উত্তরবঙ্গের নববধূদের ভাদরকাটানি উত্সব

পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তিনদিনের ভাদরকাটানি উত্সব শেষ হয়েছে গতকাল সোমবার। এখন নববধূরা ফিরছে আবার স্বামীর বাড়িতে। অনেকে এখনো বাপের বাড়িতে। হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা ভারতীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী সোমবার থেকে ভাদ্র মাস শুরু হওয়ায় ভাদরকাটানি উত্সব শুরু করেছে। শ্রাবণের শেষদিনের সূর্যাস্তের আগেই নববধূরা হাজির হয় বাবার বাড়িতে। পহেলা ভাদ্রের প্রথম দিন সূর্য ওঠার পর শ্বশুরবাড়িতে স্বামীর মুখ দেখলে তার চোখ অন্ধ হয়ে যাবে, স্বামীর অমঙ্গল হবে এমন সামাজিক অন্ধবিশ্বাসে পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন উপজেলার সহস্রাধিক নববধূ পিত্রালয়ে ফিরে আসে। সেখানে ৩ দিন অবস্থানশেষে তারা আবার স্বামীর বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। গত বছরের আশ্বিন মাস থেকে শ্রাবণের শেষদিন পর্যন্ত যে সকল মেয়ের বিয়ে হয়েছে কেবলমাত্র তারাই এই উত্সব পালন করে থাকে। এখনো ভাদ্র মাসে এই অঞ্চলে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দেন না অভিভাবকরা। অনেকের মতে তা কুসংস্কার হলেও পঞ্চগড়সহ উত্তরবঙ্গের অনেক জেলায় এই সংস্কৃতি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। পঞ্চগড় জেলা সদরের বলেয়াপাড়া গ্রামের কছিমউদ্দিনের মেয়ে শেফালী আক্তারের বিয়ে হয়েছে ৫ মাস আগে। স্বামীর বাড়ি পার্শ্ববর্তী হাফিজাবাদ ইউনিয়নে। শ্রাবণের শেষদিনে শুক্রবার বিকালে বাবার বাড়ি আসার পর গতকাল সোমবার বিকালে তিনি আবারো স্বামীর বাড়ি ফিরে গেছেন। রেলস্টেশন এলাকার ঘাটিয়ারপাড়া গ্রামের ফুলবানু ধাক্কামারা ইউনিয়নের খানপুকুর গ্রামের মোজাম্মেলের স্ত্রী আয়শা আক্তারও গতকাল স্বামীর বাড়িতে ফিরে এসেছেন। পঞ্চগড় জেলাসহ উত্তরের জেলায় কবে থেকে ভাদরকাটানি উত্সব শুরু হয়েছিল এই প্রশ্নের উত্তর অজানা। জানা গেছে, ইংরেজ শাসনামল থেকেই এই অঞ্চলে এর প্রচলন শুরু হয়। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বংশপরম্পরায় ভাদরকাটানি উত্সব পালন করে থাকে। মুসলমানদের মধ্যেও এর প্রচলন হয়। তখন থেকে রটে যায় যে, ভাদ্রের প্রথম তিনদিন স্বামীর মুখ দেখলে তার চোখ অন্ধ ও অমঙ্গল হবে। গত এক বছরে যেসব মেয়ের বিয়ে হয়েছে তারা সবাই ফিরছে বাপের বাড়িতে। নববধূ বাপের বাড়ি যাবে এ নিয়ে ধুম পড়ে যায় শ্বশুরবাড়িতে। বৌমা যেন বাড়ি গিয়ে তার বাবা-মাকে বলতে না পারে তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন চিমঠা বা কঞ্জুস। তাই সাধ্যমত বাড়িতে পিঠা-পুলি বানিয়ে, সাথে ক্ষীর আর মুড়ি দিয়ে পাঠায় বৌমার বাড়িতে। অনেকে ঘটা করে কয়েকটি ভ্যান সাজিয়ে ১৫/২০ জনকে সাথে দিয়ে নতুন বৌকে পাঠায় বাপের বাড়িতে। দিন বদলের সাথে সাথে ভাদরকাটানির ভিন্নতাও বাড়ছে। আগে নববধূরা বাবার বাড়িতে আসত গরুর গাড়িতে। আর গত কয়েক বছর থেকে তারা আসছিল ভ্যানে চড়ে। এখন সেদিনও পুরনো। হাতের কাছে পাওয়া অটোরিকশা, থ্রি-হুইলার আর মাইক্রোবাসে করেই নববধূরা আসছে বাপের বাড়িতে। মেহমান নিয়ে মেয়ে বাড়িতে আসছে। তাই এনিয়ে খাতির-যত্ন করতে কমতি নেই। পিতার বাড়িতে বড় মাছ আর বড় মোরগ তৈরি রাখা হয়েছিল মেয়ের জন্য। এভাবে গ্রামে গ্রামে উত্সবের আমেজ। সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, আবহমান গ্রামবাংলার চিরায়ত উত্সবের মতো স্বামীর মঙ্গল কামনায় নীলফামারী জেলায় শুরু হয়েছে ভাদরকাটা উত্সব। প্রথাটি যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলে চলে আসছে। এখানে বিশ্বাস রয়েছে যে, বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী জীবনের প্রথম ভাদ্র মাসে কোথাও তিনদিন, সাতদিন আবার কোথাও পুরো মাস স্বামী-স্ত্রী মুখ দেখলে স্বামীর চোখ অন্ধ হয়ে যাবে, অমঙ্গল হবে, ঝগড়া-বিবাদসহ তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হবে না। এমন বিশ্বাস থেকে শ্রাবণ মাসের শেষদিন থেকে নববধূরা পুরো ভাদ্র মাস বাপ-মায়ের বাড়িতে নাইওর যায়। গেল এক বছরের মধ্যে যেসব মেয়ের বিয়ে হয়েছে তারা সবাই ফিরছে বাপের বাড়িতে। নববধূ বাপের বাড়ি যাবে এনিয়ে ধুম পড়ে যায় শ্বশুরবাড়িতে। ভাদ্র মাসকে স্থানীয়ভাবে ভাদর মাস বলায় এ আয়োজনকে ভাদরকাটানি বলা হয়। দরিদ্র বাড়ির লোকজন হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল বিক্রি করে অথবা এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়েও এই উত্সব পালন করে আসছে।