঞ্জের জেলা জজ হওয়ায় এই ঘটনায় ছাত্রলীগ কর্মী রিনেট ও হিরোককে গতকালই আটক করে পুলিশ। তারা এখন মতিহার থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ছয় দিনে যে তিন শিক্ষার্থী মারধরের শিকার হয়েছেন তাদের কেউ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী হওয়ায় অন্যায়ভাবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের মারধর করলেও কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি। রহস্যজনকভাবে বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব রয়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও জানান তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এম আহসান কবির বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয়। যদিও তাদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আমাদের তথা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
বিশ্ববিদ্যালয় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সোহরাব হোসেন বলেন, ‘যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করেন তারা সরকার তথা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মদদপুষ্ট। এ কারণে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হাতে শিক্ষার্থী মারধরের শিকার হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও একাডেমিক ব্যবস্থা না নেয়ায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি আয়তুল্লাহ খোমেনী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশাসন ওইসব সন্ত্রাসীদেরকেই বেশি নিরাপত্তা দেয়ার কারণে তারা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধরের বিষয়টি বিভিন্নভাবে জানলেও তাদের থেকে কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় আমরা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। শিক্ষার্থীরা যদি লিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ করে তাহলে অবশ্যই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ আল হোসেন তুহিন বলেন, ছাত্রলীগ এ সমস্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। ছাত্রদল-ছাত্রশিবির কর্মীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপ্রবেশকারীরা এবং কোনো কোনো সময় সাধারণ ছাত্ররাও ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে ক্যাম্পাসে এ সমস্ত বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা বলেন, এসব ঘটনায় কেবল সাধারণ শিক্ষার্থীরাই নয়, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরাও আতংকিত। রাত ৯টার পর ভয়ে কেউ ক্যাম্পাসে বের হতে পারছে না।