লজ্জার সঙ্গী সমালোচনা

ওভালের গ্যালারিগুলো ততক্ষণে ফাঁকা হয়ে গেছে। টেস্ট ম্যাচকে কেন্দ্র করে আশেপাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী খাবারের দোকানগুলোর গোছ-গাছও হয়ে গেছে। দর্শকরা সবাই হাঁটছেন স্টেশনের দিকে। এবার বাড়ি ফেরার পালা। আজ পরিবারের সাথে একটু আগেই দেখা হবে। ৫৮ থেকে ১০৫ ইউরোর টিকেট কিনে তাদের প্রাপ্তি তো এটুকুই! ঠিক এমন একটা সময় ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে হাজির হলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত ১৭টি টেস্ট ম্যাচের ১৩টি হারের বিপরীতে জয় মাত্র একটি। চেহারাটা কতটা বিষণ্ন হতে পারে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। অনুমেয় ভাবেই তাকে অধিনায়কত্ব নিয়েই বেশি কথা বলতে হল। এখানেই বের হয়ে আসলো অধিনায়কের আসল রূপ। স্বভাবসুলভ চাঞ্চল্য রেখেই উত্তরটা দিলেন, ‘আপনাদের কিছুটা অপেক্ষা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। ২০১১ সালেও আমি ঠিক এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমি এখনও শক্ত আছি। যেদিন সেটা হারিয়ে ফেলবো তাহলে সবার আগে আপনিই জানবেন।’ তবে, ধোনির এই কথায় কি আর চিড়ে ভিজে! ভারতীয় সাবেকদের সমালোচনার তীরটা বেশ তীব্র আকারেই সহ্য করতে হচ্ছে দলটিকে। সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান সুনীল গাভাস্কার তো ভারতকে আর টেস্ট না খেলার জন্যই পরামর্শ দিলেন, ‘খেলোয়াড়রা না চাইলে তাদের টেস্ট ছেড়ে দেয়াই উত্তম। সেক্ষেত্রে শুধু সীমিত ওভারের ক্রিকেট খেলাই ভাল। সবসময় এমন লজ্জা আমরা চাই না। আরেক সাবেক ক্রিকেটার রবিশাস্ত্রী অবশ্য এতোট কথার মধ্যেই গেলেন না। ‘করুণ পরিণতি!’ — তার স্রেফ এই একটা কথাতেই ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থাটা সামনে চলে আসলো। সাবেক খেলোয়াড়দের এমন বিস্ফোরক বক্তব্য এখানেই শেষ নয়। সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী সাফ বলে দিলেন, ‘ঈশ্বরের জন্য হলেও আমাদের ছেড়ে দাও। আর যাই হোক আমরা টেস্ট খেলুড়ে দল। প্রতিবার এমন লজ্জায় ডুবতে নিশ্চয়ই আমরা টেস্ট খেলতে আসি না।’ কোচ ডানকান ফ্লেচারকেও উঠতে হচ্ছে সমালোচনার কাঠগড়ায়। সাবেক অধিনায়ক অজিত ওয়াদেকার তার প্রসঙ্গে বলেন, ‘লর্ডসে বাজে একটা পিচেও আমরা টেস্ট জিতে গেলাম। এরপর ফ্লেচার কি করলেন? কিচ্ছু না! সিরিজে এগিয়ে গিয়েও আমরা এমন বাজেভাবে হারলাম। তার বিদায়ের সময় চলে এসেছে।’ সবচেয়ে বেশি সমালোচনাটা ধোনিকে সহ্য করতে হলেও সিরিজে ভারতের একমাত্র প্রাপ্তি এই অধিনায়কের কল্যাণেই এসেছে। এই সিরিজে তার ডিসমিসাল সংখ্যা ১৭টি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক সিরিজে ভারতের কোনো উইকেটকিপারের সর্বোচ্চ ডিসমিসাল এটা। তবে, এটা নিশ্চিত এই অর্জন নয়, বরং লজ্জার জন্যই সিরিজটা অনেকদিন মনে রাখবেন দুই ফরম্যাটে ভারতের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ী এই অধিনায়ক! ভারতের ইংলিশ-লজ্জা ৭ ইনিংস ও ২০০ বা তার বেশি ব্যবধানে হারা ভারতের টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা। এর মধ্যে চারটিই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ওভালে ইনিংস ও ২৪৪ রানের