সাত মন্ত্রীকে চূড়ান্ত নোটিস দেবে সংসদ কমিটি

মন্ত্রী হিসেবে সরকারি বাসা ব্যবহারের পাশাপাশি সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য ভবনের (ন্যাম ভবন) ফ্ল্যাটেরও দখলে রাখার অভিযোগ উঠেছে সরকারের পাঁচজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন উপমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট ছেড়ে দেয়ার জন্য এই সাত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীকে এবার চূড়ান্ত নোটিস পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদ কমিটি। এরা হলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী সাইদুল হক, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম এবং পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। গতকাল সোমবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদ কমিটির তৃতীয় বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ আ.স.ম ফিরোজ সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘মন্ত্রী হিসেবে সরকারি বাসা পাওয়ার পরেও অনেকে এখনও সংসদ সদস্য হিসেবে আগে থেকে বরাদ্দ পাওয়া ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটের দখল ছাড়েননি। ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট ছেড়ে দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে কয়েক দফা তাদেরকে মৌখিক অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে কেউ এতে সাড়া দেননি। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এবার তাদেরকে চূড়ান্ত ও শেষবারের মতো নোটিস দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদ কমিটি।’ আ.স.ম ফিরোজ অবশ্য ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটের দখল না ছাড়া সাত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীর নাম প্রকাশ করেননি। তবে সংসদ কমিটির বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ওই সাতজনের নাম রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে সংসদ কমিটির সভাপতি বলেন, ‘নবম সংসদের সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের (ওই সাতজনের) অনেকেই ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান। কেউ কেউ আবার এবারের দশম সংসদের সদস্য হিসেবে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছেন, পরে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হওয়ার পর সরকারি বাসাও পেয়েছেন। তবে নবম সংসদ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট তারা এখনও ছাড়েননি।’ তিনি জানান, এই মন্ত্রীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন-আসবাবপত্র গোছগাছ করতে পারেননি বলেই তারা এখনও ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটের দখল ছাড়তে পারেননি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ফিরোজ জানান, দশম সংসদ গঠিত হওয়ার পরপরই নবম সংসদের সদস্যদের সরকারি বাসার বরাদ্দ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। নবম সংসদের অনেকে দশম সংসদেরও সদস্য নির্বাচিত হলেও নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে বাসার জন্য নতুন করে আবেদন করতে হয়। যারা আবেদন করেছেন কিংবা যাদের নামে বাসা বরাদ্দ করা হয়েছে, এখন তারাই বাসায় থাকবেন। তবে মন্ত্রিসভার ওই সদস্যরা ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটের দখল না ছাড়ায় কয়েকজন সংসদ সদস্য এখনও সরকারি বাসায় উঠতে পারেননি। বিশেষ করে, ঢাকায় যাদের নিজস্ব বাসা নেই-তারা বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসায় থাকছেন। জানা গেছে, এর আগে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল সংসদ সদস্যের নামে বাসা বরাদ্দ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশ অনুযায়ী বাসা না ছাড়া মন্ত্রীদের অনুরোধ করা হলেও তারা সাড়া দেননি। এনিয়ে সংসদ কমিটির গতকালের বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সংসদ সচিবালয় থেকে জানা যায়, দশম সংসদ গঠনের পর সংসদ কমিটির প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে-সংসদ সদস্য ভবনে এবার মন্ত্রীদের কোন বাসা বরাদ্দ দেয়া হবে না। সংসদ সদস্যদের ফ্ল্যাটে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা ও ভাই-বোন ছাড়া বাইরের কেউ থাকতে পারবেন না বলেও ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। তবে সংসদ কমিটির এসব সিদ্ধান্ত মানেননি কেউ কেউ। সংসদ সদস্য ভবন ও সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান মন্ত্রী হিসেবে নবম সংসদ থেকেই সরকারি বাড়িতে বসবাস করছেন। তবে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বরাদ্দ নেয়া ন্যাম ফ্ল্যাট-৪ এর ৪০৭ নম্বর ফ্ল্যাটটি এখনও ছাড়েননি। তার একাধিক স্টাফ ও এলাকার লোকজন সেখানে বসবাস করেন। যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের থাকেন হুইপের একটি বাংলোতে। কিন্তু নবম সংসদের সদস্য হিসেবে বরাদ্দ পাওয়া ন্যাম ফ্ল্যাট-৪ এর ৭০১ নম্বর ফ্ল্যাটটির দখল ছাড়েননি। ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ থাকেন মন্ত্রিপাড়ায়। তবে ন্যাম ফ্ল্যাট-৪ এর ৪০৩ নম্বর ফ্ল্যাটটি এখনও নিজ দখলে রেখেছেন। সেখানে তার এলাকার লোকজন থাকছেন। উপমন্ত্রী জ্যাকব পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন মন্ত্রিপাড়ায়। কিন্তু সংসদ সদস্য হিসেবে এর আগে বরাদ্দ পাওয়া ন্যাম ফ্ল্যাট-৬ এর ৯০৩ নম্বর ফ্ল্যাটটিও নিজ দখলে রেখেছেন। ন্যাম ফ্ল্যাট-৪ এর একটি ফ্ল্যাটে থাকছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এলাকার লোকজন। একই কাজ করছেন মন্ত্রী সাইদুল হক ও প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলামও। প্রসঙ্গত, এর আগেও বিভিন্ন সরকারের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে, কমিটির বৈঠক সংক্রান্ত সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে- বৈঠকে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ ও নাখালপাড়াস্থ সংসদ-সদস্য ভবন এবং শেরে বাংলা নগর সদস্য ভবনের অফিস কক্ষের নিরাপত্তার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার স্বার্থে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউস্থ ১, ২, ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর সংসদ-সদস্য ভবন এবং নাখালপাড়াস্থ ১, ২ ও ৩ নম্বর সংসদ-সদস্য ভবনের জন্য সংসদ-সদস্য ভবনে বসবাসরত সংসদ-সদস্য খালিদ মাহ্মুদ চৌধুরীকে আহবায়ক এবং সাগুফতা ইয়াসমিন, পঞ্চানন বিশ্বাস, শেখ হাফিজুর রহমান ও নূরুল ইসলাম ওমরকে সদস্য করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট সোসাইটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। সোসাইটি প্রয়োজনে সংসদ কমিটির সভাপতির পরামর্শক্রমে আরো দু’জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। কমিটি ভুয়া পরিচয়ে সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দকৃত ব্যক্তিদের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী সাব্যস্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের এবং সংসদ ভবন এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের সুপারিশ করে। বৈঠকে সংসদ-সদস্য ভবনের অব্যবহূত আসবাবপত্রগুলোকে যত্রতত্র ফেলে না রেখে নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণের জন্য নাখালপাড়াস্থ সংসদ-সদস্য ভবন এলাকায় আলাদা একটি স্থাপনা তৈরির সুপারিশ করা হয়। অব্যবহূত আসবাবপত্রগুলো ব্যবহার উপযোগী করা অথবা প্রয়োজনে নিলামে বিক্রির পরামর্শ দিয়েছে সংসদ কমিটি। কমিটির সদস্য তাজুল ইসলাম চৌধুরী, আব্দুস শহীদ, নূর-ই-আলম চৌধুরী, সাগুফতা ইয়াসমিন, পঞ্চানন বিশ্বাস ও ফজলে হোসেন বাদশা বৈঠকে অংশ নেন।