সংবিধান সংশোধনে দ্বৈতনীতি
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৪, ২৩:১৪
সামরিক শাসনামলে ১৯৭৮ সালে সংবিধানে সংযোজিত বিচার বিভাগ সংক্রান্ত দুটি অনুচ্ছেদ এখনো সংবিধানে বহাল রয়েছে। এর মধ্যে একটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা এ সংক্রান্ত সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু আরেকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনে কোন আগ্রহ নেই সরকারের। আইন বিশেষজ্ঞরা এটিকে সরকারের দ্বৈতনীতি বলে অভিহিত করেছেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, সরকার দাবি করছে মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংযোজনের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিধানে তারা ফিরে যেতে চায়। কিন্তু সামরিক শাসনের ১১৬ অনুচ্ছেদ বহাল রেখে ৯৬ অনুচ্ছেদে ফিরে যাওয়া সরকারের একটি দ্বৈতনীতি।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো সুপ্রিম কোর্টের হাতে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়, “বিচার কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি-মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকিবে।” জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে ১৯৭৮ সালের ২য় ফরমানের আদেশ নম্বর ৪ এর ২য় তফসিল বলে সংবিধানের উপরোক্ত ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত করা হয়।
সংশোধনীতে উল্লেখ করা হয়, “সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হইবে।” পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলেও এই সংশোধনী সংবিধানে বহাল থাকে।
অন্যদিকে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত ছিলো। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে দেয়া হয়। এ সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকিবে যাহা এই অনুচ্ছেদে ‘কাউন্সিল’ বলিয়া উল্লিখিত হইবে এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারকের মধ্যে পরবর্তী যে দুইজন কর্মে প্রবীণ তাহাদের লইয়া গঠিত হইবে:তবে শর্ত থাকে যে, কাউন্সিল যদি কোন সময়ে কাউন্সিলের সদস্য এইরূপ কোন বিচারকের সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করেন, অথবা কাউন্সিলের কোন সদস্য যদি অনুপস্থিত থাকেন অথবা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোন কারণে কার্য করিতে অসমর্থ্য হন তাহা হইলে কাউন্সিলের যাহারা সদস্য আছেন তাঁহাদের পরবর্তী যে বিচারক কর্মে প্রবীণ তিনিই অনুরূপ সদস্য হিসাবে কার্য করিবেন।
(৪) কাউন্সিলের দায়িত্ব হইবে-
(ক) বিচারকগণের জন্য পালনীয় আচরণ বিধি নির্ধারণ করা; এবং (খ) কোন বিচারকের অথবা কোন বিচারক যেরূপ পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন সেইরূপ পদ্ধতি ব্যতীত তাঁহার পদ হইতে অপসারণযোগ্য নহেন এইরূপ অন্য কোন পদে আসীন ব্যক্তির সামর্থ্য বা আচরণ সম্পর্কে তদন্ত করা।
(৫) যে ক্ষেত্রে কাউন্সিল অথবা অন্য কোন সূত্র হইতে প্রাপ্ত তথ্যে রাষ্ট্রপতির এইরূপ বুঝিবার কারণ থাকে যে কোন বিচারক- (ক) শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে তাঁহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতে অযোগ্য হইয়া পড়িতে পারেন, অথবা (খ) গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইতে পারেন, সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করিতে ও উহার তদন্ত ফল জ্ঞাপন করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। (৬) কাউন্সিল তদন্ত করিবার পর রাষ্ট্রপতির নিকট যদি এইরূপ রিপোর্ট করেন যে, উহার মতে উক্ত বিচারক তাঁহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছেন অথবা গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইয়াছেন তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা উক্ত বিচারককে তাঁহার পদ হইতে অপসারিত করিবেন।
সংবিধানের এই বিধান বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ হিসেবে মনে করেন আইনজীবীরা। ৫ম সংশোধনী বাতিলের মামলায়ও আপিল বিভাগ তার রায়ে উল্লেখ করেছেন: ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিচারক অপসারণ পদ্ধতির যে প্রক্রিয়া তার চেয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে শ্রেয়তর। ৫ম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করলেও আপিল বিভাগ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি অবৈধ ঘোষণা করেনি। পঞ্চদশ সংশোধন বিল পাসের জন্য গঠিত সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি রেখে দিয়ে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের সংশোধন করে।
কিন্তু বর্তমান সরকার ধারাবাহিক দ্বিতীয় মেয়াদে এসে হঠাত্ করে ৯৬ অনুচ্ছেদটি সংশোধন করে ৭২ এর মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আইন কমিশনও এ সংক্রান্ত ৭২ এর মূল অনুচ্ছেদে ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করেছেন। যদিও মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইন কমিশনও নিশ্চুপ।
৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া গতকালও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে দুই তৃতীয়াংশ অনুমোদনের ভিত্তিতে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের যে বিধান ছিলো, সংবিধান সংশোধন করে সেটিই আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছাড়া ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের অনেক কিছুই ফিরিয়ে আনা হয়। এছাড়া বিচার বিভাগ সংক্রান্ত ৯৬ ও ১১৬ অনুচ্ছেদটি সামরিক শাসনামলে যেভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিলো সেভাবেই রয়ে যায়। এর মধ্যে ১১৬ অনুচ্ছেদটি রেখে শুধুমাত্র ’৯৬ অনুচ্ছেদটি সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।
আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংসদের আগামী অধিবেশনে ১৬তম সংবিধান সংশোধন বিলটি পাসের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র পরিচালক ড. শাহদীন মালিক বলেন, ’৭২ সালের মূল সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ ক্ষমতা ছিলো সুপ্রিম কোর্টের হাতে। তাই উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসন ’৭২-এর অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে আনতে হলে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও সুপ্রিম কোর্টের হাতে দিতে হবে। এই সংশোধনী না এনে শুধুমাত্র ৯৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনী আনা হলে সেটি হবে দ্বৈতনীতি।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ব্যারিষ্টার এম মাহবুবউদ্দিন বলেন, ’৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়াটা বাহানা মাত্র। বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে যেটুকু প্রয়োজন সরকার সেটুকুই করছে। ১১৬ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে দিলে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে না। এ কারণেই তারা সেটি করছে না। ৭২ সংবিধানে ফিরতে হলে একসঙ্গে দুটি করা উচিত। তা না করা হলে এটি হবে দ্বিমুখিতা।