হারটি ভারতের তৃতীয় বড় পরাজয়। এর চেয়ে বড় ব্যবধানে এর আগে মাত্র দু’বারই হারে ভারত। সেটা ছিল ১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ড ও ১৯৫৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ০০০ ৩৬ ভারত টানা তিনটি টেস্ট সিরিজ হারে ৩৬ বছর আগে। আট মাসের মধ্যে ভারত দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হারল। সবশেষ তারা টানা তিনটি সিরিজ হারে ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে। পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সেবারও ইংল্যান্ডের কাছে হারে ভারত। ০০০০ ২৬ ভারতের এক ইনিংসে ১০০ বা তার নিচে অলআউট হওয়ার মোট সংখ্যা ২৬। ২০০৮ সালের এপ্রিলে আহমেদাবাদে দক্ষিণ আফ্রিকার সবশেষ এই লজ্জায় পুড়ে ভারত। ১০০ রানের নিচে অলআউট হওয়া কোনো টেস্ট ভারত জিততে পারেনি। ০০০ ১৩৪ এই সিরিজে বিরাট কোহলির রান। কমপক্ষে ১০টি ইনিংস খেলা শীর্ষ চার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এটা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন সংগ্রহ। লজ্জার এই রেকর্ডটি একজন ভারতীয়রই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৯৪৭-৪৮-এ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০০ রান সংগ্রহ করেছিলেন চান্দু সারওয়াতে। ০০০ ২২.২ এই সিরিজে চেতেশ্বর পূজারার ব্যাটিং গড়। ইংল্যান্ডে কোনো টেস্ট সিরিজে কমপক্ষে ৫টি ইনিংস খেলা ভারতের তিন নম্বর ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বাজে গড় এটা। ০০০০ ৯৭.১২ ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যান জো রুটের গড়। এই বছরে ৭৭৭ রান সংগ্রহ করেন তিনি। এর মধ্যে ভারতের বিপক্ষে ৫ টেস্টে করেন ৫১৮ রান। সিরিজের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও তিনিই। ০০০০ ৭৮ প্রথম দুই টেস্টে পিছিয়ে থাকার পর ৫ ম্যাচের সিরিজে শেষ তিনটি টেস্ট জয়ের আগের নজিরটি আটাত্তর বছর আগের। ১৯৩৬ সালের অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে এগিয়েছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু সিরিজে ৮১০ রান করা ডন ব্র্যাডম্যান সব হিসাব উল্টে দেন। ৩-২-এ সিরিজ জেতে অস্ট্রেলিয়া। ০০০০ ৫ এক সিরিজে পাঁচবার ২০০ রানের নিচে অলআউট—এই নিয়ে পাঁচটি সিরিজে এমন বাজেভাবে হারলো ভারত। সর্বশেষ ১৯৭৬-৭৭-এ এমন হয়েছিল ভারতের, সেটিও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আর ১৯৫৯ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক সিরিজে ৭ বার ২০০ রানের নিচে অলআউট হয় ভারত। ০০০০ ১৭৭ এই সিরিজে অতিরিক্ত থেকে পাওয়া ভারতের রান। রবীন্দ্র জাদেজাও সিরিজে ঠিক এই রানই সংগ্রহ করেন। ভারতের কিছু টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যানের সংগ্রহ এর চেয়েও কম। কোহলি করেন ১৩৪ রান, শিখর ধাওয়ানের সংগ্রহ ১২২ রান। ০০০০ ২৯.২ ওভালে দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের মুখোমুখি হওয়া ওভারের সংখ্যা। গত ৬ বছরে ভারতের সবচেয়ে কম ওভারে অলআউট হওয়ার নজির এটি। এর চেয়ে কম ওভারে ভারতের অলআউট হওয়ার নজির আছে ৬বার। সবচেয়ে বাজেটি লর্ডসে ১৯৭৪ সালে। সেই টেস্টে ভারত ১৭ ওভারে ৪২ রানে অলআউট হয়েছিল।