ঐতিহ্য ফিরে পাচ্ছে না ঢাকা কলেজ
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২৩:১২
একটা সময় ছিলো যখন সেরা কলেজ মানেই ঢাকা কলেজকে ধরা হতো। শুধু সেরা নয়, এই কলেজের সাথে প্রতিযোগিতা করার মতোও তেমন কোন কলেজ ছিলো না। গ্রেডিং পদ্ধতি শুরুর আগে মেধা তালিকার অর্ধেকেরও বেশি দখল করে রাখতো এই কলেজটির শিক্ষার্থীরা। তবে গত কয়েক বছরে মেধা তালিকায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে ঢাকা কলেজ।
সবার পছন্দের তালিকার শীর্ষে ছিলো এই কলেজটি। ৯২ থেকে ৯৬ এই চার বছরে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়সহ প্রত্যেক বছরই সেরা ২০ শিক্ষার্থীর মধ্যে বেশিরভাগই থাকতো ঢাকা কলেজের ছাত্র। গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশ শুরু হয় ২০০৩ সাল থেকে। তখনও ঢাকা কলেজ ও নটরডেমই পর্যায়ক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকতো। এসব কারণে মেধাবীরা ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতো।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের ফলে ঢাকা কলেজের ফলাফল নিম্নগামী হতে থাকে। হারাতে থাকে ফলাফলের ঐতিহ্য। গত পাঁচ বছরের ফলাফলে মেধা তালিকার দৌড় থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়েছে ঢাকা কলেজ। গত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৯ সালে সেরা ১০ এর তালিকায় ঢাকা কলেজ ৯ম স্থান দখল করে। ২০১১ সালে সেরা ১০ এর মধ্যে জায়গা হয়নি কলেজটির। ১৮তম স্থানে চলে যায় কলেজটি। এছাড়া ২০১২ সালে ১৫তম, ২০১৩ সালে ১০ম স্থানে এবং এবছর ঢাকা কলেজের অবস্থান ১৮তম। এবার ঢাকা কলেজ থেকে ১০৯৩ জন ছাত্র এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ১০৭৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৩৯ জন।
ঢাকা কলেজ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে ঢাকা কলেজ অন্যতম সুপ্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি ইংলিশ স্কুল হিসাবে। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৩৫ সালের ১৫ জুলাই ঢাকায় এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। স্কুলটির নাম ছিল ইংলিশ মিশনারি স্কুল। দেশবাসীর মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ঢাকার তদানীন্তন সিভিল সার্জন ড. জেমস্ টেইলর ও ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. গ্রান্ডের সহযোগিতায় গঠিত জনশিক্ষা কমিটি এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলো।
১৮৪১ সালে ইংলিশ মিশনারি স্কুলটি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং তখন এর নাম পরিবর্তন করে ‘ঢাকা কলেজ’ নামকরণ করা হয়। কলকাতার বিশপ রেভারেন্ড ড্যানিয়েল ১৮৪১ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকা কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে সদরঘাটে নির্মিত হয়েছিলো ঢাকা কলেজের প্রথম ক্যাম্পাস। কর্নেল গ্যাসর্টিন ঢাকা কলেজ ভবনের নকশা তৈরি করেছিলেন। ১৮৪১ সালে ভবনটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। ঢাকা কলেজের যেমন ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে, তেমনি উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলেরও ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু এখন ফলাফলের ঐতিহ্য হারাতে শুরু করেছে প্রাচীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।
কেন এই বিপর্যয়
ঢাকা কলেজের বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক কারণ। শিক্ষকরা যেমন রাজনৈতিক বিবেচনায় এখানে বদলি হয়ে আসেন। তেমনি শিক্ষার্থীও ভর্তি হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। এসএসসির ফল অনুযায়ী ভর্তির যোগ্য নয় এমন অনেক শিক্ষার্থীও রাজনৈতিক বিবেচনায় ভর্তির সুযোগ পায়। শুধু তাই নয়, লেখাপড়ার চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নেই শিক্ষার্থীদের সময় বেশি ব্যয় হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা কলেজে শিক্ষাদানের জন্য নয়, ঢাকায় থাকার জন্য রাজনৈতিক বিবেচনায়, নানা কৌশল অবলম্বন করে বদলি হয়ে আসেন শিক্ষকরা। এ কারণে পদ অনুযায়ী শিক্ষক সংখ্যা বেশি হলেও ভালো ফলাফল করতে ভূমিকা রাখতে পারছেন না শিক্ষকরা।
ভালো ফলাফল করতে না পারা সম্পর্কে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আয়শা বেগম বলেন, এটি একটি প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে ভালো ফলাফল করবে এটা ঠিক নয়। তবে আমরা ভালো করার চেষ্টা করছি। শিক্ষকদের নিয়ে আলাদা কমিটি গঠন করেছি। তারা ছাত্রদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভালো ফলাফল করতে সহায়তা করবে।
মেধাবীরা ভর্তি হতে চায় না
এক সময় শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের কলেজ ছিলো ঢাকা কলেজ। দেশের প্রাচীনতম কলেজ হিসাবে যেমন পরিচিতি ছিলো, তেমনি ফলাফলে সুনাম অর্জন করেছিলো ঢাকা কলেজ। মেধাবীদের কলেজ নামেই পরিচিত ছিল এটি। কিন্তু ঢাকা কলেজে এখন আর মেধাবীরা ভর্তির জন্য ভিড় করে না।
রফিকুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীর বক্তব্য, রাজনৈতিক নানা অস্থিরতা রয়েছে ঢাকা কলেজে। রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে কলেজটিতে। একারণে বাবা-মা এখন আর সন্তানদের ঢাকা কলেজে ভর্তি করাতে চান না। আমিরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, ঢাকায় ভালো মানের কলেজের অভাব রয়েছে। এক সময় ঢাকা কলেজের সুনাম ছিলো। ঢাকা কলেজের ফলাফল মেধাতালিকায় জায়গা করে নিতো। এখন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করে না। ভালো কলেজ না থাকায় আমার মতো অনেকেই বাধ্য হয়ে সন্তানকে ঢাকা কলেজে ভর্তি করাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন ঢাকা কলেজে যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তি হন, নানা কারণে তারাও খারাপ ফলাফল করে। অনেক সময় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করতে তারা বাধ্য হয়। এ কারণে লেখাপড়ারও ক্ষতি হয়।